Home তিন তরঙ্গের আলোকছটা তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২২

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২২

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২২
রাফিয়া জান্নাত রিফা

তালুকদার বাড়ির টোনাটুনি ইতি, বিথী, নিঝুম, সুন্দর, মুহিন,পিকি, সুহানা,দির্শক গাড়িতে বসে আছে।আলবান গাড়ি ড্রাইভ করছে তার পাশে বসে আছে ইতি।নিধি আর আর্দ্র নেই তাদের একপ্রকার জোরজবরদস্তি করেই আর্দ্রের বাইকে উঠানো হয়েছে। ৭ জনের জায়গা হওয়া গাড়িতে ৮ জন বসেছে।আলবান আর ইতি তো দিব্বি বসেই আছে, কিন্তু পিছনের সিটেই আসল কারবার। বিথী এক পাশে, তার পাশে দির্শক, দির্শকের পাশে পিকি আর পিকির কোলে মুখ গোমরা করে বসে আছে মুহিন। মুহিনের মুখ দেখে মনে হচ্ছে, জীবনে এর চেয়ে বড় অন্যায় আর কিছু হয়নি। যেন পৃথিবীর সব সিট শেষ হয়ে গেছে, আর ভাগ্যক্রমে সে শুধু পিকির হাঁটুর উপরে স্থান পেয়েছে!
পেছনের কোণে বসে আছে নিঝুম আর সুন্দর সুন্দরের পাশে সুহানা নাক ছিটকে জানালার দিকে মুখ করে বসে আছে। সুন্দর তো মহা খুশি গাড়ি কাঁপুক, ধাক্কা লাগুক, নিঝুম তার গায়ে প্রমুখ।সে যেন মেঘে ভেসে বেড়াচ্ছে। নিঝুম একটু বিরক্ত হলেও সুন্দের মধ্য তার সিটেফোটা ও নেই।

বিথী যথেষ্ট প্রচেষ্টায় আছে যাতে দির্শকের সাথে তার কোন ভাবেই ধাক্কা না লাগে, কিন্তু হচ্ছে তার উল্টোটাই বারবার দির্শকের কাঁধে বিথী কাঁধ ঘনিষ্ঠ ধাক্কা লাগছে। বিথী আবার আগের ন্যায় নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেই যাচ্ছে।দির্শকে এসবে কোন হেলদোল নেই সে বেশ ভালো ইনজয় করছে ব্যাপারটাকে।
আলবান এক হাত দিয়ে স্টারিয়াং ধরে অন্য হাত দিয়ে গাড়ির রেডিও অন করলো, রেডিও তে নব্বই দশকের গান বাজতে লাগলো,ইতি খুবই বিরক্তিকর লাগলো,তাও দাঁতে দাঁত চেপে কয়েক মিনিট শুনলো কিন্তু তার পক্ষে এই ভ্যাঁ ভ্যাঁ করা গান আর সহ্য করা সম্ভব হলো না,তাই সে রেডিও বাটামে চাপ দিয়ে গান চেঞ্জ করলো,ডিজে পার্টির আইটেম গান বাজতে লাগলো,আলবান ইতির দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, কিন্তু ইতি তা দেখেও দেখলো না।আলবান কোন কথা না বলে সে ও আগের ন্যায় গান চেঞ্জ করে ইংরেজি গান দিলো।ইতির আবারো বেশ বিরক্ত লাগলো, ইচ্ছে করলো আলবানের চুল গুলো একটা একটা ছিড়ে টাকলা করতে, কত্তো সুন্দর আইটেম গানটা ছিল।আলবানের দিকে রাগে কটমট করতে লাগলো ইতি,সে ও আর কিছু না বলে গান চেঞ্জ করলো আবার অন্য এক আইটেম গান এলো।আলবানের আবার রাগ হলো রাগের বশে এক হাত দিয়ে বিথীর মাথা একটা টালা ও বসালো, পরক্ষণে আবার গান চেঞ্জ করে ইংরেজি গান দিলো,ব্যাস ইতির আবার রাগ হলো,এইভাবে চার থেকে পাচ বার এমন চলতেই লাগলো, ছয়বারের বেলায় আলবান রাগে গর্জে বলে,,,

__ ইতিইইই বেশি বাড়াবাড়ি করছিস কিন্তু?
ইতিও মাথা ঝাঁকিয়ে বলে,,,
__ আপনি শুরু করেছেন।
তাদের গান চেঞ্জ করাকরি চলতেই লাগলো। এদিকে পিছনের ছিটে বসে থাকা অবলা গুলো অসহায় চোখ ফ্যালফ্যাল করে তাদের কান্ড দেখছে।একের পর এক গান চেঞ্জ করায় কান ঝিম ধরে আছে।এমন অবস্থায় সত্যি মুহিনের খুব কান্না পাচ্ছে।পিকি কিছু একটা বোধ করে মুহিন কে বলে,,,
__ মুহিন আর ইউ ওকে, ব্যাথা পাচ্ছো নাকি?
এটাকে ছোট করে বলে কাঁটা গাঁয়ে নুনের ছিটা, হেব্বি রাগ হলো মুহিনের।তাও মুখ ফুটে শুধু মিন মিন করে বলল,,
__ পেটটা আস্তে করে ধরো পিকি।কাতুকুতু আছে তো তাই।
__ ওকে।
সুন্দরের ও হেব্বি রাগ হলো কারণ টা হলো,এই তো একটু আগেই একটা রোমান্টিক গান বাজলো, একটু রোমান্টিক মুড ও আসলো,ব্যাস গান গান টা পাল্টে গেল।এখন ইচ্ছা করছে নিজের মাথা নিজেকেই ফাটাতে,ব্যাস রাগ ঝড়তে সুহানাকে রাগি কন্ঠে বললো,,,

