তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ১১
রাফিয়া জান্নাত রিফা
আলবান আর্দ্র ও পুলিশেরা সেখানে উপস্থিত হলো, কিন্তু ইতি, বিথী, নীধি কাউকে পেলো না। আলবান আর্দ্রের অস্হিরতা আরো বেড়ে গেল কি করবে বুঝতে পারছে না। মাথাটা রাগে ফেটে যাচ্ছে আলবানের।তারউপর এই এস আই পুলিশের ফোনটা ননস্টপ বেজেই যাচ্ছে কিন্তু ফোনটা ধরছে না। ফোনের রিংটোন টা আলবানের কাছে বিরক্তিকর লাগলো তার উপর ননস্টপ ভাবে বেজেই চলেছে,রাগ দেখিয়ে পুলিশ কে বলে,,,
__ হয় ফোন টা রিসিভ করুন আর না হয় আমাকে দিন।আমি ভেঙ্গে ফেলি।
এস আই পুলিশের সেই প্রথম থেকেই আলবানকে খুব ভয় লাগছিল, কিন্তু তা প্রকাশ করে নি,,,
__ আসলে স্যার বউ ফোন দিচ্ছে?
__ হ্যাঁ তো কথা বলে ম্যাটার ক্লোজ করুন, অসহ্য লাগছে।
__ ওকে।
পুলিশ তার বউয়ের ফোন রিসিভ করতেই কর্কশ গলায় ওপাশ থেকে কন্ঠস্বর ভেসে এলো,,,
__ তুই শুধু আজ বাড়িতে এসে দেখ তোর কি অবস্থা করি, অন্য মেয়েদের সাথে কথা বলা বের করবো, আগামী তিন দিন ভাত খাওয়া বন্ধ। আমার সাথে দুই নাম্বারী।
ভুলবশত ফোনে লাউড স্পিকার ছিল। তাড়াহুড়ো করে পুলিশ ফোনের সাউন্ড কমালো এবং অন্য পাশে গিয়ে ফিসফিস করে বললেন,,,
__ রাগ করে না বউ,বাড়ি গিয়ে আমি তোমার পা টিপে দিবো,সোনা বউ রাগ করে না এখন মহা ব্যস্ত কাজে আছি।
বুউকে ভুজুং ভাজুং অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে ফোনটা পকেটে রেখে পেছোনে ঘুরতেই দেখতে পেলো কালো এক ছায়া তার সামনে লম্বা লম্বি ভাবে দাড়িয়ে আছে, অন্ধকারে মুখ স্পষ্ট নয় একদম মুভিতে দেখা কালো ছায়া গুলো মতো মনে হচ্ছে, পুলিশের পা কাঁপতে লাগলো পাশাপাশি ঠোঁট জোড়া, কিছুক্ষণ সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইল।ভয় কে আর দমিয়ে রাখতে পারলো না, ভুবন কাঁপানো চিৎকার শুরু করে দিলেন,,,
__ এএএএ আম্মা,এএএ বউউউউউউউ,এএএএ হাবিলদার এদিকে আয়। বাঁচাচচচচ রেেেে
পুলিশটি নড়াচড়া করতেও ভুলে গেল,ভয় তাকে তীব্রভাবে ঘিরে নিলো, তখনি তার সামন থেকে আলবান ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলে,,,
__ আরে থামেন,সমস্যা কি,?
এবার বুঝলেন যে এটা আলবান ছিল,সেখানে মুহূর্তেই আর্দ্র ও বাকি সব পুলিশ আসলো।এস আই পুলিশ এখনো নড়াচড়া করছে না, নড়াচড়া করতে ভুলেই গেছে বেচারা।
একটু ভয় কেটেছে কিন্তু লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে গেল, কারণ ভয়ে চোটে তিনি প্যান্টে এক নাম্বার কাজ সেড়ে ফেলছে,সেরে ফেলছে বললে ভুল হবে,আসলে অনেক আগেই চাপ দিছিলো কিন্তু আলবান ও আর্দ্রের হুমকি ধুমকি তে মুল কাজ খানা সেড়ে আসার সময় পায়নি।
