Home মন পিঞ্জিরা মন পিঞ্জিরা পর্ব ২৬+২৭

মন পিঞ্জিরা পর্ব ২৬+২৭

মন পিঞ্জিরা পর্ব ২৬+২৭
শ্যামলী রহমান

রাত তখন গভীর। নিস্তব্ধতা বলে দিচ্ছে মানুষের সঙ্গে গ্রাম ও যেন ঘুমিয়ে পড়েছে।বিয়ে নিয়ে দৌঁড়াদৌঁড়ি করাতে সকলে ক্রান্ত।কারো মন,কারো মতিষ্ক।অন্ধকার আকাশে আজ কেন যেন চাঁদের দেখা নেই। দূরে কোথাও একটুখানি আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। হওয়ায় গাছের পাতা দুলছে।হুতুমপেঁচা ডাকছে থেকে,থেকে।এই অন্ধকারে দুজন মানুষ ছাঁদে দাঁড়িয়ে আছে।তাদের গন্তব্য এখানে পরিকল্পিত।সমোঝোতা নাকি বোঝাপড়া?প্রহর পিয়াসের ঠিক ডান সাইডে দাঁড়িয়ে।হাতদুটো গোটানো বুকের মাঝে।পিয়াস এবার সোজাসুজি হয়ে প্রহরের দিকে তাকালো।নিরবতা ভেঙে প্রশ্ন করলো,

“নিজেকে মহান ভাবলেই কেউ মহান হয়?একবার বললে খুব ক্ষতি হতো?আমরা তোর আপন না?
আগে বললে এমন দিন আসতো না।
ভালোবাসলে বলার সাহস রাখতে হয়।তুই কি করেছিস?একবার মনে হয়েছিলো তুই পাওয়ার যোগ্য না আবার মনে হলো হয়তো বলার মতো পরিস্থিতি পাসনি। কিন্তু আমারে বলতে পারতি।
প্রহর তীর্যক হাঁসলো। প্রতিত্তোরে বলল,
“মহান আমি নিজেকে ভাবিনা।আমাকে ভালোবাসা মানুষ গুলো আমার কাছে মহান।যেমন তুমি।নিজের পছন্দ বিসর্জন দিয়ে আমার সাথে পরিণয় করিয়ে দিলে।এটা কি নয় মহানুভবতা?
পিয়াস চুপ হয়ে গেলো।সেও সহ্য করতে পারেনি মিথির কবুল বলা। তার পর সহ্য করেছে নিজের জীবনে অন্য একজন কে জড়িয়েছে।অনুভূতি তীব্র না হলে সামান্য যতটা কষ্ট দিচ্ছে প্রহর যদি না পেতো তবে কতটা কষ্ট পেতো তা এখন অনুভব করছে।

“ঘরে যা।
“তুমি যাবে না?
পিয়াস প্রহরের এই প্রশ্নে সামনে ঘুরলো।দূরে তাকিয়ে নিরস মুখে জবাবে বলল,
“কিছু সময় প্রয়োজন। আমার নিজেকে এখন একলা লাগবে।ঘর আমার জন্য বিষাক্ত মনে হবে।
একদিন বলেছিলি না?
“সবার জীবনে বসন্ত রঙীন হয়ে আসলেও,
আমার জীবনে বসন্ত আসে কেবল ঝরাপাতার মৌসুম নিয়ে।
এই লাইনটা তোর জন্য আজ ভুল প্রমানিত।
এই বসন্তে তোর জীবন রঙিন হবে,ভালোবাসার ফুল ফুঁটবে।আমার দেখতে হয়তো বিষাক্ত লাগবে কিন্তু মন থেকে চাইবো তেরা ভীষণ ভালো থাক,সুখি থাক। আর পরিশেষে একটাই অনুরোধ করবো রাখবি?
প্রহর আরেকটু সামনে এগিয়ে গেলো।অন্ধকারে পুকুরপাড়ে জোনাক পোকা জ্বলছে।সবুজ মিটিমিটি আলো উড়ে বেড়াচ্ছে সেদিকে তাকিয়ে বলল,

