আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১২
DRM Shohag
আকাশের কথা শুনে সন্ধ্যার ভ্রু কুঁচকে যায়। আকাশ কি বোঝাতে চাইল? বাচ্চা আর বাচ্চার বাবার প্রতি ইন্টারেস্ট নেই। আর বাচ্চার মায়ের প্রতি ইন্টারেস্ট মানে? বাচ্চার মা তো সে। আকাশ এই কথা কেন বলল? আকাশ তো তাকে সহ্য করতে পারেনা। তার বাচ্চাকেও মা’র’তে চায়। তাহলে আকাশ এসব কি বলছে? সন্ধ্যার সব এলোমেলো লাগলো।
আকাশের মুখাবয়ব গম্ভীর। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সন্ধ্যার দিকে। সন্ধ্যার শুকনো মুখটা তার ভালো লাগলো না। মনে হলো, এই হসপিটালের ডক্টরগুলো মেয়েটির উপর অ’ত্যা’চার করেছে৷ এজন্য মেয়েটির অবস্থা করুণ। চোখ দু’টো কী ভীষণ লাল! আকাশ বিরক্তি কণ্ঠে ডাকে,
“নিয়াজ?”
নিয়াজ ছোট করে বলে,
“হ্যাঁ?”
“ডক্টরদের পেমেন্ট করবেনা। মনে থাকে যেন।”
নিয়াজ অবাক হয়ে বলে,
“কেন?”
“ওরা পেশেন্টের ট্রিটমেন্ট এখনো ঠিকঠাক পারেনা। আরও ট্রেনিং নিতে হবে।”
নিয়াজ তব্দা খেয়ে যায়। তার এতো বড় বড় স্যাররা সন্ধ্যার অপারেশন করল। আর আকাশ বলছে, তাদের আরও ট্রেনিং নিতে হবে? সে বলে,
“বুঝলাম না।”
আকাশ এখনো সন্ধ্যার দিকে চেয়ে। সন্ধ্যা অবাক চোখে চেয়ে আছে আকাশের দিকে। আকাশ সন্ধ্যাতে দৃষ্টি রেখেই বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“যে ডক্টরা অপারেশন করতে গিয়ে পেশেন্টদের হার্ট করে। তাদের ডক্টর হওয়ার যোগ্যতা নেই। বুঝেছ?”
নিয়াজ কেশে ওঠে। আকাশের দৃষ্টি যে সন্ধ্যাতে তা দেখেছে। সাথে আকাশের ধ্যান-ধারণা-ও সন্ধ্যাকে ঘিরে এটাও বুঝেছে। না মানা বউটার প্রতি কি সিরিয়াস ভাবা যায়! অপারেশনের পর কোন রোগী আরামে থাকে? কিন্তু আকাশের বউ বাচ্চা জন্ম দেয়ার পর ব্য’থা পাচ্ছে বলে, আকাশ কি সুন্দর ডক্টরদেরই মূ’র্খ বানিয়ে দিচ্ছে! নিয়াজ বাকহারা হয়ে কেবল দেখল আকাশকে।
আকাশের অযৌক্তিক কথায় সন্ধ্যার চোখেমুখে বিরক্তি ফুটে ওঠে। চোখ সরিয়ে নেয় আকাশের থেকে।
তখনই কেবিনে একে একে সকলে প্রবেশ করে। আসমানী নওয়ান, তার বোন তাঁরা, ইরা, শিমু সকলে প্রবেশ করে। নিয়াজ মূলত ইশারায় ডেকেছে সবাইকে।
শিমু উঁকি দিয়ে সন্ধ্যাকে দেখে দৌড়ে আসে বাচ্চার কাছে। একটি ছোট্ট দোলনার মতো জায়গায় বাচ্চাটিকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। শরীরে কিচ্ছু নেই। কি সুন্দর ফুটফুটে এক বাচ্চা। অনবরত হাত-পা নাড়াচ্ছে। বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে। ছোট্ট তুলতুলে বাচ্চাটিকে দেখে শিমু নিজেও যেন বাচ্চা হয়ে গেল। খুশিতে হাত পা কাঁপছে বলে মনে হলো। শিমুর মুখ দিয়ে অস্ফুটস্বরে বেরিয়ে আসে, “কি সুন্দর!”
এদিকে ইরা ধীরেসুস্থে সন্ধ্যার কাছে এসে সন্ধ্যার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। সন্ধ্যা চোখ ঘুরিয়ে তার সৌম্য ভাইয়াকে খুঁজল। মানুষটার অনুপস্থিতি দেখে সন্ধ্যা ইরাকে জিজ্ঞেস করে,
“ভাইয়া কোথায় ভাবি?”
ইরা মৃদু হেসে বলে,
“সে তার বোনুর জন্য দোয়া আনতে গিয়েছে। বুঝলে?”
কথাটা শুনে সন্ধ্যার বুকে প্রশান্তির ঢেউ খেলে যায়। সে কেন তার ভাগ্যের দোষ দেয়? তার সৌম্য ভাইয়ার মতো ভাই কি হতভাগীরা পায়? পায় না। সৌম্য ভাইয়ার মতো ভাইয়া পেতে অনেক সৌভাগ্য নিয়ে জন্মাতে হয়। তার হাজারটা দুঃখের মাঝে তার সৌম্য ভাইয়া এক টুকরো সুখ।
ইরা সন্ধ্যার মাথায় আলত হাতে আরও ক’বার হাত বুলিয়ে দিয়ে বাচ্চার দিকে যায়।
আসমানী নওয়ান সন্ধ্যার বেডের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এক ধ্যানে চেয়ে আছে মেয়েটার দিকে। সে এক মুহূর্তের জন্য ভেবেছিল, হয়ত তার জান্নাতকে সে হারিয়ে ফেলবে। তার মনে হলো, সে তার মৃ’ত বোন জ্যোৎস্নাকে দেখছে। যে এই পরিস্থিতি একা একা লড়াই করে সৌম্য আর সন্ধ্যাকে জন্ম দিয়েছিল।
সন্ধ্যা ছলছল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আসমানী নওয়ানের দিকে। আসমানী নওয়ান এগিয়ে এসে সন্ধ্যার মাথায় হাত রাখে। সন্ধ্যা ঢোক গিলে নিচু স্বরে ডাকে, “আম্মা?”
আসমানী নওয়ান ঝাপসা চোখজোড়া পলক ঝাপটে নিজেকে সামলালেন। নিচু হয়ে সন্ধ্যার কপালে চুমু এঁকে আওড়ায়, “আমার মা।”
সন্ধ্যা চোখ বুজে প্রশান্তির শ্বাস ফেলল। আজ আর অপরিচিত আকাশের জন্য ততটা ক’ষ্ট হয়না, যতটা আগে হত। সেই পরিচিত আকাশকে ছাড়াও অদ্ভুদ এক প্রশান্তি পায় মনে। তার রাজপুত্র এই পৃথিবীতে এসেছে বলে হয়ত। যে এখন তার জীবনের সবকিছু।
আসমানী নওয়ানের বোন তাঁরা সন্ধ্যার বেডের অপর পাশে এসে বসে। সন্ধ্যার মাথায় হাত বুলায়। সন্ধ্যা প্রশান্তির হাসি হাসে।
আকাশ এগিয়ে এসে মায়ের পাশে দাঁড়িয়েছে৷ ভ্রু কুঁচকে দেখছে এদের সকলের কাহিনী। মা তো এই মেয়েকে পুরো নিজের মেয়ে বানিয়ে ফেলেছে। আকাশ তার মাকে যত দেখে তত অবাক হয়। এক অচেনা মেয়ের প্রতি তার মা কত পজেসিভ!
নিয়াজ আকাশের পিছু এসে আকাশের উদ্দেশ্যে বলে,
“আকাশ শার্টটা খোলো।”
আকাশ বিরক্তি কণ্ঠে বলে, “নো।”
নিয়াজ আর আকাশের কথায় আসমানী নওয়ান, তাঁরা তাকালো আকাশের দিকে। সন্ধ্যাও তাকালো। সকলের দৃষ্টি আকাশের পরনের র’ক্তমাখা শার্টের দিকে যায়। অ’পরিষ্কার র’ক্তের অস্তিত্ব বুঝতে পেরে সকলের অস্বস্তি হয়। এর মধ্যে সন্ধ্যার বেশি অস্বস্তি হয়। আসমানী নওয়ান ভ্রু কুঁচকে বলে, “শার্ট খুলছ না কেন?”