কিন্তু এখন কি হবে তিনি তো একজন এস আই তার মান সম্মান তো আজ এখানেই ধুলিসাৎ হবে।
আলবান রাগ দেখিয়ে বলে,,,
__ আপনি কিভাবে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট পেলেন বলেন তো। পুলিশ এত ভয় পায়?
পুলিশটির এখনো কাঁপুনি বন্ধ হয় নি,,
__ আআসলে আমি ভুতকে খুব ভয় পাই।
__ কিইইই আমাকে আপনার ভুত মনে হয়েছে।
__ না মানে স্যার এখানে কোন লাইট নেই তো তাই আর কি..
__ স্টুপিট সরুন ওখান থেকে।
__ ক কেনো স্যার?
__ আপনার পায়ের কাছে সাপের মতো কিছু একটা আছে??
__ ওরে মাআআআআআ…
নিমিষেই ভয়ে এক লাফে হাবিলদারের গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন। হাবিলদারের কাছ থেকে আর্দ্র লাইট টা নিলো, হাবিলদারের নাকে মূএের গন্ধ এলো,নাক দিয়ে ভালো করে শুঁকে নিয়ে এস আই পুলিশের কানে ফিসফিস করে বলেন,,,
__ স্যার আপনার আবার ১হয়ে গেছে?
এস আই পুলিশ অসহায় কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে,,,
__ হ্যাঁ রে?
__ স্যার,আবার তো ভয় পেলেন এবার তো দুই হওয়া কথা তাইনা।
দাঁতে দাঁত চেপে পুলিশ বলে,,,
__ মজা নিচ্ছিস? যা গাড়ি থেকে প্যান্ট টা নিয়ে আয়?
__ স্যার আমি পাবো না? প্রতিবার কোন না কোন মিশনে এসে আপনি এমন করেন আর আমার হয় যত জ্বালা।আজ একদমই পাবো।
এস আই মুখ আমুট চুমুট করে বলে,,,
__ এক্সটা টাকা দিবো যাহহ।
__ না স্যার পাবো না ? ওই দেখেন বাশার টা আপনাকে আর আমাকেই দেখছে,আপনি আমার সাথে এমন ফিসফিস করে কথা বলেন বলে ও মনে করে আপনি আমাকে বেডে নিয়ে যাওয়ার ওফার দেন।চরম ভাবে ও আমার চরিত্রে আঙ্গুল তুলছে। আমার ও বউ আছে স্যার তার কানে যদি এসব যায় তাহলে আমাকে রোদে শুকিয়ে শুঁটকি বানিয়ে তরকারিতে দিয়ে খাবে।
এস আই এবার রাগ দেখিয়ে বলে,,,
__ বাশার রে আমি পরে দেখে নিবো,এই অবস্থায় যদি আমি আমার বউয়ের কাছে যাই তবে সে আমায় ব্লেন্ডারে পিষে জুস করে খাবে।তাই বেশি কথা না বলে যা বললাম তাই কর।
__ এটাই শেষ বার কিন্তু স্যার।
__ আরে তুই যা তো।
__ আমার সাথে গাড়ির পিছনে চলেন।
দুজনেই গাড়ির পিছনে চলে গেল বাশার হেলে দুলে দেখতে লাগলো,আর মনে মনে আওরালো,,,
__ আস্তাগফিরুল্লাহ,নাউযুবিল্লাহ,সি সি সি। আল্লাহ এই দিন ও দেখাইলা। শেষে কিনা…সি সি।
আর্দ্র একটা লাঠি দিয়ে সাপটাকে তুললো তারা মনে করছিল এটা হয়তো আসল সাপ,,
__ আলবান এটা তো নকল সাপ?
আলবান সাপটাকে হতে নিলো নেড়েচেড়ে বললো,,,
__ এটা আমি কিনেছিলাম। নিশ্চিত ইতি আমার রুমে এসে এটা নিয়ে গেছিলো।
আর্দ্র বলে,,,
__ এটা দিয়েই হয়তো লোকগুলোকে ভয় দেখিয়েছে আম শিওর ভাই ওদের যারা তুলে নিয়েছে তাদের অবস্থা নাজেহাল করেছে আর না হয় কথার প্যচে ফাঁসিয়েছে লোকগুলোকে।
তখনি আলবানের ফোন বেজে ওঠে ফোনের স্ক্রিনে দির্শক নামটি ভেসে উঠলো,ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে দির্শক বলে,,,
