Home আমি তার সন্ধ্যামালতী আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ৩০

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ৩০

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ৩০
DRM Shohag

“হেই অরুণ! কি অবস্থা তোর? জানি ভালো নয়। ভালোবাসার মানুষকে অন্যকেউ রে’প করে, তাকে দুনিয়া থেকে বিদায় দিলে, প্রেমিক হিসেবে তা মেনে নেওয়া খুব কঠিন। আমি জানি ভাই। সাথে এটাও জানি, কারো ছোট বোনকে ধ’র্ষ’ণ করলে, তার বড় ভাইয়েরও মারাত্মক ক’ষ্ট হয়। কি ভাবছিস? অনামিকার বড় ভাই কোথা থেকে আসলো? ওরও একটা বড় ভাই ছিল অরুণ। শুধু তুই জানতি না।
একটা মজার কাহিনী শুনবি? কাহিনীটা আমার জন্য দুঃখের হলেও তোর জন্য মজার-ই হবে। আমার দুঃখে তুই অরুণ সবচেয়ে বেশি খুশি হয়ে থাকিস, এ কথা তো নতুন নয়। আজ যদি অনামিকা বেঁচে থাকতো, তবে তুই ফাটিয়ে ইঞ্জয় করতে পারতি।

আমার উপর তোর খুব রা’গ, তাই না অরুণ? কেন এতো রা’গ? আমি অনামিকার ধ’র্ষ’ক বলে?, আমি অনামিকাকে মে’রে ফেলেছি বলে? উমম, শুধু রা’গ না। একদম মে’রে ফেলতে ইচ্ছে করে আমাকে, তাই না? মজার ব্যাপারটা হলো, তোকে আর ক’ষ্ট করে আমাকে মা’র’তে হবে না। আমি নিজেই ম’রে যাওয়ার হাজারখানা ব্যবস্থা করেছি। যাকে বলে একদম পিওর ব্যবস্থা। এদিক-ওদিক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একটু খুশি করতে পারলাম কি তোকে? একটু না, অনেকটাই খুশি করতে পেরেছি, তাই না?
এসব থাকুক, যা বলছিলাম। কাহিনীটা তবে শুরু করি, কি বলিস!

তুই আমার এমন এক বন্ধু ছিলি, যে আমার ভালো দেখলেই জ্ব’লে’পু’ড়ে একেবারে খাক হয়ে যেতি। আমার প্রতি তোর এতোটাই বি’তৃষ্ণা ছিল যে, তুই এভিজানের মায়ের সাথে প্ল্যান করে এভি’র বাবার মিথ্যে মৃ’ত্যুর মিথ্যে অপবাদ আমার উপর চাপিয়ে দিয়েছিলি। অর্থাৎ তোরা দু’জন এভিকে বুঝিয়েছিলি, আমি না-কি এভিজানের বাবাকে মা’র’তে চেয়েছি। যদিও এভির বাবাকে আমার পছন্দ ছিল না, কিন্তু তাকে আমি মা’র’বো কেন বল তো? এভি দুঃখ পাবে এমন কাজ আমি জ্যাক বরাবরই এভোয়েড করতাম। আর তোরা কতবড় মিথ্যে অ’প’বা’দ আমার উপর দিয়ে দিয়েছিলি। মিসেস আসমানী নওয়ান আমায় ভীষণ অ’পছন্দ করত, তার দিক থেকে এমন বিহেব আমি মানতে পারলেও তোর থেকে এরকম বিহেব মানতে পারছিলাম না। তুই জানতি, আমি এভিজানকে নিয়ে কত সিরিয়াস ছিলাম। অথচ আমার সাথে সামান্য হিং’সা করতে গিয়ে তুই আমার আর এভিজানের মাঝে কতবড় ফাটল তৈরী করেছিলি অরুণ!

আমি ভেবেছিলাম, তুই উপরে উপরে আমাকে দেখতে না পারলেও, ভেতরে ভেতরে আমাকে একটু হলেও বন্ধু ভাবিস। ঠিক যেমনটা আমি তোকে ভাবতাম। তুই বরাবরই ভাবতি, আমি তোকে আমার শ’ত্রু মনে করি। অথচ এভির পরে তুই-ই আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিলি অরুণ। কিন্তু আমি তোর বন্ধু কখনোই ছিলাম না।
তুই কি জানিস অরুণ, একদিক থেকে বিবেচনা করলে, আমি আমার সন্ধ্যাপ্রাণকে হারানো আর আমার সন্ধ্যাপ্রাণ এভিজানের বউ হয়ে যাওয়া, এসবের পিছনে আমার বাবার পাশাপাশি আসমানী নওয়ান আর তুই-ও সমানভাবে দোষী। তোরা যদি সেদিন আমার উপর মিথ্যে অ’প’বা’দ না দিতি, তাহলে আমার আর এভিজানের মাঝে কোনো ঝামেলা হত না। আমি আমার বাবাকে অনিচ্ছাকৃতভাবে মা’র’লেও আমাকে এতোবছর জে’লে কা’টা’তে হত না। কারণ এভিজান আমার পাশে থাকতো, আর ও আমাকে একদিনও জে’লে কা’টা’তে দিত না। কিন্তু তোরা আমাদের মাঝে একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরী করে দেয়ায় এভিজান আমার উপর অভিমান করে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিল। আমাকে ছাড়া বিয়েও করে নিল, তাও আবার আমার-ই প্রাণকে। আমি জানি, এভিজান যদি জানতো সন্ধ্যা-ই আমার প্রাণ, তবে ও কখনোই আমার সন্ধ্যাপ্রাণকে বিয়ে করত না। বছরের পর বছর এভিজান যেভাবে আমার জন্য আমার সন্ধ্যাপ্রাণকে খুঁজে বেড়াতো, আবারো সেভাবেই আমার সন্ধ্যাপ্রাণকে আমার জন্য আগলে রাখতো। কিন্তু এসবের কিছুই হলো না। তোর হিং’সা আমার বুক থেকে আমার প্রাণকে কে’ড়ে নিয়েছে অরুণ। আল্লাহ তোর মতো বন্ধু কাউকে না দিক। কিন্তু মজার ব্যাপার কি জানিস? তোর মতো বে’ঈ’মা’ন বন্ধুর জন্য আমি পাহাড়সম সুখের আয়োজন করেছিলাম।

জে’ল থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশে আসার পর অনামিকার সাথে আমার খুব সুন্দর একটি সম্পর্ক তৈরী হয়েছিল। যাদের কেউ থাকে না, তারা যেকোনো সম্পর্কের ভীষণ লোভী হয়। আমার তো তেমন কেউ ছিল না। যখন দেখলাম একটি মেয়ে নিঃশব্দে আমার ছোট বোনের আবদার নিয়ে আমার কাছে আসছে। আমি তো সম্পর্ক গড়ে তোলার লোভী। তাই আমি খুশি হয়ে তাকে সুযোগ দিলাম। আর তারপর হুট করেই আমাদের মাঝে ভীষণ সুন্দর একটি ভাইবোনের সম্পর্ক তৈরী হয়ে গেল। হঠাৎ একদিন জানতে পারলাম তোর আর অনামিকার কাহিনী। কথাটা জানার পর প্রচন্ড রা’গ হয়েছিল, কারণ তোর মতো বে’ঈ’মা’ন কেন আমার পাতানো বোন অনামিকার ভালোবাসার মানুষ হতে গেলি?

