Home তিন তরঙ্গের আলোকছটা তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৪

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৪

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৪
রাফিয়া জান্নাত রিফা

হরলিক্সের পাশের চেয়ারে নিধিকে বসানো হল। সেই সঙ্গে যেন অদৃশ্য এক স্রোত বুকে ছুঁয়ে গেল হরলিক্সকে হৃদস্পন্দন আচমকা তীব্র হয়ে উঠল, অথচ কারণটি ঠিক ধরতে পারল না সে। তবে একটি বিষয় আজ প্রথমবার এত স্পষ্ট হয়ে উঠল হরলিক্স যে সুহানার প্রতি তার মনে সূক্ষ্ম কিন্তু প্রবল টান জন্মেছে, সে টান কোনো হালকা অনুভূতি নয় ভালোবাসার প্রারম্ভিক ধাপ, সেই প্রথম কোমল আলোড়ন একটি নিষ্পাপ ক্রাশ।
জর্জেটের ওড়নার নরম ভাঁজের আড়ালে সুহানার উদাসীন, স্বপ্নমগ্ন মুখটি যখন হরলিক্সের দৃষ্টিতে ভেসে উঠল, তখন তার মনে অদ্ভুত এক শিহরণ জাগল। মনে হল, এই মুখশ্রীতে রয়েছে এমন এক নীরব আকর্ষণ, যা ভাষায় ধরা যায় না, কেবল অনুভবে বোনা যায়। হরলিক্স জর্জেটের ওড়নার ভেতরে সুহানার উদাসীন মুখশ্রী দেখে ইতমস্ত বোধ করে বলে,,

__ আপনি মনে হয় অনেক টেন্সন সুহানা?
সুহানা কিছু বললো না মাথা নিচু করেই রইল, হরলিক্স আবার বলে,,
__ স্বামী হয়ে আপনাকে মারবো না,বা জ্বালাবো ও না,ওমন স্বামী হবো না আমি এতে ১০০% নিশ্চয়তা আছে।আমার মা বাবা ও কিন্তু ওমন না,তাই চিন্তা করবেন না। নিজের পরিবারের কথা ভেবে উদাসীন হলে আমার মা বাবাকে নিজের মা বাবা মনে করে জড়িয়ে ধরবেন, আপনার মা বাবাদের বেশি মনে পড়লে তাদের কাছের যেতেও কেউ বাঁধা দিবে না। আপনার সুন্দর মুখে ওমন কালো মেঘ মানাচ্ছে না। বুঝলেন তো?
কথা বেশ মন কেড়েছে সুহানার, হরলিক্সের কথায় হালকা করে মাথা নাড়ালো সুহানা।
আর্দ্রের পাশে নিধিকে বসানো হয়েছে,এই মুহূর্তে নিধি প্রচুর নাচতে ইচ্ছে করছে তা পারছে আর কই, হঠাৎ আর্দ্র নিধির কানে ফিসফিস করে বলতে লাগলো,,

__ অপূর্ব লাগছে তোমায় এতটা না সাজলেও হতো।
মুখ কুঁচকে নিধি বলে,,
__ একবারই তো বিয়ে করবো নাকি , তো একটু না সাজলে কি হয়।
__ সমস্যা নেই, সাজ এলোমেলো করে দেওয়ার জন্য আমি তো আছিই।
এই বলে ফেচেল হাসলো আর্দ্র,নিধি হ হয়ে চেয়ে রইলো আর্দ্রের পানে। আর্দ্র ফের বলে,,
__হোয়াট ইউ নো চুড়ুই ” তিন ঘন্টার সাজ এক মিনিটে নষ্ট করে দেওয়াকে বাসর” বলে।
নিধি রাগ হয়ে বলে,,

