আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৪
DRM Shohag
ফজরের নামাজ পড়ার পর সন্ধ্যা বেলকনিতে এসেছিল। বেলকনিতে এসে বকুল গাছ তলায় দু’জনকে বসে থাকতে দেখে সন্ধ্যা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে। বেলকনি থেকে আকাশ আর জেডিকে চিনতে পারেনি। তবে বাগানে আকাশদের কাছাকাছি এসে চিনতে পারে। সন্ধ্যা মূলত সকালের আলো ফোটার আগেই এখানে এসে দাঁড়িয়েছিল। অর্থাৎ জেডি আসার পর পরই। একই সাথে সৌম্য-ও এসে দাঁড়িয়েছিল সন্ধ্যার পিছে। সে গতকাল রাত থেকে সন্ধ্যাকে অনেকবার কল করেছে। কিন্তু সন্ধ্যা ফোন তুলছিল না বলে সৌম্য ভীষণ টেনশন করছিল। সে জানত, আসমানী নওয়ান বাড়িতে নেই। এজন্য আরও বেশি চিন্তা হচ্ছিল।
নিয়াজকে কল করেও পায়নি। তাই একপ্রকার বাধ্য হয়ে বোনুর টানে অনেকগুলো বছর পর এই বাড়ির ভেতর পা রেখেছিল। তার বোনু ঠিক আছে কি-না, শুধু এই খবরটুকু নিয়েই সে চলে যাবে। বাড়ির মেইন গেইট থেকে ভেতরে আসার পর সৌম্য সন্ধ্যাকে বাগানের দিকে যেতে দেখে স্বস্তি পায়, তার বোনু ঠিক আছে এই ভেবে। দু’টো কথা বলে এখান থেকেই চলে যেতে পারবে ভেবে স্বস্তির পরিমাণ আরেকটু বেড়েছিল। সৌম্য সন্ধ্যার পিছু পিছু আসতে আসতে পিছু ডাকতে নেয়, তখনই এখানে আকাশ আর জেডির কথায় তার আর সন্ধ্যাকে ডাকা হয় না। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। সৌম্য’র সামনে সন্ধ্যাও তখনই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। আকাশের বলা সেই প্রথম কথাগুলো থেকে শুরু করে জেডির শেষ করা আর্তনাদ সবকিছু শুনেছে তারা দু’ভাইবোন। আকাশ আর জেডির অসহায়ত্ব স্বচক্ষে দেখেছে। আকাশের গত এক বছরের করা কর্মকান্ডের কথা জেনেছে। সৃজনকে রক্ষা করার কথা জেনেছে। আড়াল থেকে সৌম্যকে আগলে রাখার কথা জেনেছে৷ জেনেছে তাদের ছোট বেলায় হারিয়ে যাওয়া সেই অধীর ভাইয়া এখনো বেঁচে আছে। যে ভাগ্যের কাছে হেরে গিয়ে তার প্রাণকে খুব বাজেভাবে হারিয়ে ফেলেছে। দু’ভাইবোন ভেজা চোখে নিচু হয়ে বসে আকাশের দিকে দু’হাত বাড়িয়ে দেয়া জেডির পানে চেয়ে আছে।
সন্ধ্যার স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে ছোটবেলায় তার একমাত্র খেলার সাথী অধীর ভাইয়ার সাথে কাটানো কিছু মুহূর্তের মাঝে এলটি দৃশ্যপট –
“কি চাই তোর সন্ধ্যাপ্রাণ? শুধু একবার বল। আমি এক্ষুনি সব এনে দিচ্ছি।”
অধীরের কথা শুনে ছোট্ট সন্ধ্যা বিরক্ত হয়ে বলে,
“আবার আমাকে অন্যনামে ডাকছো? আমার নাম শুধু সন্ধ্যা, শুধু্ সন্ধ্যা। বুঝলে?”
অধীর হেসে মাথা নেড়ে বলে,
“না বুঝিনি।”
সন্ধ্যা চোখ পাকিয়ে বলে,
“কেন বোঝোনি?”
অধীর সন্ধ্যাকে টেনে মাঠে ঘাষের উপর বসায়। এরপর সেও সন্ধ্যার পিছনে হাঁটুমুড়ে বসে সন্ধ্যার কোমর সমান খোলা চুলগুলো নেড়েচেড়ে বলে, “সবসময় এভাবে চুল ছেড়ে থাকিস কেন?”
সন্ধ্যা চোখমুখ কুঁচকে চেঁচিয়ে বলে,
“আহ্ আমার চুল ছাড়ো অধীর ভাইয়া। লাগছে।”
অধীর হাত দিয়েই চুলের জট ছাড়াতে ছাড়াতে বলে, “সারাদিন চুল ছেড়ে রাখার ফল এটা।
এরপর পকেট থেকে একটি সুন্দর রাবার ব্যান বের করে সন্ধ্যার চুল উঁচু করে ঝুটি করে দেয় আর বলে,
তোর চুল একদিন হাঁটুর নিচ ছাড়িয়ে যাবে। ভুলেও চুল কাটার কথা মাথায় আনবি না। তোকে ক’ষ্ট করে কিচ্ছু করতে হবে না। চুল তোর, যত্ন আমার। বুঝলি প্রাণ? আর তাছাড়া বউ বানাবো তোকে আমি। তাই তোর উল্টো কথা আমি বুঝিনা।”
কথাটা শুনতে সন্ধ্যা অধীরের দিকে তাকায়। মুখ ভেঙিয়ে বলে,
“হবো না তোমার বউ। সারাদিন প্রাণ প্রাণ বলে মাথা খেয়ে ফেলো আমার।”
অধীর সন্ধ্যার কান টেনে ধরলে সন্ধ্যা চেঁচিয়ে বলতে থাকে,
“হবো হবো। তোমারই বউ হবো। কান ছিঁড়ে গেল আমার। কান ছাড়ো। আহ্!”
অধীর সন্ধ্যার কান ছেড়ে দেয়। সন্ধ্যা কান ডলতে ডলতে অধীরের দিকে চেয়ে বলে,
“আমি যা যা চাইব, সব দিতে হবে কিন্তু।”
অধীর হেসে বলে,
“পাক্কা, সব দিব। কি চাই তোর?”
সন্ধ্যা দুষ্টুমি হেসে বলে,
“সকালে একবার, রাতে একবার তোমাকে ঝাটা দিয়ে পেটাতে দিতে হবে।”
অধীর কেশে ওঠে। আবারো সন্ধ্যার কান টেনে ধরতে নিলে, সন্ধ্যা তার আগেই মাঠ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে অধীরকে মুখ ভেঙিয়ে দৌড় দেয়। খিলখিলিয়ে হাসতে থাকে। ঘাড়ে ঝুলিয়ে রাখা ওড়না দু’হাতে ধরে দৌড়াচ্ছে। অধীর সন্ধ্যাকে ধরতে না পেরে সন্ধ্যার পিছু দৌঁড়ায়। হাত উঁচু করে বলে,
“এই দাঁড়া। দু’আঙুল সমান মেয়ে হয়ে আমাকে ঝাটা পেটা করতে চাস? কত্ত বড় সাহস!”