__ আমি ওদের তিন জনকে নিয়ে বাড়ি যাচ্ছি তোরাও বাড়ি চলে আয়।
__ তুই কোথায় পেলি ওদের?
__ ওই রাস্তা দিয়ে আসার পথেই দেখা।
__ এখন কোথায় তুই?
__ উজ্জ্বল নারীদের নিয়ে বাড়ি যাচ্ছি,এই এসেই গেছি আর,তোরা ও চলে আয়।
কল বিছিন্ন হতেই আর্দ্র বলে,,
__ কি হয়েছে?
__ দির্শক ওদের নিয়ে বাড়ি গেছে, এখানেই পেয়েছিল হয়তো।বাড়ি চল?
দুজনেই সস্তির নিঃশ্বাস ফেলে চলতে লাগলো। পুলিশ মনে মনে হাজারটা গালি দিতে লাগলো আলবান ও আর্দ্রকে ,মনে মনে বলল,,, ,
__পুলিশ স্টেশনে গিয়ে তো রিতিমত কাপাকাপি তুলে দিয়েছিল।নানা ধরনের হুমকি ধুমকি রাগ তাপ দেখিয়ে নিয়ে এলো ,এনে কি হলো? কি সুন্দর আরামে করে বসে বউ সাথে কথা বলছিলাম,দিলো আমার সংসার আগুন লাগিয়ে,আজ বাড়ি গেলে আমার সাথে যে কি কি হবে তা আমিই জানি। সাথে প্যান্টটাও চেঞ্জ করলাম, অন্য রং এর প্যান্ট দেখে না জানি আবার কি সন্দেহ করে বসে বউটা, আল্লাহ আজকের জন্য রক্ষা করে দিও ,এই অধমের উপর একটু করুনা করো।
মুহূর্তেই এস আই পুলিশের মুখে কালো মেঘ নেমে আসলো। আলবান আর্দ্র পুলিশের সাথে যাবতীয় কথা বলে দুজনেই বাইক স্টাট দিয়ে চললো তালুকদার বাড়ি।
ইতি, বিথী, নীধি মা ,মা বলে বাড়িতে প্রবেশ করলো। সোফায় বসে থাকা সিদ্দিকী বেগমের কানে মা ডাক যেতে দৌড়ে আসলেন দরজার দিকে মুহূর্তেই তিন বোনকে ঝাপ্টে ধরে জোরে জোরে কান্না করতে লাগলেন,আলিফা বেগম ও কান্না করছেন।ইতি বলে,,,
__ মা এভাবে কেঁদো না?
বিথী বলে,,,
__ আমদের কিছু হয়নি দেখো?
নিধি বলে,,,
__ কান্না থামাও প্লিজ মা
ইতি আলিফা এবং মিলি বেগমের দিকে তাকিয়ে বলে,,,
__ উফফ বড় মা, ছোট মা তোমরাও কাঁদছো।
__ কোথায় কোথায় আমার নাতনিরা,কই?
ইতি, বিথী, নীধি গলার আওয়াজ পেতেই ঘর থেকে বের হলেন আসিয়া বেগম। সিদ্দিকী বেগম তিন আলোকছটাদের সোফায় বসালেন। বিথী আছিয়া বেগম কে বলে,,
__ জান আমরা এখানে, এদিকে আসো?
আসিয়া বেগম তাদের পাশে বসে কান্নারত কন্ঠ নিয়ে বললো,,
__ কই ছিলি তোরা?
ইতি বলে,,,
__ আরে জান নাটকে দেখো নাই,ওই যে নায়িকা কিডন্যাপ হয়ে যায় তারপর নায়ক এসে বাঁচায়। কিছুটা ওরকমই হয়েছিল, যদিও কোনো নায়ক বাঁচাতে আসে নি। কিন্তু যারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল তারাই উল্টো দৌড় দিয়ে পালালো।
