Home লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ২৮

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ২৮

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ২৮
অহনা রহমান

নাসিমা সকালের খাবার তৈরি করছিলেন। রাজ ও নাফির বিয়ের কারনে বেশ কয়েকদিন ধরে কলেজে অনিয়মিত ছিলেন তিনি৷ হিয়া এই বাড়ির বউ হয়ে এসেছে আজ একমাস তিন দিন। এখন সব স্বাভাবিক। তাই ইদানীং নাসিমা কলেজে যাচ্ছেন নিয়মিত। যেহেতু দুটো বউ-ই নতুন, সংসার তো আর বউদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে পারেন না তিনি। তাই তিনি আগের মতো করেই সকালের নাস্তা বানাচ্ছেন। নাস্তা রেডি করে, ছেলেদের খাইয়ে-দাইয়ে তারপর তিনি কলেজে যাবেন। তখন ভোর পাঁচটা বাজে৷ নাসিমা নিজ মনে রুটি বানাচ্ছেন৷ আর গুনগুন করে দোয়া-দরুদ পড়ছেন। এমন সময় পেছন থেকে কারো শীতল কন্ঠের ডাক শুনে, অবাক হন তিনি৷

“মা? আজও আপনি একা একা কাজ করছেন?”
মনের ভেতরে প্রশান্তির ছোঁয়া বয়ে যায় নাসিমা বেগমের। তিনি হাসি মুখে পেছনে তাকান৷ হিয়াকে দেখে একটুও অবাক হননা তিনি। মেয়েটা এমনই। প্রতিদিন রাতে পইপই করে বলে দেবে নাসিমাকে,
“মা, আপনি কিন্তু একা একা এতো কাজ করতে যাবেন না। ফজরে আমি উঠি। আমাকে একটু ডাক দিবেন আম্মু। দুজনে একসঙ্গে করলে সব তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে।”

নাসিমা শোনেন না হিয়ার কথা৷ কি করে শুনবেন তিনি৷ ওদের নতুন বিয়ে হয়েছে। বর-বউয়ের কথা গল্প করতে করতেই তো রাত শেষে হয়ে যায়। ভোরে উঠতে কষ্ট হবে না?? তাছাড়া নতুন বিয়ে হয়েছে ওদের। বাপের বাড়িতে যেসব অভ্যাস ছিলো তা তো আর এতো কম সময়েই চলে যাবে না। ওকে তো একটু সময় দেওয়া উচিৎ। যেমনটা রুহি নিয়েছে৷ এসব ভেবেই নাসিমা আর ডাকেন না হিয়াকে। যেটুকু কাজ তিনি একাই করতে পারবেন। কিন্তু মেয়েটা শুনলে তো? এই যে প্রতিদিনের মতো নিয়ম করে আজও উঠে চলে এসেছে।
“তুমি কেন উঠতে গেলে মা? এটুকু কাজ আমি একাই পারবো।”
হিয়া ততক্ষণে নাসিমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। হিয়া নীল শাড়িটার আঁচল খানা কোমড়ে গুজলো। বেসিনে রাখা থালাবাটি গুলোতে হাত দিয়ে বলল,

“আম্মু আমি জানি আপনি পারবেন৷ আপনি তো মা! আর মায়েরা তো সব পারে। কিন্তু আপনি এখানে একা কাজ করবেন আর আমি ঘুমিয়ে থাকবো! এটা হয় বলেন?”
নাসিমা খুশি হন মনে মনে। তবে যতটা হন ততটা প্রকাশ করেন না। কেবল হিয়ার দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইলেন কিয়ৎক্ষন। হিয়া আর কিছু বলে না। থালাবাসন গুলো ধুয়ে ফেলে। গৃহকর্মী রাবেয়া গর্ভবতী হওয়ার দরুন, নাসিমা ওকে দিয়ে এখন অতটা ভারী কাজ করান না। রাবেয়া আসে দশটার দিকে। এসে অল্পসংখ্যক কাজ করে দিয়ে চলে যায়৷ এজন্য নাসিমার উপর একটু বেশিই চাপ পড়ে গেছে।
হিয়া ও নাসিমা মিলে সকালের নাস্তা তৈরী করলো। সব কাজ শেষ। তখন সকাল সাড়ে সাতটা। নাসিমা তখন হিয়াকে বললেন,

