তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ১৪
রাফিয়া জান্নাত রিফা
তীব্র গতিতে বাইক চলছে, চারপাশের বাতাস মুখে এসে ধাক্কা দিচ্ছে বারংবার,ছোট ছোট ঠান্ডা ঢেউ এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে ইতির শরীরে, শিরশির করে উঠছে শরীর। হিজাবটা অনবরত উড়ছে, জামার হাতা ওড়াউড়ি করছে,ইতি শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে আলবানের পেট,মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবী যেন পিছিয়ে যাচ্ছে। বাতাসে মিশে থাকে ধুলা রাস্তার গরম,আলবানের শরীরে এই মাতাল করা ঘ্রাণ,সব মিলিয়ে ইতির মন আকুল হয়ে উঠেছে,এক শান্ত উষ্ণতা ছড়িয়ে যাচ্ছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে।আলবানের শার্ট বাতাসের গতিতে শরীরের সাথে মিশে গেছে। চোখ কোন ভয়, ভীতি কিছু নেই, অনুভূতি শূন্য হয়ে মনমতো বাইক চালাচ্ছে।
দির্শক, আর্দ্রের বাইকে রেখে সাই বেগে বাইক নিয়ে লম্বা লম্বি রাস্তায় মুহূর্তেই মিশে গেল আলবান ও ইতি।হা হয়ে দেখলো বিথী,নিধি।
বিথী বেশ রাগ হয়েই ছটফটিয়ে বলল,,
__ এই দাবানল ভাই নিজেকে মনে করেটা কি?এতো স্পীডে বাইক চালানো মানেটা কি?কি বোঝাতে চায়?অসয্য?যদি কিছু একটা হয়ে যায়?
দির্শকের কানে কথা গুলো পৌছা মাএই দির্শক ও ফুল স্পীডে বাইক নিয়ে এঁকে বেঁকে চলতে লাগলো,ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে দির্শকের পেট বরাবর শার্ট খিচে ধরলো,এতে একটু হলেও পেটে ব্যথা পেলো বোধহয় দির্শক। এবার বিথীর ভয়ের সাথে সাথে রাগে ও মাথাটা ফেটে যাচ্ছে, ইচ্ছা করলো মুখ দিয়ে কিছু অশ্লীল ভাষা আওরাতে, কিন্তু বললো না, নিজেকে সংযত রাখলো,মনে মনে পাঁয়তারা কষলো “এর জবাব ও প্রতিশোধ পরে নিবো”। দির্শককে কিছু বললো না,রাগে ফোঁস ফোঁস করেই খিচে ধরে রইলো দির্শককে।
দির্শক,ও আলবানের এমন কান্ডে আর্দ্র,ও নিধি থমথমে লেগে গেলো।নিধিতো প্রথম থেকেই ভয় পেয়ে আছে,এমন কান্ডে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার নিশ্চয়তা বেশ বুঝতে পারলো নিধি মনে মনে বলল,,
__ ইতি, বিথী প্রচুর ক্ষেপে গেছে নিশ্চয়ই, ইতির কথা তো বাদই দিলাম বিথী ক্ষেপে গেলে কি যে করে, আল্লাহ ভালো জানেন।আমি নিশ্চিত গ্রামে গিয়ে দাবালন ভাই,আর দুষ্শমন স্যারের হায়াত কমবেই। গ্রামে আমাদের সাঙ্গোপাঙ্গর অভাব কম নাকি?ইসস রে কষ্ট হচ্ছে দাবালন ভাই আর , দু্ষ্শমন স্যারের জন্য।
পরক্ষণেই আর্দ্রকে অসহায় সুরে বললো,,
__ এখন নিশ্চয়ই আপনিও ওদের মতো স্পীডে বাইক চালাবেন?
আর্দ্র মুচকি হেসে বললো,,,
__ প্রশ্নই আসে না?ওদের মরার শখ হয়েছে বোধহয়?বুঝলে, আমার বাবা এত তাড়াতাড়ি মরার শখ নেই, এখনো অনেক কিছু দেখার বাকি।
__ খবরদার এমন কথা বলবেন না? ওদের সাথে কিন্তু আমার বোনরা ও আছে?
__ হুম জানি?আলবান তো নিজের খায়েজ মিটাচ্ছে এতে ইতির বা আলবান কারো কিছুই হবে না?এমনি ভয় দেখাচ্ছে ইতিকে হয়তো?কিন্তু দির্শক ও একই ভাবে ছুটল কেন?
