প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৭
ইনান হাওলাদার
আহি যেদিন ভার্সিটির অনুষ্ঠানে গিয়েছিল সেদিন তাহি তার সাথে যাওয়ার জন্য বায়না ধরেছিল।কিন্তু সে নেয়নি।তারপর শান্ত ,প্রান্ত আর তাহি মিলে তাদের বাড়ির পাশাপাশি পুজো উপলক্ষে একটা মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল সেখানে যায়। তাহি অনেক খেলনা ও বাচ্চাদের কসমেটিকসও কিনে।কিন্তু রা’গ করে আহিকে দেখায়নি।আর কত দিন রা’গ করে পড়ে থাকবে? আহিকে দেখাতে না পারা অবধি তার পেটের ভাত হজম হচ্ছে না।অনেক কষ্টে এই দুই দিন পার করেছে। তাই এখন একটা একটা করে খেলনা আর কসমেটিকস বড় বোনকে দেখাচ্ছে।আর ডিটেইলস বলছে। এই যেমন , এখন হাতে একটা ছোট খাটো কিউট একটা খরগোশ ধরে রেখে সেটা নাড়িয়ে চাড়িয়ে দেখাচ্ছে আর বলছে এটা কয় টাকা চেয়েছিল ,তারা কয় টাকা দিয়ে কিনেছে,এটার আরো অনেক কালার ছিল কিন্তু সে সাদা কালারেরটাই কিনেছে , কারণ খরগোশ তো সাদা রঙেরই হয়,ইত্যাদি , ইত্যাদি।নানান সব কথা বার্তা।
আহিও মনোযোগ সহকারে সবটা শুনছে আর নিজের মতামত দিচ্ছে ।
একটু পর একটা নন ব্র্যান্ডেড লিপস্টিক নিয়ে আহিকে জোর করছে ঠোঁ’টে দেওয়ার জন্য।কিন্তু আহি তো সেটা কিছুতেই দিবে না। এসব ননব্রান্ডেড জিনিসপত্র দিলে ঠোঁ’ট কালো হয়ে যাবে। কিন্তু ,ছোট বোনের সাথে পেরেও উঠছে না।
তাহি একপর্যায়ে নাকে কান্না করতে করতে বলল,
” একটু দেও না আহি আপু। সাথে সাথে মুছে ফেলো। এগুলো তো ডলা দিলেই উঠে যাবে ”
আহি আর কি করবে ? বাধ্য হয়ে লাগাতেই হলো।যেমন ভাই – তেমন বোন, যেটা বলবে সেটা করতেই হবে। যদিও চৌধুরী বংশের প্রায় সবাই ই এমন একরোখা।শুধু কেউ একটু কম আর কেউ একটু বেশি। আহি লিপিস্টিক লাগাতেই তাহিও নিজের ঠোঁ’টে পরে নিলো। তারপর বড় বোনের প্রশংসা করে বলল,
” তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে ”
” তোকেও ” তাহির গাল টেনে দিতে দিতে বললো আহি।
” ভাইয়া সুস্থ থাকলে ওকে দেখাতে যেতাম ।থাকগে সুস্থ হলে তারপর দেখাবো ” বলে জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে চলে গেল তাহি।
আহি সেই সন্ধ্যায় একবার আর রাতে খাবার আগে একবার গিয়ে তূর্যকে দেখে এসেছে। এরপর আর যাওয়া হয়নি। দুইবারেই তূর্য প্রায় অ’বচেতন অবস্থায় ছিল।কোনো কথা বার্তা হয়নি।আহি শুধু তাকে দেখে একটু মাথায় হাত বুলিয়ে চলে এসেছে। তাই এখন আরেকবার তূর্যের রুমে যাবে বলে ঠিক করলো।
আস্তে করে দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করলো আহি। ঘরটা জুড়ে হালকা অন্ধকার ,আবার হালকা আলো। অর্থাৎ, আলো অন্ধকারের মাঝামাঝি পর্যায়।