আকাশ সন্ধ্যার দিকেই দৃষ্টি রেখেই গম্ভীর গলায় বলে, “ইচ্ছে করছে না।”
আসমানী নওয়ান বিরক্ত হয়। ইচ্ছে করছেনা মানেটা কি? এই শার্ট পরে থাকার মানে কি? সে ছেলের উপর রে’গে বলে, “আকাশ শার্ট খোলো।”
আকাশ ভ্রু কুঁচকে বলে, “কেন?”
আসমানী নওয়ান বিরক্ত হয়ে বলে,
“কেন মানে? দেখছ না এটা নোংরা হয়ে গিয়েছে? তাছাড়া দেখতে খারাপ লাগছে।”
আকাশ গা-ছাড়াভাবে বলে,
“তুমি চোখ বন্ধ করে রাখো। তাহলেই আর খারাপ লাগবেনা।”
ছেলের গা-ছাড়া ভাবে ভীষণ চটলেন তিনি। রে’গে বলেন,
“অ’সভ্যের মতো আচরণ করছ কেন?”
এবারেও আকাশের ভাবলেশহীন উত্তর,
“চাইলে তুমিও করতে পারো।”
আসমানী নওয়ান চোয়াল শ’ক্ত করে তাকায় আকাশের দিকে। এতো অ’সভ্য হয়েছে ছেলেটা! কিছু বলাও যায়না। নিয়াজ কপাল চাপড়ায়। এই আকাশটা এতো অদ্ভুদ আচরণ করছে! সে চুপচাপ দেখে যাচ্ছে। বলার মতো কিছু পায়না।
ওদিকে সন্ধ্যার বেশ রা’গ হয় আকাশের প্রতি। দৃষ্টি আকাশের চোখে রেখে দাঁত কটমট করে আওড়ায়,
“একটা পাক্কা জা’নো’য়া’র হয়েছে।”
কথাটা সন্ধ্যা আস্তে বলতে চাইলেও, গলার আওয়াজ বেশি হয়ে গিয়েছে। ফলস্বরূপ সবাই শুনতে পেয়েছে। কথাটা আকাশের কানেও স্পষ্টভাবে ভেসে এসেছে। সন্ধ্যার মুখে নিজেকে নিয়ে এহেন সম্মোধনে প্রচন্ড রা’গ’ল আকাশ। ডান হাত এগিয়ে নিয়ে সন্ধ্যার গলা চেপে ধরার ভঙ্গি করে রাগান্বিত স্বরে বলে, “কি বললি বে’য়া’দ’ব মেয়ে?”
সন্ধ্যা তার মাথা দ্রুত বাদিকে ফিরিয়ে চোখ বুজে নেয়। আসমানী নওয়ান আর তাঁরা আঁতকে উঠে ডেকে ওঠে, “আকাশ?”
একই সময়ে নিয়াজও উচ্চারণ করে আকাশ শব্দটি।
সন্ধ্যার গলার কাছে এসে আকাশের হাত থেমে গিয়েছে। সন্ধ্যার দিকে ঝুঁকে এসেছে সে। কাছ থেকে সন্ধ্যাকে দেখে ঢোক গিলছে বারবার। আকাশকে থেমে যেতে দেখে সকলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। আকাশ হাত সরিয়ে নেয়। ইচ্ছে করেই সন্ধ্যার মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে৷ আকাশের গরম নিঃশ্বাস সন্ধ্যার মুখের উপর আছড়ে পড়ে। সন্ধ্যা শ’ক্ত হয়ে চোখ বুজে রেখেছে। আকাশ সন্ধ্যাকে নিখুঁতভাবে অবলোকন করে দৃঢ় কণ্ঠে আওড়ায়,
“গড প্রমিজ, এই দুর্বল হার্ট নিয়ে আর তোমার মতো বে’য়া’দ’ব মেয়ের সামনে আসবনা।”
আকাশের কথায় কি ছিল কে জানে! সন্ধ্যার বুকের বা পাশে চিনচিন ব্য’থা করে ওঠে। তবে চোখ খুলল না সে।
এদিকে আকাশ কথাটা বলে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। রা’গে মাথা ফেটে যাচ্ছে। রা’গটা সন্ধ্যার উপর ঝাড়তে না পারলেও ঝেড়ে দিল এক চেয়ারে। পায়ের কাছে একটি চেয়ার দেখে সেথায় জোরেসোরে একটা লাথি মে’রে হনহন করে বেরিয়ে যায় কেবিন থেকে। সকলে হতভম্ব হয়ে চেয়ে আছে৷ আকাশের কখন কি হয়, শুধু সেই জানে। আকাশকে এভাবে বেরিয়ে যেতে দেখে নিয়াজ আকাশের পিছু পিছু যায়।
সন্ধ্যার ডান হাতে ক্যানুলা লাগানো। বা হাতে বেডের চাদর শ’ক্ত করে ধরে রাখলো। আকাশ বেরিয়ে গেল বুঝতে পেরেও একবারের জন্য-ও চোখ মেলল না। তাকালো না একবারো। শ’ক্ত হয়ে পড়ে রইল সে।
আকাশ হসপিটালের সিঁড়ি বেয়ে হনহন করে নামতে থাকে। তখনই সৌম্য’ও তাড়াহুড়ো করে উপরদিকে উঠছিল। কেউ কাউকে খেয়াল না করায় দু’জন দু’জনের সাথে ধাক্কা খায়। আকাশ রে’গে ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে উপরে তোলে সামনের ব্যক্তিকে ঘু’ষি মা’রতে। কিন্তু সৌম্যকে দেখে তার হাত থেমে যায়। সৌম্য বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায় আকাশের দিকে। দৃষ্টিজোড়া লাল তার। আকাশ ঢোক গিলল। মুষ্টিবদ্ধ ডান হাত সৌম্য’র সামনে থেকে নামিয়ে দেয়। এরপর সৌম্য’কে পাশ কাটিয়ে বড় বড় পা ফেলে নিচে নেমে যায়।
সৌম্য আকাশের ব্যবহারে ভীষণ অবাক হয়। সাথে অবাক হয় আকাশের পরনের র’ক্তমাখা শার্ট দেখে।
ওদিকে পিছনে দাঁড়ানো নিয়াজ আকাশ আর সৌম্য’র এই দৃশ্য দেখে খানিক অবাক হলো। আকাশকে বুঝতে পেরে ভালো-ও লাগলো। এগিয়ে এসে সৌম্য’র উদ্দেশ্যে বলে,
“সন্ধ্যার কাছে যাও৷ ও অপেক্ষা করছে।”
সৌম্য মাথা নেড়ে দ্রুতপায়ে উপরে উঠতে লাগলো। আর নিয়াজ আকাশের পিছু পিছু গেল।
সৌম্য কেবিনে প্রবেশ করলে সর্বপ্রথম তার স্বয়নরত বোনুকে চোখে পড়ে। দুর্বল কণ্ঠে ডাকে, “বোনু?”
ভাইয়ের কণ্ঠ পেয়ে সন্ধ্যা চিলের ন্যায় ঘাড় ফিরিয়ে চোখ মেলে ঝাপসা দৃষ্টিতে তাকায় সৌম্য’র পানে। সৌম্য দুর্বল পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ায় বোনুর পাশে। সে ভীষণ ভ’য় পেয়েছিল বোনুকে নিয়ে। ভেবেছিল, এইবার হয়ত তার বোনুর কিছু একটা হয়ে যাবে। আল্লাহর অশেষ রহমতে তার বোনু মৃ’ত্যুর দ্বার থেকে ফিরে এসেছে। সৌম্য মন ভরে দেখে তার বোনুকে৷ কিছুসময় পর সৌম্য একটু ঝুঁকে সন্ধ্যার কপালে চুমু খায়। সন্ধ্যা বা হাতে ভাইয়ের গলা জড়িয়ে ধরে। চোখ বুজে নেয়। এতোক্ষণের জমানো অশ্রু বন্ধ চোখের পাতা বেয়ে গড়িয়ে পড়ে দু’ফোটা। ঠিক যেমন আদুরে ছানা একটি আশ্রয় পেয়ে তার ভেতরে জমানো আবেগ ছেড়ে দেয়, সন্ধ্যা-ও ভাইকে পেয়ে তেমনটাই করল।
দুইভাইবোনের আবেগী মুহূর্ত সকলে মন ভরে দেখল।
আকাশ রাস্তার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। শূণ্য দৃষ্টি অজানায়। পাশ থেকে নিয়াজ বলে,
“সন্ধ্যা তোমাকে জা’নো’য়া’র বলার পরও তুমি ওকে আ’ঘা’ত করতে পারলে না কেন আকাশ?