নিধি বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল, বোনদের জন্য চিন্তায় নিউড়ে রইল। আর্দ্র বুঝতে পেরে বললো,,,
__ কি হলো? চিন্তা হচ্ছে বুঝি?
__ হুম।
__ আরে বোকা ফুল ওদের কারো কিছুই হবে না।আলবান, আর্দ্র বাইক চালাতে অনেক দক্ষ,ওতোটা দক্ষ আমিও না।বরং এখন আমি আর তুমিই বেশ রিক্সে আছি বুঝলে?
নিধি ভয়ে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে,,
__ গাড়ি থামান?আমি বাইকে জাবো না?
__ তোমার কিছুই হবে না নিধি?আমি থাকতে তোমার কি হতে পারে বলো?এখন তোমার যদি আমার প্রতি আচ্ছাস না থাকে তবে আর কি করার?
বলেই দীর্ঘ শ্বাস ফেললো আর্দ্র।
নিধির কথাখানা পছন্দ হলো,আর কোন কথা বললো না চুপটি করে বসে রইল আর্দ্রের পাশে। আর্দ্র ও মনোযোগ সহকারে বাইক চালাতে লাগল।
সাই সাই করে আশা বাতাস ইতিকে যেন উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।ইতির অবস্থা বেশ শোচনীয় নাজেহাল, এমনিতেই তাঁর মতে অসভ্য ইতরের বাইকে বসেছে, অসহ্য তো লাগছেই,তার উপর ফুল স্পীডে বাইক চালাচ্ছে।ইতি বেচারি কতবার করে বলছে যে একটু আস্তে বাইক চালান কিন্তু কে শুনে কার কথা। আলবানের তো কথা একটাই “ত্যাড়ামো করা, মুখে মুখে কথা বলা, এগুলো প্রতিশোধ শুদে আসলে নিবো,মরলেও করার কিছু নেই?
এই কথা শুনে ভয়ে তটস্থ হয়ে আছে ইতি, আগের থেকে চারগুণ ভাবে আঁকড়ে ধরেছে আলবানকে।ভয়ে আমতা আমতা করে ইতি বলে,,,
__ আমি মরলে কিন্তু আপনাকে নিয়েই মরবো দাবানল ভাই।
নির্বিকার উওর আলবানের,,
__ আমি কি একবারও বলছি যে আমি মরবো না।
শুকানো ঢোক গিলে ইতি বলে,,
__ হ্যাঁ মনে থাকে যেনো?
মনে মনে হাজার হাজার দোয়া দরুদ পাঠ করতে থাকে ইতি।আলবানের কোন ভ্রু-ক্ষেপ দেখা গেল না বরং আগের থেকে আরো জোরে গতিতে বাইক চলছে।ইতির ভয় আরো বেরে গেল। শক্ত করে ধরে রেখেছে আলবানকে,পিটের দিকে লুকিয়ে পড়েছে যেনো।এবার ভয়ের মাএা তীব্র থেকে তীব্রতর হলো কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,,,
__ আলবান ভাই আমার সত্যি খুব ভয় করছে, বাইকের গতি কমান প্লিজ?
বাইক নিজের কন্ট্রোলে রেখে আলবান বলে,,,
__ ভয় দেখানোর জন্য তো এমন করছি না, শাস্তি দিচ্ছি শাস্তি? আন্ডারস্ট্যান্ড।
পানি এসে চোখে ভির বাঁধলো,গলায় কান্নারত ব্যাথা হলো,,
__ মৃত্যুই আমার শাস্তি তবে?
__ হ্যাঁ?
__ কি করেছি আমি?
__ অনেক কিছু?
__ বলেন কি করেছি?
__ আমার কথা শুনিস না,ড্যাস মারা কথা বলিস,ভাব দেখাস,তর্ক করিস, অবাধ্য হয়ে চলিস, সবচেয়ে বড় কথা আমাকে অনেক জ্বালাস তুই,আরো অনেক কিছু করিস এখন মনে পড়ছে না?