__ ওই একটু সরে যা না, চিপায় ফালায় মারবি আমারে।
সুহানা দাঁত কটমট করে বলে,,,
__ অসুন্দরই মাথাটারে বিগড়ায় দিস না কয়া দিলাম,তুই আমারে চিপায় ফেলচোস, চোখে মাথা খাইছোস,বালি চাপা দিমু কয়া দিলাম।
__ এনে বালু পাবি কই বইননা।
__ রাগাইস না তো ?
সুন্দর আর কিছু বললো,মেয়ে মানুষ এখন রেগে আছে বলে কথা,কখন কি করে তা তো আর বলা বাহুল্য,তাই চুপ থাকাই ভালো।
ওদিক আলবান, ইতির গান পাল্টানোর যুব্দ ধ্বংসের প্রান্তে।ইতি গান পাল্টে দিসে,আলবান আবার ইতির মাথায় জোরে টালা বসিয়ে গান পাল্টাতে যাবে কিন্তু বাটাম আর কাজ করলো না কিন্তু ইতির সেট করা গান ঠিকই বাজছে,এতে ইতি মহা খুশি হলো,আলবানের প্রচুর রাগ হলো এতে, চোখে মুখে উপছে পড়ছে সেই রাগ। কিন্তু এবার গানের লাইনে যেটা বললো,,,

.🎶🎶বোঝে না সে বোঝে না।
বোঝে না সে বোঝে না।
ব্যাস পিছনে বসে থাকা সবার মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো,বেশি প্রতিক্রিয়া দেখা গেল সুন্দরের মাঝে, সুন্দর বেশ হকচকিয়ে উঠলো তারপর ভাবনায় ডুবে গেলো চোখে ভেসে উঠলো বোঝেনা সে বোঝেনা ছবির শেষের দৃশ্য খানা, পরক্ষণে আবার সুন্দর ভাবলো “ওমা তারাও তো গাড়িতেই ছিল”। ব্যাস সুন্দর আতংকে ওঠে বলতে লাগলো,,,
__ ওরে কার মরার শখ হয়েছে রেয়য়য়?
মুহিন ও চিৎকার করে বলতে লাগলো,,,
__ ইতি আপু এই গান পাল্টা।
সুন্দর আরো হকচকিয়ে উঠে বলে,,,

__ মেয়েরা তোমরা তোমাদের ওড়না ভালো করে ধরে বসো,দেখো যেন উড়ে না যায়।
মানে এটা বোঝেনা সে বোঝেনা ছবির কাহিনী, ওড়ানার মাধ্যমেই তো সেই এক্সিডেন্ট হয়েছিল।
সুহানা বিরবির করে বলতে লাগলো,,
__লা হাউলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল ‘আলিয়্যিল ‘আযিম
সুহানার এমন দোয়া সুন্দরের কানে আসতেই, চোখে ভেসে উঠলো তাদের গাড়ি একটা বাসের সাথে এক্সিডেন্ট করেছে তারপর….আর কিছুই না ভেবে সুন্দর জোরে চিৎকার করে বলতে লাগলো,,,
__ ওরে তোরা গাড়িটারে থামা রে,আমি মরতে চাই না রে, আল্লাহ হহহহহহ
গাড়িতে থাকা প্রত্যেকই এমন চিৎকারে হকচকিয়ে উঠলো,আলবান গাড়ির ব্রেক জোরে কষলো। বিথী ইতির বাহু জোরে একটা থাপ্পড় দিয়ে বললো,,,

__ ওই বলদি এক কেমন মরাটুপানি গান দিছোস।
ইতি মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলে,,,
__ কিভাবে যে এই গান আসলো,বাটাম ও আর কাজ করছে না।
বিথী এবার সুন্দরের দিকে তাকিয়ে হেসে হেসে বলে,,,
__ সুন্দর ভাই মিউজিক ওন ওফ বাটামটাই ধ্বংস করেছে তারা,এখন আমাদের আল্লাহ ছাড়া রহমত করার কেউ নেই।
দির্শক ও হাসতে হাসতে বলে,,
__ রেডি হয়ে যাও সুন্দর। আলবান তুই গাড়ি স্টার্ট দে,।
নিঝুম মিটমিট করে হাসছে।
সুন্দর নিজের তিন বার বুকে থু থু দিয়ে আল্লাহ, আল্লাহ করতে লাগলো। ইতি ও এই গানের প্রভাবে থমথমে খেয়ে গেছে মনে অজানা ভয় সিটিয়ে আছে।ইতির এমন থমথমে চেহারা দেখে আলবান বেশ মজা পাচ্ছে। মিটমিট করে হাসছে আলবান তা দেখে ইতি গা জ্বলে পুড়ে সাই হচ্ছে।

গাড়িটি হঠাৎ থেমে দাঁড়ালো এক বিস্তীর্ণ নদীর তীরে। নদীর ধার বরাবর ছড়ানো সরু রাস্তা। পথের পাশে ছোট-বড় নানা দোকান সাজিয়ে রাখ । নদীর জলে এক বড় জাহাজ ধীরেধীরে ভেসে চলেছে, যেন নদীর গভীরতার ক্যানভাসে আঁকা এক চিত্র।
থমথমে মুখ নিয়েই গাড়ি থেকে নেমে সবাই একরাশ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দিল। নদীর প্রশান্ত বাতাস, দোকানপাটের হুল্লোড়, জাহাজের ঢেউ সব মিলিয়ে মুহূর্তটি জীবনের এক অনন্য প্রশান্তির ছবি আঁকলো।
সবাই এখন অপেক্ষা করছে আর্দ্র আর নিধির জন্য। তারা এখনও পৌঁছায়নি। আলবান বারবার আর্দ্রকে ফোন দিচ্ছে, কিন্তু কোনো সংযোগ নেই। বিথীও তখন নিধিকে ফোন করছে, কিন্তু নিধি ফোন ধরছে না।
বিথী, অস্বস্তি আর ক্ষোভে মুখ বাঁকিয়ে, বিরবির করে বললো,