__ চোপপপপপপ,আপনার মাথা ফাটাবো যদি আমার সাজ নষ্ট হয়।
আর্দ্র হাঁসি থামিয়ে অসহায় মুখে বলে,,
___ আমার থেকে তোমার সাজ বেশি হলো বুঝি।
__ বাসর ঘরে আমি ছবি তুলবো আমি,আর আপনি কিনা আমার এই তিন ঘন্টার সাজ এক মিনিটে নষ্ট করবেন।
আর্দ্র হতবাক হয়ে নিধির দিকে চেয়ে মনে মনে বলে,,,
__ আদৌও এ বাসরের কিছু বোঝে তো।
আর্দ্র আর কোন কথা না বলে মুখে কুলুপ আটলো।

আর্দ্র, নিধি ও হরলিক্স সুহানার বিয়ের কার্যক্রম শেষ,এখন ইতি ও আলবানের পালা। কিন্তু ইতিকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
সিদ্দিকী বেগমের মুখখানা চিন্তার শুকিয়ে খাঁঠ,সকালে মেয়েটাকে কত করে বোঝালেন যে,,,
__ দেখ মা বিয়েটা যেভাবেই হোক না কেন আলবান তোর স্বামী,বিয়ে একটি পবিত্র সম্পর্ক,আজ আর্দ্র নিধির বিয়ে হয়ে গেলে ভদ্র মেয়ের মতো তুই সবার কথা মতো আলবানকে আবার বিয়ে করবি।

কিন্তু ইতি কিছুতেই এ বিয়েতে মত দিচ্ছে তার কথা মতো আলবান তাকে বিয়ে করবে শুধু রাগের বশে ও প্রতিশোধের আগুনে।এখন এই মেয়েকে কে বোঝাবে যে আলবানের মনে এমন কোনো ঘোর প্যাঁচ নেই ,হয়তো মুখেই বলে এই যা।কিন্তু এখন ইতির কোনো খোঁজ না পেয়ে আলবানের রাগে আবারও জ্বলে উঠল। এদিকে কাজি সাহেব বারবার তাগদা দিচ্ছেন কনেকে নিয়ে আসার জন্য। উপস্থিত আত্মীয়-স্বজনেরা অস্বস্তি লুকোতে না পেরে ফিসফিস করে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। সেই সব চাপা কথাবার্তা, দৃষ্টির আড়ালে লুকোচুরি সবই আলবানের কাছে অসহ্য লাগতে শুরু করল। যা আলবানের কাছে চরম বিরক্তিকর ঠেকলো,রাগ নিয়ে সেখান থেকে হনহনিয়ে বাগানের দিকে যেতে লাগলো।

ইতির অবস্থান এখন পেয়ারা গাছের মোটা ডাল দুটোর মধ্যখানে,গাছটা বেশি একটা উচু নয় তবে কেউ কখনো আন্দাজ ও করতে পাবে না যে সেখানে ইতির অবস্থান,সেই সুযোগটাই কাজে লাগিয়ে ইতি এখন পেয়ারা গাছে,দুই পা দুলাতে দুলাতে বেশ আরাম আয়েশ করে গাছের পেয়ারা খাচ্ছে।এই মিনিট পাঁচেক আগেই সবার অগোচারে এখানে এলো ইতি,বিয়ে সে কিছুতেই করবে না,তার মতে আলবান তাকে শুধু শাস্তি দেওয়ার জন্য বিয়ে করবে,এমনিতেই সেদিন আলবানের হাতের চার চারটে থাপ্পড় খেয়ে ইতির গালটা পচে যাওয়ার মতো, বিয়ের আগেই যদি চারটে মারে বিয়ের পর তো তাহলে মারতে মারতে আধমরা করে ফেলবে,এই ভয়টা ইতি গ্রাস করছে বারংবার।ইতির গালে এখনো পাঁচ আঙুলের সাফ পুরোপুরি মিসে নাই,ইতি হা করতে পারে না হা করলেই গাল দুটো মোচড় দিয়ে ওঠে, একমাত্র ইতিই জানে কতটা ব্যাথা করে তার গাল দুটো।বেচারি এখনো অনেক কষ্ট পেয়ারা খাচ্ছে,বুড়ি গুলোর মতো করে কোন রকমে পেয়ারা কুবলিয়ে কুবলিয়ে খাচ্ছে।ইতি বেশ জেদি কন্ঠেই বলতে লাগলো,,

