Home জাহানারা জাহানারা পর্ব ২৩

জাহানারা পর্ব ২৩

জাহানারা পর্ব ২৩
জান্নাত মুন

কেরানীগঞ্জ, ঢাকা। ইতিহাসের পাতায় এই নগরটি একটি মনোমুগ্ধকর ঐতিহাসিক স্থান। বুড়িগঙ্গার ওপারে বিস্তৃত কেরানীগঞ্জ। শহরের এত কাছে হয়েও এখানে এখনো টিকে আছে গ্রাম্য শান্তি। চারদিকে নদী, খাল, চর আর সবুজ মাঠের সমাহার। শরৎ আসলেই কেরানীগঞ্জ যেন নতুন পোশাক পরে। আকাশ থাকে ধবধবে নীল, সাদা তুলোর মতো মেঘ ভেসে বেড়ায় নদীর উপর দিয়ে। ভোরবেলা বাতাসে থাকে হালকা ঠান্ডা, শিশিরে ভেজা ঘাসে হাঁটলে পা ভিজে যায়। সেই ঠান্ডা বাতাসে ভিজে ওঠে নদীর চারপাশ।

দাঁড় টানতে টানতে মাঝিদের কপালে শিশির জমে, তবু তাদের মুখে ক্লান্তি নেই। কারণ এটাই তাদের প্রতিদিনের জীবন। ঘাটের পাশে তখন থেকেই ব্যস্ততা শুরু। কেউ মাছ নিয়ে আসে বাজারে, তো কারো হাতে থাকে শাকসবজি ভর্তি ঝুড়ি। পানিতে দাঁড় টানার শব্দ, “ওই দাও, ধরো, সাবধানে নামো”— এমন ডাকাডাকিতে মুখর নদীর পাড়। কিছু নৌকা আবার নদী পাড়ি দিয়ে ঢাকার দিকে রওনা দিচ্ছে। তাতে থাকে গ্রামের মানুষ। কেউ কাজে যাবে, কেউ পড়তে, কেউ বাজারে যাবে। একেকটা নৌকা ভর্তি মানুষ নিয়ে বুড়িগঙ্গার বুক চিরে চলে যায়, দূর থেকে তাদের গলার হাক শোনা যায়। যেন ভোরের প্রথম প্রহরে বুড়িগঙ্গা হয়ে ওঠে এক বিশাল জীবন্ত বাজার, যেখানে নদীই পথ, আর নৌকাই ভরসা।

আর এই অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা গ্রামটাই হলো আমার মাতৃভূমি।
এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী জুই। প্রতিদিনের মতোই আজও তার কিছু সহপাঠীদের নিয়ে নদীর ঘাটে হাজির। গন্তব্য নদীর ঐপাড়ে গণিত স্যারের বাড়ি। সপ্তাহে চারদিন সকাল নয়টায় বকুল স্যার ছাত্র ছাত্রীদের গণিত পড়ান। নদীর ঐপাড়ে যেতে সময় লাগে আধা ঘণ্টা। কিন্তু আজ ঘাটে আসতে দশ মিনিট লেইট হয়ে গেছে তাদের। ঘাটে প্রতিদিন নৌকা নিয়ে বসে থাকেন হারুন কাকা। তিনিই মূলত তাদেরকে প্রতিদিন ঐপাড়ে নিয়ে যান। তবে আজ এই নৌকায় তিনজন ব্যক্তি আগেই উঠে গেছে। সেসবে নজর নেই কারোর। সকলেই তাড়াহুড়ো করে নৌকায় উঠে বসে। শেষে জুইও তাড়াতাড়ি উঠতে গিয়ে আগে থেকে থাকা একজন ব্যক্তির সাথে ধাক্কা লাগে। আচমকা ধাক্কায় তাল সামলাতে না পেরে উভয়ই নৌকা থেকে পড়ে যায়। যেহেতু এখনো নৌকা ঘাট থেকে যায়নি তাই জুই আর ঐ লোকটা ঘাটের কাঁদার উপর পড়েছে। জুইয়ের পড়নে গাঢ় গোলাপি রঙের একটা গাউন। পিঠে পড়া চুলগুলো বেনুনি করে কাঁধের একপাশে যত্ন করে ফেলে রেখেছে। পিঠে থাকা স্কুল ব্যাগটা সহ সারা শরীর এখন কাঁদায় ছড়াছড়ি।
জুই পড়ে যেতেই ভুবন কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলো। সাথে সাথে নৌকা থেকে নেমে আসলো জুইয়ের বান্ধবীরা। তাদের মধ্যে মিনা আর সোমা হলো জুইয়ের বেস্ট ফ্রেন্ড। দুজন জুইকে দু’হাতে ধরে দাঁড় করালো।