“আমার জীবনে বসন্ত আমি এভাবে চাইনি।আমি চেয়েছি সবাই ভালো থাকুক।তার পর হয়তো আল্লাহ কিছু সুখ আনন্দ কপালে লিখছে এজন্য রঙিন বসন্ত পেলাম। তবে চাই তোমার জীবন ও বসন্তের ন্যায় রাঙিয়ে উঠুক।সময় নেও,তবে মেয়েটাকে ভালোবেসো,ভালো রেখো।একজন দায়িত্ববান, ব্যক্তিত্ববান স্বামী হিসাবে তার কাছে ধরা দিও।মেয়েটা ভীষণ ভালো এবং কিছুটা অবুঝ পাগলামো করে।অবশ্য তার পাগলামোর জন্য আজ আমি এই পোশাকে।
ওহ হ্যাঁ পরিশেষে কোন অনুরোধ সেটুকু বলো?
পিয়াস কিছু একটা ভেবে কথাটা চেপে গেলো।আজ বলা ঠিক হবে না ভেবে শুধু বলল,
“কাল বলবো।এখন ঘরে যা অনেক রাত হয়েছে।
প্রহর গেলো না। ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো। বলল,

“তুমি ও চলো।
“তুই যা আমি দশ মিনিট পরই যাচ্ছি।
প্রহর বিশ্বাস করলো এবং পা বাড়ালো।সে জানে পিয়াস যখন বলেছে তখন ঠিকই যাবে।ছোটবেলা থেকে প্রহর পিয়াস দুজনে মিথ্যা বলতো না এবং যা বলতো সেটাই পালন করতো।প্রহর ছাঁদ ত্যাগ করতেই পিয়াস ছাঁদের কিনারার দেওয়াল ঘেঁষে বসলো।অন্ধকার আকাশে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলল,
“সময়ের পরিবর্তনে শ্বাসটাও যখন অসস্থির লাগে,
তখন সব ভালো মানতে ও দেখতে বিতৃষ্ণা জাগে।
প্রহর ছাঁদ থেকে নেমে ঘরে না গিয়ে নিচে গেলো।পাভেল আর আসিফ কে নিচে একটা রুমে থাকতে দেওয়া হয়েছে।সে যেয়ে দেখলো পাভেল ফোনে কথা বলছে আর আসিফ বিছানায় শুয়ে আছে। প্রহর কে ঘরে আসতে দেখে পাভেল ফোন রাখলো,আসিফ উঠে বসলো।জিজ্ঞেস করলো,

“তুই এখন এখানে কেন?আবার ঠোঁটে দুষ্টু হাঁসি নিয়ে বলল,
“তোর তো এখন বলবো কথা বাসর ঘরে সিনেমা দেখার কথা মামা।
আসিফের কথায় পাভেল ও হেঁসে ফেললো। দুজনের হাঁসি দেখে প্রহর কপালে ভাঁজ পড়লো। দাঁত চেপে বলল,
“দেখতে এসেছিলাম ঘর পেলি কি-না। নাকি আবার গোয়াল ঘরে জায়গা করে দিবো।
“তোর ঘরে যাই তুই আর তোর শুকতারা গোয়াল ঘরে বসে আকাশের শুকতারা দেখবি আর গল্প করবি ভালো হবে না?
প্রহর কিছুটা তেড়ে আসার ন্যায় হয়ে আসিফ দিকে এসে বলল,
“তোর দাঁত গুলো ফেলে দিতে পারলেও ভালো হবে।ঘুমো তাড়াতাড়ি।
পাভেল প্রহরের কাছে গেলো।কাঁধে হাত রেখে হেঁসে বলল,

“নতুন জীবনের জন্য শুভ কামনা। শত দুঃখের মাঝেও সুখের দেখা মিললো অবশেষে। এই সুখ টুকু চিরস্থায়ী হোক।অন্তকাল ভালোবাসার জয় হোক,তার মনেও তোর জন্য সীমাহীন ভালোবাসা জন্মাক।
ঠাড্ডা শেষে সিরিয়াস কথা শুনে প্রহর আবেগপ্রণীত হয়ে গেলো।দুজনে কাছাকাছি এসে বলল,
“আমার দুঃখের সময়ের সঙ্গী তোরা ছিলি,
আমার সুখের সঙ্গী হিসাবে তোরা দুজনেও থাকবি।
জীবনে বন্ধু নামক জিনিসটি ভীষণ প্রয়োজন। তবে সেটা তোদের মতো সৎ,নিষ্ঠাবান বন্ধু। অনেকে জিজ্ঞেস করে জীবনে বন্ধু তোমার কি করলো? উত্তর-
“দুঃখের মাঝেও হাঁসতে শেখালে,খারাপ সময়ে ভরসা হয়ে দাঁড়ালো।এই ছোট জীবনে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা উপহার দিলো।”