আকাশ নিশ্চুপ। নিয়াজ আবারো বলে,
“সৌম্যকে মা’রতে গিয়েও থেমে গেলে কেন? সৌম্য অপরাধী জানার পরও তুমি কয়েকমাস আগে সৌম্যকে কিছু না করেই বাংলাদেশ ছাড়লে। কেন? এসবের অ্যান্সার আছে তোমার কাছে?”
আকাশ এবারেও চুপ। সত্যিই তো সে কেন এসব পারেনা। হিসাব মতে, সৌম্য ছেলেটার বডি থেকে মাথা আলাদা করার কথা। অথচ সে ভুলেই বসেছিল। ঠিক ভুলে যায়নি৷ কিন্তু কথাটা ভাবলে কেমন যেন লাগে। নিজেকে দুর্বল লাগে। কেন? আকাশ ঢোক গিলে বলে,
“সৌম্যকে আমি আরও অনেক কঠিনভাবে মা’র’বো। এজন্য ছাড় দিচ্ছি।”
আকাশের কণ্ঠ দুর্বল। যেন নিজের সাথে যু’দ্ধ করে কথাটা বলল। নিয়াজ বোধয় বুঝল। হাসল সে। বলে,
“আর সন্ধ্যাকে নিয়ে কি বলবে?”
আকাশের অস্থিরতা বাড়ে। সে যা করতে চায় তা পারেনা। গতবার দেশে এসে মেয়েটিকে আ’ঘা’ত করে তার নিজের অবস্থা-ই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এখন তো সে মেয়েটিকে আ’ঘা’ত করার কথা ভাবতেও পারেনা। কেন এমন হয়? এর উত্তর আকাশের কাছে নেই। একেবারেই নেই।
নিয়াজ আকাশের কাঁধে হাত রেখে বলে, “একটা কথার উত্তর দিবে আকাশ?”
আকাশ চুপ থাকলো। নিয়াজ আবারো বলে, “তুমি গত চার থেকে পাঁচ বছর কোথায় কি করেছিলে,, সেসব দিনের কথা তোমার মনে আছে?”
আকাশ কিছু ভাবছে। সে মাঝে মাঝে এসব মেলাতে পারেনা। মায়ের সাথে রা’গ করে সে ইংল্যান্ড যাওয়ার পর ইংল্যান্ডে তার একটা এক্সিডেন্ট হয়েছিল। এরপর তো আর মনে নেই। তারপর হঠাৎ একদিন নিজেকে ইংল্যান্ডের হসপিটালের বেডে আবিস্কার করল, যেখানে জেডি ছিল। সে জেডিকে মা’র’ল। আর তারপর দেখল চোখের পলকে কে’টে গিয়েছে ক’বছর। তার অবাক লাগছিল। ইংল্যান্ডে তার নিজস্ব এক বিজনেস ছিল, মাফিয়া লিডের সঙ্গে সে যুক্ত ছিল। সবকিছু সচল ছিল। সবজায়গায় নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পেল। যখন যেখানে যা প্রয়োজন হয়েছে, তখন সে সেখানে সে উপস্থিত ছিল। অর্থাৎ ইংল্যান্ডের বিজনেসম্যানদের সাথে, মাফিয়াদের সাথে তার গত ক’বছরের সব ফুটেজ ছিল। সে তারিখের হিসাব মেলাতে সেসব ফুটেজ চেক করলে সবজায়গায় নিজেকে দেখেছে। মিটিং থেকে শুরু করে সকল কাজে। শুধু সে মনে করতে পারেনা সেসব।
এরপর সে ডক্টরের সাথে দেখা করলে তাকে ইংল্যান্ডের ডক্টর থেকে জানানো হয়, তার একটা ছোটোখাটো এক্সিডেন্টের কারণে কিছু কিছু স্মৃতি মনে আসেনা। আকাশ ডক্টরের কথা শুনে বুঝেছিল তার এমন হওয়ার কারণ।
এরপর তাকে তার ইংল্যান্ডের এক ফ্রেন্ড জানায় বাংলাদেশে তার ফ্যামিলির ব্যাপারে। তাকে জানায়, এক ছেলে তার বাবাকে মে’রে ফেলেছে সম্পত্তির লোভে। আর সেই ছেলে সৌম্য। যে শিমুকে প্রায়ভেট পড়াত। আকাশের বিশ্বাস হয়নি। সৌম্যকে সে যথেষ্ট ভালো ছেলে হিসেবে চিনত। কিন্তু প্রমাণ পাওয়ার পর তার বিশ্বাস হয়েছে। নিজের চোখকে অবিশ্বাস করবে কিভাবে?
তার সেই ফ্রেন্ড আরও জানায়, সে বাংলাদেশে ফিরলে সবাই তাকে বলবে, সৌম্য’র বোন তার বউ। মেয়েটির পেটে তার বাচ্চা। এছাড়াও ওরা তার খালাতো ভাই-বোন। আকাশ বাংলাদেশে এসে সত্যি সত্যিই সবকিছুর মিল পেল। তার ফ্রেন্ড যা যা বলেছিল সব মিলে গিয়েছিল। সে বুঝতে পারেনা, সবাই তাকে মিথ্যে কেন বলে? তার ফ্যামিলি যা বলে, সেসবের কোনো প্রমাণ নেই। তার ফ্যামিলি বলে সে গত পাঁচবছর বাংলাদেশে ছিল। অথচ সে ফুটেছে স্পষ্ট দেখেছে সে ইংল্যান্ডের মাটিতে গত পাঁচবছর রাজত্ব চালিয়েছে ঠিক সেভাবে, যেভাবে মাস্টার্স করতে গিয়ে ইংল্যান্ডে এসবের সাথে জড়িয়েছিল। তার মায়েরা বলে সে বাংলাদেশে ছিল। তার বাবার জানাজা সে নিজে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। অথচ সে ফুটেজ চেক করলে সেদিন-ও নিজেকে ইংল্যান্ডের মাটিতে দেখতে পায়।
এরপর তার ফ্যামিলি আরও বলে, তার বাংলাদেশে এক্সিডেন্ট হয়েছিল। বিমান ক্রাশ হয়েছিল। তার ফ্যামিলি তাকে যে ডেট বলেছে, সেই ডেটে সে ইংল্যান্ডে অনেক বড় ডিল ফাইনাল করেছে। তার সাইন আছে সেখানে। এমনকি ফুটেজেও সে নিজেকে সেদিন ইংল্যান্ডে দেখেছে। তার ফ্যামিলি যা বলে, একটা কিচ্ছুর প্রমাণ নেই। বিমান ক্রাশের একটা নিউজ বা ভিডিও পর্যন্ত নেই। একটা ছোট্ট প্রমাণ দিতে পারেনি তার ফ্যামিলি। সে কিভাবে বিশ্বাস করবে তার ফ্যামিলির বলা কথাগুলো? উল্টোদিকে তার ফ্রেন্ডের বলা প্রতিটি কথার প্রমাণ আছে। প্রমাণগুলো বলে দেয়, সে মায়ের সাথে রা’গ করে চলে যাবার পর আর বাংলাদেশে ফেরেইনি৷ অথচ সবাই বলে, সে না-কি সন্ধ্যাকে বিয়ে করেছে৷ তাছাড়া সে বিয়ে করার মতো ছেলেও নয়। আর না তো সেসবের প্রমাণ আছে। উল্টে গত কয়েকবছর সে ইংল্যান্ডে বিরাজ করেছে সেসবের হাজারটা প্রমাণ তার কাছে আছে।
কিন্তু এসব অনুভূতির নাম কি? সবমিলিয়ে তার নিজেকে মাঝে মাঝে পা’গ’ল লাগে। একদিকে হাজার হাজার প্রমাণ, আরেকদিকে তার ফ্যামিলি। সে কাকে বিশ্বাস করবে? তার কেন সেসব দিনের কথা মনে নেই? যদি তার মনে থাকতো, তবে তাকে বারবার ফুটেজ দেখতে হত না। আর নিজেকে এতো অ’সুস্থ লাগতো না।
আকাশের মনে আছে, সে ইংল্যান্ডে মাস্টার্স করতে গিয়ে মাফিয়া লিডের সাথে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। সেভাবেই লাইফ লিড করছিল। সে তখনো মাফিয়া কিং ছিল না। কিন্তু হসপিটাল থেকে ফিরে নিজেকে মাফিয়া কিং হিসেবে পেয়েছে আকাশ। সেসবের ফুটেজ-ও স্পষ্ট আছে। আকাশ অবাক হয়েছিল। তবে তার মনে না থাকলেও ভীষণ খুশি হয়েছিল। তার বহুদিনের ইচ্ছা ছিল। যা হঠাৎ পেয়ে গিয়ে ভীষণ খুশি হয়।
বর্তমানে ইস্ট লন্ডনের মাফিয়া কিং হিসেবে পরিচিত ‘আকাশ ভিরাজ নওয়ান।’
কিন্তু আকাশের প্রথম প্রথম কেমন যেন নতুন লাগতো। মনে হত, এসব থেকে সে কিছুদিন দূরে ছিল। এখন যদিও তেমনটা মনে হয়না। তবে বাংলাদেশে ফিরলে নিজেকে ভীষণ দুর্বল লাগে। কি যেন পিছুটান তার! আকাশ হাসফাস করল।
সৌম্যকে শা’স্তি দিবে, আর সন্ধ্যাকে নিয়ে তার চিন্তাধারাগুলো সম্পূর্ণ এভোয়োড করবে, এই প্রতিজ্ঞা করে বাংলদেশের মাটিতে পা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু সে দু’টো কাজেই চরমভাবে হে’রে গেল। সে পারছে না। দুর্বল হয়ে পড়ছে সে। কেন? এই কেন’র উত্তর নেই তার কাছে। নাহ, তার এতো দ্রুত বাংলাদেশে ফেরা উচিৎ হয়নি। কি করত সে? ইংল্যান্ডেও যে ছটফট লাগে। আকাশ ঠিক করল, সে আবারো ইংল্যান্ড ব্যাক করবে। যতদিন না তার মাইন্ড সেটআপ করতে পারবে, তার লক্ষ্য পূরণ করার জন্য নিজেকে তৈরী করতে পারবে,,ততদিন বাংলাদেশে ফিরবেনা। এই মিথ্যে পিছুটানের সুতো ছিঁড়ে তবেই সে আবারো এই বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখবে। আকাশের চোখমুখ শ’ক্ত হলো। ভেতরটা জেদ আর ক্রোধে ফুলে উঠবে।
আকাশ আর দাঁড়ায় না। পকেট থেকে ফোন বের করে কাউকে মেসেজ করল, একঘণ্টার মাঝে তার ইংল্যান্ডের ফ্লাইটের টিকিট চাই। এরপর কিছু না বলেই নিয়াজের পকেট থেকে গাড়ির চাবি নিয়ে গাড়ির দিকে যেতে যেতে বলে,
“এয়ারপোর্টে থেকে তোমার গাড়ি নিয়ে এসো।”
নিয়াজ অবাক হয়ে বলে,
“কোথায় যাবে তুমি?”