__ চারটে থাপ্পড়ের জায়গায় চারকোটি থাপ্পড় উপহার পাবি তুই দাবানল।
পেয়ারা গাছের নিচ থেকে গম্ভীর কন্ঠসর ভেসে এলো,,,
__ তো নিচে আয়।
ইতি চোখ বড় বড় করে নিচের দিকে তাকাতেই দেখলো আলবান বুকে হাত গুজে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।ইতির বুকটা দ্রিমদ্রিম করতে লাগলো।একের পর এক শুকনো ঢোক গিলতে শুরু করলো।ভয়ে আলবানের কথার আর কোন প্রত্যুত্তর করলো না।আলবান ফের বলে,,

__ নিচে নামতে ভয় পাচ্ছিস।
__ নামবো না আমি এখানে কেন এসেছেন,যান চলে যান।
__ আমি বিয়ে করছি তা দেখবি না?
__ আমি আপনাকে বিয়ে করবো না।
__ আজব তোরে বিয়ে করবে কে?আমি..টু মাচ ইতি।
ইতি একটু অবাক হয়ে বলে,,
__ তো কাকে করবেন?
আলবান মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে ডাক ছাড়লো,,
__ বেবি কাম হেয়ার।
তখনি আঁধারের ওপাশ থেকে এক জিন্স প্যান্ট ও টপস পড়া মেয়ে আসলো, আলবানকে জড়িয়ে ধরে বললো,,,
__ ইয়েস বেবি।
গাছের দিকে ইতিকে দেখিয়ে দিয়ে আলবান বলে,,
__ ইটস মাই শাকচুন্নী কাজিন।
__ ও , হেই হ্যালো,হাউ আর ইউ।

আলবান শাকচুন্নী বলায় রাগে ফুঁসে উঠলো ইতি,বড় বড় ভয়ংকর চোখে আলবানের দিকে তাকিয়ে আছে যেন চোখ দিয়ে গিলে খাওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে,আলবান ও ইতির চোখে ভ্রু উচানো চোখে তাকিয়ে আছে।গাছের ডালে থাকায় আলবান পাশে থাকা মেয়েটার মুখ অস্পষ্ট ইতির কাছে,গাছ থেকে নামার ইচ্ছা হলো ইতির কিন্তু তাও নামলো না, সেখানেই হোপ হয়ে বসে থাকলো।ইতি মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে আলবানকে প্রশ্ন করলো,,

__ আমাকে যে বিয়ে করতে চাইলেন।
__ কখন, কোনদিন,কোনসময়,তোর মতো কাল নাগিনীকে বিয়ে করবো তাও আবার আমি।
এই বলে,আলবান আর কোন কথা না বলে মেয়েটির সাথে যেতে লাগলো,যেতে যেতে আলবান বললো,,
__ আমার বিয়ে দেখতে চাইলে তাড়াতাড়ি আয়।
ইতি কথা খানা কানে কিছুতেই নিলো না, মনে মনে আওরালো,,,
__ করুক গে, কাকে বিয়ে করবে করুক তাতে আমার কি?
কিন্তু ইতির মস্তিষ্কে “আমার বিয়ে” এ কথা খানাই বার বার বাজতে লাগলো,,,
__ যেহেতু স্বামীর বিয়ে তো আমার একটু যাওয়া উচিত,সতিন কে বরন করতে তো হবে নাকি।যাই একটু গিয়ে দেখে আসি।
এই বলে গাছ থেকে নেমে ড্রয়িং রুমে উপস্থিত হলো ইতি। আলবান ইতিকে আসতে দেখে কাজী সাহেবকে বলতে লাগলেন,,