“মা, তাহলে তুমি প্লিজ খাবার গুলো একটু টেবিলে নিয়ে রাখো। আমি রেডি হয়ে আসছি৷ খেয়েদেয়ে একবারে বেরোবো ওদের সাথে।”
হিয়া প্রথমে সায় জানালেও পরক্ষণে কি ভেবে যেন ডাকলো নাসিমাকে। নাসিমা পিছনে ঘুরে তাকালেন। বললেন,
“কিছু বলবে মা?”
হিয়া প্রথমে গাইগুই করতে লাগলো। যা দেখে নাসিমা ওকে অভয় দিলেন৷ এতে হিয়া যেন একটু সাহস পেল। বলল,
“আম্মু আমি ভার্সিটিতে যেতে চাচ্ছিলাম। আজকে যাবো?”
নাসিমার হঠাৎ করে কি যেন মনে পড়লো। এজন্য তিনি জিভ কামড় দিলেন৷ হিয়ার দিকে এগিয়ে এসে, ওর কাঁধে হাত রাখলেন। বললেন,

“আরেএএ, আমি তো ভুলেই গেছিলাম ভার্সিটির কথা। তোমাকে বলবো-বলবো করে মনেই থাকে না। যাইহোক! এটা আবার আমাকে বলার কি দরকার আম্মু? অবশ্যই যাবে তুমি ভার্সিটিতে।”
হিয়া হাসলো। বলল,
“আমি আজকে থেকেই যেতে চাচ্ছিলাম আম্মু।”
“বেশ তো। আচ্ছা আমি রাজকে বলবো, তোমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য?”
এতক্ষণের হাসিখুশি মুখটা রাজের কথা শোনা মাত্রই চুপসে গেল। হিয়ার তো ঠ্যাকা পড়েনি যে রাজের সাথে যেতে হবে। রাজের কথা শুনে হিয়ার যতটা না বিরক্ত লাগলো, তার চেয়ে দ্বিগুন ঠান্ডা গলায় সে বলল,
“না না মা সমস্যা নেই। আমি একা যেতে পারবো। তাছাড়া আপনার ছেলের সঙ্গে একটু কথা বলে নিই।”
নাসিমা সায় দিলেন তাতে৷ হিয়াকে পাঠিয়ে দিলেন ওর ঘরে। নাফির সাথে কথা বলবে আবার ভার্সিটিতে যাওয়ার জন্য তৈরী হবে! সময় লাগবে মেয়েটার৷ তাই তিনি হিয়াকে পাঠিয়ে দিলেন। এবং নিজে সমস্ত খাবার গুলো টেবিলে এনে রাখলেন। সবকিছু গুছিয়ে তারপর গেলেন নিজে ফ্রেশ হতে।

নাফি তখনও ঘুমে। ফজরে দুজন একসাথে নামাজ পড়েছে। এরপর হিয়া নিচে চলে গেছে। আর নাফি আবারও ঘুমিয়ে পড়েছে। হিয়া এসে আলগোছে নাফির শিয়রে বসলো৷ কি মনে করে যেন, হিয়া হাত রাখলো নাফির গালে। খোঁচা খোঁচা চাপদাড়িতে। নাফির দিকে তাকিয়ে হুট করেই চমৎকার হাসলো সে। হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো গোটা মুখে। মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় দেখে গেল তার ব্যক্তিগত পুরুষটাকে। কন্ঠে তার আপনাআপনিই চলে এলো,
“এতো মায়ায় কখন জড়ালেন সাহেব? কিভাবে পারলেন? এই হিয়া যে এলোমেলো ভাবে বড্ড জড়িয়ে যাচ্ছে আপনি নামক মানুষটাতে। আপনি কিন্তু দারুণ জাদু জানেন নাফি। কিভাবে পারলেন এমন জাদু করতে?”
নাফি আচমকাই চোখ খুলে ফেললো। এবং নিজের মুখে থাকা হিয়ার হাতখানা চেপে ধরলো সে। হঠাৎ আকস্মিক ঘটনায় কিংকর্তব্যবিমূড় হলো হিয়া। সে চমকে গেল। ও কিছু বলার আগেই নাফি হিয়ার হাতটা টেনে ঠোঁট ছোঁয়ালো। এতে হিয়ার সর্বাঙ্গ যেন শিউরে উঠলো এতে। মেয়েটি পরক্ষনেই চোখদুটো বন্ধ করে নিলো। নাফি বাঁকা হাসলো তা দেখে। বলল,