আবেগের টান হৃদয়ে লাগলো।তিনজনের বহু মিলিত হলো। বন্ধুত্ব হলো সৃষ্টি কর্তার দান।
জীবনে সৎ,নিষ্ঠাবান বন্ধু থাকা প্রয়োজন। যারা আপনাকে খারাপ পথে যেতে দেখলেও টেনে আনবে,বোঝাবে সঠিক পথ কোনটা।
আজকালকের বন্ধুত্ব অনেক এমন আছে।
বলে চল আজ নেশা করে আসি,ওই মেয়েকে বিরক্ত করে ঘরে আসি।অনেক ছেলে ভালো থাকলেও অসৎ বন্ধুর সাথে না চাইতেও জড়িয়ে নেশাগ্রস্ত হয়,বাবা মায়ের অবাধ্য হয়ে যায়।
আজ বলে চল একটান দে একবার খেলে কিছু হয়না। অথচ এই একবার থেকে অভ্যাসে পরিনত করায়।এর পর শুরু হয় বাবা মায়ের অবাধ্যকতা।

একজন ভালো বন্ধু যেমন সুন্দর পথ দেখায়,তেমন একজন খারাপ বন্ধু অন্ধকারে হারিয়ে নিয়ে যায়।
প্রহর সিঁড়ি বেয়ে উঠছে।মাঝ সিঁড়িতে পা থেমে গেলো।পিছনে তাকালো তক্ষণাৎ কিন্তু কাউকে দেখতো পেলো না। কিন্তু স্পষ্ট মনে হলো পিছনে কেউ আছে।বাড়িতে তো কেউ জেগে নেই এই সময়ে। পিয়াস ভাই তো ছাঁদে তবে কি আমার মনের ভুল। হয়তো তাই। মনের ভুল ভেবে উপরে উঠে গেলো।ঘরে ঢোকার আগে আরেকবার আশে পাশে তাকালো।প্রহর নিজের ঘরের ভিড়ানো দরজায় হাত দিলো।কাঠের দরজা কিছুটা শব্দ করলো।ঘর অন্ধকার হয়ে আছে। চেনা ঘরে সুইচ খুজতে অসুবিধা হলো না।লাইট জ্বালাতে দেখলো মিথি বিছানার একপাশে শুয়ে আছে।লাইটের আলো চোখে পড়তেই চোখের পাতা নড়ছে,পিটি পিটি করছে।চোখে আলো যেন অসহ্য লাগছে সেটাই বুঝাচ্ছে।প্রহর তার মুখের দিকে চেয়ে হেঁসে ফেললো।শব্দহীন হাঁসি ঠোঁটের কোনো রেখে মিথির হাত ঝাকিয়ে আলতো করে ডাকলো,

“মিথি?
“হুম হ্যাঁ।একবার ডাক দিতেই মিথি হকচকিয়ে উঠে পড়লো।ভালো মতো না দেখে,না বুঝে বলল,
“কি হয়েছে আম্মা?ঘরে কি ডাকাত পড়লো?
প্রহর ভ্রু উঁচিয়ে তাকালো।মিথির ঘুমঘুম চেহারা দেখে এবার জোরেই হেঁসে ফেললো।হাঁসির শব্দে মিথি চোখ ডলে তাকালো। সামনে প্রহর হাঁসছে। সাদা দাঁতগুলো চকচক করছে।শ্যামলা গালে হাঁসি বেশ মানিয়েছে। প্রহর এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে হাঁসি বন্ধ করলো, বলল,
“ঘরে ডাকাত পড়েছে।শুকতারা কে চুরি করতে বড় ডাকাত এসেছে।
এতটুকু বলেই মিথির পাশে বসলো। হাৃসি এখনো তার অধঁরে রয়ে গেছে।খুব একটা হাঁসি না দেখতে পাওয়া ঠোঁটে হাঁসি আজ বড়ই ভালে লাগলো।নিরবতায় দুজনে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইলো।মিথিও কি বলবে বুঝতে পারলো না।এর মধ্যে বেমালুম ভুলে বসলো স্বামী কে সালাম করতে হবে সায়েদা বানু বলেছিলো। প্রহর ডানপাশে মিথির দিকে তাকালো। উদরে শাড়ির উপর হাতটা ধরার তিব্র বাসনা জাগলো।