__ হুজুর বিয়ের কার্য শুরু করুন।
সেখানে উপস্থিত থাকা সকলেই থ হয়ে তামাশা দেখতে লাগলো, ইতির কাছে তার মা এসে বলল,,
__ কি রে কোথায় ছিলি।
__ ছিলাম কোথাও,আগে বলো উনি কি সত্যিই বিয়ে করছে নাকি।
__ হ্যাঁ সতিনের সাথে স্বামী সংসার ভাগাভাগি করার জন্য প্রস্তুত হো।
মেয়েটির নাম নিলা,আলবান ও আর্দ্রের কোম্পানিতে জব করে সেখান থেকেই পরিচয় । আর্দ্র সাথেও সম্পর্ক বেশ গাঢ় ,বিয়ে এটেন্ট করতে এসেছে।আলবানের এসব প্লান যাতে ইতি মনোভাব বুঝতে পারে।
নিলা আসতে ধীরে কলমটা হাতে নিলো সাইন করার জন্য,ওপাশ থেকে ইতিকে তা মা খুচিয়ে বলতে লাগলো,,

__ কি রে,সতিনের সাথে স্বামী সংসার ভাগাভাগি করবি।
এবার কিছুক্ষণের জন্য ইতি ভাবনা জগতে চলে গেল দেখতে লাগলো তার সতিন নিলার সাথে তার প্রচুর চুলোচুলি হচ্ছে।আলবান ও আর ইতির কথা শুনে না,ইতির কাছেও আসে না,সারাদিন রাত তার সতিনের সেবা করে।সতিনের পিছোন পিছোন ঘুর ঘুর করে।
ভাবনার জগৎ থেকে বেড়িয়ে এলো ইতি মুহুর্তেই হকচকিয়ে উঠলো,ঢোকের পর ঢোক গিলতে লাগলো ইতি,আর এক মুহূর্তও দেরি না করে আলবানের দিকে এগিয়ে গিয়ে নিলাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে তাদের মাঝখানে বসে পড়লো, আলবান মুখটা কুঁচকে বলে,,

__ সমস্যা কি তোর,এভাবে মাঝে এসে বসলি কেন?
ইতি অসহায় কন্ঠে আলবানের কানে ফিসফিস করে বলল,,
__ আমি সতিনের সংসার করবো না দাবানল ভাই।
__ কিন্তু আমি দ্বিতীয় বিয়ে করে বউয়ের, সাথে সংসার করবো।
__ এমনিটা করবেন না প্লিজ,আমি আপনার পায়ে পড়ে থাকবো সারাজীবন, আপনার মুখের উপর একটা কথাও বলবো না, স্বামী সেবায় সর্বদা সচেষ্ট থাকিবো।
__ কিন্তু আমি তোকে বিয়ে করবো না।
ইতির এবার রাগ হলো দাঁতে দাঁত চেপে হাঁসি মুখে বললো,,
__ সোনা জামাই আমার এমন করে বলে না গো, মানুষ শুনলে খারাপ বলবে।
__ বলুক,তাও তোর মতো অবাধ্য মেয়েকে আমি বউ হিসাবে চাই না।
ইতি কি করবে বুঝতে না পেরে এবার জোরে জোরে কান্না শুরু করে বলতে লাগলো,,
__ আমি সতিনের সংসার করবো না কিছুতেই না।
চোখে পানির ছিটেফোঁটাও নেই,ইতি ফের বলে,,

__ বড় বাবা বড় মা তোমাদের ছেলে ফের বিয়ে করছে তোমরা কেউ বলছো না কেন?আমি সতিনের সংসার করবো না।
এতো জোরে কথা বললো যে আলবান কানটা ঝালাপালা হয়ে গেল,কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে নাড়াচ্ছে অনবরত, পাশে বসা আর্দ্র হাসতে হাসতে বলে,,
__ ইতি হয়েছে থামো, এখন বিয়েটা করো,সময় নষ্ট না করে সাইন করে দাও না হলে তোমার হবু সতিন সাইন করে দিবে।
আর্দ্রের কথায় ইতি আর আগপাছ কিছু না ভেবে সাইন করে দিল।পরপর আলবান ও সাইন করে দিলো। পরমুহূর্তেই তাদের কবুল পড়ানো হলো।