নাক টেনে টেনে ইতি বলে,,,
__ বেঁচে থাকলে ওমন কাজ আমি করতেই থাকবো,আপনি কেন, পৃথিবীর কেউ তা করা থেকে আমাকে আটকাতে পাড়বে না,তার থেকে ভালো মরে যাওয়া, যদিও মরে গেলেও নিস্তার নেই আপনার,তখন শাকচুন্নী,পেত্নি, ভুতের রুপ নিয়ে ভয় দেখাবো, মাঝে মাঝে আপনার শরীরের ডুকে ভর করবো,না মানে ওসব কিছু দেখবো না। আচ্ছা, মৃত্যুকে আমি বরণ করে নিলাম। এবার বাইকের গতি কমান?
__ তুইতো শাকচুন্নী, পেত্নিই? নিজেকে কি ঐশ্বরিয়া ভাবিস নাকি। বাইকের গতিকে ফুল স্পীডে রেখেই তো তোকে মারতে চাই?
__ বললাম তো মরবো, বাইকের গতি কমান?
__ এভাবেই মারবো তোকে?
__ ঠিক আছে মরবো?
ইতি ভেবেই নিলো সত্যি আজ তার মৃত্যু নিশ্চিত বোধ হয়,এবার ইতি সত্যিই কান্না করতে লাগলো, কান্না করতে করতে বলতে লাগলো,,,
__ দাবালন ভাই মরার আগে কটা কথা কইতে চাই?
__ বল?
__ কোন ভুল কিছু করলে ক্ষমা করে দিয়েন?
__ দিলাম?
__ আর একটা গোপন কথা ছিল?
__ বল?
__ সেদিন না আপনার অনেক কিছু দেখে নিয়েছিলাম,তাই ক্ষমা করবেন?
__ কিইইইইইইই,।
__ না মানে, তেমন কিছুই দেখি নি?
__ তাহলে ঠিক আছে?
কিছুক্ষণ ভেবে কান্না করতে করতে আবার বললো ইতি,,
__ আরো একটা কথা?
__ বল শুনছি।
__ আপনাকে একটা মেয়ে পছন্দ করে?
__ তো?
__ সে বলেছে, আপনার সাথে তার যেন যোগাযোগ করিয়ে দিই?
__ তারপর?
__ আমি সাফ সাফ বলে দিয়েছি,আলবান ভাই প্রেম করবে না, করবে না,করবে না?
__ তারপর?
__ তারপর মেয়েটা আমাদের অনেক ফুচকা, চটপটি, আইসক্রিম খাওয়াইছে ও বলছে আপনার নাম্বার, আইডি দিতে?
__ তারপর?
__ আমরা তিন জনেই নাম্বার আজ দিবো,কাল দিবো করে করে আর দেই নি,ওই সুযোগ আরো ফুচকা, চটপটি আইসক্রিম খেয়েছি?
__ তো আমি করবো?
__ মেয়েটাকে সব টাকা দিয়ে দিবেন,মরে যাবো তো।তাই সব পাপ কাজ চুকিয়ে দিচ্ছি? খবরদার মেয়েটার দিকে তাকাবেন না,ওই অসভ্য মেয়ের কথায় ভুলবেন না। দেখতে একদম বিশ্রী,চিপা চিপা শার্ট প্যান্ট পড়ে, ওকে যদি আপনি বিয়ে করেন, তাহলে নিশ্চিত আপনার প্যান্ট শার্ট গুলো নিজের দখলে নিবে।