__না জানি কোথায় প্রেমে মত্ত হচ্ছে এরা! উফফ বাবা! এদের বিয়ে দিয়ে দেওয়াটা জরুরি। না হলে দিনদিন এরা একের পর এক অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেবে আমাদের চারপাশের সিংগেল মানুষদের মধ্যে। আর আমার মতো নিঃসঙ্গ মানুষ তো শুধু আফসোসের মধ্যে দিন গুনে কাটাবেই!”
এইমাত্র উপস্থিত হলো আর্দ্র ও নিধি। ইতি দৌড় গিয়ে নিধিকে অন্য পাশে নিয়ে গিয়ে বলে,,,
__ কি রে এত লেট হলো কেন ?
নিধি লজ্জা মুখ ঢেকে দুলতে থাকে, বিথী বিরক্তির রেশ টেনে বলে,,,
__ ওই চেংরি কিস টিস করছিস নাকি, তাহলে যে ওড়না দিয়ে মুখ চেপে আছিস।
ইতি চোখ বড় বড় করে নিধি মুখ ওড়না সড়িয়ে,নিধি মুখ দেখে বলে,,,
__ জোরে কামড় টামড় ও দিছে নাকি।
নিধি লজ্জা লাল হয়ে যায়,,
__ ধ্যাত,কি যে বলিস।
এই বলে এক প্রকার দৌড়ে চলে যায় নদীর অপর প্রান্তে।ইতি, বিথী দুজনেই দুজনের দিকে অসহায় ভাবে তাকালো কিছুক্ষণ, তারপরও হাত ধরে তারাও অন্য প্রান্ত চলে যায়।

নিধির চোখ বাঁধা ছিল, আলবানের কথা মতো ইতি কালো কাপড় দিয়ে বেঁধেছে। নিধিকে দু’পাশ থেকে ধরে রেখেছিল ইতি ও বিথী। তারা নিধিকে নিয়ে যাচ্ছিল ছোট জাহাজের ছাদে। নিধি বারবার প্রশ্ন করছিল আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?কিন্তু চারপাশে নিঃশব্দ। কেউ কোনো উত্তর দিচ্ছিল না। তার হৃদয় টানটান উত্তেজনা আর অজানার আতঙ্কে ঢেকে গিয়েছিল।
জাহাজের ছাদে নিয়ে এলো নিধিকে। নিধিকে সেখানে রেখে ইতি, বিথী অসহায়ভাবে মুখ ভেংচালো, চুপচাপ চলে গেল। জাহাজের ছাদে তখন আর কেউ রইল না শুধু আর্দ্র আর নিধি ছাড়া। নিধি আঙুলের সঙ্গে আঙুল মিলিয়ে চারপাশে খুঁজতে লাগল ইতি ও বিথীকে। বিরক্তির সঙ্গে সে ফিসফিস করে বলল,

__ কই মরলি সব।
আর্দ্র নিধির কাছে এগিয়ে এলো। পিছন থেকে নিধির চোখে বাঁধা কাপড় আলগা করে খুলল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার নিজের দু’হাত নিধির চোখ ঢেকে দিল। নিধির হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তে স্থবির হয়ে গেল। হাতের স্পর্শে সে বুঝতে পারল এটা আর্দ্রের হাত। তবু সে পরিচয় চিহ্নিত করতে পেরেছিল, কিন্তু স্বভাবতই বিস্ময়ের ছোঁয়ায় চোখে ছাপা হাসি ফুটে উঠল। নিধি স্বগতভাবে হেসে বলল,
__ পাদরো ভাই।
__ উফফ নিধি,আজকে দিনটায় তো আমার ভালো নামটাই বলতে পারতে নাকি।
__ ওতো কঠিন নাম আমার মুখে আসে না।এখন ঝটপট বলুন তো আমার চোখ ঢেকে রেখেছেন কেন?
আর্দ্র কিছু না বলে নিধি কে নিয়ে সামনের দিকে এগোতে লাগলো। অধৈর্য নিধি ধৈর্য নেই বললেই চলে,নিধি আবার বলে,,,

__ কি হলো বলুন?
আর দু’পা এগোতেই আর্দ্র থেমে গেল এবং নিধির চোখ থেকে হাত সরাল। নিধি পিটপিট করে চোখ খুলল তাতক্ষণিকই তার সামনে চকচকে গোলাপের পাপড়ি দিয়ে তৈরি বিশাল একটি হার্টসিফ দেখা গেল। নিধির চোখ বড় বড় হয়ে গেল, মুখে উজ্জ্বল হাসি ফুটল। সবকিছু যেন অবিশ্বাস্য, স্বপ্নের মতো। সে আর্দ্রকে কিছু বলার চেষ্টা করল, কিন্তু তখনই তার নজর উপরের দিকে গেল চারপাশে ঘুরছে ড্রোন ক্যামেরা।যা এই মুহূর্তটাকে বন্দি করে রাখছে।
নিধিকে বরাবরই সব ধরনের জামাকাপড়ে বা সাজে ভালো লাগে আর্দ্রের, তবে আজ যেন তাকে আরও অনন্যভাবে সুন্দর লাগছে। লাল টকটকে গাউনটি তার উপর পরিধান, যা তাকে একেবারেই চমকপ্রদ করে তুলেছে, আর্দ্রের চোখ শীতল, কিছু টা না অনেক টা ভালোবাসা কথা ও গল্প বলা সেই চোখে বন্দি।
নিধি হার্ট সিফটারের দিকে তাকাতেই চোখে পড়লো তার সামনে আর্দ্র হাটু গেড়ে বসা এক মনুষ্য। হাতে হাতে একটি বড় গোলাপের তোড়া।নিশ্বাস আটকে গেল, চোখ বেয়ান করতে পারছে না মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না নিধির , অবাকের চরম পর্যায়ে। নিধি অবাক হয়ে, হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে, সেখানেই স্থির দাঁড়িয়ে রইল। মুহূর্তটি যেন সময়ের বাইরে। আর্দ্রের কাছে সব স্বপ্ন, সব আশা সবই একসাথে ভেসে এলো। আর্দ্র মুখে চওড়া হাসি, এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা নিয়ে, নরম গলায় বলল,,