সুহানার বিদায় তার মা বাবা দাদির আহাজারি কান্না চলছে,সবার কাছ থেকে কেঁদে কেঁদে বিদায় নিলো সুহানা কিন্তু তার ভাই সুন্দরকে খুঁজে পেলো, এজন্য সুহানা আরো ডুকরে কাঁদছে,,
__ অসুন্দর ভাই কই,ওয় না আইলে আমি যামু না কয়া দিলাম।
সুন্দর ভিড়ের মাঝে মাথা নিচু করে ধীর পা ফেলে এলো সুহানার দিকে, হরলিক্স হাতের উপর সুহানা হাত রেখে হরলিক্সকে বললো,,
__ আমার বোনরে দেখে রাইখো ভাই,ওরে কষ্ট পাইতে দিও না,ও আমার কলিজা ভাই।ওর মন খারাপ থাকলে ঝালমুড়ি খাওয়াতে নিয়ে যাবা,তখন ওর মন একদম ভালো হয়ে যায়।
সুহানা ডুকরে কেঁদে সুন্দরকে জড়িয়ে ধরে বলল,,

__ ভাই আমি যাবো তোকে ছেড়ে।
সুন্দর তার চোখে পানি গুলোকে সমানে মুছেই যাচ্ছে,,,
__ রাখার হলে তোকে যত্নেই রেখে দিতাম,আর সারাদিন ঝগড়া করতাম।
আরো জোরে কেঁদে উঠলো সুহানা,,
__ তাহলে আমাকে রেখে দে ভাই আমি যাবো না,না ।
__ এভাবে কাদবি বলেই আমি আসতে চাই নি বোন।
__ আমি যাবো না, বাবাকে বল ওদের চলে যেতে,আমি যাবো না।
সুন্দরও এবার ডুকরে কেঁদে উঠলো, তাঁদের ভাই-বোনের এমন আহাজারি দেখে উপস্থিত থাকা আত্মীয় স্বজন হা হয়ে দেখছে,মুলত ভাই বোনের এমন ভালোবাসা দেখে মুগ্ধ তারা, সুন্দর অনেক কষ্টে সুহানার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে অন্য দিকে দৌড়ে আড়াল হয়ে কাঁদতে লাগলো, এদিকে সুহানা এবার হাত পা ছুড়া ছুড়ি করে কান্না করতে লাগলো সে কিছুতেই যাবে মা,বাবা,ভাই বলে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো, সুহানাকে দাঁড় করে রাখানো হরলিক্সের পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠলো তাই সে সুহানার মাথাটা তার বুকে চেপে ধরে বলে,,

__ এভাবে কাদবেন না প্লিজ,আমার এমন আহাজারি কান্না সহ্য লাগছে,কেমন যেনো বুকে বিঁধছে।
__ যাবো না আমি,ছেড়ে দিন আমায়, কোথায়,কোথায় অসুন্দর কোথায়,ওই অসুন্দর ভাই কই তুই আমি যাবো না।
ইতি, বিথী, নীধি তিনজনই কেঁদে যাচ্ছে, শুরু তারা নয় সেখানে উপস্থিত থাকা সকলেই। সুহানার বাবা ও মেয়ের জন্য ডুকরে কাঁদছে অনেক করে চেয়েছিল যে মেয়েকে হাসি মুখে বিদায় দিবে কিন্তু তা হলো না সুহানার মাকে আলিফা বেগম ও সিদ্দিকী বেগম ধরে রেখেছে।
সুহানা কান্না করতে করতে হরলিক্সের বুকেই অজ্ঞান হয়ে পড়লো, হরলিক্স সুহানাকে কোলে তুলে গাড়িতে বসে অজ্ঞান সুহানাকে নিজের কোলে বসিয়ে নিলো,সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল তারা।
সুহানার এমন কান্নার প্রতিফলন নিধিকে বেশি প্রবাহিত করছে,তার যদি আজ আর্দ্র সাথে বিয়ে না হয়ে অন্য কারো সাথে বিয়ে হতো তাহলে সে ও ওভাবেই আহাজারি কান্না করতো, করবে না আবার,সে তো এক মুহূর্তো ইতি বিথী নীধি কে ছাড়া থাকতে পারবে না,সেখানে কান্না করা তো দুর,নিধির তো শ্বাস প্রশ্বাস আটকে মৃত্যু হতো তখন,নিধির চোখ বেয়ে ও টপটপ করে পানি পড়ছে,নিধিকে কাঁদতে দেখে ইতি,নিধি বলে,,

