Home আমি তার সন্ধ্যামালতী আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ৩০ (২)

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ৩০ (২)

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ৩০ (২)
DRM Shohag

আকাশের নিরবতায় থানার ওসি অধৈর্য হয়। অনেকক্ষণ যাবৎ আকাশকে প্রশ্ন করে যাচ্ছে, অথচ আকাশের মুখে রা নেই। সে পাথরের মতো নির্জীব দৃষ্টিতে কোনো একদিকে চেয়ে আছে। ওসি সাহেব আর ধৈর্য রাখতে পারলেন না। হাতে থাকা র’ক্তা’ক্ত লাঠি দ্বারা আবারো সর্বশক্তি দিয়ে আকাশের মাথা সাথে বাম গাল বরাবর আ’ঘা’ত করে। এইবারের আ’ঘা’ত এতোটাই জোরে ছিল যে, চেয়ারে বসা আকাশ একেবারে উল্টে গিয়ে সেলের সাথে জোরেসোরে ধাক্কা খায়। মুখ থেকে একদলা র’ক্ত ছিটকে বেরিয়ে এসে পড়ে সেলের বাইরে থেকে কয়েক হাত দূরত্বে।
ঠিক সেই সময়ে সন্ধ্যা থানার সকলের কথা অ’গ্রাহ্য করে একপ্রকার জোর করে জে’লের ভেতর প্রবেশ করেছে। ভতরে কয়েক পা আসতেই বাড়ানো ডান পায়ের উপর এসে ছিটকে পড়ে আকাশের মুখের র’ক্ত। সন্ধ্যার সারা শরীর কারেন্ট শক খাওয়ার মতো ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে নিচু মাথা উঁচু করে সামনে তাকায়। র’ক্তা’ক্ত, এতো বি’ধ্ব’স্ত আকাশকে দেখে সন্ধ্যার সারা শরীর শিউরে ওঠে। ততক্ষণে ওসি আকাশকে টেনে উঠিয়ে বাম গাল বরাবর লাঠি দ্বারা সর্বশক্তি দ্বারা আ’ঘাত করে। দ্বিতীয় আ’ঘা’তে আকাশ তার দুর্বল শরীর নিয়ে উল্টোদিকের দেয়ালে গিয়ে জোরেসোরে ধাক্কা খায়। মাথা ধাক্কা খায় দেয়ালের সাথে। কি আশ্চর্য, ছেলেটা এতো আ’ঘা’ত পাওয়ার পরও এখনও একটি টুঁ-শব্দটিও করল না৷

কিন্তু সন্ধ্যার চোখের সামনে আকাশকে এভাবে আ’ঘা’ত করায় মেয়েটা নিতে পারল না। সে সর্বশক্তি দিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, “আকাশ?”
সন্ধ্যার ডাক আকাশের কানে পৌঁছালো কি? আকাশের নির্জীবতা দেখে তো তা মনে হয় না। সে মা’র খেয়েও পাথরের ন্যায় বসে আছে। মুখের দু’পাশ বেয়ে গলগল করে র’ক্ত গড়িয়ে পড়ছে। নিভুনিভু চোখ দু’টো বুজে আসছে।
এদিকে সন্ধ্যা আকাশ শব্দটি উচ্চারণ করেই সেলের দিকে দৌড়ে আসছিল, কিন্তু সন্ধ্যার পিছনে আসা দু’জন মহিলা সন্ধ্যাকে টেনে ধরে। সেলের ভেতরে বসা ওসি মহিলা দু’জনকে আদেশ করে, ‘সন্ধ্যাকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যেতে।’

ভদ্রমহিলা দু’জন তাদের স্যারের কথা মেনে সন্ধ্যাকে টানতে থাকে। কিন্তু সন্ধ্যাকে একচুল পরিমাণ নাড়াতে পারেনা।
ওদিকে ওসি মহিলা দু’জনকে নিজের আদেশ শুনিয়ে আবারো আকাশের কাছে যায়। দেয়াল হেলান দিয়ে বসে থাকা পাথরের মূর্তির ন্যায় আকাশকে টেনে সরিয়ে এনে আবারো তৃতীয়বারের মতো লা’ঠি দ্বারা মা’থায় আ’ঘা’ত করে। এ পর্যায়ে আকাশ মৃদু আ’র্ত’নাদ করে ওঠে। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে সেলের ভেতর মেঝেতে। ওসি চতুর্থবারের মতো আকাশের মুখ বরাবর ডান হাত দ্বারা আ’ঘা’ত করে। আকাশের না’ক’মুখ দিয়ে গ’ল’গল করে র’ক্ত বেরিয়ে আসে। একেবারে নেতিয়ে পড়া শরীরটা দুলে ওঠে৷
সন্ধ্যা আকাশের দিকে চেয়ে শব্দ করে কেঁদে দেয়। চেঁচিয়ে বলে,
“উনাকে মা’র’বেন না। উনি অ’সু’স্থ। দয়া করুন। উনাকে মা’র’বেন না।”
কে শোনে কার কথা! থানার ওসির থামার নামগন্ধ নেই। সে অনবরত আকাশকে আ’ঘা’ত করছে। কখনো লাঠি দ্বারা তো কখনো হাত দ্বারা।

সন্ধ্যাকে মহিলা দু’জন টেনে নিয়ে যেতে চাইলে সন্ধ্যা তো যায়-ই না। উল্টে সে ধীরে ধীরে সেখানেই বসে পড়ে। দু’হাতে একজন মহিলার পা সাপ্টে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“দয়া করে উনাকে থামতে বলুন। আকাশ অসুস্থ। উনি ক’দিন আগে হার্ট-অ্যাটার্ক করেছে। উনার অবস্থা ভালো নয়। উনি উনার বন্ধুকে মে’রে উনার মন এমনিতেই ম’রে গেছে। উনার শরীরটাকে ছাড় দিন আপনারা। আমার বাচ্চাটা কখনো তার বাবার ভালোবাসা পায়নি। আমার বাচ্চাকে এতিম করবেন না। দয়া করুন, উনাকে ছেড়ে দিন।”
সন্ধ্যা কিছু বলছে এটা বোঝা গেলেও কি বলছে সেটা কেউ বুঝতে পারলো না। কারণ কান্নার ফলে সন্ধ্যার কথাগুলো জড়িয়ে গিয়েছে। এতো চিৎকার, কান্নার আওয়াজে বাইরে থেকে আরেকজন মহিলা ভেতরে আসে। সে সন্ধ্যাকে একজনের পা সাপ্টে এভাবে কাঁদতে দেখে অবাক হয়।

সন্ধ্যার দৃষ্টি অরুসরণ করে সামনের সেলের দিকে তাকালে চোখে পড়ে তাদের ওসি স্যার একজন আসামীকে নি’র্দ’য়ের মতো একটার পর একটা আ’ঘা’ত করছে। মহিলাটি ঢোক গিলল। তার দৃষ্টি ঘুরে এলো কান্নারাত সন্ধ্যার দিকে। তার চোখেমুখে অদ্ভুদ মায়া সন্ধ্যার প্রতি। সে খেয়াল করেছে, আকাশ নামের এই আসামী তাদের জে’ল’খা’নায় আসার পর থেকে মেয়েটি নিয়ম করে এখানে আসে। আকাশের সাথে অনেক কথা বলার চেষ্টা করে, কিন্তু আকাশ কোনো রেসপন্স করেনা। মাঝে মনে হতো সন্ধ্যা পা’গ’ল কি-না! এই ভাবনা ভাবার কারণও আছে। আকাশ অন্যদের সাথে ভালোভাবে কথা বলত, কিন্তু সন্ধ্যাকে এভোয়েড করত, যেন সে সন্ধ্যাকে চেনে না। কিন্তু সন্ধ্যা মেয়েটি নাছোড়বান্দা হয়ে আকাশের পিছেই লেগে থাকতো। সে সন্ধ্যাকে জিজ্ঞেস করতে চাইতো, সে আকাশের কে হয়, আবার ভাবতো, মেয়েটা উল্টাপাল্টা উত্তর-ই দেয় কি-না! কারণ সন্ধ্যার প্রতি আকাশের বিহেভ দেখে মনে হতো, আকাশ সন্ধ্যাকে চেনে না। আজ এরকম একটা অবস্থায় আকাশের জন্য সন্ধ্যাকে কাঁদতে দেখে তার কৌতূহল কয়েক হাজার গুণ বেড়ে গেল এটা জানতে যে, সন্ধ্যা আকাশের আসলে কে হয়! অতঃপর সে তার কলিগ বাকি দু’জনের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করে,

“মেয়েটি আকাশ নামে আসামীর কি হয়?”
কথাটি বোধয় কান্নারত সন্ধ্যার কানে গেল। সে কাঁদতে কাঁদতেই আকাশের দিকে চেয়ে শব্দ করে কঠোর স্বরে বলে ওঠে,
“আমি তার সন্ধ্যামালতী……
একবার বলেই মেয়েটা থামলো না। সে অনবরত আওড়ালো, আমি তার সন্ধ্যামালতী….আমি তার সন্ধ্যামালতী….আমি তার সন্ধ্যামালতী….”
কতবার যে কান্নারত সন্ধ্যা আকাশের দিকে চেয়ে এই একটি বাক্য আওড়ালো, তার হিসেব নেই।
একসময় ওসির শেষ আ’ঘা’তে হাঁটুগেড়ে বসা দুর্বল আকাশ সামনের দিকে হেলে মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। ততক্ষণে সন্ধ্যার বলা ‘আমি তার সন্ধ্যামালতী’ বাক্যটি আকাশের মস্তিষ্কে বারবার প্রতিধ্বনি হতে শুরু করেছে। টকটকে লালিত, টলমলে করুণ দৃষ্টিজোড়া কান্নারত সন্ধ্যার পানে র’ক্তি’ম, কা’টা ঠোঁটজোড়া নাড়িয়ে অস্পষ্ট স্বরে আওড়ায়, “তুমি শুধু আমার সন্ধ্যামালতী।”

