প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৬
রাত্রি মনি
চাঁদের আলো মুখ লুকিয়েছে মেঘের আড়ালে। সিসিলির পাহাড়ি রাস্তাগুলো ঘুমিয়ে আছে গা ঢাকা দিয়ে। যেন এখানে পা রাখেনি কেউ যুগের পর যুগ। চারপাশে কুয়াশা আর দুধারে পাইন গাছের দীর্ঘ ছায়াগুলো আঁধারের বুকে আঁকছে অদ্ভুত সব রহস্যময় ছবি ।
হঠাৎ সেই আদিম নৈঃশব্দ্য চুরমার করে দিয়ে ইঞ্জিনের বুকফাটা গর্জনে কেঁপে উঠল উপত্যকা। ধোঁয়া উড়িয়ে, টায়ার আর পিচের ঘর্ষণে আগুনের ফুলকি ছুটিয়ে শাঁ শাঁ করে ছুটে আসছে একঝাঁক ব্ল্যাক মার্সিডিজ। ঝকঝকে কালো বডি আর নিশ্ছিদ্র কালো কাঁচের আড়ালে কারা বসে আছে, তা বোঝার সাধ্য নেই কারো। গাড়িগুলোর গতি এতই তীব্র যে রাস্তার পাশের শুকনো পাতাগুলো ঘূর্ণি খেয়ে উড়ে যায়। আর পেছনে লাগিয়ে যায় ধোয়া ধুলার দাঙ্গা।
সবার সামনের যে গাড়ি আছে, তাতে বসে আছে সান্দ্রে। লোকটার দশা এখন শোচনীয়।চোখে মুখে আতঙ্ক। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। এসির ভেতরেও তার কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঘাম।গলার সেই গভীর ক্ষত থেকে এখনো টাটকা রক্ত চুইয়ে পড়ছে দামি শার্টে। ডান পায়ে বিঁধে আছে বুলেট, আর বাম হাতের তালুটা দেখে মনে হচ্ছে কোনো ধারালো ছুরি দিয়ে নিখুঁতভাবে চিরে দেওয়া হয়েছে। যন্ত্রণায় আর আতঙ্কে লোকটা এখন জীবন্ত লাশ।স্টিয়ারিং ধরা হাতটা কাঁপছে। সে জানে, পেছনের ওই কালো গাড়িগুলো শুধু গাড়ি নয়, ওগুলো তার যমদূত।
ঠিক তার পেছনের গাড়িতেই এলেনা আর মাত্তেও। মাত্তেও শক্ত হাতে স্টিয়ারিং ধরা, দৃষ্টি নিবদ্ধ রাস্তার বাঁকে। পাশেই বসা এলেনা। তার মধ্যে উত্তেজনার কোনো রেশ নেই। সে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে ফ্রন্ট মিররে তাকিয়ে ঠোঁটে লিপস্টিক ঘষছে। দেখে মনে হবে, এই রক্তক্ষয়ী জীবন-মরণ খেলা তার কাছে নিছক এক বিনোদন।
সেই গাড়ির পেছনের সিটে বসে আছে লুকা আর মার্কো। লুকা একজন বিস্ময়কর হ্যাকার—ডিজিটাল জগতের এমন কোনো দেয়াল নেই যা সে ভাঙতে পারে না। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে শুরু করে সিসিটিভি বা ভার্চুয়াল কারেন্সি, সবকিছু হ্যাক করা তার কাছে চোখের পলকের কাজ।আর, মার্কো একজন তুখোড় স্পাই হিসেবে মানুষের এমন সব গোপন খবর সে জানে, যা হয়তো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজেও জানে না। লুকা এখন নির্বিকার চিত্তে ফোনে ভিডিও গেম খেলছে আর আপনমনে ইতালীয় ভাষায় বিড়বিড় করছে।
অন্যদিকে মার্কোর চেহারায় চরম বিরক্তি—কোথায় এই বয়সে সুন্দরী নারীদের সান্নিধ্যে থাকবে! তা না তাকে ছুটতে হচ্ছে এক আধমরা মানুষের পেছনে। লক্ষ্য মাত্র একটা হার্ডড্রাইভ! সত্যিই কি ওটা সামান্য কোনো ড্রাইভ? নাকি ওর ভেতরে লুকিয়ে আছে এমন কোনো অজানা রহস্য?