মুচকি হাসলো বোধহয় আলবান,,
__ আচ্ছা?
কিছু একটা ভেবে ইতি আবার বলে,,,
__ আরো একটা কথা?
__ কান আছে, শুনছি?
__ আপনার ঘরে ঢুকে নকল সাপ আর, তিনটে সাদা শার্ট, তিনটি পাঞ্জাবি,নিয়ে এসেছি,চুরি করিনি কিন্তু।
__ চুরি করিসনি? এটাকে চুরি বলে না?
__ না?
__ ওগুলো কেন নিয়েছিস?
__ বাবার ঘর থেকে তিনটি লুঙ্গি ও এনেছি?
__ ওগুলো দিয়ে কি করছিস এটা বল?
মুখ আমুট চামুট করে বলে,,
__ তিনজনই লুঙ্গি,আর পাঞ্জাবি পড়ে ডান্স করছি? সাথে দাদি ও ছিলো?
__ খুব খারাপ কাজ করেছিস?
তখনি আলবান তার পিটে তরল কিছু অনুভব করলো, মুহূর্তেই চোখ কুঁচকে বলে,,
__ আমার পিটে ভিজা ভিজি লাগছে কেন?
নিরেট জবাব,,
__ নাকের পানি, চোখের পানি মুছছি আপনার শার্টে?
__ কিইইইইইইইইই….
__ হ্যাঁ?
রাগে গজগজ করতে করতে আলবান বলে,,
__ ইডিয়ট তোর ওড়না নেই, সেখানে মুছলেই তো হয়।
নাকটা আবার আলবানের পিটে ঘষাঘষি করলো,আলবান সঙ্গে সঙ্গে বাইক চলন্ত অবস্থায় পিট সরানোর বৃথা চেষ্টা করলো। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,,,
__ ইতির বাচ্চা ইতি,ভালো হচ্ছে না কিন্তু? পিট থেকে নাক সরা বলছি?
হেঁচকা কান্নারত কন্ঠে ইতি বলে,,
__ কোথায় মুছবো তা?
__ তোর ওড়নায় মোছ?
__ ওড়না নিতে গেলে হাত সরাতে হবে ,হাত সরাতে গেলে পড়ে যেতে হবে,পড়ে গেলে মরে যেতে হবে,মরে গেলে ভূত হতে হবে,ভূত হলে বিয়ে হবে না,বিয়ে না হলে স্বামী হবে না, স্বামী না জামাই হবে না,জামাই না হলে পোড়া কপাল হবে।
এক নাগাড়ে কথা গুলো বলে থামলো থেমে হাত দিয়ে নিজের কপালে নিজেই কয়েকটা চাপ্পড় মেরে বললো,,,
__ এ আল্লাহ পরিশেষে কপাল পোড়া হলে সন্ন্যাসীনিই হতে হবে।
ইতির এক নাগাড়ে বলা কথাগুলো শুনে আলবানের আরো বিরক্তি ধরে গেল,কি বোঝাতে চাচ্ছে আর কি বুঝছে তা আল্লাহ ভালো জানেন।ইতির বকবকে আলবানের মাথা ধরে গেছে, মেজাজ তাও তুঙ্গে উঠেছে,তার উপর নাকের পানি চোখের পানি এক করে আলবানের পিট ভাসিয়ে দিচ্ছে।নাহ এই মেয়ের সাথে আলবান এ জন্মে কেন কোনো জন্মেই পাবে না।
চলন্ত অবস্থায় ইতি রাস্তায় এক পুলিশকে দেখলো তিনিও বাইকে করে যাচ্ছেন।ইতি মনে মনে বেশ খুশি হলো মাথাটা আকাশ পানে তুলে কিছুক্ষণ ভাবলো, সঙ্গে সঙ্গেই ইতি পুলিশটি ইশারা ইঙ্গিতে বার বার ডাকতে লাগলো ফিসফিস করে ডাকলো ও,পুলিশ শোনা তো দুর তাকিয়ে পর্যন্ত দেখলো না ইতির পানে।আলবান ইতির সাথে আর কোন কথা না বলে মনোযোগ দিয়ে বাইক চালাচ্ছে,
ইতি আবার ফিসফিস করে পুলিশটিকে ডাকলো কিন্তু এবারো শুনলো না।এতে ইতির বেশ রাগ হলো রাগ দেখিয়ে একটু জোরেই বললো,,,
__ বালের পুলিশ,কানে কম শুনে শালা?
এবার স্পষ্ট ভাবে কথাটি পুলিশের কানে পৌঁছালো, মূহুর্তেই বাইকের গতি কন্ট্রোলে রাখলো,ঘার কাত করে ইতির পানে তাকালো,,,
__ আপনি কি আমাকে বাল বললেন ম্যাম?
ইতি বলে,,,
__ সে কতক্ষণ ধরে স্যার স্যার বলে ডাকলাম,তা আপনার কানে গেল না যেই বাল বললাম সেই কানে গেল,বাহ যে বাহ কি দারুন কান।
পুলিশটি একবার সামনের দিকে তাকিয়ে বাইকের গতি নিয়ন্ত্রণে রাখছে তো একবার ইতির দিকে তাকাচ্ছে।
__ আমাকে বাল বললেন কেন?
__ তো ?
__ আপনার কি ধারণা আছে যে আপনি কাকে এ কথা বলছেন?
__ পুলিশকে?
__ আপনার ভয় করছে না?
__ খারাপ কি বললাম যে ভয় করবে?
আলবান পুলিশের দিকে একবার তাকালো। বাইকের স্পীড কমিয়ে এনেছে। ক্রুদ্ধ কন্ঠে ইতিকে বলল,,,