আকাশের ছোট্ট উত্তর,
“ইংল্যান্ড। মাকে জানিয়ো। গুড বাই।”
নিয়াজ দ্রুত আকাশের পিছু যায় আর বলে, “আকাশ যেও না। এখনো অনেক কিছু বাকি আছে।”
কে শোনে কার কথা। আকাশ ততক্ষণে গাড়িতে বসে হাওয়ার বেগে জায়গাটি প্রস্থান করে। নিয়াজ দৌড়ালো, তবে কাজ হলো না। চরম হতাশার শ্বাস ফেলল সে। আবারো সব এলোমেলো হয়ে গেল। এর শেষ কোথায়?
বাচ্চাটি ঘুমিয়ে যাওয়ায় সৌম্য শুধু বাচ্চাটিকে দেখে কেবিন থেকে বের হলো। কে যেন তার বোনুকে চার ব্যাগ র’ক্ত দিয়েছে। সে জানে তার বোনুর জীবন বাঁচানোর জন্য কখনো ঋণ শোধ করতে পারবেনা। তবে তাকে একটা ধন্যবাদ দিতে চায় সৌম্য। সাক্ষাৎ করতে চায়।
কেবিন থেকে বেরিয়ে নিয়াজ আর অরুণকে দেখে জিজ্ঞেস করে,
“ভাইয়া আপনারা কি জানেন, বোনুকে কে র’ক্ত দিয়েছে?”
ভাবমায় মশগুল নিয়াজের ধ্যান ভাঙে সৌম্য’র কথায়। পাশে অরুণেরও।
বেচারা অরুণ এখানে এসে অনামিকাকে দেখে ছোটোখাটো ছ্যাঁকা খেয়ে এক কোণায় বসে ছিল। অবশ্য সন্ধ্যার সিচুয়েশন ভালো জেনে নিয়েছিল। এখন সন্ধ্যা আর বাচ্চাকে দেখতে আসছে।
সন্ধ্যাকে কে র’ক্ত দিয়েছে অরুণ, নিয়াজ কেউ জানেনা। নিয়াজ সৌম্য আর অরুণকে নিয়ে লোকটির খোঁজে যায়।
নিয়াজ, অরুণ আর সৌম্য নিয়াজের বয়সী এক ডক্টরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক নার্সকে জিজ্ঞেস করেছে, তবে কেউ বলতে পারেনি৷ শেষমেশ নিয়াজ তার এক কলিগ ডক্টরের কাছে এসেছে। যে এসব ব্যাপারে অবগত থাকে। লোকটি বলে,
“আমরা র’ক্তের জন্য ছোটাছুটি করার আগেই হঠাৎ কোথা থেকে একজন এসে বলল, ‘আমার ব্লা’ডের গ্রুপ (AB-)। আমি ব্লা’ড দিব।’ আমরা তার র’ক্ত পরীক্ষা করে এক ব্যাগ র’ক্ত নিই। সে বলে, সে একাই চার ব্যাগ র’ক্ত দিবে। কারণ সন্ধ্যাকে বাঁচাতে হলে সন্ধ্যার চার ব্যাগ র’ক্ত লাগবে।
আমরা ছেলেটিকে না করে দিই। একজনের থেকে এতো র’ক্ত নিলে সেই লোকটির জীবন আশঙ্কায় পড়ে যাবে। কিন্তু আমরা দ্বিমত পোষণ করতেই ছেলেটি ক্রোধে ফেটে পড়ে। আমার মাথায় পি’স্ত’ল ঠেকিয়ে বলে,
‘আমার থেকে চার ব্যাগ ব্লা’ড নিবি না-কি তোর লা’শ ফেলব, কোনটা? কুইক বল? কুইক।’
এটুকু বলে ডক্টর থামল। নিয়াজ, অরুণ আর সৌম্য বিস্ময় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। নিয়াজ বলে, “কে সে? নাম কি? দেখতে কেমন?”
ডক্টর জানায়, “জানিনা কে সে? নাম বলেনি। আর দেখতে কেমন তাও জানিনা। নিজেকে পুরো কালো পোষাকে আবৃত করে রেখেছিল। মুখে কালো রুমাল বাঁধা ছিল। মুখ দেখায়নি আমাদের। তবে তার চোখের মণি ছিল সাদা। কিন্তু সে চোখে সোনালি রঙের ল্যান্স পড়েছিল। চার ব্যাগ ব্লা’ড দেয়ার পর সে তার চোখের ল্যান্স দু’টো খুলে এখানে ফেলে চলে যায়। তখন দেখেছিলাম তার চোখের মণি দু’টো অনেক সাদা। এটুকুই। ছেলেটি ঠিক করে হাঁটতে পারছিল না। রেস্ট নিতে বলায় আবারো রে’গে তাকিয়েছিল। তাই আমরা আর কিছু বলিনি৷ তাকে যেতে দিয়েছি।”
ডক্টরের কথা শুনে সৌম্য, নিয়াজ, অরুণ রীতিমতো স্তব্ধ হয়ে যায়। নিয়াজের মাথা ঘুরছে। সোনালি ল্যান্স পরেছিল? তার মানে, সন্ধ্যার ঘরে এই ছেলেই গিয়েছিল? কে এই ছেলে? যে সন্ধ্যার ছেলেকে মা’র’তে চায়? অথচ নিজের জীবনের পরোয়া না করে সন্ধ্যাকে বাঁচায়? আর সবচেয়ে মূখ্য বিষয় সন্ধ্যা আর আকাশের সম্পর্ক খারাপ করার জন্য একটি উপায়-ও বাদ রাখেনি? নিয়াজের মস্তিষ্ক ফাঁকা লাগছে। কিচ্ছু বুঝতে পারছেনা।
সৌম্য, অরুণ, নিয়াজ চিন্তিত বদনে সন্ধ্যার কেবিনে প্রবেশ করে। আসমানী নওয়ানের কোলে সন্ধ্যার বাচ্চা। সৌম্যকে দেখে সে এগিয়ে এসে বাচ্চাটিকে সৌম্য’র দিকে বাড়িয়ে দেয়। সৌম্য আপাতত এসব চিন্তা বাদ রেখে তোয়ালে মোড়ানো তার ফুটফুটে ভাগ্নেকে কোলে তুলে নেয়। হাত কাঁপছে তার। তার বোনুর অংশ এটা? সে মামা হয়েছে। সৌম্য ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে। বাচ্চাটি সৌম্য’কে দেখে কি খুব চিনে ফেলল? কি জানি? তবে সৌম্য’র দিকে চেয়ে ঠোঁট প্রসারিত করে হেসে ফেলল। এটা দেখে সকলেই হাসল। পাশে দাঁড়ানো অরুণ বলে, “আরে বাহ! এক দেখায় মামাকে চিনে নিয়েছে। এবার আমি চাচ্চুকে চিনলেই হয়!”