খোঁজ নিয়ে দেখলাম, তুই তখনো অনামিকার জন্য দেবদাস৷ ইচ্ছে করল, তোর ভালোবাসাকে একেবারে জ্য’ন্ত পুঁ’তে দিতে। কারণ আমার প্রাণকে হারানোর পিছনে তুই-ও শতভাগ দায়ী৷ কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, তোর ভালোবাসার মানুষ ততদিনে আমার বোন হয়ে গিয়েছে। আমি আমার বোনকে কিভাবে মা’র’বো? দেখলাম অনামিকা তোকে নিয়ে ভীষণ সিরিয়াস। আমি ভাই হয়ে কি করে ওর ভালোবাসা আলাদা করতাম? যে দুঃখ, ক’ষ্ট আমি বছরের পর বছর পুহিয়েছি, সেই দুঃখ, ক’ষ্ট আমি আমার বোনটাকে কিভাবে দিতাম? তোর উপর আমার বহুত ক্ষো’ভ অরুণ। কিন্তু তোকেই বা এতো দুঃখ দিতাম কিভাবে? হাজার হোক, তুই আমার বন্ধু। আরে জানি জানি, আমি তোর কেউ না। কিন্তু তুই তো আমার বন্ধু-ই ছিলি। আর তাই আমি তোদের আলাদা করার বদলে তোদের মধ্যকার ঝামেলা মেটাতে চাইলাম। অনামিকাকে বোঝালাম, তুই সত্যিই অনামিকাকে ভালোবাসিস।

তোর সব খবরাখবর অনামিকাকে দিতাম। অনামিকা যখন দেখল, তুই সত্যিই অনেক বদলে গিয়েছিস, মেয়েদের থেকে অনেক ডিস্টেন্স তৈরী করে চলিস, অনামিকাকে নিয়ে ভাবতেই তোর দিন যায়, তখন সে তোকে চেয়ে বসে আমার কাছে। সবকিছু ঠিক করে দিতে বলে। আমি নিঃশব্দে তার আবদার মেনে নিই। তোদের এক হওয়ার জন্য হাজারটা রাস্তা খুলে দিই। তোদের বিয়ের জন্য রিসিপশন ঠিক করি। অনামিকা আর তোর জন্য আমার পছন্দ অনুযায়ী বিয়ের মার্কেট পর্যন্ত করি। তোরা একসাথে গিয়ে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী মার্কেট করবি বলে সব ব্যবস্থা করে রাখি। অনামিকা মা’রা যাওয়ার আগেরদিন আমি এসবই অনামিকাকে জানাই৷ অনামিকাও আমার উপর ভীষণ খুশি ছিল।

গত ক’মাসে তোর আর অনামিকার জন্য একটি দোতোলা বাড়ি বানিয়েছিলাম। বড় ভাই হিসেবে বোনের বিয়ে উপলক্ষ্যে বাড়িটি বোনকে গিফ্ট করতে চেয়েছিলাম। শুধু এই বাড়িটার কথা অনামিকাকে বলা হয়নি। ওকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম তোদের বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেলে তোদের দু’জনকে একসাথে নিয়ে গিয়ে সারপ্রাইজ দিব। কিন্তু সে সুযোগ আর হলো কই? আমার সারপ্রাইজ রিভিল করার আগেই অনামিকা আমিসহ আমাদের সবাইকে সারপ্রাইজ দিয়ে একেবারে দুনিয়া থেকেই বিদায় নিয়ে চলে গেল।

কি ভাবছিস? অনামিকার বড় ভাই কখনোই অনামিকার ধ’র্ষ’ক হতে পারেনা, তাই তো? তাহলে আমি কেন এসব মিথ্যে ভার মাথায় নিলাম? প্রশ্নের উত্তর খুব সহজ। তোর হাতে যখন আমার এই চিঠি পৌঁছাবে, তখন তুই আমাকে বাঁচাতে ছুটে আসবি, আর আমি তো বাঁচতে চাইনা অরুণ। তোদের কাছে অ’প’রা’ধী না হলে তো তোরা এতো সহজে আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতি না। আর তখন আমার ম’রে যাওয়া মুশকিল হয়ে যাবে৷ কারণ আমি অনমিকা থেকে শুরু করে আসমানী নওয়ান, ডক্টর নিয়াজ, রিহান কাউকেই মা’রি’নি। এসব জানার পর তোরা দয়া করে আমাকে বাঁচতে দিবি, আমি জানি৷ কিন্তু আমার তো মৃ’ত্যু প্রয়োজন। ভীষণ প্রয়োজন। আর তাই এতকিছু করলাম। আমার ছোট বোনের রে’পি’স্ট না-কি আমি! কথাটা কতটা ঘৃ’ণি’ত তুই বুঝতে পারছিস অরুণ?

সবার মৃ’ত্যুর ভাড় বইতে যতটা না ক’ষ্ট হয়েছে, তার চেয়ে কয়েকহাজারগুণ বেশি ক’ষ্ট হয়েছে বোনের নামে এসব মিথ্যে ভাড় বইতে। জানিস অরুণ, অনামিকাকে নিয়ে কথাটা এভিকে বলার পর আমার মনে হচ্ছিল, আমি নিজের শরীরের চামড়া নিজেই ছিঁলে লবণ লাগিয়ে দিই। আমার পুরো শরীর ঘৃ’ণায় রি রি করছিল। এতোকিছুর পরও আমি এই বি’শ্রী অপবাদ নিজের উপর কেন নিয়েছিলাম জানিস? কারণ আমার যেকোনো মূল্যে মৃ’ত্যু প্রয়োজন। এই যে আর একটু পর তোর বন্ধুর ছেলে সৃজনকে নিয়ে খেলবো, এভিজান অতিষ্ঠ হয়ে যাবে। এতোগুলো অন্যায়, অ’প’রা’ধের দায় প্লাস এতোগুলো মানুষের খু’নি, সর্বশেষে সৃজনের খু’নি হতে চাইলে এভিজান আমাকে না মে’রে কোথায় যাবে বল? অবশেষে আমি এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছি। এটাই ছিল তোর জন্য সবচেয়ে বড় খুশির খবর। ওহ হ্যাঁ, আরেকটি খুশির খবর হলো,, এভিজান আমাকে আর ভালোবাসে না অরুণ, প্রচন্ড ঘৃ’ণা করে। যেটা তোর বহুবছরের মনের বাসনা ছিল, অবশেষে তুই জিতে যাচ্ছিস। এবার খুশি হয়েছিস তো অরুণ? জানি, আমার এই পরিণতিতে তুই অরুণ সবচেয়ে বেশি খুশি৷

যদি অনামিকা আমার বোন হওয়ার আগে আমি জানতে পারতাম, অনামিকা তোর ভালোবাসার মানুষ, অথবা তোর ভালোবাসার মানুষ অনামিকা না হয়ে যদি অন্যকেউ হত, তবে তার জায়গা এই জমীনে হত না অরুণ। আমি জ্যাক অনামিকার চেয়েও তার করুণ পরিণতি করতাম। পুরো পৃথিবীর মানুষকে সাক্ষী রেখে তোর ভালোবাসার মানুষের গায়ে ক’ল’ঙ্ক লাগিয়ে দিতাম। আর তারপর আমি জ্যাক পৃথিবীকে সাক্ষী রেখে তোর ভালোবাসার মানুষকে জী’ব’ন্ত ক’ব’র দিতাম। তাহলে এই পৃথিবীতে কোনো বন্ধু তোর মতো বে’ঈ’মা’নী করার আগে একহাজারবার ভাবতো।
কি ভাবছিস? আমি এতো খারাপ কেন? আমি জানি তুই এই মুহূর্তে এটাই ভাবছিস। আর আমি এটা লিখছি আর তোর ভাবনার কথা চিন্তা করে হাসছি। আমি মাফিয়া কিং জ্যাক ডাল্টন। আমাকে ভালো মানুষ ভেবে ভুল করার কোনো প্রয়োজন নেই অরুণ। তুই মাঝে মাঝে আমার নামে অনেক কিছু বলে এভিজানের কান ভাঙাতিস। যার মধ্যে একটি ছিল,