“হাতটা কি ধরবো?
মিথি সামনে থেকে নজর সরিয়ে বামপাশে তাকালো।চোখে চোখ পড়লো।সে চোখে তার জন্য সমুদ্র সমান ভালোবাসার ঢেউ খেলছে।
“বিয়ে করার সময় কি বলেছিলেন বিয়ে টা কি করবো?
“কেন তুমি কি মন থেকে রাজি ছিলে না?
প্রহরের চোখে জানার আগ্রহ। হাঁসি মুখটা কিছুটা কালো হয়ে এসেছে।
“তা কখন বললাম?অধিকার আছে আপনার হাত ধরতে পারেন।আর আপনি আমায় তুমি বলছেন যে?
প্রহর অনুমতি পেয়ে ডান হাতটা মুঠোয় নিলো।শক্ত করে ধরলো যেন ছেড়ে দিলে হারিয়ে যাবে।মিথির সত্তা কেঁপে উঠল।এ হাতের ছোঁয়া আজ অন্য রকম লাগছে।অনুভূতি হচ্ছে অবর্ননীয়।
মিথির প্রশ্নের উত্তর দিলো এবার,

“ স্ত্রী’কে তুই ডাকা সম্মানের নয়।আগের সম্পর্ক আর এখনের সম্পর্কে ভিন্নতা আছে।তুমি আমার অধ্যাঙ্গীনি,আমার জীবনে সকল সুখ দুঃখের সাথী।
জীবনের শেষ পর্যন্ত থাকতে হবে আমার পাশে।
মিথির মুগ্ধতা বাড়লো।নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।প্রহর উঠে দাঁড়ালো।হুট করে মিথিকে দাঁড় করিয়ে নিজের সামনাসামনি আনলো।কাছাকাছি হতে মিথি নড়তে ভুলে গেলো। প্রহর হাত খানা সামনে ধরে বলল,
“আমার এই বুক পাঁজরে তোমাকে রাখতে চাই,

সন্ধ্যে নামলে ব্যস্ততা ভুলে নীড়ে ফিরে তোমার মুখটি দেখতে চাই,
নির্ঘুম রাতে অন্ধকার আকাশের চাঁদ দেখে গল্প করে রাত্রি পার করতে চাই,
হঠাৎ দুপুরে ক্রান্তির শহরে তোমার কাঁধে মাথা রেখে শান্তির নিঃশ্বাস নিতে চাই।
এই স্বার্থের দুনিয়ায় আমি তোমার আলিঙ্গনে থাকে চাই।তুমি কি আমার সুখে-অসুখের কারণ হবে?
সুখের মাঝে অসুখ থাকবেই।আমি শুধু সুখ নয়,অসুখের মাঝেও তোমায় খুঁজে নিবো।
তোমার ত্রুটিহীন হতে হবে না তুমি শুধু আমার একান্ত হইও।
মিথি স্তব্ধ। এমন অনুভূতি সে পড়লেও কখনো শোনোনি।ঝিম ধরে আছে শরীর।অনুভূতিরা তার মনে দোলা দিচ্ছে। প্রচন্ড আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সামনের মানুষটির উত্তরের আশায় চেয়ে আছে।মিথি প্রহরের হাতের উপর আরেক হাত রাখলো,তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“স্বামী রূপে যখন গ্রহণ করেছি, তখন আজীবন পাশে থাকবো,নান্দনিক দুনিয়ায় আপনার অসুখ সারানোর দায়িত্ব নেবো,সুখ বলতে আমি দুঃখের মাঝে হাঁসিকে বুঝি। সেই হাঁসি সুখের হোক,দুঃখের সাথে লড়াই করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি হোক।সেই পথে আপনার হাতে আমার হাত থাকুক মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।
প্রহর শুনলো।মিথির কথা শেষ হতেই হুট করে মিথিকে বক্ষে জড়িয়ে নিলো।মিথির মাথা ঠেকলো ওর বুকে।মিশ্র অনুভূতিতে সিক্ত হলো দুজনের হৃদয়।অবশেষে পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত ভালোবাসা।
প্রহর একটু সরে এলো।মিথির মাঝে সামান্য দূরত্ব রেখে ঠোঁট ছোঁয়ালো কপালে।মিথি চোখ বন্ধ করলো,শক্ত করে ধরলো হাত। ঠোঁটের ছোঁয়া গাঢ় হলো ঠেকলো নাকের ডাগা ও অঁধরের কোনো।
শেষ ভাগে মিথির হৃদ স্পন্দন বাড়লো,বুকের পাশে ধুকপুক করছে। প্রহর হেঁসে অনেকটা কাছে আসলো।মিথি দুহাতে জড়িয়ে ধরলো প্রহর কে।হাত ঠেকলো পিঠের পিছনে কাঁধ জড়িয়ে।নিস্তব্ধ রাতে আমাবস্যায় ও বুঝিয়ে দিলো।ভালোবাসা কেউ ভালোবাসার চাদরে মুড়বে,কেউ বা স্মৃতি মনে করে নির্ঘুম রাত জাগবে।