সৌম্য ঝাপসা চোখে হাসে। বিড়বিড় করে, “আমার বাবা।”
সন্ধ্যা তার ভাই আর বাচ্চাটির দিকে চেয়ে আছে। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা। সৌম্য বাচ্চাটিকে নিয়ে সন্ধ্যার কাছে এসে দাঁড়ায়। জিজ্ঞেস করে,
“বোনু নিতে পারবি ওকে?”
সন্ধ্যা বা হাতে বুকে ইশারা করে বলে,
“পারবো ভাইয়া। এখানে দাও।”
সৌম্য বাচ্চাটিকে আলতো করে সন্ধ্যার বুকের উপর শুইয়ে দেয়। সন্ধ্যার পুরো শরীর জুড়ে অদ্ভুত এক শীতল শিহরণ বয়ে যায়। বা হাত তার বাচ্চার পিঠে রাখে। ছেলের কপালে ছোট্ট এক চুমু খেয়ে চোখ বুজে বুক ভরে শ্বাস নেয়। সকলে মুগ্ধ হয়ে দেখে মা ছেলের এই দৃশ্য। মুখে হাসির ঝিলিক।
আসমানী নওয়ান নিয়াজকে জিজ্ঞেস করে, “আকাশ কোথায় নিয়াজ?”
নিয়াজ তাকায় আসমানী নওয়ানের দিকে। তাকায় বন্ধ চোখে বাচ্চাকে বুকে নিয়ে শয়নরত সন্ধ্যার দিকে। ঢোক গিলে বলে, “আকাশ আবারো ইংল্যান্ড ব্যাক করেছে।”
কথাটা শুনে সবাই ভীষণ অবাক হলো। সন্ধ্যার বুকটায় চিনচিনে ব্য’থারা হাজির হলো। তবে সে সেভাবেই রইল যেভাবে এতক্ষণ ছিল।
নিয়াজ এগিয়ে এসে সৌম্য’র পাশে সন্ধ্যার বেডের কাছে দাঁড়ায়। সে চাইছে, আকাশের ব্যাপারে সন্ধ্যা যে ভুল ধারণা পুষেছে তা ভেঙে দিতে৷ ভাবনা অনুযায়ী বলে,
“সন্ধ্যা তুমি আকাশকে ভুল বুঝ….
সন্ধ্যা নিয়াজকে কথা শেষ করতে দেয় না। চোখ বুজে রেখেই বলে,
“আপনাদের আকাশকে নিয়ে আমার সামনে আর সাফাই গাইবেন না। শুধু সাফাই নয়, আর কখনো তাকে নিয়ে আমার সামনে কিচ্ছু বলবেন না। এবার আমাকে শান্তি দিন আপনারা। আমি আমার বাচ্চাকে নিয়ে শান্তিতে বাঁচতে চাই। আর কিচ্ছু চাইনা আমার। দয়া করে আমার এইটুকু শান্তি কে’ড়ে নিবেন না। প্লিজ!”
সন্ধ্যার কথাগুলো অত্যন্ত দৃঢ়, অথচ স্বর ভাঙা। সকলে অসহায় দৃষ্টিতে তাকায় সন্ধ্যার পানে৷ নিয়াজ, সৌম্য, আসমানী নওয়ান, অরুণ, ইরা, শিমু সকলের চোখের কোণে পানি জমেছে। আকাশের জন্য কতশত পা’গ’লা’মি করে আকাশের থেকে প্রতিনিয়ত পা’গ’ল উপাধি পাওয়া মেয়েটি হঠাৎ করেই কি দারুণ শ’ক্ত প্রাচীরে পরিণত হয়ে গেল!
সন্ধ্যা তার বাচ্চাকে আরেকটু শ’ক্ত করে ধরল নিজের সাথে। এই প্রাণটাই তার সব। তার বাঁচার অনুপ্রেরণা, তার জীবন। তার সেই ভালোবাসার আকাশ তার মনে আজীবন রয়ে যাবে। এই বদলে যাওয়া আকাশের সাথে শতশত মাইল দূরত্ব রেখে বাঁচবে শুধু তার বাচ্চাকে নিয়ে। সে আর কখনো আকাশকে চাইবেনা। ভুল করে মনের অজান্তেও না। সে আজ সত্যিই আকাশকে মুক্তি দিয়ে দিল। আকাশের জন্য হৃদয়ের দরজাখাটা খুব শ’ক্ত বাধনে বাঁধল। সে আর তার সেই ভালোবাসায় ভরিয়ে দেয়া আকাশের ছোট্ট প্রাণের এক ছোট্ট পৃথিবী গড়ে তুলল। বন্ধ দু’চোখের কোণ ঘেঁষে দু’ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল। সন্ধ্যা বাঁধতে পারল না এটুকু। তবে মুখে একখানা হাসি ফুটাতে ভুলল না। তার হাসি, আর তার ছোট্ট প্রাণ-ই আজ থেকে তার জীবনের সঙ্গী হয়ে গেল।
চোখের পলকে পরিয়েছে দু’বছর। সুখ-দুঃখ মিলিয়ে কিভাবে যেন সময়গুলো কেটে গেল।
সন্ধ্যা নিজেই তার বাচ্চার এক ছোট্ট নাম রেখেছে ‘সৃজন৷’ সৃজন নামের অর্থ ‘সৃষ্টি’। মানুষ যেমন কল্পনায় পুনর্জন্মের কথা ভাবে। সন্ধ্যার মনে হয়, সে জীবন দিয়ে সেই পুনর্জন্মের ব্যাপারটি উপলব্ধি করেছে। আকাশকে হারিয়ে সে তো প্রায় ম’রে গিয়েছিল। বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিল। কখনো কখনো নিজের মৃ’ত্যু কামনা করত। ঠিক সেই সময় তার এই ছোট্ট প্রাণ এসে তাকে আবারো নতুন করে বাঁচতে শেখালো। জীবন্ত লা’শের মাঝে প্রাণ ফিরিয়ে দিল আল্লাহর এই ছোট্ট সৃষ্টি। যে সৃষ্টিকে ঘিরে সন্ধ্যা আবারো নতুন করে জীবন ফিরে পেল। ঠিক যেন তার পুনর্জন্ম হলো। এজন্যই মূলত সন্ধ্যা তার বাঁচার একমাত্র অবলম্বন তার ছোট্ট প্রাণের নাম রেখেছে ‘সৃজন’।
আকাশ সৃজন হওয়ার রাতে যে ইংল্যান্ড পাড়ি জমালো। এরপর সে আর বাংলাদেশে ফেরেনি৷ সকলের সাথে টুকটাক যোগাযোগ ছিল, এখনো আছে হয়ত। তবে সন্ধ্যার সাথে একদমই যেগাযোগ ছিল না। এখনো নেই। দু’জন দু’জনের মতো আলাদা জীবন নিয়ে হয়ত বড্ড ব্যস্ত৷ সন্ধ্যা তো সৃজনকে নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত।
সৃজন হওয়ার পর কয়েক মাসের মাথায় সন্ধ্যার এইচএসসি এক্সামের ডেট দিয়ে দেয়। সকলে সন্ধ্যাকে বলেছিল একবছর গ্যাপ দিতে৷ কিন্তু সন্ধ্যা কারো কথা শুনলো না। সে পড়াশোনায় গাফিলতি করলে কি করে হবে? তার সৃজনের ভবিষ্যৎ কি হবে? সে কারো কথা শুনলো না। পড়তে আরম্ভ করল। শুয়ে বসে, ছোট্ট প্রাণকে বুকে নিয়ে দিন-রাত এক করে পড়াশোনা করল। আর্টস সাবজেক্ট হওয়ায় খুব বেশি অসুবিধা হয়নি। এরপর পরীক্ষার ডেট চলে আসলো। মোটামুটি সুস্থ একটা শরীরে পরীক্ষাগুলো দিল। কিন্তু রেজাল্ট খারাপ হয়েছিল। পরীক্ষার ক’মাস আগে পড়ে পরীক্ষা দিলে যা হয়। সন্ধ্যার-ও তেমনি হয়। সে টেনেটুনে ৪.০০ পায়। এসএসসিতেও তার প্লাস ছিল না। দু’টোর রেজাল্ট নিয়ে সে হতাশ ছিল। এই রেজাল্ট নিয়ে সে এডমিশনে টিকবে কি করে? যখন আশা ছেড়ে দিয়েছিল, তখন তার সৌম্য ভাইয়া আর লামিয়া তাকে সাহস যুগিয়েছে। সন্ধ্যা সাহস নিয়ে আবারো এডমিশনের জন্য পড়তে শুরু করল। টানা তিনমাস প্রচুর পড়ল মেয়েটা।
এই কয়মাস পড়াশোনা আর তার ছোট্ট প্রাণ সৃজনকে ঘিরে ছিল শুধু। দেখতে দেখতে এডমিশনের পরীক্ষা চলে আসল। সন্ধ্যা বেশ কয়েকটি ভার্সিটির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করল। যার মধ্যে অন্যতম ছিল ঢাকা ভার্সিটি। এরপর শুরু হলো রেজাল্টের অপেক্ষা। সন্ধ্যার সে কী টেনশন! আল্লাহর অশেষ রহমতে সন্ধ্যা আর লামিয়া টিকে গেল ঢাকা ভার্সিটির অর্থনীতি ডিপার্টমেন্টে। সন্ধ্যা আর লামিয়া সেদিন রেজাল্ট পেয়ে দু’জন দু’জনকে জড়িয়ে ধরে ভীষণ হেসেছিল। দু’জনের চোখের কোণে ছিল পানি।
অনেকগুলো কারণের মাঝে একটি অন্যতম কারণ ছিল, আকাশ ব্যতীত সন্ধ্যার নিজের এক পরিচয় গড়ে তোলা। যার প্রথম সিঁড়ি সে পার করতে পেরেছে। আরেকটি কারণ, সন্ধ্যা আর লামিয়া আলাদা হয়ে যায়নি। একই জায়গায় একই ডিপার্টমেন্টে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। এর জন্য তো লামিয়া কান্নাই করে দিয়েছিল। সন্ধ্যা হাসে। লামিয়া তার জীবনের এক আশ্চর্যরকম নিঃস্বার্থ বন্ধু, যাকে দেখলে সন্ধ্যার বিস্ময় কাটে না। মেয়েটা তার বিপদের দিনে কি শ’ক্ত ঢালের ন্যায় সাপোর্ট দেয় বিনাস্বার্থে!
