Home সায়রে গর্জন সায়রে গর্জন পর্ব ৫৬

সায়রে গর্জন পর্ব ৫৬

সায়রে গর্জন পর্ব ৫৬
নীতি জাহিদ

দুপুরে লাঞ্চের পর কিছুক্ষন বিশ্রাম নিচ্ছে সকলে যে যার যার কামরায়। ছেলেরা সবাই ক্রুজের ছাদে। প্ল্যান করছে কোথায় স্কুবা করবে? গ্যালাপাগোসের অন্যতম বড় দ্বীপ ইসাবেলা। কাছাকাছি এসেই স্কুবা করার প্ল্যান। সন্ধ্যার আগেই কাছাকাছি চলে এসেছে ক্রুজ। শাহাদ নিচে নেমে তৈরি হয়ে নিলো। সাথে তৈরি হলো রকিব এবং রাহিল। রোকসানা শাহাদের কথায় রাজি হয়েছে। ক্রুজের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়েছে সবাই। স্কুবা গেট আপ নিয়ে তিনজনই লাফিয়ে পড়লো পানিতে। অন্যদিকে ক্রুজের কুক,ক্যাপ্টেন সহ প্রত্যেকে চিয়ার আপ করছে। শাহাদদের সাথে ক্রুজের স্টাফ ও গিয়েছে। শেহজা হাত তালি দিচ্ছে। প্রতীক্ষা এখন পাতালপুরীর গল্প শোনার।

গ্যালাপাগোসের ম্যারিন জগৎ নিয়ে যারা স্কুবা ডাইভারদের জানার আকাঙ্ক্ষা সীমাহীন। পছন্দের তালিকার শীর্ষে থাকে। গ্যালাপাগোস মেরিন রিজার্ভ বিশ্বের বৃহত্তম, শত শত বিভিন্ন প্রজাতির জন্য একটি অভয়ারণ্য, যার মধ্যে অনেকগুলি অত্যন্ত বিপন্ন। যদিও স্থলভাগের তুলনায় পানির নিচে কম এন্ডেমিজম রয়েছে, সেখানে গ্রীষ্মমন্ডলীয় এবং নাতিশীতোষ্ণ উভয় পরিবারের প্রজাতির একটি বিশাল বৈচিত্র্য রয়েছে, যা এই দ্বীপগুলিকে স্কুবা-ডাইভ করার জন্য বিশ্বের সেরা জায়গাগুলির মধ্যে একটি করে তুলেছে , সেই সাথে একটি চমৎকার বছরব্যাপী ডাইভিং করার উপযোগী করেছে।

রাহিল কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে শাহাদকে অনুসরণ করছে। এখনো চারদিকে পানি। পেছন দিকে ঘুরতেই দেখতে পেলো উপরের সূর্যের আলো পড়ে চিক চিক করছে পানি। শাহাদ পানিতেই রাহিলের হাত ধরে এগুতে থাকলো। ফ্লিপার এর মতো পা চালাচ্ছে। স্কুবা কস্টিউম এর পদদ্বয় মাছের পাখনার মতো। খানিকটা নিচে নামতেই দেখতে পেল পাশ দিয়ে কিছু রঙ্গিন মাছ যাচ্ছে। পানিতে চিৎকার দেয়ার সুযোগ থাকলে রাহিল হয়তো আজ সজোরে চিৎকার দিয়ে বলতো এই মজার অভিজ্ঞতার কথা। এরপর আবার খানিকটা এগিয়ে গেলো। হঠাৎ রকিব কাছাকাছি এসে ডাকলো দুজনকে। বিশাল এক অক্টোপাস। রাহিল ভয় পেয়েছে। শাহাদ কাছে আগাতেই রাহিল এবং রকিব দুজনই আটকে দেয়।