সন্ধ্যা দৌড়াতে দৌড়াতে একবার পিছু ফিরে অধীরের উদ্দেশ্যে বলে,
“উহ্। তো এই দু’আঙুলের মেয়েকে বিয়ে করতে চাও কেন? ল’জ্জা নেই।”
অধীর কিছু বলতে গিয়েও হেসে ফেলে। হাঁপিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। নিজেকে সামলে বলে,
“তুই হাফ আঙুল সমান হলেও তোকেই বিয়ে করবো পাকনা বুড়ি।”
সাত বছরের সন্ধ্যা বিয়ে, ভালোবাসা এসব না বুঝলেও অধীরের এসব কথা তার বেশ ভালোই লাগতো। প্রাণ খুলে হাসতো।’
অধীর ভাইয়ার সাথে এমন ধারার খুনশুটির দিনের শেষ নেই সন্ধ্যার। সন্ধ্যা তখন ভালো লাগা, ভালোবাসার মানে বুঝতো না। কিন্তু তার খেলার সাথী, খুনশুটির সাথী অধীর ভাইয়াকে হারিয়ে পা’গ’লের মতো কেঁদেছিল।
অধীর হারিয়ে যাওয়ার পর, সন্ধ্যারা সেই গ্রাম ছেড়ে আসার পর সন্ধ্যার যখন অধীরকে খুব মনে পড়ত। তখন
অবুঝ সন্ধ্যা একা একা পুকুড় পাড়ে বসে কাঁদতে কাঁদতে বলত,
‘অধীর ভাইয়া আমাকে বউ তো বানালোই না। শুধু মিথ্যা বলে চলে গেল। মিথ্যুক অধীর ভাইয়া একটা।’
সবকিছু সন্ধ্যার স্পষ্ট মনে না থাকলেও, সেই স্মৃতিগুলো একেবারে অস্পষ্টও নয়। বাচ্চাকালের পুরনো দিনগুলোর কথা ভেবে সন্ধ্যার দু’চোখ বেয়ে নোনাজল গড়ায়। দৃষ্টি জেডি রূপী অধীরের পানে।
সন্ধ্যার পিছনে দাঁড়ানো সৌম্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জেডি যে তাদের অধীর ভাইয়া এটা কখনো কল্পনাতেও আসেনি। সৌম্য’র মনে আছে ভার্সিটি লাইফের কথা। ভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারের শেষের দিকে জেডি তার কাছে এসে বলেছিল, সে তার বোনকে বিয়ে করতে চায়৷ হঠাৎ জেডির থেকে এহেন প্রস্তাব পেয়ে সৌম্য ভীষণ অবাক হয়েছিল। ভার্সিটির প্রথম থেকেই জেডিকে ভীষণ উচ্ছৃঙ্খল একজন মানুষ হিসেবে চিনে এসেছে সৌম্য। সাথে আকাশও ছিল, তবে আকাশ জেডির তুলনায় একটু কম ছিল। জেডির থেকে পাওয়া নিজের বোনুর জন্য পাওয়া প্রস্তাবটি সৌম্য’র একটুও ভালো লাগেনি। সে মুখের উপর না করে দিয়েছিল। এমন মানুষের সাথে সে তার বোনুর জীবন কিছুতেই জড়াতে দিবে না বলেছিল। জেডিকে তার ফ্লাট করা লোকদের ফেলেছিল সৌম্য। জেডির চালচলনে এমন মনে হতো। যদিও জেডি মেয়েদের সাথে মিশতো এমন নয়। তবে জেডির গেটআপ, কথা বলার ধরনই এমন ছিল।
এজন্য আকাশের এক্সিডেন্টের পর চার মাসের মাথায় আকাশের সাথে সাথে যখন জেডির সাথেও দেখা হয়েছিল, তখন সৌম্য তার অসুস্থ বোনুকে নিয়ে জেডির গাড়ির উঠতে সংকোচবোধ করছিল। সেদিনও জানতো না, এটাই তাদের সেই অধীর ভাইয়া। যে হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে তাদের জীবন এলোমেলো হওয়া শুরু হয়েছিল। অধীর ভাইয়া মা’রা গিয়েছে জেনে সে কত চিৎকার করে কেঁদেছে। গ্রামের মানুষ তার কান্না দেখতে এসেছে। অধীর মা’রা যাওয়ার পর সৌম্য নদীর পাড়ে মাছ মারতে গিয়ে মাছ না মে’রে নদীর পাড়ে বসে বসে কাঁদতো। মনে হতো, মায়ের বকা থেকে আর কেউ বাঁচাতে আসবে না। কতদিন নদীর পাড়ে বসে নিঃশব্দে কাঁদতে কাঁদতে ভাবত,, অধীর ভাইয়া আর বলতে আসবে না, ‘বড় ভাই থাকলে ছোট ভাইদের এতো টেনশন করতে হয় না।’ আর কখনো বড় ভাইয়ের মতো তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে আসবে না।
যাকে নিয়ে এতোসব অনুভূতি ছিল। আজ শুনছে, সেই অধীর ভাইয়া নাকি দিব্যি বেঁচে ছিল। আজো বেঁচে আছে। যা যা ঘটেছে, তার বোনুকে কেন্দ্র হয়ে৷ সৌম্য’র মনে পড়ে একসময়ের চিন্তিত অধীরের বলা কথা, অধীর তার দু’হাতের মাঝে সৌম্য’র দু’হাত আঁকড়ে ধরে বলেছিল,
“সৌম্য শোনো, আমার কোনো প্রবলেম হলে আমি ইংল্যান্ড থেকে বা ঢাকা থেকে ফিরতে লেট করলে তুমি যেন আমাকে দেয়া কথা ভুলে যেও না।”
সৌম্য ভ্রু কুঁচকে বলেছিল,
“কি ভুলে যাবো না অধীর ভাইয়া?”