‘জেডি ভালো মানুষ নয়।’
হাহ্! তোর এই কথাটা চরম সত্য অরুণ। আমি মানুষটা ভালো নই। আমি মানুষের সাথে পা’ষ’বি’ক আচরণ করতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করিনা, কখনো করিওনি। এই যেমন সৌম্য’র বন্ধু রিহান আমার কাছে এক সপ্তাহ ছিল। খোঁজ নিলে বুঝতে পারবি, এক সপ্তাহে ওকে কোন জা’হা’ন্না’ম থেকে ঘুরিয়ে এনেছি। এটা তো হওয়ারই ছিল। ও আমার সন্ধ্যাপ্রাণের দিকে নজর দিয়েছিল। ওকে কি করে ছেড়ে দিই বল তো? ভাবলাম মে’রে দিব। কিন্তু এখানে আরেকটি মজার ব্যাপার আছে। আর সেটা হলো, আমি নির্দিষ্ট কয়েকজন মানুষের প্রতি পা’ষ’বি’ক আচরণ করতে পারিনা। ঠিক যেমন অনামিকা আমার ছোট বোন বলে, তাকে তার ভালোবাসা ফিরিয়ে দিতে হাজারটা ব্যবস্থা করেছি। যদিও জানি, আমার নামে বন্ধু অরুণ একটা নি’মো’ক’হা’রা’ম।

ওদিকে সৌম্যকে বি’শ্বা’স’ঘা’ত’ক জেনেও ওকে পুরোপুরি ধ্বং’স করতে পারিনি। আর সেই একই কারণে, সৌম্য’র বন্ধু রিহানকেও ছেড়ে দিতে হলো। সৌম্য আমার ছোট ভাই। আমি আমার বন্ধু এভিজানকে হারানোর ব্য’থা পেলেও, আমার ছোট ভাই সৌম্যকে সেই ব্য’থা দিতে চাইনি। ঠিক যেমন এভিজান আমার প্রাণকে বিয়ে করার পরও ওর প্রাণ কাড়তে পারিনি। তুই আর আসমানী নওয়ান ইনডিরেক্লি আমার প্রাণকে কে’ড়ে নেয়ার পরও তোদের ক্ষ’তি করতে পারিনি। যাদের জন্য আমার জীবন আজ ন’র’ক তারা প্রত্যেকেই একই সূত্রে গাঁথা, যে সূত্র-টুকুই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে আপন। তাদের ধ্বং’স করতে আমি বারবার ব্যর্থ হয়েছি। সবশেষে হার মেনে নিয়ে এই দুনিয়ার মাঠ থেকে পরাজিত সৈনিক এর ন্যায় বিদায় নিচ্ছি।

তোকে একটা সিক্রেট বলি,
রিহান যদি আবারো আমার সন্ধ্যাপ্রাণের দিকে চোখ তুলে তাকায়, সেদিন-ই ওর মৃ’ত্যু হবে। কি ভাবছিস? আমি ম’রে গেলে রিহানকে কে মা’র’বে? যদি সত্যিই এটা ভেবে থাকিস, তবে আমি একটু হেসে নিই।
আমি জ্যাক ডাল্টন কাঁচা কাজ করিনা। আর এজন্যই আমার কাছের মানুষ এভিজান এতো চেষ্টা করেও আমাকে ধরতে পারেনি৷ আমি মা’রা গেলেও আমার ছায়া তোদের পিছু ঘুরঘুর করবে, যতদিন তোরা বাঁচবি। আর এটা আমার বুদ্ধির পাওয়ার। ধীরে ধীরে বুঝতে পারবি।
শেষ একটি কথা,
যে বাক্সে খন্ডিত করা ম’র’দে’হ দেখতে পাচ্ছিস, এ একজন ড্রাইভার। যে গাড়িতে অনামিকা রে’পড হয়েছে, সেই গাড়ির ড্রাইভার ছিল লোকটা। আমি তাকে মে’রে তোকে ছোট্ট একটি উপহার পাঠালাম। এখন ভাবছিস, এ যদি ড্রাইভার হয়, তাহলে অনামিকার রে’পি’স্ট কে? আর আমি অনামিকার রে’পি’স্ট কে না মে’রে ড্রাইভারকে কেন মা’র’লাম? সব বলছি, ওয়েট।

অনামিকার রে’পি’স্ট আমার সৎ ভাই অ্যালেক্স। কি, চমকে গেলি? চমকানোর কিছু নেই। আমার সৎ ভাইকে ভালো মানুষ ভাবার দরকার নেই। তাহলেই চমকাবি না। এখন ভাবছিস আমি কেন আমার সৎ ভাইকে মা’র’লা’ম না? ওকেও মা’র’তে গিয়ে হে’রে গিয়েছি কি-না! যদি এমন ভেবে থাকিস, তবে আমি হাসছি। এর উত্তর আমি অ্যালেক্সকেই সঠিক সময়ে দিয়ে দিব। আগেই বলেছি, আমি জ্যাক ডাল্টন কাঁচা কাজ করিনা।
তোকে বলছি অরুণ, অ্যালেক্স তোর ভালোবাসার মানুষের রে’পি’স্ট৷ শা’স্তিটা তুই দিয়ে যতটা শান্তি পাবি, আমি দিলে ততটা শান্তি পাবিনা। আর তাই অ্যালেক্সকে তোর উপর ছেড়ে দিয়ে গেলাম। ওকে জা’হা’ন্না’ম থেকে ঘুরিয়ে আনার দায়িত্ব তোর অরুণ।

কথাটা আসলেই সত্য অরুণ, আমি কখনো তোকে আর অনামিকাকে আলাদা করতে চাইনি। চেয়েছি তোদের এক করতে। কিন্তু ভাগ্য তোদের সাথ দিল না। আমার কি মনে হয়, জানিস? তুই ইনডিরেক্লি আমার প্রাণকে আমার বুক থেকে কে’ড়ে নিয়েছিস তো, তাই সৃষ্টিকর্তা তোর বুক থেকে তোর অনামিকাকে কে’ড়ে নিয়েছে। অথচ মাঝখান থেকে অনামিকার মৃত্যুতে আমিও ভীষণ ক’ষ্ট পেয়েছি। যার সাথে যাই-ই হোক না কেন! ফলাফলে, আমি জ্যাক দুঃখ পাবোই! আহা আমার নিয়তি!