“হার্ডড্রাইভ!”
শব্দটা শোনামাত্র সান্দ্রের শিরদাঁড়া দিয়ে একটি শীতল স্রোত বয়ে গেল। এই গোপন তথ্যের কথা কেবল সে আর তার বস ছাড়া আর কেউ জানার কথা নয়। কোনো দেহরক্ষী বা বিশ্বস্ত বন্ধুকেও তো এই সংবাদের ছিটেফোঁটা দেওয়া হয়নি। তবে কি বিশ্বাসঘাতকতা তাদের নিজেদের ভেতর থেকেই হয়েছে? নাকি লুকা আর মার্কোর মতো দক্ষ হ্যাকার ও স্পাইদের কাছে পৃথিবীর কোনো গোপনই গোপন নয়?
“কিসের হার্ডড্রাইভের কথা বলছো তুমি? আমি কিচ্ছু জানি না! তোমাদের কোকেইন আর ড্রাগের সমস্ত মাল রুম নাম্বার থার্টি-ফোরে আছে। এমনকি সব অস্ত্রও ওখানে! আমি আর কিছু জানি না, আমাকে যেতে দাও প্লিজ!” কাঁপতে কাঁপতে বললো সান্দ্রে।
কিন্তু এলেনার কানে সেসব আকুতি পৌঁছাল না। সে তার চাকুর মতো ধারালো নখগুলো আরও গভীরভাবে সান্দ্রের গলায় গেঁথে দিল। টকটকে লাল নেলপলিশের নিচ দিয়ে চুঁইয়ে পড়তে শুরু করল গাঢ় রক্ত। ব্যথার তীব্রতায় সান্দ্রে তখন খাবি খাচ্ছে।হঠাৎ এলেনা সামান্য অন্যমনস্ক হতেই সুযোগটা লুফে নিল সান্দ্রে। শরীরের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে সে সেন্টার টেবিলের দিকে হাত বাড়াল। হাতে উঠে এল ভারী এক পিস্তল। তাক করল সোজা এলেনার কপাল বরাবর।
এলেনা প্রথমে ভড়কে গেল। দুই হাত গালে দিয়ে বাচ্চাদের মতো মুখভঙ্গি করে বলল,
“উপস্… ভয় পেয়ে গেলাম তো! এবার কী হবে আমার? আমি মরতে চাই না, আমাকে ছেড়ে দাও প্লিজ!”
পরক্ষণেই তার সেই মেকি ভীতি বদলে গেল এক পৈশাচিক খিলখিল হাসিতে। সেই হাসির শব্দ ঘরের দেয়ালগুলোতে প্রতিধ্বনিত হয়ে যেন সান্দ্রের কলিজা কাঁপিয়ে দিল। হাসতে হাসতে হঠাৎই গম্ভীর হয়ে গেল এলেনা। তার চোখে এখন কাঠিন্য আর তাচ্ছিল্য।
“হাউ ফুল ইউ বাস্টার্ড! তুই সত্যিই ভেবেছিস একটা সামান্য বন্দুক দিয়ে তুই আমাকে মারবি? আমাকে… এলেনাকে!”
আফসোসের সহিত মুখ দিয়ে উচ্চারণ করলো, “চ্যু..চ্যু..চ্যু… ব্যাড লাক সোনা। আমাকে মারার জন্য তোকে আরও একশোবার জন্ম নিতে হবে, তাও পারবি কি না সন্দেহ!”
সান্দ্রের বুক দুরুদুরু কাঁপছে। তবুও সে কাঁপাকাঁপা হাতে ট্রিগার চাপতে চাইল। কিন্তু এলেনা নির্বিকার; দুই হাত ভাঁজ করে স্টাইলিশ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। অদ্ভুত এক শান্তিতে এই দৃশ্যটা উপভোগ করছে। যেন কোনো সার্কাসের শো!এলেনার এমন ভাবলেশহীন ভঙ্গি, এতে যেন ভয় বাড়লো লোকটার। ট্রিগারে ধরা আঙুল কাঁপছে। ঠিক তখনই আড়াল থেকে ছায়ার মতো উদয় হলো মাত্তেও। এক ঝটকায় সান্দ্রেকে পেছন থেকে চেপে ধরে হাত থেকে কেড়ে নিল বন্দুকটা। এলেনা নির্বিকার ভঙ্গিতে আবার একই প্রশ্ন করল,
“এবার বল… হার্ডড্রাইভটা কোথায়?”