“তুমি আমার কাছে এলে এতো লজ্জা কেন পাও ময়না? বিয়ের তো অনেকদিনই হলো। এখনও কি লজ্জা ভাঙাতে পারিনি?”
হিয়া জবাব দিলো না। সে নিজেও জানে না, নাফির সামনে একে কেন কাঁপাকাঁপি শুরু হয় তার। লজ্জারা সব আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রাখে তাকে। সে চাইলেও পারে না নিজে থেকে নাফির কাছে যেতে। বেচারি ভাবছিলো মনে মনে এসব। ঠিক তখনই শুনতে পেল নাফির আরেকটি কথা,
“এমন হলে তো জনগণ আমার পুরুষত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলবে৷ কেমন পুরুষ আমি, যে নিজের বউয়ের লজ্জায় এখনো ভাঙাতে পারলাম না!”
এরপর নাফি কিছু একটা ভেবে চোখমুখ শক্ত করে ফেললো। হিয়া তখন অন্যদিকে তাকিয়ে। নাফি হিয়াকে বলল,
“ময়না একটু শোনো তো।”

নাফির কথা বলার ধরন শুনে হিয়া তাকালো ওর দিকে। নাফি তখন ইশারায় বোঝালো, সে কানে কানে বলবে৷ এজন্য হিয়া নিচু হয়ে, নিজের কানটা নাফির মুখের সামনে নিলো। নাফি তখন হিসহিসিয়ে বলল,
“প্রতিদিন যে ডোজ চলছে তাতেও কি লজ্জা ভাঙার কাজ হচ্ছে না? আরও কড়া ডোজ চাই?”
হিয়ার চোখ দুটো আপনা-আপনিই বড় হয়ে গেল। ছিঃ ছিঃ! লজ্জায় মেয়েটা হাশফাশ করতে লাগলো। উঠে সরে যেতে চাইলো সেখান থেকে। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না৷ নাফি হিয়ার হাতটা টেনে ধরলো৷ বসালো হিয়াকে আগের জায়গায়। স্বাভাবিক ভাবে বলল,

” তুমি যদি উল্টা-পাল্টা মনে করে নিজেই লজ্জা পাও, তাও কি আমার দোষ? আমি কিসের ডোজের কথা বললাম? এই যে নিয়ম করে, তোমাকে ভালোবেসে যে চুমু খাই প্রতিদিন। সেটা কি একটা ডোজের মতো কাজ করার কথা না? এই কয়েকদিনে কয়েক লক্ষ বার চুমু খেলাম। অথচ তোমাকে প্রত্যেকবার চুমু খেতে গেলেই, তুমি নতুন করে লজ্জা পাও। তাই বললাম, যে কড়া ডোজ চাই? মানে ধরো এখন থেকে চুমুর সাথে সাথে ….!”
হিয়া থামিয়ে দিলো নাফিকে। বিয়ের পর থেকেই বেচারির সাদা মনে সারাদিন কালা কালা ভাবনা-চিন্তা ঘুরে বেড়ায়। এতে ওর কি দোষ? মুরব্বিরা বলে এটা নাকি বিয়ের দোষ৷ নাফি যা মিন করেই বলুক না কেন, তার কালা মনে তো একটা জিনিসই দেখিয়ে দেয়। এই সমস্যার জন্য হিয়া বেচারি কখন জানি পাগল হয়ে যাবে! হিয়া কথা ঘুরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে বলে উঠলো,

“আজকে ভার্সিটিতে যেতে চাচ্ছিলাম। দিয়ে আসবেন আমাকে?”
হিয়ার ভার্সিটি যাওয়ার কথা শুনে নাফি চকিতে উঠলো। শোয়া থেকে উঠে বসলো সে।
“ময়না ভার্সিটিতে যাবা কখন প্লান করলে?”
“হুট করেই। অনেকদিনই তো যাওয়া হয় না। সামনে এক্সাম আছে তো।”
“বললাম, ভার্সিটি চেঞ্জ করে দিই। যদি ওরা না মানে আমি নিজেই কতৃপক্ষের সাথে কথা বলবো। কিন্তু তুমি তো রাজি হলে না৷ তোমাকে তো ওখানে একাকী যেতে দিতে মন চাই না পাখি।”
হিয়া নাফিকে আশ্বস্ত করে বলল,
“চিন্তা করবেন না। আমার কিছুই হবে না। আপনি থাকতে কার সাহস আছে আমাকে কিছু করার?”
হিয়ার সরল কথাতে নাফি খুশি হলেও নিশ্চিন্ত হতে পারে না। সে কিভাবে হিয়াকে প্রটেক্ট করবে কে জানে! হিয়া সুযোগ পেয়ে এবারে উঠে চলে গেল। গোসল-টোসল করে তারপর যেখানো যাওয়ার যাবে। আলমারি থেকে সুন্দর একটা থ্রিপিস বের করলো মেয়েটা। এরপর ওয়াশরুমে ঢুকবে এমন সময় নাফি বাঁধ সাধলো।