__ এই যে ম্যাডাম ,আমি মানুষটাকে ভালোবাসো?ঘর-সংসার করবে এই আমিটার সাথে,রাজি তো আদ্রয়ান আর্দ্রের রাজ্যের একমাত্র মুশকিলের আসান হতে,সদ্য ফুটন্ত নিষ্পাপ ফুল হতে,কসম কোনদিন ও কষ্ট পেতে দিবো না।
আর্দ্র মুচকি হেসে আবার বলে,,,
__ হবে তো আমার বউ?আমার মা বাবার পুএবধু? করবে এই নির্বোধের সংসার?
__ পূনতা কি দেবে ১০ ভালোবাসা কে?
“দশ বছরের ভালোবাসা…” কথাটি কানে যেতেই নিধির বুকের ভেতর যেন বজ্রপাত হলো। টনক নড়ে উঠল তার, সারা শরীর কেঁপে উঠল এক অদ্ভুত আবেগে। হৃদয়টা ছলছল করছে, মনে হচ্ছে চিৎকার করে বলে ওঠে,
“হ্যাঁ! করবো আপনার সংসার, ভালোবাসি আপনাকে! হবো আপনার বউ, হবো আপনার মা–বাবার পুত্রবধূ!”
কিন্তু কণ্ঠ যেন হারিয়ে গেছে কোথায়। নিধির চোখ ভরে উঠেছে আনন্দাশ্রুতে, ঠোঁট কাঁপছে, বুক ধকধক করছে। কাঁপা কাঁপা হাতে কোনোভাবে সে আর্দ্রের বাড়িয়ে ধরা গোলাপের তোড়াটা নিল।
আর্দ্র তখনও হাঁটু গেড়ে বসে আছে সময়ের মতো স্থির, চোখে শুধু নিধির প্রতিচ্ছবি। আর নিধি দাঁড়িয়ে আছে, যেন পৃথিবীর সব ভালোবাসা এক মুহূর্তে তার সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে,,

__ কী ম্যাডাম, এভাবে বসে রাখবেন নাকি, উঠার অনুমতি দিবেন না,আমি তো এখন আপনার কৃতদাস।
নিধির চোখ দিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গড়িয়ে পড়ছে জলবিন্দু, যেন আনন্দ আর অশ্রুর সীমানা মুছে গেছে একে অপরের মাঝে। সে কাঁদছে, আবার হাসছেও একই সঙ্গে দু’টি অনুভূতি মিশে গেছে তার মুখে।
আর্দ্র হঠাৎ থমকে গেল, হকচকিয়ে উঠল নিধির চোখের সেই অঝোর ধারায়। পরম কোমলতায় সে এগিয়ে এলো, নিধির সামনে ঝুঁকে দাঁড়াল। দু’হাত বাড়িয়ে আলতো করে মুছে দিল নিধির গাল বেয়ে পড়া অশ্রুবিন্দু। তারপর নরম কণ্ঠে বলল,,

__ আমার পাগলিটা কাঁদে কেন?সে কি জানে না সে কাঁদলে অন্য একজনের বুকে প্রচুর ব্যথা হয়।
নিধি অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে “জানি” বলে আর্দ্রের বুকের ঝাঁপিয়ে পড়লো। কান্নার তোড় আরো বেড়ে গেল নিধির, আর্দ্র মোলায়েম ভাবে নিধির পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে পরম আবেশে।নিধি খুশির কান্না করতে করতেই বললো,,
__ আমিই কিন্তু আগে বলেছি আপনাকে বিয়ে করবো?
আর্দ্র ফিচেল হেসে বলে,,
__ তুমি আগে বলেই তো আমার প্লানে পানি ঢেলে দিলে।
__ এসব আগে থেকে প্ল্যান ছিল?
__ সিনেমায় একদিন এমন প্রোপজাল দেখেছিলাম সেই থেকেই প্রতি রাতে ঘুমোনের আগে প্লান করে ঘুমাই।আজ তা বাস্তবে রুপ দিলাম।
নিধি আর্দ্রের বক্ষ থেকে মুখ তুলে তার চোখ পানে তাকালো,,
__ আপনি আমাকে কবে থেকে ভালোবাসেন?
__ ওসব না হয় নিকা করার পর বলি??
নিধি আর কিছু বললো না,আবারো আর্দ্রের বুকে সিটিয়ে নিলো নিজেকে। আর্দ্র নিধিকে নিজের বক্ষ থেকে তোলার প্রচেষ্টায় বলে,,

__ আরো কিছু দেখা বাকি আছে, মাথা তুলো।
নিধি আর্দ্রের বক্ষ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আর্দ্রে হাত ধরে হাটলো জাহাজের ছাদের কোনে।
সেখানে দাঁড়িয়ে দুহাত নিয়ে নিধি মুখখানা আজলে নিলো আর্দ্র, হাতের এক আঙ্গুল বাড়িয়ে আকাশ পানে তাকাতে আহ্বান জানায় নিধিকে।নিধি ও খুশি মনে আকাশ পানে তাকায়,আকাশ পানে তাকতেই চোখ বড় বড় হয়ে যায় নিধি, অবিশ্বাস্য মনে হলো সব।বিশেষ স্কাইরাইটিং এয়ারপ্লেন (ছোট প্লেন) আকাশে উড়ে যায়।প্লেনের এক্সহস্ট দিয়ে সাদা ধোঁয়া ছাড়ায় তার পাশে বড় বড় অক্ষরে লেখা উঠলো।
__”আমি তোমাকে ভালোবাসি নিধি I ❤️ U নিধি পাগলি।
Will You Marry Me ♥️
(আর্দ্র💘নিধি)