দুজনের কাউকে তোয়াক্কা না করে শাহাদ এগিয়ে যায়। এই দশ ফিটের অক্টোপাস যে কেউ দেখলো ঘাবড়ে যাবে। শাহাদ কি বুঝে এগিয়ে গেলো! অক্টোপাসটি বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। যেই মাছই কাছে যাচ্ছে তার আটপা দিয়ে মুড়িয়ে বিষ ছেড়ে দিচ্ছে। শাহাদ কাছাকাছি যেতেই এক পা দিয়ে শাহাদকে আক্রমণ করবে এর পূর্বেই শাহাদ ছিটকে গেলো। রাহিল আর রকিব ভীত হয়ে একপাশে সরে আছে। সেই স্ক্রুজের স্টাফ এন্ড্রু ও হাত নাড়িয়ে নিষেধ করছে। খানিকবাদে বুঝতে পারলো শাহাদের আগানোর কারণ। অক্টোপাসের পা মুড়িয়ে গিয়েছে একটা প্রবালে। সে কিছুতেই বের হতে পারছেনা। তাই সামনে যে আসছে ভাবছে তাকে আক্রমণ করবে, তার দিকেই বিষ ছুড়ছে। শাহাদ এগিয়ে পা খুলে দিতেই সরে গেলো প্রকান্ড দেহ নিয়ে। এটাই হয়তো একজন স্কুবা ট্রেইনারের বিশেষত্ব। অন্যদিকে মানব অক্টোপাস শাহাদ ইমরোজ হয়তো বুঝতে পেরেছিলো অক্টোপাসের দুঃখ। সমুদ্রের প্রাণিদের দুঃখ বুঝে প্রতিটি স্কুবা ডাইভার।

পুনরায় এগিয়ে গেলো, অনেক রকমের রঙ্গিন রুপচাঁদা মাছ দেখতে পাচ্ছে। এর পরই ঘটলো জীবনের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনা গ্যালাপাগোস হাঙর সামনে দিয়ে যাচ্ছে। শাহাদ,রকিব, এন্ড্রু মাঝখানে রাহিল একপাশে। ছেলেটা হাঙর দেখে বুদ্ধি হারিয়েছে মাস্ক সরিয়ে ফেলতে চেয়েছিলো। শাহাদ দ্রুত গিয়ে রাহিলকে কাছে টেনে স্থির করে ফেললো। একটি নয়,দুটি নয় মিনিমাম অর্ধশত হাঙর ঘুরে বেড়াচ্ছে চারপাশে। একটু পিছিয়ে শাহাদ খুব কাছ থেকে একটা হাঙরকে ছুঁলো। এত শান্ত, নমনীয় প্রাণি হয়তো দুটি নেই এই হাঙরকে দেখলে মনে হবে। অথচ এরা ততটাই হিংস্র রূপ ধারন করে প্রয়োজনে, যতটা কোনো প্রাণির প্রাননাশ হয়।

মাঝখানে ওরা তিনজন, আচানক সামনে এলো সী লায়ন। হাঙর গুলো সরে যেতেই যেই ঘটনা ঘটলো সী লায়ন পিছু ধরেছে ওদের। যদিও সী লায়ন কোনোভাবেই ক্ষতিকর নয় তবে ভয় পাইয়ে দিয়েছে রকিব এবং রাহিলকে। শাহাদকে কিছুতেই ছাড়ছেনা। এন্ড্রুসহ দ্রুত সেই জায়গা ত্যাগ করে এগুতেই সামনে দেখলো বড় বড় তারা মাছ যাকে ইংরেজি বলে স্টার ফিস। এক একটি তারা মাছ বেশ বড় এরপর কিছু বাঁদুড়ের মত ডানা মেলে যাচ্ছে। পানিতেও বাঁদুড়। আসলে তো এগুলো স্টিংগ্রে ফিস যাদের আমরা শাপলা পাতা মাছ হিসেবে চিনি। শাহাদ পানির মাঝেই উলটো ঘুরে গেলো। মাছ গুলোকে ফলো করেই আগাতেই দেখতো বেশ চমৎকার কিছু সামুদ্রিক প্রাণি। সব শেষে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহুর্ত এলো। শাহাদ স্বচক্ষে দেখতে পেলো গ্যালাপাগোস বিখ্যাত হ্যামারহেড শার্ক বা হাতুড়ে হাঙর। যার মাথা দেখতে হাতুড়ির মত। এই হাঙর নিয়ে জানা অজানা রহস্যের শেষ নেই। অন্য হাঙরের চেয়ে এই হাঙর তুলনামূলক কম ক্ষতিকর। এরা ছোট মাছ শিকার করতে পছন্দ করে। পানির নিচে মানুষটার হাসি পর্যবেক্ষন করা সম্ভব হয়নি। তবে তার মনোবাসনা আজ কিছুটা পূর্ণ হলো।