কথাটা আওড়াতে গিয়ে আকাশের দু’চোখ বেয়ে দু’ফোঁটা জল সেলের মেঝেতে টুপ করে পড়ে। র’ক্তে মাখামাখি দুর্বল আকাশের চোখ দু’টো একেবারে বন্ধ হয়ে যায়।
আকাশের এমন অবস্থা দেখে মুহূর্তেই সন্ধ্যার কান্না থেমে যায়। পাথরের মূর্তির ন্যায় কতক্ষণ নি’থ’র র’ক্তা’ক্ত আকাশকে দেখে গেল কেবল। এক তীব্র ব্যর্থ বান্দার ন্যায় সন্ধ্যা আল্লাহর নিকট নিজেকে সঁপে দিতে চাইলো, যে তার জীবনে যা পেয়েছে, তার চেয়ে হাজারগুণ শুধু হারিয়েছে।
এক পর্যায়ে পাথরের ন্যায় নিশ্চুপ সন্ধ্যা-ও ডান দিকে হেলে হেলে ঠাস করে পড়ে যায় মাটিতে। চোখদু’টো আপনাআপনি বন্ধ হয়ে আসে। বন্ধ চোখের পাতা বেয়ে নোনাজল গড়িয়ে মেঝেতে পড়ে।
আকাশ সেলের ভেতরে, সন্ধ্যা সেলের বাইরে। দু’জনের মাঝে দূরত্ব পাঁচ-ছয় হাত হবে। দু’জন দু’জনের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে। ঘুমিয়েছে বোধয়।

আশেপাশের সেলগুলোর প্রত্যেক আসামীসহ পু’লিশ ওসি সবাই একবার সন্ধ্যার দিকে তাকায়, তো আকাশের দিকে। প্রত্যেকের দৃষ্টি নির্বাক, কারো মন ব্য’হ’ত, কেউ বা ভীষণ-ই ব্য’থি’ত। তাদের মনে হচ্ছে, এইমাত্র দু’টো লা’শ তাদের চোখের সামনে পড়ল৷
আকাশের বলা ‘তুমি শুধু আমার সন্ধ্যামালতী’ বাক্যটি কেউ না শুনলেও, সন্ধ্যার কঠোর স্বরে চেঁচিয়ে বলা বাক্যটি প্রত্যেকে শুনেছে। যার তীব্রতা এতো বেশি ছিল, কঠোরতা এতো বেশি ছিল, শব্দের গতি এতো প্রখর ছিল যে এই বদ্ধ জে’ল’খা’না’র ভেতর বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো, ‘আমি তার সন্ধ্যামালতী’।

জোহরের আজান দিচ্ছে তখন। ছোট্ট সৃজন ঘুমের ঘোরে এপাশ-ওপাশ করতে থাকে। এমন করতে করতে কিছু সময় পর ছেলেটার ঘুম ছুটে যায়। সে ধীরে ধীরে উঠে বসে। ঘুমুঘুমু চোখে ঘরের চারপাশে চোখ বুলায়। দু’হাতে চোখ ডলে আর ডাকে, “মা? মা? মা?”
কোনো সাড়া না পেয়ে সৃজন ধীরে ধীরে বিছানার কোণ ঘেঁষে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়৷ ছোট্ট ছোট্ট পায়ে এগিয়ে এসে চাপানো দরজা টেনে দরজা খুলে ঘর থেকে বের হয়। দু’হাতে চোখ ডলতে ডলতে আশেপাশে তাকায় আর মাকে ডাকতে থাকে। মায়ের কোনো সাড়া না পেয়ে সৃজনের কান্না পায়। ঘুম থেকে উঠে মাকে না পেলে বাচ্চা ছেলেটি এমনই করে। ইতোমধ্যে তার চোখদু’টো ভরে উঠেছে। অনবরত ডেকে চলেছে মা মা করে।
হাঁটতে হাঁটতে সৃজন সিঁড়ির মাথায় এসে দাঁড়িয়েছে। দোতলার সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে নিচের ফ্লোরে চোখ বুলিয়ে মাকে খোঁজে আর ডাকে,

“মা মা মা? তুমি কুতায় মা? কুতায় তুমি? আচো আমাল কাচে মা।”
কোনো সাড়া নেই। মাকে না পেয়ে সৃজনের পানিতে টইটুম্বুর পানি দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। সে তার ছোট্ট ছোট্ট দু’হাতে চোখজোড়া মুছে ধীরে ধীরে বসে পড়ে সিঁড়ির মাথায়। এরপর একটু একটু করে সিঁড়িগুলো বেয়ে নামতে থাকে। কখনো দাঁড়িয়ে বা কখনো বসে হামাগুড়ি দিয়ে। তখনও সৃজনের মুখে বুলি,
“মা তুমি ককন আচবা আমাল কাচে? মা আচো। মা মা?”
মায়ের কোনো সাড়া না পেয়ে বাচ্চাটির চোখদু’টো বারবার ভরে ওঠে। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে একটু পর পর চোখ মুছে নেয়, ঝাপসা চোখজোড়া ঠিক করে নেয়ার জন্য। এমন করতে গিয়ে হঠাৎ-ই সৃজনের হাত ফসকে যায়। বাচ্চা ছেলেটি একেবারে ব্যালেন্স ফেলে। মুখ থুবড়ে পড়ে সিঁড়িতে। এরপর সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে নিচের থেকে পড়তে থাকে। কয়েক সেকেন্ডের মাথায় উঁচু সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে একেবারে ঠাস করে নিচের ফ্লোরে এসে পড়ে৷ সৃজন চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। গলা ফাটিয়ে ডাকে,

“মাআআআআআ?”
কিন্তু কেউ সৃজনের দিকে এগিয়ে আসেনা। কাজের লোকগুলো বোধয় অন্যদিকে ব্যস্ত। আর সৃজনের বাবা-মা তো জে’লে, যারা আদোও বেঁচে আছে কি-না সন্দেহ! তারা কিভাবে আসবে তাদের জানের টুকরোকে বাঁচাতে?
সৃজন মাথায়, চোখে প্রচন্ড ব্যথা পেয়ে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। অস্পষ্টস্বরে আওড়ায়,
“মা আমি বিতা পিয়েচি মা। তুমি কুতায় মা? মা মা?”
কাঁদতে কাঁদতে অস্পষ্টস্বরে কথাগুলো আওড়াতে আওড়াতে সৃজন নিশ্চুপ হয়ে যায়। চোখ দু’টো বন্ধ হয়ে আসে। কান্নার আওয়াজ একেবারে থেমে যায়। নিচের ফ্লোরে এক কোণায় ছোট্ট সৃজনের নিথর দেহখানা পড়ে থাকে। কেউ এগিয়ে আসেনা। সন্ধ্যা যার জন্য এতোদিন বেঁচেছিল, যার কান্না শুনলে সব ভুলে ছুটে আসতো, যাকে সবসময় নিজের বুকে শক্ত করে চেপে আগলে রাখতো, সেই সৃজনের আজ করুণ অবস্থা, কিন্তু সন্ধ্যা তার সেই জানবাচ্চাটার খবরটুকু-ও পেল না। তার যে নিজেরই নিথর দেহ জে’লের এক কোণায় পড়ে আছে। সে কি করে তার তার জানবাচ্চার খবর পাবে? কি করে তার জানবাচ্চার বিপদে ছুটে আসবে? কি হলো তাদের সাথে? আকাশ-সন্ধ্যা-সৃজন তিনটে জীবনের সমাপ্তি কি এখানেই ঘটে গেল? তাদের কি এটুকুই হায়াত ছিল?