সবশেষে আমার মৃ’ত্যুর সংবাদের মাধ্যমে তোকে অফুরন্ত খুশি করে এই দুনিয়া ছাড়ছি। বাই বাই অরুণ!”
অরুণ আর অনামিকার জন্য জেডির বানানো বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে অরুণ। হাতে সেই চিঠি, যেটা গত সাতদিন আগে জেডির পাঠানো বক্স ভরা ড্রাইভারের খ’ন্ডিত ম’র’দে’হের পাশেই এককোণায় পড়ে ছিল। অরুণ আজ দ্বিতীয়বারের মতো চিঠিটা পড়ল, তার আর অনামিকার জন্য জেডির বানানো সেই বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে। দু’চোখ বেয়ে টপটপ করে নোনাজল গড়িয়ে চিঠির উপর পড়ে, চিঠিটি পুরো ভিজে একাকার হয়ে গিয়েছে।

সকালের রোদ হেলে দুপুরের রোদ দুনিয়ার বুকে পদার্পণ করার পথে। মিটিমিটি বাতাস অরুণের গা ছুঁয়ে দিচ্ছে। সামনে সফেদ রঙের খুব সুন্দর একটি দেতলা বাড়ি। আশেপাশে বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগানো। চারিদিকে নিস্তব্ধ। শুনশান পরিবেশে জেডি ‘অরুণ আর অনামিকার’ জন্য এই বাড়িটি বানিয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এই বাড়ির মালকিনসহ সারপ্রাইজড হওয়ার কথা মানুষটা এই দুনিয়ার বুকে আর নেই। অরুণ দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি হারিয়ে ফেললো। ধপ করে পড়ে গেল দোতলা বাড়িটির সামনে। দু’হাঁটু এসে ঠেকল ঘাসের উপর। অরুণ চিঠিটিসহ দু’হাতের মাঝে তার বি’ধ্ব’স্ত মুখ লুকালো। বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে উঠে বিড়বিড়িয়ে আওড়ালো,
“একবার স্যরি বলার সুযোগটুকুও দিলিনা রে জেডি! এবার আমি কার কাছে ক্ষমা চাইবো? আমার অ’প’রা’ধ তো তোকে ঘিরে!”

“কেমন আছিস প্রাণ? রাগ করলি না-কি? এভিজান তোর স্বামী হওয়ার পর তো এই নাম তোর আরও সহ্য হয়না। আমি জানি প্রাণ। তবুও তোকে এই নামে সম্মোধন করছি। এই শেষবার। বিশ্বাস কর, আর কখনো ভুল করেও এই নাম মুখে নিব না। সেই সুযোগটাই তো আর পাবো না। হায়াত ফুরিয়ে ফেলার হাজারটা ব্যবস্থা করে ফেলেছি। সফল হব জানি।
জানিস প্রাণ, তোকে ঘিরে লক্ষ্য-কোটি স্বপ্ন বুনেছিলাম আমার মনে। মজার ব্যাপার কি জানিস? আমার প্রাণকে ঘিরে সব স্বপ্নের সাক্ষী তোর স্বামী আকাশ আর আমার বন্ধু এভিজান। সেসব তোকে আর না বলি। তোর সাথে খুব অল্পই কথা বলব। কারণ এভিজান খুব হিংসুটে, বুঝলি? তোর সাথে কথা বলা যত দীর্ঘ হবে, এভিজানের বুক ব্য’থা তত বাড়বে। তাই তোর সাথে খুব বেশি কথা বলা ঠিক হবেনা আমার।
তোর মনে আছে প্রাণ? ছোটবেলায় তোকে বলেছিলাম, ‘এমন কোনো দিন আসবে না, যেদিন আমি অধীর তোকে বিয়ে করতে চাইবো না।’

তুই মিলিয়ে দেখ প্রাণ। সত্যিই এমন দিন আসেনি৷
তুই যখন অবুঝ ছিলি, তখনও আমি তোকে চাইতাম। আর তারপর, তুই এক বাচ্চার মা হয়ে যাওয়ার পরও আমি শুধু তোকেই চেয়েছি। আমি আমার কথা রেখেছি প্রাণ। কিন্তু তুই তোর কথা রাখিসনি। তোর অবুঝপনার অজুহাত দিয়ে তুই আমার থেকে পালিয়ে গিয়েছিস। আর আমি হারিয়ে ফেলেছি আমার প্রাণকে।”
কাগজের লেখাগুলো পড়ে সন্ধ্যার দু’হাত কাঁপতে লাগলো। লেখা কাগজের উপর কিছু কথোকপথন অস্পষ্টভাবে ফুটে উঠল বলে মনে হলো,
‘সন্ধ্যা : তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো অধীর
ভাইয়া?

অধীর : যতটা ভালোবাসলে, তোর জন্য এই জীবন কু’র’বা’ন করতে আমাকে একবারো ভাবতে হবে না, আমি তোকে ততটা ভালোবাসি সন্ধ্যাপ্রাণ।
সন্ধ্যা : ইহ্! মিথ্যুক তুমি।
অধীর : ভালোবাসা কেমন হয় জানিস?
সন্ধ্যা : কেমন হয়?
অধীর : পবিত্র হয়। আর আমি অধীর আমার পবিত্র ভালোবাসা নিয়ে কখনো মিথ্যা বলিনা। যদি কখনো সুযোগ হয়, তবে অবশ্যই খুব যত্ন করে এর প্রমাণ দিয়ে দিব।’
কল্পনার ঘেরা কথোপকথনগুলো মনে করতে গিয়ে সন্ধ্যার দু’চোখ বেয়ে দু’ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে কাগজটির উপর পড়ল। সন্ধ্যা কয়েকবার পলক ঝাপ্টে আবারো চোখ রাখলো লেখার উপর,

“আমি ভালো মানুষ কখনোই ছিলাম না সন্ধ্যাপ্রাণ। এভির জায়গায় অন্যকেউ তোর হাসবেন্ড হলে, তার জায়গা আজ মাটির তলায় হত। তোর ভালোবাসা আমি অধীর জোর করেই আদায় করে নিতাম। সে ক্ষমতা আমার বরাবরই ছিল। কারণ আমি খারাপ। কিন্তু আমি হেরে গিয়েছি, তোর হাসবেন্ড আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু এভিজান বলে। আমি অধীর এমনি এমনি কখনো কারো কাছে হার মানিনি। কিন্তু আমি বন্ধুত্বের কাছে হার মেনেছি। যখন আমার পাশে কেউ ছিল না। তোকে, সৌম্যকে কাউকে চিনতাম না। তার অনেক আগে থেকে এভিজান আমার লাইফে ছিল। আমার দুর্দিনের একমাত্র সঙ্গী এভিজান ছিল। তার কাছে হার মেনেছি আমি। এভিজানের ঋণ আমি এক জীবনে শোধ করতে পারবো না। আর তাই অন্তিম পর্বে এসে সামান্য সেক্রিফাইস করে গেলাম। এভিজানকে জিতিয়ে দিয়ে গেলাম। নিজেই নিজেকে হারিয়ে দিলাম।”

আর কোনো লেখা নেই। সন্ধ্যা জেডির থেকে পাওয়া ছোট্ট চিঠিটা আলতো হাতে রেখে দিল বেলকনির কোণায় পাতা টেবিলের উপর। দু’হাত বেলকনির রেলিঙের উপর ঠেকিয়ে তাকালো আসমানী নওয়ানের পাশের ক’ব’র জেডির ক’ব’রের দিকে। টকটকে দু’চোখ বেয়ে অনবরত নোনাজল গড়িয়ে পড়ছে মেয়েটার। দুপুরের কড়া রোদ সন্ধ্যার মুখে এসে পড়েছে। কিন্তু সন্ধ্যার সেদিকে খেয়াল নেই৷ সে জেডি ক’ব’রে দৃষ্টি রেখে ভাঙা গলায় বলতে লাগলো,
“তুমি তোমার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য কত নোং’রা খেলা খেললে, তোমার বন্ধুর স্মৃতি না ফিরুক এর জন্য কতকিছু করলে, কারণ তোমার বন্ধু যেন দুঃখ না পায়, চুপচাপ আমার থেকে সরে যায়। আর তারপর একদিন তুমি ব্যর্থ হয়ে তোমার বন্ধুকে জিতিয়ে দিয়ে তোমার বন্ধুর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য তার হাতে মৃ’ত্যু লিখলে। আর আমি অভাগীর কথা কে ভাবলো? না তুমি ভাবলে, আর না তো তোমার বন্ধু ভাবলো।