সান্দ্রে এবার দাঁতে দাঁত চেপে গোঙাতে গোঙাতে বলল, “আমি জানি না। হার্ডড্রাইভ কোনোদিনও খুঁজে পাবি না তোরা। ওটা এমন এক জায়গায় আছে যার হদিস কেউ জানে না!”
বলেই নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি এক জায়গায় করে পেছনের দিকে এক প্রচণ্ড কনুইয়ের ধাক্কা মারল সে। আঘাতটা সরাসরি গিয়ে লাগল মাত্তেওর চোখে ও নাকে। ব্যথায় আর বিরক্তিতে সান্দ্রেকে ছেড়ে দিয়ে মাত্তেও চোখ মুখ কুঁচকে বলে উঠল— “শিট!”
সান্দ্রে সুযোগ বুঝে ওয়াকি টকিতে সংকেত দেয় তার পাহারায় নিয়োজিত গার্ডগুলোকে। এরপর এক মুহূর্ত দেরি না করে ছুটে বেরিয়ে পরে কক্ষ থেকে। এলেনা তখনো নির্বিকার।মুখে কোনো উদ্বেগের চিহ্ন নেই। না আছে সান্দ্রেকে ধরার বিন্দুমাত্র তাড়া! সে সোফায় হেলান দিয়ে এক অদ্ভুত শীতল চোখে দেখছে সান্দ্রের পলায়ন। শিকারি যখন জানে, শিকার তার হাতের মুঠোয়, তখন তাকে খানিকটা দৌড়ানোর সুযোগ দেওয়াটাই তো আসল আনন্দ। সে শুধু দেখতে চায় সান্দ্রে আর কতদূর পালাতে পারে তার হাত থেকে।
এলেনা আর মাত্তেও ক্লাবের মেইন লিভিং এরিয়ায় পা রাখল, ততক্ষণে চারপাশে সান্দ্রের ডজনখানেক সশস্ত্র গার্ড তাদের ঘিরে ফেলেছে। এলেনা খুব শান্ত ভঙ্গিতে হাত দিয়ে নিজের কোঁকড়ানো চুলগুলো ঘাড়ের একপাশে সরিয়ে নিল। একজন গার্ড হুংকার দিয়ে তেড়ে আসতেই এলেনা বিদ্যুৎগতিতে দৌড়ে গিয়ে এক লাফ দিল। বাতাসে ভেসে থেকেই নিজের চার ইঞ্চি লম্বা পেন্সিল হিল দিয়ে লোকটার স্পর্শকাতর অংশে এক ভয়াবহ লাথি বসাল। যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে লোকটা যখন মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, ঠিক তখনই মাত্তেও এলেনার দিকে ছুঁড়ে মারল একটি ছোট অথচ শক্তিশালী স্নাইপার রাইফেল।বাতাসেই ক্যাচ ধরল এলেনা। এরপর শুরু হলো তান্ডব। এলেনার রাইফেলের নল থেকে আগুনের হলকা বেরোচ্ছে আর একে একে সান্দ্রের গার্ডরা খড়কুটোর মতো লুটিয়ে পড়ছে। পুরো ক্লাব এখন নরক। ক্লাবের সমস্ত প্রস্টিটিউট মেয়েগুলো পালিয়েছে অনেক আগেই! কার্পেট থেকে মার্বেল পাথর—সবই এখন গাঢ় রক্তে স্নান করে লাল হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে সান্দ্রে মেইন ডোর দিয়ে পালানোর চেষ্টা করতেই মাত্তেও বাজপাখির মতো তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। হাতের ধারালো ছুরি দিয়ে নিখুঁত একটা পোঁচ বসিয়ে দিল সান্দ্রের বাম হাতের তালুতে। মাংস চিরে ঠিক মাঝখানে হা হয়ে গেল, রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল ফিনকি দিয়ে। যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে সান্দ্রে মেইন ডোরে পাসওয়ার্ড টিপতে গেল, কিন্তু দরজা খুলল না।দরজার লক সিস্টেম ইতোমধ্যেই বদলে ফেলা হয়েছে।সান্দ্রের ফ্যাকাশে মুখটা দেখে মাত্তেও কৌতুক করে বলে উঠল,
“যাহ্! এবার কী হবে? আমাদের বাবুটা এখন পালাবে কী করে? কীভাবে বাঁচাবে নিজেকে?”