সচ্ছ নীল আকাশে সেই দৃশ্যটি এক অপার্থিব সৌন্দর্যের আবেশ ছড়িয়ে দিয়েছিল। নিধির চোখে স্বপ্নের আলো ঝলমল করছে মন ভরে উঠছে আনন্দে, হৃদয় ভেসে যাচ্ছে এক অনির্বচনীয় খুশিতে। এমন এক দিন যে এভাবে এসে নিধির জীবনকে রঙে ভরিয়ে দেবে, সে নিজেও তা কল্পনা করতে পারেনি।
আকাশের বুকে ভেসে থাকা সেই লেখা পাঁচ মিনিটের মতো স্থির হয়ে রইল। মাঝেমাঝে কয়েকটি রঙিন আতশবাজি আকাশ জুড়ে ফেটে উঠল ঝলসে উঠল আলোর মায়াবী রঙে। নিধি বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই মনোহর দৃশ্যের দিকে, যেন সময় থমকে গেছে। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল আকাশের সেই লেখাখানা, নিধির চোখে তখনও তার রেশ লেগে আছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে নিধি ঘুরে তাকালো আর্দ্রের দিকে। দেখল, আর্দ্র কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে, দু’হাত প্রসারিত করে যেন তার বুকে নিধিকে আহ্বান জানাচ্ছে পরম মমতায়, নিঃশব্দ প্রেমের ভাষায়।
নিধি আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। হৃদয়ের সমস্ত টান তাকে টেনে নিয়ে গেল আর্দ্রের বুকে। ছুটে গিয়ে সে মাথা রাখল সেই উষ্ণ বক্ষে যেখানে লুকিয়ে আছে নিরাপত্তা, ভালোবাসা আর এক অবর্ণনীয় প্রশান্তি।

আলবান ও দির্শক সবাইকে নিয়ে ফুচকার দোকানে এসেছে, টেবিলে গোল হয়ে সবাই বসে আছে,ইতি, বিথীর মুখ খ না গোমড়া হয়ে আছে,কেন গোমড়া হয়ে আছে তা তাদের কাছে ও অজানা।দির্শক ফুচকা ওডার দিলো।
সবাই এখন ফুচকা খেতে ব্যাস্ত শুধু,আলবান,দির্শক, সুন্দর ছাড়া।পিকি তো ফুচকায় মধু পেয়েছে মধু,তিন দুই প্লেট শেষ করলো। আলবান,দির্শক তাদের মতো ফোন ঘাটছে,আর সুন্দর নিঝুম কে দেখছে,এতে নিঝুমের খুবই অস্বস্তি লাগছে, মাঝে মাঝে কটমট চোখ করে সুন্দরের পানে তাকাচ্ছে কিন্তু এতে সুন্দরের কোন ভু-ক্ষেপ দেখা গেল না।
এদিকে পিকি যেন ফুচকার মধু পেয়েছে। একের পর এক, দুই তিন প্লেট শেষ করে ফেলেছে সে। মুহিন মুখ কুঁচকে বসে আছে, ঝালের তাড়ায় চোখ নাক লাল হয়ে গেছে, তবু পিকির সেই নির্ভীক খাওয়া দেখে নিজের অজান্তেই তাকিয়ে আছে তার দিকে। পিকির এক চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে ঝালের কারণে, তবু সে থামছে না একের পর এক ফুচকা খেয়েই যাচ্ছে, যাচ্ছে,থামার কোন হেলদোলই নেই।
ইতি, ফুচকা খাওয়া আড়চোখে আলবান তা দেখছে,ঝালে নাক ঠোট মাএাতিক্ত ভাবে লাল হয়ে আছে মেয়েটার, দেখতে সুন্দর লাগছে,ঝালের তোড়ে চোখ দিয়ে পানি পড়ে পড়ে অবস্থা,আলবান কিছুই একটা ভেবে ইতির ফুচকার প্লেট টা টান মেরে নিজের দিকে এনে বলল,,,

__ আগে কান্না কর তারপর খা?
ঝালের কারণে ইতি কথা বলার জো নেই,তাও সোশানি নিয়েই বলল,,,
__ আমি কান্না করব নাকি খাবো সেটা আমার ব্যাপার,দিন আমার ফুচকার প্লেট?
__ তা কান্না করবি না।
__ আরে বাবা কান্না করছি কই,ঝাল লাগছে তাই চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।
__ এতে বিশ্রী লাগে তোকে?
__ একদিন কলেজে ফুচকা খাওয়ার সময় একটা ছেলে এসে প্রোপোচ করেছিল আর বলেছিল আমাকে নাকি ফুচকা খাওয়া সময় লাল টমেটোর মতো সুন্দর লাগে।
ব্যাস আলবানের মাথা গরম হয়ে গেল, ফুচকা প্লেট টা দিলো বালুতে ফেলে,তারপর ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলল,,,
__ যদি ফুচকা খাওয়ার ফলে টমেটো মতো লাল মুখ ছেলেদের চোখে পড়ে তাহলে এই ফুচকা খাওয়া আজ থেকে বন্ধ তোর জন্য।
ইতি মেজাজ টাও চরম তুঙ্গে উঠলো,চোখ বড় বড় করে তাকলো আলবানের দিকে,তা দেখে আলবান বলে,,,

