আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৮
DRM Shohag
ঘড়ির কাটা তখন রাত ১১ টার ঘরে। সন্ধ্যার অপারেশন সাকসেসফুল হয়েছে। এক ব্যাগ র’ক্ত দেয়া হয়েছে। কিছুক্ষণ আগে তাকে কেবিনে দিলে, ক’মিনিটের মাথায় সন্ধ্যার জ্ঞান ফিরে আসে। কেবিনের দু’পাশে সন্ধ্যার ফ্রেন্ডরা লামিয়া, সাফা, জাবির, সাইফ দাঁড়ানো৷ সন্ধ্যাকে হসপিটাল আনার পর পরই যাদের নিয়াজ খবর দিয়েছিল। জাবির, সাইফ ছেলে মানুষ বিধায় তাদের এতো রাতে হাসপিটাল আসতে কোনো প্রবলেম না হলেও লামিয়া আর সাফার আসতে বেশ কসরত হয়েছে। কিন্তু তাতে কি? তাদের বন্ধু মৃ’ত্যুর সাথে লড়াই করছে, সেখানে তারা জেনেশুনে কি করে ঘরে বসে থাকতো। নিয়াজ সন্ধ্যার ফ্রেন্ডদের ব্যাপারে বেশ ভালোই জানে। এজন্য ওদেরকেই সন্ধ্যার খবরটা দিয়েছে। কিন্তু বাড়িতে জানায়নি সন্ধ্যার কথা। উল্টে সন্ধ্যার ফ্রেন্ডদের মাধ্যমে জানিয়েছে, সন্ধ্যা আজ তার এক ফ্রেন্ডের বাড়ি থাকবে। এটা নতুন নয়, এজন্য আসমানী নওয়ান নিশ্চিতে আছেন।
সন্ধ্যা ঘরের চারপাশে চোখ বুলিয়ে সৃজনকে না দেখে সকলের উদ্দেশ্যে বিচলিত কণ্ঠে বলে,
“আমার সৃজন, সৃজন কোথায়?”
সন্ধ্যার কথায় সকলের দৃষ্টিজুড়ে অসহায়ত্ব ঘিরে ধরে। নিয়াজসহ সন্ধ্যার ফ্রেন্ড কেউ কোনো উত্তর দিতে পারেনা। কি বলবে? তারা নিয়াজের কাছে শুনেছে, সৃজনকে আকাশ দত্তক দিয়ে দিয়েছে। লামিয়া এগিয়ে এসে সন্ধ্যার পাশে বসে। বা হাত সন্ধ্যার কপালে রেখে বলে, “তুই অসুস্থ, একটু শান্ত হ।”
সন্ধ্যা ভেজা কণ্ঠে বলে,
“আমি কিভাবে শান্ত হব? আমার বাচ্চা, আমার সৃজনকে ওই নিষ্ঠুর লোকটা আমার কোল থেকে কেড়ে নিয়ে গিয়েছে লামিয়া।
এরপর সন্ধ্যা সাইফ আর জাবিরের দিকে চেয়ে বলে, তোরা আমার সৃজনকে এনে দিতে পারবিনা জাবির? নিয়াজ ভাইয়া বলছিল ও খুব কাঁদছিল। তোরা একটু ওকে খুঁজে এনে দে আমার কাছে।”
সাইফ, জাবিরের দু’জনের মাথা নিচু৷ চোখদুটো লাল। সৃজন তাদের মাঝে নেই, অন্যমানুষের কাছে। এটা তারাই কেউ মানতেই পারছে না৷ সন্ধ্যা মা হয়ে কি করে মানবে?
সাইফ, জাবিরের থেকে উত্তর না পেয়ে সন্ধ্যার বড্ড অসহায় লাগে। উঠতে চাইলেও পারেনা। পেটের কাছে লাগছে। সে দৃষ্টি আরেকটু ঘোরালে নিয়াজের দিকে চোখ পড়ে। সন্ধ্যা আগের চেয়ে বিচলিত হয়ে জিজ্ঞেস করে,
“নিয়াজ ভাইয়া আমার সৃজন কোথায় আপনি জানেন? বলুন না আমার বাচ্চাটাকে আকাশ কার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে?”
নিয়াজ ঢোক গিলল। কিছু একটা ভেবে বলে, “একটি লোক তোমাকে মোট পাঁচ ব্যাগ র’ক্ত দিয়েছে। সৃজন হওয়ার সময় চার ব্যাগ। আজ এক ব্যাগ। লোকটি তোমার কে হয় সন্ধ্যা?”
নিয়াজের মুখে হঠাৎ এমন কথা শুনে সন্ধ্যা অবাক চোখে তাকায়। সন্ধ্যার সাথে সাথে তার ফ্রেন্ডরাও ভীষণ অবাক হয়। নিয়াজ আবারো বলে,
“একজন ব্যক্তি একসাথে চার ব্যাগ র’ক্ত দিতে পারেনা। কিন্তু সেই লোকটি দিয়েছিল। আমাদের হসপিটালের নার্সরা নিতে চায়নি বলে লোকটি তাদের হুমকি দিয়েছিল। সে তার লাইফ রিস্ক নিয়ে এতোগুলো র’ক্ত দিয়েছিল। আর আজ তোমার জন্য এক ব্যাগ র’ক্ত ম্যানেজ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু লোকটি নার্স দ্বারা জোর করিয়ে তার র’ক্ত পাঠিয়েছে আমার কাছে। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, সে সবসময় তার পরিচয় এমনকি মুখ ঢেকে রাখে। নার্সদের ভাস্যমতে তার চোখের মণি দু’টো সাদা। এখন তুমি বলো এসব কি হচ্ছে সন্ধ্যা?”