__ ওই কাদিস কেন?
__ আমি ও যদি ওভাবে চলে যেতাম।
ইতি বলে,,
__ আমরা দুজন ও তো যেতাম,আমাদের আলাদা করার সাধ্য কারো নেই নিধি তাই কান্না থামা।
এই বলে তিনজন তিনজনকেই জড়িয়ে ধরলো ‌।

আর্দ্রের বাসর ঘর কাঁচা ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে সুন্দর করে। নিধিকে আর্দ্রে ঘরের ফুলে সজ্জিত খাটে বসানো হয়েছে।ঘরে ভির করে আছে ইতি, বিথী, নিঝুম, মিশকাত, নিখিল, মুহিন। আর্দ্র ভাইয়ের থেকে টাকা উশুল করার ধান্দায়।
আর্দ্র ঘরে এলো আর্দ্রের কাছে দশ হাজার টাকা চাইলো বিথী, আর্দ্র খুব ঘুম পাচ্ছে অবশ্য তা নয়, তার যে ঘুমে ধরেছে তা দেখানোর প্রচেষ্টা মাএ।তাই বেশি কথা না বাড়িয়ে আর্দ্র দশহাজার টাকাই দিয়ে দিলো তাদের। খুশিতে নেচে উঠল সবাই।
এই মাত্র সেখানে উপস্থিত হলো আলবান ও দির্শক।তখনি বিথীর ও ইতির কিছু একটা মনে পড়তে দৌড় দিলো, কিছুক্ষণ পড় চলেও এলো হাতে একটি বিড়াল নিয়ে,বিড়াল দেখে সবার চক্ষু চড়কগাছে, আর্দ্র বলে,,

__ বিড়াল পুষবে নাকি?
বিথী বলে,,
__ না।
__ তাহলে।
__ আপনাকে ও নিধিকে আমাদের তরফ থেকে এই বিড়ালটি গিফ্ট করলাম।
আর্দ্র অবাক হয়ে বলে,,
__ বিড়াল কেন?
__ আমি শুনেছি বাসর ঘরে নাকি বিড়াল মারে তাই?
এমন কথা শুনে উপস্থিত থাকা সবাই অবাক তবে দির্শকের মুখের ভঙ্গিমা দেখার মতো ছিলো তার চোখ কোটা থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। আর্দ্র আলবান ও দির্শকের দিকে তাকিয়ে বিথীকে বলে,,

__ এমন নিষ্পাপ প্রাণীকে মারার কোন ইচ্ছা নেই আমার।
ফট করে ইতি বলে,,
__ আমি শুনেছি বাসর রাতে বিড়াল না মারলে,নাকি বাচ্চা হয় না।
আলবান, আর্দ্র,দির্শক তিনজনই থমথমে খেয়ে গেলো, বিথী বলে,,
__ উফফ ইতি চুপ করতো ওটা ওদের সিক্রেট ব্যাপার স্যাপার।
বিথী আর্দ্রকে বলে,,
__ পাদরো ভাই এই যে নেও আমাদের গিফ্ট,তা বলে সত্যিই সত্যিই মেরো না যেনো,পারলে একটু রক্ষা দিও,এত কষ্ট সহ্য করতে পাবে না।
বিথী বিড়ালের ব্যাপারে বলেছে কিন্তু আলবান, আর্দ্র, দির্শকের নিষ্পাপ মন নিষ্পাপ কিছু ভেবে ফেলছে।
আর্দ্র ফের বলে,,