“তারপর কি হলো?” মাহদির ব্যস্ত কণ্ঠ।
বিকেলের আমেজ ধরনীর বুক থেকে মুছতে শুরু করেছে। এলেমেলো বাতাস অনবরত ছোটাছুটি করছে। দশতলা বিল্ডিং এর ছাদের রেলিঙের উপর দাঁড়ানো সৃজন রাজ নওয়ান। চশমার আড়ালে চোখদু’টো অসম্ভব লাল। পরনে কালো রঙের গ্যাবার্ডিন প্যান্ট, গায়ে সাদা রঙের শার্ট। দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে রাখা। সোনালি চোখের মণি দু’টো মেঘলা আকাশপানে নিবদ্ধ।
সৃজনের নিরবতায় মাহদি বিরক্তি কণ্ঠে বলে,

“আজব পাবলিক তো তুই! গল্পের এরকম মোমেন্টে থামলি কেন? তারপর বল কিভাবে কি হলো?”
সৃজন ডান পকেট থেকে সিগারেট বের করে দুই ঠোঁটের ফাঁকে রাখে। বাম পকেট থেকে লাইটার বের করে সিগারেটে আ’গু’ন ধরায়। এরপর লাইটার পকেটে রেখে বা হাত পকেটে রেখে ডান হাতের দু’আঙুলের সাহায্যে সিগারেটটি চেপে ধরে। এরপর খুব মনোযোগের সহিত শূণ্যে ধোঁয়া ছুড়তে থাকে।
মাহদি চরম বিরক্ত হয়ে বলে,
“বলবি তুই? বা’লডা। এমন এক জায়গায় এসে থামলি, তো গল্পটা বলতে এসেছিলি কেন? উফফফ! গল্প শুনে তো মনে হচ্ছে তোরা তিনটেই ম’রে গেছিলি। তাহলে এতো বড় বড় হয়ে কোথা থেকে বেরোলি বাপ? ফটাফট বাকি গল্প বল।”
মাহদির কথায় সৃজন বিরক্ত হয়। সিগারেটের আগায় জমা ছাই টোকা দিয়ে ফেলতে ফেলতে গম্ভীর গলায় বলে,

“মুড নেই।”
মাহদি আসমান থেকে পড়ার মতো করে বলে,
“হোয়াট দ্য ফুচকা! মুড নেই মানে কি? কি বিচ্ছিরি মুড তোর! ছ্যাহ! দ্রুত মুড আন বলছি। নয়তো তোকে তো…..
কথাটা বলতে বলতে মাহদি রেলিঙের উপর দাঁড়ানো সৃজনের পা বরাবর একটি থা’প্প’ড় মা’র’তে চায়, তার আগেই সৃজন উল্টোদিক ফিরে একটা লাফ দিয়ে ছাদের মেঝেতে এসে দাঁড়ায়। মাহদি কিছু বোঝার আগেই মাহদিকে জোরেসোরে একটা ধাক্কা দেয়। ফলস্বরূপ মাহদি চটকে গিয়ে ছাদের বাইরে পড়ে। বেচারা কিছুই বুঝল না, হঠাৎ চোখের পলকে কি হলো কে জানে! বেচারা ভেবেছে আজ সে শেষ। দু’চোখ খিঁচে নিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে ওঠে,
“মামুনি বাঁচাচাচাওওওওওও।”
কয়েক সেকেন্ডের মাথায় মাহদির মনে হলো সে আসলে পড়েনি, মনে হচ্ছে সে ঝুলছে। অতঃপর ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকালে দেখল সৃজন তার বাম হাত বাড়িয়ে তার বা হাত ধরে রেখেছে। ডান পা রেলিঙের উপর উঠানো। ডান হাতে আরামসে সিগারেট ফুঁকছে। দৃষ্টি কোনদিকে কে জানে! মাহদি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এ যাত্রায় সে বেঁচে গেছে। অতঃপর হাঁপানো কণ্ঠে বলে,

“আমাকে তোল।”
সৃজন ছোট করে বলে, “মুড নেই।”
মাহদি হা করে তাকালো। তাকে ঝুলিয়ে রেখে বলছে, তোলার মুড নেই! কি পরিমাণ বে’য়া’দ’ব ভাবা যায়! মাহদির ইচ্ছে করল, তার এই বন্ধু নামে শ’ত্রুকে কাঁচা চিবিয়ে খেতে। কিন্তু নিজের রা’গ আপাতত চেপে রাখলো। নয়তো এই দশ তলার উপর থেকে পড়লে তার ম’র’ণ নিশ্চিত। অতঃপর মাহদি অসহায় কণ্ঠে বলে,
“এ ভাই আমাকে তোল। তুই আমার জান্টুস, মান্টুস, খান্টুস, সান্টুস….”
সৃজন মাহদির দিকে চেয়ে ধমক দেয়, “সাটআপ।”
ঝুলন্ত মাহদি বন্ধুর ধমক খেয়ে ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। অসহায় কণ্ঠে বলে, “দয়া করে আমাকে তোল। এই দশ তলা থেকে একবার পড়লে আমি বাঁচবো না। অকালে আমার বাবা মা আমাকে হারিয়ে এতিম হয়ে যাবে। তুই আমার বাবা-মাকে এভাবে এতিম করতে পারিস না!”
সৃজন বিরক্তিকর চোখে তাকিয়ে বলে,

“বাবা মা মা’রা গেলে ছেলেমেয়ে এতিম হয়, ছেলে মা’রা গেলে বাবা মা এতিম হয়না।”
মাহদি পাত্তা না দিয়ে বলে,
“আরে ওই একই হলো। উল্টে গিয়ে যেমন পাল্টে যায়, তেমন পাল্টে গিয়ে উল্টে যায়। এবার আমাকে তোল রাজবাবু।”
সৃজন ভাবলেশহীনভাবে বলে, “নো।”
মাহদি চেঁচিয়ে ওঠে,
“কিহ? নো মানে? ছ্যা ছ্যা ছ্যাহ! বন্ধু হয়ে বন্ধুকে মা’র’তে চাইছিস? ওগো আল্লাহ্, এমন নির্দয় বন্ধু তুমি কাউকে দিওনা গোওও….”
বন্ধুর রাগান্বিত দৃষ্টি দেখে মাহদির গোল করে রাখা মুখ বন্ধ হয়ে যায়। ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলে,
“না মানে আমি বলতে চাইছিলাম, তোর মতো বন্ধু যেন সবার ঘরে ঘরে হয়। এই কথাটাও একটু উল্টে গিয়ে পাল্টে গেছে। চরি রাজবাবু!”

সৃজন কিছু বলল না৷ তার দৃষ্টি ঘুরে যায় বিল্ডিংয়ের সামনে বাগানে। খুবই মনোযোগ দিয়ে কিছু দেখতে ব্যস্ত সে।
মাহদি হতাশার শ্বাস ফেললো। এমন ঝুলে থাকতে কার ভালো লাগে? বুক ধুকধুক করছে বেচারার। এ যখন টেনে তুলবে তখনই তার গতি হবে সে জানে। তাই সে-ও চুপচাপ মেনে নিল তার বন্ধু নামে শ’ত্রুর মুড হওয়ার। কিছু একটা ভেবে বলে,
“তুই চশমা পরিস কেন? তোদের বংশে তো কেউ এমন নেই।”
সৃজন ঠোঁটের ফাঁক থেকে সিগারেট সরিয়ে উত্তর করে, “ছোটবেলায় সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে চোখে ব্য’থা পেয়েছিলাম, তাই।”
মাহদি মুখ গোল করে বলে,

“ওওওও। আমি এটাই আন্দাজ করেছিলাম। কিন্তু সেই অধীরের প্রতি তোর এতো টান কেন? যা বুঝলাম, ওই লোকটার জন্য তোর বাবা-মা সবচেয়ে বেশি সাফার করেছে।”
মাহদির কথা শুনে সৃজন বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। এরপর বলে,
“অধীর আব্বু আমার আইডল।”
মাহদি চোখ ছোট ছোট করে বলে,
“এতো খা’রা’প মানুষ কারো আইডল হয়?”
সৃজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ১৭ বছর আগে অধীর তাকে বলেছিল, ‘তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও বাবা। আর অবশ্যই আমাকে ভুলে যেও।’
১৭ বছর পর, আজ সৃজনের বয়স এসে ঠেকেছে ২১ বছরে। আর সে অধীরের ব্যাপারে জানার পরেরদিন থেকে কখনো ভুলে যায়নি। সবসময় মনে রেখেছে। সৃজন দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
“যে অনুতপ্ত হয়ে চার বছরের বাচ্চার পা ধরে ক্ষমা চেয়েছে, বন্ধুর জন্য নিজের ভালোবাসা ত্যাগ করেছে, আমার বাবা-মায়ের জন্য এই দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেছে, সে একহাজারবার সৃজন রাজ নওয়ান এর আইডল প্লাস ভালোবাসা। বাট আই হেইট দ্যট লাভ। যে ভালোবাসা মানুষের প্রাণ কে’ড়ে নেয়। সেই ভালোবাসার উপর আমি থুতু ফেলি। ডিজগাস্টিং লাভ!”
মাহদি ভ্রু কুঁচকে বলে,

“কোনোভাবে তোর অধীর আব্বুর বন্ধুর দিকটার জন্য তাকে আইডল মানিস না-কি? কিন্তু এটা তো ডাহা মিথ্যা কথা। কারণ তোর দিন শুরুই হয় আমার মতো নিষ্পাপ বাচ্চার উপর অ’ত্যা’চা’রে’র মাধ্যমে।”
সৃজন কিছু বলল না। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ বাগানে। যেখানে ১৬ বছরের একটি মেয়ে বেশ অনেকক্ষণ যাবৎ কোমর দুলিয়ে নাচছে। মেয়েটির মুখের গড়ন অনেকটাই সন্ধ্যার সাথে মিলে যায়। যার মধ্যে অন্যতম লক্ষণীয় দু’টো বৈশিষ্ট্য হলো, গায়ের শ্যামলা রঙ আর লম্বা চুল। মেয়েটির পরনে পার্পেল রঙের একটি গোল জামা সাথে পায়জামা। জর্জেট ওড়না কোমরে বেঁধে রেখেছে। যদিও এতোদূর থেকে গান শোনা যাচ্ছে না। তবে দেখে বোঝা যাচ্ছে গানের তালে তালে হাত-পা নাড়িয়ে নাচছে। মেয়েটির হাঁটুসমান চুলগুলো ছেড়ে দেয়া। নাচের তালে তালে যা দুলছে বেশি।
মেয়েটির থেকে কয়েক হাত দূরত্বে আরেকটি মেয়ে দাঁড়িয়ে, যার বয়স ১৫ বছর। মেয়েটি ১৬ বছরের মেয়ের দিকে একটি ফোন ধরে রেখেছে। নাচের ভিডিও করছে বোধয়।
সৃজনের কপালে বিরক্তির ভাঁজ। সময়ের সাথে সাথে ছেলেটার বিরক্তির মাত্রা বাড়লো বই কমলো না। কয়েক সেকেন্ডের মাথায় সৃজন তার ঠোঁটের ফাঁকে আধখাওয়া সিগারেটটি চেপে সামান্য ঝুঁকে মাহদিকে টেনে ছাদের মেঝেতে ওঠায়। মাহদি এতক্ষণ পর একটু ঠিক করে শ্বাস নেয়। দু’হাতে শরীর ঝাড়তে থাকে। দেখার চেষ্টা করে কোথাও লেগেছে কি-না!