–“কিরে মাইয়া পইরা গেলি কেমনে?”
সোমার কথা জুই কানে তুললো না। বরং আচমকা চেচিয়ে উঠলো,
–“এ কোন বাঙ্গির বাচ্চা আমারে ধাক্কা মারছস?”
অতিরিক্ত রাগে দুঃখে কাঁদা মাখা ফর্সা চোখমুখ লাল হয়ে গেছে। তখনই পিছন থেকে একটা পুরুষালী কন্ঠ স্বর তাদের কানে বাড়ি খেলো,
–“What the hell?”
সকলে পেছনে তাকাতেই চোখ আটকালো একজন সুদর্শন পুরুষের উপর। যে বর্তমানে কাঁদার স্তুপে পরিণত হয়েছে। যখন নিজের কর্দমাক্ত শরীরে দৃষ্টি বুলাতে ব্যস্ত তখনই নৌকা থেকে নেমে এসে লোকটাকে টেনে দাঁড় করালো আরো দুজন লোক।

–“আরে ব্রো পড়ে গেলি কিভাবে?”
পাপন নামের লোকটার কথায় কাঁদা মাখা লোকটা জুইয়ের দিকে ক্ষ্যাপা দৃষ্টিতে তাকালো। সেই দৃষ্টি অনুযায়ী বাকি দুজনও তাকাতেই চোখ বড় বড় হয়ে যায়। কাঁদা মাখা শরীরে জুইও খ্যাপা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তখন সবুজ নামের লোকটা অবাক হয়ে বললো,
–“মাহিন তুই একটা মেয়ের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়লি?”
এটা বলেই সুবজ আর পাপন চোখাচোখি করেই উচ্চ স্বরে হেসে দিলো। এতে মাহিন আর জুই রাগে এক সাথে চেচিয়ে উঠলো। জুই আর মাহিন একে অপরের দিকে এগিয়ে গিয়ে আঙ্গুল তাক করলো।
–“হাউ ডিয়ার ইউ মিস? আপনার সাহস কিভাবে হলো আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়ার।”
মাহিনের কথায় জুই দ্বিগুণ চেচিয়ে উঠলো,

–“বা*লের আলাপ জুরসেন আমার সাথে? আমি আপনাকে ধাক্কা মেরেছি নাকি আপনি আমাকে ধাক্কা মেরেছেন?
–“What আমি আপনাকে ধাক্কা মেরেছি?”
–“তাহলে কি আমি মেরেছি? অসভ্য বদমাশ লোক,মেয়ে দেখলেই গায়ে পড়ার ধান্দা,,,,,,,”
একনাগাড়ে জুই বকাঝকা করেই যাচ্ছে। জুইয়ের কথার মধ্যে মাহিন বাকহারা হয়ে পড়েছে। একটা মেয়ে এতটা ঝগড়াটে কিভাবে হয় এটা হয়তো জুইকে না দেখলে বুঝতেই পারতো না। এদিকে জুইকে মিনা আর সোমা টেনেটুনে দূরে নিয়ে গেছে।
–“আরে বোইন দোষটা তো তরই। তুই এভাবে না উঠলেই তো লোকটা পড়ে যেতো না।”
মিনার কথায় জুই আরও চেতে উঠে,
–“হ্যা হ্যা এখন তো সব দোষ আমারই দেখবি, সুন্দর সেরাইন দেখছস না?”
মিনাকে একচোট ঝেরে এবার সোমাকে চেপে ধরলো জুই_