আহি ভেবেছিল তূর্য বোধ হয় এখনো ঘুমিয়ে আছে।কিন্তু খাটের উপর তাকাতেই দেখলো সে নেই।ওয়াশরুমে পানির শব্দ হচ্ছে ,তারমানে তূর্য ভাই ওয়াশরুমে।সে খাটের উপরে পা ঝুলিয়ে বসে ওয়াশরুমের দরজা পানে তাকিয়ে আছে।মিনিট দুয়েক পর খট করে দরজা খোলার শব্দ হলো।
তূর্য এলোমেলো পায়ে এগিয়ে আসছে। এই বুঝি পড়ে যাবে এমন ভাব।আহি দৌঁড়ে গিয়ে তূর্যকে ধরে ফেললো ।মোক্ষম সময়ে যেতে না পারলে টাল সামলাতে না পেরে হয়তো এতক্ষণে মেঝেতে পড়ে যেত তূর্য।
আহির মতো একটা মেয়ের পক্ষে তূর্যের মতো একটা ব’লিষ্ঠ দেহের পুরুষের ভার সামাল দেওয়া অনেকটা ক’ষ্টসাধ্য। সে শ’ক্ত করে তূর্যকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে।আর তূর্য দূর্বল হাতে আহির কোমর পেঁচিয়ে ধরে কোনরকমে পড়া হতে নিজেকে রক্ষা করেছে।
তূর্যের মুখ যেয়ে ঠেকেছে আহির ঘাড়ের ভাঁজে।তূর্য থেমে থেমে কয়েকটা দীর্ঘ শ্বাস টেনে জড়ানো কন্ঠে বলল,
” তোর এখানের স্মেইলটা কেমন যেন আহি।ইট ফিলস … ইট ফিলস্ ইনটক্সিকেইটিং!
আর কখনো এত কাছে আসবি না। আ’ম রিকোয়েস্টিং ইউ,হা’র্ট – স্টিইলার ! ”
মানুষের নিঃশ্বাস এমনিতেই উষ্ণ হয় । তার উপর তূর্যের গায়ে এখন জ্বর ।যার কারণে, নিঃশ্বাস আরো কয়েকগুণ বেশি উষ্ণ।ঘাড়ে এমন উষ্ণতা পেয়ে সারা শরীর শিউরে উঠেছে আহির । তূর্যের পিছনের টিশার্ট দুই হাতে শক্ত করে খাঁমচে ধরেছে সে। হৃৎপিণ্ড অস্বাভাবিক রকমে লাফাচ্ছে। এমনিতেই তূর্যের জড়ানো কন্ঠে বলা কথা বোঝা কষ্টসাধ্য।তারউপর সে এখন অনুভূতির জোয়ারে ভাসছে।
আহি কাপাকাপা কন্ঠে বললো,
” একটু পরিষ্কার করে বলুন তূর্য ভাই আমি বুঝছি না। দুর্বল লাগছে? খুব খারাপ ফিল হচ্ছে ?”
“হুঁ !সেদিন ছাদের মতো ফিল হচ্ছে !” বলে জোরে আহির কোমর খামচে ধরে পুরোপুরি নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো।
আহি চোখ খিঁচে বন্ধ করে শুধালো,
“কো..কোন দিন ?”
” কোনোদিন না! ছেড়ে দে আমাকে ”
” ছেড়ে দিলে তো পড়ে যাবেন । ” বলে আস্তে আস্তে পায়ে পায়ে তূর্যকে নিয়ে বিছানার দিকে এগোতে লাগলো আহি। বিছানার কাছে এসে তূর্যকে শুইয়ে গায়ে কম্বল টেনে দিয়ে চুলের ভিতর হাত বোলাতে লাগলো। একটু আগে করা তূর্যের কান্ডের কথা মনে পড়লেই হাসফাস লাগছে তার।
প্রায় ঘন্টা খানেক এভাবে পার হলো।আহির এখন প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে ।আর তূর্যও এতক্ষণে নিশ্চয় ঘুমিয়ে গিয়েছে।এই ভেবে চুলের ভাঁজ থেকে হাত সরিয়ে চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালো আহি। চুলের ভিতর থেকে নরম ,কোমল ,আদুরে হাতটা সরে গিয়েছে বুঝতেই তূর্য বিড়বিড় করে বললো,
” চলে যাচ্ছিস ?”