সৃজন বাগানের সেই নৃত্যরত মেয়েটির দিকে চেয়েই দু’হাতের কনুই সমান সাদা শার্টের গুটানো হাতা আরেকটু গুটিয়ে নেয়। ফর্সা গাল ভর্তি চাপ দাঁড়িতে কয়েকবার ডানহাত বুলালো। চশমার আড়ালে দৃষ্টিজোড়া মেয়েটির থেকে এখনো সরেনি। কিছু ভাবছে মনে হচ্ছে। ছোট্ট হয়ে আসা সিগারেটটি ছুঁড়ে ফেলে হঠাৎ-ই সৃজন সামান্য ডানদিকে ঘুরে মাহদির পকেট থেকে মাহদির ফোন বের করে। মাহদি ভ্রু কুঁচকে তাকায়। বুজল না এ কি করতে চাইছে। সে কিছু বলার আগেই সৃজন সূক্ষ্মচোখে তার লক্ষ্য অনুযায়ী দক্ষহাতে তার হাতের ফোন ঠিক সেই নৃত্যরত মেয়েটির মাথা বরাবর ছুড়ে মা’রে। সৃজনের চোখ কিছুক্ষণ আগে দুঃখের কারণে যেটুকু লাল ছিল, এখন তা রা’গের কারণে কয়েকশগুণ বেড়ে গিয়েছে।

এদিকে নিজের ফোন সৃজনকে ছুঁড়ে ফেলতে দেখে মাহদি চেঁচিয়ে ওঠে, “আরে আমার ফোওওও…..
ছেলেটা থেমে গেল সামনের বাগানে তাকিয়ে।
সৃজনের ছুড়ে মা’রা ফোন তার লক্ষ্য অনুযায়ী নৃত্যরত মেয়েটির ডানদিকে একদম কপাল বরাবর গিয়ে লাগে। মেয়েটি ব্যথা পেয়ে মৃদু আ’র্ত’না’দ করে ওঠে। নৃত্যরত হাত পা সব থেমে যায়। ডান হাতে কপাল চেপে ধরে। সামনে দাঁড়ানো ১৫ বছরের মেয়ে সৃষ্টি দৌড়ে আসে মেয়েটির সামনে। ব্যস্ত কণ্ঠে বলে,
“ঈশিতা আপু কি হলো তোমার?”
বেশ ভালোই ব্য’থা পেয়েছে ঈশিতা। মুহূর্তেই চোখের কোণ ভিজে উঠেছে। ডান হাতে কপাল ডলতে ডলতে বলে,
“অনেক শ’ক্ত কিছু এসে লেগেছে মনে হচ্ছে। উফফ! অনেক ব্য’থা পেয়েছি রে সৃষ্টি।”
সৃষ্টি অসহায় চোখে তাকালো। আশেপাশে তাকিয়ে কিছু খুঁজলে দেখল ঈশিতার পায়ের কাছে একটি ফোন পড়ে আছে। সে ব্যস্তহাতে ফোনটি তুলে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখে বলে,

“আরে এই ফোন তো আমি ভাইয়ার হাতে অনেকবার দেখেছিলাম।”
কথাটা বলতে বলতে সৃষ্টি আশেপাশে তাকালো। এদিক-ওদিক খুঁজতে খুঁজতে ছাদের দিকে দৃষ্টি গেলে সৃষ্টির কপালে ভাঁজ পড়ে। যদিও দূরত্ব বেশ। তবে সৃজনকে চিনতে অসুবিধা হলো না। ততক্ষণে ঈশিতাও ছাদের দিকে তাকিয়েছে। ছাদের কোণায় সৃজনকে দেখে তার চোখ দু’টো বড় বড় হয়ে যায়। কোমরে বেঁধে রাখা ওড়না ব্যস্ত হাতে খুলে মাথাসহ নিজেকে পুরো ঢেকে নিয়ে হাসফাস কণ্ঠে বলে,
“তোর ভাই বাড়ি আছে, আমাকে বলিস নি কেন বে’য়া’দ’ব? ইশ! তোর এই জ’ল্লা’দ ভাই-ই আজ আমার মাথা ফাটাতে চাইছিল। কোনদিন যেন গলা কে’টে দিবে। গেলাম আমি।”
কথাগুলো বলতে বলতে ঈশিতা কোনোরকমে তার দু’পায়ে জুতো পরে একপ্রকার দৌড় দিল। সৃষ্টি অসহায় কণ্ঠে বলে,

“ঈশিতা আপু কই যাও? আমি নিজেই জানতাম না সৃজন ভাইয়া আজ বাড়িতে। তুমি আমার রুমে থাকলে কোনো প্রবলেম হবে না। ঈশিতা আপু?”
ঈশিতা সামনের দিকে দৌড়াতে দৌড়াতে হাত নেড়ে বলে,
“আরেকদিন আসবো পাখি। আজ বাই বাই।”
কয়েক পা সামনে এগোতেই সামনে ইরা আর সৌম্যকে দেখে ঈশিতা থেমে গেল। সৌম্য ব্যস্ত কণ্ঠে বলে,
“কি হয়েছে মা? এভাবে দৌড়াচ্ছ কেন?”
ঈশিতা সৌম্য’র হাত টেনে ধরে বলে,
“বাবা আমাকে এক্ষুনি বাড়ি যেতে হবে। তোমরাও চলো।”
সৌম্য ভ্রু কুঁচকে বলে, “কেন? তুমি যে বললে, আজ সৃষ্টির সাথে থাকবে!”
ঈশিতা কি বলবে বুঝল না। সে কি জানতো না-কি তার ফুপির এই বে’য়া’দ’ব ছেলে আজ এখানে আছে। জানলে জীবনেও আসতো না। ঈশিতা আমতা আমতা করে বলে,
“আমার বা’থ’রু’ম পেয়েছে বাবা, প্লিজ চলো।”
ইরা চোখ ছোট ছোট করে বলে,

“বা’থ’রু’ম তো এই বাড়িতেও আছে। কি লুকাচ্ছ তুমি আমাদের থেকে?”
ঈশিতা ইরার দিকে চেয়ে মেকি রা’গ দেখিয়ে বলল, “তুমি চুপ থাকো তো বাবার পাকনা ইরাবতী। এই বড়লোকি বাড়িতে আমার বা’থ’র’ম বের হয় না। এবার চলো।”
কথাটা বলে ঈশিতা সৌম্যর হাত ধরে টানতে থাকে। এদিকে সৌম্য আর ইরা একে-অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। ইরা রে’গে বলে,
“ওকে কিছু বলবে তুমি?”
সৌম্য গলা ঝেড়ে বলে,
“কি বলব?”
ইরার কটমট চোখে তাকিয়ে বলে,

“কিছু না। তুমি বরং ওকে মাথায় উঠাতে উঠাতে চাঁদের দেশে পাঠিয়ে দাও।”
কথাটা বলেই ইরা উল্টো ঘুরে ধুপধাপ পা ফেলে সামনের দিকে এগোয়। ঈশিতা আর সৌম্য দু’জন দুজনার দিকে তাকায়। ঈশিতা বাবার অসহায় মুখ দেখে মিটিমিটি হেসে বলে,
“চাপ নিও না বাবা। ১০ টাকার ফুল দিলেই তোমার ইরাবতী পটে যায়। তোমার আবার এতো চিন্তা করা লাগে?”
সৌম্য কিছুটা বিব্রতবোধ করল। ঈশিতা বুঝতে পেরে হাসল। বলল,
“তোমার বউয়ের দাম ১০ টাকা। আর আমার দাম হাজার কোটি টাকা। কারণ তোমার বউকে ১০ টাকা দিলেই পটে যায়। কিন্তু আমাকে কেউ হাজারকোটি টাকা দিয়েও পটাতে পারবে না। বুঝলে তো বাবা, কেমন সস্তা বউ পেয়েছ তুমি? আর আমি হলাম তোমার দামী মেয়ে। তাই সব চিন্তা বাদ দিয়ে সবসময় তোমার এই দামী মেয়ের পক্ষ-ই নিবে, বুঝলে?”