__ আমি জানি তুই নাগিন,রুপ ধারণ করার দরকার নেই।কালনাগিনী।
বিথী একবার ইতি ও আলবানের দিকে তাকিয়ে বলে,,,
__ দাবালন ভাই কেন এমন করছেন,ফুচকা আমাদের ইমোশন?
আলবানের নিরেট জবাব,,,
__ তা দে তোর টাও ফেলে দেই?
বিথী প্লেটে একটা ফুচকাই অবশিষ্ট ছিলো সেটাকে নিজেকে আগলে আড়াল করে বলে,,,
__ না থাক?
দির্শক বিথী দিকে আর এক প্লেট ফুচকা দিয়ে বলে,,,
__ খাও,দেখতে ভালো লাগছে।
বিথী একটা চোখ উপরে তুলে দির্শকের পানে তাকিয়ে বলে,,,
__ দেখতে ভালো লাগছে মানে?
__ হুম,খাও।
__ ওই যে ইতি রে দেখেন, ফুচকা খাইতে না পেরে এই কান্না করে বোধহয়।আর আপনি আমায় আরো খেতে বলছেন।
দির্শক আরো কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনি বিথী একটা ফুচকা দির্শকের মুখে টুসে দিলো,দির্শক চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে নিল।মুখ থেকে ফুচকাটা বের করার জন্য উদ্বেগ হলে বিথী বলে,,,

__ একদম ফেলবেন না বলে দিলাম।
দির্শক ফেলে না ,চোখ মুখ বন্ধ রেখেই খেতে লাগলো। হঠাৎ আলবান বিথী কে রাগি কন্ঠে ঝাড়ি মেরে বলে,,,,
__ ইডিয়ট, দির্শকের ঝালে এলার্জি আছে।সবসময় বাড়াবাড়ি করাটা কি খুব জরুরী।
বিথী হকচকিয়ে বলে,,,
__ কিইইই।
তড়িৎ বেগে চেয়ার থেকে উঠে দির্শকে পাশে এসে পানি দিয়ে বলে,,
__ মুখ থেকে ফেলুন তাড়াতাড়ি,ফেলে পানি খেয়ে নিন।
মুহূর্তেই দির্শকের চোখ লাল হয়ে গেছে, শরীর টা কেমন দুর্বল লাগছে,তাও মুখে হাসির রেখা টেনে বলল,,
__ আম ওকে বিথী,এটা সিরিয়াস কিছু না।
বিথী বলে,,,
__ আমি সরি,আসলে বুঝতে পারি নাই।
__ ইটস ওকে
দির্শক শার্টের পকেট থেকে একটি ওষুধ বের করে খেয়ে নিল। বিথী সুক্ষ্ম চোখে তা পরখ করলো। মুহূর্তেই দির্শকের শরীরে এক প্রকার গোল লালচে দাগ উঠতে শুরু করলো, বিথী নজর গেল গলায় আ্যপেল এন্ডালস এ থাকা লালচে দাগ গুলো ছড়িয়ে পড়ছে। বিথী আতংকে উঠলো মুখ অসহায় করে বলল,,

__ লালচে দাগ হচ্ছে কেন?
দির্শক নির্বিকার ভঙ্গিতে উওর দেয়,,
__ এটা একধরনের এলার্জি, ডোন্ট প্যানিক,পিল খেয়ে নিয়েছি, কিছু হবে না।
বিথীর মধ্য এক ধরনের অপরাধ বোধ কাজ করতে লাগলো।আর দির্শক…? সে নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে বিথীর চোখে, ঠোঁটে হালকা এক অনির্বচনীয় হাসি, যা ভয়ের চেয়েও বেশি অস্বস্তিকর।যা দির্শকে ভিতরে এক অন্যরকম প্রশান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে।
ইতির রাগের মাএা প্রচুর বেড়ে গেল, তড়িৎ বেগে চেয়ার থেকে উঠে চেয়ারটাকে ফেলায় দিয়ে সোজা পথে চলে যেতে লাগলো,আলবান তা দেখেও দেখলো না,ফোন ঘাটতে ব্যাস্ত সে। বিথী ও ইতির পিছনে পিছনে যেতে লাগলো। হনহনিয়ে হাঁটছে ইতি,তার সাথে বিথী হাটতে হিমশিম খাচ্ছে।
ইতি উপস্থিত হলো এক কাশ ফুল ভরা স্থানে,বেশ লোকজনকেও সেখানে দেখা গেল।ইতি নদীর দিকে মুখ করে বুকে হাত গুজে নিল। বিথী ও আসলো না ইতির কাছে। বাতাস এসে দুজনেরই জামা,ওড়না ওড়াওড়ি করছে, বিথী ইতির কাঁধে হাত রেখে বলে,,

__ সামান্য ব্যাপারে রাগ করে এলি যে?
__ ওটার জন্য রাগ করিনি?
__ তাহলে কেন?
__ আমার অবাধ্য মনটার সাথে প্রচুর রাগ হয়েছি?
বিথী মুচকি হেসে বলে,,,
__ অবাধ্য মন কি দাবানল ভাই ভাই করে?
__ অতিরিক্ত,এটা আমার ভালো লাগে না।
__ ভালোবাসিস সেটা স্বীকার কর?
__ বালের ভালোবাসা,ওনাকে আমার সহ্যই হয় না।
বিথী আরো কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনি, পুরুষালী কন্ঠস্বর ভেসে এলো,,
__ মাননিরা একটু শুনবেন?
ইতি, বিথী দুজনেই ঘুরে তাকলো সেই কন্ঠস্বরের মানুষটার পানে, বিথী ঝালের তোড়ে এখনো সমানে নাক টেনেই যাচ্ছে। বিথী বলে,,,

__ হ্যাঁ বলুন?
__ তোমাদের বয়স কত মামনি?
__ ১৮ প্লাস হয়েছে।কেন?
__ বিয়ের বয়স হয়েছে তবে?
ইতি বলে,,,
__ হ্যাঁ।আপনি কি কোন ঘটক?
লোকটা হাঁসি দিয়ে বলে,,,
__ আমাকে দেখে কি তা মনে হচ্ছে?
বিথী বলে,,
__ না ,তবে আপনাকে দেখে বুড়া ও মনে হচ্ছে না আবার চেংড়া ও মনে হচ্ছে না।
__ আমি ইয়াং পুরুষ।ছোট খাটো একজন ঘটক ও বলা চলে।
ইতি বলে,,
__ ও।
ইতি,বিথীর লোকটাকে বেশ ভালো লেগেছে,বেশি বয়স হলে হবে কি দেখতে পুরাই আগুন ঝাক্কাস যাকে বলে।কোর্ট প্যান্ট পড়েছে বেশ বড়লোক ও মনে হলো। লোকটা আবার বলে,,,
__ তোমাদের কেমন ছেলে পছন্দ মামনি রা।
ইতি হুট করেই বলে বসে,,,