” আপনি ঘুমনি ? আমি ভেবেছি ঘুমিয়ে গিয়েছেন ”
” আজকের রাতটা থেকে যা আহি। “করুন সুরে আউড়ালো তূর্য। কেন জানি এই সামান্য কথাতেই কেন জানি আহির বুকের ভিতরটা ধ’ড়াস করে উঠলো।
তূর্য ফের বললো,
” খেয়ে ফেলবো না তোকে ,থেকে যা। আর খেলেও বৈধই হবে । তবুও কিচ্ছু করবো না,প্রমিজ! ”
তূর্যের মুখে এহেন কথা শুনে ভ্রু কুঁচকালো আহি। জ্বরের ঘোরে কিসব উলোপালটা কথা বলছেন তূর্য ভাই।মানুষ নে’শা করলে উল্টো বকে আর তূর্য ভাই অসুস্থতায় বকছেন। সে কি একটু বাজিয়ে দেখবে? কোনো ভাবে মনের মধ্যে লুকিয়ে রাখা কথা বের করা যায় কিনা। ভেবেই ফের তূর্যের পাশে বসে পড়লো।প্রশ্ন করলো,
” কিভাবে বৈধ হলাম ? হুম?”
একটু বাদে ভাঙা গলায় ছিঁড়ে ছিঁড়ে উত্তর আসলো,
” মনে নেয় তোর? কয়েক মাস আগে তুইও কবুল বললি আমিও বললাম ”
মনে করার চেষ্টা করলো আহি । হ্যাঁ! মজার ছলে বলেছিল।কিন্তু ওটা তো সিরিয়াস বিষয় না। সেটা তো একপ্রকার খেলা বলা যায়।
সেটা তূর্য ভাই সিরিয়াসলি নিয়েছেন?তাছাড়া বিয়েতে তো সাক্ষীও দরকার হয় । কবুল বললেই বিয়ে হয়ে যায় নাকি? আহি বললো,
” কিন্তু কোনো সাক্ষী ছিল না তো ”
” ছিল ”
” শুধু তাহি ছিল।আর বিয়েতে তো দুইজন সাক্ষী লাগে”
” আর তাহির টেডি বিয়ার ছিল”
তূর্যের কথায় ফিক করে হেসে দিলো আহি।
তূর্য ভাইয়ের জ্বর এসে উনি সত্যিই পা’গল হয়ে গিয়েছেন। একটা জড় বস্তুকে সাক্ষী বানিয়ে দিলেন?
কিন্তু হুসে ফিরলে এসব কিছুই মানবেন না।যখন সে এসব বলবে এক গাদা ধ’মক দিয়ে মুখ বন্ধ করিয়ে রাখবে।
একটা বুদ্ধি মাথায় এলো তার।সাথে সাথে মোবাইল বের করে রেকর্ড করা শুরু করলো।এরপর যা বলবে সব রেকর্ড হবে।আর পরে সেটা শুনাবে। কততে বিশ্বাস করবেন না?ভালোবাসি বলে দিলে তো তাড়াতাড়ি বিয়ে সাদি করে একটা সুন্দর সংসার সাজাতে পারে তারা।
আহি রেকর্ডিং অন করেছে অনেকক্ষণ হয়েছে কিন্তু তূর্য এখন আর আবোল তাবোল ব’কছে না। যেন মুখের মধ্যে কু’লুপ এঁটেছে।কোনো কথা বলছে না।
আহি এবার খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
” আপনিও আমাকে ভালোবাসেন । তাই না তূর্য ভাই?”কিছুক্ষন পার হলেও কোনো উত্তর আসলো না দেখে আহি ফের বললো,
” তাই না ?” এবারও কোনো উত্তর আসলো না।সে নাকের কাছে হাত দিয়ে দেখলো তূর্যের নিঃশ্বাস ঘন আর ভারি হয়ে এসেছে।তারমানে ঘুমিয়ে গেছেন তিনি। আহি একটা দী’র্ঘশ্বাস ছেড়ে মোবাইল রেকর্ডিং বন্ধ করলো।
আর বিড়বিড় করে বললো,
” জাতে মা’তাল তালে ঠিক ”
ভোরের আলো ফুটতেই পাখির কিচিরমিচির ডাক আর রাস্তার গাড়ি ঘোড়ার হর্ন কানে আসতে আরম্ভ করেছে। উপুড় হয়ে ঘুমিয়ে আছে তূর্য। আপাতত গায়ে একটা ট্রাউজার ছাড়া কোনো কিছু নেই। জ্ব’রটা বোধ হয় পড়েছে। যদিও মাথাটা এখনো ভারি ভারি মনে হচ্ছে।