পিয়াস ঘরে এসেছে একটু আগেই। এসে দেখে শার্লিন ঘুমিয়ে গেছে।ক্লান্ত অসুস্থ শরীর ঘুমিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক।ডাক্তার বলেছে রেস্ট নিয়ে এবং সময় মতো ঘুমতে।পিয়াস ধীর পায়ে গিয়ে বসলো জানালার সামনে চেয়ারটায়।পিছনের আম বাগান থেকে ঝি ঝি পোকার ডাক ভেসে আসছে। সেই আওয়াজ কাণে আজ যেন বিষের মতো বাজছে।
এক পলক পিছনে বিছানায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকা শার্লিনের দিকে তাকালো।তার পর মনে পড়লো প্রহরের কথা। মাথা থেকে সেসব ভাবনা ঝেড়ে ফেলতে চাইলে কিন্তু পারলো না।সময়ের সাথে সবকিছু পরিবর্তন হয়,এই ভালোলাগাও পরিবর্তন হবে কিন্তু সেই সময় অপেক্ষা করতে হবে।অনুভূতির দারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তখন মনে হবে তাকে ছাড়া জীবন অচল কিন্তু একদিন সেই অনুভূতি মিথ্যে মনে হবে যদি জীবনে কেউ দ্বিগুণ ভালোবাসে।
এসব ভাবতে ভাবতে কখন চোখ লেগে এসেছে বুঝতে পারেনি।

“এখানে শুয়ে আছেন কেন?বিছানায় ঘুমান।সমস্যা হলে আমি নিচে ঘুমাবো।
পিয়াস সজাগ হলো।শার্লিনের কন্ঠ কর্ণগোচর হতেই চোখ মেলেছে।পিছনে শার্লিন দাঁড়িয়ে আছে।
পিয়াস এক পলক তাকালো। চেয়ার ছেড়ে উঠে বিছানায় গেলো,বলল,
“এটা বাংলা সিনেমা নয়,বাস্তব জীবন তাই সিনেমাটিক কথা বাদ দিয়ে যেখানে শুয়ে ছিলি সেখানে আবার শুয়ে পড়।
শার্লিন চোরা চোখে তাকালো।পিয়াস ততক্ষণে শুয়ে পড়েছে। শার্লিন ও তার পাশে খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে শুয়ে পড়লো। দুজন দুপাশে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে শুয়ে আছে।কারো মুখে কথা নেই।
“বিয়ে কোনো ছেলেখেলা নয়,বিয়ে যখন করেছি তার দায়িত্ব পালন করবো।
শার্লিন সবে চোখ বন্ধ করেছে তখনই পিয়াসের কথা শুনে চোখ খুলো।পাশ ফিরে দেখলো সে ওদিকে তাকিয়ে আছে।উত্তরে বলল,

