প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১৭
ইনান হাওলাদার
সকাল সকাল বাড়ির গিন্নিরা রান্নার কাজে লেগে পড়েছেন। একজন কাটাকাটি করছেন তো আরেকজন সেটাকে ধুইয়ে এক পাত্র হতে আরেক পাত্রে রাখছেন।আর বাড়ির বড় গিন্নি রান্না করছেন।চৌধুরী বাড়ি এসেছেন ধরেই রান্নার কাজ পারভিন বেগমের কাঁধে। বাকিরাও খুব ভালো রান্না করেন ।কিন্তু বাড়ির প্রতিটা সদস্য তার রান্না পছন্দ করে।তাই শত শরীর খারাপ থাকলেও রান্না মাপ নেয় তার।সবাই কম – বেশি খেলেও আহি যদি শোনে আজ রান্না বড় মা করেননি।তাহলে সে খাবারের পাশ ঘেঁষতেও আসে না।
শান্ত – প্রান্ত কোচিংয়ে।এবারের এইচ এস সি ব্যাচ শান্ত। তাই পড়ার চাপটা একটি বেশিই তার।আর তার পরের বছর প্রান্তের এইচ এস সি।
আহি আর তাহি দুই বোন বসে দু’ষ্টুমি করছে।একটু আগেই তাহি বড় একটা পান্ডা কোলে নিয়ে আহির কাছে এসেছে।এটা নাকি কাল তূর্য কিনে দিয়েছে।আহি সেটা শুনে হাসতে হাসতে বলেছে,
” তূর্য ভাই একটা পান্ডা।আর তোকে কিনে দিয়েছেনও একটা পান্ডা ”
এই কথা শুনে তাহির কপট রাগ দেখিয়ে বলল ” ভাইয়া পান্ডা বলবে না আপু।আমার ভাইয়া ……” আর কথা শেষ করতে পারল না সে।তূর্যকে করিডর পেরিয়ে যেতে দেখেই আহি গলা উঁচু করে বলল,
” আমি কিছু জানি, কলা গাছের পানি। কচু গাছের ফুল ,কবুল,কবুল !”
” কবুল,কবুল “এর আগেও কয়েকবার তূর্যকে দেখেই একথা বলেছে সে।কিন্তু তূর্য কোনো প্রতিত্তর করেনি।কিন্তু এবার হুট করেই যে তূর্য পা থামিয়ে উত্তর দিবে বুঝেনি সে।
” ক…বুল “থতমত করতে করতে বলল আহি।
” হুমম,কবুল ”
” তূর্য ভা…ই ,আ..সলে…”
” তাহি বাইরে যা তো ভাইয়া ” কথাটা বলতে বলতে রুমে প্রবেশ করলো তূর্য।তার কথা মতো তাহিও দৌঁড়ে রুমের বাইরে চলে গেল।তূর্য প্রথম থেকেই বুঝেছে আহি কথা গুলো তাকে বলছে।কিন্তু কেনো বলছে জানে না সে।তবে একে একটু শায়েস্তা না করলে দমন হবে না জানে সে।
” তাহি? যাস না বইন।মে’রে ফেলবে…”
তাহি বাইরে যেতেই তূর্য রুমের দরজা লাগিয়ে দিয়ে আহির দিকে এগোলে।ভ’য়ে আহি কথা থামিয়ে দিয়েছিল।দরজা লাগাতে দেখে সে কিছু বলার জন্য হা করছিল তবে সে কিছু বলার আগেই তূর্য ভারী কন্ঠে বলল,
” বল !কি জানিস তুই?”
” কিচ্ছু জা..নি না । ” বলে আহি দরজার দিকে এগোতেই তূর্য ওর হাত ধরে পিছন দিয়ে আড়াআড়ি ভাবে পিঠের সাথে চেপে ধরে বলল,
” বল, কী জানিস !”
আহি নাকে কান্না করতে করতে বলল,
” ব্য’থা লাগছে।ছাড়ুন না !”