__ ওই পুলিশ কে এসব কি বলছিস, হাজতে যাওয়ার ইচ্ছা হয়েছে নাকি?
মুখ কুঁচকে ইতি বলে,,,
__ আজব তো, আমি কি এমন বললাম ওনাকে?
পুলিশ বলে,,
__ বাল বলেছেন ম্যাম?
ক্রুদ্ধ কন্ঠে ইতি বলে,,,
__ একদম মিথ্যা বলবেন না?
__ আমি মিথ্যে বলছি না?
__ বাল ই তো বলেছি নাকি?কি এমন ভুল বলেছি?
__ বাল ওটা তো সুশীল ভাষা নয়।
__ আপনি নিজেও তো বাল বললেন?
__ আমি ওটা আপনাকে বুঝিয়ে বললাম?
__ আচ্ছা তাহলে বলুন তো?বাল এর মানে কি?বুঝান আমাকে?
পুলিশ হাত দিয়ে অঙ্গ ভঙ্গি করে বুঝাতে লাগলো ইতিকে,না জানি এটা কেমন বুঝ,,,
__,আমি একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর আমি দেশের কাজে নিয়োজিত।আমি এসব বালের মানে জানি বলে মনে হচ্ছে আপনার?
ইতি আলবানের পেট চেপে ধরেই হকচকিয়ে বললো,,
__ এইতো আবারো বাল বললেন?ছিই পুলিশ ইন্সপেক্টর হয়ে এসব বলতে লজ্জা করে না?
আলবান আবার দাঁতে দাঁত চেপে ইতিকে বলে,,,
__ ইতি স্পট,কি করছিস টা কি?উনি পুলিশ?
__ আপনি চুপ করুন তো?আজ হয় এছপার না হয় ওছপার হবে?এই বালের মানে চুকাতেই হবে?বাল কে কেন সবাই খারাপ ভাষা বলে?আমি বালের পাশে আছি বালের জন্য লড়াই করবো, দরকার হলে মিছিলে নামবো,অনশন করবো, সুন্দর সুশীল ভাষায় রুপান্তর করবো বালকে?আডান্সটেন্ড?
আলবানের মাথা এবার সত্যিই চক্কর দিলো,এ মেয়ে বলে কি?বাল কে নিয়ে এতো ডেম্পারেট, ডেমোক্রেসি ও করতে পারে এই বাল কে নিয়ে বাহ! বাহ।আলবানের নিজেকে বিরক্তির সাথে সাথে অসহায় ও লাগলো।ইতির সাথে বলা মানেই নিজের পিটে নিজে কুড়াল মারা।যাই হোক,আলবান এখন পুরো দমে চুপ মেরে রইলো।
ইতির বলা কথাগুলো বাইক থেকে একটু ঝুঁকে কান পেতে শুনলো পুলিশ। কিছুক্ষণ থ মেরে চুপ রইল, কিছু একটা ভাবলো বোধহয়,। পরক্ষণেই বললো,,
__ ম্যাম শুনুন?
ভাব ভঙ্গি পরিবর্তন করলো ইতি,বেশ এটেটিউড নিয়ে বললো,,
__ উু হু একটা কথাও না,আগে বাল এর মানে বলুন?যদি না পারেন তাহলে বুঝবো আপনি ঘুষ দিয়ে পুলিশ হয়েছেন।
পুলিশ পরলো মহা জ্বালায়,এ কেমন প্রশ্ন বালের কি মানে হয়,এ কথাটি বেশ ভাবালো পুলিশ, পুলিশের ও বেশ মনে হলো আসলেই তো বাল মানে তেমন খারাপ কিছুই না, শুধু বিরক্তি অর্থে ব্যবহৃত হয় এই আরকা? পুলিশ এখন কি রাগ হওয়ার কথা ছিল?না তো পুলিশের মধ্যে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত হলো না?বেশ সাবলীল লাগলো।
__ আমি তো ঘুষ খাই না?
বিরক্তি টনে ইতি বলে,,
__ আরে আগে বাল এর মানে বলেন?
আলবান দাতে দাঁত চেপে বলে,,
__ ইতিইইই ভাষা ঠিক কর?
__ উফ , চুপেন তো আপনি?এটা আমার আর পুলিশ বাবুর ব্যাপার।
এভাবে বেশ অনেকক্ষণ ইতি ও পুলিশের মধ্যে এই বাল অর্থ নিয়ে আলোচনা চললো।
পুলিশ বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে ভাবা শুরু করলো, এবং আলবানকে উদ্দেশ্য করে বললো,,,