“দায়িত্ব?সমস্যা নেই ভালোবাসা পাবার আশা করে বিয়েতে বসিনি।জানতাম কেমন হবে পরিস্থিতি। আপনাকে কিছুতে জোর করবো না। সংসার নামমাত্র হলেও চলবে।
পিয়াস এবার ঘুরে তাকালো। চোখ চোখ পড়লো। বিষাদ চোখে রাগ ফুটে উঠলো, বলল,
“দায়িত্ব বলতে কি বুঝিস?শুধু ভাত কাপড়ের?
হ্যাঁ এর মধ্যে ভালোবাসা ও আছে তবে সেটা না হয় একটু সময় নিয়ে বাসি।অনুভূতি তো এতো তাড়াতাড়ি ভোলা সম্ভব নয়। সবকিছুতে সময় লাগে।
“অনন্ত সময় নিন আমার কোনো সমস্যা নেই।
পিয়াস আবার ওপাশে ঘুরলো। ঘুমিয়ে পড়তে বলে নিজেও চোখ বন্ধ করলো।ঘুম কি আর আসলো?
শার্লিনের ওষুধের পাওয়ারে খানিকবাদেই ঘুমিয়ে তলিয়ে গেলো।
সকাল হতেই প্রহরের ঘুম ভাঙলো।আড়মোড়া দিয়ে উঠতে অনুভব করলো বামপাশে বুকের মাঝে কেউ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। মিথি ঘুমিয়ে আছে। জড়িয়ে ধরে আছে প্রহরের কাঁধ। নিষ্পাপ মুখশ্রী আজ বেশি মায়াবী লাগলো।এলোমেলো চুলগুলো মুখের উপর থেকে সরিয়ে দিলো। কিছু একটা ভেবে হাঁসলো। আনমনে চেয়ে বলে উঠলো,

“আজ শুকতারা তার নিজস্ব আকাশ পেয়েছে,
সে আকাশ এবং শুকতারার মালিক আমি নিজে।
সবকিছু কেমন কাল্পনিক লাগছে,সত্যি কি শুকতারা তার হয়েছে?
তখনই বাহির থেকে দরজা ধাক্কানোর শব্দ হলো।প্রহর মিথিকে সরিয়ে দিয়ে উঠলো। মিথি নড়েচড়ে আবার ঘুমোলো।প্রহর দরজা খুলে দেখে সানিয়া দাঁড়িয়ে আছে।
“কি চাই?
সানিয়া বাঁকা হেঁসে ঘরে উঁকি দিয়ে বলল,
“দাদি পাঠালো মিথিকে গোসল ঘরে নিতে।
ভালোবাসা কি বেশি ছিলোঅন্যের হবু বউ তোমার ঘাড়ে চাপলো।
প্রহরের রাগ উঠলো। কিছু বলতে গিয়ে থামলো কারণ সায়েদা বানু এদিকে আসছে। রাগে হাত মুষ্ঠি করে ধীরে বলল,

“আপনার লজ্জা করে না?
“কেন বলতো? অজানার ভান ধরে বললো।
“পর পুরুষের সামনে এমন বেহায়াপনা করেন অথচ বাড়ির আর মানুষের সামনে ভালো সাঁজেন।
“তোমার সামনেও ভালো হতে চাই।বলেই চোখ টিপ দিলো। সায়েদা বানু আসলে প্রহর মিথিকে ডেকে দেয়। ঘুমঘুম চোখে প্রহরের দিকে তাকালো।
“নতুন জীবনে,নতুন দিনের শুভেচ্ছা।
মিথি বিছানা থেকে নামলো। উত্তর দেওয়ার আগেই সানিয়া ঘরে আসলো।মিথিকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে কি কি যেন বলছে প্রহর শুনতে না পেলেও বুঝতে পারছে।

মন পিঞ্জিরা পর্ব ২৫

ওরা চলে যেতেই প্রহর শার্লিনের দেওয়া নতুন ডাইরিটি খুললো।পাশ থেকে কলমটা হাতে নিয়ে
প্রথম পৃষ্ঠায় বড় বড় করে লিখলো,
“জীবনে এই প্রথম রঙিন বসন্ত আসলো,
ঝরা পাতার দিন শেষ হয়ে ভালোবাসার রঙ ছড়ালো।”

মন পিঞ্জিরা পর্ব ২৮