তূর্য হাতের উপর আরও জোরে প্রেসার দিতেই আহি কান্না করতে করতে বলল,
” আ…পনি নে..শা করেন সেটা জা..নি। এ..বার ছাড়ুন তূর্য ভাই ”
এহেন কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়ল তূর্য।না চাইতেও হাত ছেড়ে দিয়ে নিজের দিকে ফেরালো আহিকে।কিছুক্ষণ শক্ত দৃষ্টিমেলে তাঁকিয়ে থেকে বলল,
” সোর্চ কী? ”
” তাসিন ভাইয়া বলেছেন! ”
” হোয়াট ? তাসিন তোকে এই কথা বলেছে ? ” চোখ – মুখ কুঁচকে বলল তূর্য। আহির দুই গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে ।সে চোখের পানি মুছতে মুছতে উপর নিচ মাথা নাড়ল।
” ওয়েট ” কথাটা বলেই তাসিনকে কল করলো সে।সেদিন রাতের সকল কাহিনী শুনে সে একটা ভারী নিশ্বাস ছেড়ে বলল,
” এত বড় ই’ডিয়েট কেনো তুই? আমরা ট্রুথ ওর ডেয়ার খেলছিলাম।ওরা আমাকে একটা ডেয়ার দেয় বাট সেটা করা আমার পক্ষে পসিবল ছিল না ।ইভেন,এখনো পসিবল নয়।তাই ওরা আমাকে সেকেন্ড ডেয়ার দেয় যে, মার্কেটে যত প্রকার কোল্ড ড্রিংকস আছে সব কিনে আনতে হবে।আর সেটাকে তুই লাল পানি বানিয়েছিস ?
বাই দ্যা ওয়ে,আমি কেনো তোকে কৈ’ফিয়ত দিচ্ছি ?তুই যা ভাবার ভেবে নে। আই ডোন্ট কেয়ার!”
” আপনি তো সিগারেট খান । আমি একদিন দেখেছি ” নাক টানতে টানতে বলল আহি ।
” এক্ষুনি কান্না থামবি।এক্ষুনি মানে এক্ষুনি ! নাহলে তোকেই খেয়ে ফেলব ”
” জানি তো ! আপনি তো খেতেই চান আমাকে । ”
” ইয়াহ, আই রিয়েলি ওয়ান্ট টু ইট ইউ। নাউ হ্যাপি ?”
আহি এখনো ফুঁফিয়ে কান্না করে যাচ্ছে দেখে তূর্য হালকা ধমকের সুরে ফের বলল,
” কী হলো? কথা কানে যাচ্ছে না তোর? ন্যা’কামি বন্ধ করে রেডি হয়ে নিচে আয় ”
” কে..নো ? কো..থায় যাব ?”
” জা’হান্নামের চৌরাস্তায় ! দুই মিনিটে নিচে নামবি ” বলেই যেভাবে হুট করে রুমে ঢুকেছিল সেভাবেই হুট করে বাইরে চলে গেলো তূর্য।
শরীরটা তেমন ভালো না লাগায় বেলা ১২ টা নাগাদ বাড়ি ফিরেছে আকবর চৌধুরী।এসেই পারভিন বেগমকে কড়া করে এক কাপ চা দিতে বলেছেন।যেখান থেকেই আসুন না কেনো বাড়ি ফিরে এক কাপ চা তার লাগবে।একপ্রকার অভ্যাস বলা যায়।প্রায় মিনিট দশেক পর পারভিন বেগম চা হাতে রুমে প্রবেশ করলেন।আকবর চৌধুরী প্রায়ই এভাবে অফিস থেকে ফিরে আসেন।এরকম নতুন নয়।তাই পারভিন বেগম চায়ের কাপটা রেখেই চলে যাচ্ছিলেন।কিন্তু পিছু ডাকলেন আকবর চৌধুরী,বললেন,
” তূর্যের মা,একটু সময় হবে ?”
” এভাবে কেনো বলছ?” অ’ভিমানী কন্ঠে বললেন পারভিন বেগম।সেটা দেখে মুচকি হাসলেন আকবর চৌধুরী।নিজের পাশে বসতে ইশারা করলেন। স্বামীর ইচ্ছা অনুযায়ী তার পাশে গিয়ে বসলেন পারভিন বেগম।এবং থ’মথমে কন্ঠে বললেন,
” বলো ”
” আরে বাবা,অ’ভিমান করছো? এখন এসব মানায় না আমাদের।তুমি ব্যস্ত লোক তাই কথাটা বললাম । শোনো,কাজের কথা শোনো !”