গত দু’বছরে সৌম্য নওয়ান বাড়ির চৌকাঠ পেরোয়নি। তার কথার বরখেলাপ সে করেনি। তবে সকলের সাথে দেখা করেছে, এখনো করে। হয় বাইরে নয়তো সন্ধ্যারা সৌম্য’র ভাড়া বাড়ি গিয়ে দেখা করেছে এখনো করে। সৌম্য’র এখনো চাকরি হয়নি। বহু চেষ্টা করেছে। কিন্তু সে ব্যর্থ হয়েছে। টিউশন করিয়ে অভাবী এক সংসারের জার্নি পার করছে এককালের সেই বিলাসী ইরাকে নিয়ে।
ধরনীর বুকে সকালের আলো ফুটেছে। ভাসমান সাদা মেঘের ফাঁক দিয়ে একটু একটু করে উঁকি দিচ্ছে সূর্যের আলো। ফজরের পর পর সৃজনের ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস। সে অনুযায়ী আজও তার ঘুম ভাঙে। সন্ধ্যা ছেলেকে ফ্রেশ করিয়ে বাগানে এনেছে।
এখন সন্ধ্যা বাগানের ফাঁকা জায়গায় উল্টোদিকে দৌড়াচ্ছে। আর সন্ধ্যার দিকে দৌড়ে আসছে ২ বছরের সৃজন৷ যার উচ্চর হাসির শব্দ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। ধবধবে ফর্সা সৃজনের উপর রৌদ্রের ছিটেফোঁটা এসে পড়ছে,, যা বাচ্চা সৃজনের সৌন্দর্য শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সন্ধ্যার পরনে কালো রঙের একটি সুতি শাড়ি কুচি করে পড়ায়। আঁচল কোমরে গুঁজে রাখা। হাঁটসমান চুলগুলোয় একটি লম্বা বিনুনি গাঁথা। হাস্যজ্জ্বল মুখে ছেলের দিকে চেয়ে উল্টোদিকে পিছিয়ে যাচ্ছে দৌড়ের ভঙ্গি করে।
সৃজনের পরনে কালো টি-শার্ট, প্যান্ট। বাচ্চা ছেলেটি দু’হাত মেলে হাসতে হাসতে মায়ের দিকে দৌড়ে যাচ্ছে। মা ছেলের মাঝে যেন প্রতিযোগিতা চলছে৷ সন্ধ্যা সৃজনের থেকে পালানোর ভঙ্গি করছে, অন্যদিকে সৃজন তার মাকে ধরার জন্য দৌড়ে যাচ্ছে৷ আদোআদো স্বরে বলে,
“মা দালাও। তুমাকে দলতে পালি না।”
সন্ধ্যা হাসতে হাসতে পেছায় আর বলে,
“এসো আব্বা। এইতো আমি৷ এভাবে ধরে দেখাও।”
সৃজন দৌড়ায়। কিন্তু বাচ্চা ছেলেটি হাঁপিয়ে গিয়েছে৷ অনেকক্ষণ থেকে এমন করে দৌড়াচ্ছে। না পেরে সে থেমে গিয়ে হাঁপায়। ছেলেকে থামতে দেখে সন্ধ্যার পা থেমে যায়। সে আর পেছালো না। কাঁচা মাটিতে হাঁটুমুড়ে বসে। দু’হাত মেলে দেয় সৃজনের দিকে। আবেগী সুরে ডাকে,
“আব্বা?”
মায়ের ডাকে সৃজন সামনে তাকায়। মাকে হাত বাড়িয়ে থাকতে দেখে সৃজন আর দাঁড়ায় না। এক দৌড়ে গিয়ে সন্ধ্যাকে জাপ্টে ধরে। দু’হাতে সন্ধ্যার গলা জড়িয়ে ধরে শব্দ করে হাসতে হাসতে থাকে। সন্ধ্যা-ও হাসে শব্দ করে। সৃজন হাসতে হাসতে বলে,
“আমি মাকে দলেচি৷ মা হেলে গেচে। আমি জিতে গেচি।”
কথাটা বলে আবারও খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে সৃজন। সন্ধ্যা ছেলের গালে দু’টো চুমু খেয়ে হেসে বলে, “তুমি জিতে যাওনি। আমার আব্বা জিতেছে। তুমি তো আমার আব্বা নও।”
মায়ের কথায় সৃজন গাল ফুলিয় বলে,
“তুমি মিতা কতা বুলচ। আমি তুমাল আব্বা। বুদেত?”
ছেলের কথায় সন্ধ্যা শব্দ করে হেসে ওঠে। সৃজনকে শ’ক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,
“ইশ! বুঝেছি তো। তুমিই আমার একমাত্র সোনা আব্বা।”
সৃজনের মুখে হাসি ফোটে। মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে এবার।
পিছন থেকে আসমানী নওয়ান কোমরে হাত রেখে বলে,
“মা ছেলের খেলা শেষ হলো? জান্নাত তুই ভার্সিটি যাবিনা? ঘড়ি দেখেছিস?”
খালার কথায় সন্ধ্যার হুশ ফিরে। সৃজনকে কোলে নিয়ে দৌড়ে বাড়ির ভেতর যেতে যেতে বলে,
“একদম ভুলে গিয়েছি আম্মা। কয়টা বাজে?”
আসমানী নওয়ান সন্ধ্যার পিছু পিছু যায় আর বলে,
“সাড়ে আটটা বাজে। ধীরে যা। আমার নাতিটাকে ফেলবি না-কি?”