এরপর কণ্ঠস্বর কঠিন করে পকেটে হাত গুঁজে সে বলল,
“তুই কি আমাদের এত কাঁচা খেলোয়াড় ভেবেছিস? এই পুরো ক্লাবের সিসিটিভি থেকে লক সিস্টেম—সবই এখন লুকার দখলে। তুই খাঁচায় বন্দি ইঁদুর সান্দ্রে! হার্ডড্রাইভ কোথায় বলবি?”
হঠাৎ করেই উচ্চ শব্দে উদভ্রান্তের মতো হো হো করে হাসতে শুরু করল সান্দ্রে। এলেনা আর মাত্তেও থমকে গেল—লোকটা কি মরার ভয়ে পাগল হয়ে গেল? সান্দ্রে হাসি থামিয়ে বলল,
“হার্ডড্রাইভ যার কাছে আছে সে এক হিংস্র বাঘ! তাকে ধরা তোদের কম্ম নয়। তার নাগাল তোরা কোনোদিন পাবি না!”
বলেই সান্দ্রে দেয়াল থেকে বিশাল এক রেনেসাঁ পেইন্টিং ঝটকা মেরে সরিয়ে ফেলল। পেছনে উন্মুক্ত হলো এক বায়োমেট্রিক হাতের ছাপের স্ক্যানার। হাত ছোঁয়ামাত্রই দেয়াল সরে গিয়ে তৈরি হলো এক গুপ্ত পথ।মাত্তেও এলেনা দাঁড়িয়ে শুধু সান্দ্রের কার্যক্রম দেখতে লাগলো। সান্দ্রে সেই পথে ছুটে বেরিয়ে গেল। মাত্তেও বন্দুক তাক করতেই এলেনা তার হাত সরিয়ে দিয়ে সান্দ্রের পায়ে একটি নিখুঁত শট করল। শীতল গলায় বলল,
“ওকে এখনই মারা যাবে না। হার্ডড্রাইভের হদিস একমাত্র ওই জানে। যতক্ষণ না বলছে, ততক্ষণ ওকে আমাদের জীবিত চাই।”
পায়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ল্যাংড়াতে ল্যাংড়াতে পার্কিং লটে পৌঁছাল সান্দ্রে। নিজের গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিতেই টায়ারের ঘর্ষণে ধোঁয়া উড়িয়ে গাড়িটি পাহাড়ের রাস্তার দিকে পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটে চলল।
পেছন পেছন হুংকার দিয়ে বেরিয়ে এল মাত্তেও, এলেনা, লুকা এবং মার্কোর ব্ল্যাক মার্সিডিজের কনভয়। সিসিলির নির্জন পাহাড়ি রাস্তায় শুরু হলো এক মরণপণ ধাওয়া।
সিসিলির সেই নির্জন পাহাড়ি রাস্তায় তখন মৃত্যুর নিস্তব্ধতা। দুধারে সারিবদ্ধ দীর্ঘ পাইন গাছগুলো যেন এই রক্তক্ষয়ী খেলার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সান্দ্রের গাড়িটি এখন চারদিক থেকে ঘেরাও করা—নিশ্ছিদ্র ব্যুহ তৈরি করেছে কালো মার্সিডিজের বহর। পালানোর শেষ পথটুকুও এখন বন্ধ।মার্সিডিজের দরজা খুলে ধীরপায়ে বেরিয়ে এল এলেনা। তার প্রতিটি চলাফেরা যেন কোনো নিপুণ শিকারির ছন্দ। সে গিয়ে উঠে বসল গাড়ির ডিকির ওপর, এক পায়ের ওপর অন্য পা তুলে। স্লিট গাউনের ফাঁক দিয়ে তার উরু অবধি উন্মুক্ত পা জোড়া চাঁদের আলোয় ঝকঝক করছে। পরমুহূর্তেই তার দুপাশে এসে দাঁড়াল মাত্তেও, লুকা আর মার্কো। কালো কোট আর পাথুরে চাহনি—সব মিলিয়ে তাদের এই গ্যাংস্টার রূপটি যে কাউকে আতঙ্কিত করার জন্য যথেষ্ট। রাতের ঝোড়ো বাতাসে এলেনার বাদামি কোঁকড়ানো চুলগুলো উড়ছে। চোখের স্থির দৃষ্টি বিদ্ধ করছে সান্দ্রেকে।
পরের মুহূর্তেই গার্ডরা সান্দ্রেকে হিঁচড়ে গাড়ি থেকে টেনে বের করে আনল। ধুলোমাখা রাস্তায় এলেনার ঠিক সামনে এনে দাঁড় করানো হলো তাকে। কিন্তু পায়ে গুলির ক্ষত নিয়ে সান্দ্রে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারল না; যন্ত্রণায় গোঙাতে গোঙাতে সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল এলেনার পায়ের কাছে।এলেনা নিচু হয়ে সান্দ্রের চিবুকটা নিজের নখের ডগা দিয়ে তুলে ধরল। তার ঠোঁটের কোণে এক টুকরো বিষাক্ত হাসি।