অধীর মলিন মুখে বলেছিল,
“আসলে এই গ্রামে আসতে মাঝে মাঝে আমার অনেক প্রবলেম হয়। কারণ বলতে পারবো না। তুমি শুধু তোমার বোনুকে আমার জন্য রেখে দিবে। শুনেছি গ্রামের মেয়েদের অনেক তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়ে যায়।”
কথাটা শুনে সৌম্য শব্দ করে হেসেছিল অনেকক্ষণ। অধীর হাসেনি। তার চোখেমুখে চিন্তা ছিল। বাবার সাথে এই গ্রামে আসা নিয়ে সবসময়ই ঝামেলা লাগে তার, সেটা নিয়েই অধীরের যত চিন্তা ছিল।
সৌম্য নিজেকে সামলে বলেছিল,
“আপনার জন্য আমার বোনুকে রেখে দেওয়ার কথা আপনি প্রতিদিনই বলেন। আমি তো বলেছিই, আমি জীবনেও আমার বোনুকে অন্যজায়গায় বিয়ে দিব না। তবুও আপনি প্রতিদিনই এভাবে বলেন। এক কথা আর কতবার বলবেন? মনে হয়, প্রেম হওয়ার আগেই ছ্যাঁকা খাচ্ছেন আপনি৷”
অধীর সৌম্য’র কথা শুনে হেসে ফেলেছিল। সৌম্য’র কাঁধে হাত রেখে বলেছিল, “আমি ভীষণ ভ’য় পাই সৌম্য। তুমি এখন বুঝবে না। যেদিন আমার জায়গায় আসবে সেদিন বুঝবে। আপাতত আমাকে দেয়া কথা রাখবে। আর কিছু করতে হবে না।”
সৌম্য হেসে বলেছিল,
“অবশ্যই রাখবো অধীর ভাইয়া।”
পুরোনো দিনের কথাগুলো ভেবে সৌম্য’র ভেতর থেকে শব্দহীন চিৎকার বেরিয়ে আসে। সে তো চেয়েছিল তার অধীর ভাইয়ার বউ হিসেবে তার বোনুকে দেখতে। সে অধীরকে দেয়া কথা রাখতে চেয়েছিল। আকাশপানে চেয়ে অধীর ভাইয়াকে কত ডেকেছিল। অধীর ভাইয়া হারিয়ে গিয়েছিল। ভাগ্য তাদের কারো সহায় হয়নি। কোথায় যেন শুনেছিল, ‘আমরা যা দেখে সবচেয়ে বেশি ভ’য় পাই। আল্লাহ সবার আগে না-কি আমাদের সেই পরিস্থিতিতেই ফেলে দেয়।’
কথাটা এতোদিন সৌম্য’র কাছে বানোয়াট মনে হলেও আজ কেন যেন বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করল। এই যে, অধীর সবচেয়ে বেশি ভ’য় পেত তার বোনুকে হারানোর। আর অধীর ভাইয়ার পাওয়া ভ’য়টুকু আল্লাহ নিমিষেই কত কঠিনভাবে বাস্তবায়ন করে দিল। অধীর ভাইয়ার ভাগ্য তার বোনুকে শুধু হারিয়েই ক্ষান্ত হয়নি। তার বোনুকে হারানোর কারণ হিসেবে আল্লাহ্ অধীর ভাইয়ারই সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুকে বেছে নিয়েছে।
সৌম্য ঝাপসা চোখে একধ্যানে চেয়ে রইল জেডি রূপী অধীরের পানে।
আকাশ জেডির দিকে চেয়ে ভাঙা গলায় বলে,
“সব বাদ দিয়ে যদি এসে বলতি, আমার সন্ধ্যামালতী-ই তোর প্রাণ। তবে আমি সন্ধ্যামালতীকে তোকে দিয়ে দিতে না পারলেও নিজে ম’রে যেতাম। তোর চোখের সামনে আমি আর আমার সন্ধ্যামালতী সুখের সংসার করে তোর বুকের দহন বাড়াতাম না। কিন্তু তুই এসব কি করে ফেললি জ্যাক?”
জেডি মাথা উঁচু করে তাকায় আকাশের দিকে। ধরা গলায় বলে, “আমার প্রাণকে আমাকে দিয়ে দিতে পারতি না কেন?”
আকাশ ঢোক গিলে বলে,
“আমি ছাড়া ওকে ছোঁয়ার অধিকার আমি কাউকে দিব না। সেটা তুই হলেও।”
জেডির মলিন মুখখানা আরও মলিন হলো। বলে,
“আর আমাকে দেয়া কথা, সব ভুলে গেলি?”
আকাশের বুকের য’ন্ত্র’ণা বৃদ্ধি পায়। শ্বাস চেপে বেঁধে আসা গলায় বলে,
“আমার সন্ধ্যামালতীর জন্য হাজারটা কথার বরখেলাপ করে অসম্মানের ভার বইতে পারি আমি।”
জেডির বেদনামিশ্রিত দু’চোখ বেয়ে নোনাজল গড়ায়। দুর্বল শরীরটা ধীরে ধীরে টেনে তোলে। আকাশের দিকে সামান্য এগিয়ে এসে আকাশের মুখেমুখি হয়ে বলে,
“তাহলে আমিও আমার সন্ধ্যাপ্রাণের জন্য বি’শ্বা’স’ঘা’ত’ক হতে পারি।”
আকাশ ঢোক গিলল। চোখদু’টোয় বড্ড ব্য’থা। এক বুকে কতশত আ’ঘা’ত! জেডি দু’হাতে চোখ ডলে বলতে শুরু করে,
“যে এভির দেখা পাবার আশায় আমি জে’লে বসে মাসের পর মাস গুনেছি। এভি আমার খোঁজ নিতে আসবে ভেবে প্রতিনিয়ত অপেক্ষা করেছি। অপেক্ষার প্রহর ফুরাতো না বলে কতশত অশ্রুকণা ঝরিয়েছি, সেই এভি আমাকে ভুলে আমার প্রাণকে নিয়ে কত সুখে সংসার করছিল!