সন্ধ্যা বিস্ময় চোখে তাকায়। চোখের মণি সাদা? আজ তাকে গাড়ি করে আকাশের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল, তার চোখের মণিও সাদা ছিল। মুখ ঢেকে রেখেছিল। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো, সে একদম তার সেই ছোটবেলার অধীরের মতো বিহেব করছিল। তাকে তুই করে ডাকা, প্রাণ ডাকা। আর এখন শুনছে ওই লোকটি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বারবার তার প্রাণ বাঁচাতে আসে। সন্ধ্যার সবকিছু এলোমেলো লাগে। সব ইঙ্গিত বলে দেয়, লোকটি ‘অধীর ভাইয়া’। কিন্তু সেটা কি করে সম্ভব হতে পারে? সে, আর তার ভাইয়া নিজ চোখে অধীর ভাইয়ার লা’শ দেখেছে। ম’রা মানুষ কি করে বেঁচে উঠতে পারে? সন্ধ্যা ঢোক গিলল। সে ঠিক করল, আজকেই সে তার সৌম্য ভাইয়ার সাথে কথা বলবে এ নিয়ে। সৌম্য ভাইয়া অধীর ভাইয়ার ব্যাপারে কিছু না কিছু অবশ্যই বলতে পারবে। সন্ধ্যা নিয়াজের দিকে চেয়ে বলে,
“আমি তাকে চিনিনা নিয়াজ ভাইয়া।”
নিয়াজের কাটকাট কথা, “কিন্তু সে তো তোমাকে চেনে সন্ধ্যা। তুমিও নিশ্চয়ই ওকে চেনো৷ চিনে থাকলে প্লিজ বলো।”
সন্ধ্যা কি বলবে বুঝল না৷ সে একবার বলতে চাইল ওটা তার ছোটবেলার এক ভাই হতে পারে। কিন্তু বলল না। সে তো মরে গেছে। মরা মানুষকে সে কিভাবে বাঁচিয়ে তুলবে? কিন্তু সন্ধ্যার আরেকটি জিনিস ভেবে ভীষণ অবাক লাগলো। লোকটি আকাশ আর সৃজনের ব্যাপারেও সব জানে। অতঃপর সে বলে,
“নিয়াজ ভাইয়া আমি তাকে সত্যিই চিনি না৷ তার সাথে আজ আমারো একবার দেখা হয়েছিল। বলেছিল সে নাকি ওভারের গাড়ি চালায়। তাই তার গাড়িতে উঠেছিলাম। এরপর অবাক হয়েছিলাম। উনি আমাকে বলছিল, আকাশ আমাকে বিয়ে করতে চায় প্রতিশোধ নেয়ার জন্য। মাফিয়ারা নাকি প্রতিশোধ নেয়ার জন্য বিয়েটাকে বেশি চুজ করে। কারণ সৌম্য ভাইয়া আকাশের বাবাকে খু’ন করেছে। এজন্য আকাশ নাকি আমাদের কাউকেই ছাড়বে না।
কথাগুলো বলে সন্ধ্যা একটু থামলো। হাঁপিয়ে গিয়েছে। সন্ধ্যার কথা শুনে সকলের চোখেমুখে বিস্ময় ভর করে। যার মাঝে নিয়াজের বিস্ময়ের পরিমাণ হাজারগুণ বেশি।
সাফা এগিয়ে এসে সন্ধ্যাকে একটু পানি খাওয়ায়। সন্ধ্যা নিজেকে সামলে আবারো বলে,
“নিয়াজ ভাইয়া আপনি তো জানেন আমার সৌম্য ভাইয়া আকাশের বাবাকে খু’ন করেনি। তাহলে আকাশ কেন আজো এসব মিথ্যা বিশ্বাস করে বসে আছে? মনে না থাকুক, কিন্তু কারো বলা মিথ্যা কেন বিশ্বাস করে বলুন তো?”
কথাটা বলে সন্ধ্যা উত্তরের অপেক্ষা করে। সন্ধ্যার ফ্রেন্ডরাও সবাই নিয়াজের দিকে তাকিয়ে আছে উত্তরের অপেক্ষায়। এই কথাটার উত্তর তারা আসলেই জানতে চায়। আকাশের স্মৃতি হারিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ আকাশের মাঝে সৌম্য’র প্রতি এমন বিরূপ ধারণা কেন তৈরী হয়েছিল, এর উত্তর তাদের কারো কাছেই নেই।
এদিকে নিয়াজ মনোযোগ দিয়ে সন্ধ্যার কথাগুলো শুনে চুপচাপ কেবিন থেকে থেকে বেরিয়ে গেল। নিয়াজের কাজে সকলের মুখ থমথমে হয়ে যায়। মিনিট দুয়েক পর নিয়াজ হাতে করে একটি ল্যাপটপ নিয়ে সন্ধ্যার কেবিনে প্রবেশ করে। সন্ধ্যাসহ সকলে দেখতে পাবে এমন একটি জায়গায় ল্যাপটপটি রাখে। এরপর তাতে একটি পেনড্রাইভ কানেক্ট করে। ল্যাপটপে আঙুল চালাতে চালাতে সকলের উদ্দেশ্যে বলে,
“মনোযোগ দিয়ে ভিডিওটি দেখবে।”
কথাটি বলে একটি ভিডিও অপেন করে ল্যাপটপের পাশে দাঁড়ায়। সকলের উৎসুক দৃষ্টি ল্যাপটপের স্ক্রিনে। যেখানে ভেসে ওঠে,
“সৌম্য’র ডান হাতে একটি ধা’রা’লো ছু’রি। সামনে একটি চেয়ারে বেঁধে রাখা আকাশের বাবাকে। সৌম্য ছু’রিটি হাতে নিয়ে এদিক-ওদিক হাঁটতে থাকে আর কেমন করে যেন হাসে। হঠাৎ-ই তার পা থেমে যায়। একদম আকাশের বাবার সামনে এসে দাঁড়ায়। হাতের ছু’রিটি আকাশের বাবার থুতনি বরাবর রেখে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“এতো ক’ষ্ট করে কি লাভ হলো? আমি, আমার বোনু এতো কায়দা করে তোদের বাড়ি ঢুকলাম। কিন্তু তুই তোর সম্পত্তি কোন গুহায় রেখেছিস যেন আমি আর আমার বোনু হাতের নাগালে না পাই! এবার তুই ম’র। এরপর আমি সব সম্পত্তি ঠিক আমার আর আমার বোনুর নামে করে নিব। শুনেছি তোর ছেলে এক্সিডেন্ট করে নাকি স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছে। এবার আরও সুবিধা হবে। আমার বোনুকে তোর ছেলের বউয়ের পরিচয় দিব, সাথে আমার বোনুকে কয়েক মাসের প্রেগনেন্টও করে দিব যাতে তোর ছেলে আমার বোনুকে কিছুতেই অস্বীকার করতে না পারে। আমার বোনুর স্বামী অন্যএকজন, পেটে বাচ্চা থাকবে অন্যএকজনের। কিন্তু তোর ছেলে এসবের ভাগীদার হয়ে যাবে। তোর বউ তো আমাকে আর আমার বোনুকে খুব ভালোবাসে। তাই কোনো প্রবলেম হবেনা। সব সম্পত্তি এমনিই আমার আর আমার বোনুর নামে হয়ে যাবে । কিন্তু তুই বেঁচে থাকলে এটা সম্ভব নয়। তাই তুই ম’রে যাহ্।”
আকাশের বাবা ভীত চোখে তাকায় সৌম্য’র দিকে। অসহায় কণ্ঠে বলে,
“প্লিজ আমাকে মেরো না৷ প্লিজ!”