“খেলাটা বেশিক্ষণ জমল না সুইটু।”
অত্যন্ত কোমল কিন্তু তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠল এলেনা।
“এবার বল, তোর সেই ‘হিংস্র বাঘ’ কোথায়? কার কাছে আছে হার্ডড্রাইভ?”
ক্যালাব্রিয়া, পেন্টহাউজ
রিমকে বিছানায় শুইয়ে কপালে হাত রেখে আঁতকে ওঠে এজে। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে মেয়েটার শরীর। অস্বাভাবিক তাপমাত্রা। যেন এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি।অস্থির হয়ে উঠে সে। হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়।কি করবে বুঝতে পারছে না। দ্রুত পা বাড়িয়ে নিয়ে আসে বালতি ভর্তি পানি। কোলে তুলে নেয় মাথা। ধীরে ধীরে সাবধানে ঢালতে থাকে জল। দীর্ঘক্ষণ জলধারার স্পর্শে তাপমাত্রা কিছুটা কমে এলেও, জ্বরের ঘোরে রিম আবোল-তাবোল বকতে শুরু করে। স্থির হয়ে সেদিকে কান পাতে এজে।
“কেউ ভালোবাসে না আমাকে। কেউ না। নিজের মা ই তো ভালোবাসে নি কোনোদিন! অন্যকেউ কিভাবে বাসবে?এতো কষ্ট কেন আমার জীবনে? একটু ভালোবাসলে কি এমন হয়? আরাত্র কোথায় তুমি? আমাকে ছেড়ে কেনো চলে গেলে? একটু বুকে জড়িয়ে ধরবে আমায়?”
বড়ই অসহায় বাচ্চাসুলভ শোনালো রিমের কণ্ঠ।স্তব্ধ হয়ে বসে পড়ে এজে। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে মেয়েটাকে। জ্বরের কারণে মুখে ফুটে উঠেছে রক্তিম আভা। একদম লাল টমেটোর মত দেখতে লাগছে।পরনের সাদা গোল ফ্রকটা জলে ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে আছেঅশালীন ভাবে। স্পষ্ট ফুটে উঠেছে নারীদেহের সুক্ষ্ম ভাঁজ গুলি। ফর্সা কলার বোনের ঠিক ওপরে একটা কুচকুচে কালো তিল দৃশ্যমান। যা আকর্ষণ কেড়ে নিতে সক্ষম। এত তিল এই মেয়েটার শরীরে! না জানি আর কোথায় কোথায় আছে? গালের মধ্যে আর চোখের পাতার কিনারেও আছে। তবে দূর থেকে দেখা যায় না।
একমাত্র খুব কাছে এলেই দেখা যায়। আর সবচেয়ে আকর্ষণীয়, প্রাণঘাতী হলো ঠোঁটের নিচের কুচকুচে কালো তিলটা। এটা দেখলেই মাথা ঘুরে যায় তার। নেশা ধরে যায়। ইচ্ছে করে কামড়ে ধরতে সেখানটায়। কে বলেছিল এমন জায়গায় তিল থাকতে? ব্লাড প্রেশার লো হচ্ছে তার। বারংবার শুষ্ক ঢোক গিলছে। উফফ্ …. কলিজা পুড়ে যাচ্ছে তার। শরীরের শিরা-উপশিরায় বয়ে যায় কামনার এক উত্তাল স্রোত।মনে মনে অস্থির হয়ে ওঠে সে—এই মুহূর্তে মেয়েটাকে নিজের শরীরের নিচে পিষে ফেলতে ইচ্ছে করছে তার।বাতাসের আর্দ্রতা আর রুমের নিস্তব্ধতায় স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে তার ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ । কে বোঝাবে এই মেয়েকে যে তার জন্য পাগল সে! নাহ্ এখানে থাকলে ভুলভাল কিছু হয়ে যাবে। এমনিতেই সকালে সামান্য হাত দিয়েছিল বলে চরাত করে গালে পড়েছিল এক থাপ্পর। এরপর কিছু উল্টাপাল্টা হলে মেরে উগান্ডা পাঠিয়ে দেবেন নিশ্চিত!