বিথী বলে,,
__ পরে হঠাৎ দির্শক স্যারের দেখা, তারপর ওনার সাথেই আসা।
সিদ্দিকী বেগম দির্শকের দিকে তাকিয়ে বলে,,,
__ তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ বাবা।
দির্শক কিছু বললো না শুধু মুচকি হাসি উপহার দিলো পরক্ষণে লম্বা একটা শ্বাস ফেলল।
বিথী দির্শক কে বলে,,,
__ মেয়ে ও বাচ্চা গুলো কোথায়?
__ ওদের বাসায় গেছে?
হঠাৎ করে দৌড়াতে দৌড়াতে ড্রয়িং রুমে উপস্থিত হলো মন্টু হাঁফাতে হাঁফাতে বলতে লাগলো,,,,
__ বৃদ্ধ দাদু থানায় মারা গিয়েছেন??
তিন বোনেরই মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো, তড়িৎ বেগে সোফা থেকে উঠে দাড়ালো,বড় বড় চোখ করে ইতি মন্টু কে বলল,,,
__ চাচা কি বলছেন এসব?
__ হ্যাঁ।
এই বলে মন্টু আবার দৌড়ে চলে গেলেন।
তিন বোনেই তিরতির করে কাঁপতে লাগলো। দৌড়ে যেতে লাগলো বাইরে,সেই সময় প্রবেশ করেছিলেন তালুকদার বাড়ির তিন কর্তা তারা দ্রুততার সহিত ইতি, বিথী, নীধিকে হাত দিয়ে আটক করলেন। নাজিম তালুকদার বলেন,,
__ যাওয়া যাবে না মা, যা হবার হয়ে গেছে। তোমরা গেলে আর কিছু পরিবর্তন হবে না।
ইতি বলে,,,
__ বড় বাবা আপনি এসব কি বলছেন? দাদু থানায় কি করে গেল।
বিথী বলে,,,
__ আমার দাদু মরে যেতে পারে না। তার আত্মগ্লানি এভাবে মিথ্যা হতে পারে না।
নিধি বলে,,,
__ দাদু থানায় কেন যাবে,বাবা কিছু বলেন? দাদু থানায় কেন?
নাঈম তালুকদার বলেন,,,
__ চলো তোমরা আগে বসো? তারপর সব বলছি?
আলবান আর্দ্র ও চলে এসেছে বৃদ্ধ দাদুর মৃত্যুর খবরটা শুনলো মাএ। ড্রয়িং রুমে সবাই বসে আছে।ইতি, বিথী, নীধি কেঁদে যাচ্ছে। নাজিম তালুকদার বলেন,,,
__ মা এভাবে কেঁদো না, আমার কথা গুলো মনোযোগ সহকারে শুনো,প্রথমে পাড়ার লোকেরা সন্দেহ করে, তোমাদের নিখোঁজ হওয়ার পিছনে বৃদ্ধের হাত আছে,সেই অনুযায়ী বৃদ্ধকে সবাই বলে যাতে তোমাদের খোঁজ দিয়ে দেয়, তিনি বলেন যে “তিনি এসব করেননি বা জানেন না” বলে অস্বীকার করেন।পরে আমরা যাই আমরাও একই কথা জিজ্ঞাসা করি তাও তিনি একই কথা বলেন।,আমি এবং তোমাদের বাবা,চাচ্চু নিশ্চিত ছিলাম যে বৃদ্ধ কিছু করে নি।
কিন্তু পারার লোকেরা তা মানতে নারাজ,পরে তারা ঠিক করলো যে তারা পুলিশকে খবর দিবে পুরো ঘটনা পুলিশকে জানাবে, পুলিশকে জানানো হলো পুলিশ আসলো, এবার পুলিশ এসে ঘটলো আর এক বিপাক পুলিশ বললো এই বৃদ্ধ নাকি মাডার কেসের দাগি আসামি, পুলিশ ও নাকি এই বৃদ্ধ কে অনেক খোঁজাখুঁজি করছে,ইনি নাকি একজন দাগি খুনি যিনি চারটা খুন করেছেন। এবং আশ্চর্যের ব্যাপার হলো যে তিনি যে খুন করেছেন তা স্বীকার ও করে নেন।