ফিরে আসার পর পথ আটকালো সেই বিশালাকৃতির অক্টোপাস যার পা সুরক্ষিত করেছিলো শাহাদ। চারজনকে ঘিরে ঘুরছে সেই অক্টোপাস। সাথে আরো আছে তার পুরো দল। কিছুটা ভীত হলো রকিব রাহিল এবং এন্ড্রু। তবে শাহাদ এগিয়ে গিয়ে অক্টোপাসকে ছুঁয়ে দিতেই শাহাদকে আট পায়ে মুড়িয়ে ধরলো। বাকিরা ভয়ে পিছিয়ে গেলো। এমন পরিস্থিতির শিকার শাহাদ নিজেও কখনো হয়নি। ভয় না পেলেও হাত দিয়ে তিনজনকে চলে যেতে বললো। বাকি অক্টোপাস ওদের আক্রমণ করার আগেই চলে যাওয়া উচিত। সমুদ্র কতটা রহস্যময় আজকের ঘটনা না ঘটলে হয়তো অজানাই থেকে যেতো। শাহাদকে অক্টোপাস ছেড়ে দিলো।

একই ভাবে আরো একটা অক্টোপাস এসে আটপায়ে ধরলো। শাহাদের তখন মনে হলো এরা তো আমাকে আক্রমণ করছে না। মানুষের মতো আলিঙ্গন করছে। চারজনকে ঘিরে হাজারো মাছ,অক্টোপাস খেলছে। মনে হচ্ছে সমুদ্রে তাদের জন্য কোনো উৎসব রেখেছে অক্টোপাসের পরিবার। তবে কি তখন বিপদ থেকে পরিবারের লোককে উদ্ধার করাতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে এসেছে! এটা কি সম্ভব! সম্ভব। তখনই মনে হলো আরে আমি তো অন্য কোথাও নেই। আছি তো গ্যালাপাগোস যা ভ্রমণপিয়াসীদের জন্য স্বর্গ। এখানে তো কোনো প্রানী কারো ক্ষতি করেনা। এই অভিজ্ঞতা নিয়ে উপরে উঠে আসলো সকলে। প্রায় এক থেকে দেড় ঘন্টা পানির নিচে কাটিয়ে যখন উপরে উঠে এলো ক্রুজে মানুষ গুলো অপেক্ষা নিয়ে তাকিয়ে আছে। ক্রুজে উঠে চারজনই স্তব্ধ। স্কুবা কস্টিউম ছেড়ে লন এ বসেছে। রাহিল শাহাদকে সবার সামনে বললো,

– আংকেল এ আমি কি দেখলাম?
রকিব ও স্তব্ধ। বাক হারিয়ে নিস্তেজ হয়ে আছে। আদিত্য প্রশ্ন করলো,
– খারাপ কিছু দেখেছো?
রকিব মুখ খুললো,
– আদিত্যদা বিশ্বাস করেন, আমার জীবনে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনা আজ ঘটেছে। আমি লাইভ না দেখালে আপনারা হয়তো বিশ্বাস ও করবেন না। আমি নিজেও না দেখলে বলতাম কেউ গাজাখুরী গল্প ছাড়ছে।
মল্লিকা, মনিরুজ্জামান প্রশ্ন করলো,
– কি ঘটেছে?
রাহিল বললো,
– অক্টোপাসকে শাহাদ আংকেল বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে, ওটার পা আটকে গিয়েছিলো। যেন তেন অক্টোপাস নয়। বিশাল। আট/দশ ফিট। সেই অক্টোপাস আমরা আসার সময় পথ আটকে আংকেলকে পেঁচিয়ে ফেলেছে…
কথা শেষ হওয়ার আগেই রোকসানা চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো,