সন্ধ্যা পায়ের গতি কমায়। হেসে বলে,
“হ্যাঁ তোমার নাতিকে আছাড় খাওয়াবো।”
সৃজন মায়ের গলা জড়িয়ে রেখেছে৷ আসমানী নওয়ানের দিকে তাকিয়ে আদোআদো স্বরে বলে,
“দাদিমা, মা আমাকে আচাল কাওয়াবে। আমি আচাল কাবো।”
সৃজনের কথায় আসমানী নওয়ান আর সন্ধ্যা দু’জনেই শব্দ করে হেসে ওঠে। সন্ধ্যা সৃজনকে ডায়নিং টেবিলের চেয়ারে বসিয়ে সৃজনের গালে চুমু এঁকে বলে,
“দাদিমার হাতে খেয়ে নাও৷ মা এক্ষুনি আসছি।”
সৃজন ভদ্রছেলের মতো মাথা নেড়ে বসে থাকলো। সন্ধ্যা একপ্রকার দৌড়ে ঘরে চলে যায়। লামিয়াকে বলেছিল ৯ টার মধ্যে পৌঁছাবে ভার্সিটি। পারবে বলে মনে হয়না৷ ঘরে এসে সন্ধ্যা দ্রুত কাভার্ড খোলে শাড়ি নেয়ার জন্য। তাড়াহুড়োয় একটি সাদা শাড়ি বের করে। দৃষ্টি সেদিকে পড়লে সন্ধ্যা থেমে যায়। দৃষ্টি আটকে যায় কিছু সময়ের জন্য। গত দু’বছরে সাদা রঙটা আর কখনো পরা হয়নি। যদিও এই রঙটা তার খুব পছন্দের। সাথে পছন্দ তার এক হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মানুষের-ও। সন্ধ্যা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাদা শাড়িটি যথাস্থানে রেখে আরেকটি কালো শাড়ি বের করে। শাড়িটি কুচি করে পরে নেয় দ্রুত। লম্বা বিনুনির নিচে ছাড়া চুলগুলো আছড়ে, আবারো বিনুনিটি পিছনে রাখে, যা হাঁটুতে ছুঁইছুঁই। এরপর মাথার উপর একটি কালো ওড়না ছেড়ে দেয়।
বা হাতে সোনালি রঙের একটি চেইন ঘড়ি পরে নেয়। এটাই তার বেশভূষা। বাইরে বেরোলে এভাবেই বের হয় সে।
কাঁধে একটি সাইড ব্যাগ ঝুলিয়ে দেয় সন্ধ্যা। একটি ছোট্ট কাভার্ড থেকে সৃজনের জন্য শার্ট-প্যান্ট বের করে হাতে নেয়। অপর হাতে টেবিলের উপর থেকে হেলমেট নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ডায়নিং-এ এসে দেখল সৃজন নেই। আসমানী নওয়ানকে জিজ্ঞেস করলে সে বলে,
“ওকে খাইয়েছি। অরুণের ঘরে গিয়েছে ও। তুই খেয়ে নে।”
সন্ধ্যা মাথা নেড়ে বলে,
“এখন খেতে ইচ্ছে করছেনা আম্মা। এসে খাবো।”
আসমানী নওয়ান জোর করলেন না। সকালে না খাওয়ার ব’দঅভ্যাস করেছে এই মেয়ে। বললেও শোনেনা। জেদি হয়েছে। সে লামিয়াকে বলে দিবে। লামিয়া একে পিটিয়ে হলেও খাওয়ায়। এজন্য আর কিছু বলল না।
সৃজন অরুণের ঘরে অরুণের মাথার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। দু’হাতে অরুণের মাথার চুল ধরে টানছে আর ডাকছে,
“অলুণ ওটো। ওলুণ? ওটো অলুণ।”
অরুণ নড়েচড়ে ঘুমঘুম স্বরে বলে,
“বিদায় হো বাপ। তোকে অনেক চকলেট কিনে দিব। এখন আমাকে ঘুমাতে দে।”
সৃজন মানল না। সে আবারও অরুণের মাথার চুল ধরে টানতে টানতে বলে, “ওলুণ ওটো। চলকেত দাও।”
সন্ধ্যা ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ছেলের কান্ড দেখে হতাশ হয়। সৃজনের প্রতিদিনের রুটিন এটা। অরুণকে ঘুমাতে দেখলেই এসে এভাবে ডাকবে, যতক্ষণ না অরুণের ঘুম ভাঙবে। সন্ধ্যা আব্বা বলে ডাকলে সৃজন অরুণের মাথার চুল ছেড়ে মায়ের কাছে দৌড়ে এসে বলে,
“মা ওলুণ ওটে না। চলকেত দেয়না।”
সন্ধ্যা সৃজনকে প্যান্ট-শার্ট বদলে দিতে দিতে বলে,
“উঠবে৷ তুমি অরুণ বলা বাদ দাও না কেন? ওটা তোমার অরুণ চাচ্চু। বুঝেছ?”
সৃজন মায়ের কথা নাকোচ করে বলে,
“না। ওটা আমাল ওলুণ, আমাল বুন্দু।”
সন্ধ্যা হাসল। এসব পাকা পাকা কথা সব অরুণ শেখায়। যদিও সৃজন আর পাঁচজনের চেয়ে সবকিছুর দিক দিয়ে এগিয়ে। সে হাঁটতে শুরু করেছে দ্রুত, কথা-ও বলে দ্রুত। তবে তার সব কথা স্পষ্ট নয়৷ তাছাড়া প্রতিটি কথা খুব ভালোভাবে বোঝে। সবমিলিয়ে সৃজন এখনই যেমন বিচক্ষণ ধরনের, তেমনি সবকিছুতে সবার চেয়ে এগিয়ে। এজন্য নিয়াজ সৃজনকে ‘স্মার্ট বয়’ বলে ডাকে। আসমানী নওয়ান মাঝে মাঝে মলিন গলায় বলেন, ‘সৃজন একদম আকাশের মতো হয়েছে।’
আকাশ-ও না-কি সবকিছুতে এমন ফাস্ট ছিল। গায়ের রঙ ধবধবে ফর্সা যা আকাশের মতো। চোখের মণি দু’টো-ও আকাশের মতো সোনালি রঙের। অনেকে তো বলে, চেহারা-ও হুবহু আকাশের মতো৷ সন্ধ্যার কাছেও তেমনই লাগে। তবে সে এসব ভাবনাকে তার মনে বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দেয় না। কথাগুলো ভেবে সন্ধ্যা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
এসব ভাবনার ইতি ঘটায় সন্ধ্যা। সৃজনকে রেডি করিয়ে কোলে নেয়। অরুণের ঘরের দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে
দরজার কাছে গিয়ে সৃজনের দু’পায়ে জুতো পরিয়ে দিয়ে আসমানী নওয়ানকে বিদায় দিয়ে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার আগে বলে,
“আম্মা অরুণ ভাইয়াকে দ্রুত পাঠিয়ে দিও। নয়তো আমার ক্লাস মিস যাবে।”
আসমানী নওয়ান সম্মতি দেয়। সন্ধ্যা সৃজনকে বাড়ি রেখে কখনো ভার্সিটি যায় না। সবসময় সৃজনকে সাথে নিয়ে যায়। যখন যখন ক্লাস থাকে তখন অরুণ নয়তো সৌম্য’র কাছে রাখে। সৌম্য বা অরুণ কেউ না কেউ ভার্সিটি যায় সন্ধ্যা আর সৃজনের জন্য। মাঝে মাঝে সন্ধ্যার অন্য ডিপার্টমেন্টের ফ্রেন্ডরা সৃজনকে নেয়। সন্ধ্যাকে যতজন চেনে সকলে সৃজনকে ভীষণ আদর করে। পুতুলের মতো বাচ্চাটিকে অনেক অপরিচিতরাও এসে কোলে নেয়, গাল টানে, কখনো গুলুমুলু গাল চুমুতে ভরিয়ে দেয়।
ভার্সিটি চান্স পাওয়ার পর লামিয়ার স্কুটি দিয়ে সন্ধ্যা স্কুটি চালানো শিখেছিল। এরপর আসমানী নওয়ান তাকে একটি স্কুটি কিনে দেয়। সন্ধ্যার যখন ইচ্ছে হয়, তার বাচ্চাকে নিয়ে স্কুটি নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে যায়। মা ছেলের ভীষণ ভালো লাগে স্কুটি নিয়ে বেরিয়ে পরতে।
সন্ধ্যা গ্যারেজে এসে তার স্কুটির উপর সৃজনকে বসিয়ে দেয়। এরপর সে হেলমেল্ট পরে সৃজনের সামনে স্কুটিতে বসে পড়ে। নিরাপত্তার জন্য একটি বেল্ট পরে নেয়, যে বেল্টের সাথে সৃজনের কোমর আটকে থাকে। অর্থাৎ একটি বেল্টের মাঝে দুই মা ছেলে আটকে থাকে। এই বেল্টকে ‘বাচ্চার সেফটি হর্নেস বেল্ট’ বা ‘স্কুটার বেবি হর্নেস বেল্ট’ বলে।
বেল্টটি পরার পর সন্ধ্যা ঘাড় বাঁকা করে বলে, “আব্বা শ’ক্ত করে ধরেছ?”