ঘুমটাও প্রায় কাঁচা হয়ে এসেছে ।সে অন্য পাশ ফিরে ঘুমানোর জন্য নড়াচড়া দিতেই পায়ের কাছে কিছু আছে বলে মনে হলো। ভারি ভারি লাগছে।পরখ করে দেখার জন্য নিজ ইচ্ছার পা দ্বারা আরো কয়েকবার খোঁচা দিতেই সম্মতি ফিরলো তার।তার যতদূর মনে পড়ছে কাল রাতে আহি এসেছিল। তাহলে সে কি এখানেই ঘুমিয়ে গেল ? সেকেন্ডের মধ্যে কথাগুলো মস্তিকে নাড়া দিতেই দ্রুত উঠে বসলো সে।যা ভেবেছে তাই।এভাবে পায়ের কাছে মনের আনন্দে ঘুমিয়ে আছে স্টু’পিডটা। আহির মুখের দিকে নজর যেতেই দেখতে পেল ওর ঠোঁটের চারিপাশে লিপিস্টিক লেগে আছে। ভ্রু কুঁচকালো তূর্য।
চোখ বন্ধ করে কালকের সব ঘটনা ভাবার চেষ্টা করলো। কিন্তু আহির রুমে আসার ঘটনা ব্যতীত কিছুই মনে পড়ছে না তার।বাকি সব কতটুকু মনে আছে, কতটুকু নেই, সে নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না।সামনে তাকিয়ে মেয়েটার শান্ত নিদ্রামগ্ন মুখটা দেখেই বুকের ভেতর কেমন জানি একটা অজানা আতঙ্ক দোলা দিল।মনের ভেতর হাজারটা প্রশ্নটা যেন ঝড়ের মতো ঘুরতে লাগল।
সে একবার নিজের দিকে আরেকবার আহির দিকে দেখতে লাগলো। জ্বরের মধ্যে উল্টো পাল্টা কিছু করে ফেলেনি তো? সে এভাবে উদাম গায়েই বা শুয়ে আছে কেন? গলাটা শুকিয়ে কাঠ, ঠোঁট কামড়ে ধরেছে হয়তো নিজের ভেতরের কাঁপুনিটা চেপে রাখতে। হাত দুটো কাঁপছে অজান্তেই। শক্ত করে বিছানার চাদরটা চেপে রেখেছে । চোখে কেমন এক অস্থিরতা, মনে এক অনবরত আলোড়ন।
যেহেতু আহির লিপস্টিক লেপ্টে আছে সে যদি কিছু করে থাকে তার গায়েও তো থাকার কথা। ভেবেই দ্রুত ড্রেসিং টেবিলের সামনে গেল সে। নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো। না,সেরকম কিছুই নেই। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো তূর্য। মনের স’ন্দেহ পুরোপুরি কাটাতে বিছানার এককোনে পড়ে থাকা টিশার্টও দেখতে আরম্ভ করলো। দেখেই একরাশ ভয় চেপে ধরলো বুকটায়।চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে আউড়ালো ,
” ওহ গড,লিপস্টিক ! ”
এরপর দ্রুত টি শার্টটা আলমারির ভিতরে লুকিয়ে রাখলো। একটা ভয়, একটা অনিশ্চয়তা বুকের ভেতর জমাট বাঁধছে। তারপর নিজেকে সান্ত্বনা দিলো,যা হয়েছে হয়েছে। সে তো আহিকে বিয়েই করবে। বাট এই মুহূর্তে কিভাবে কি? আহি বাড়ির সবাইকে বলে দিলে কী হবে? এতো বড় ভুল কিভাবে করলো সে? অথচ, এই ব’জ্জাতি ঘটনার কোনো সিঙ্গেল মোমেন্ট পর্যন্ত তার মনে পড়ছে না। আহির তো নিশ্চই সব মনে থাকবে। যে করেই হোক সব প্রমাণ লোপাট করতে হবে।