” হ্যাঁ,বলো ”
” তোমার ভাই আবার কল করেছিল।সে তো কাল যেতে বলছে।এখন কী করবে?এক কাজ করো,তোমরা কাল চলে যাও । আমি আর আসিফ বিয়ের দিন সকাল সকাল পৌঁছে যাব। আসিফের নাকি কাল একটা মিটিং আছে”
” আমাদের উচিত ছিল তো আজই যাওয়া।ছেলের ফুপি আমি। অথচ…”
” তাহলে আগে বলোনি কেনো? আমি আটকাতাম তোমাকে? তোমার ছেলে কাল যেতে রাজি হয় কিনা তাই দেখ।আর তুমি আজ যেতে চাইছ ”
” সে ছেলের বিষয়টা আমি দেখে নিচ্ছি । এখন যাচ্ছি,রান্না – বান্না কত দূর দেখি ”
” হ্যাঁ, যাও! আজ রাতে তো আর ঘুম হবে না। ”
” সেটা তো হবে না।পাঁচ বছর পর যাচ্ছি ”
শহরের যানজট পেরিয়ে কালো বিএমডাবলুটা থামলো এক কোচিং সেন্টারের সামনে।আহি অনেকবার বলেছিল ” তূর্য ভাই ,বাইক নিয়ে চলুন প্লীজ ” কিন্তু তূর্য তার কথা শোনেনি।উল্টে ধ’মকা ধ’মকি করে তাকে চুপ করিয়ে রেখেছে।আহিও অ’ভিমান করে আর কোনো কথা বলেনি।বাইক যখন চালাবেই না তখন কিনেছিল কেনো? না কিনলেই তো পারত।কয়েকবার গাড়িতে ওঠার সৌভাগ্য হলেও বাইকে ওঠার সৌভাগ্য এখনো হয়নি তার।
” কোলে করে নামাবো তোকে?”নিজে গাড়ি হতে নেমে আহির পাশের দরজা খুলে বলল তূর্য। নানান ভাবনার মাঝে কখন যে পৌঁছে গিয়েছে বুঝতেই পারেনি আহি । সে নামতে নামতে বলল,
” রাস্তা – ঘাটেও এভাবে ব’কবেন না তূর্য ভাই। আমি অ’পমানিত হই ”
” রাস্তা ঘাটেও এভাবে ই’ডিয়েট পনা করবি না ,আহি।আমি বিরক্ত হই ”
” আমি কি করেছি? তখন থেকে তো চুপ করেই আছি।কোনো কথা বলেছি ? কালকে বড় আব্বু কি বলেছেন মনে আছে?।বড় আব্বুকে বলে দেব কিন্তু!আর সি’গারেট খাওয়ার কথাও বলে দিবো।”
“খেতে বাধ্য কেনো করিস? পা ছাড় আমার “বলেই আহিকে এক ধা’ক্কা দিলো তূর্য । তাল সামলাতে না পেরে গাড়ির সাথে মিশে গেল আহি।হুট করে এভাবে রে’গে গেলেন কেনো তূর্য ভাই? সে তো না দেখেই পায়ে পাড়া দিয়েছে।ইচ্ছা করে দিয়েছে নাকি?
আহির মুখটা একদম ফ্যা’কাশে হয়ে গেছে।সব সময়ই এমন করেন তূর্য ভাই। সে কাঁদো কাঁদো হয়ে কিছু বলবে তার আগেই একটা ভদ্রলোক তাদের দেখে এগিয়ে এসে বললেন,
” তুমি তূর্য না ? ”
তূর্য আহির থেকে চোখ সরিয়ে পিছন ঘুরলো।লোকটিকে দেখে ঠোঁট কিছুটা প্রসারিত করে বলল,
” আসসালামু ওয়ালাইকুম, স্যার । কেমন আছেন?”
” ওয়ালাইকুম সালাম। আলহামদুলিল্লাহ! তোমার কী খবর? সাথে কে?বোন?”