সৃজন তার ছোট্ট ছোট্ট দু’হাত বাড়িয়ে সন্ধ্যার কোমরের দু’পাশ শ’ক্ত করে ধরে বলে, “হু হু দলেচি।”
সন্ধ্যা হেসে সৃজনের ঠোঁটে একটা চুমু খায়। মায়ের আদর পেয়ে সৃজন হাসে। এরপর সন্ধ্যা স্কুটি স্টার্ট দেয়। পিছন থেকে আসমানী নওয়ান বলেন,
“সাবধানে যেও দাদুভাই।”
সৃজান ফিছু ফিরে ডান হাত দিয়ে ইশারা করে আর আদোআদোস্বরে বলে,
“তাতা দাদিমা।”
আসমানী নওয়ান হাসলেন। সন্ধ্যা-ও হাসল। আবারো সৃজনকে ভালোভাবে ধরে বসতে বললে সৃজন বাধ্য ছেলের ন্যায় মাকে শ’ক্ত করে ধরে মায়ের পিঠে বাম গাল ঠেকিয়ে দেয়। মিটিমিটি বাতাস গায়ে লাগছে। সৃজনের মুখে হাসি ফোটে। বোঝা যাচ্ছে, মায়ের সাথে এভাবে স্কুটিতে যেতে পেরে সে ভীষণ খুশি।
ট্রাফিক সিগন্যালের কারণে রাস্তার গাড়িগুলো সব একে একে থেমে গেছে। সকলের সাথে সাথে সন্ধ্যা-ও স্কুটি থামিয়ে অপেক্ষা করে। হাতঘড়িতে একবার সময় দেখল। লামিয়ার হাতে আজ মা’র খেতে হবে নিশ্চিত।
সৃজন দু’হাতে মাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। বাদিকে ফিরে আশপাশটা কুটুর কুটুর চোখে দেখে। তাদের পাশে আরও অনেক গাড়ি থেমে আছে। যার মধ্যে অন্যতম গাড়ি, বাইক, সিএনজি।
সন্ধ্যার স্কুটি থেকে বাদিকে অল্প কিছু দূরত্বে একটি বাইক, যে বাইকে এক ৩৩ বছর বয়সী লোক বসা। পরনে সাদা শার্ট-প্যান্ট৷ দু’হাতে গ্লাভস, বুকে রাইডিং জ্যাকেট, দু’পায়ে ব্রাউন কালার রাইডিং বুট। মাথায় সাদা-কালো রঙের সংমিশ্রণের একটি হেলমেট। বোঝা যাচ্ছে সকাল সকাল বাইক রাইডিং এ বেরিয়েছিল৷ কিন্তু এখানে এসে আটকে গিয়েছে। জ্যামে আটকে মারাত্মক বিরক্ত সে। বাইকের হাতল থেকে হাত সরিয়ে মাথার হেলমেট খুলে ডান হাতে নিলে দৃশ্যমান হয় তার তার চেহারা। যাকে দেখতে এক সুদর্শন যুবকের মতোই লাগছে। ধবধবে ফর্সা গালে চাপ দাঁড়িতে ভরপুর। উঁচু নাক, দীর্ঘ কপাল সবচেয়ে আকর্ষণীয় যা লাগে, তা হলো সোনালি চোখের মণি দু’টো।
সে বিরক্তি নিয়ে ডানে-বামে মাথা নাড়ায়। হঠাৎ-ই দৃষ্টি আটকায় তার ডানদিকে একটি স্কুটিতে বসা এক বাচ্চা ছেলের উপর। যার দৃষ্টি তার-ই উপর। আকাশকে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি অবাক করল, বাচ্চা ছেলেটির চোখের মণি দু’টো একদম তার চোখের মণির মতো সোনালি।
সৃজন আকাশের দিকে অনেকক্ষণ থেকে তাকিয়ে আছে। বাচ্চা ছেলেটি বোধয় আকাশকে চেনার চেষ্টা করছে। এটুকু বাচ্চার দৃষ্টি কি ভীষণ তীক্ষ্ণ! আকাশ সৃজনের চোখের দিকে চেয়েই হেলমেটটি আবার-ও পরে নেয়। বিড়বিড় করে আওড়ায়, “ইন্টারেস্টিং!”
তখন-ই ট্রাফিক সিগন্যালে লাল বাতি নিভে সবুজ বাতি জ্বলে ওঠে। সকলের গাড়ি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলেও আকাশ তার বাইক প্রথমেই অনেকটা হাই স্পিডে ছাড়ে। ফলস্বরূপ কয়েকটা গাড়ির সাথে ধাক্কা লাগে। তবে তার মাঝে বিশেষ কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না।
কয়েকটি ধাক্কা খাওয়া গাড়ির মাঝে ডানপাশে সন্ধ্যার স্কুটি-ও ছিল। যার সাথে আকাশের বাইক ধাক্কা খায়। সন্ধ্যা স্কুটিসহ ডানদিকে পড়তে পড়তে বেঁচে যায়। শ’ক্ত হাতে স্কুটি চেপে সোজা করে। ঘাড় বাঁকিয়ে ডান হাত পিছনে নিয়ে সৃজনকে ধরে। আত্মার পানির শুকিয়ে গিয়েছিল। ভেবেছিল, আজ তার এই প্রাণটার কিছু হয়ে গেল বলে! নিজেকে সামলে নিতে পেরে সন্ধ্যা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। সৃজনের উদ্দেশ্যে বিচলিত কণ্ঠে বলে,
“আব্বা ঠিক আছো?”
সৃজন ভীষণ ভ’য় পেয়েছে। মাকে আরও শ’ক্তহাতে চেপে ধরে ছোট করে বলে, “হু।”
সন্ধ্যা সামনে তাকায়। চোখে পড়ে একটি সাদা শার্ট-প্যান্ট পরিহিত লোক বাইক নিয়ে এলোমেলোভাবে ছুটে চলছে। সন্ধ্যা রাগান্বিত স্বরে চেঁচিয়ে বলে, “এ্যাই অন্ধমূর্খ এ্যাই, চোখ নেই?”
আকাশ শুনতে পেল কি-না! সে তার মতোই ছুটছে। যেন আরও গাড়ির সাথে ধাক্কা লেগে কয়েকটি এক্সিডেন্ট হয়ে গেলেও তার কিচ্ছু যায় আসেনা।
সন্ধ্যা লোকটির এমন অ’স’ভ্যের মতো কান্ড দেখে রে’গে তার বা পায়ের জুতো খুলে বা হাতে আকাশের দিকে ছুড়ে মা’রে।
আকাশের দৃষ্টি আয়নায় পড়লে দেখল তার দিকে কেউ জুতো ছুড়ে মে’রেছে৷ সে দ্রুত বাইক ডানদিকে একদম হেলে নেয়। যেন রাস্তার সাথে ঘেঁষে গেল। সন্ধ্যার ছুড়ে ফেলা জুতোটি আকাশের উপর দিয়ে চলে গেলে আকাশ আবারো বাইক সোজা করে। চোখেমুখে অসম্ভব ক্রোধ হানা দিয়েছে। সিদ্ধান্ত নেয়া শেষ, যে তার দিকে জুতো ছুড়েছে আজ তার লা’শ না ফেলে সে এই জায়গা প্রস্থান করবেনা। বাইক এই পথেই উল্টো ঘুরাতে নেয়, তখনই আবারো আয়নায় দৃষ্টি পড়লে আকাশের দৃষ্টি শীতল হয়। আয়নায় স্পষ্ট দৃশ্যমান সন্ধ্যার রাগান্বিত মুখ। সন্ধ্যার মাথায় হেলমেট থাকলেও তার শ্যামলা ঘর্মাক্ত মুখটা স্পষ্ট দৃশ্যমান। আকাশ আর মোড় ঘোরায় না। বরং সোজা পথেই বাইকের স্পিড আগের চেয়েও বাড়ায়। আয়নায় সৃষ্ট সন্ধ্যার প্রতিবিম্বে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে হেলমেট এর ভেতরেই সামান্য ঠোঁট বাঁকালো আকাশ।
আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১১
রা’গে সন্ধ্যার শরীর কাঁপছে এখনো। সে নিজেকে সামলে ডান পায়ের জুতো খুলে রেখে সৃজনকে ধরে বসতে বলে স্কুটি স্টার্ট দেয়।
ছোট্ট সৃজন মাকে ধরে রেখেই বাদিকে হেলে অস্পষ্ট হয়ে আসা অদৃশ্য হওয়ার পথে, আকাশের বাইকের দিকে চেয়ে থাকে। এতোক্ষণ ভাবার পর কিছু মনে পড়েছে বোধয় তার। মায়ের বলা তখনকার অন্ধমূর্খ শব্দটি আর তার মনে আসা নামটি মিলিয়ে আদোআদোস্বরে আওড়ায়,
“অন্দমুলকো বাতাচ বাবু।”
