Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৮

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৮

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৮
ইনান হাওলাদার

চৌধুরী পরিবারের পারিবারিক টুকিটাকি রো’গের ডাক্তার তূর্য । টুকিটাকি বলতে জ্ব’র – জারি, হাঁ’চি – কা’শি,স’র্দি বা ঠান্ডা লাগা , কারো প্রেসার আপ – ডাউন ,এই আর কি। যেহেতু সে হা’র্ট বিশেষজ্ঞ , তাই সে হা’র্টের বিষয়েই পারদর্শী।অন্যান্য জটিল রো’গের জন্য আলাদা ডাক্তার দেখানো হয়।যদিও আল্লাহর রহমতে চৌধুরী পরিবারের সদস্যদের তেমন কোনো জটিল রো’গ নেই।আগে পরেও ছিল না।বাড়ির বড় কর্তা,আকবর চৌধুরী একটু স’মস্যা আছে,বেশি চিন্তা ভাবনা বা হাই’পার হলেই প্রেসার বেড়ে মা’রাত্মক অবস্থা হয়ে যায়। এজন্যে ব্যবসায়ী কাজকর্মেও যতটা সম্ভব তাকে রি’ল্যাক্স রাখার চে’ষ্টা করেন আসলাম চৌধুরী।
একটু আগে একজন ডাক্তার এসে তূর্যকে দেখে গিয়েছেন। আকবর চৌধুরী সেই ডাক্তারকে নিজেদের বাড়ির গাড়িতে উঠিয়ে ড্রাইভার রহিমকে পৌঁছে দিতে বলে ডাইনিং রুমের সোফায় বসে হা’ক – ডাক ছাড়লেন ,

” শোন সবাই, এদিকে এসো ” আসলাম চৌধুরী আর আসিফ চৌধুরী কিসব বিষয় নিয়ে কথা বলছিলেন। বড় ভাইয়ের কথা শুনে তারা সেদিকে মনোযোগী হলেন।
বাড়ির তিন গিন্নি রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলেন,হাতের কাজ সেরে এগিয়ে আসলেন তারা। শান্ত,প্রান্ত, আহি,তাহি উপরে ছিল আকবর চৌধুরীর ডাক শুনে যে যেখানে ছিল হুড়মুড়িয়ে নিচে নেমে এলো। সবাই এক জায়গায় হতেই আকবর চৌধুরী বললেন,

” তোমরা কি কাল রাতের ঘটনা জানো?”
সবাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আকবর চৌধুরীর দিকে তাকালেন। কি হয়েছে কাল রাতে? আহির খটকা লাগলো। বড় আব্বু কি কোনোভাবে তার আর তূর্যের এক ঘরে থাকার কথা বলছেন?আহি বেজায় খুশি ,গ্রামাঞ্চলে তো প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে মেয়েদের এক রুমে দেখলে বিয়ে দিয়ে দেয়। তাহলে বড় আব্বু কি তাদের এক রুমে দেখে নিয়েছেন? আর এখন সেটা বলতে চাচ্ছেন?তাদের বিয়ে দিয়ে দিবে? এমন কিছু হলে তো খুব ভালো হবে। একদিকে একজনের মনে উৎফুল্লতা অন্যদিকে তূর্য ড্রয়িং রুমে আসার উদ্দেশ্যে মাত্র কয়েকটা সিঁড়ি ভেঙেছিল। আকবর চৌধুরীর কথা শুনে সেখানেই থেমে গিয়েছে । ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি কোন দিকে যায় সেটা বোঝার চে’ষ্টায় আছে।
যাকে বলে ,’ চো’রের মন পুলিশ ,পুলিশ ‘
সত্যি হলো আহির ভাবনা তবে সেটা ভিন্ন কায়দায়।আকবর চৌধুরী বললেন,