সৌম্য ডান হাতে তার মেয়ের মুখ চেপে ধরল। অসহায় কণ্ঠে বলে, “চুপ কর। তোমার মা শুনলে আমাকে আস্ত রাখবে না।”
ঈশিতা মিটিমিটি হাসছে।
ওদিকে ইরা উল্টোদিকে ফিরে আবারো সৌম্য’র দিকে রে’গে তাকিয়েছে। সৌম্য একবার ইরার দিকে তাকায়, আরেকবার মেয়ের দিকে তাকায়। ইশ! তার জীবনটা মেয়ে আর মায়ের মাঝে কত ভয়ানকভাবে সবসময় আটকে থাকে।
ঈশিতা ঘাড় ঘুরিয়ে একবার ছাদের দিকে তাকালে এখনও সৃজনকে একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে আবারো ঢোক গিলল। সময় ন’ষ্ট না করে সৌম্য’র হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো বাইরের দিকে। কিছুক্ষণ আগে ইরাও রা’গ করে এদিকে এসেছে।

মাহদি তখন থেকে সৃজনের দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে আছে। তার ফোন ছুড়ে ফেলে বারোটা তো বাজালোই। সাথে মেয়েটার অবস্থাও কাহিল করেছে মনে হয়। অতঃপর মাহদি তার বা হাত সৃজনের ঘাড়ের উপর রেখে হতাশ কণ্ঠে বলে,
“ও তোর-ই মামাতো বোন ভাই। বাচ্চা মেয়েটার সাথে এতো শ’ত্রুতা করে কি লাভ? একটুর জন্য মাথা ফাটেনি বোধয়।”
সৃজন তখনো ঈশিতার দিকে তাকিয়ে শ’ক্ত গলায় বলে, “আই হেইট হার।”
মাহদি আসমান থেকে পড়ার মতো ভান করে তাকালো সৃজনের দিকে তাকিয়ে বলে,

“ওমা তাই? এজন্যই তোর চোখ ঈশিতার উপর থেকে সরে না, তাই না রাজবাবু?”
সৃজন বিরক্ত হয়ে ঈশিতার থেকে চোখ সরিয়ে নেয়। পকেট থেকে আরেকটি সিগারেট বের করে সিগারেট ধরায়।
মাহদি সৃজনের সামনে এসে দাঁড়িয়ে দু’হাতে সৃজনের চাপদাঁড়িতে ভর্তি দু’গাল এদিক-ওদিক নাড়ায় আর বলে,
“বলছি, কোন জিহ্বা দিয়ে এতো বড় বড় সত্যি বলিস বাবু? ওই জিহ্বাটা আমাকে একদিনের জন্য ধার দিবি? বিশ্বাস কর, আমি তোর মতো এতো বড় বড় সত্যি কথা কোনোদিনও বলিনি। একদিনের জন্য হলেও আমাকে তোর এই দামী জিহ্বা টা দিয়ে দে ভাই!”
সৃজন রে’গে গিয়ে ডান হাতে মাহদির গালে একটা ক’ষিয়ে থা’প্প’ড় মে’রে দেয়। মাহদি গালে হাত দিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে। গাল ডলতে ডলতে অসহায় কণ্ঠে আওড়ায়,

“আহ্ আমার দাঁত! এই তোর শরীরে কি দয়ামায়া বলতে কিছু নেই? আমার দাঁত পড়ে গেলে আমাকে কেউ বিয়ে করবে? অকালে আমার বউটা আমিহীনা এতিম হতে যাচ্ছিল। ভাগ্যিস দাঁতগুলো পড়েনি।”
মাহদির আজাইরা কথা কানে নিল না সৃজন। সে চুপচাপ সিগারেট ফুঁকছে। দৃষ্টি তাদের বাড়ির মেইন গেইটের দিকে। কিছুক্ষণ আগে যেদিক দিয়ে ঈশিতা তার বাবা মাকে নিয়ে বেরিয়ে গেছে, এখন আর কেউ নেই। এর ফলে সৃজনের মাঝে তেমন কোনো প্রভাব পড়ল বলে মনে হলো না। উল্টে সে হয়ত এটাই চাইছিল। যার ফলে এখন সে আগের অনেকটা ঠান্ডা হয়েছে।
বেখেয়ালে সৃজন উল্টো ঘুরলে চোখে পড়ে দরজার কাছে সন্ধ্যা দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ মাকে এখানে দেখে সৃজন ভ’য় পেল বলে মনে হলো। ফলস্বরূপ দু’বার কাশি উঠে যায় তার। সন্ধ্যা তাকে দেখার আগেই সৃজন দ্রুত উল্টো ঘুরে দাঁড়ায়।

সন্ধ্যা ছাদের গেইটের কাছে দাঁড়িয়ে একজন বয়স্ক মহিলার সাথে কথা বলছিল। কাশির শব্দ শুনে কথা বলতে বলতে একবার ঘাড় বাঁকিয়ে আশেপাশে তাকিয়েছিল, কিন্তু তেমনকিছু চোখে না পড়ায় সে আবারো কথা ব্যস্ত হয়।
এদিকে সৃজন উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁটের ফাঁকে এখনো সিগারেট। সে জানে সন্ধ্যা একটু পরেই তার দিকে আসবে তার সাথে কথা বলার জন্য। কিন্তু সৃজন তার মায়ের সাথে কিভাবে কথা বলবে? সে সিগারেট খায়, এটা তার মা জানলে কে’লে’ঙ্কা’রি হয়ে যাবে। এমন নয় যে সন্ধ্যা এটা জানলে তাকে অনেক বকবে বা মা’র’বে। তার মা এসব কিছুই করবে না। বড়জোর তার দিকে এমনভাবে তাকাবে, যে দৃষ্টিতে মিশে থাকবে অনেক দুঃখ! হয়তোবা তার সাথে ঠিক করে কথাও বলবে না। কিন্তু সৃজন এসবের কিছুই তার মাকে দিতে পারবে না। তার মনে পড়েনা, বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে সে তার মাকে ইচ্ছে করে কখনো একবিন্দু দুঃখ-ক’ষ্ট দিয়েছে। কিন্তু এখন কি করবে সেটাই বুঝতে পারছেনা। হঠাৎ করে ভীষণ হাইপার হয়ে গিয়েছে ছেলেটি।
এদিকে মাহদি সৃজনের ব্যাপারটা বুঝতে মিটিমিটি হেসে বলে,

“লাললাললা আজকে আমার বাবুটাকে কট খাওয়াবো। এক্ষুনি খাওয়াচ্ছি বাবু, দাঁড়া।
সৃজন কটমট দৃষ্টিতে তাকায় মাহদির দিকে। মাহদি মেকি হেসে বলে,
“আরে চাপ নিচ্ছিস কেন? তুই দু’টো খেয়েছিস। আমি তোর মাকে বলব, তুই বেশি সিগারেট খেতেই পারিস না। মাত্র এক প্যাকেট খেয়েছিস। দয়াল মানুষ আমি। বুঝিস-ই তো ব্যাপারটা।
কথাটা বলে মাহদি সন্ধ্যার দিকে চেয়ে ডাকতে নেয়, “আ….
তখনি সৃজন তার জ্ব’ল’ন্ত সিগারেট মাহদির মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে মাহদির মুখ চেপে ধরে। মাহদি চোখ বড় বড় করে তাকায়। সৃজন পাত্তা দিল না। সে তার নাকমুখ দিয়ে বের হওয়া ধোঁয়া বা হাত দিয়ে সরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বেশ কিছুক্ষণ পর
মাহদির দিকে চোখ পড়লে দেখে মাহদির চোখমুখ লাল হয়ে গিয়েছে। সৃজনের খেয়ালে আসে সে রে’গে গিয়ে কি করে ফেলেছে। নিজের কান্ড দেখে নিজেই থতমত খেয়ে যায়। টেনশন আর রা’গে কি করে ফেলেছে বুঝতেই পারেনি। এখন বুঝতে পেরে দ্রুত মাহদির মুখের ভেতর থেকে সিগারেট বের করে ছাদের বাইরে ছুঁড়ে ফেলে।
মাহদি রা’গে কাঁপছে। তার মুখ থেকে শুরু করে পায়ুপথ পর্যন্ত মনে হয় ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে গেছে। সৃজনের দিকে চেয়ে সে দাঁত কিড়মিড় করে বলে, “এ্যাই বে’য়া’দ’ব তুই কি মানুষ?”