__ স্যার আপনি একটু বাইকটা থামান,এটা সিরিয়াস কথা,যা নিয়ে কথা না বললেই নয়।বসে ডিসকাশন করি এই বাল অর্থ নিয়ে?
আলবান এবার ভালো ভাবেই বুঝলো যে পুলিশের মাথা ও সুন্দর করে ওয়াস করে ফেলছে ইতি।রাগ হলো প্রচুর,এসব আলউ,ফাউল মাথামোটা পুলিশ কেন আর কিভাবে পুলিশ হয়? কিভাবে এরা দেশের উন্নতি করে? বালের অর্থ নিয়ে নাকি এখন ডিসকাশন চলবে,ভাবা য়ায়? বিরক্তির চরম পর্যায়ে আলবান,,,
__ সরি স্যার,এসব আউল ফাউল কথা নিয়ে কথা বলার মতো সময় আমার নেই, তাছাড়া পাগলের সাথে কথা বলে পাগলা গারদে যাওয়ার কোন চিন্তা ভাবনাই আমার নেই,ক্ষমা করবেন,চলি?
এই বলে বাইকের স্পীড বাড়িয়ে দিয়ে পুলিশকে রেখে বাতাসের গতিবেগে চলতে লাগলো। ইতি জোরে জোরে চিৎকার করে বলতে লাগলো ,,
__ দাবালন ভাই বাইক থামান,আমি মামলা করবো? থামান বলছি?
ভ্রু কুঁচকে আলবানৃ বলে,,
__ কিসের মামলা?
__ আপনার মামলা?
আর কোন কথা বললো না আলবান, আরো স্পীডে চললো বাইক।ইতি এবার পুলিশে দিকে তাকিয়ে হাত উঁচিয়ে বলে,,,
__ পুলিশ বাবু আবার দেখা হবে?
পুলিশ ও গলা উঁচিয়ে জোরে বলে,,,
__ হ্যাঁ, তখন কিন্তু বালের অর্থ টা পরিষ্কার ভাবে ভেঙ্গে বলবেন?
আলবানের সাথে আবারো মিশে গেলো ইতির শরীর, এক অদ্ভুত মিলন, ভয় আর ভালোবাসার দ্বন্দ্বে মোড়া এক ক্ষণিক যাত্রা। বাতাসের ছোঁয়া মুখে লাগছে ইতির, মনে হয় পৃথিবীটাকে একসঙ্গে ছুঁয়ে ফেলা যাচ্ছে বোধহয়। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই বাইকটার এমন বেপরোয়া গতি বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে এক অজানা আশঙ্কা,ভয়ে আড়ষ্ট হয় ইতি।
মন বার বার বলেছে ইতির
__ ধীরে চালান, এই বেপরোয়া হাওয়ায়ই আপনাকে আর আমাকে নিরুদ্দেশ পথিক বানানোর জন্য যথেষ্ট ।
কিন্তু গলা বেড়ে সেই স্বর বের হলো না, তীব্র ক্ষোপ জেগে উঠেলো মুহূর্তেই। এটাকে অভিমান বলে কি?ভয়ের মিশ্র স্রোতে কণ্ঠ যেন থমকে আছে ইতির।
নিরবতার তাদের মাঝে নিউড়ে রইল। তাদের মধ্যে থাকল অজস্র না-বলা কথা অকথিত ভালোবাসা,অপ্রকাশিত অভিমান,আর একরাশ স্মৃতি ও থাকলো বোধহয়?যা কেবল অনুভব করছে?
আলবেন প্রতিক্রিয়া কেমন?কি রকমের?সে নিজেও বুঝতে পারছে না?তবে ভালো যে লাগছে এতটুকুই বোধ হচ্ছে?