__ না থাক এটার কোন প্রয়োজন নেই।
তাও জোরজবরদস্তি করে আর্দ্রের হাতে বিড়ালটাকে দিলো ইতি, বিথী, নিঝুম।
আলবান এবার ইতিকে বলে,,
__ আজ কিন্তু তোর ও কিন্তু বাসর।
ইতি নির্বিকার ভঙ্গিতে উওর দিলো,,
__ ওসব বাজে ব্যাপার দাবানল ভাই।
আলবান ইতির কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,,
__ ক্যান ডু দিস প্র্যাকটিস, প্র্যাকটিক্যালি।
আলবান কথা কোন লাইনে চলে গেছে তা বুঝতে বাকি রইল না ইতির,ভয়ে সিটিয়ে গেলো মেয়েটা। আর্দ্রকে বেস্ট ওফ লাক বলে এক এক করে চলে এলো সবাই।

__ মুহিন কোথায় যাও।
__ কেন?
__ আমিও যেতাম।
মুহিন মুখ কুঁচকে পিকিকে বলে,,
__ কেন এখানে থাকলে কি সমস্যা।
__ তাও তোমার সাথেই যাবো কই যাও তুমি।
__ প্রকৃতির ১ নাম্বার ডাকে সাড়া দিতে যাই,যাবে?
__ হ্যাঁ চলো।
__ প্রকৃতির দু নাম্বার ডাকে ও সাড়া দিতে হবে,গন্ধ সহ্য করতে পাবে তো।
মুহিনেরএ কথা বলা মাএই পিকি নাক চেপে ধরে অন্যদিকে যেতে যেতে বলে,,
__ ওই জন্য সকাল থেকে পাদের গন্ধ পাচ্ছি,ছি মুহিন ছি।

ইতিকে জোর জবরদস্তি করে আলবানের ঘরে পাঠালো বিথী, নিঝুম,মুহিন। আলবান আপাতত ঘরে নেই কোথাও গেছে হয়তো। বিথী অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে ইতিকে রেখে চলে গেলো। সিদ্দিকী বেগম ও আলিফা বেগমও অনেক করে বোঝালো ইতিকে,তাদের কথায় আর না করতে পেলো না ইতি।
ইতি ভয়ে সিটিয়ে গেলো না জানি আজ তার সাথে কি অঘটন ঘটে।অবশ্য সব ধরনের প্রটেকশন নিয়েই আলবানের ঘরে এসেছে ইতি।
ইতি নিজের ওড়নার কোস থেকে ছুড়ি,রিবেলবার, অজ্ঞান করার জন্য চিলি স্প্রে,এগুলো এক এক করে বের করে বিছানার জাজিমের নিচে লুকিয়ে রাখলো ও নিজে খাটের উপর উঠে,দোয়া পড়ে শরীর ফু দিয়ে বসে পড়লো।রিবেলবার টা নকল।