তোমার কর্মকাণ্ডের জন্য আমি আমার স্বামীর সাথে একটা বছরও সংসার করতে পারিনি। আমার বাচ্চাটা পেটে নিয়ে আমি আমার স্বামীর হাতে থা’প্প’ড়ের উপর থা’প্প’ড় খেয়েছি। পেয়েছি কতশত তিরস্কার। একটাসময় হার মেনে নিয়ে আমার বাচ্চাটাকে একাহাতে বড় করেছি। এতকিছুর পর ফলাফল পেয়েছি, আমার স্বামী বন্ধুর জন্য আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। জীবনের এ পর্যায়ে এসে আমার আর কোনো আফসোস নেই, আফসোস শুধু একটাই,, আমি আর আমার সৃজনকে আল্লাহ কেন মৃ’ত্যু উপহার দিল না? প্রতিদিন কত মানুষ ম’রে যায়, আমি কেন ম’রে যাই না? কোন পা’পের ফলে আল্লাহ আমার জীবন এতো দীর্ঘায়ু করছে?”
কথাগুলো বলতে সন্ধ্যা কান্নায় ভেঙে পড়ে। ধীরে ধীরে বেলকনির রেলিঙের সাথে হেলান দিয়ে বসে পড়ে। রেলিঙে মাথা ঠেকিয়ে বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে কাঁদে মেয়েটা।

গত একসপ্তাহ যাবৎ আকাশ লকাপে। সন্ধ্যা যে ক’দিন আকাশের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল, কিছু না কিছু জিজ্ঞেস করছিল, প্রতিবার আকাশ ছিল নিরুত্তর। দুঃখের বিষয় আকাশ চোখ তুলে একবার সন্ধ্যার দিকে তাকায়নি পর্যন্ত। অথচ সৃজন থাকলে আকাশ সৃজনের সাথে একদমই স্বাভাবিকভাবে কথা বলেছে। সন্ধ্যা আকাশকে ডাকতে ডাকতে ক্লান্ত হয়ে যেত। কিন্তু আকাশ বিরক্ত হয়েও কখনো সন্ধ্যার দিকে ফিরে তাকায়নি। সন্ধ্যা না পেরে জেলখানার ভেতর দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিত। আর তখন আকাশ নিঃশব্দে সেখান থেকে উঠে গিয়ে এমন জায়গায় বসত, যেখান থেকে সন্ধ্যা আকাশকে দেখতেও পেত না। সন্ধ্যা কত করুণ কণ্ঠে ডাকতো, আশেপাশের মানুষ কেমন করে যেন তাকাতো সন্ধ্যার দিকে। পু’লি’শ এসে বলত, সন্ধ্যার সময় শেষ। কিন্তু আকাশ আর সন্ধ্যার সামনে আসতো না। এভাবেই গত এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেল।

প্রায় অনেকটাসময় পর সন্ধ্যা নিজেকে সামলে নিল। দু’হাতে চোখের পানি মুছে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। ঘরে এসে দেখল সৃজন ঘুমিয়ে। অনেক সকালে উঠেছিল, এজন্য আবারো ঘুমিয়েছে। সন্ধ্যা ওভার-ড্রয়ার থেকে একটি ওড়না বের করে মাথায় চাপলো। কাঁধে সাইড ব্যাগ ঝুলিয়ে ঘরের দরজা চাপিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। কাজের মেয়েকে বলে গেল, সৃজনকে দেখে রাখতে। উদ্দেশ্য জেলখানা, যেখানে আকাশ আছে। প্রতিদিন ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেও সন্ধ্যার মন ক্ষান্ত হয় না। সে নিয়ম করে আকাশের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।

সেলের ভেতর একটি চেয়ারে বসিয়ে রেখেছে আকাশকে। সামনে বসা ওসি। গতকাল ট্রান্সফার হয়ে এই থানায় এসেছে। সে আকাশের সামনের চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে। হাতে একটি মোটাসোটা লাঠি।
তার চোখেমুখে প্রফুল্লতা। দেখে বোঝা যাচ্ছে, আকাশকে কা’রা’দ’ণ্ডে দেখে সে ভীষণ খুশি। হঠাৎ-ই ওসি এগিয়ে এসে ডান হাতে আকাশের চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে। দুর্বল, নেতিয়ে পড়া আকাশ দু’চোখ টেনে তোলে। মুখের অবস্থা বি’ধ্ব’স্ত। কিছুক্ষণ আগে করা তার মুখমাথাসহ সারা গায়ে শতশত আ’ঘা’তের চিহ্ন ভেসে আছে। আকাশের এই অবস্থা কিছুক্ষণ আগে ওসি নিজেই করেছে। গতকাল থেকে আকাশকে একপ্রকার রিমান্ডে রেখেছেন তিনি। যেন বহুবছরের ক্ষো’ভ ঝেড়েছে আকাশের উপর। কিন্তু ফলাফলে আকাশ ছিল নিশ্চুপ। যার মুখ থেকে একটা শব্দ তো দূর, টুঁ-শব্দটিও বের হয়নি।
ওসি আকাশের এক মুঠো চুল ধরে আকাশের মাথা উঁচু করে। ক’ঠো’র স্বরে বলে,

“তোদের মতো মাফিয়ারা পারিস শুধু এই সমাজ ন’ষ্ট করতে। একটাকে নিজেই মে’রে আমাদের শান্তি দিয়েছিস। আর তার খু’নের দায়ে এখন তুই আরেক কী’ট জে’লে পঁচে ম’র’ছি’স। আমাদের মতো মানুষের কাজ কমিয়ে দিয়েছিস। কিন্তু প্রশ্ন একটা থেকেই যায়। শুনেছি, যাকে মে’রে’ছিস সে না-কি তোর জানের জিগার দোস্ত ছিল। কি যেন নাম তার? ওহ হ্যাঁ, জ্যাক ডাল্টন। তা কি এমন হলো, যে নিজের বন্ধুকেই মে’রে দিলি?”
আকাশ নিভুনিভু চোখে তাকায় ওসির দিকে। মুখের ডানদিক থেকে র’ক্ত গড়িয়ে পড়ছে। মাথা ফেটে, কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে তাজা র’ক্ত। দু’হাত একেবারে ছেড়ে দেয়া। গত সাতদিনে শুকিয়ে কেমন যেন অর্ধেক হয়ে গিয়েছে। চুলগুলো উষ্কখুষ্ক। চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গিয়েছে। ফর্সা ত্বকের উপর অদ্ভুদ এক কালচে দাগে ভরে গিয়েছে। শুধুমাত্র চেহারাটুকুই বি’কৃ’ত হয়নি বোধয়। তাছাড়া আগের ফিটফাট আকাশের সাথে এই আকাশের কোনো-ই মিল নেই।