” জ্বি! কাজিন।ভেতরে যা আমি আসছি “শেষ কথাটা আহির দিকে তাঁকিয়ে বলল তূর্য।
এখানেও চাচাতো বোন বলল।লোকটা যখন বলছেই বোন? তাহলে ‘হ্যাঁ’ বললেই তো হয়।ঘটা করে কাজিন বলার কী আছে? আর কখনো আহি তাকেও নিজের বড় ভাই বলে পরিচয় করিয়ে দিবে না।কক্ষনো না!এক বুক অ’ভিমান নিয়ে চলে গেল আহি।
তূর্য অনেকক্ষণ যাবৎ কথা বলল লোকটার সাথে।ভদ্র লোকটি হলেন তূর্যের কলেজ টিচার। ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের। অনেক বছর পর সাক্ষাৎ হওয়ায় ভালো – মন্দ নানান কথা বলতে বলতে প্রায় ঘণ্টা খানেক লেগে গিয়েছে। স্যারকে গাড়িতে তুলে দিয়ে তূর্য ভেতরে আসলো।এসেই দেখলো রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে আহি।ধবধবে ফর্সা মুখ রোদের তাপে লাল হয়ে আছে। সারা মুখ ঘামে লেপ্টে একাকার অবস্থা। সে আরেকটু পা চালিয়ে আহির নিকটে এসে হাতের কব্জি ধরে একটা ছায়া জায়গা দাঁড়া করে দাঁতে দাঁত চে’পে বলল,
” আরে ই’ডিয়েট। এভাবে এক ঘণ্টা ধরে রোদে দাঁড়িয়ে আছিস ?”
” আপনি ভর্তি করে তাড়াতাড়ি চলুন ” রা’গে রা’গে বলল আহি।
” তোর রা’গের কামায় খাই ? রা’গ দেখাস আমাকে ! ”
” আমিও খাই না ! ”
” নে ,এবার কান্না করে দে ! ”
” ভেতরে না গেলে বলে দিন। আমি একা গিয়ে ভর্তি হয়ে আসবো ”
” যা ! ” বলেই আহির কাঁধে মৃদু একটা ধাক্কা দিলো তূর্য।আহি সত্যি সত্যি ভেতরে চলে গেল। গিয়ে খুঁজে খুঁজে আসল জায়গা বের করলো ।সব ফরমালিটিস পূরণ করল সে একাই।তূর্য দূর থেকেই সবটা দেখছে।এবার লোকটা টাকা চেতেই আহি চোখে চোখে তূর্যকে খুঁজতে আরম্ভ করলো।খুঁজেও পেলো।কিন্তু এখন তো টাকা চাইতেও লজ্জা লাগছে।রা’গ দেখিয়ে চলে এলো।টাকা চাইলেই যদি সবার সামনে অ’পমান করে?তখন কী হবে? আর এখন না চেয়েও তো উপায় নেয়। দূর থেকে খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে সবটা দেখছে।একটু এগিয়ে আসলে কী হয়? আহি আর উপায় না পেয়ে বলল,
” আসলে আমার ভাইয়া এসেছেন । ঐযে দাঁড়িয়ে আছে ।আমি ডেকে নিয়ে আসছি ”
” কেমন ভাই তোমার ?”
একটু আগের কথা মনে পড়তেই আহি গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” পাড়াতো ভাই !” তূর্য যখন নিজের বোন বলে পরিচয় দিতে পারবে না।সে কেন দিতে যাবে ? ঠেকা আছে নাকি সে?
ছেলেটি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করতে গিয়েছিল
” পাড়াতো ভাই আবার কী?” কিন্তু তার আগেই আহি জায়গা ত্যাগ করে ।তূর্যের কাছে গিয়ে মিনমিন করে বলল,
” টাকা লাগবে !”
” স্যরি? কী বললি? বুঝিনি !”
তূর্য যে বুঝে ও না বোঝার অভিনয় করছে আহি সেটা বেশ ভালো করে বুঝতে পারছে ।তবুও ফের বলল,
” ভর্তি হতে টাকা লাগবে ”
” তো ? আমি কী করব? তোর বাপ – চাচাদের তো টাকার অভাব নেয়।তাদের থেকে আনিসনি কেন?”
” আপনারও তো অভাব নেয়।এখনের মতো উদ্ধার করুন।বাড়ি ফিরে দিয়ে দিবো ”
” পাড়াতো ভাই মানে বুঝিস? ”
” হ্যাঁ ”
” কী বুঝিস ?”
” যা বুঝি ,বুঝি! ”
” আমাকেও একটু বোঝা !”