” আমরা তো সবসময় আহি আর তূর্যকে রা’গা’রা’গি করতেই দেখি। আসলে কিন্তু আমাদের আহি ,তূর্যকে খুব ভালোবাসে। কাল রাত দুইটার দিকে ছেলেটার জ্ব’রের কি অবস্থা দেখার জন্য যেতে গিয়ে দেখি আহি তূর্যের মাথা টিপে দিচ্ছে।তারপর আমি দেখলাম,সেবা করার লোক তো আছেই তাই আর ভেতরে গেলাম না।
একেই বলে ভাই বোনের ভালোবাসা বুঝলে ? ”
” আমি তো তূর্য ভাইকে ভালোই বাসি,বড় আব্বু।কিন্তু তূর্য ভাই তো বাসেন না ” আহি গভীর ভাবে কথাটা বললেও বাকিরা সেটা বুঝলেন তারা স্বাভাবিকভাবে নিয়ে হেসে উড়িয়ে দিলেন। আসিফ চৌধুরীর জরুরী মিটিং আছে , তাই তিনি চলে গেলেন। আকবর চৌধুরী আর আসলাম চৌধুরী ব্যবসায়িক আলাপ – আলোচনায় ব্যস্ত হলেন।
” তুই কি ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য ?” কথাটা বলতে বলতে সিঁড়ি বেঁয়ে নেমে সোফাতে বসলো তূর্য। আহি একটা ভেং’চি কাটলো আর মনে মনে বললো,
” শুধু কাল রাতের কী’র্তিকলাপ একবার বলি মুখ দেখানোর জায়গা পাবেন না ট্রাউজার মশাই ”
লতা বেগম বললেন,

” কে বলেছে তূর্য তোকে ভালোবাসে না? একটা কাহিনী শোন ” সবাই বাড়তি মনোযোগী হলো।
লতা বেগম বলা শুরু করলেন,” তখন তোর বয়স চার বা সাড়ে চার।রাতে তূর্য তোকে নিয়ে যাবে বলে বায়না ধরে।কিন্তু তুই যাবি না। তখন তূর্য কাদোঁ কাঁদো হয়ে তোকে কোলে নিয়ে অ’নুরোধ করতে থাকে , ” আয় না ,আহি । অন্নেক আদর করবো,মোটেও মারবো না। সকাল হলেই চকোলেট কিনে দিব।কিন্তু তুই যাবিনা বলে কান্না কাটি করছিস আর তূর্যের মুখের উপর চ’ড় মারছিস।তারপর মেজো বুবু বলে একটু সুন্দর সুন্দর নামে ডাক চলে যাবে । তখন তূর্য বলে …..”
এইটুকু বলে অট্ট হাসিতে ভেঙে পড়েন লতা বেগম।সাথে বাকিরাও।তূর্য মুখে হাত দিয়ে হাসি আড়াল করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।আর আহি উৎসুক হয়ে পড়ে আছে ছোট মায়ের পরবর্তী কথাটুকু শোনার জন্য। তখন তো আহি ভালোই ছোট তাই এই ঘটনার কিছুই তার স্মৃতিতে নেয়।তাই সে তাড়া দিয়ে বললো,

” তারপর ? বলুন, ছোট মা ” আহির ধারণা তারপর সে তূর্যের নাক বরাবর একটা ব’ক্সিন লাগিয়ে দিয়েছিল। তাই ই এত উৎসাহ তার। কিন্তু তূর্য ভাই ঠোঁ’ট টিপে হাসছেন কেন?
সমীকরণ মেলাতে পারছে না আহি।
লতা বেগম হাসতে হাসতে বলতে লাগলেন,
” তারপর আর কি ! তুই তখন ন্যাড়া ছিলি আর একদম গ্যাদা কালে পায়’খানা করে সেটার ভিতর হাত ঢুকিয়ে দিতি
। তূর্য বলে ‘ আয় না টাক্কু পাখি, প’টি খাওয়া পাখি আমার। প্লিজ আয়….”
” চুপ করুন ছোট মা। আর শুনবো না ” চিৎকার করে বলে ওঠে আহি। এতে যেন সবাই আরো বেশি হেসে ফেলে। তূর্য আড় চোখে চেয়ে আহির কান্ড দেখছে। মুখের হাসি কোনো কায়দায় চেপে রাখলেও চোখ হাসছে তার । মারুফা বেগম বললেন,

” তারপরের কাহিনী বলবি না ছোট ?”
লতা বেগম ফের বলতে শুরু করলেন,
” তারপর তো তুই গেলি। ঘুমিয়েছিসও! এখন সকালে তূর্য ঘুম থেকে উঠেই মেজো বুবুর কাছে এসেছে ।এসে বলছে ,
‘ জানো মেজো মা,রাতে তোমার মেয়ে কি করেছে? মাঝ রাতে আমাকে ঘুম থেকে তুলে বলে , ‘ তুরতো বাই,তুরতো বাই, আমিন এত্তা পা’ত তিবো? ( তূর্য ভাই,তূর্য ভাই,আমি একটা পা’দ দিবো?) ”
আহি আর এক মুহুর্ত দেরি করলো না। এক দৌঁড়ে নিজের রুমে চলে গেল। সুযোগ পেলেই সবাই তাকে ল’জ্জায় ফেলে। ছোটবেলায় কিনা কি করেছে ।এখন সেটা সবার সামনে বলতে হবে? এখন তো সে বড় হয়েছে । সবকিছু বোঝে। লজ্জা পায় না বুঝি?ছোট মা কিভাবে তার স’ম্মানহানি করে দিলেন। এখন তো শান্ত – প্রান্ত তাকে খে’পিয়ে মা’রবে।