একটা সময় এসে তুই, সৌম্য, সন্ধ্যাপ্রাণ সবাই আমাকে একেবারেই ভুলে গিয়েছিলি। কেউ আমাকে একটুও মনে রাখিস নি এভি। আমি কি তোদের জন্য কিছুই করিনি? কোনো কারণ ছাড়াই আমার উপর তোর আগে থেকেই এতোটা রা’গ আর ঘৃ’ণা জমেছিল যে, পরবর্তীতে আমার সাথে দেখা হওয়ার পরও আমার ব্যাপারে সামান্য একটু খোঁজও নিসনি। আমি খারাপ তা আমি জানি এভি। কিন্তু তুই লাস্ট সাত-আট বছরে মনুষ্যত্বের খাতিরেও আমার একটা খোঁজ নিস নি। আর ওই চার বছর, ম’রে গেছি নাকি বেঁচে আছি,, সেই খোঁজটাও নিস নি এভি।”
কথাগুলো বলে জেডি ডান হাতের বুড়ো আঙুল দ্বারা ডান চোখের নোনপানি ছিটকে ফেলে।
আকাশ মলিন মুখে জেডির দিকে চেয়ে আছে। মুখে রা নেই। মা তাকে যা বলেছিল, সেসবের সত্যতা সে পরে বুঝেছিল ঠিকই। কিন্তু সে জেডির উপর রা’গ, অভিমান করার পরও জেডিকে আর তার কাছে আসতে না দেখে দুঃখ পেয়েছিল খুব। খোঁজ নিয়ে জেনেছিল, জেডি ইংল্যান্ড চলে গিয়েছে। এটা শুনে আকাশের খারাপ লাগার পরিমাণ বাড়ে। এরপর সে জেডির নাম্বারে কল করলে, জেডির ফোন বারবার কে’টে দেয়া হতো। আকাশের ভীষণ খারাপ লেগেছিল। তার অভিমানের মাত্রা গাঢ় থেকে গাঢ় হলো। কিন্তু জেডি আর বাংলাদেশ আসলো না। আকাশ ভেবেছিল জেডি ইচ্ছে করে তাকে ইগনোর করছে। এজন্য সে একপ্রকার জেদ করেই জেডির আর খোঁজ নেয়নি। বুকে পুষেছিল পাহাড়সম অভিমান। একদিন যেই জ্যাকের পাশে কেউ ছিল না, জ্যাকের বাবা পর্যন্ত ছিল না। সেদিন সে নিজে একটা বাচ্চা হয়ে জ্যাকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছিল সেই জ্যাক তাকে ভুলে গিয়েছে ভেবে আকাশ যেমন ক’ষ্ট পেয়েছিল, তেমনি জ্যাকের একটা ফোনের অপেক্ষা করত। কিন্তু বছর ঘুরলেও সে জ্যাকের থেকে কোনো রেসপন্স পায়নি। সে ভেবেছিল, জ্যাকের ভালো অবস্থান হওয়ায় জ্যাক তাকে আর মনে করতে চায় না। তাই সে নিজেও আর জ্যাকের দিকে ফিরে তাকায়নি। কিন্তু তার ভাবনা সব ভুল ছিল। সে অভিমান করে প্রিয় বন্ধুর থেকে দূরে সরে থেকেছে। আর তার প্রিয় বন্ধু সূদূর ইংল্যান্ডের জে’লে বসে তার জন্য চোখের জল ফেলেছে। আকাশের নিজেকে ভীষণ অসহায় এক প্রাণী মনে হলো। সে যদি একবার জানতো, জ্যাক ওই ইংল্যান্ডের জে’লে। তবে সে এই বাংলাদেশের মাটিতে আর এক সেকেন্ডের জন্যও থাকতো না। কিন্তু এখানে ভাগ্য তাদের সহায় হয়নি।
জেডি ভাঙা গলায় বলে,
“আসলে আমি সবসময় তোর সাথে চিপকে থেকে থেকে সস্তা হয়ে গিয়েছিলাম। তাই আমার প্রতি তুই বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলি, এটা আমি পরে বুঝেছি।”
আকাশ বিস্ময় সাথে ধরা গলায় আওড়ায়, “জ্যাক?”
জেডি নিজেকে সামলে গলা ঝেড়ে বলে,
“জেনে হোক বা না জেনে হোক, আমার সাথে নি’ষ্ঠু’র’তার সূচনা তোরাই করেছিলি এভি। আমার লাইফে আমার সবচেয়ে আপন, সবচেয়ে প্রিয় মানুষ তোরা ছিলি। অথচ একটা সময় এসে তোরা সবাই আমাকে ভুলে গিয়েছিলি। তোদের কারো ভাবনায় আমার ছায়াটুকুও ছিল না।”
এটুকু বলে জেডি আবারও চোখ মুছল। আকাশ ঝাপসা চোখ আর ব্য’থাযুক্ত মন নিয়ে কেবল জেডিকে দেখে গেল। পিছনে দাঁড়ানো সন্ধ্যার চোখের বাঁধ থামে না। সে কেবল জেডি রূপী অধীরকে দেখে। সৌম্য’রও একই অবস্থা। প্রত্যেকে যেন অনুভূতিহীন হয়ে গিয়েছে।
জেডি আবারো বলে,
“তোদের সবাইকে সুখে সংসার করতে দেখে আমি থমকে গিয়েছিলাম। সীমাহীন দুঃখ পেয়েছিলাম। কি করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। বাবার বন্ধুকে সব খুলে বললে সে আমাকে জানায়, ‘তুমি চিন্তা কর না। আমি সব ঠিক করে দিব।’
আমি দিশেহারা পথিক ছিলাম। মাথা কাজ করছিল না তখনো। হঠাৎ খবর পেলাম, তুই ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ফিরছিস হেলিকপ্টার নিয়ে। আর বাবার বন্ধু আঙ্কেল আমার আড়ালে তোর হেলিকপ্টার ক্র্যাশ করিয়েছে। খবরটি পেয়ে মনে হলো, কাঁচা আ’ঘা’তপ্রাপ্ত জায়গায় আবারো ভ’য়া’নক ভাবে কেউ আ’ঘা’ত করল। ভাগ্যিস তখনো বাংলাদেশে ছিলাম। আমি ছুটে যাই সেখানে, যেখানে হেলিকপ্টার ক্র্যাশ হয়েছিল। সকলের আড়ালে তোর ক্ষ’ত’বি’ক্ষ’ত দেহ উদ্ধার করে বাংলাদেশেই তোর ট্রিটমেন্ট করাই। দু’দিনের মাথায় তোকে নিয়ে ইংল্যান্ড ব্যাক করি। তখনো আমার মাথায় কোনো প্লান ছিল না তোকে বাঁচানো ছাড়া। ইংল্যান্ড নিয়ে গিয়ে উন্নত চিকিৎসা করাই। তুই ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছিলি। তবে ডক্টর আমাকে জানায়, তোর রিসেন্ট কিছু স্মৃতি মুছে গিয়েছে। লাইক গত এক-দুই অথবা তিন বছরের স্মৃতি। তবে তোর স্মৃতি ধীরে ধীরে ফিরে আসবে। তখন আমার মাথায় প্লান আসে। আমি বুঝেছিলাম, তোর জ্ঞান ফিরলেও তুই সন্ধ্যাকে চিনতে পারবি না। এজন্য আমি ভাবি, তুই সন্ধ্যাকে চিনতে না পারলে, সন্ধ্যাকে অস্বীকার করলে, আমি আমার সন্ধ্যাপ্রাণকে পাবো। তাই তোর যেন ধীরে ধীরেও স্মৃতি না ফিরে আসে এজন্য ঔষধ দিতাম তোকে। সাথে তোর হার্টের কাছে একটি ডিভাইস সেট করিয়ে দিয়েছিলাম, যেন তুই কখন কি করছিস, সব খবর আমি পাই। এতে আমার কাজে গরমিল হত না।