–“তুই শালি, তোর কারণেই আজ লেইট হয়সে। আরও তলা ভরে খাগা।”
এসবের মধ্যে আজ আর ওদের তিন জনের প্রাইভেটে যাওয়া হলো না। এদিকে হারুন কাকা বাকিদের নিয়ে নৌকা ছেড়ে দিয়েছে আরও পাঁচ মিনিট আগে। রাগে মিনা আর সোমা কে গা*লি দিতে দিতে জুইও ওদেরকে নিয়ে নদীর ঘাট ত্যাগ করে বাড়ির উদ্দেশ্য।
এদিকে মাহিনরা এখনো ওদের যাওয়ার দিকে পলকহীন তাকিয়ে আছে। সেভাবেই মাহিন বললো,
–“Oh my God.I have never seen such a crazy girl in my life.”
পাপন আর সবুজও একইভাবে তাকিয়ে প্রতিত্তোর করলো,
–“আমরাও ভাই।”

সকাল ১০টা বাজে। দেখতে দেখতে ইফানের এক্সিডেন্টের দশদিন পেরিয়ে গেল। আজ চৌধুরী বাড়িতে যেন উৎসব লেগে গেছে। আমি আজ সকালে উঠে পড়তে বসেছিলাম। নিচে এসেই দেখি সকলে ব্যস্ততার মধ্যে আছে। কাকিয়া, পলি আর কাজের মেয়ে লতা হাতে হাতে কাজ করছে। আমিও গিয়ে তাদেরকে হেল্প করতে লাগলাম। যদিও সকলে আমাকে রান্না ঘর কিংবা বাড়ির কোনো কাজ করতে দেয় না। এত এত রান্না করতে দেখে কাকিয়াকে প্রশ্ন করলাম,
–“কেউ কি আসবে কাকিয়া এত এত আইটেম করছ যে?”
আমার কথায় কাকিয়া মুচকি হেসে উত্তর দিলো,
–“আসলেই দেখতে পাবে বড় বউমা।”

আমি পলিকে চোখে ইশারা করে জানতে চাইলাম।সেও মুচকি হেসে ঠোঁট উল্টালো। তার মানে সেও কিছু জানে না। আমি আর কিছু বললাম না। বেশ কিছুক্ষণ কাজ করার পর কাকিয়া আমাকে আর পলিকে রেস্ট নিতে বললো। তাই আমি আর পলি দু কাপ চা নিয়ে রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে আসলাম।
লিভিং রুম আজকে ফাঁকা পড়ে আছে। বেশ কিছুদিন ধরে ইফানকে সময় দেওয়ার ফলে নাবিলা চৌধুরী অফিসে যেতে পারে নি। তাই আজ বোনকে হাসপাতালে পাঠিয়ে তিনি অফিসে চলে গেছেন। অন্যদিকে ইকবাল চৌধুরী আর ইরহাম চৌধুরী বিজনেস প্লাস রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে। আমি আর পলি সোফায় বসে গল্প করছি তখনই ইতি এসে আমার পাশে বসে। মেয়েটার চোখমুখ আগের চেয়ে অনেকটা শুকিয়ে গেছে। কয়েকদিন পরই এসএসসি পরীক্ষা দিবে। তাই আজকাল বেশিরভাগই রুমে বসে বসে পড়াশোনা করে।

–“কি হলো ইতি মুখ এভাবে গুমরা করে রেখেছ কেন?”
আমার কথায় মেয়েটা আমার কোমর জড়িয়ে ধরলো_
–“ভাবিজান পড়ালেখা বিষয়টা ভিষণ কঠিন। আমার পড়তে একটুও ভালো লাগে না।”
–“তাহলে একমাত্র ননদিনী কে বিয়ে দিয়ে দিই, কি বল জাহানারা ভাবি?”
পলির হেয়ালিতে লজ্জায় নাকমুখ লাল হয়ে গেছে ইতির। নাজুকতা নিয়েই উত্তর করলো,
–“ইশশশ তোমরা খালি বলতেই জান কাজের কাজ করতে আর পার না।নাহলে তো আমিও পড়ালেখা ছেড়ে ডেক মাস্টারি করতাম।”
ইতির কথায় আমরা হেসে দিলাম,

–“তো ডেক মাস্টারি করতে কষ্ট লাগবে না।”
আমার কথায় সাথে সাথে মাথা ঝাঁকিয়ে ইতি বলল,
–“একটুও লাগবে না। এই যে পলি ভাবি করে না। ভাবির কি কষ্ট লাগে নাকি। তাই আমার ডেক মাস্টারি করতে কষ্ট লাগবে না।”
আমি আর পলি একমাত্র ননদীনির কথায় আবার হেসে দিলাম। তখনই পেছন থেকে আরেক জনের কন্ঠ স্বর কানে আসে,
–“What is ডেক মাস্টারি?”
আমরা পিছনে তাকিয়ে দেখার আগেই আমার আর পলির মাঝখানে ধপাস করে বসে পড়লো নোহা। এই মেয়েটার উপর আমার বহুত রাগ অথচ প্রকাশ করতে পারছি না ওর এমন সব আচরণে। মেয়েটা সারাক্ষণ আমার সাথে ডলাডলি করে বেড়ায়। কত গা”লাগালি করি তবুও লজ্জার ল টাও ওর মধ্যে দেখতে পাই না।

–“কি হলো প্রিটি গার্ল বল?”
–“এই মেয়ে যা বুঝ না তা নিয়ে এত প্যানপ্যান কর কেন? তোমার কি বয়স হয়নি এটুকু বুঝার যে তোমার এসব ডিজগাস্টিং বিহেভিয়ারে অনেক মানুষ বিরক্ত হয়।”
আমার বিরক্তি তে কান দিলো না মেয়েটা। নিজের মতো করে আবার বকবক শুরু করে দিলো,
–“OMG কি খাচ্ছ?”
এবার রাগে আমার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো,
–“চোখে কি দেখতে পাচ্ছ না চা খাচ্ছি?”
–“তুমি টি লাইক কর? বাট আমি করি না। আমি তো এভরিডে টির বদলে ওয়াইন খাই। ঐটা খুব ইয়াম্মি। তুমি খাবে?”

–“তোমার মতো যাদের মাথায় গুয়ে ভরা তাদের নিয়ে খাও যত্তসব।”
আমার কথায় পলি আর ইতি মুচকি মুচকি হাসছে। নোহা ঠোঁট উল্টালো,
–“ঠিক আছে আজ আমিও তোমার মতো চা খাব।”
এইটুকু বলে নোহা পলির দিকে তাকালো তার সব বিরক্তি নিয়ে। তারপর আদেশ করে বলে উঠলো ,
–“হেই দার্টি চিপ গার্ল আমার জন্য এরকম করে টি বানিয়ে আন।”
নোহার কথা শুনে পলির হাস্য উজ্জ্বল চেহারাটা নিভে গেল তৎক্ষণা। চোখগুলো সাথে সাথে জ্বলজ্বল করে উঠলো। এভাবেই পলি উঠে যেতে নিলে আমি বাঁধা দিই,
–“How dear are you? তুমি কোন সাহসে পলিকে চিপ বললে?”
–“ও তো চিপই।”
চোখ উল্টে উত্তর করলো নোহা। আমি পলির মিইয়ে যাওয়া চেহারা একবার দেখে শক্ত ভাবে নোহাকে উত্তর দিলাম,
–“ওকে, পলি চিপ আমিও চিপ। সো দূরত্ব বজায় রাখবে। নেক্সট টাইম যদি আমার সাথে ঘষাঘষি করতে দেখি তাহলে বিষয় টা খুব খা’রাপ হয়ে যাবে।”

–“কেন, কেন? তুমি চিপ কেন হতে যাবে প্রিটি গার্ল? বেইবি আমাকে বলেছে তুমি হাই ক্লাস ফ্যামিলির মেয়ে।”
আমি নোহাকে সুক্ষ্ম চোখে ভালো করে পরখ করলাম। কিন্তু তাকে তার উত্তর দেওয়ার আগেই কানে আসে টিভির শব্দ ,
❝ব্রেকিং নিউজ, আজ কেরানীগঞ্জ বুড়িগঙ্গা নদীতে ভাসমান অবস্থায় একজন দম্পত্তির র”ক্তাক্ত লা*শ উদ্ধার করে নৌবাহিনী। ময়নাতদন্তের জন্য পুলিশ লা*শ দুটো কে নিয়ে গেছে। এখানো মৃ*ত্যুর আসল কারণ জানতে না পারলেও লা*শ দুটোর পরিচয় পাওয়া গেছে। দম্পতি তার একমাত্র সপ্তাদশী কন্যাকে নিয়ে গাজীপুর থেকে কেরানীগঞ্জ আসছিলেন। পথেই দু’র্ঘটনা ঘটে। তবে মেয়েটির এখনো কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।❞
আমার সম্পূর্ণ মনযোগ নিউজে চলে গেছে নিমেষেই।এদিকে লা*শের কথা শুনেই ইতি আমার সাথে চেপে বসেছে। ইতি স্বভাব বসত র*ক্ষ,লা*শ এসবে ভীষণ ভয় পায়। সাধারণ যেকোনো মানুষই ভয় পাবে। আমি ইতিকে এক হাতে আগলে পলির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম,

–“মাত্র কোন জায়গার নাম বললো নিউজে?”
–“কেরানীগঞ্জ, বুড়িগঙ্গা নদী,,,”
তৎক্ষণাৎ পলির দিক থেকে উত্তর পেয়ে গেলাম। আমি কি ভেবে তাড়াতাড়ি উঠে দাড়ালাম। তারপর যখন এখান থেকে চলে যাচ্ছি তখন পেছন থেকে নোহার অনেকগুলো ডাক শুনতে পেলাম। এই মেয়েটা কি সবসময় মাতাল হয়ে থাকে কিনা বুঝতে পারি না। না হলে এত ভয়ংকর একটা নিউজ দেখলাম, অন্তত একটু তো ঘাবড়ে যাবে? তা কিছুই তার মধ্যে নেই সে এখনো চা অব্দিই পড়ে আছে।এক্কেবারে পাক্কা মাতাল প্লে গার্ল।

আমি রুমে এসে বাড়িতে কল করলাম। সাথে সাথেই কল রিসিভ করে অপর প্রান্ত থেকে জুইয়ের গলা ভেসে আসে,
–“আপুনি কেমন আছ?”
–“হুম ভালো। তুই কেমন আছিস?”
–“অনেক ভালো আছি। শুধু তোমাকে একটু মিস করছি। কবে বাড়ি আসবে বল?”
–“এই তো দেখি কবে আসা যায়। আর এই সময় তুই কল ধরলি কেন? আজ কি প্রাইভেট নেই?”
–“ছিলো তো। নদীর ঘাট পর্যন্ত গিয়েওছিলাম কিন্তু,,,”
আমি জুইয়ের মুখের কথা কেড়ে নিলাম,

–“কিন্তু কি?”
তারপর অচেনা লোকটাকে বকতে বকতে সকালের সব ঘটনা খুলে বললো আমাকে। আমি আর এ নিয়ে কিছু বললাম না। বরং ভালোভাবে চলাফেরার জন্য কিছু এডভাইজ দিলাম,
–“নিউজ তো দেখেছিস নিশ্চয়ই? সাবধানে থাকবি বুঝলি। একদমই এদিক সেদিক টইটই করে বেড়াবি না। একবার কানে এরকম খবর আসলে ভাইয়াকে জানিয়ে দিবো মনে রাখিস।”
জুইয়ের সাথে কথা বলে আম্মুর সাথেও আরও কিছু সময় ভালোমন্দ খোঁজ খবর নিয়ে ফোন কেটে দিলাম। তারপর একা বসে বসে আনমনে এটা সেটা ভাবতে লাগলাম।