বাতাসে হালকা উষ্ণতা, সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে চারপাশ।ভেতরটা কেমন যেন শান্ত লাগছে আলবানের।
এই অনুভূতির কোনো নাম নেই, কোনো জোরালো প্রকাশও নয়।শুধু এক অদৃশ্য ঢেউ এসে স্পর্শ করে যাচ্ছে মনকে। যেখানে হৃদয় একটু থেমে শ্বাস নিচ্ছে নরমভাবে।
আলবান কিছুই বলছে না,চোখে এক চিলতে হাসি খেলে যাচ্ছে নিঃশব্দে তার অভিব্যক্ত বোঝা মুশকিল। সেই হাসিতেই মিশে রইল হাজার ব্যাথার ঔষুধ।
ছেলেদের ভালো লাগা প্রায়ই নিভৃতে জন্ম নেয়,সেভ ভাবে আলবানের মনেও লুকিয়ে রইল বিরাট গভীর অনুভুতি।
তিনটি বাইক তাদের নিজ গন্তব্যে পৌঁছালো। আসতে আসতে বিকেল হয়ে গেছে।
দিনের ক্লান্ত সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিমে হেলে পড়েছে যা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মাটির লম্বা লম্বি রাস্তাটা দিয়ে তা দৃশ্য মান এই অপরুপ প্রকৃতি। চারিদিকে সবুজে সবুজ।
আকাশের কোণে জমে ওঠেছে সোনালি আর গাঢ় কমলার মিশ্র রঙ।ধানক্ষেতের ওপর লম্বা লম্বি ভাবে ছায়া পড়লো তিনটি বাইকের। সর্বপ্রথমে দির্শক বিথী, দ্বিতীয় আলবান, ইতি, তৃতীয় আর্দ্র,নিধি।
গরুর গাড়ি ফিরছে কাঁকর মাটির রাস্তা দিয়ে।চিল উড়ে যায় অলস ডানায় ভর দিয়ে,গাছের পাতায় পাতায় ঝরঝর করে পড়ছে বিকেলের রোদ।
ছোট ছোট বাচ্চারা মাঠে খেলা শেষ করে খিলখিল করে হেসে হেসে দৌড়ে ফিরছিল ঘরে। হঠাৎ বাইকের শব্দ কানে যেতেই পিছন ঘুরে তাকালো, নিষ্পলক তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, পরক্ষণেই উপস্থিত থাকা ছয়টি বাচ্চা ছেলে মেয়েদের মুখে চওড়া হাসি ফুটে উঠল। পরক্ষণেই জোরে জোরে হেসে লাফালাফি করতে লাগলো।সব বাচ্চারা জোরে জোরে চেঁচাতে লাগলো,,,
__ ইয়ে তিন আপারা এসে গেছে,কি মজা।
তাদের হাসির শব্দে মিশে আছে দিনের শেষ প্রাণচাঞ্চল্য।
চোখে তার শান্ত এক তৃপ্তি বিরাজ রইল।
বিথী তাদের দিকে তাকাতেই সব বিরক্তি,রাগ,ক্ষোপ উবে গেল।মুখে চওড়া উজ্জ্বল হাসি,হাত দিয়ে হায় জানালো তাদের, কিছুক্ষণ পর মুখটাকে অসহায় করে বিথী বলে,,,
__ আজ অনেক ক্লান্ত রে,কাল সকাল সকাল বাগানে চলে আসবি।
ইতি ও হাঁসি খুশি মনোভাব নিয়ে বললো,,,
__ বল্টু তোদের গাছের পেয়ারা আনবি কিন্তু?
__ আইচ্ছা আপা?
নিধি ও চোখ মুখ ক্লান্তের ছাপ স্পষ্ট,,,,
__ এখন বাড়ি যা সব, সন্ধ্যা হলো বলে,বাড়ি গিয়ে পড়তে বস,টাটা কাল দেখা হবে।
তিন বোনেই পিছোন ঘুরে বাচ্চা গুলোকে টাটা দিলো, বাচ্চা গুলো ও হাত উঁচিয়ে নাড়াতে লাগলো,তারাও টাটা জানালো
আকাশে তখন সূর্য অস্তের রঙ ছড়িয়ে আছে।সোনালি, রক্তিম, বেগুনি, আর এক চিলতে নীল।দিগন্ত রঙের নদী পুল বেয়ে যেতে লাগলো বাইক তিনটি।
____
গ্রামের মাঝখানে বিশাল এক প্রাচীন নিবাসটির বড় গেটে বাইক তিনটি এসে থামল।
চারদিক ঘেরা আমগাছ, কাঁঠালগাছ, আর ফুলের বাগানে।
দূর থেকেই দেখা যায় উঁচু দালানটির ছাদে মাটির টালি।
প্রবেশদ্বারটি প্রশস্ত, পুরোনো দিনের নকশা করা লোহার গেট।যার ওপরে জুঁই আর শেফালির লতা জড়িয়ে আছে,
বাতাস বয়ে গেলে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে পুরো উঠোন জুড়ে।
বিথী বাইক থেকে নামতেই কোমরটা টনটন করে উঠলো ,মাথাটাও ঝিমঝিম করতে লাগলো।দির্শক বাইকে বসেই হেলমেট খুলছে। বিথী রাগি চোখে তাকালো দির্শকের দিকে।দির্শক তা দেখে ভ্রু নাচিয়ে বললো,,