এরপর তোকে অন্যলোকের দ্বারা ভুল বুঝিয়েছিলাম, সন্ধ্যা আর সৌম্য’র ব্যাপারে। সৌম্য তোর বাবাকে ছু’রি মা’র’ছে। এই ভিডিওটি আমি দু’টো লোক ভাড়া করে তাদের সৌম্য আর তোর বাবার মাস্ক পরিয়ে এক্টিং করিয়েছিলাম। এরপর সেটা তোকে সেন্ড করেছিলাম, যাতে তোর মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ না হয়। আর তুই যে ভিডিওগুলোর ফুটেজে নিজেকে দেখতি। অর্থাৎ তোর মায়েরা বলত, তুই তখন বাংলাদেশে ছিলি, কিন্তু তুই ফুটেজে দেখতি তুই ইংল্যান্ড। ওই ভিডিওগুলো এডিট করা। আসলে আমি ভার্সিটি লাইফ থেকেই টুকটাক মাফিয়া রিলেটের সাথে একটু-আধটু অ্যাড ছিলাম তুই জানতি। তবে আমি নিজের জন্য জায়গা তৈরী করার আগে তুই সেজে তোর স্বপ্ন পূরণ করতে চেয়েছিলাম। অর্থাৎ তোর ইংল্যান্ডের মাফিয়া কিং হওয়ার স্বপ্ন। তাই মাস্কসহ বিভিন্ন মেকাপ নিয়ে তুই সেজে ওই কাজগুলো করতাম। ইচ্ছে ছিল, কোনো একদিন তোকে সারপ্রাইজ দিব। কিন্তু তার মধ্যেই এতোসব ঝামেলা লেগে গেল। আর তোর সেই অবস্থানসহ ওই ফুটেজগুলো জমা থাকলো। এরপর তুই সুস্থ হলে তুই নিজেকে ইংল্যান্ডের মাফিয়া কিং হিসেবে দেখতে পাস। তোর কিছু মনে না থাকায়, তুই সন্দেহ করিস নি। তবে মাঝে মাঝে ডিস্টার্ব হতি, অভ্যেস না থাকায়। কিন্তু আমি ধীরে ধীরে ম্যানেজ করে নিয়েছিলাম।
এরপর তুই প্রতিটি কাজ আমার প্লান মাফিক করছিলি। বাংলাদেশে ফিরে সন্ধ্যাকে অস্বীকার করা থেকে শুরু করে সৌম্য’র সাথে রুড বিহেব। আমার ধারণা ছিল, তুই সন্ধ্যা, সৌম্যকে কখনো মনে করতে না পেরে ওদের আ’ঘা’ত করলে তুই, সন্ধ্যা আর সৌম্য’র মন থেকে উঠে যাবি। আর তোরও কখনো কিছু মনে পরবে না। আমি ভেবেছিলাম, আমার সন্ধ্যাপ্রাণ সাময়িক ক’ষ্ট পাবে। এরপর আর পাঁচজন মানুষের স্বামী মা’রা গেলে বা ছেড়ে দিলে তারা যেমন দ্বিতীয়বার সংসার করে, আমার সন্ধ্যাপ্রাণও আমার সাথে তেমনি দ্বিতীয়বারের মতো সংসার বাঁধবে। তোর বাচ্চাকেও আমি মা’র’তে চাইনি। প্রথমদিকে রা’গ হলেও পরবর্তীতে ভেবেছিলাম, সন্ধ্যাপ্রাণের সাথে ওই বাচ্চাকেও আমি নিয়ে নিব। আমার কোনো প্রবলেম নেই। কিন্তু হঠাৎ-ই কেমন সব উলটপালট লাগছিল। আমার প্লান প্রথমদিকে কাজ করলেও পরের দিকে কেমন যেন হচ্ছিল। হাজার চেষ্টা করেও সবশেষে যেন তোরা সেই এক সুতোয় আটকে যেতি। তখন আমি টার্গেট করি তোর বাচ্চাকে। আমার মনে হয়েছিল, সৃজনকে মা’র’লে আমার প্লান আবারো ঠিকঠাক কাজ করবে। তোরা কনফার্ম আলাদা হয়ে যাবি।”
এটুকু বলতেই আকাশ ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে জেডির নাক বরাবর একটা ঘুষি মা’রে। জেডির শরীর ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। আকাশ দু’হাতে জেডির হুডি শক্ত করে টেনে ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
“কু’ত্তা’র বাচ্চা। আমার র’ক্ত ও। ওকে মা’র’তে যাওয়ার আগে তোর বুক কাঁপেনি?”
জেডি একটু হেসে বলে,
“কাঁপেনি তো।”
কথাটা বলতেই আকাশ জেডির নাক বরাবর আরেকটি শ’ক্ত ঘুষি মে’রে দেয়। চিৎকার করে বলে,
“অ’মানুষ, অকৃতজ্ঞের চেয়েও অধম তুই।
এরপর একটু থেমে বলে,
আমার ভাই নিয়াজকে কেন মে’রেছিস তুই?”
জেডি মলিন মুখে তাকায় আকাশের দিকে। বলে,
“তোর একমাত্র ভাই তো আমি ছিলাম। নিয়াজ কবে তোর ভাই হলো?”
আকাশ বজ্র কণ্ঠে বলে,
“তোর মতো বে’ঈ’মানরা এই এভি’র ভাই তো দূর, কর্মচারী হওয়ার যোগ্যতা রাখিস না। বল, আমার ভাইকে কেন মে’রেছিস?”
জেডি গাছাড়াভাবে বলে,
“নিয়াজকে আমার কখনোই পছন্দ ছিল না। ও সবসময় তোর বন্ধু হতে চাইতো। আমাদের বন্ধুত্বের মাঝে ভাগ বসাতে চাইতো। তবুও ছেড়ে দিতাম। কিন্তু আজ তোর অপারেশন করালে ওখানে ৯৯.৯৯% ঝুঁকি থাকতো। ও এসব জেনেও এই সস্তা বাংলাদেশে সেই অপারেশন করতে চাইছিল। তাই ওই অ’সহ্যকর নিয়াজকে মে’রে দিয়েছি।”
আকাশ রে’গে জেডিকে ছুঁড়ে ফেলার মতো করে ধাক্কা দেয়। জেডি কয়েক পা পিছিয়ে যায়। আকাশ ফুঁসতে ফুঁসতে বলে,
“এসব ঢঙের দরদ নিজের মাঝেই রাখিস। নিয়াজ জানতো, আমি যে ক’ষ্টে ছিলাম এর চেয়ে ম’র’ণ ভালো। তাই সে শেষ চেষ্টা করছিল। আর তুই….