একটু পর দরজা ঠেলে রুমে প্রবেশ করলো আলবান,দরজা খুলেই ইতিকে দেখে বেশি আবাক হলো আলবান, আলবান বেশ তীক্ষ্ণ চোখে খাটের উপর মাথায় ঘোমটা দেওয়া বসে থাকা ইতিকে দেখলো, আলবানের বিশ্বাস হলো না যে এটা ইতি,তাও আবার এতো নম্র ভদ্র ভাবে গুটিয়ে বসে আসে আলবানে স্বপ্ন মনে হলো, ওটা ইতি কিনা তা শিওর হওয়ার জন্য সেদিকে এগিয়ে গেল আলবান ঝুকে ঝুঁকে দেখতে লাগলো ইতিকে কিন ।কিন্তু দেখতে পেলো না।ফট করে ইতি নিজের ঘোমটাটা সরাতেই আলবান জোরে চেঁচিয়ে উঠলো,গগন কাঁপানো চিৎকারে ইতি নিজের কান চেপে ধরে রইল।
ইতি চোখ ভর্তি করে উপর নিচে কাজল দিয়েছে ঠোঁটে কালো লিপস্টিক দিয়েছে, গাল দুটো লাল করেছে,যেকেউ এই ইতিকে দেখলে ভয়ে আঁতকে উঠবে,আলবানের ক্ষেত্রে ও তাই, আলবান ভয় দেখানোর জন্যই এই কাজ,আলবান চিৎকার করে বিছানা থেকে ছিটকে দুরে সরে গিয়েছে।ইতি আলবানের দিকে এগিয়ে ভুতুড়ে কন্ঠ করে বলে,,

__ কি রে বাসর করবি বাসর,খুব শখ না, আজ শখ মিটিয়ে দিবো ভালো করে।
আলবান এবার বেশ বুঝলো যে এটা ইতিই তাই নিজেকে অনেকটা শান্ত করলো কিন্তু শ্বাস প্রশ্বাস জোরে জোরে ছাড়তে লাগলো।
আলবান উঠে দাঁড়িয়ে ঘুরে ইতি দিকে আসলো ইতি পা ধরে এক টান মেরে নিজের দিকে এনে ইতিকে দাঁড় করালো নিজের সামনে।,ইতির ওড়না খানা নিজ হাতে নিয়েই ইতি ঠোঁটর কালো লিপস্টিক গুলো ঘঁষে ঘঁষে তুলতে লাগলো আলবান,ইতি বুঝতে পারছে তার সাথে হচ্ছেটা কি, কিছু বুঝে ওঠার আগেই, আলবানের নিজ ওষ্ঠ চেপে ধরলো ইতির ঠোঁট জোড়ায়,ধীরে ধীরে গাঢ় হলো সে চুমু।

ইতির শরীর অবশ হয়ে গেছে,আলবানের ক্রোধ যে সেই ঠোঁটে প্রতিফলিত হচ্ছে তা বুঝতে বাকি রইল না ইতির,এমন কামড়ের ইতির অসহ্যতা বেরে গেলো, নিজেকে ছাড়ানো অনেক প্রচেষ্টা চালালো কিন্তু প্রতিবারই সে ব্যর্থ।এই পর্যায়ে ইতির এমন নড়াচড়ায় আলবান তাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরলো।
ইতির হাতের থাকে ছুড়িটা অনেক কষ্টে আলবানের গলায় বসালো,আলবান তার গলায় ধারালো কিছু দেখেই ইতির ঠোঁট ছেড়ে দিলো, হাঁটুতে ভর করে শ্বাস নিতে লাগলো ইতি।ওড়না দিয়ে ঠোঁটাকে জোরে জোরে মুচতে লাগলো ও বলতে লাগলো,,

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৩

__ উুয়াক থু থু,কি বাজে চুমু।
প্রবল রাগ নিয়ে আলবানের কাছে ধেয়ে এসে বলতে লাগলো,,
__ আপনাকে তো।
এই বলে পুনরায় আবার আলবানের গলায় ছুরি ধরে বলে,
__ আপনার এত বড় সাহস,আমার পরমিশন ছাড়া চুমু খেলেন তাও আবার লিফ টু লিফ,আবার রক্ত ও বের করে দিয়েছেন,আজ তো আপনাকে মেরেই ফেলবো।
আলবান এক হাত ইতির ঠোঁটে রেখে নাড়াতে নাড়াতে বলে,,
__ কামড়ের ফলে বেশি পিংক লাগছে তোর ঠোঁট জোড়া,যদি চাস যে এর থেকেও খারাপ কিছু না হোক তবে আমাকে জ্বালাতে আছিস না।

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৫