আরও অসহায়ভাবে রিকুয়েষ্ট করল। কিন্তু সৌম্য একবিন্দু দয়া দেখালো না। তার হাতের ধারালো ছু’রি আকাশের বাবার পেট বরাবর একবারে ঢুকিয়ে দেয়। আকাশের বাবার চোখের মণি উল্টে আসে। চিৎকার করে ওঠে। তখনই ভিডিওটি বন্ধ হয়ে যায়।
ভিডিওটি দেখে সকলে বাকরুদ্ধ হয়ে চেয়ে আছে, একমাত্র নিয়াজ স্বাভাবিক। সন্ধ্যা ভাঙা স্বরে শব্দ করে বলে ওঠে,
“এটা আমার সৌম্য ভাইয়া নয়। আমার সৌম্য ভাইয়া কিছুতেই এমন নয়।”
নিয়াজ সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল বোধয়। সাইফ কিছু একটা ভেবে নিয়াজের দিকে চেয়ে বলে,
“ভিডিওতে সৌম্য ভাইয়া যা যা বলল, মনে হলো সব ঘটনা আকাশ ভাইয়ার এক্সিডেন্টের পর। অথচ আকাশ ভাইয়ার এক্সিডেন্টের আরও বছরখানেক আগেই আকাশ ভাইয়ার বাবা মারা গিয়েছে।”
নিয়াজ এবার সাইফের দিকে চেয়ে একটু জোরেই হেসে ফেলল। ডান হাত উঠিয়ে ইশারা করে আর বলে,
“স্যরি এভাবে হাসার জন্য। আসলে সন্ধ্যার এক্সপ্রেশন দেখে আমার হাসি পাচ্ছিল। ও এক মুহূর্তের জন্য ভেবেই নিয়েছিল, স্ক্রিনে থাকা ব্যক্তিটি আসলেই সৌম্য।”
সাইফ আর জাবির স্বাভাবিক থাকলেও সন্ধ্যাসহ লামিয়া, সাফা অবুঝ নয়নে তাকায় নিয়াজের দিকে। নিয়াজ এগিয়ে এসে সন্ধ্যার সামনে দাঁড়ায়। দু’হাত আড়াআড়িভাবেভাবে বুকে গুঁজে বলে,
“ভিডিওটা কোথায় পেয়েছি জানো সন্ধ্যা?
সন্ধ্যা প্রশ্নাত্মক চোখে তাকায়। নিয়াজ বলে,
আকাশের কাছ থেকে এই পেনড্রাইভ আমি আরও অনেক আগেই কালেক্ট করেছি৷ তুমি সব জানার পরও ভিডিওটি দেখে এক মুহূর্তের জন্য সত্যি ভেবে নিয়েছিলে, সেখানে আকাশ স্মৃতি হারিয়ে এরকম একটা ভিডিও দেখে যখন একটা পর একটা সত্যিই প্রুভ পাচ্ছিল, তখন ওর এতোদিনের রিয়েকশনটা কি খুব অস্বাভাবিক ছিল বলো?
সন্ধ্যা বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। মাথার ভেতর কেমন যেন চিনচিন করে উঠল। কে আকাশকে এমন ভিডিও দিয়েছিল? ভিডিওতে লোকদুটো একদম হুবহু তার সৌম্য ভাইয়া আর তার শ্বশুরের মতো দেখতে। এটাই বা কিভাবে সম্ভব? নিয়াজ সন্ধ্যার মনোভাব বুঝতে পেরে বলে,
“আমি নিজেও জানিনা, এরা দু’জন সৌম্য আর আঙ্কেলের মতো কি করে দেখতে হয়ে গেল৷ কিন্তু আমরা যেহেতু ঘটনা জানি, সেহেতু এটাও জানি লোকগুলো ফেইক। কিন্তু আকাশের পক্ষে এটা জানা সম্ভব নয়। আমার কথা বুঝেছ সন্ধ্যা?”
সন্ধ্যার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। আজ আকাশের বলা প্রতিটি অদ্ভুদ কথার মাঝে একটি কথা বারবার তার কানে বাজলো যেন। ওই যে, গভীর সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া নিয়ে আকাশ যে উক্তিটি দিয়েছিল, তার অর্থ এবার আরও পরিষ্কার হলো,, ‘আকাশ না জেনে অনেক ভুল করেছে, আর তারা জেনেবুঝে আকাশকে দোষারোপ করে গিয়েছে।’ কিন্তু আকাশ এই কথাটা তো তখনই বলবে, যখন আকাশের স্মৃতি ফিরবে। অথচ আকাশের স্মৃতি তো ফেরেনি। তবে? সন্ধ্যা ঢোক গিলল।
নিয়াজ ল্যাপটপটি বন্ধ করে হাতে তুলে নেয়৷ সন্ধ্যার দিকে চেয়ে বলে,
“আশা করি ভিডিওটি দেখে বুঝতে পেরেছ, এসবের পিছনে মাস্টারমাইন্ড কেউ একজন আছে। তোমাকে গু’লিটাও হয়ত সেই করেছে। চিন্তা কর না সন্ধ্যা, সৃজন ভালো না থাকলেও নিরাপদে আছে। তুমি নিজের যত্ন নাও। আমি আশাবাদী সৃজনের সাথে তোমার খুব শীঘ্রই দেখা হবে।”
কথাটি বলে নিয়াজ কেবিন থেকে যেতে নিলে সাইফ বলে ওঠে,
“আপনি তখন আকাশ ভাইয়ার সাথে অদ্ভুদ বিহেভ করেছেন, তখনকার আপনি আর এখন আপনির মাঝে অনেক তফাৎ। আমি চিনতে পারছি না। তখন আপনি আকাশ ভাইয়াকে দোষারোপ করে এখন সন্ধ্যাকে বলছেন সৃজন নিরাপদে আছে?”
নিয়াজের পা থেমে গিয়েছে অনেক আগেই। সাইফের বলা কথাগুলো শুনে একটু হাসলো বোধয়। উল্টো ঘুরে সাইফের দিকে তাকায়। মৃদুস্বরে বলে,
“আমার আর আকাশের মুখে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দের পিছনে একটি করে যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকে। আপাতত এটাই জেনে রাখো, সৃজন কারো কাছে দত্তক আছে।”
কথাটা বলতেই সন্ধ্যা অসহায় কণ্ঠে বলে ওঠে, “নিয়াজ ভাইয়া?”
নিয়াজ সন্ধ্যার দিকে চেয়ে শ’ক্ত গলায় বলে, “তোমাকে এভাবে মানাচ্ছে না সন্ধ্যা।”
কথাটা বলে নিয়াজ বেরিয়ে যায় কেবিন থেকে। সন্ধ্যার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। বিড়বিড় করে, “আমি কখনো আমার সৃজনকে ছাড়া থাকিনি। এখন কিভাবে থাকবো আল্লাহ্? আমার আব্বা?”