সৃজন মাহদির কথা পাত্তা দিল না। সে মাহদির পকেট হাতাতে ব্যস্ত। কোনো চকলেট বা চুইনগাম পায় কি-না এজন্য। নয়তো মায়ের সাথে এভাবেই কথা বলতে গেলে মা বুঝে যাবে সে সিগারেট খায়। মাহদি রে’গে সৃজনকে একটা ধাক্কা দেয়। সৃজন দু’পা পিছিয়ে যায়। রে’গে তাকায় মাহদির দিকে। এগিয়ে এসে দু’হাতে মাহদির কলার চেপে ধরে বলে, “আমার মুখ ফ্রেশ করার ব্যবস্থা কর, কুইক!”
মাহদি হা করে তাকালো। একে কি করা উচিৎ? বে’য়া’দ’বটা সিগারেট খেয়ে, এখন তাকে বলছে মুখ ফ্রেশ করে দিতে। এমনিতেই তার মুখে সিগারেট ঢুকানোয় ইচ্ছে করছে একে কাঁচা চিবিয়ে খেতে। ভাগ্যিস মুখটা হা ছিল, নয়তো মুখ পুরো পু’ড়ে যেত। হা করে থাকায় সে বেঁচে গেছে। মাহদি রে’গে বলে,

“আমার পকেটে সিগারেট ছাড়া কিছু নেই। তাছাড়া আমাকে কি তোর হাত মোছার টিস্যু মনে হয়? দরকার লাগলে এটা দে ওটা দে। আর না হলে মা’রা’র প্ল্যান করিস বে’য়া’দ’ব!”
সৃজন মাহদির কলার ছেড়ে দাঁড়িয়ে বলে,
“আমার কি মাথা খারাপ? আমি তোকে এতো দামী টিস্যু মনে করব কেন? তোকে আমি টয়লেট টিস্যু মনে করি, ক্লিয়ার?”
মাহদি বাকহারা হয়ে তাকালো সৃজনের দিকে। ইয়া আল্লাহ্ কোন পা’পের কারণে তার ভাগ্যে এমন বন্ধু জুটেছিল? মাহদি হতাশ। অসহায় কণ্ঠে বলে,

“আজ তোদের বাড়ি একটা কচু গাছ নেই বলে আমি গলায় ফাঁ’স দিতে পারলাম না! নয়তো তোর মতো স্বা’র্থ’পর বন্ধুর জন্য আমি আজকেই কচু গাছের সাথে গ’লায় দ’ড়ি দিয়ে আমার লা’শ ফেলে দিতাম তোদের বাড়ির সামনে।”
মাহদির আজগবি কথায় বিরক্ত হলো। কিন্তু কিছু বলল না। সে উল্টোদিকে ফিরে সন্ধ্যার দিকে তাকায়। এতক্ষণে মুখ থেকে ধোঁয়া চলে গিয়েছে। কিন্তু গন্ধ দূর করবে কি করে সেটাই ভাবছে।
সন্ধ্যা ভদ্রমহিলার সাথে এখনো কথা বলায় ব্যস্ত।
মাহদি বেশ কয়েকবার থুতু ফেললো। কিছু ছাই মুখে ঢুকে গিয়েছিল। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছল সে। এরপর সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে সৃজনের উদ্দেশ্যে হতাশার সুরে বলে,
“এতো সুন্দর মানুষের ছেলে তোর মতো বে’য়া’দ’ব হতে পারে, তোকে না দেখলে এটা কখনো জানতেই পারতাম না।
মাহদির কথা সৃজনের মাঝে তেমন কোনো প্রভাব ফেললো না। মাহদি হুট করেই একেবারে নরমাল হয়ে গেল। তার ডান হাত সৃজনের ঘাড়ে তুলে বলল,

“তোর মাকে দেখে বিন্দুমাত্র বোঝা যায় না, উনার তোর মতো বয়সী একটা ছেলে আছে। তোর মায়ের আবার বিয়ে দেয়া যাবে ভাই।”
শেষ কথাটা মাহদি খুব উৎসাহের সাথে বলল। সৃজনের ধ্যান মাহদির কথায় ঘুরে এলো। দৃষ্টি সন্ধ্যার দিকে। সন্ধ্যার পরনে ধূসর রঙের একটি শাড়ি। শাড়িটি কুচি করে পরা। সাদা ব্লাউজের হাত দু’টো ফুলহাতা। মাথায় একটি সাদা ওড়না টানা। এটাই সন্ধ্যার সবসময়ের বেশভূষা। ঘরের ভেতর থাকলে শুধু ওড়নাটা খুলে রাখে। মজার ব্যাপার হলো, সৃজন তার মায়ের সাথে কোথাও গেলে, অপরিচিত অনেকের থেকে শুনতে হয়,
‘সৃজন সন্ধ্যার ছোট ভাই কি-না!’ এ পর্যন্ত সন্ধ্যা আর সৃজন অনেকবার এই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। কথাটা ভেবে সৃজন সূক্ষ্ম হাসলো। অতঃপর মৃদুস্বরে বলে,
“ছেলে দেখ তবে!”

সৃজনের কথা শুনে মাহদি কেশে ওঠে। সৃজনের ঘাড় থেকে দ্রুত হাত সরিয়ে নেয়। এ যা ছেলে, দেখা যাবে সত্যি সত্যি এ নিজেই এর মায়ের বিয়ে ঠিক করেছে। তখন এর বাপ এসে তাকে ধোলাই করবে, এসব অ’শুভ কথা মুখ দিয়ে বের করায়। কোন দুঃখে যে কথাটা বলতে গেল!
এদিকে সৃজনের দৃষ্টি ঘুরে ছাদের ডানদিকে যায়। যেখানে আকাশ আর সৃষ্টি একসাথে দাঁড়িয়ে আছে। দু’জনেই উল্টোদিকে ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। সৃষ্টি আকাশের বা হাত জড়িয়ে ধরে রেখেছে। আকাশের পরনে সাদা পাঞ্জাবি। ড্রেসটা সৃজনের বিরক্ত লাগে। কিন্তু মায়ের জন্য কিছু বলতে পারেনা। সে এসব ভাবনা চেপে ব্যস্ত পায়ে আকাশের দিকে এগিয়ে গেল।

সৃজন আকাশের পাশে এসে দাঁড়িয়ে কিছু না বলেই আকাশের পাঞ্জাবির ডান পকেটে হাত দেয়। আকাশ বাদিকে ফিরে সৃষ্টির সাথে কথা বলছিল। পকেটে টান পড়ায় ঘাড় বাঁকিয়ে ডানদিকে তাকায়। ততক্ষণে সৃজন আকাশের পকেট থেকে একটি ছোট্ট মাউথ-ওয়াশ এর কৌটা বের করে সামান্য পরিমাণ মুখে নিয়ে কয়েকবার কুলি করে। আকাশ চোখ ছোট ছোট করে তাকায় ছেলের দিকে। কিছু বুঝল বোধয়। অতঃপর বলে,
“ভালো হয়ে যাও সৃজন। ভালো হতে পয়সা লাগেনা।”
সৃজন তার কাজ শেষ করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকায়। হাতের কৌটাটি আকাশের পাঞ্জাবির পকেটে রেখে একই পকেট থেকে একটি সিগারেট এর প্যাকেট বের করে আকাশের সামনে ধরে গম্ভীর গলায় বলে,

“সেইম ঠু ইউ বাবা।”
ছেলের কান্ডে আকাশ থতমত খেয়ে তাকায়। গলা ঝেড়ে বলে, “আমি তোমার বাবা হই।”
সৃজন মৃদুস্বরে বলে,
“এইজন্যই তো বাবার খবর মায়ের কাছে পাস করব৷ কারণ আমি লয়াল ছেলে।”
কথাটা বলে সৃজন আকাশকে পাস করে যেতে নিলে আকাশ সৃজনের হাত টেনে সৃজনকে তার সামনে এনে দাঁড় করায়। দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“আমার পিছে পড়লে কেন? কি চাইছো তুমি?”
সৃজন ভাবলেশহীনভাবে বলে,
“তোমার বউকে আবার বিয়ে দিতে চাইছি।”
আকাশ হতভম্ব কণ্ঠে বলে, “হোয়াট?”

আকাশের পাশে দাঁড়ানো সৃষ্টিও অবাকচোখে তাকায় সৃজনের দিকে। রা’গ হচ্ছে তার। একে তো সৃজনের জন্য ঈশিতা চলে গিয়েছে। তার ভাই মেয়েটার মাথা ফাটাতে চেয়েছিল। আর এখন কিসব উল্টাপাল্টা বলছে। কিন্তু তার রিয়েক্ট করার সাহস নেই। যদি তাকে মা’রে? নাকের ডগায় রা’গ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। মা-ও শুধু তার ভাইয়ের সাপোর্ট নেয়। তাকে তার বাবাই একটু ভালোবাসে। কথাগুলো ভেবে সৃষ্টি ভাইয়ের দিকে চেয়ে মুখ বাঁকালো।
এদিকে আকাশের রিয়েকশন দেখে সৃজন ঠোঁট চেপে নিজের হাসি আটকালো। ডান হাতে ডান গাল বুলায় আর বলে,
“আমার মা অনেক ইয়াং। তোমার বয়স বেড়েছে। আমার মায়ের পাশে তোমাকে ঠিক মানাচ্ছে না।”
আকাশ রে’গে যাচ্ছে। ইচ্ছে করছে তার বউয়ের সোনার টুকরো ছেলেকে ঠাটিয়ে দু’টো থা’প্প’ড় লাগাতে। অতঃপর রে’গে বলে,

“সন্ধ্যামালতীর জন্য শুধু তুমি আমার হাত থেকে বেঁচে যাও৷ নয়তো তোমার জন্য আমি আমার পুরো বাড়ি লাঠি ভর্তি করে রাখতাম।”
সৃজন অবাক হয়ে বলে,
“কেন তোমার হাতে জোর নেই?”
আকাশ আরও রে’গে যায়। এই ছেলে এমন কেন? শুধু তার পিছে লাগে। জীবনটা ভেজে দেয় একেবারে।
ভাইয়ের কান্ডে সৃষ্টি এবার মিটিমিটি হাসে। সৃজন তার বাবাকে ইচ্ছে করে রাগাচ্ছে বুঝল।
এদিকে আকাশ নিজেকে সামলে বলে,
“আমাকে তুমি বারবার বয়সের খোঁটা দিচ্ছ? আমার এখনো চারটে বিয়ে করার ক্ষমতা আছে, বুঝেছ?”
সৃজন ভ্রু কুঁচকে বলে,
“আমি বুঝে কি করব? এটা মাকে বোঝাতে হবে। তুমি কোনো চিন্তা কর না, আমি নিজ দায়িত্বে আমার মাকে তোমার ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলব।”