– ইন্না-লিল্লাহ।
রকিব ধমকে বললো,
– থাম কিসের ইন্না-লিল্লাহ। অক্টোপাস শাহাদকে পেঁচায় নি। জড়িয়ে ধরে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে এসেছে। ইভেন তার পরিবার নিয়ে। আরো মাছ নিয়ে আমাদের ঘুরে খেলছিলো। ভাবতে পারছিস এমন ঘটনা? কল্পনা করতে পারছিস? আমি এক মুহুর্তের জন্য ভেবেছিলাম আজকে ম/রেই গেলাম বুঝি।যেভাবে শাহাদকে আট পায়ে পেঁচিয়েছে। ভয়ে আমি আর রাহিল ওখানেও শেষ।
দিয়ার শ্বাস আটকে আসছে। এদিকে শাহাদ মেয়েকে বুকে নিয়ে বউকে আগলে বসে আছে। কেমন যেন নিশ্চল। রকিব শাহাদের দিকে তাকিয়ে বললো,
– ভাই আজ যা যা দেখলাম পানির নিচে আমার মনে হলো আমি পৃথিবীর কোথাও এই সুখ পাবোনা। তোকে ধন্যবাদ দিলে কম হবে। তুই কিছু বল?
শাহাদ মুখ খুলে বলে,

– আমার জন্য প্রতিটি ঘটনাই উত্তেজনার ছিলো। তবে অক্টোপাসটা যা করলো আমি সারাজীবন মনে রাখবো। সম্ভবত পুরুষ অক্টোপাস হবে। পরের বার আমাকে যে ধরেছে তা নারী অক্টোপাস। স্বামী, বাবা ছাড়া কতটা অসহায় একটা পরিবার? অক্টোপাস হোক আর মানুষ, সকলের জীবনের ভিত্তি যে পুরুষ মানুষ আমি আজ টের পেলাম। একজন পুরুষ কতটা সৌভাগ্যবান জানিস? এরা বাবা মায়ের আদর পায়, সন্তানের,ভাই বোনের সম্মান পায়, স্ত্রীর ভালোবাসা পায়৷ কোথায় পাবো এমন বিরল চিত্র!! অক্টোপাসের কৃতজ্ঞতা কতটা মায়াময়, ভালোবাসাময় ছিলো বলতো!
দিয়া হেসে বলে,
– তাহলে তো আমার পানির নিচে যাওয়া উচিত ছিলো। অক্টোপাসের চেয়ে যন্ত্রনা বেশি তো আমি ভোগ করেছি অনেক মাস। যখন কেউ ছিলোনা পাশে। বাবা নেই, ভাই নেই, স্বামী অসুস্থ সিঙ্গাপুর। ভাবুন তো কতটা অসহায় কেটেছে একেকটা দিন?

ঘড়িতে সন্ধ্যা সাতটা। অফিস থেকে বেরিয়েই হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বিয়ে হয়েছে আজ দশদিনের ও বেশি সময় পেরিয়েছে। স্বাভাবিক সবকিছুর মাঝেও অস্বাভাবিকতা পরশ রয়েই গেলো। হাসপাতালের নিচে শিউলী গাছটাতে ফুলে ফুলে ভরা। শ্বাস টানতেই মনে হয় কত মায়া। কল দেয়া হয়েছে ডাক্তার তাহিকে। উঠায় নি হয়তো ব্যস্ত। একটা মেসেজ দিয়ে বাইকের নিচে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আজই বাইক নিয়ে বেরিয়ে প্রায় অনেক মাস পর। এক্সিডেন্টের পর কেউ বাইক ছুঁতে দেয়নি। ভাইজান দেশের বাইরে সেই সুযোগে গ্যারেজে সকালে বলেছে বাইক ঠিক করে অফিসে দিয়ে আসতে। ফোন হাতে নিতেই অপরিচিত আইডি থেকে বন্ধু রিকুয়েস্ট পাঠানো হয়েছে ফেসবুকে। হালকা হাসলো লিমন। বেশি না বছর খানেক আগেও এসব রিকুয়েষ্ট দেখলে মজা নেয়ার সুযোগটা এক বিন্দু ছাঁড় দিতো না। অথচ আজ সেদিকে মনই টানে না। ভাবতে ভাবতে চা নিয়ে যাচ্ছে একজন। তাকে থামিয়ে এক কাপ লেবু চা করে দিতে বললো। অফিস থেকে বের হতেই শরীরটা ভালো ঠেকছেনা।
চা মুখে দিতেই ফোন বেজে উঠলো। তাহি ফোন দিয়েছে। রিসিভ করতেই বললো,