জেডি অসহায় কণ্ঠে বলে,
“আমি জানতাম না এভি, তোর স্মৃতি ফিরেছে। একবার যদি জানতাম, তোর স্মৃতি ফিরেছে আর তুই ক’ষ্ট পাচ্ছিস। তবে আমি হাড় মেনে নিতাম। আমি তো শুধু সন্ধ্যাপ্রাণকে পাওয়ার জন্য শেষ চেষ্টা….”
জেডি কথা থেমে যায় আকাশের থেকে সামান্য পিছনে ডানদিকে সরে দাঁড়ানো কান্নারত সন্ধ্যার দিকে চোখ পড়লে। সন্ধ্যা জেডির দিকেই চেয়ে। দু’জনের চোখাচোখি হলো। সন্ধ্যা দৃষ্টি সরালো না। ধীরপায়ে এগিয়ে আসে জেডির দিকে। আকাশের থেকে এক পা সামনে দাঁড়িয়ে জেডির দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বলে,
“আপনি আমার নিয়াজ ভাইয়াকে মে’রে ফেলেছেন?”
জেডি সন্ধ্যার দিকে চেয়ে ঢোক গিলল। সন্ধ্যার বিশ্বাস হয় না, তার নিয়াজ ভাইয়া ম’রে গেছে। নিয়াজ এমন একজন ব্যক্তি ছিল, যাকে সন্ধ্যা এমন কোনো বিপদ নেই যে সে নিয়াজকে তার পাশে পায়নি। সেই মানুষটা ম’রে গেছে? তাও আবার তার আর সৌম্য ভাইয়ার এককালের ভীষণ প্রিয় অধীর ভাইয়ার হাতে? সন্ধ্যা আবারো ভাঙা গলায় বলে,
“আমাদের অধীর ভাইয়া মানুষও খু’ন করতেও জানে? তুমি নিয়াজ ভাইয়াকে মে’রে’ছ অধীর ভাইয়া?”
জেডির বুকটা কেমন মুচড়ে উঠল। ঠিক কতগুলো বছর পর সন্ধ্যা তাকে আবারো অধীর ভাইয়া আর তুমি করে ডাকলো। জেডি’র চোখজোড়া ঝাপসা হয়।
পিছে দাঁড়ানো আকাশ পিঠ ফিরিয়ে রাখা সন্ধ্যার দিকে চেয়ে আছে। দৃষ্টিতে প্রাণ নেই। জেডিকে করা সন্ধ্যার সম্মোধনে বিন্দুমাত্র অবাক হয়নি সে। জেডি আর সন্ধ্যার ছোটবেলার প্রতিটি ঘটনা জেডি তাকে এতোবার বলেছিল যে, আকাশ একবার চোখ বুজলেই আজো ওদের দু’জনের কথোপকথন গড়গড় করে বলে দিতে পারবে। তার সন্ধ্যামালতী জ্যাকের প্রাণ কথাটি ভাবতেই আকাশের বুক ব্য’থার পরিমাণ বাড়তে লাগলো।
সন্ধ্যা এবার চেঁচিয়ে ওঠে,
“কি হলো, কথা বলছ না কেন?”
জেডি ঢোক গিলে ছোট্ট করে আওড়ায়, “মে’রে’ছি।”
সন্ধ্যার সহ্য হলো না। এই লোকটা তাদের সবার জীবন ধ্বং’স করার পথে নেমেছে তো নেমেছেই। তার ছেলেটাকেও কতবার মা’র’তে চেয়েছে। আর আজ তাদের নিয়াজ ভাইয়াকে একদম মে’রেই ফেলেছে। সন্ধ্যা জেডির দিকে তেড়ে যেতে নিলে পিছন থেকে সৌম্য দ্রুতপায়ে এগিয়ে এসে সন্ধ্যাকে দু’হাতের মাঝে আগলে নেয়। সন্ধ্যা ভাইয়ের বাঁধা পেয়ে শান্ত হয়। ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ওঠে। নিয়াজ ভাইয়া নেই, এটা সে কি করে মেনে নিবে? গতকালকেই তাকে নিয়াজ বলেছিল, আর দু’টো দিন অপেক্ষা করতে। তাহলে না-কি সব ঠিক হয়ে যাবে। সব ঠিক করতে গিয়ে নিয়াজ ভাইয়া তার জীবনটাই দিয়ে দিল?
সৌম্য’র দৃষ্টি জেডির দিকে। জেডি’র দৃষ্টি সৌম্য’র দিকে। সে সৌম্য’র দিকে চেয়েই বলে,
“নি’য়া’জকে মে’রেছি। সৌম্য’র ইরাবতীর মুখে এ’সি’ড ছুড়ে দিয়েছি, গু’লি করে মে’রে ফেলতে চেয়েছি। সৌম্য’র স্বপ্নের বাড়ি কে’ড়ে নিয়েছি। সৌম্য’র কপালে একটা ছোটখাটো চাকরি তো দূর, টিউশনটাও ঠিক করে করতে দিইনি। সবশেষে সৌম্য’র নামে মা’ম’লা ঠুকে জে’লে ঢুকিয়েছি।”
সৌম্য পাথরের মতো দাঁড়িয়ে তার নি’ষ্ঠু’র অধীর ভাইয়াকে দেখল। সে যে অধীর ভাইয়াকে চিনতো। সে ছিল স্বচ্ছ। মনমানসিকা ছিল শুভ্র রঙের মতো সফেদ। যে মানুষকে আ’ঘা’ত নয় শুধু ভালোবাসতে জানতো। সেই চেনা অধীর ভাইয়ার কত অধঃপতন হয়েছে। নিজের চাওয়া পূরণ হয়নি বলে তাদের প্রত্যেকের সাথে দিনের পর দিন নোং’রা খেলা খেলেছে। মানুষ খু’ন করেছে। আর সে বোকার মতো ভাবত, তার অধীর ভাইয়া বেঁচে থাকলে তাকে দুঃখ ছুঁতে পারতো না। অথচ গত চারবছরে তার জীবনের সকল দুঃখ তার অধীর ভাইয়াই তাকে দিয়েছে। সৌম্য’র সারা শরীরে অসহনীয় ব্য’থা ছুটোছুটি করছে। সে জেডির দিকে চেয়ে প্রাণহীন হেসে বলে,
“অথচ আমি ভাবতাম, আমাদের অধীর ভাইয়া বেঁচে থাকলে আমাদের জীবন থেকে দুঃখ নামের অধ্যায় মুছে যেত। কত বোকা আমি!”