” আপনি টাকা দিবেন না ,বললেই তো হয় ।শুধু শুধু কথা প্যাঁ’চাচ্ছেন কেন?”
” পাড়াতো ভাই নিশ্চয়ই টাকা দিয়ে ভর্তি করায় না? এই.. বড় জোর তোকে দেখে শিষ বাজালো,ব’ডি শে’মিং করল,কয়েকটা ফা’উল কথা বলল.. এটসেট্রা এটসেট্রা ”
” আর বলবো না! ” মাথা নিচু করে আস্তে অস্তে আস্তে বলল আহি।
তূর্য একটু ঝুঁকে আহির মুখ দেখার চেষ্টা করতে করতে ভ্রু কুঁচকে বলল,
” কী বলবি না?”
” পাড়াতো ভাই ”
আহির কথা শুনে এবার সে সটান দাঁড়িয়ে পকেটে দুই হাত গুজে ভেতরের দিকে এগোতে এগোতে বলল,
“বল! আমার তো কোনো প্রবলেম নেই। দ্যান,আমিও তাদের মতোই বিভেব করব । তখন ভালো লাগবে ?”
আহিও তূর্যের পিছুপিছু যেতে যেতে বলল,
” বললাম তো আর বলবো নাহ ”
সামনে দুটো উপন্যাসের বই নিয়ে চিন্তিত মুখে বসে আছে আহি।বাড়ি ফিরেই জানতে পেরেছে তার নামে পার্সেল এসেছে । অথচ সে কোনো অর্ডার করেনি।আর যে পাঠিয়েছে ,নামটাও গোপন রেখেছে।সে কি জীবনেও উপন্যাসের বই পড়ে নাকি? এতই যখন গিফট পাঠানোর ইচ্ছা দুইটা জামা পাঠাতো ! সে তাহলে ঈদের থেকেও বেশি খুশি হতো।
সে তারিনের কাছেও কল করেছিল ।কিন্তু না ! তারিন পাঠায়নি।
আজই এডমিশন কোচিংয়ে ভর্তি হয়ে এসেছে।দুইদিন পর পরীক্ষা ।আর বাড়ির লোক যদি জানতে পারে সে একাডেমিক বই না পড়ে উপন্যাস পড়ে বেড়াচ্ছে।পুরো খু’ন করে ফেলবে।বিশেষ করে মারুফা বেগম আর তূর্য। তারা মে’রে শুঁটকি বানাবে।
” আহিপু ! তোকে নাকি তূর্য ভাই মোবাইল কিনে দিয়েছেন ?”
প্রশ্নটা করতে করতে খাটের উপর এসে আয়েশ করে শুয়ে পড়ল শান্ত।
এই হয়েছে আরেক জ্বা’লা।মোবাইলটা কিনে দিয়েছেন ভালো কথা।ফেসবুক আইডি খুলে দিতে কে বলেছে? সে নিজে পারত না খুলে নিতে? কোথায় ভেবেছিল আইডির নাম হবে ‘ Angel Ahi ‘ তা না! তূর্য ভাই নাম দিয়েছেন ‘ Afhana Chowdhuri Ahi ‘ তিন পৃষ্ঠার নাম।মে’জাজটা পুরো খা’রাপ করে দিয়েছে।আর ম্যাসেঞ্জার নামতে নিষেধ করলো।ম্যাসেঞ্জার যদি না ই চালাতে দিবে তাহলে ফেসবুক দিয়ে কি করবে সে? একটু চু’রি – চামারি করে নামিয়ে নিবে সেটার ও উপায় নেয়।প্লে স্টোরে লক দিয়ে রেখেছে।এমন মোবাইল হওয়ার চেয়ে না হওয়াই ভালো ছিল।
আহি কে চুপচাপ থাকতে দেখে শান্ত ফের বলল,
” কী হলো আহিপু ? কথা কস না কেন? শুনলাম আইফোন কিনে দিয়েছেন ”
” আরে থাম তো তুই! আইফোন ! আইফোন সেভেনটিন কিনে দিতো! দিলো না ওনার নাকি কালার পছন্দ হয়নি।পকেটের টাকা খসাবে না ,সেটা না বলে কালারের দো’ষ দিচ্ছেন।ভাবেছেন আমি কিচ্ছু বুঝি নাহ ”
” নে,যেটা দিয়েছে সেটা তো দেখা বইন ”
” এই কী দেখাবো তোকে? হাতে পেয়েছি নাকি? কাল সকালে নিতে বলেছে ।শুধু উঁকি মেরে নামটা দেখেছিলাম।ধ’মকে রুমে পাঠিয়ে দিয়েছে।আজ নিজের টাকা নেই বলে,নাহলে ওনার ফোন আমি জীবনেও নিতাম না ”
” তাহলে তূর্য ভাইকে বলে দেই যে তুই ফোন নিবি না ”
” আমি বলেছি ফোন নিব না ? শান্ত তুই যা তো ! এমনিতেই টেন’শনে আছি ” রা’গ দেখিয়ে বলল আহি।
” তাড়িয়ে দিচ্ছিস ? তূর্য ভাইকে সেই কথা বলে দিবো ?”