– উপরে এসে বসুন। আমার আরো কিছুক্ষণ সময় লাগবে।
– আচ্ছা, আমি আছি। আপনার হলে জানাবেন।
– হুম।
সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলো। চা খেয়ে চা ওয়ালার মামার সাথে গল্প জুড়ে দিলো। হাসপাতালের কেয়ারটেকার ও যোগ দিলো। লিমনকে চেনে। প্রায় দেখে তাহি ম্যাডামকে নিতে আসে। প্রশ্ন করেনি কখনো। আজ সাহস করে বললো,
– স্যার একটা কথা জিজ্ঞেস করি যদি আপনে অনুমতি দেন আর কি?
– জ্বি চাচা বলুন।
– তাহি ম্যাডাম আপনের কি লাগে?
লিমন হেসে দিলো। জবাবে বললো,
– চাচীর নাম কি চাচা?
– জ্বে আমার বউয়ের নাম?
– জ্বি।
– লতা।

– আচ্ছা। লতা চাচী আপনার যা হয় তাহি ম্যাডাম ও আমার তা হয়।
– ইয়া আল্লাহ! কি কন তাহি ম্যাডাম বিয়া করছে?
– হ্যাঁ কিছুদিন হলো। দোয়া করবেন আমাদের জন্য।
– অবশ্যই দোয়া স্যার। কি যে মন খুশি লাগতাছে। তাহি ম্যাডাম অনেক ভালা। আপনারা সুখী হন। বহুত কষ্ট করছে ম্যাডাম এত বছর। আমার মন থেইকা দোয়া ম্যাডামের লাইগা।
লিমন দেখলো তাহির বেশ সময় লাগছে। বাইক পার্ক করে উপরে চলে এলো। ওয়েটিং চেয়ারে বসে অপেক্ষা করতেই পাশ দিয়ে দুজন নার্স ফিসফিস করে বললো,
– ডাক্তার তাহির হাসবেন্ড। উনার থেকে বয়সে ছোট। শেষমেষ ছোট টা ধরছে।
লিমনের মনোযোগ ফোনে ছিলো। কর্ণকুহরে কটু কথা আসতেই চোখ পাকিয়ে তাকালো নার্সের দিকে। নার্সের সামনে গিয়ে শীতল কন্ঠে বললো,

– নার্স আমাকে কি আপনার অসুন্দর মনে হয়?
থতমত খেয়ে গেলো নার্স দুজন। পাশে ছিলো রিসিপশনিস্ট। নার্স তোতলে বললো,
– আমি তো ওভাবে মানে আপনি যা বলতে চাইছেন তা বলিনি।
– কি বলতে চাইছি আমি আপনিই বলুন?
– স্যরি স্যার।
– আমি দেখতে খুব সুন্দর আমি জানি। ইভেন খুব ভালো মেয়ে পটাতে পারি। আমার হাসি সুন্দর। আপনিও কাত আমার হাসিতে আমি এটাও জানি। তাহলে বুঝে নিন ডাক্তার তাহি ঠিক কতটা মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য্যের অধিকারী হলে আমি পাগল হয়ে যাই। আমার স্ত্রীর নামে কিছু বলার আগে ভেবে বলবেন। আমার পছন্দ নয়।