‘এভিজান?’
এই একটি শব্দে আকাশের শরীর শিউরে উঠল। সে দুর্বল শরীরটা ঠিকঠাক নাড়াতে না পারলেও, করুণ দৃষ্টিজোড়া ঘোরালো সেলের ভেতর। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে শুনতে পাওয়া স্পষ্ট জেডির ডাক আকাশের কানে আসলেও, আকাশ জেডির অস্তিত্ব খুঁজে পেল না। ঝাপসা চোখদু’টোয় ভেসে উঠল তার আর জেডির বন্ধুত্বের কিছু দৃশ্য। সেদিন আকাশের সাথে জেডির প্রথম পরিচয় ছিল।
১২ বছরের আকাশ টিফিন টাইমে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে ওয়াশরুমের দিকে যাচ্ছিল। মাঠের এক কোণায় তাদের ক্লাসের একটি ছেলেকে চুপিচুপি কাঁদতে দেখে আকাশ তার দিক পরিবর্তন করে ছেলেটির দিকে এগিয়ে গিয়ে ছেলেটির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
কারো পায়ের আওয়াজ পেয়ে জেডি দ্রুতহাতে দু’হাতে তার দু’চোখ মুছে নেয়৷ মাথা তুলে তাকায় আকাশের দিকে। কি মনে করে মৃদু হেসে ডান হাত নাড়িয়ে বলে, “হাই!”
আকাশ গম্ভীর মুখে তার সামনে বসা ছেলেটির দিকে চেয়ে আছে। সে হাসলো না। মৃদুস্বরে বলে,

“তুমি এখানে একা বসে আছো কেন? টিফিন খাবেনা?”
কথাটা শুনে জেডির মুখ থেকে হাসি মিলিয়ে যায়। মাথা নিচু করে মলিন গলায় বলে,
“এমনি। খাবোনা আমি। তুমি খাও।”
আকাশ আবারো একইভাবে বলে,
“কেন খাবেনা?”
জেডি একইভাবে উত্তর করে,
“আমার মা নেই। কে টিফিন করে দিবে?”
আকাশ আবারো প্রশ্ন করে,
“তোমার বাবা তেমাকে টাকা দেয়না টিফিন খাওয়ার জন্য?”
জেডির ছোট্ট উত্তর, “না।”
আকাশ অবাক হলো। কোন বাবা তার ছেলেকে এভাবে না খাইয়ে রাখে? কই তার বাবা তো তার খুব যত্ন করে। তার মা তাকে টিফিন দেয়ার পরও তার বাবা তার খাবারের খোঁজ করে। আরও অনেককিছু কিনেও দেয়। সে অবাক স্বরে বলে,

“তাহলে তুমি দুপুরের খাবার কখন খাও?”
জেডি’র চোখ দু’টো ঝাপসা হয়ে এসেছে। সে এসব বলতে চায়না। কিন্তু আকাশকে তার খুব ভালো লাগে। যদিও কখনো আকাশের সাথে এর আগে তার কথা হয়নি। কিন্তু ক্লাসে দেখত, আকাশ সবসময় চুপচাপ থাকে আর মন দিয়ে পড়াশোনা করে। কেউ আকাশের বিরুদ্ধে বা কাউকে নিয়ে কটুক্তি করলে আকাশ তাকে গিয়ে ঠাস করে থা’প্প’ড় মে’রে দিত। এসব মিলিয়ে আকাশকে তার বেশ ভালোই লাগে। জেডি ঝাপসা চোখদু’টো ছোট ছোট হাতে ডলে মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে,

“খাইনা। শুধু সকালে আর রাতে খাই। বাবা বলেছে, যাদের মা নেই, তাদের দু’বেলা খেলেই হয়।”
কথাটা শুনে আকাশ বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। এমন কথা সে এই প্রথম শুনলো বলে মনে হলো। ১২ বছরের ছেলে খুব বেশি বুঝদার না হলেও একেবারে অবুঝও নয়। আকাশের ভীষণ খারাপ লাগলো। মায়াও হলো জেডিকে দেখে। সে জেডির সামনে হাঁটুগেড়ে বসে জিজ্ঞেস করল,
“তোমার কি খুব খিদে পেয়েছে?”
জেডি অবাক হয়ে তাকালো আকাশের দিকে। মাথা নেড়ে না বোঝালো, অর্থাৎ তার খিদে পায়নি। আকাশ চোখ ছোট ছোট করে তাকালো জেডির দিকে। কিছুটা রে’গে বলে,
“তুমি মিথ্যে বলছ, তাইনা?”
জেডি ঢোক গিলল। আকাশের সোনালী চোখের মণি দু’টো দেখে একটু ভ’য় পেল। বলল,
“হু। কিন্তু তুমি কি করে বুঝলে?”
আকাশ জেডির বাম হাত তার ডান হাতের মুঠোয় নিয়ে সামনের দিকে এগোতে এগোতে বলল,

“আমি অনেক কিছু বুঝি। তুমি বোকা তাই কিছুই বোঝোনা।”
এরপর আকাশ তাদের ক্লাসরুমে গিয়ে তার ব্যাগ থেকে টিফিন বাটি বের করল। বাটির এক কোণায় একটু নুডুলস পড়ে আছে, যেটা সে একটু আগে খেয়ে রেখে দিয়েছে। আকাশ আফসোস করল, সে কেন আগে আগে টিফিন খেয়ে নিল। না খেলে এখন সে তার টিফিন জেডিকে দিতে পারতো। অতঃপর সে তার ব্যাগসহ জেডির ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে আসে। জেডির হাত ধরে রেখেছে আকাশ। জেডি আকাশের পিছু আসতে আসতে বলে,
“আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো? আমি কোথাও যাবো না। আমাকে ছেড়ে দাও।”
আকাশ শুনলো না। সে দারোয়ানকে ফাঁকি দিয়ে জেডিকে নিয়ে স্কুল থেকে বেরিয়ে আসে। একটি রিক্সা ঠিক করে সে আগে রিক্সাতে উঠে জেডির দিকে হাত বাড়িয়ে বলে,
“এসো। তোমাকে আমাদের বাড়িতে ঘোরাতে নিয়ে যাচ্ছি।”
জেডি এবার কিছু বলল না। সে আকাশের হাত ধরে রিক্সায় উঠে পড়ল। দু’জন বাচ্চা পাশাপাশি বসলে রিক্সাওয়ালা রিক্সা টানতে শুরু করে। জেডি আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসে। সে এভাবে রিক্সায় উঠে কখনো ঘুরে বেড়ায়নি। তার কোনো বন্ধুও নেই। তাই নতুন অনুভূতি হচ্ছে। কিন্তু আকাশ হাসেনা। সে চুপচাপ সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। সাথে জেডির বা হাত তার দু’হাতে শ’ক্ত করে ধরে রেখেছে।

বাসায় ফিরলে আসমানী নওয়ান অসময়ে আকাশকে স্কুল থেকে ফিরতে দেখে আকাশকে অনেক বকাঝকা করে। আকাশ অনেকক্ষণ চুপচাপ শুনলেও একপর্যায়ে গিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,
“আমার বন্ধু খেতে পায়না। তাই ওকে খাওয়াতে এনেছি মা। তুমি এভাবে রিয়েক্ট করছ কেন? আমার বন্ধুকে অনেক খাবার দাও। আমার ভাগেরটাও দাও। ওর অনেক খিদে পেয়েছে। ওর বাবা ওকে খেতে দেয়না।”
আসমানী নওয়ানের বকাঝকা শুনে ছোট্ট জেডি প্রায় কেঁদেই দিয়েছিল। কিন্তু আকাশের কথা শুনে সে অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকায়। তার ঠিক মনে পড়ছে না, আকাশ তার কবে বন্ধু হলো!
এদিকে আকাশ মাকে কথাটা বলে জেডির হাত ধরে তার ঘরের দিকে নিয়ে যায়। জেডি চুপচাপ আকাশের সাথে পা মেলায়। আসমানী নওয়ানও আর কিছু বলেন না। সে কেবল নিজ ছেলের পাশে অপরিচিত ছেলেকে দেখল। মায়া-ও লাগলো জেডির জন্য। তার ছেলে তো মিথ্যে বলবে না। তার মানে ছেলেটার পেটে হয়তো আসলেই অনেক খিদে। এজন্য সে ব্যস্ত পায়ে রান্নাঘরের দিকে গেল।