আহি আর তারিন বসে আছে শহরের এক কোচিং সেন্টারে।প্রথম প্রথম হওয়ার স্টুডেন্টও খুব বেশি নয়। বিশ থেকে পঁচিশ জন। কোচিংয়ে আজকে আহির প্রথম দিন হলেও তারিনের তৃতীয় দিন। তারিনের মাধ্যমেই মূলত এই কোচিংয়ে ভর্তি হওয়া। সকাল সাড়ে দশটা থেকে পড়া শুরু করার কথা ছিল।সেখানে দশটা পঁয়তাল্লিশ বেজে গিয়েছে।কিন্তু টিচার পড়াতে আসেননি। কিছু ছেলে মেয়ে কোচিংয়ের অন্য ভাইয়াদের কাছে শুনলে তারা বলেছেন ,” ভাইয়া একটু কাজে আটকে গেছেন।আর পাঁচ মিনিট ওয়েট করো তোমরা “ইতোমধ্যে পাঁচ মিনিটের তিন মিনিট পার হয়ে গিয়েছে।আহি বি’রক্ত ভঙ্গিতে বলল,

” ধুর! প্রথম দিনেই যদি ভাইয়া এত লেইট করে আসেন ভালো লাগে বল?”
” তোর এমনিতেও মুড ভালো নেই। কি? তোর তূর্য ভাইয়ের জ্ব’র কমেনি?”
” আরে কমছে। আমি কি সব সময় ওনাকে নিয়ে ভাবি নাকি? আশ্চর্য!”
” তাহলে? আচ্ছা শোন, এই কেমিস্ট্রি ভাইয়াটাও সেই হ্যান্ডসাম রে । আমি তো প্রথম দেখাতেই ফিদা। আআআআ ” নাটকীয় ভঙ্গিমায় বললো তারিন।
” তুই কোথা থেকে দেখলি?”
” ফরম নিতে এসে দেখেছিলাম।তাছাড়া,আমি দুই দিন ক্লাসও করেছি।ভালো পড়ান ,কিন্তু নতুন।আমরাই ওনার ফার্স্ট ব্যাচ।” এইটুকু বলে তারিন আহিকে ইশারা দিয়ে বাইরে দেখিয়ে বলল,”ঐযে ঐযে চলে এসেছেন ” তার কন্ঠে চাপা উ’ত্তেজনা। যুবকটাকে দেখেই আহির চক্ষু চড়ক গাছ। ইনি এখানে কি করে? সে যতদূর জানে মেহেদীদের পারিবারিক ব্যবসা আছে।সে সেটাই দেখাশোনা করে।তাহলে কোচিং সেন্টার কবে খুলে বসলো ? আহির হাবভাব দেখে তারিন বললো,

” তুই চিনিস ওনাকে?
আহি কি বলবে বুঝলো না।দ্বি’ধা দ্ব’ন্দ্বে ভুগতে ভুগতে বললো,
” হ্যাঁ, মানে ওই চিনি।” আর কোনো প্রশ্নের সুযোগ পেল না তারিন। মেহেদী এসেই প্রশ্ন ছুড়লো,
” আজকে নতুন কেউ আছো? থাকলে দাঁড়াও ”
আহিসহ আরো পাঁচ – ছয় জন উঠে দাঁড়ালো। আহিকে দেখে তি’র্যক হাসলো মেহেদী। হয়তো তার আসার অপেক্ষায় দিন গুনছিল সে। এরপর নতুন আর কেও আসুক বা না আসুক তাতে কিচ্ছু যায় আসে না তার। কিচ্ছু না!

” তূর্য ভাই?একটা কথা বলি?” রাতের খাবার খেয়ে শয়ন কক্ষে যাচ্ছিল তূর্য।আহি পিছন থেকে ডেকে কথাটা বলে।
উত্তরটা যে ‘ না ‘ আসবে সেটা সে জানেই।তাই আহি প্রশ্নটা করে করে উত্তরের অপেক্ষা করলো না।উক্ত কথার সাথে কথা জুড়ে বললো,
” আপনি তো সবসময় মানে ছোটকালে চি’পা-চাপায় নিয়েই শুধু মা’রতেন আমাকে দাদু বলতেন। তাহলে সেইদিন রাতে নিয়ে গেছিলেন কেন ?”
” কোনদিন ? ”
” ছোটমা সকালে বললেন যে !”
” তোর স’ম্মানহানি করতে ” সামনে অগ্রসর হতে হতে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিলো তূর্য। আহি জানে তূর্য মি’থ্যা কথা বলছে।তবুও চোখ বড় বড় করে ক’পট আ’র্তনাদ করে বললো,