লামিয়া আর সাফা সন্ধ্যার মাথায় হাত বুলিয়ে সন্ধ্যাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করে। সাইফ আর জাবির ভাবুক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জাবির মৃদুস্বরে বলে,
“আমার মনে হচ্ছে, নিয়াজ ভাইয়া অনেক কিছু জানে।”
সাইফ স্বায় দেয়, “আমারও। কিন্তু কোথাও একটা গোলমেলে লাগে।”
জাবির উত্তর করে, “তা তো লাগবেই। আকাশ ভাইয়ার স্মৃতি যে ফেরেনাই মামা। আই গেজ, আকাশ ভাইয়ার স্মৃতি ফিরলেই সব প্রবলেম সল্ভ হয়ে যেত।”
সন্ধ্যা সাইফ আর জাবিরের কথোপকথন শুনে ঢোক গিলে বলে,
“আমার উনাকে সন্দেহ হয়।”
সকলে সন্ধ্যার দিকে উৎসুক চোখে তাকায়। বলে, “কি নিয়ে? আর কাকে?”
আজ আকাশের বলা প্রতিটি কথা, আকাশের ফোনের রিংটোন সব মিলিয়ে সন্ধ্যার মাথা এলোমেলো লাগে। কিন্তু আকাশের কঠোরতার কথা ভাবতেই সন্ধ্যার অসহ্য অনুভূতি হয়। চোখমুখ খিঁচে দু’হাতে মুখ ঢেকে হাসফাস কণ্ঠে বিড়বিড় করে,
“না না কিছু নিয়ে না। আমার আকাশ হারিয়ে গেছে৷ উনি আমার আকাশ না।”
নিয়াজ হসপিটাল থেকে বেরিয়ে তার গাড়িতে বসতে যাচ্ছিল। তখনই চোখে পড়ে রাস্তার ওপাশে বায়ান আর শিমু সামনাসামনি দাঁড়ানো। মনে হচ্ছে শিমু কিছু নিয়ে বায়ানকে ভীষণ রিকুয়েস্ট করছে। কিন্তু বায়ান বিরক্ত হয়ে শিমুর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বারবার চলে যেতে চাইছে কিন্তু শিমুর জোরাজুরির জন্য পারছে না। নিয়াজ দু’জনের দৃশ্য দেখে ঢোক গিলল। ধীরপায়ে রাস্তা পার হয়ে রাস্তার অপর পাশ থেকে এপাশে দাঁড়ালো। বায়ান আর শিমুর থেকে অল্পকিছু দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়েছে।
শিমু দু’হাত জমা করে কেঁদে কেঁদে বলে,
“আকাশ ভাইয়া দেশে ফিরেছে। মা ভাইয়াকে বলে এবার আমার বিয়েটা সত্যি সত্যিই দিয়ে দিবে। প্লিজ বায়ান তুমি আমাকে বিয়ে করে নাও।”
বায়ানের চোখেমুখে বিরক্তি। শিমুর কান্না তার মাঝে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলল বলে মনে হলো না। উল্টে রে’গে বলে, “আমি তোমার থেকে গুণে গুণে পাঁচ বছরের বড়। আমাকে নাম ধরে ডাকতে তোমার ল’জ্জা করে না?”
বায়ানের কথা শিমু গায়ে মাখলো না। সে দু’হাতে চোখ মুছে বলে,
“আমি তো তোমাকে ভালোবেসে নাম ধরে ডাকি। ভালোবাসলে ল’জ্জা রাখতে হয় না, বুঝেছ? আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি বায়ান।”
বায়ানের শক্ত কণ্ঠ,
“আমি তোমাকে ভালোবাসি না। এই কথাটা আর কয় হাজারদিন বললে তোমার এসব ফা’ল’তু পা’গ’লা’মি বন্ধ করবে তুমি?”
শিমুর দু’চোখ বেয়ে নোনাজল গড়ায়। বলে, “তুমি যতদিন বাঁচবে ততদিন বলবে। আমি তো বলিনি আমাকে তোমার ভালোবাসতে হবে। তুমি শুধু আমাকে বিয়ে করে নাও। তুমি আমার নামে থাকো। আর কিছু চাই না আমার।”
কথাটা বলতে বলতে শিমু বায়ানের হাত ধরতে নিলে বায়ান ঝাড়া মেরে তার হাত সরিয়ে নেয়। রেগে বলে,
“তুমি একটা গায়ে পড়া মেয়ে। এসব মেয়ে আমার পছন্দ নয়।”
শিমু অসহায় কণ্ঠ,
“বিশ্বাস কর আমি শুধু তোমাকে টাচ করতে চাই৷ আর কোনো ছেলের দিকে ফিরেও তাকাইনা। তোমার বিশ্বাস না হলে আমার ফ্রেন্ডদের জিজ্ঞেস করে দেখ। ওরাও এটাই বলবে।”
বায়ান শীতল দৃষ্টিতে তাকায়। ঢোক গিলে বলে, “আমিও শুধু আমার সকালকে টাচ করতে চাই। অন্যকারো দিকে ফিরেও তাকাইনা। বিশ্বাস না হলে তুমি আজীবন ওয়েট করতে থাকো আর আমার অ্যান্সার ‘নো’ শোনার জন্য প্রস্তুত থাকো। যতক্ষণ আমার দেহে প্রাণ আছে, ততক্ষণ আমি শুধু সকালকেই ভালোবাসবো। যে জায়গায় ওর বসার কথা ছিল, সে জায়গায় আমি অন্য কাউকে বসাবো না।”
শিমুর দু’চোখ বেয়ে টপটপ করে নোনাজল গড়িয়ে পড়ে। মাথা নিচু করে ফোঁপায়। কি আছে ওই মেয়ের মাঝে, যা তার মাঝে নেই? আজ কত বছর হলো মেয়েটি মে’রে গেছে। তবুও বায়ান কেন ওকে ভুলতে পারেনা? বায়ান সকালকে ভুলে না যাক। সে তো ভুলতে বলেনি। সে চায়, বায়ান শুধু তাকে একটি সুযোগ দিক। কিন্তু বায়ান সেটুকুও করেনা। কেন এমন করে বায়ান? শিমু আবারো বায়ানের হাত ধরলে এবার বায়ান আগের চেয়েও রেগে যায়। মেয়েটার জন্য সে আকাশদের অফিসের চাকরিটা পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছে। তবুও রাস্তাঘাটে দেখলে এমনভাবে পা’গ’লা’মি করে যেন ও শিমুকে ঠকিয়েছে। আর কথায় কথায় টাচ করা তো আছেই। বায়ান এবার রাগ গিলতে না পেরে শিমুর কাঁধে হাত রেখে জোরেসোরে একটা ধাক্কা দেয়। শিমু পড়ে যেতে নিলে একটু দূরে দাঁড়ানো শিমুর ফ্রেন্ড দৌড়ে এসে শিমুকে সাপ্টে ধরে।
এই দৃশ্য দেখে নিয়াজ রাগে ফুঁসতে ফুুঁসতে পিছন থেকে তেড়ে আসে বায়ানের দিকে। বা হাতে বায়ানের শার্টের কলার ধরে দাঁত কিড়মিড় করে বলে, “তোর সাহস কি করে হয়, ওর সাথে এতো বাজে বিহেভ করার?”