জামা ভিজে আছে তার ফায়ারফ্লাইয়ের। চেঞ্জ করা দরকার। নইলে জ্বর আরো বাড়বে। এক শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। অপর হাতে শুষ্ক একটা বড়সড় ঢোক গিলে কাঁপাকাঁপা আঙুলগুলো বাড়িয়ে দেয় রিমের বুকের ওপরের বোতামগুলোর দিকে।………………
“হোয়্যার ইজ দ্য হার্ডড্রাইভ?”
নির্জন পাহাড়ি রাস্তা। পিনপতন নীরবতাকে চিরে দিল এলেনার বরফশীতল কণ্ঠস্বর। তার প্রতিটি শব্দ সিসিলির রাতের বাতাসে চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল।দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে তার বিশ্বস্ত সহযোগীরা, কিন্তু এই মুহূর্তে এলেনার পুরো অস্তিত্ব যেন সান্দ্রের ওপর হামলে পড়ছে।সান্দ্রে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, শরীর থেকে রক্ত ঝরছে, তবুও তার চোখেমুখে এক অবাধ্য জেদ। সে দাঁতে দাঁত চেপে গোঙানির সুরে বলল,
“আমি বলব না! হার্ডড্রাইভের সন্ধান তোরা কোনোদিন পাবি না। আর যদি কোনোভাবে খবর পেয়েও যাস, যার কাছে ওটা আছে তার থেকে কোনোদিনও ছিনিয়ে নিতে পারবি না।”
মাত্তেও ভ্রু কুঁচকে তাকালো,
“কে সে?”
সান্দ্রে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
“তার নাম শুনলেই আত্মা কেঁপে উঠে মানুষের। সি ইজ অ্যা টাইগার। King of the forest…”
এলেনা কোনো উত্তর দিল না। সে গাড়ির ডিকি থেকে নেমে ধীরপায়ে সান্দ্রের আরও কাছে এগিয়ে এল। হাঁটু গেড়ে বসল তার সামনে। এলেনার এক জোড়া চোখ—যা কখনো মায়াবিনী, কখনো ঘাতক—তা এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সেই চোখের মনিতে জেগে উঠেছে এক আদিম সম্মোহনী শক্তি। সে সরাসরি সান্দ্রের চোখের দিকে তাকাল।
এলেনার এক বিশেষ ক্ষমতা আছে—সে যে কাউকে খুব সহজে হিপনোটাইজ বা বশীভূত করতে পারে। তার স্থির দৃষ্টির গভীরতা সান্দ্রের মস্তিষ্কের প্রতিটি স্নায়ুকে অবশ করে দিতে শুরু করল। এলেনা খুব নিচু স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে সম্মোহনী কণ্ঠে আবার জিজ্ঞেস করে বললো,
প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫
“বলো সান্দ্রে, হার্ডড্রাইভটা কোথায়? কার কাছে আছে ওটা?”
সান্দ্রের চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। তার জেদ, তার আতঙ্ক—সব যেন এক নিমেষে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। সে এখন আর নিজের সচেতন মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণে নেই। এলেনার সম্মোহনে সে এক গভীর ঘোরের রাজ্যে প্রবেশ করেছে। সে যেন কোনো রোবটের মতো বিড়বিড় করে উচ্চারণ করল,
“আলেস্সান্দ্রো……………..”