আকাশ জেডিকে আনার কিছুক্ষণ পর আসমানী নওয়ান গরুর মাংস আর চিংড়ি মাছ দিয়ে খাবার দিয়ে যান আকাশের ঘরে। আকাশ ফ্রেশ হয়ে আসার পরও জেডিকে খেতে না দেখে সে হাত ধুয়ে এসে ভাত মাখতে শুরু করল। এটা দেখে জেডির মন খারাপ হয়ে গেল। খিদেয় তার পেট ব্য’থা করছে। কিন্তু ল’জ্জায় খেতে পারছিল না। সে ভেবেছিল আকাশ তাকে সাধবে। কিন্তু নিজেই খাবার মাখতে লাগলো নিজে খাওয়ার জন্য। বাচ্চা জেডির খিদের চোটে কাঁদতে ইচ্ছে করল। কিন্তু সে মুখ ফুটে কিছু বলল না। সে কেবল আকাশের ভাত মাখার দিকে চেয়ে রইল। একটু পর পর জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট ভেজালো৷ ভাবনার মাঝেই হঠাৎ-ই আকাশ তার মাখা ভাতের এক নোলা জেডির মুখের সামনে ধরল। জেডি অবাক হয়ে তাকালো আকাশের দিকে। আকাশ রে’গে বলে,
“তোমাকে খাওয়ানোর জন্য এনেছি। তাই খেতেই হবে। না খেতে চাইলে ঠাস ঠাস করে থা’প্প’ড় খাবে। আমি ছোট হলেও অনেক থা’প্প’ড় মা’র’তে পারি। তুমি তো জানোই, তাইনা?”

জেডি কি বলবে বুঝল না। সে হুট করেই হেসে ফেলল। দ্রুত বড় করে হা করল। আকাশ সাথে সাথে জেডির মুখে ভাত মুখে পুড়ে দিল। জেডির বড্ড খিদে পেয়েছিল। সে আকাশের হাতের পুরো এক প্লেট ভরা সব ভাত গপাগপ খেয়ে নিল। সবশেষে পানি খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলল। এবার আকাশ মৃদু হাসল। জেডিও হেসে বলল,
“এতো মজার খাবার আমি কখনো খাইনি। বেশি খেয়ে ফেলেছি মনে হয়, স্যরি!”
স্যরি শব্দটা শুনে আকাশ বিরক্ত হলো। তবে এ নিয়ে কিছু বলল না। জিজ্ঞেস করল,
“এতো মজার খাবার খাওনি বললে কেন?”
জেডি মলিন গলায় বলে,
“তোমার মনে হয় আসল মা। কিন্তু আমার তো সৎ মা। তাই আমাকে ভালো ভালো খাবার দেয় না। আমার ছোট ভাইকে শুধু দেয়। আর আমাকে বেচে যাওয়া খাবার দেয়।”
কথাটা শুনে আকাশের মনটা পুরো বিষাদে ছেঁয়ে গেল। বললে, “ওহ। তোমার বাবা তো নিজের৷ তাহলে সে কেন তোমাকে আদর করেনা?”

ছোট্ট জেডির মুখখানা আরও মলিন হয়ে গেল। বলল, “বাবা আমাকে আদর করত তো। এই যে তুমি আমাকে খাইয়ে দিলে। এভাবেই খাইয়ে দিত। কিন্তু নতুন মা আসার পর থেকে আর আদর করেনা। আমাকে ঠিক করে চেনেও না। আচ্ছা আসল মা’য়েরা কেমন হয় আমাকে একটু বলবে?”
কথাটা শুনে আকাশ আশ্চর্যজনকভাবে জেডির দিকে তাকালো। জেডি আমতা আমতা করে বলে,
“না মানে তোমার মা তোমার কথা শুনে আমাকে খাবার দিয়ে দিল। আর আমার মা তো আমাকেই খাবার দেয়না। তোমার মা তোমার রা’গ দেখেও কিছু বলল না। কিন্তু আমার মা তো উল্টে আমাকেই মা’রে। এতো মা’রে যে শরীর দা’গ পড়ে যায়। তাই বললাম আর কি। আসল মায়েরা মনে হয় অন্যরকম হয়, তাইনা?”
ছোট্ট আকাশের চোখের কোণ ভিজে উঠল। সে ছোট হলেও যথেষ্ট বুঝদার। এমন ছেলে কখনো দেখেনি সে। আকাশকে চুপ দেখে জেডি একটু ভ’য় পেল। এতক্ষণে বুঝেছে আকাশ একটু-আধটু রাগী। সে হয়তো ভুলভাল বলায় আবার না তাকে মে’রে দেয়। জেডি ভ’য় পেল কিছুটা। আকাশ হাত ধুয়ে এসে জেডির সামনে দাঁড়িয়ে বলে,

“তোমার শার্ট খোলো।”
জেডি ভীত কণ্ঠে বলে,
“তুমি কি আমাকে মা’র’বে না-কি? আমি কালকেই নতুন মায়ের মা’র খেয়েছি। আজ আমাকে মে’রো না প্লিজ!”
আকাশ কি বলবে বুঝল না। বাচ্চা ছেলেটির কি ভীষণ ব্য’থা লাগলো জেডির কথা শুনে। আকাশ নিজেই জেডির পরনের শার্ট টেনে খুলে দিলে জেডি ভীত হয়ে বিছানার উপর পা তুলে গুটিয়ে বসল। আকাশ জেডির শরীরে খেয়াল করলে দেখল, পুরো শরীর লাল লাল দাগ। জায়গায় জায়গায় ফুলে উঠেছে৷ কিছু দাগ অনেকটা কালচেও হয়ে গিয়েছে। আকাশ বিস্ময় দৃষ্টিতে দেখল জেডির শরীরের অবস্থা। ঢোক গিলে বলে,

“ওই ডা’ই’নি মহিলাটা তোমায় এতো মা’রে জ্যাক?”
আকাশের মুখের প্রথমবার নিজের নাম শুনে জেডির ভীষণ ভালো লাগে। সবাই তাকে জেডি বলে ডাকে৷ আকাশ-ই একমাত্র তাকে জ্যাক বলে ডাকলো, এজন্য আরও বেশি ভালো লাগলো। সাথে ডা’ই’নি শব্দটা শুনে জেডি শব্দ করেই হেসে ফেললো। কিন্তু আকাশের চোখদু’টো হালকা লাল হয়ে এসেছে দেখে জেডি নিজেকে সামলে নিল। মাথা নিচু করে বলে,

“আসলে উনি আমাকে এভাবেই মা’রে। আমার অভ্যেস হয়ে গেছে। তুমি চিন্তা কর না।”
আকাশ কিছুই বলল না। সে দু’হাতে চোখ ডলতে ডলতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কয়েক মিনিটের মাথায় দু’টো মলম হাতে করে দৌড়ে তার ঘরে আসে। এরপর সে জেডির উদ্দেশ্যে বলে,
“তুমি শুয়ে পড়। আমি তোমাকে মলম দিয়ে দিব। এগুলো দিলে তুমি খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবে।”
জেডি আকাশের কান্ডে অবাক হয়। তার বাবা-ই তার জন্য এতো ভাবে না। আর তার একদিনের বন্ধু তার জন্য এতো ভাবছে? জেডি মৃদুহেসে বলে,
“আমি কিভাবে সুস্থ হব? আমার নতুন মা তো আমাকে প্রতিদিন-ই মা’রে।”
আকাশ ঢোক গিলে বলে,