কথাটা বলতে বলতে নিয়াজ তার মুষ্টিবদ্ধ ডান হাত দ্বারা আঘাত করতে নেয় বায়ানকে। তখনই শিমু চেঁচিয়ে ওঠে, “খবরদার ওকে মারবেন না।”
নিয়াজের হাত থেমে যায়। বাদিকে ঘাড় ফিরিয়ে অবাক হয়ে দেখে শিমুকে। শিমু এগিয়ে এসে নিয়াজকে আদেশের সুরে বলে, “ওর কলার ছাড়ুন বলছি।”
শিমুর এক কথায় বায়ানের কলার ধরে রাখা নিয়াজের হাত ঢিলে হয়ে গেল। মুষ্টিবদ্ধ ডান হাতটিও ধীরে ধীরে নামিয়ে নেয় নিয়াজ।
শিমু বায়ানের দিকে আরেকটু এগিয়ে এসে অসহায় কণ্ঠে বলে,
“বায়ান তুমি আমাকে বিয়ে করবে বলো? তোমার মাকে একবার বলবে আমার কথা?”
নিয়াজ শিমুর দিকে চেয়েই দু’পা পেছালো। বুকের বা পাশটায় কি অসহনীয় ব্য’থা হয়৷ গত পাঁচ বছরের বেশি হয়ে গেল, যাকে এতো এতো ভালোবেসে গেল, সেই মেয়েটির চোখে তার জন্য একটু দয়াও নেই। অথচ যে ছেলেটা তাকে প্রতিনিয়ত ছুড়ে ফেলছে, শিমু সেই ছেলেটার কাছে বারবার ফিরে যাচ্ছে। কণ্ঠে কত নমনীয়তা মিশে! নিয়াজের চোখদু’টো টকটকে লাল। দৃষ্টি শিমুর বিধ্বস্ত মুখপানে।
এদিকে বায়ান অসহায় চোখে চেয়ে আছে শিমুর দিকে। সে মেয়েটাকে এতো ইগনোর করে, তবুও মেয়েটা বারবার তার কাছেই আসে সেই এক আবদার নিয়ে। এমন কেন এই মেয়ে? বায়ান কিছুই বলল না। সে উল্টো ঘুরে দ্রুত পা চালায় জায়গাটি প্রস্থান করতে। বায়ানকে এভাবে চলে যেতে দেখে শিমুর বুক ফেটে কান্না আসে। সে শব্দ করে বলে,
“বায়ান, তুমি আমাকে বিয়ে না করলে আমি কিন্তু ম’রে যাবো।”
বায়ান ঢোক গিলল। সকালের লিখে যাওয়া সেই ছোট্ট চিঠির লেখাগুলোর দু’টো লাইন চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ভাসে,
‘বায়ান জানো, আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি। তুমি অন্যকারো হলে আমি খুব ক’ষ্ট পাবো।’
কথাগুলো ভেবে বায়ানের চোখের কোণে নোনাপানি জমে। শুকনো ঢোক গিলে পায়ের গতি বাড়ায়। ডান হাতে ঝাপসা চোখজোড়া ডলে নেয়। পিছন থেকে শিমুর আরও খানিক কান্নামাখা গলায় কিছু কথা ভেসে আসলো, তবে বায়ান ফিরে তাকালো না। সে পারবে না তার সকালকে ভুলে আরেক নারীকে সে জায়গায় বসাতে। এটা তার দ্বারা কখনো সম্ভব নয়।
বায়ান অদৃশ্য হয়ে গেলে শিমুর দমবন্ধ লাগে। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে তার। চোখজোড়ায় অনবরত নোনাজল জমে। নিয়াজ নির্জীব দৃষ্টিতে শিমুকে দেখে। নিজের উপর উপহাস করে হাসে। তার ভাগ্য! এই ফুলের মতো মেয়েটিকে নিয়ে কতশত সে স্বপ্ন সাজিয়েছে এই মনের ঘরে। সেই মেয়ে দিন-রাত আরেক ছেলের জন্য তার সামনেই কতই না পা’গ’লা’মি করে!
শিমুর ফ্রেন্ড এগিয়ে এসে শিমুকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে উল্টোপথে। শিমু ধীরে ধীরে এগোয়। মাথা নিচু করে নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলে। কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে শিমুকে তার বাড়ির গাড়িতে বসিয়ে দেয় তার ফ্রেন্ড, সাথে সেও উঠে বসে। এরপর ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দেয়। শিমু মূলত ফ্রেন্ডকে নিয়ে কেনাকাটা করতে এসেছিল। বাড়ি থেকে আসতে দিয়েছিল সাথে ফ্রেন্ড আর বাড়ির গাড়ি নেয়ায়। কিন্তু হসপিটালের কাছে বায়ানকে দেখে শিমু দৌড়ে বেরিয়ে এসেছে। সেই কখন থেকে বায়ানের সাথে পা’গ’লা’মি করছিল কে জানে!