” কোন কথা ?”
” ঐযে সেই কথা,তোকে একদিন বলেছিলাম তূর্য ভাইয়ের রুমে ঢুকছিস দোয়া পড়ে ঢুকিস।আর তুই ওয়াশরুমে যাওয়ার দোয়া পড়েছিলি।”বলেই উচ্চস্বরে হাসি আরম্ভ করলো শান্ত
” যা যা ! বল তো ”
শান্ত শোয়া থেকে উঠে বসতে বসতে বলল,
” গেলাম তাহলে। ”
” থাক না ভাই।দরকার কী!” আদুরে কন্ঠস্বর শুনে যে শান্ত গলে গেল এমন না।তবে কথাটা আর তূর্যের কান পর্যন্ত দিলো না।এখনই যদি না’লিশ করে দেয় তাহলে পরে আবার ভয় দেখাবে কী নিয়ে?
একটু আগেই ঘুম থেকে উঠেছে তূর্য।ফ্রেশ হয়ে খাটের হেড বোর্ডে পিঠ ঠেকিয়েছে মিনিট দুয়েক হবে।মোবাইল হাতে খুব মনোযোগ সহকারে কিছু দেখছে। কখনো কখনো বৃদ্ধা আঙ্গুল আর তর্জনি আঙুলের সাহায্যে ফোনের স্ক্রিনটা জুম করে দেখছে।থেকে থেকে ঠোঁট প্রসারিত করছে।
সন্ধ্যায় কোনো দিনই কফি খায় না।তবুও মাকে কফি হাতে রুমে প্রবেশ করতে দেখেই বুঝেছে নিশ্চই কোনো আবদার আছে।তাই পারভিন বেগম রুমে প্রবেশ করা মাত্রই সে মোবাইলের স্ক্রিন বন্ধ করে প্রশ্ন ছুড়লো,
” আম্মু,এমন কিছু বলো না যেটা আমি করতে পারবো না ”
পারভিন বেগম কফির মগ রেখে ছেলের পাশে বসলেন।মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,
” তোর বাবা বলছিল রাজশাহী কালকেই যেতে ।”
” তোমরা যাও।আমি অকেশনে যাবো ”
” কালকে গায়ে হলুদ আব্বা। কালও তো অনুষ্ঠান হবে ”
” আম্মু প্লীজ! আমাকে ছেড়ে দেও ”
ছেলের কথা শুনে পারভিন বেগম মুচকি হেসে তার কানে কানে কিছু বলতেই।তূর্যের গম্ভীর মুখশ্রী আরো গম্ভীর হলে গেল।থ’মথমে গলায় বলল,
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১৬
” বলো! তোমার স্বামীকে ভ’য় পাই নাকি?”
” তাকে কেনো বলতে যাবো? জায়গা মতো গিয়ে বলবো ”
” তাকেও ভ’য় পাই না ”
” তাহলে বলি?”
” তোমার এত ক’ষ্ট করার দরকার নেয়। আমিই বলবো! এখন যাও ,রেডি হও ! বাবার বাড়ি যাবে বলে কথা ”
ছেলেকে কায়দায় ফেলে রাজি করাতে পেরে পারভিন বেগম মহা খুশি।তূর্য কেবল তার মায়ের হাবভাব দেখলো।কীভাবে বাচ্চাদের মতো ব্ল্যাকমেইল করলো।মায়ের এমন কাণ্ড দেখে গম্ভীর মুখশ্রীতেও হাসি ফুটে উঠলো।