“আর মা’র’বে না। আমার বাবা আসলে, তাকে নিয়ে তোমাদের বাড়িতে যাবো। আমার বাবার অনেক ক্ষমতা। তোমার সৎ মায়ের বিরুদ্ধে শিশু নির্যাতনের মা’ম’লা করব। তাহলেই সে আর তোমাকে মা’র’তে পারবে না।”
জেডি তখনো আকাশের মতো অত বুঝদার নয়। সে অতশত না বুঝলেও, এটা বুঝল এবার থেকে হয়ত তাকে ওতো শ’ক্ত মা’র খেতে হবে না। কারণ তার একটা বন্ধু হয়েছে। তাকে আদর করার মানুষ হয়েছে। জেডি চুপচাপ শুয়ে পড়ল। আকাশ জেডির পাশে বসে ছোট্ট ছোট্ট হাতে জেডির পুরো শরীরে আলতো হাতে মলম লাগিয়ে দিতে লাগলো। থেকে থেকে ব্য’থা লাগলে জেডি মৃদু আ’র্ত’না’দ করে উঠলে আকাশ ফু দিতে দিতে মলম লাগায়। জেডি মৃদু হেসে বলে,

“আচ্ছা তুমি তো আমাকে চেনো না। তাহলে তুমি তোমার মাকে কেন বললে, আমি তোমার বন্ধু?”
আকাশ উত্তর দেয়,
“কারণ তোমাকে আমি আমার বন্ধু বানিয়ে ফেলেছি।”
কথাটা শুনে জেডির চোখ দু’টো চকচক হয়ে উঠল। আকাশ তো কারো সাথে ঠিকঠাক কথাই বলেনা। সেখানে তাকে বন্ধু বানিয়ে ফেলেছে, আর তাকে কত ভালোওবাসছে। এটা ভেবেই জেডি উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে,
“সত্যি বলছ? তুমি আমাকে এভাবেই আদর করবে?”
আকাশ মৃদু হেসে বলে, “হুম।”
হঠাৎ-ই জেডির উৎফুল্ল মনটা নিভে গেল। মলিন গলায় বলে, “সারাজীবন কেউ আদর করেনা। বাবাও একসময় আমাকে আদর করত, এখন আর করেনা।”
আকাশের কাটকাট উত্তর, “আমি সারাজীবন তোমাকে একইভাবে আদর করব। তবে আমার একটা শর্ত আছে।”
জেডি প্রশ্নাত্মক চোখে তাকিয়ে বলে,

“কি শর্ত?”
আকাশ মলম দেয়া থামিয়ে দিয়ে জেডির দিকে তাকিয়ে বলে, “আমাকে কখনো ভুলে যাওয়া যাবেনা।”
জেডি মাথা নেড়ে বলে,
“আমি তোমাকে কখনো ভুলে যাবোনা।”
আকাশ মৃদু হাসে। তবে কিছু বলে না। আবারো মনোযোগী হয় জেডির গায়ে মলম লাগাতে।
পুরোনো দিনের কথা ভেবে আকাশের চোখদু’টো ভরে উঠেছে। জ্যাক সেদিন তাকে কথা দিয়েছিল, সে তাকে কখনো ভুলবে না। কিন্তু গত ছয় বছর আগে আকাশ যে সিচুয়শনে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে দাঁড়িয়ে আকাশের মনে হয়েছিল, জ্যাক তাকে ভুলে গিয়েছে। জ্যাক ইংল্যান্ড চলে গিয়েছে জানতে পারার পর আকাশ নিজের অভিমান সরিয়ে জ্যাককে কল দেয়ার পর সমানে যখন জ্যাক তার কল কে’টে দিত। এরপর সে অন্যভাবে জ্যাকের খোঁজ নিতে গেলে জ্যাকের আঙ্কেল তাকে জানায়, জ্যাক তার ভালোবাসার মানুষকে খুঁজে পেয়েছে। এখন আর আকাশকে জ্যাকের প্রয়োজন নেই। আকাশ খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছিল, জ্যাক সত্যিই জ্যাকের হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার মানুষকে খুঁজে পেয়েছিল। আর তারপর-ই সে ইংল্যান্ড চলে যায়। আকাশ জানতে পারেনি জ্যাকের ভালোবাসার মানুষ কে, শুধু জানতে পেরেছিল জ্যাক তার ভালোবাসার মানুষকে খুঁজে পেয়েছে।
জ্যাকের এমন ব্যবহার আকাশকে পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছিল। সে সেদিন তার মায়ের কোলে মাথা রেখে বাচ্চাদের মতো কেঁদেছিল জ্যাকের জন্য। কেঁদে কেঁদে বলছিল,

“জ্যাক আমাকে কথা দিয়ে কথা রাখেনি মা। ও আমাকে ভুলে গিয়েছে। ও আর আমার সাথ চায়না। জ্যাক আমার সাথে বে’ঈ’মা’নী করেছে মা। আমি ওর ভালোবাসার মানুষকে ওর বুকে ফেরানোর জন্য আমার গায়ের কত ঘাম ঝরিয়েছি, কত দিন না খেয়ে গ্রামে গ্রামে বেরিয়েছি। কত রাত না ঘুমিয়ে ওর ভালোবাসার মানুষকে খুঁজেছি, শুধু ওর মুখে হাসি দেখবো বলে। আজ ও ওর ভালোবাসার মানুষকে পেয়ে আমাকে ছুঁড়ে ফেলেছে মা। ও আমার ভালোবাসার দাম এতো জ’ঘ’ণ্যভাবে কেন দিল মা? মা বলো না?”

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৯ (২)

তখন তো আকাশ জানতো না, তাদের পিছনে বড়সড় চ’ক্র চলছে। জ্যাকের বাবার পাশাপাশি জ্যাকের আঙ্কেলও চাইতো না, জ্যাক আকাশের সাথে মিশুক। ঠিক যেমন আসমানী নওয়ান চাইতেন না। তাদের দু’বন্ধুকে আলাদা করতে কতজনের কত জল্পনা-কল্পনা ছিল। আজ তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। এতোটাই নিখুঁতভাবে সফল হয়েছে যে, এভি তার প্রাণপ্রিয় বন্ধু জ্যাককে নিজ হাতেই এই দুনিয়ার বুক থেকে বিদায় দিয়েছে। যার ভার বইতে অক্ষম আকাশ। সে কি করে মানবে জেডির এতো করুণ মৃ’ত্যু? সে তো একদিন জেডিকে রাস্তা থেকে তুলে এনে তার ঘরে জায়গা দিয়েছিল। জেডিকে সন্তানের মতো করে আগলে নিয়েছিল। নিজে বাবার মতো জেডির আদর-যত্ন করেছিল।
কথাগুলো ভাবতে গিয়ে আকাশের বুকের ব্য’থা বাড়লো। র’ক্তলাল চোখ বেয়ে অনবরত অশ্রু গড়ালো। অস্পষ্টস্বরে আওড়ালো,
“আমাকে কি মৃ’ত্যু’দন্ড দেয়া যায় না আল্লাহ!”

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ৩০ (২)