নিয়াজ শিমুদের চলন্ত গাড়ির পানে একধ্যানে চেয়ে রইল। কখন যে চোখজোড়া ঝাপসা হয়ে এলো টের পেল না। বুকে অসহনীয় ব্য’থার পরিমাণটা তড়তড় করে বেড়ে গিয়েছে। আস্তে করে সামনে দু’পা বাড়ালো। অসহায় দৃষ্টি শিমুদের অদৃশ্য হওয়ার পথে গাড়িটির দিকে। যে গাড়িতে তার স্বপ্নের নারী বসে আছে। কিন্তু সেই স্বপ্নের নারী স্বপ্নেই থেকে যাবে। সে কখনো বাস্তব হবে না।
দুপুরের পর থেকে ইরা সৌম্য’র জন্য ওয়েট করছে। সাইফ, জাবির তাকে জানিয়েছে সৌম্যকে নিয়ে তারা ফিরছে। কিন্তু রাত ১২ টা বাজতে চলল সৌম্য’র বাড়ি ফেরার নামগন্ধ নেই। ইরা চিন্তা ভর্তি মাথা নিয়ে রাতে আবারও সন্ধ্যাকে কল করে। সন্ধ্যাকে না পেয়ে সাইফের নাম্বারে কল করলে তারা জানায়, সৌম্যকে তারা বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে দিয়েছে। সৌম্য হয়ত কোনো কাজে আটকে গিয়েছে। টিউশনেও যেতে পারে, এজন্য হয়ত আসতে লেট হচ্ছে। ইরা মেনেছিল। কিন্তু তাই বলে এতো রাত করবে ফিরতে? এমনি দিনেও তো সৌম্য বাড়ি ফিরতে এতো লেট করেনা। আর আজ তাকে এভাবে কাঁদিয়ে রেখে গেল।
জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তো সৌম্য সবার আগে বাড়ি ফিরত। এটাই তো সৌম্য। সে সৌম্যকে খুব ভালো করে চেনে৷ তবে এখনো কেন ফিরছে না সৌম্য? ওর কি আবার কোনো বিপদ হলো? ইরা ভাবতে পারেনা। টেনশনে মাথা ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। সৌম্য’র কাছে ফোনটাও নেই, এজন্য সে সৌম্য’র সাথে যোগাযোগও করতে পারছে না। ইরা না পেরে আবারো জাবিরের নাম্বারে কল করতে নেয়, তখনই দরজায় কেউ কড়া নাড়ে। শব্দ পেয়ে ইরা দ্রুত দরজার দিকে তাকায়। এতো রাতে সৌম্য ছাড়া আর কেউ আসবে না। ভাবনা অনুযায়ী ইরা তার হাতের ফোন রেখে দ্রুতপায়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় দরজার সামনে। ব্যস্ত হাতে দরজার ছিটকিনি খুলে দেয়। দৃষ্টি আটকায় সামনে দাঁড়ানো বিধ্বস্ত সৌম্যতে৷ সে এক সেকেন্ডও সময় ন’ষ্ট না করে একপ্রকার ঝাঁপিয়ে পড়ে সৌম্য’র বুকে। ফুঁপিয়ে ওঠে মেয়েটা। শক্ত করে সৌম্যকে জড়িয়ে ধরে ফোঁপানো কণ্ঠে বলে,
“এতো দেরি করলে কেন? আমি অনেক ভ’য় পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম আবারো তোমার কোনো বিপদ হয়েছে।
এটুকু বলে ইরা সৌম্যকে ছেড়ে মাথা উঁচু করে সৌম্য’র দিকে তাকায়। ডান হাত সৌম্য’র গালে রেখে ভাঙা গলায় বলে, “এতো দেরি হলো কেন বাসায় ফিরতে? কোথায় গিয়েছিলে?”
সৌম্য নির্বিকার চিত্তে ইরার কান্নাভেজা মুখটার দিকে চেয়ে আছে। মুখে কোনো রা নেই, নেই দৃষ্টির নড়চড়। ইরা সৌম্য’র চোখদু’টো খেয়াল করলে দেখল, সৌম্য’র দু’চোখ ভীষণ লাল হয়ে আছে। সে ডান হাত সৌম্য’র গাল থেকে সরিয়ে সৌম্য’র কপালে রেখে চিন্তিত কণ্ঠে বলে,
“তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?”
সৌম্য নিশ্চুপ। ইরা সৌম্যকে এমন চুপচাপ দেখে ভ্রু কুঁচকে বলে,
“কি হয়েছে তোমার? কোনো কথা বলছ না কেন?
এবারেও সৌম্যকে চুপ দেখে ইরা সৌম্য’র শুকনো মুখটার দিকে চেয়ে মলিন গলায় বলে,
“কি হয়েছে তোমার বলো? এমন চুপ হয়ে গেছ কেনো?”
হঠাৎ-ই সৌম্য তার বা হাত ইরার শাড়ির আঁচলের ফাঁকে নিয়ে, ইরার পেট শ’ক্ত থাবার ন্যায় খামচে ধরে। ইরা কেঁপে ওঠে। তাকায় সৌম্য’র পানে। সৌম্য চোয়াল শক্ত করে বলে,
“কয় মাস চলে যেন? চার মাস! রাইট?”
সৌম্য’র কথাটা কানে আসতেই ইরা বিদ্যুৎ শক খাওয়ার মতোন কেঁপে ওঠে। বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায় সৌম্য’র দিকে। চোখেমুখে ভীতি জড়ো হয়। শুকনো ঢোক গিলে। কাঁপা কণ্ঠে বলতে নেয়,
“সৌম্য, আআমি আসলে তোমাকে বাবা……
বাকিটুকু শেষ করতে দেয় না সৌম্য। বা হাতে ইরার ডানগালে ক’ষিয়ে একটা চড় মা’রে। হঠাৎ আক্রমণের জন্য ইরা মোটেও প্রস্তুত ছিল না। ফলস্বরূপ বাদিকে হুমড়ে খেয়ে পড়ে মেঝেতে। জীবনের প্রথম সৌম্য’র হাতে এমন দাবাং মার্কা চড় খেয়ে যেমনি মাথাটা ভনভন করে ওঠে, তেমনি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। চোখদু’টো ভরে ওঠে। ভাবনার মাঝেই সৌম্য বড় বড় পায়ে এগিয়ে এসে ইরার সামনে হাঁটুমুড়ে বসে। বা হাতে ইরার চুল টেনে ধরে ইরার মুখ তার মুখ বরাবর এনে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“আমাকে বাবা বানাবি? এতো শখ আমাকে বাবা বানানোর? কিভাবে বানাবি? তুই মা না হয়ে আমাকে একা একা বাবা বানাবি? এতো স্পর্ধা তোর ইরাবতী? এতোটা?”
ইরা সৌম্যকে দেখে ভ’য়ে থরথর করে কাঁপতে থাকে। দু’চোখ বেয়ে নোনাজল গড়ায়। সৌম্য ডান হাতে ইরার গাল চেপে ধরে বলে,
“ডক্টর বলেছিল, তুই কন্সিভ করলে বাঁচবি না, জানতি না তুই বল? বল জানতি না?”
ইরা কান্নামাখা গলায় কাঁপা কণ্ঠে বলে,
“আমার অংশ তো বাঁচবে। তুমি বাবা হতে পারবে। আমার বাঁচা মরা…..