জেডি’র টইটুম্বুর হয়ে আসা চোখ দু’টো থেকে টুপ করে জল গড়াতে নেয়, তার আগেই জেডি দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় ডানদিকে৷
সন্ধ্যা নিজেকে সামলায়। আসমানী নওয়ান কোথায় এ নিয়ে তার আগে থেকেই চিন্তা হচ্ছিল। সাথে সন্দেহ। কারণ আসমানী নওয়ান তাকে কিছু বলতে চেয়েছিল। আর উনি সেদিন ভীষণ বিধ্বস্ত ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, তার আম্মা তাকে সন্ধ্যা বলে ডাকে না। আর আজ অধীরের মুখে সব শুনে তার সিওর মনে হচ্ছে, অধীরই জানে আসমানী নওয়ানের খোঁজ। সন্ধ্যা তার ভাইয়ের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে অধীরের দিকে চেয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“আমার আম্মা কোথায়?”
কথাটা শুনে জেডি চোখ বুজল। সময় না নিয়ে সহজ গলায় বলে,
“বাগানের শেষ মাথায় তার ক’ব’র।”
কথাটা শুনে আকাশ, সৌম্য, সন্ধ্যার তিনজনের মাথার উপর যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো। স্তব্ধ হয়ে যায় তিনজনেই। আসমানী নওয়ানের ক’ব’র মানে? তিনি আর বেঁচে নেই? কেউ কিছু বলার আগে জেডি নিজেই বলে,
“আমার ব্যাপারে সব জেনে গিয়েছিল। তাই মে’রে দিয়েছি।”
জেডির বলা পরবর্তী কথায় সকলে বোধয় কিছুসময়ের জন্য বোধ হারিয়ে ফেললো। সন্ধ্যা বহুক’ষ্টে নিজেকে সামলায়। এক সেকেন্ডও সময় ন’ষ্ট না করে বাগানের উল্টোদিকে একপ্রকার দৌড় লাগায়। পা চলছে না। মাথাটা ভনভন করে ঘুরছে। দু’চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে।
সন্ধ্যার পিছু পিছু আকাশ আর সৌম্যও বড়বড় পায়ে এগোয়। দু’জান পাশাপাশি হাঁটছে, তবে মাঝখানে অনেকটা ফাঁকা। দু’জনের মাথায় আসমানী নওয়ান ছাড়া আপাতত কেউ নেই। সন্ধ্যার পর পর আকাশ আর সৌম্য’ও বাগানের শেষ মাথায় এসে পৌঁছায়। চোখ পড়ে, এক কোণায় ক’ব’রের মতো মাটি উঁচু করে রাখা। ক’ব’রের এক মাথায় একটি খেজুর গাছ গেড়ে দেওয়া।
সন্ধ্যা কাঁদতে কাঁদতে ক’ব’রের মাথায় বসে পড়ে। তাদের মাথার উপর থাকা বট গাছটা না-কি এই মাটির নিচে শুয়ে আছে। তাকে বলা আসমানী নওয়ানের শেষ কথাগুলো বারবার কানে বাজছে। তার গালে হাত দিয়ে বলেছে, তাকে সাহসী জান্নাত হয়ে বাঁচতে। তার আম্মার একেকটা কথা কত দামী ছিল৷ তার দুঃখী জীবনে, তার ভাইয়ের পর তার আম্মাই একমাত্র তাকে বুকে জড়িয়ে নিত। কত আদর-ভালোবাসায় মুড়িয়ে রাখতো। সেই মানুষটা হারিয়ে গেছে। সন্ধ্যা কাকে আম্মা বলে ডাকবে? তার মাথায় মায়ের মতো আর কে হাত বুলিয়ে দিবে? সে না খেলে তাকে কে শাসন করবে? সন্ধ্যার বুকটা হু হু করে ওঠে। কাঁদতে কাঁদতে করুণ সুরে আওড়ায়,
“আম্মা? তুমি কোথায় চলে গেলে আমাদের রেখে? তোমার সৃজন দাদুভাই তোমাকে ছাড়া কি করে থাকবে আম্মা?”
বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
আকাশ পাথরের মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি ওই উঁচু ক’ব’র টার দিকে। বারবার মনে পড়ছে মায়ের সাথে শেষবার দেখা হওয়ার দৃশ্য। যখন সে বাড়ি এসেছিল। শিমুকে জিজ্ঞেস করছিল সন্ধ্যার কথা। তখনই তার মা রুম থেকে বেরোচ্ছিল। কিন্তু তাকে দেখে তার মা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। আর বেরোয়নি রুম থেকে। সেটাই ছিল আকাশের সাথে তার মায়ের শেষ দেখা। তার মা তার উপর বড্ড রা’গ, অভিমান পু’ষে, বুকে শতশত য’ন্ত্র’ণা চেপে এই দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেছে। সে পারেনি তার মায়ের কাছে ক্ষমা চাইতে। পারেনি তার মায়ের ভুল ভাঙাতে। পারেনি মায়ের অভিমান ভাঙাতে। আকাশের র’ক্ত’লাল দু’চোখ ফেটে নোনাপানি গালে গড়িয়ে পড়ে।
সৌম্য বারবার ঝাপসা চোখজোড়া পরিষ্কার করছে ডান হাত দ্বারা। আসমানী নওয়ান তার বাড়ি গেলেই বলত,
‘সৌম্য, মায়ের বাড়ি ফিরবে না আব্বা?’