আকাশ হতভম্ব হয়ে যায়। ইয়া আল্লাহ! কার সামনে সে এতো বড় স’র্ব’না’শী কথা বলে ফেললো। সৃজন আকাশকে পাশ কাটিয়ে যায়। আকাশ দ্রুত উল্টো ঘুরে বলে,
“তুমি সন্ধ্যামালতীকে কিচ্ছু বলবে না সৃজন। তোমার মা তো একটা গ’ণ্ড’মূ’র্খ আর ছেলের অ’ন্ধ’ভ’ক্ত। আমার হয়েছে যত জ্বা’লা।”
সৃজন সামনে এগোতে এগোতে ছোট করে বলে,
“চিন্তা কর না। তোমার বউকে ঘিরে তোমার সকল কমপ্লিমেন্ট আমি মায়ের কাছে পৌঁছে দিব।”
আকাশ অসহায় চোখে তাকায়। সত্যি সত্যি সৃজন তার সন্ধ্যামালতীকে এসব বললে তার কপালে কত দুঃখ থাকবে কে জানে!
সৃষ্টি বাবার অসহায়ত্বে ঘেরা মুখ দেখে আড়ালে মুখ চেপে হাসলো। আকাশ সন্ধ্যার দিকে চেয়ে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে অসহায় কণ্ঠে বলে,
“তোমার ভাই সন্ধ্যামালতীকে সব বলে দিলে, তোমার মা আমার সাথে কয়দিনের জন্য আলাদা হয়ে যাবে?”
সৃষ্টি বাবার বুকে থুতনি ঠেকিয়ে ঠোঁট উল্টে বলে,
“আমার মনে হয়, মা মামার বাড়ি চলে যাবে। চিন্তা কর না, আমি সব রান্না পারি। আমি তোমার সাথেই থাকবো বাবা।”
আকাশ হতাশার শ্বাস ফেলে মনে মনে আওড়ায়,
“খাবার ছাড়া পেট চললেও, সন্ধ্যামালতী ছাড়া তো আমার চলে না।”

মাহদি রেঙিলের উপর পা ঝুলিয়ে বসে তখন থেকে সৃজনকে দেখছিল আর একটু পর পর হাসফাস করছিল টেনশনে। কে জানে, এই ছেলে এর বাপের সাথে তার মায়ের হবু বরটা পর্যন্ত ঠিক করছে কি-না সেই চিন্তায়।
এদিকে সৃষ্টি মাহদির দিকে তাকিয়ে ভাবছে, তার ভাই নিশ্চয়ই এই বন্ধু নামের অ’বন্ধুর থেকে সিগারেট খাওয়া শিখেছে। তার মা এসব পছন্দ করেনা, অথচ তার ভাই এই বন্ধুর পাল্লায় পড়ে খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এজন্য তার ভাইয়ের বন্ধুকে তার একটুও পছন্দ নয়। কথাগুলো ভেবে সৃষ্টি মাহদির দিকে চেয়ে মুখ ভেঙায়। তখনই মাহদি সৃষ্টির দিকে তাকায়। বাচ্চা মেয়েটাকে নিজের দিকে চেয়ে এভাবে মুখ ভেঙাতে দেখে মাহদি থতমত খেয়ে তাকায়।
এদিকে সৃষ্টি যখনই বুঝেছে মাহদি তাকে দেখে ফেলেছে, সাথে সাথে সে দ্রুত তার মাথা নিচু করে সামান্য বাবার আড়াল হওয়ার চেষ্টা করে।

মাহদি মাথা চুলকায়। ব্যাপারটা কি হলো? এই মেয়ে এমন বাঁদরের মতো করল কেন? বিড়বিড় করে, “লে হালুয়া! আমি আবার কি করলাম?”
মনে মনে ভাবলো, এদের ভাইবোনের প্রবলেম টা আসলে কি? একজন তাকে টয়লেট টিস্যু ভাবে, আরেকজন তাকে বাঁদর টাদর ভাবছে না-কি? হাহ্, সব কপাল!
সৃজনকে এতক্ষণ পর তার দিকে আসতে দেখে মাহদির ধ্যান ভাঙে। দেখা যাক, এ এর বাবার সাথে কি কান্ড ঘটিয়ে এলো। সৃজন মাহদির সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে,
“মুখে আর গন্ধ আছে?”
মাহদি মাথা চুলকে বলতে নেয়,
“তোর মা……
এটুকু বলতেই সন্ধ্যার কণ্ঠ ভেসে আসে,
“সৃজন আব্বা??”

মাহদি থেমে যায়। সৃজনও এক সেকেন্ডও সময় ন’ষ্ট না করে তাকায় মায়ের দিকে। সন্ধ্যা সৃজনের দিকে চেয়ে মৃদু হেসে হাত নেড়ে ইশারায় সৃজনকে তার কাছে ডাকে। সৃজনের বুকে হুট করেই অদ্ভুদ এক প্রশান্তি লাগলো। সে অপলক তার মাকে দেখল। মাহদিকে বলা গল্পগুলো উল্টেপাল্টে সৃজনের সামনে ভেসে উঠল। তার মায়ের জীবনে হাসির মুহূর্ত খুব কম-ই এসেছে। এখনও সে খুব বেশি হাসে না। তবে মাঝে মাঝে কারণ ছাড়াই হাসে। এই যেমন এখন হাসছে। আর সেই মুহূর্তগুলো সৃজনের কাছে হয় সবচেয়ে দামী। ঠিক যেমন এই মুহূর্তটা তার কাছে ভীষণ দামী ঠেকল। মায়ের হাসি অন্যান্য ছেলের কেমন অনুভূতি দেয় সৃজন জানে না। তবে তার কাছে তার মায়ের হাসি শ্রেষ্ঠ মনে হয়। তার মায়ের হাসি তার জীবনের অর্ধেক সুখ।

সৃজন তার দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে রাখল। সন্ধ্যার চোখে চোখ রেখে মাহদির উদ্দেশ্যে বলল,
“আমার দেখা শেষ্ঠ নারী আমার মা ‘মিসেস সন্ধ্যা নওয়ান’, যে ছোট্ট থেকে প্রতিদিন নতুন নতুন ল’ড়া’ই করে আজো অটল পাহাড়ের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। যার সর্বশেষ ল’ড়া’ই ছিল নিজ স্বামীকে জে’ল থেকে মুক্ত করা প্লাস স্বামীর পাথরে রূপান্তিত মনে নতুন করে সন্ধ্যামালতী ফুল ফুটানো। সে আমার বাবা ‘মিস্টার আকাশ ভিরাজ নওয়ান’ এর সন্ধ্যামালতী।”
ছেলের মুখে হঠাৎ নিজের জীবনের একটি সারাংশ শুনতে পেয়ে সন্ধ্যার সারা শরীর বিদুৎের ন্যায় ঝাঁকি দিয়ে উঠল। ঠোঁটের কোণে লেপ্টানো হাসি মিলিয়ে গেল। সৃজনের বলা দু’টো বাক্যের মাঝে তার পুরো জীবনের গল্প খুঁজে পেল সন্ধ্যা। সন্ধ্যার চোখ দু’টো ভরে উঠল। ঝাপসা দৃষ্টিজোড়া সে দ্রুত সরিয়ে নিল ছেলের থেকে। তাকালো আকাশের দিকে৷

আকাশ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ছেলের দিকে। কিছুক্ষণ আগে সৃজনের বলা কথাগুলো নিয়ে সব চিন্তা দূর হয়ে গেল, পরিবর্তে একরাশ মুগ্ধতা কাজ করল ছেলের প্রতি। সৃজন বাবার দিকে চেয়ে সূক্ষ্ম হাসলো। আকাশের চোখে ছেলের হাসি অবশ্য ধরা পড়েনি, তবে সৃজনকে কিছুটা পড়তে পেরেছে বোধয়।
আকাশ তার দৃষ্টি ঘুরিয়ে সন্ধ্যার দিকে তাকায়। চোখাচোখি হয় সন্ধ্যার পানিতে টইটুম্বুর চোখজোড়ার সাথে। আকাশের গলা শুকিয়ে এলো। শুকনো ঢোক গিলল কয়েকবার। করুণ দৃষ্টিজোড়া দিয়ে কয়েক হাজারবার বোধয় সন্ধ্যাকে স্যরি বলল। সন্ধ্যা কি বুঝল আকাশের চোখের ভাষা? বুঝল বোধয়! এজন্যই হয়ত, পানিতে টইটুম্বুর চোখে আরও খানিক অশ্রু জমলো। সে নিঃশব্দে দৃষ্টি ঘুরিয়ে আবারো সৃজনের দিকে তাকালো। সৃজনের চোখে চশমা, এটা মা হিসেবে তার ব্যর্থতার পরিচয়। সে তার ছেলেকে সেদিন রক্ষা করতে পারেনি বলে, তার ছেলের আজ চোখে চশমা। কথাটা ভাবলে সন্ধ্যার মা হিসেবে নিজের কাছে ল’জ্জা লাগে। সেদিন সে তার ছেলেকে একা ফেলে চলে গিয়েছিল বলেই তো তার ছেলের মাঝে এই খুঁত। এর জন্য সে ছাড়া আর কেউ দায়ী নয়। কথাগুলো ভেবে সন্ধ্যার একচোখ বেয়ে ব্য’র্থতা, আফসোস, আক্ষেপের নোনাজল গড়িয়ে পড়ে।
সৃজন ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো সন্ধ্যার সামনে। মায়ের দু’হাত তার দু’হাতের মাঝে নিয়ে মাথা নিচু করে সন্ধ্যার দু’হাত একসাথে করে সৃজন সন্ধ্যার দু’হাতে একটি চুমু আঁকলো। এরপর মাথা তুলে সন্ধ্যার চোখে চোখ রেখে মৃদুস্বরে বলে,