এইবারও সৌম্য ইরাকে কথা শেষ করতে দিল না। রাগে কাঁপতে কাঁপতে ইরার একই গালে আরেকটা থা’প্প’ড় মেরে দেয়। ইরা পড়ে যাওয়ার আগেই সৌম্য ইরাকে নিজের সাথে চেপে ধরে। ডান হাতে গাল চেপে ইরার মুখ নিজের দিকে করে রাখে। ইরা ফোঁপায়। নিভুনিভু চোখে তাকায় সৌম্য’র দিকে।
সৌম্য কান্নারত ইরার দিকে চেয়ে ঢোক গিলে বলে,
“আমি বাবা হতে না পারলে শুধু একটু কষ্ট পেতাম, একটুখানি দুঃখ পেতাম। আর তোকে হারিয়ে আমি জীবন্ত লা’শ হয়ে যাবো। অথচ তুই জেনেশুনে আমার এই ভ’য়া’বহ পরিণতি দিতে এতো আয়োজন করলি ইরাবতী?”
সৌম্য’র গলা ধরে আসে। চোখদু’টো ঝাপসা হয়ে আসে। ইরা ফুঁপিয়ে কাঁদে। সে কি করে বোঝাবে, সে যখন সৌম্য’র সাথে বাইরে যেত। সৌম্য’র দৃষ্টি ওই ছোট্ট বাচ্চা মেয়েগুলোর দিকে পড়ে থাকতো। কি অসহায় থাকতো সে দৃষ্টিজোড়া! ইরা কতদিন একা একা কেঁদেছে, সে সৌম্য’কে বাবা বানাতে পারবে না ভেবে৷ কিন্তু এভাবে কতদিন? সে সৌম্য’র ওই অসহায়ত্বে ঘেরা দৃষ্টি দিনের পর দিন উপেক্ষা করতে পারেনি।
সৌম্য ইরাকে ছেড়ে মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে। কান্নারত ইরার পানে মলিন মুখে চেয়ে থাকে। এই মেয়েটা নাকি আর কয়দিন পর আর এই পৃথিবীতে নিঃশ্বাস নিবে না। এটাও তার ভাগ্যে ছিল? দুর্ভাগ্য হলে এতোটা হয় বুঝি? এমন ভাগ্য আল্লাহ তার শ’ত্রু’রও না দিক। সৌম্য অসহায় কণ্ঠে বলে,
“তুই এতো স্বার্থপর কেন ইরাবতী? আমাকে আর কত পরীক্ষা দিতে হবে? এই দুর্ভাগ্যের খাতার সমাপ্তি কোথায়?”
ইরা তাকায় সৌম্য’র পানে। ধীরে ধীরে সৌম্য’র দিকে এগিয়ে এসে সৌম্য’কে ঘেঁষে বসে। দু’হাতে সৌম্য’র শার্ট আঁকড়ে ধরে সৌম্য’র বুক বরাবর মুখ রেখে মাথা উঁচু করে সৌম্য’র দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে কিছু বলতে নেয়, তার আগেই সৌম্য ইরার দিকে চেয়ে বিদ্রূপ স্বরে বলে,
“ম’রার জন্যই তো চার মাসের বাচ্চা পেটে নিয়ে ঘুরছিস। আসলে আমাকে সবাই মিলে এতো দুঃখ দিয়েও ভাঙতে পারছিল না তো, এজন্য তুই আমাকে পুরোপুরি ভাঙতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমে পড়েছিস। তুই সফল ইরাবতী। খুশি হয়েছিস তো?”
কথাটা বলতে গিয়ে সৌম্য’র ডান চোখ বেয়ে একফোঁটা নোনাজল টুপ করে ইরার বাম গালের উপর পড়ে।
ইরা অনবরত দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে না বোঝায়। সে কিছু বলতে চায়, কিন্তু কান্নার ফলে কিছু বলতেই পারছে না।
সৌম্য ঢোক গিলে আবারো বলে,
“ম’রে তুই যাবি-ই। কিন্তু তার আগে আমিই ম’রে যাবো। তুই ম’রে গিয়ে আমাকে চিরকাল যে শা’স্তি দিতে চেয়েছিলি, তুই নিজেই নাহয় ক’য়েকমাস সেই শা’স্তির স্বাদ গ্রহণ কর।”
কথাটা বলে সৌম্য ইরাকে ঠেলে সরিয়ে দেয়। ইরা চোখ বড় বড় করে তাকায়। সে কিছু বোঝার আগেই সৌম্য বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বড় বড় পা ফেলে রুমের বাইরে চলে যায়। ইরা দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে দৌড়ে যায় সৌম্য’র পিছু। কিন্তু সে ঘর থেকে বেরোতে পারলো না৷ তার আগেই সৌম্য ঘরের দরজা ঠাস করে বন্ধ করে দিয়েছে। ইরা দরজায় জোরে জোরে থা’প্প’ড় দেয়। শব্দ করে কেঁদে দিয়ে বলে,
“সৌম্য দরজা খোলো। সৌম্য দাঁড়াও। কোথাও যাবে না তুমি। সৌম্য??”
সৌম্য বাইরে থেকে দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দিয়ে বাড়ির বাইরের দিকে এলোমেলো পায়ে হাঁটতে থাকে। ডান হাতের শার্টের হাত দ্বারা চোখ মুছে নেয়। বুকটা জ্বলছে খুব। জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত একটুখানি সুখের আশায় তার সারাটি জীবন কেটে গেল। অথচ সুখ, স্বাধীন প্রজাপতির ন্যায় তার হাত থেকে বরাবরের মতোই আবারো উড়ে গেল। ওইতো বাংলায় যাকে বলে, ‘চরম অভাগা।’
ইরা কাঁদতে কাঁদতে দরজায় হেলান দিয়ে বসে পড়েছে। কোথায় চলে যাবে সৌম্য? সে সৌম্যকে ছাড়া কি করে থাকবে? অসহায় কণ্ঠে অস্পষ্ট স্বরে বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়,
“আমায় ক্ষমা কর। ফিরে এসো। সৌম্য??”