এখন এখানে আমি বা তোমার বাবা, চাচ্চু কি করবো বলো। এমনিতেই তোমাদের খোঁজ না পেয়ে আমাদের মাথা কাজ করা বন্ধ হয়ে গেছিলো, তারউপর বৃদ্ধের ঐই খুনের ঘটনায় মাথা মস্তিষ্কে আরো ফাটল ধরে দিয়েছে। পুলিশের সাথে যাওয়ার সময় তিনি একটা কথাই বলেছেন “কৃত কর্মের ফল আত্মগ্লানি,কভু মানি না পরাজয়, মৃত্যু হবে নিশ্চিত,সব রহস্যের মাধ্যম ও হবে এই মৃত্যু।তিন আলোকছটা হবে তীব্র শিখার ঝাঁঝালো প্রতিক, প্রতিবাদি ন্যায় বহুপদি।” এই বলে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন।
আলবান ইতির চোখ বড় বড় হয়ে গেলো,ইতি রক্তিম চোখে আলবানের পানে তাকালো,আলবান দেখলো ইতি সেই তীব্র ঝাঁঝালো চোখ যেখানে এক নিমেষেই আলবানের ঝলসানো মৃত্যু নিশ্চিত।তখন আলবানের চোখ ছিল শীতল, চোখে অদ্ভুত ভয় ও ছিলো।
বিথী তড়িৎ বেগে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তেজি কন্ঠে বলে,,,
__ নিজেকে বাঁচানোর প্রয়াসে চারটা কেন হাজারটা খুন করা উচিত।আইন আদালত কি করবে?কি করবে তারা?তারা শুধু একটা কথাই জানে মানি এন্ড মানি।এখন দাদুকে মারার জন্য যদি আমি ওই পুলিশকে খুন করি।করবো খুন?করবো?কত সাহস তাদের? আমিও সাহস দেখাবো। আমি নিশ্চিত ওরা দাদুকে লাঠি দিয়ে অনেক মেরেছে অতঃপর আমার দাদু তো বুড়ো মানুষ আবার অসুস্থ ও মাইর গুলো সহ্য করতে না পেরে আল্লাহর কাছে চলেই গেলো?আর বাকি রইল বড় মাথাটা যে আমাদের তুলে নিয়ে গিয়ে চরম অন্যায় কাজটা করেছে,তার মাথা ধর থেকে আলাদা করবোই আমি। তবেই শান্তি আমার।তার জন্যই আর এতকিছু।
কথা গুলো বলেই হু হু করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো বিথী,আলিফা বেগম এসে ধরলেন।
বিথীর প্রত্যেকটা কথাই দির্শকের বুকে তীরের মতো এসে বিধলো।চোখ মুখের ভীতিকর পরিবর্তন দেখা গেল।যা সে নিজেও বুঝলো এ ভয় কিসের,তার কি অন্যায়।সে তো কিছুই করে নি।
ইতি আলবানের থেকে চোখ সরিয়ে বলে,,,
__ আমার দাদু তো মহান না নাহলে অন্যের খুনের দ্বায় নিজে কি করে নেয় বলুন। দাদুর সব স্বপ্ন শেষ, দাদুর আর কোন ইচ্ছা রইলো না।তার সেই অপূর্ণতা আর শুনবে না তার তিন আলোকছটা,তার আত্মগ্লানি শুনে আর কাঁদবে না ইতি, বিথী, নীধি।আর কেউ বলবে আমার তোরা ছাড়া কেউ নেই আমার।আর কাউকে গিয়ে খাবার দিয়ে আসা হবে না। পুলিশ কি?,কে পুলিশ,?এরা হলো একেটা করে টাকার কুকুর।এরা সত্য উদঘাটন করতে যানে না,এরা যানে না,মানে না, কিচ্ছু মানে না,কি ঘটেছে জানে না,।কি করে তারা এমন টা করলো?মেরেই ফেললো দাদুকে?না জানি কতখানি মেরেছিল?বাবা, বড় বাবা তোমরা ছিলে সেখানে তাও কিছু করলে না?কেন?কেন এমন অবিচার?