“আমি অনেক ভাগ্য করে তোমার মতো মা পেয়েছি। তুমি ছিলে বলে তোমার ছেলে একেবারে অন্ধ হয়ে যায়নি। সে আজো তার শ্রেষ্ঠ মাকে দেখতে পায়। তোমার ভালোবাসার মানুষকে দেখতে পায়। এই সুন্দর পৃথিবী দেখতে পায়। তাই তুমি আমার মাকে কখনো অকারণে কাঁদিয়ো না।”
সন্ধ্যা কাঁপা হাত ছেলের গালে রেখে ভাঙা গলায় বলে, “তুমি অনেক বড় হয়ে গেছ আব্বা।”
সৃজন একটু হাসলো বোধয়, তবে তা তার মুখাবয়বে সেভাবে প্রকাশ পায়না। সে সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছোট করে ডাকে, “বোনু?”
সৃষ্টি ভাইয়ের দিকে তাকায়। সৃজন চোখের ইশারায় কিছু বোঝাায়। এরপর সৃজন সিঁড়িতে নেমে ডান হাতে মায়ের ডান হাত ধরে মৃদুস্বরে বলে, “মা এসো।”

সন্ধ্যা বা হাতে শাড়ির কুচি ধরে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে।
এদিকে সৃষ্টি ভাইয়ের কথা মেনে বা হাতে তার বাবার পেট জড়িয়ে ধরে বলে, “বাবা এসো।”
মেয়ের কণ্ঠে আকাশের ধ্যান ভাঙে। সে দৃষ্টি এদিক-ওদিক নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। এরপর ডান হাতে মেয়েকে জড়িয়ে নিয়ে ব্যস্তপায়ে এগোয় সামনের দিকে।
মাহদি ছাদের রেলিঙের উপর পা ঝুলিয়ে বসে গালে হাত দিয়ে আওড়ায়, “অস্থির ফ্যামিলি!
সৃষ্টির দিকে চোখ পড়লে তখনকার কথা ভেবে বলে, বাট মেয়েটা পাক্কা বাঁদর!”

সৃজন তার মায়ের হাত ধরে মায়ের পাশাপাশি মায়ের সাথে পা মিলিয়ে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নামছে। পিছু পিছু আকাশ মেয়েকে জড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামছে। দৃষ্টি সন্ধ্যার পানে। ওড়নার ফাঁক দিয়ে সন্ধ্যার হাঁটুর নিচ পর্যন্ত চুলগুলো বেরিয়ে এসেছে। সিঁড়ি বেয়ে নামার ফলে চুলগুলো একেবারে হাঁটুর নিচে এসেই ঠেকেছে। সেই একইরকম কালো চুল। একটুও ছোট হয়নি, একটুও কমেনি, আর না তো রঙ বদলেছে। তার সন্ধ্যামালতী শুধু মনের দিক দিয়ে বদলায়নি এমন নয়, বাহ্যিকভাবেও সে বদলায়নি। আজো সেই একই সন্ধ্যামালতী রয়ে গেছে। আকাশের সন্ধ্যামালতী। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আকাশ সন্ধ্যার দিকে চেয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়তে নেয়, সাথে সাথে সৃষ্টি তার বাবাকে শ’ক্ত করে ধরে। তবে আকাশ সোজা হয়েই দাঁড়িয়ে আছে। দু’পায়ের ভরেই নিজেকে সামলে নিয়েছে। দৃষ্টি তখনো সন্ধ্যার পানে।

একজন বয়স্ক অপরিচিত মহিলা ছাদের দিকে উঠে আসছিল। সে যখন সন্ধ্যার সামনে এসে দাঁড়ায়, তখনই তার চোখে পড়ে আকাশের ব্যাপারটি। সে সন্ধ্যাকে পাশ কাটিয়ে যেতে গিয়েও থেমে যায়। জিজ্ঞেস করে,
“পিছনে ওই পাঞ্জাবি পরা লোকটার তুমি কে হও মা?”
বয়স্ক মহিলার কথায় সন্ধ্যা তাকালো মহিলাটির দিকে। বুঝল সে আকাশের কথা তাকে জিজ্ঞেস করছে। কিন্তু কেন করছে, তা বুঝল না। ভাবনার মাঝেই মহিলাটি আবারো বলে,
“তোমার দিকে তাকিয়ে হাঁটতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছিল, তাই জিজ্ঞেস করলাম। কিছু মনে কর না মা।”
কথাটা শুনতেই সন্ধ্যার বুক ধড়ফড় করে উঠল। সে দ্রুত মাথা ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো আকাশ ঠিক আছে কি-না দেখতে। চোখাচোখি হলো আকাশের সাথে। মেয়েকে জড়িয়ে আকাশকে একদম সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সন্ধ্যা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। আকাশ কিছুটা বিব্রতবোধ করলেও সন্ধ্যার থেকে দৃষ্টি সরালো না। বরং সূক্ষ্ম হাসলো।

আকাশের হাসি, সাথে আকাশ তার দিকে তাকিয়ে হাঁটতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছিল কথাটা ভাবতেই সন্ধ্যার হৃদযন্ত্র লাফাতে লাগলো। কেন-ই বা এমন অনুভূতি হবে না সন্ধ্যার? একসময় এই মানুষটাই তার থেকে একেবারে মুখ নিয়েছিল। তার শুভ্র পুরুষ তার দিকে তাকাতো না। তাকে সন্ধ্যামালতী বলে ডাকতো না। কতগুলো দিন, কতগুলো মাস সে ওই ম’র’ণ য’ন্ত্র’ণার মাঝে ডুবে ছিল সে খবর একমাত্র সে আর তার আল্লাহ জানে। আর তারপর আকাশ স্বাভাবিক হওয়ার কত বছর পেরিয়ে গেল, কিন্তু আকাশের সেই ব্যবহারের রেশ আজো সন্ধ্যার মন থেকে মুছে যায়নি। তাইতো আকাশের সামান্য যত্ন, সামান্য ভালোবাসা পেলে আজো সন্ধ্যার সেই প্রথমদিনের মতো অনুভূতি হয়। সন্ধ্যা আকাশের দিকে ঝাপসা চোখে চেয়ে ভাঙা গলায় দৃঢ়ভাবে উচ্চারণ করে,
“আমি তার সন্ধ্যামালতী।”

কথাটা বলতে গিয়ে সন্ধ্যার দু’চোখ বেয়ে জল গড়ালো। এই অশ্রুতে অতীতের কতশত য’ন্ত্র’ণা মিশে আছে তা কি আকাশ বুঝল? বুঝল বোধয়। না বোঝার তো কথা নয়। সবকিছুই তো জানা আকাশের। তার সন্ধ্যামালতীর দুঃখের সাক্ষী সে ছাড়া আর কেউ ছিল না যে!
সন্ধ্যা দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় আকাশের থেকে। এরপর মহিলাটির পাশ কাটিয়ে সৃজনের হাত শ’ক্ত করে ধরে সামনে এগোয়। মায়ের উত্তরে সৃজন বোধয় একটু হাসলো, কারণ সে জানতো, তার মায়ের উত্তর এটাই হবে।
এদিকে সন্ধ্যার উত্তরের মানে ভদ্রমহিলা বুঝল না। কারণ সন্ধ্যামালতী একটি ফুল, কোনো সম্পর্কের নাম তো নয়। সে এসব ভাবনা রেখে উপরের দিকে উঠতে লাগলো।
ছাদ থেকে কয়েক সিঁড়ি নিচে আকাশ দাঁড়িয়ে। তার দৃষ্টি ব্যস্ত পায়ে পালিয়ে যাওয়া সন্ধ্যার পানে। একসময় সন্ধ্যা তার মুখে একবার সন্ধ্যামালতী ডাক শোনার জন্য কতশত যে আকুতি করেছে! তার পা ধরে কেঁদেছে পর্যন্ত। কিন্তু পা’ষা’ণ আকাশ ডাকেনি।

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ৩০

সেদিনের পর থেকে আকাশের মুখে সন্ধ্যামালতীর পরিচয় পাবার জন্য সন্ধ্যা আর বসে থাকে না। বরং নিজেই নিজেকে সবার কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়, ‘সন্ধ্যা শুধু আকাশের সন্ধ্যামালতী’। এই যেমন একটু আগেই সন্ধ্যা নিজেকে তার সন্ধ্যামালতী বলে পরিচয় করিয়ে দিল সেই মহিলার কাছে।
সন্ধ্যার দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারিত বাক্যটি এখনো এই বদ্ধ জায়গায় এ দেয়াল থেকে ও দেয়ালে ধাক্কা খাচ্ছে। সাথে সন্ধ্যার পানে টলমল চোখে চেয়ে থাকা আকাশের একেবারে হৃদয়ে এসে বারবার বিট করে হৃদয়জুড়ানো সেই বাক্য,
‘আমি তার সন্ধ্যামালতী।’

অসমাপ্ত

1 COMMENT

Comments are closed.