এই ভেবে সে একটা টিস্যু নিয়ে আহির পাশে গিয়ে মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসলো। মুখের উপর এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকা চুলগুলো আলতো হাতে কানে গুঁজে দিয়ে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে একটা শুকনো ঢোক গিললো সে। আশ্চর্য জনক ভাবে আহির কাছে গিয়ে যেন একটু আগে করা ভাবনা চিন্তা খেয়ে বসলো। ঠোঁট জোড়া খুব বাজে ভাবে আ’কৃষ্ট করছে তাকে।হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে নিজেকে সামাল দিয়ে লিপস্টিক মুছতে আরম্ভ করলো।
একপর্যায়ে আহির দিকে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থেকে গাইতে আরম্ভ করলো,
” কিয়্যু হার সুবাহ তু
মেরি সাঁসোঁ মে সামায়ে না
আজা না তু মেরে পাস,
দূঙ্গা ইতনা পেয়ার মে
কিতনি রাত গুজারি হ্যায়,
তেরে ইন্তেজার ম্যায়
কেইসে বাতাউ জাজবাত ইয়ে মেরে
ম্যায়নে খুদ সে ভি জ্যায়াদা
তুঝে চাহা হ্যায় ”
লিপস্টিক মোছা শেষে আরো কয়েক মুহূর্ত তার ঘুমন্ত প্রেয়সীর আদুরে মুখ পানে চেয়ে থাকলো।আর বিড়বিড় করে আউড়াল,
” এত কিছু করে ফেললাম অথচ তোর শরীরে কোনো প্রুভ রাখিনি? আদেও কিছু করেছি তো? আ’ম নট দ্যাট মাচ অব আ সেইন্ট ”
বলে আহির আধবোচা নাকের সাথে নিজের সরু নাকটা কয়েকটা ডলা দিয়ে মুচকি হাসলো তূর্য।তারপর আহির মাথার নিচে একটা বালিশ রেখে ওয়াশরুমে চলে গেল। আহি ঘুম থেকে উঠে তাকে এই অবস্থায় দেখলে বেকায়দায় পড়ে যাবে।যার কারণে আর দেরি করলো না।
মিনিট কয়েক পর ফ্রেশ হয়ে বেরোলো সে। কয়েকবার আড় চোখে চেয়ে আহিকে দেখে নিলো।এখনো ঘুমিয়ে আছে।
তূর্য সব সময় শব্দহীন ,নিরিবিলি কাজ পছন্দ করে।আর নিজেও সেভাবেই কাজ কর্ম করে। কিন্তু আজ একটু জোরে জোরেই কাজ করছে। আলমারি শব্দ করে খুলেছে আবার শব্দ করেই লাগিয়েছে। চুলে চিরুনি করে সেটাও শব্দ করে ড্রেসিং টেবিলের উপর রেখেছে। উদ্দেশ্য এই শব্দে যদি আহির ঘুম ভাঙে। নিজের ডেকে তুলতে মায়া লাগছে। তূর্য আশ্চর্য হলো নিজের উপর, সেও কি আহির মতো ছেলে মানুষ হয়ে যাচ্ছে নাকি? ডেকে ঘুম ভাঙাচ্ছে না ,আবার ঘুম থেকে তোলার যাবতীয় টেকনিক অ্যাপ্লাই করে যাচ্ছে। আবার একটু আগেও কিসব ভাবনা – চিন্তা করলো। যদি কোনো অপরাধ করেও থাকে সেটা ঢাকার জন্য কিসব চিন্তা ভাবনা করে ফেলেছে।
কাজ করলো তূর্যের বুদ্ধি। আহি ওড়া মোড়া ভেঙে ঘুম থেকে জাগলো।প্রথমে এদিক ওদিক তাকিয়ে হকচকিয়ে উঠলো। এটা তো তার রুম নয়।তারপর মনে পড়লো সে তো কাল রাতে তূর্যের রুমে এসেছে তখনই বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছে।আহিকে উঠতে দেখে তূর্য গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
” কাল রাতে কিছু হয়েছে?”