– জ্বি স্যার।
– গুড।
– মিস্টার লিমন?
রিনরিনে আওয়াজ পেয়ে ঘাড় ঘুরালো লিমন। ক্লান্ত,পরিশ্রান্ত স্ত্রীকে দেখে কষ্ট লাগলেও সারাদিনের পরিশ্রম সব যেন উবে গেলো। হেসে সামনে এগিয়ে বললো,
– কাজ শেষ?
– ওটি করেই বের হলাম। চলুন। কি করছিলেন ওখানে?
– ভাবছিলাম ডাক্তার দেখাবো তাই নার্সদের সাথে আলোচনা করছিলাম।
উপস্থিত সকলে চেহারায় এমন চোর চোর ভাব আনলো দেখেই বুঝা যায় সুযোগ পেলেই এরা চোগলখোরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
তাহি হেসে বললো,

– কিসের ডাক্তার? এখনো আছে কিছু ডাক্তার। চলুন দেখিয়ে নিবেন।
– অসুখ তো সেরে গিয়েছে।
তাহি ভ্রু কুচকে বললো,
– কি বলছেন?
– আপনাকে দেখলাম, দু চোখ জুড়ালো, বুকের ভেতর খরস্রোতা নদী শান্ত হলো। হৃদয় গেয়ে উঠলো,
সেদিনও বুঝিনি আমি যে চোখে পড়েছি ধরা
এভাবে আমার হয়ে যাবে
আলগোছে পায়ে পায়ে যে কবিতা হলো শুরু
এভাবে মলাট খুঁজে পাবে।
তাহি লজ্জা পেয়ে গেলো সকলের সামনে। লিমনকে ছেড়ে সামনে এগিয়ে এলো। তাহি এগুতেই লিমন ওদের দিকে তাকিয়ে বললো,

– গানটা সুন্দর না? বাকিটুকু ভুলে গিয়েছি নতুবা পুরোটাই গেয়ে শোনাতাম আপনাদের।
হেঁটে চলে গেলো সামনে। পেছনে রাখা মানব মানবীদের মুখ ছিলো দেখার মতো। পুরুষ নার্স হালকা হেসে বলে,
– তোদের দুটোর উচিত শিক্ষা হয়েছে। যখনই দেখি ওর নামে এর নামে বলতে ব্যস্ত। দাড়া স্যারকে বলব তোদের নামে।
নিচে নামতেই লিমন বাইক বের করলো। বাইক দেখে তাহি চটে গেলো। যাবেনা গো ধরে বসে আছে। লিমন অনেক বুঝিয়ে বললো,
– শুধু আজকের জন্য। যদি সঠিক ভাবে না চালাতে পারি, ওয়াদা করছি আপনি যেভাবে বলবেন ওভাবে হবে।
তাহি লিমনের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আমি বাইকে বসতে পারিনা।
লিমন হেসে বললো,

– বসে শক্ত করে আমাকে ধরুন। বাকিটুকু আমি সামলে নিবো।
লিমন ব্যাগ থেকে তাহির জন্য হেলমেট বের করে পরিয়ে দিলো। জীবনে প্রথমবারের মতো তাহি বাইকে চেপে বসলো। প্রথমে লিমনকে না ধরলেও ভয়ে চেপে ধরলো। বাইক স্টার্ট দিলো। আরো জোরে চেপে ধরলো। বেশ রাত হয়েছে। গলির রাস্তা ধরলো। পুনরায় গলা ছাড়লো,
সেদিনও বুঝিনি আমি যে চোখে পড়েছি ধরা
এভাবে আমার হয়ে যাবে
আলগোছে পায়ে পায়ে যে কবিতা হলো শুরু
এভাবে মলাট খুঁজে পাবে।
তাহির খুব পছন্দের একটি গান। শিরশিরে হাওয়া লাগছে। শীত শীত প্রকৃতি। চোখ বুজে তাল মিলিয়ে গেয়ে উঠলো,

সায়রে গর্জন পর্ব ৫৫

– হাওয়া কেন চেনা আঙুলে?
হাওয়া কেন আমাকে ছুঁলে?
আমিও কি পড়েছি প্রেমে অকারণ?
হাওয়া কেন চেনা আঙুলে?
হাওয়া কেন আমাকে ছুঁলে?
আমিও কি পড়েছি প্রেমে অকারণ?

সায়রে গর্জন পর্ব ৫৭