“এই ময়না কই যাও?”
“গোসল করবো। ভার্সিটি থেকে কখন আসবো না আসবো বলা যায় না তো। তাই গোসলটা করেই যাবো।”
নাফি বসা থেকে এক লাফে নিচে নামলো। হিয়ার মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো। হিসহিসিয়ে বলল,
“রাতে না গোসল করলে? এখন আবার করবে?”
হিয়া ভেবেছিল নাফি বোধহয় কোনো জরুরি কথা বলবে। এজন্য সে দাঁড়িয়ে ছিলো। নাফির ওই কথাটি শুনে সে চলে যেতে নিলো। মুখে শুধু বলল,

“ধ্যাৎ! সবসময় উল্টাপাল্টা কথা।”
মেয়েটি যেতে চাইলেও যেতে পারে না। নাফি ফের আটকালো ওকে। এইবার আর কোনো কথা বললো না লোকটা। হিয়াকে একটানে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। হিয়া কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই নাফি আক্রমণ চালালো হিয়ার অধর জোড়াতো। হিয়ার হাত থেকে কাপড়চোপড় গুলো পড়ে গেল আপনাআপনি। হাত দুটো চলে গেল নাফির পিঠের কাছে৷ খুব জোরে খামচে ধরলো পিঠের কাছটা। তন্মধ্যে নাফি একটা বাক্যই শুধু আওড়ালো,
“ওকে ফাইন। আমিও গোসল করবো পাখি। চলো তাহলে, লজ্জা ভাঙানোর ওভার ডোজ টা দিয়েই ফেলি।”

হিয়া নাফি দুজনে একসঙ্গে নিচে নামলো। ততক্ষণে রাজ ও রুহি উঠে পড়েছে। ওরা অলরেডি খাওয়া শুরু ও করেছে। ওরা দুজন অমনই। নাফি হিয়ার ধার ধারেনা দু’জনের কেউ। রুহি এই একমাসে অসংখ্যবার চেষ্টা করেছে হিয়াকে কষ্ট দেওয়ার। কিন্তু প্রত্যেক বারই কোন না কোন ভাবে ব্যর্থ হচ্ছে সে। যতবারই সে ব্যর্থ হচ্ছে ততবারই রাজের সাথে ঝগড়া করছে। সে মূলত হিয়াকে দেখতেই পারছে না। দুজনে একই বাড়িতে থাকলেও, ওদের সারাদিন দেখাও হয়না বলা যায়।
রাজের শরীর কমে গেছে অনেক। চিন্তায়, শোকে বেচারা ধুঁকে ধুঁকে মরছে।এই কয়েকদিনের মাথায় রাজকে দেখায় গাঞ্জা খোরের মতো৷ চোয়াল – টোয়াল ভেঙে একটা ন্যাসাকার অবস্থা! যদিও সেও আড়ালে আবডালে হিয়ার থেকে প্রতিশোধ নিতে চাই। হিয়ার সুখ তারও সহ্য হচ্ছে না। হয়তো সে হিয়াকে আবারও নিজের করবে নাহলে একদম রাস্তা থেকে সরিয়ে ফেলবে।

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ২৭

তবে সে এইবারে আর কারোও কথা শুনবে না৷ নিজের বুদ্ধিতে ফকির হওয়া ভালো। রাজ এই মনে করে অল্প-সল্প এগোচ্ছে। কিন্তু রুহি সেটা মানছে না৷ সে হিয়াকে যেকোনো মূল্যে হারাতে চায়।
নাফি ও হিয়া যখন নিজেদের চেয়ারে বসলো, নাসিমা বেগম বলে উঠলেন,
“বড় ছেলে, হিয়া মামনী নাকি আজ ভার্সিটিতে যাবে। তুই একটু নামিয়ে দিয়ে আয় ওকে।”
হিয়ার ভার্সিটিতে যাওয়ার খবর শুনে রাজ ও রুহি দুজনই অবাক হলো। এতক্ষণে ওরা মুখ তুলে তাকালো। দুজন দু’জনের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে নিলো। হিয়াকে হেনস্তা করার একটা দারুণ ফন্দি ততক্ষনে এঁটে ফেলেছে রুহি৷

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ২৯