__ কি?
উওর কিছু বললো না বিথী।ইতি তো গাড়ি থেকে নেমেই আলবানে বাইকের ইঞ্জিনে জোরে এক লাথি মেরে বিথী দিকে চলে যায়।এমন আকস্মিক লাথি আলবান খৈ হারাতে ধরেও নিজেকে আটকে নিলো।রাগ তো হলোই, ইচ্ছা তো করলো ঠাঁটিয়ে থাপ্পড় মারতে, কিন্তু ইতির মতো তারছিড়া বেয়াদব তোর আলাবান না।এভাবে নিজেকে সংযত রাখলো। হেলমেট খুলে বাইক থেকে নামলো।
নিধি ও খোঁড়াতে খোড়াতে বিথী, ইতির কাছে আসলো, তিনজনেরই পা গুলো যেন ভারি হয়ে গেছে, এতক্ষণ জার্নির কারণে শরীর ও নেতিয়ে পড়েছে।
অতঃপর ইতি, বিথী, নীধি সামনে ও আলবান,দির্শক, আর্দ্র তাদের পিছনে হাঁটতে লাগলো।
ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে প্রশস্ত উঠোন।নানা ধরনের ফল ফুলে গাছের দেখা মিললো।বড় বড় গাছের গোড়ায় পাথরের বেদি বনানো হয়েছে, আড্ডা দেওয়ার জন্য।
সামনেই একটি তিন তলা ভিত্তিক দলান।দোতলার বারান্দায় কাঠের জালি-খচিত জানালা,নীল রং করা।। ফটকে তালা বিশিষ্ট বাড়িটিতে বারান্দা বেড়ে প্রবেশ করার দরজা খানা আকর্ষণ কাড়বে বেশ।দালানের বারান্দায় পুরোনো রজনীগন্ধার টব সাজানো। দরজা একপাশে লেখা “তালুকদার নিবাস”
দেয়ালে আছে পুরনো দিনের রঙিন টালি। হালকা নিলি ও ধরছে বাড়িটিতে। বাগানের মাইক্রো গাড়িটিকে দেখা গেল,যার মানে,বাকিরা অনেক ক্ষন আগেই এসে গেছে।
দরজা খোলাই ছিল বিধায় বড় বড় পা ফেলে ভিতরে প্রবেশ করলো ইতি, বিথী,নিধি। অন্দরমহল বসেই সবাই চা বিস্কুট নিয়ে আড্ডা দিচ্ছে।ধুপ ধাপ পায়ে সেখানে উপস্থিত হলো ইতি, বিথী, নীধি। তাদের সবাই দেখলো,পিকি বসা থেকে উঠে এসে ইতি কাঁধে এসে ধাক্কা মেরে বললো,,,
__ আসতে এতো লেট হলো কেন সুইটিরা।
ইতি বলে,,,
__ ওসব কথা পরে হবে গে?
আলবান,দির্শক, আর্দ্র ও চলে আসলো।বেশ কিছুক্ষণ সবার সাথে কথা বার্তা বললো তারা, তাদের ক্লান্ত মুখের দিকে তাকালেন মা আলিফা বেগম, এবং বললেন,,,
__ তোমরা ঘরে যাও বাবা, বিশ্রামে প্রয়োজন?
মোজাম্মেল হকের দিকে তাকিয়ে বললেন,,
__ ভাই ওদের ঘর গুলো দেখিয়ে দিন।
তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ১৩
ভারী সোনালী রং ও তাতে বেশ সুক্ষ্ম করে ডিজাইন করা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলো আলবান, আর্দ্র,দির্শক।
ইতি, বিথী, নীধি ভালো করেই জানে তাদের ঘর কোথায়?তাই তারও আর কথা না বলে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলো।
সিদ্দিকী বেগম তাদের যাওয়ার পানে তাকিয়ে বললেন,,,
__ ভালোভাবে ফ্রেশ হবি,জামা কাপড় গুলো পাল্টে অন্য জামা পড়বি,।
তিনজনই মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সম্মতি জানিয়ে, নেচে কুদে উপরে গেল।