সৌম্য বরাবর চুপ থাকতো। আসমানী নওয়ান সৌম্য’র মাথায় মায়ের স্নেহের হাত বুলিয়ে চুমু খেয়ে বলত,
‘দোয়া করি আব্বা। আবারো সব আগের মতো হোক। আমার ছেলেমেয়েরা আবারো এক হোক।’
আসমানী নওয়ান এমন আরও কত আদরমাখা, দোয়ায় ভরা কথা বলত। সব বুঝি স্মৃতি হয়ে গেল? মাকে হারিয়ে ভেবেছিল, আরেকটা মা পেয়েছে। অথচ আবারো ভাগ্য তাদের সাথ দিল না।
সন্ধ্যা ধীরে ধীরে নিজেকে সামলায়। এরপর হঠাৎ-ই ক’ব’র পাড় থেকে দাঁড়িয়ে যায়। উল্টোঘুরে দৃঢ় পায়ে এগিয়ে আসে জেডির দিকে। যে সন্ধ্যাদের পিছু পিছু এখানে এসে দাঁরিয়েছিল। সন্ধ্যাকে নিজের দিকে আসতে দেখে জেডি দ্রুত ঝাপসা চোখজোড়া মুছে নেয়। সন্ধ্যা জেডির সামনাসামনি এসে দাঁড়ায়। টকটকে লালিত চোখ দু’টো জেডির চোখে নিবদ্ধ রেখে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“তোকে আমি এতোটাই ঘৃ’ণা করি, যেই ঘৃ’ণা পরিমাপ করা আল্লাহ ছাড়া আর কারো পক্ষে সম্ভব না।।”
কথাটা বলে সন্ধ্যা একদলা থুতু জেডির মুখে নিক্ষেপ করে। জেডি এটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। অবাক হলো ভীষণ। কিন্তু সে নির্বিকার চিত্তে সন্ধ্যার রাগান্বিত মুখপানে চেয়ে রইল। কেন যেন কান্না পাচ্ছে ভীষণ। চোখজোড়া ভিজলও। তবে সে নির্বিকার এক ধ্যানে চেয়ে রইল। সন্ধ্যা আবারো রূঢ় কণ্ঠে বলে,
“পাপে পাপে পথ যে ভরে
শেষে পাপই গিলে ধরে।
সময় কারো বন্ধু নয়
ভালো মন্দ সবই কয়।
আজ হাসছো তুমি সুখের ঘোরে,
কাল কাঁদবে সময়ের ডোরে।”
কথাটা বলে সন্ধ্যা আর দাঁড়ায় না। ডানদিকে ফিরে দৃঢ় পায়ে হাঁটতে থাকে। দু’চোখ বেয়ে নোনাজল গড়াচ্ছে। এমনদিন কেন এলো, যেদিনে দেখতে হচ্ছে, তার প্রিয় অধীর ভাইয়া তার প্রিয়মানুষদের একে একে হ’ত্যা করছে! এর চেয়ে তো ছোটবেলায় অধীর মা’রা গেলেই ভালো হতো।
আকাশ জেডির দিকে তাকিয়ে ডান হাতের বুড়ো আঙুল দ্বারা একফোঁটা পানি ছিটকে ফেলে। র’ক্তলাল চোখদু’টো থেকে মনে হলো আ’গু’নের ফু’ল’কি ঝরছে। সে ডানদিক থেকে একটি গাছ থেকে, গাছের মোটা ডাল চাড়া দিয়ে ভাঙল। এরপর সেটি হাতে নিয়ে বড় বড় পায়ে জেডির দিকে এগোয়। ক’সেকেন্ডের মাথায় জেডির সামনে এসে চোখের পলকে গাছের মোটা ডালটি দ্বারা জেডির ডানদিকে সর্বশক্তি দিয়ে আ’ঘা’ত করে। জেডির মাথা নিচু ছিল। হঠাৎ আক্রমণে সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। আকাশের শ’ক্ত আ’ঘা’তে সে একদম উল্টে পড়ে যায় কয়েকহাত দূরে। আকাশ এগিয়ে গিয়ে বা হাতে জেডিকে টেনে তুলে ডান হাতের গাছের ডাল দ্বারা জেডির বাম গাল গাল আর ঘাড় বরাবর আ’ঘা’ত করে। সে একেবারে তিনবার উল্টে যায়। এবারের মা’র’টার জন্যও জেডি প্রস্তুতি নিতে পারেনি৷ মুখ দিয়ে র’ক্ত বেরিয়ে আসে। খুকখুক কেশে ওঠে জেডি।
ওদিকে প্রথমবার মা’রের শব্দ পেয়েই সন্ধ্যা উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। অধীরকে এভাবে মা’রতে দেখে সন্ধ্যা দু’হাতে মুখ চেপে ফুঁপিয়ে ওঠে। দ্বিতীয় মা’রে অধীরের মুখ থেকে র’ক্ত পড়তে দেখে সে আর সৌম্য দু’পাশ থেকে অধীরের দিকে আসতে নেয়। কিন্তু দু’পা এগিয়ে দু’জনেই থেমে যায়। মনে পড়ে, অধীরের করা কার্যকলাপের কথা। দু’ভাইবোন দু’পাশে শ’ক্ত পাথরের ন্যায় দাঁড়িয়ে যায়। ভেজা চোখে আ’হ’ত অধীরের পানে চেয়ে থাকে।
ওদিকে আকাশ এগিয়ে এসে মাটিতে শয়নরত অধীরকে হাতের ডাল দ্বারা দু’দিক থেকে সমানে মা’র’তে থাকে। জেডির পরনের হুডি টেনে খুলে ছুড়ে ফেলে আকাশ। তার ভস্ম করা দৃষ্টি জেডির পানে।
ইতোমধ্যে জেডি’র মুখ থেকে অজস্র র’ক্ত বেরিয়েছে। পরনের শার্ট র’ক্তে ভিজে গিয়েছে। কিন্তু আজব করা ব্যপার জেডি হাসছে। র’ক্তে মাখামাখি, ক্লান্তিতে ভরা মুখে প্রাণখোলা হাসি হাসছে। আকাশকে একবারো বাঁধা দিচ্ছে না।
আকাশ র’ক্তমাখা গাছের ডালটি ছুড়ে ফেলে দু’হাতে জেডির শার্টের কলার টেনে ধরে। এখনো ভস্ম করা দৃষ্টি জেডির পানে। কিন্তু জেডি হাসছে। ধীরে ধীরে তার শরীরটা নেতিয়ে আসছে।
আকাশ অ’সহ্যকর অনুভূতি নিয়ে ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে জেডির র’ক্তা’ক্ত মুখ বরাবর আরও দু’টো ঘু’ষি মা’রলো। হাতের কাছে মাটিতে গেড়ে রাখা একটি চা’কু পেয়ে, আকাশ তার ডান হাতের মুঠোয় চা’কুটি নিয়ে নেয়। জেডির দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে চেয়ে জেডির বুক বরাবর গেঁথে দেয়ার জন্য ঝড়ের গতিতে চা’কুটি জেডির বুকের দিকে নিয়ে যায়। চা’কুটি জেডির বুক ছুঁইছুঁই হতেই আকাশের হাত থেমে যায়। জেডি আকাশকে থেমে যেতে দেখে মলিন হাসে। নেতিয়ে যাওয়া র’ক্তে মাখামাখি শরীর নিয়ে অস্পষ্ট ভাঙা স্বরে বলে,
আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৩
“থেমে গেলি কেন? আমি অপেক্ষা করছিলাম।”
জেডির বিধ্বস্ত মুখাপানে ব্য’থাতুর নয়নে চেয়ে আছে আকাশ। চা’কু ধরে রাখা হাতটি থরথর করে কাঁপছে। চোখের কোণে নোনাজল। বা হাতে জেডির সারামুখে লেপ্টানো র’ক্ত মুছে দিয়ে ধরা গলায় বলে,
“জানিস জ্যাক, তোকে আমি ছোট থেকে যতটা আদর, ভালোবাসা দিয়েছি,, তার ৯০ ভাগের এক ভাগ আদর-ভালোবাসাও আমি আমার সৃজনকে দিতে পারিনি। সেই তুই…..
আকাশের চোখ থেকে টুপ করে করে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। একই সাথে জেডির চোখ থেকেও দু’ফোঁটা নোনাজল গড়ালো।