প্রশ্নটা করে সে মনেমনে হাজারবার আল্লাহকে বলছিল যেন উত্তরটা না আসে।কিন্তু সেটা হলো না ।আহি উত্তর দিলো,
” হুঁ! ”
তূর্য ফের জিজ্ঞেস করলো,
” কী হয়েছে?”
” হয়েছে তো অনেক কিছু ।কিন্তু আপনাকে বললে তো মানবেন না ”
” ঢং না করে বল ” তূর্যের নিজের কার্যকলাপ দেখে তার নিজেরই একটা কথা বারবার মাথায় আসছে ‘ চো’রের মায়ের বড় গলা ‘
” কাল আপনি আমাকে রুমে জোর করে রেখে দিয়েছিলেন”
” দ্যান ?”
” তারপর … তারপর, আপনি আমাকে …..”এইটুকু বলে থেমে গেল আহি। তূর্য অধৈর্য হয়ে বললো,
” স্পিক আপ,আহি! ”
” কী কী যেন বলেছিলেন ভালো করে শুনতে পাইনি।কিন্তু একটা কথা শুনেছি ”
” শুধু বলেছিলাম? কী বলেছিলাম?”
” হার্ট স্টিইলার বলেছিলেন ”
” কিছু করিনি তো?” বিচলিত হয়ে কথাটা বলেই নিজেকে মনে মনে কয়েকটা ধ’মক দিয়ে, কথা ঘোরাতে তূর্য ফের বলল,
” আই মিন ,তোকে মে’রে বসিনি তো ? ”
আহির মুখে দুষ্টু হাসি।ঘনঘন দুই ভ্রু নাচাতে নাচাতে বলল,
” ওসব বাদ দিন। হার্ট – স্টিইলার কেনো বলেছিলেন? আমি আপনার হৃদয়হরিণী ? ”
” একটু ভুল শুনেছিস ,হার্ট – রিপেলর বলেছিলাম মেই বি! ”
” মোটেও কথা ঘুরাবেন না তূর্য ভাই ”
যা বলেছে তো বলে ফেলেছে।এখন আর ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলেও লাভ নেই।ওই মেয়ের মাথায় যেটা ঢুকেছে সেটা আর বের হবে না।আল্লাহর অ’শেষ রহমত কিছু করে বসেনি। এখন যেকোনো উপায়ে রুম থেকে তাড়াতে পারলে হয়।
” হে’ডেক হচ্ছে ।যা এখন ”
আহিরও ফ্রেশ হতে হবে। তাই আর কথা প্যাঁচালো না সে।তাছাড়া তূর্য এখন যেভাবেই কথা ঘোরানোর চেষ্টা করুক না কেন ,সে তো মানবে না। হার্ট – স্টিইলার না হয় ভুল শুনেছে।কিন্তু ওই যে বিয়ের কথা বলেছিলেন! সেটা তো স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে। ওনার মনের মধ্যে যদি কিছু না ই থাকবে তাহলে ওসব বলবেন কেন?
মনে মনে আরো হাজার কথা ভাবতে ভাবতে চলে যাচ্ছিলো আহি।তারমধ্যে তূর্য আবার পিছু ডাকলো তাকে। বললো,
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৬
” আমার টিশার্টে লিপস্টিকের দাগ কেন ?”
এই প্রথম বারের মতো তূর্যের গলায় ইতঃস্তত ভাব। খুব নার্ভাসনেসের সাথে কথাটা বললো। পিছু ফিরল আহি।
অল্প কিছুক্ষণের ভাবনা সেরে বললো,
” কাল পড়ে যেতে নিয়েছিলেন।জানে বাঁচিয়েছি আমি। ”
” লিপস্টিকের দাগের কথা বলেছি !”
” আরে ভাই! কথা শেষ করতে দিবেন তো? আমার ঠোঁটে লিপস্টিক ছিল সেটা লেগে গিয়েছিল মনে হয় ”
” রাতের বেলায় পে’ত্নী সেজে ঘুরিস?”
” পে’ত্নী ,পে’ত্নী করছেন না ? এই পে’ত্নীই একদিন আপনার ঘাড়ে উঠে নাচানাচি করবে ” বলে চলে গেল আহি।আহি যেতেই তূর্য বিড়বিড় করলো,
” আই উইশ, সেই দিনটা খুব শিঘ্রই আসুক ”