একই ভাবে ইতিও কান্নায় ভেঙে পড়ে সিদ্দিকী বেগম এসে ধরলেন। আলবান মেঝেতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে আছে,তার কিছু বলার কোন জো রইলো না সে এখন যাই বলুক না কেন তাই যুক্তিহীন। চোখে মুখে বিষন্নতা উপছে পড়ছে। ভিতর এক অজানা কারণ কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।
নিধি কিছু বলতে পারছে না, কান্না গুলো সব গলায় এসে আটকে যাচ্ছে। স্তব্ধ হয়ে বসে আছে, চোখে স্পষ্ট বৃদ্ধ দাদুর সেই মুখ খানা ভেসে উঠছে।নিধি বরাবরই ইতি বিথীর থেকে শান্ত ও ঠান্ডা মস্তিষ্কের মেয়ে।ইতি বিথী মতো করে মনে কথা গুলো ওগলে দিতে যানে না সে। স্তব্ধ হয়ে মনে সব পুষে রাখে।
ইতিকে ছেড়ে দিয়ে সিদ্দিকী বেগম নিধি কাছে গেলেন।তিনি তার মেয়েকে ভালো করে চিনেন। সিদ্দিকী বেগম নিধিকে জরিয়ে ধরে আকুল স্বরে বললেন,,,
__ মা কাদ,দেখ মা আছি কাঁদ জোরে কাঁদ।না কাঁদলে তোর প্যানিক অ্যাটাক হয়ে যাবে । সোনা মা,কাদ?
নিধি ভাবনা জগৎ থেকে বেরিয়ে আসলো সিদ্দিকী বেগমকে জরিয়ে ধরে আহাজারি করে কাঁদলো,,,
__ মা দাদু তো মারা যেতোও কিন্তু এভাবে কেন মরলো?এটা কেমন মৃত্যু?, দাদু তো এভাবে মৃত্যু চায় নি।তবে কেন?কেন?কেন মারলো? আমার দাদু নির্দোষ ছিল মা।এটা কাকে বোঝাবে?কি হবে বুঝিয়ে? দাদুকে তো আর পাবো না।
ড্রয়িং রুমে বসে থাকা সবার মুখে বিষন্নতা থাকলেও। দৃষ্টিতে এক ধরনের মুগ্ধতা ছড়িয়ে আছে।এক বৃদ্ধের জন্য এমন আহাজারি কান্না সবাই মুগ্ধ করছে পাশাপাশি কষ্টে ছিন্নভিন্ন ও হয়ে যাচ্ছে। তালুকদার বাড়ির তিন কর্তা মাথা নিচু করে বসে আছে,কি বলবে তারা?কি বা বলার আছে। শুধু নতুন করে আজ তাদের মেয়েদের চিনলো।কত খানি নিষ্পাপ মনের তা বুঝলো।
তালুকদার বাড়ির দরজা ফটকে সামনে এক হাবিলদার পুলিশ জোরে চিৎকার করে বললেন,,,
__ তিন আলোকছটা কে? আছেন এখানে?
ইতি বিথী নীধি তাকালো লোকটার দিকে, বিথী চোখে পানি দু হাত দিয়ে মুছে ,সব রাগ ক্ষোপ নিয়ে দৌড়ে গিয়ে হাবিলদার পুলিশের শার্টের কলার চেপে ধরলো।
সবাই বিথীকে আটকাতে গেলে দির্শক বাঁধা দেয়, হাতে ইশারায় তাদের থামতে বলে। এবং দির্শক ধির গতিতে এগোতে লাগলো বিথীর দিকে।
হাবিলদার বুঝতে পারলো না এই সেকেন্ডের মধ্যে তার সাথে হলোটা কি, হাবিলদাকে দেখতে বেশ শুঁটকি মাছের মতোই লাগলো, শরীরের গোসতো নেই বললেই চলে, এমনিতেই তো চিকন তার উপর খাটো, বিথী কাছে এই হাবিলদার তো কিছুই না বরং বিথীর তো হাবিলদার কে ধরতেই সমস্যা হচ্ছে। বিথী দাঁতে দাঁত চেপে বলে,,,