ঘুম ভাঙার পর থেকে সৃজন চিৎকার করে কাঁদছে। কারণটা অবশ্যই তার মা। এর আগে কখনো মায়ের থেকে টানা এতোক্ষণ দূরে থাকেনি। বিছানায় শুয়ে শুয়ে গড়াগড়ি করে কাঁদছে। থেকে থেকে মা মা করে ডাকছে৷ মায়ের বুক ছাড়া এই কান্না বোধয় থামবে না। বেডের পাশে দাঁড়ানো আকাশ। যার দৃষ্টিজুড়ে অসহায়ত্বে ভরপুর। সে যতবার সৃজনকে কোলে নিতে গিয়েছে, ততবার সৃজনের কান্নার বেগ বেড়েছে। আকাশ ভ’য় পেয়ে সৃজনকে কোলে নেয়ার সাহস-ই করতে পারেনি তখন থেকে৷ কি করবে কিচ্ছু বুঝতে পারছে না।
সৃজন কাঁদতে কাঁদতে শোয়া থেকে উঠে দাঁড়ায়। আকাশের দিকে তেড়ে এসে ছোট্ট ছোট্ট দু’হাতে আকাশকে সমানে থা’প্প’ড় দেয় আর কেঁদে কেঁদে বলে,
“পুচা বাতাচ বাবু। মা কাচে নিয়ে যায় না। তোমাকে একদম মেলে পেলবো আমি।”
সৃজন এতক্ষণ কান্নার মাঝে নিজের গায়ের কাপড় নিজেই টেনে টেনে খুলে ফেলেছে। রেগে এমন কাজ করেছে৷ তাকে কেন তার মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না, এজন্যই তার রাগ। আকাশ ডান হাত বাড়িয়ে সৃজনের শরীর চেক করলে দেখল শরীর ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ করে এসির কি যে প্রবলেম হয়েছে এজন্য বেশি প্রবলেম হচ্ছে। আকাশ ব্যস্ত হাতে তার শার্টের বোতামগুলো খুলে কান্নারত সৃজনকে জোর করে তার উম্মুক্ত বুকে জড়িয়ে নিয়ে, শার্ট আর কোর্ট দ্বারা সৃজনের ঠান্ডা শরীর ঢেকে নেয়। সৃজন আবারো চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। আকাশ সৃজনকে তার বুকে শক্ত করে ধরে রাখলো। সৃজন রা’গে রা’গে আকাশের গলায় শক্ত করে দাঁত বসায়। আকাশের মাঝে তেমন কোনো ভাবান্তর হলো না। সে সৃজনকে এভাবে ধরে রেখে ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে আকাশ একজায়গায় হাঁটু গেড়ে বসে। সামনে একটি বড়সড় একুরিয়াম। যেখানে রঙবেরঙের আলো, ফলে পানিও বিভিন্ন কালারের দেখাচ্ছে। সেই পানিতে ছোট বড় অনেক মাছ ছোটাছুটি করছে।
আকাশ ডান হাত আলতো করে সৃজনের চুলের ভাঁজে চালায়। ধীরে ধীরে সৃজনের কান্নার বেগ কমে আসে। আকাশের গলায় যে কা’ম’ড়ে ধরেছিল, সেটাও ছেড়ে দেয়। দৃষ্টি রঙবেরঙের আলোয় ভরা একুরিয়ামে পড়লে কান্না একেবারে থেমে যায়। ধীরে ধীরে মাথা তুলে একুরিয়ামের দিকে চেয়ে ভাঙা গলায় বলে, “ইটা কি?”
আকাশ তাকায় সৃজনের দিকে। সৃজনের চুলের ভাঁজ থেকে তার ডান হাত সরিয়ে সৃজনের ভেজা মুখ মুছে দিয়ে অতি যত্নের সাথে। এরপর সৃজনকে সহ আকাশ আরেকটু সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে একপাশে চুপ করে থাকা একটি বড় মাছ বরাবর তার ডান হাতের একটি আঙুল তাক করে বলে,
“এটা মাছের মা।”
সৃজন আকাশের মাথার সাথে তার মাথা ঠেকিয়ে বলে, “উটা মাচের মা?”
আকাশ ছোট করে করে বলে,
“হুম।
এরপর আকাশ একটি ছোট্ট মাছের দিকে আঙুল তাক করে বলে,
আর এটা মাছের বাচ্চা, একদম তোমার মতো। ওর মা ওইপাশে কাজ করছে, তাই ও চুপ করে আছে।”
সৃজন চট করে বলে,
“আমাল মা-ও কাচ কচ্চে?”
সাথে সাথে আকাশ সৃজনের দিকে ফিরে তাকায়। মৃদু হেসে বলে,
“হুম। তোমার মা কাজ করছে। কাজ করার সময় বাচ্চারা কাঁদলে মায়েরা কষ্ট পায়। তোমার মা কাজ করছে, কিন্তু তুমি কাঁদছ তাই তোমার মা-ও কষ্ট পাচ্ছে।”
কষ্ট মানে যে ভালো থাকা নয়, এটা সৃজন বেশ বোঝে। সে আবারো কান্নামাখা গলায় বলে,
“আমি মা কাচে যাবো।”
আকাশ সৃজনকে নিয়ে মেঝেতে লেপ্টে বসে। কোর্টের মাঝে সৃজনকে জড়িয়ে রেখে বলে,
“মায়ের কাজ শেষ হলে তোমাকে তোমার মায়ের কাছে নিয়ে যাবো।”
সৃজন গোল গোল চোখ করে বলে,
“মায়েল কাচ ককুন শেচ অবে?”
আকাশ মলিন মুখে সৃজনের ফোলা ফোলা ফর্সা লাল মুখটা দেখল। এতো মা পা’গ’ল ছেলে। কথাটা ভেবে আকাশ একটু হাসল বোধয়। মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করে,
“তুমি তোমার বাবাকে চেনো?”
সৃজন অবুঝ নয়নে চেয়ে বলে,
“না। বাবালা দেকতে কেমুন অয়?”
আকাশ ঢোক গিলে বলে,
“তুমি দেখতে চাও?”
সৃজন মাথা উপরনিচ করে বলে,
“হু হু। বাবাকে দেকতে চাই। দেকতে চাই।”
আকাশ মৃদু হেসে বলে,
“আমি তোমাকে দেখাবো। কিন্তু তার আগে আমার সব কথা শুনতে হবে। শুনবে?”
সৃজন আবারো মাথা উপরনিচ করে বলে, হু হু চুনব৷ কি চুনতে অবে?”
আকাশ সৃজনের কপালে একটা চুমু খেয়ে বলে, “আর কান্না করা যাবে না। সবসময় হাসতে হবে।”
সৃজন ভাবুক হয়। এরপর সে হামাগুড়ির মতো করে আকাশের বুক থেকে একটু উপরদিকে উঠে আকাশের অনুকরণ করে আকাশের কপালে একটা চুমু খায়। আকাশের শরীর শিরশির করে ওঠে। অদ্ভুদ দৃষ্টিতে তাকায় সৃজনের দিকে।
এদিকে সৃজন কাজটি করে তার ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে আকাশের সামনে ধরে দু’টো আঙুল পরপর খুলে বলে,
আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৭
“আত্তা আত্তা। একন কালি হাচব। তায়লে তুমি আমাকে মা কাচে নিয়ে যাবা আল বাবাকি দেকাবা। বুচ্চ বাতাচ বাবু?”
কথাটা বলে সৃজন আকাশের দিকে তাকিয়ে দু’হাতে তালি দেয় আর শব্দ করে হাসে।
আকাশ স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে হাস্যজ্জ্বল সৃজনের দিকে। অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণেও এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে
