Home জাহানারা জাহানারা পর্ব ২৪

জাহানারা পর্ব ২৪

জাহানারা পর্ব ২৪
জান্নাত মুন

এতদিন পর চৌধুরী বাড়ির দুই সদস্যকে কাছে পেয়ে দাদি আর কাকিয়া আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলেছে। ইফানের অবস্থা এতটাই খা’রাপ ছিল যে ডাক্তাররাও আশা ছেড়ে দিয়েছিল। তারপরও যে এত তাড়াতাড়ি ও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে তা হইতো কেউ কল্পনায় করতে পারেনি। আমি নিজ রুমে চলে যেতেই সদর দরজাই কলিং বেল বেজে উঠে। কাজের মেয়ে লতা দরজা খুলে দিতেই প্রবেশ করে একজন লোক। লোকটা ফর্মাল ড্রেসআপে, দেখতে ভীষণ সুদর্শন লাগছে। দু’হাতে দু’টো ট্রলি বেগ নিয়ে অ্যাটিটিউডের সাথে লোকটা কিছুটা ভেতরে হেঁটে এলো। এখনো সকলে ইফানদের কে নিয়ে ব্যস্ত। তাই কে আসলো সে দিকে কারও খেয়াল নেই। লোকটা এক হাতের সাহায্যে চোখের সানগ্লাসটা খুলে সকলের উপর একবার দৃষ্টিপাত করে। অতঃপর ঠোঁট প্রসারিত করে মুচকি হেসে সকলের উদ্দেশ্য বাক্য ছাড়ে,

–“Hey guys, I’m back.”
অতিপরিচিত কন্ঠ স্বর কানে আসতেই সকলে সদর দরজার দিকে চোখ রাখলো। অনেকদিন পর আপন জনকে দেখে সকলের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। যদিও প্রথমে অবাক হয়েছিলো কিছুটা। কেউ কিছু বলার আগেই মনিরা বেগম এক ছুটে ছেলের বুকের উপর হামলে পড়ে। ছেলেও অনেকদিন পর মাকে কাছ থেকে দেখতে পেয়ে দু’হাতে আগলে নেয়। অত্যাধিক আনন্দে কাকিয়ার চোখ টলমল করছে। ভেজা গলায় ছেলেকে ধমকাতে শুরু করল,
–“পাজি ছেলে মার কথা কখনো ভাবিস না। তুই আসবি বলে সকাল থেকে কত কি রান্নাবারা করলাম। কিন্তু তোর দেখা মিললো না। আমি তো ভেবেই নিয়েছিলাম এবারও মিথ্যা আশা দিয়েছিস।”
মায়ের কান্না মিশ্রিত কন্ঠে কথাগুলো শুনে মাহিন তার মাকে আরও শক্ত করে বুকের সাথে আগলে ধরলো। কাকিয়ার মাথায় থুতনি ঠেকিয়ে নরম কন্ঠে বলে,

–“আর বলো না মম। আমার সাথে পাপনও দেশে ফিরেছে। তখন ও জোর করে ওদের গ্রামে নিয়ে গেছে। সেখানে আমার আরও কিছু কলেজ ফ্রেন্ড ছিল। এতগুলো বছর পর দেখা হবে তাই আর না করতে পারি নি।”
মা ছেলের কথার মাঝে বাকিরাও এসে মাহিনের সাথে কথা বলতে থাকে। ইরহাম চৌধুরী মাহিনের কাঁধে হাত রেখে বলেন,
–“কি আব্বু আজ যে দেশে আসবে আমাদের কে তো জানালে না।”
বাবাকে কাছে পেয়ে তাকেও জড়িয়ে ধরলো,
–“কি বল আব্বু! আমার দুই ভাই হাসপাতালে আর আমি ছোট ভাই হয়ে দেখতে আসবো না?”
–“ছেলেটা জার্নি করে এসেছে। এখনো তোমরা ওকে দাঁড় করিয়ে রেখেছ।”
ইকবাল চৌধুরীর গলা শুনতে পেয়েই মাহিন উনাকেও জড়িয়ে ধরলো,

–“বড় আব্বু তুমি কেমন আছ?”
–“আলহামদুলিল্লাহ ভিষণই ভালো। আফটারল বাড়ির সকল ছেলে আজ এক সাথে। তো কখন দেশে আসলে?”
–“জ্বি রাত তিনটার ফ্লাইটে বিডিতে ল্যান্ড করেছি। তারপর আরকি বন্ধুদের সাথে রাতটা কেরানীগঞ্জেই কাটিয়েছি।”
–“রাতে না হয় ছিলে। তাহলে সারাদিন গেলো সবে বাসায় আসলে?”
নাবিলা চৌধুরীর কথা শুনে সেদিকে তাকিয়ে মেকি হাসলো। নাবিলা চৌধুরী কেও জড়িয়ে ধরে মহিন’
–“বড় মা কেমন আছ তুমি? তোমাকে যে কত মিস করতাম কি বলবো।”
নাবিলা চৌধুরী মাহিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,

–“I know বেটা। আমাদের ছেলেমেয়েরা আমাদেরকে কতটা ভালবাসে তা বুঝাতে হবে না,আমরা জানি।”
মাহিন সোজা হয়ে দাঁড়ায়”
–“আমি তোমাদের সকলকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্যই বলে আসি নি। শুধু মমকেই জানিয়ে রেখেছিলাম। আর বাসায় আসতে লেইট হওয়ার করাণ হচ্ছে,,,,”
–“কিরে ভাই রোগীসব এইখানে আর তুই ঐখানে কি বাল ফেলছিস?”
ইফানের কন্ঠ কানে যেতেই ওর দিকে তাকালো মাহিন। ইফান গা ছেড়ে সোফায় বসে আছে। ঘাড় হালকা বাকিয়ে মাহিনের দিকে তাকিয়ে আছে। মাহিন ইফানের সাথে সোফায় বসে পড়লো।

–“ব্রো কেমন আছ এখন?”
–“আমি আবার কোন জীবনে খারাপ ছিলাম রে?”
ইফানের হেয়ালি কথায় হেসে দিলো মাহিন,
–“সে তো তুমি অলওয়েজ চাঙ্গা থাক আমি জানি। আর এখন তো বউ পেয়ে আরও বেশি।”
মহিনের কথায় ইফান দোতলার দিকে তাকিয়ে শিশ বাজালো, যেখানে একটু আগে আমি দাড়িয়ে ছিলাম। মাহিনও দৃষ্টি অনুযায়ী ঐদিকে একবার তাকিয়ে ইফানের বাহু চাপরে দিলো।
–“যা ভাই, আমাকে দেখা শেষ হলে লেংরাটাকে দেখ।”
ইফানের ইশারা অনুযায়ী মহিন সহ সকলে ঐদিকে তাকালো। এদিকে লেংরা বলায় পঙ্কজের চোয়াল শক্ত হয়ে এসেছে। সে রাগে ইফানের দিকে তাকিয়ে। গত সাতদিনে ইফান পঙ্কজ কে যে পরিমাণ জ্বালিয়েছে, অন্য কেউ থাকলে হয়তো পাগল হয়ে যেতো। পঙ্কজ কে রাগতে দেখে ইফান চোখ মেরে ঠোঁট বাকালো। ইফান আর পঙ্কজ কে থামাতে ইমরান আর মাহিন শুকনো কাশলো।

–“পঙ্কি ভাই কেমন আছ?”
মাহিনের গলার আওয়াজ শুনে ইফানের দিক থেকে খেপা দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। খুব কষ্ট করে ঠোঁটে মৃদু হাসি ঝুলিয়ে প্রতিত্তোর করলো,
–“দেখে কি মনে হচ্ছে?”
মাহিন বলার আগেই পঙ্কজের মুখের কথা কেড়ে নিলো ইফান,
–“দেখে তো মনে হচ্ছে তর টুক্কুরু ভাই আর দাড়াতে পারবে না।”
ইফানের বাক্যটা যেন আগুনে ঘি ঢালার মতো পঙ্কজের শরীরে লাগলো। পঙ্কজ রাগে মুখ খুলতে যাবে তখনই আবার মাহিন আর ইমরান কেশে কথা ঘুরাতে অন্য আলাপ শুরু করে দিলো। ইফানের কথায় বড়দের মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা দিলো না। সকলে জানে ইফান যে কত বড় ঠোঁট কাটা নি’র্লজ্জ পাবলিক।

পুরো লিভিং রুম হইচইপূর্ণ। মাহিন সকলের সাথে কথাবার্তা বলছে। এদিকে এতক্ষণ পর হৈচৈ আওয়াজে ঘুম ভাঙে নোহার। ডুলুডুলু পায়ে হেঁটে চোখ কচলাতে কচলাতে লিভিং রুমে হাজির হয় সে। পুরোপুরি চোখ খুলতেই চোখ আটকায় ইফানকে দেখে। তারপর আর কি? এক চিৎকারে পুরো চৌধুরী বাড়ি কাপিয়ে দিলো মেয়েটা। সকলে ওর দিকে তাকানোর আগেই এক দৌড়ে ইফানের দিকে আসতেই হঠাৎ ব্রেক কসে। উপস্থিত সকলের দৃষ্টি নোহাতে আবদ্ধ। তেমনই মাহিনও নোহার দিকে তাকিয়ে। হঠাৎ এত সুদর্শন পুরুষ কে দেখতে পেয়ে পা থেমে যায় নোহার। মাহিনের দিকে তাকিয়ে থেকেই কয়েকটা ঢুক গিললো মেয়েটা।

–“কি হচ্ছে কি নোহা? এক্ষুনিই তো পড়ে যেতে।”
নুলক চৌধুরীর কথা কানে তুললো না মেয়েটা। সে তার শর্ট কাট চুলগুলো কে সুন্দর করে কানে গুজে মাহিনকে হাত নাড়িয়ে হায় দিলো। মাহিনও মৃদু হেসে হায় দিলো। তারপর আবার সকলে আড্ডায় মেতে উঠলো। কাকিয়া আর পলি সকলের জন্য বিভিন্ন ধরনের সরবত,পকরা, পিঠা এনে দিলো। নোহা আস্তে আস্তে ইফানের পাশে ঘেঁষে বসে পড়লো। তার দৃষ্টি এখনো মহিন তেই আবদ্ধ।
–“কিরে শালি কয় কেজি খেয়েদিলি এ কদিনে?”
ইফানের কথা কানে যেতেই তার দিকে দৃষ্টিপাত করলো নোহা। আবার দু’টো ঢুক গিলে, জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ইফান কে বললো,

–“বেইবি ওরটা কতটুকু হবে?”
নোহার ইশারা অনুযায়ী ইফানও মাহিনের দিকে তাকালো,
–“একবার মেপে দেখতে পারিস।”
ইফান ঠোঁট কামরে উত্তর দিলো। নোহার চোখমুখ জ্বলজ্বল করছে ইফানের কথা শুনে। ইফান শুধু তাকিয়ে দেখলো খুশিতে গদগদ করা নোহাকে। তারপর দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নিতে নিতে অস্পষ্ট ভাবে বিরবির করলো,
–“শালি জিনিস একটা!”

বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামলো। আজ কয়েকদিন পর আকাশে পুরো চাঁদের হদিস মিলেছে। কদিনের কু*ত্তা ম*রা গরম থাকায় বাইরে বাতাসের ছিটেফোঁটাও ছিলো না। তবে বিকেল থেকেই দক্ষিণ দিক থেকে শীতল হাওয়া বইছে। আমি মাগরিবের নামাজ আদায় করে বেলকনিতে এসে দাঁড়ালাম। খুব ভালো লাগছে এই ঠান্ডা হাওয়াটা। বিকাল থেকেই নিচে হৈ-হুল্লোড় হচ্ছিল। এখন চেচামেচির আওয়াজ কম আসছে। মনে হয় সকলে রেস্ট নিতে লিভিং রুম ত্যাগ করছে।
ধরণী সম্পূর্ণ আঁধারে তলিয়ে গেছে। বিশাল বড় বড় দালান গুলোর প্রতিটি ইউনিটে আলো জ্বলমল করছে। ব্যস্ত ঢাকা শহর ইলেকট্রনিকাল বিদ্যুৎতে আলোকপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হঠাৎ ধমকা হাওয়ায় পরম আবেশে চোখ দুটো বন্ধ করে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকলাম। ঝড়ো হাওয়ায় আমার সামনের ছোট ছোট বাবরি চুলগুলো আর শাড়ির আঁচল টা উড়ছে। আমি গভীর ভাবনায় হারিয়ে যেতে থাকলাম। তখনই ইফানের কর্কশ কন্ঠ কানে এসে প্রতিধ্বনিত হয়,

❝ঝাঁঝ ওয়ালির ঝাঝ বেড়েছে
ঠান্ডা হবে কিসে?
অনেক ভেবে ফার্মেসি থেকে
ক”নড”ম নিয়ে এসেছি সাথে।❞

আস্তে আস্তে দুর্বল শরীরটাকে টেনে নিজের রুমের দিকে আসছে ইফান। তাকে ধরে রুমে নিয়ে আসার জন্য সবাই বললেও কারো কথাই কানে তুলে নি। তার মতে,”তাকে রুমে কেন কেউ দিয়ে যাবে সে কি পঙ্কির মতো লেংরা নাকি? এখন সে না পারলেও কারো হেল্প নিবে না। এতে তার প্রেস্টিজে লাগবে।”
অবশেষে নিজের রুমের সামনে এসে থামলো লোকটা। ইদানীং কোনো পুরুষ বাসায় বেশি থাকে না। তাই ঘুমানোর আগ পর্যন্ত দরজা খুলে রাখি। দরজার সামনে আসতেই ইফানের ঠোঁটের কোণে শয়তানি হাসিটা ফুটে উঠলো। ঐসব উল্টো পাল্টা বকে বকে দরজায় মৃদু ধাক্কা দিতেই খুলে যায়। রুমে দৃষ্টিপাত করতেই দেখতে পায় সারা রুম অন্ধকারাচ্ছন্ন। সে ভেবেছিলো আমি হয়তো রুমেই।

তাই তার এই সব নোংরা কবিতা বলতে বলতে দরজা খুলে। তবে পুরো রুম অন্ধকার থাকায় হাসি মুখটা কঠিন হয়ে গেলো। সে লাইট ওয়ান করতেই সারা ঘর আলোকিত হয়ে পরে। রুমের সকল কোণায় একবার চোখ বুলিয়ে দেখে। অতঃপর আমাকে না দেখতে পেরে বুঝার বাকি থাকে নি আমি কোথায় থাকতে পারি। হাত চালিয়ে সে তার পড়নের কালো শার্টের বাকি বোতাম গুলো খুলে শার্ট টাকে বিছানায় অযত্নে ছুড়ে ফেলে দেয়।

জাহানারা পর্ব ২৩

তারপর নিঃশব্দে বেলকনিতে গিয়ে পেছন থেকে আমাকে সংবে’দন’শীল স্পর্শে জড়িয়ে ধরে। আমি আগে থেকেই এটার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। এ যে কত বড় নি’র্লজ্জ তা আমার আর বুঝার বাকি নেই।এর মুখে হাজার বার ঝাড়ু মা’রলেও সে আমার গু খেতেই আসবে। লোকটার শরীর থেকে অতি পরিচিত ক্লোনের গন্ধ বারবার নাকে এসে বাড়ি খাচ্ছে। আমি বিরক্তিতে নাকমুখ কুঁচকে ফেললাম। রাগে কটমট করে মুখ খোলার আগেই ইফানের মাদকীয় হাস্কি কন্ঠ ধ্বনি কানে আসে,
❝বুলবুলি❞

জাহানারা পর্ব ২৫