__ ওই বল দাদুকে কেন মারছিস?
হাবিলদার হাত জোর করে কাঁপতে কাঁপতে বলে,,,
__ আমি তো হাবিলদার মাএ।আমি তো ও বিষয়ে কিছু জানি না।
__ তুই সব জানিস?
__ আমি কিছু জানি না ম্যাডাম?
__ দাদুকে যখন থানায় নিয়ে যায় তখন তুই কোথায় ছিলি?
__ আসলে আমার তো নাইট ডিউটি করি। তাই দিনের বেলা বউ বাচ্চার কাছে ছিলাম।
শার্টের কলার আরো জোরে চেপে ধরে বিথী পুনরায় আবার দাঁতে দাঁত চেপে বলে,,,
__ তুই কেন কিছু জানিস না?
হাবিলদার এবার কান্না করেই বলে,,,
__ আমি ছিলাম না?
__ তুই কেন ছিলি না?
__ ডিউটি ছিল না।
__ তোর ডিউটির মায় রে বাপ। তোদের থানা যদি আমি বোম মেরে উড়িয়ে না দিসি তবে আমার নাম ও বিথী না।
কাঁদো কাঁদো স্বরে হাবিলদার বলে,,
__ আমি কিছু করি নি ,আমায় ছেড়ে দিন।
__ সত্যি করে বল।
হাবিলদার ভয় ভয় করে বলে,,
__ সত্যি বলতে। দিনের বেলা আমি মদ, গাঁজা খাই,তারপর মানুষ বাড়ির দেয়ালে মূএ করে দিই, আপনাদের বাড়ির দেয়ালেও একদিন ইয়ে করে দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলাম।তারপর রাতে পুলিশ স্টেশনে ডিউটিতে যাই।
দির্শকে প্রচুর পরিমাণে হাঁসি পেল, হাত দিয়ে হাঁসিকে ঢেকে নিল এবং নিজেই নিজেকে বললো,,,
__ দির্শক হাসিস না স্টপ,এটা হাসার সময় নয়।
তাও নিজের হাঁসিকে দমিয়ে রাখতে পারলোনা।দির্শকে একটু একটু হাসির শব্দ কানে আসলো বিথীর,,,
__ এই দুষ্শমন স্যার হাসছেন কেন।
অনেক কষ্টে হাঁসিকে দমিয়ে রেখে দির্শক বলে,,
__ কই না তো।তুমি তোমার কাজ করো?
হাবিলদার অসহায় মুখে দির্শকে দিকে হাত জোর করে বললো,,,
__ স্যার আমাকে বাঁচান,আমি আর মদ গাঁজা খাবো না,আর আপনাদের যে দেওয়ালে মূএ করে দিয়েছি ওই জায়গা ভালো করে মুছে দিবো। বাঁচান স্যার, বাঁচান।
দির্শক বলে,,,
__ সম্ভব নয়,তবে যেটা দেওয়া জন্য এসেছো সেটা বিথীকে তারাতাড়ি দিয়ে পালাও।
__ স্যার মদ গাঁজা খেয়ে খেয়ে আমার শরীরে এক ফোঁটা ও শক্তি নেই,তাই ম্যাডামের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পালাতে পাবো না।
__ তাহলে আমি কিছু জানি না।
বিথী বলে,,,
__ এ আমার দিকে তাকিয়ে কথা বল। তোকে আচার মারতে কিন্তু আমার এক মিনিট সময় ও লাগবে না।
এবার হাবিলদার বিথীর দিকে একটা কাগজের খাম এগিয়ে দিয়ে বলে,,
__ এটা দেওয়ার জন্য আমি এসেছি?
বিথী চোখ ছোট করে এক হাত দিয়ে খামটা নেয় এবং অন্য হাত দিয়ে হাবিলদারের শার্টের কলার চেপে ধরে। হাবিলদার বুঝলো আজ বোধহয় এই মেয়ের হাত থেকে তার নিস্তার নেই।
তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ১০
__ একটা আচার দিলে আমি শেষ।
হাবিলদারের মাথায় একটা বুদ্ধি আসলো।সে তার ঢিলে ঢালা পোশাক খানায় গা ছাড়া ভাব দিয়ে আস্তে করে মাথা বের করে নিলো ,পরপর হাত দুখানা বের করে নিলো। তারপর সরে দাড়ালো শরীর শুধু গেঞ্জি দেখা গেল। বিথী হাতে শুধু পড়ে রইলো হাবিলদারের শার্ট খানা। হাবিলদার দৌড় দিবে এমন সময় বিথী বলে,,
__ এই জে লোক আপনার শার্ট খানা নিয়ে যান?
হাবিলদার শার্ট নিয়ে ভৌ দৌড় দিলো।
বিথী কাগজের খামটাকে এপাশ ওপাশ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগলো, ড্রয়িং রুমে আসলো।