__আপনাকেই পছন্দ হয়েছে ঘটক মশাই আপনি কি হবেন আমাদের নাকের সর্দি পরিষ্কার করে দেওয়া কেয়ারিং মানুষটা।
ইতির এ কথা শুনে বিথী চোখ বড়বড় করে তার দিকে তাকায়,ইতির এ কথা বলার কারণটা হলো আলবান,ইতি বিথীর একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছে আলবান ও দির্শক।
এদিকে ভদ্রলোকটা এমন কথা শুনে তাজ্জব বনে চলে গেছে।আলবান রাগ হয়ে হনহনিয়ে ইতির দিকে আসতে থাকে।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকটা ছুড়ি বের ইতির পেটে আঘাত করতে যাবে,তখনি তা নজরে পড়ে বিথীর । বিথী হকচকিয়ে উঠে লোকটার হাত ধরে টানাটানি করতে লাগে, এমন পরিস্থিতিতে ইতি ও আতংকে উঠলো,সে ও লোকটার হাত ধরতে লাগলো, বিথী বেশ রাগ হয়ে বলতে লাগলো,,,

__ মাদার** কে বে তুই,এত বড় সাহস তোর,বালকামা জায়গা বরাবর দেই একটা বসিয়ে।কে তুই বল?
লোকটা মুহূর্তেই আতংকে উঠলো, একটু সামনে তাকিয়ে দেখলো আলবান দির্শক তেড়ে দৌড়ে আসছে, নিজেকে বাঁচানোর দায়ে বিথীর হাতের কব্জি বরাবর আঘাত হানে লোকটা, বিথী চিৎকার করে ওঠে,ইতি ও চিৎকার করে লোকটার সাথে আর ধস্তাধস্তি না করে বিথী হাত ধরে,এই সুযোগে লোকটা পালিয়ে যায়।আলবান দির্শক লোকটাকে ধরার জন্য দৌড়াতে লাগলো কিন্তু হঠাৎ লোকটার সামনে এক মাইক্রো গাড়ি এসে থামলো এবং লোকটাকে নিয়ে চলে গেল।দির্শক মাথা ঝাঁকিয়ে বলে,,,

__ ড্যাম ইট?
লোকটা গাড়িতে উঠিই ফোনে বলে,,,
__ স্যার কাজ হয়নি।
ফোনের ওপর পাশ থেকে রাগি ঝাঁঝালো কন্ঠ শোনা গেল।
আলবান ভালো ভাবেই গাড়ির নাম্বারটা নোট করে নিল মস্তিষ্কে। আলবান দির্শক আবার ইতি, বিথীর দিকে এগিয়ে এলো।দির্শক বিথীর হাত ধরলো, অনর্গল রক্ত পড়ছে সেই হাত দিয়ে । এদিকে ইতি রক্ত দেখে সমানে মাথা ঘুরছে আর বলছে,,,
__ রক্ত,, রক্ত বিথী…
এই বলেই আলবানের গায়ে টলে পড়লো ইতি,ইতির রক্ত দেখলেই অজ্ঞান হয়ে যায়,আজ ও সেটাই হলো,আলবান হকচকিয়ে ইতিকে ডাকতে লাগলো,,,
__ ইতি,এই ইতি,ওঠঠ।
অন্য হাত দিয়ে বিথী নিজের মাথায় থাপ্পড় মেরে বললো,,,
__ হায় আল্লাহ কার অজ্ঞান হওয়া কথা আর কে হলো অজ্ঞান?ভাবা যায়?

নিকটস্থ ছোট চিকিৎসালয় নিয়ে আসা হয়েছে বিথী ও ইতি কে। আলবান ইতিকে কোলে করেই নিয়ে এলো ডাক্তারের কাছে। বিথী হাত ব্যান্ডেজ করার জন্য ডাক্তার আসলো, বিথীর হাত ধরতে যাবে ঠিক তখনি দির্শক ডাক্তারের হাত বলে মুচকি হেসে বললো,,,
__ ফাস্ট এইড বক্সটা আমায় দিন,আমি প্রাথমিক চিকিৎসা পারি, ডোন্ট ওয়ারি।
ডাক্তার কোন কথা না বলে, দিয়ে দিলো,ইতিকে সোয়ানো হয়েছে বেডে। চোখে মুখে পানি দিয়ে জ্ঞান ফিরালো আলবান, পিটপিট করে চোখ খুলেই দেখলো তার দিকে ইনজেকশনের সুচ এগিয়ে আসছে, ব্যাস ইতি ভয়ে আঁতকে উঠে বসলো, জোরে জোরে ডাক্তারকে বলতে লাগলো,,,
__ এটাকে নিয়ে সামনে থেকে ছারুন, ছারুন বলছি?
ডাক্তার বাচ্চাদের মতো করে বুঝিয়ে ইতিকে বলে,,
__ ওমন করে না,এটা দিতে হবে তোমাকে,ভয়ে কিছুই নেই?
__ এই মিয়া আপনার ইচ্ছা হলে আপনি দেন,আমি দিতাম না,দাবালন ভাই কিছু বলেন না কেন,আমি ইনজেকশকে ভয় পাই, প্লিজ বাঁচান?
আলবান গম্ভীর কন্ঠে বলে,,