আসরের নামাজ পড়ে ফোন টিপতে থাকলাম। আজকাল সব কিছু বোরিং লাগে। না এভাবে এখানে আর থাকা সম্ভব নয়। তাই আজ সিদ্ধান্ত নিয়েই নিলাম কাল পরশু বাপের বাড়ি যাব কেরানীগঞ্জ। এমনিতেও ইকবাল চৌধুরী কয়েকদিন আগে বাড়িতে আব্বু আর ভাইয়ার সাথে কথা বলেছে। আব্বু তেমন কিছু না বললেও ভাইয়া বলেছে আমাকে কয়েকদিনের জন্য নিয়ে যাবে। আমি যখন বাড়ির কথা ভাবতে মগ্ন তখনই বাইরে থেকে চেচামেচির আওয়াজ কানে আসে। আমি চোখ বন্ধ করে নিজেকে স্থির করে নিলাম। তারপর ফোনটা বিছানায় রেখে রুম থেকে বেরিয়ে গেলাম। আজ আর নিচে নামতে ইচ্ছে করছে না। তাই রেলিং ধরে লিভিং রুমে দৃষ্টিপাত করলাম। এই মূহুর্তে চৌধুরী বাড়ির সকলেই সেখানে উপস্থিত। দাদি আর কাকিয়ার কান্নার আওয়াজ শুনা যাচ্ছে। তখনই চোখ আটকায় নুলক চৌধুরীর পাশে পঙ্কজ কে হুইলচেয়ারে এমন অবস্থায় দেখে। এই চরিত্র খা’রাপ লু’চ্চাটাকে হাত পা ভাঙা অবস্থায় দেখে হাসি পেয়ে গেলো। আমিও ঠোঁট কামরে হাসতে থাকলাম। তখনই চোখ আটকায় নুলক চৌধুরীর তীক্ষ্ণ চাউনিতে। কিছুক্ষণ একে অপরের দিকে তাকিয়ে থেকে চোখ সরিয়ে নিলাম।

তখনই আবার সদর দরজা দিয়ে ইনান খন্দকার মানে ইফানের পিএ প্রবেশ করে। সাথে সাথে মাথায় আসে তাহলে কি আজ ইফানকেও হাসপাতাল থেকে বাড়ি নিয়ে আসা হয়েছে? ভেবেই তড়িৎ গতিতে আরেক পাশে তাকাতেই চোখ পড়ে কাঙ্ক্ষিত মানুষটার উপর। সে আগে থেকেই আমাকে দেখছে। তার ঠোঁটের কোণে লেগে আছে সেই চিরচেনা কুটিল হাসির রেখা। আমার সাথে চোখাচোখি হতেই চোখ টিপ মেরে ঠোঁট গোল করে চুম্মা দেখালো। তার এমন কাজে আমার ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরো প্রশস্ত হলো। কালো শার্ট পড়ে আছে। সামনে তিনটা বোতাম খোলা তাতে বুকের ভেতরের বড়বড় পশম গুলো দৃশ্যমান, যদিও আগে বুকে এগুলো ছিল না। হয়তো এই কয়দিনে গজিয়েছে। শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত তুলা। হাত পা ছড়িয়ে সোফায় গা ছেড়ে বসে আছে। ইফানের কপালে, হাতের অনেক অংশে ছোট ছোট ব্যান্ডেজ করা। শরীরের এমন অবস্থাতেও যে নি”র্লজ্জতা ছাড়ে না। আমর মনে হয় মরার সময়ও ছাড়বে না। ইফান এখনো সকলের দৃষ্টির আড়ালে আমার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাকিয়ে হাসছে। আমিও হেঁসে তাকে মিডল ফিঙ্গার দেখালাম। তাতে সে আরও ঠোঁট বাঁকাল। জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে দু আঙ্গুল দিয়ে কপালে স্লাইড করল। অতঃপর সবার আড়ালে বাঁকা হেসে ঘাড় কাথ করে সেও মিডল ফিঙ্গার দেখালো। শেষে নিঃশব্দে ঠোঁট নাড়িয়ে বুঝালো,

জাহানারা পর্ব ২২

❝ Fu*ck you ঝাঝঁওয়ালি❞
আমি জোর করে হাসি দিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আবার নিজের রুমে চলে গেলাম। তবে যাওয়ার সময় সদর দরজায় কলিং বেল বাজার শব্দ কানে আসে।

জাহানারা পর্ব ২৪