__ উফফ ইতি,এতে ভয় পাওয়ার কি আছে?
ডাক্তার এবার তাদের নার্সদের বলে,,,
__ নার্স আসুন,এনার হাত পা ধরুন।
ইতি এবার রাগে গর্জে বলে,,,
__ এ ডাক্তার এ ভালো হচ্ছে না কিন্তু, বিথী রে কই তুই?
আলবান ইতির পাশে এসে আবার বলে,,
__ এই যে আমার হাত ধর, বিশ্বাস কর কিছু হবে না শুধু একটু লাগবে আর কিছু ই না।
ইতি এবার কাঁদতে কাঁদতেই আলবানকে বলে,,

__ আমার খুব ভয় করে দাবানল ভাই,আমি এসব দিবো না,এই দেখেন আমি একদম চাঙ্গা সুস্থ সবল আছি।
__ ইতি ইনজেকশটা দেওয়া খুব জরুরী? তুই ছোট নেই ইতি যথেষ্ট বুঝিস।
একজন নার্স এসে ইতির হাত ও অন্য জন এসে ইতির পা দুটো ধরলো।ইতি তো ছটফট করতেই লাগলো।আলবান ইতির জামার হাতা গুটিয়ে যেখানে ইনজেকশন পুশ করা হবে সেই বাহু বের করে শক্ত করে ধরলো। ডাক্তার ইনজেকশন পুশ করতে আসতে লাগলো ইতি “না না না” বলে সমানে চিৎকার করতে লাগলো।
ডাক্তার ইনজেকশন কিছুতে দিতে পারছে না,ইতি এতো কান্নাকাটি আর চিৎকার করছে যে ডাক্তার ও আলবানের মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে।আলবান তো ইতিকে বারবার রাগ দেখাচ্ছে আর ঝাড়ি মারছে। কিন্তু ইতি আগের ন্যায় চিৎকার ছটফট করেই যাচ্ছে।

অবশেষে ডাক্তার ইতি বাহুতে ইনজেকশন দিলো, কিন্তু ইতি এবার ডাক্তার হাতে এত জোড়ে কামড়ে ধরছে যে ডাক্তার বোম ব্লাস্টার মতো করে চিৎকার করতে লাগলো, এদিকে ইতি তো প্রথম থেকেই চিৎকার করছে এখন ইনজেকশন দেওয়ার ফলে সেই চিৎকার বিকট আকারে রুপ নিলো। ডাক্তার ও পেশেন্টের চিৎকারে চিকিৎসালয় খানা কেঁপে উঠলো দুই নার্স ,আলবান,দির্শক বিথী কান চেপে ধরে রইল।কারো চিৎকারই থামার নাম নিচ্ছে না।
ডাক্তার এক প্রকার লাফালাফি শুরু করে দিলো,ইতি ডাক্তারের হাতে কাপড় দিয়ে ৩২ টা দাঁতই বসে দিয়েছে। বেচারা তা দেখেই আরো বেশি লাফালাফি করছে,আর সমানে বলছে,,

__ এ কোন সাধারণ কামড় নয় লা,এ হলো সাংঘাতিক রাক্ষুসীর কামড়, সুন্দরী বলে কিছু বললাম না,ওমা গেল গোওওওওওও
_,আমার ও ইনজেকশন দেওয়া জরুরি।নার্স ইনজেকশন রেডি করো।
আলবানে প্রচুর রাগ হলো তাই সে ও জোরে একটা ঝাড়ি মারলো,তাতে ইতি ও ডাক্তার দুজনেই একদম চুপ হয়ে গেল।
__ কি মারাত্মক অবস্থা ,মাথা আমার ঘুরছে,কানটায় সমানে রিংং শব্দ হচ্ছে,এত জোরে চিৎকার করে কেউ ইডিয়টের দল।
ডাক্তার কাঁদো কাঁদো অসহায় স্বরে মনে মনে বলে,,,
__ ভাগ্যিস মেয়েটাকে মনে লেগেছে,না হলে আমাকে কামড় দেওয়ার ফলে আরো একটা ইনফ্লুয়েন্স ইনজেকশন পুশ করে দিতাম হু।
দির্শক, বিথী দুজনেই মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে,এমন চিৎকারে তাদের মাথা ও টকটক করছে, বিথীর হাত দির্শক ড্যাসিং করে দিছে।দির্শক জোরে একবার নিঃশ্বাস নিয়ে বলে,,,

__ একটা ইনজেকশন কে ইতি এতো ভয় পায়।
__ আপনি তো শুধু এতটুকুই দেখলেন,আর আমরা এমন চিৎকার কতো সহ্য করেছি। কিন্তু ওসব তো ওই বলদি মানে না,ওকে যদি এসব আমি বলতে যাই তো উল্টো আমাকে মিথ্যাবাদী বানিয়ে দেয়।
__ উফফ কি মারাত্মক ডাক্তারের হাতে কামড় দিয়ে লাল দাগ বসায় দিলো।
বিথী এবার শব্দ করেই জোরে হাসতে লাগলো,এতে বিথী হাতে একটু ব্যাথা পেয়েই কঁকিয়ে উঠলো,দির্শক হকচকিয়ে বিথী হাত ধরে বলল,,,
__ আর ইউ ওকে বিথী।
__ হুম।
কিছুক্ষণ নিরব থেকে আবার বিথী বলে,,,

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২১

__ আপনি কি কোন ভাবে জেলাস আমাকে নিয়ে।
দির্শক বিথীর কথার উওর না দিয়ে মুচকি হেসে বলল,,
__ ইতি তোমাকে ডাকছে যাও,ওই প্রশ্ন খানা তোলা রইল।
বিথী ও আর কথা না বাড়িয়ে ইতির কাছে চলে গেল।
এদিকে ডাক্তারের ইতিকে চরম ভাবে পছন্দ হয়েছে।আলবান তা বুঝতে পেরে সেখানকার সব কাজ শেষ করে চলে যায় সেখান থেকে।

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২৩