” কী ,বললেন কী আপনি? কী কী করেছিলেন আমার সাথে?”
” কী করবো তোর সাথে ? ই’ডিয়েট ! “ধমকে বললো তূর্য ।
” সত্যি ? কিছু করেননি তো ? ”
” হ্যাঁ, করেছি ! সব করেছি । হ্যাপি? ”
” করেছেন যখন, এখনো বিয়ে না করে বসে আছেন কেন? তাছাড়া,আপনি এটা কিভাবে করতে পারলেন,তূর্য ভাই?”
” রুমে চল,কিভাবে করেছিলাম দেখাই ” হাঁটতে হাঁটতে নিজের রুমের কাছে চলে এসেছে তূর্য।আহিও একেকটা প্রশ্ন করছে আর তূর্যের পিছুপিছু হাঁটছে।রুমের দরজায় পা থামিয়ে পিছনে ফিরে আহির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কথাটা বলে তূর্য।
” চলুন ” তূর্য কথাটা বলার সাথে সাথে উত্তর দেয় আহি। ন্যানো সেকেন্ডের মধ্যে।
তূর্য অ’গ্নিদৃষ্টিতে তাকাতেই দুই ঠোঁ’টের উপর তর্জনী আঙুল ঠেকালো আহি। মানে চুপ, আর কোনো ভ’ন্ডামি কথাবার্তা বলবে না সে।বলবে না মানে বলবে না।
আর মনেমনে বললো,” আপনি কত দিন শাক দিয়ে মাছ ঢেকে রাখেন আমি দেখবো, জনাব তাশরীক চৌধুরী তূর্য ”

নিজ চেম্বারে বসে আছে আয়রা।কয়েক মিনিট হয়েছে হাসপাতালে এসেছে সে।আধ ঘন্টা পর থেকেই রোগী দেখতে আরম্ভ করবে।আজও তূর্যের জন্য বরাদ্দ চেম্বারের দরজা ব’ন্ধ।তার আর তূর্যের চেম্বার পাশাপাশি হওয়ায় আসার সময়ই নজরে পড়েছে সেটা। এই নিয়ে তিন দিন হাসপাতালে আসে না তূর্য।
তূর্য যে অ’সুস্থ,সেটা তূর্যের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্স থেকে জানতে পেরেছে আয়রা। তূর্যের অ্যাসিস্ট্যান্সকে জিজ্ঞেস করেছিল সে দেখতে যাবে কি না, কিন্তু সে আগেই দেখে এসেছে।তাই আর তার যাওয়া হয়ে ওঠেনি।কয়েকবার করে ভেবেছে একাই চলে যাবে, কিন্তু সা’হস করে ভাবনাটা সফল করে উঠতে পারেনি। তূর্যের দিক থেকে একটু আস্কারা পেলে হয়তো যেতো।
গেইলেই তূর্য স্যার হয়তো বলবেন,” আ’ম ফাইন! দেখতে আসার কোনো দরকার ছিল না ”

অবাক লাগে আয়রার।নিজেদের বাড়িতে সবাই তাকে রূ’ঢ় বলে।সে নাকি মিষ্টি কথা বলতে জানে না। তারা যদি ডক্টর তাশরীক তূর্যকে দেখে কি করবে? বলবে এটা নিশ্চয়ই কোনো য’ন্ত্রমানব।
এই পর্যন্ত তূর্যের হাসি দেখার সৌভাগ্য আয়রার হয়নি। তূর্যের দাঁত কেমন সেটাও হয়তো বলতে পারবে না সে।কথাটা হাস্যকর হলেও সত্য।
কথাও তেমন একটা হয় না।আর যেটুকু যা হয় খুব কম।সে যত চাই কথা পেঁচিয়ে দীর্ঘ করতে, কিভাবে যেন তূর্য খুব ছোট করে দুই তিন শব্দে উত্তর দিয়ে দেয়।পরবর্তীতে সেই কথার পাল্টায় সে আরেকটা কথা বলবে তার কোনো অপশন থাকে না।পৃথিবীতে আর কাউকে পেল না সে ? শেষে এরকম একটা মানুষের উপরই কেনো আকৃষ্ট হলো? হয়তো তূর্যের এমন স্ট্রং পার্সোনালিটিই তাকে মুগ্ধ করেছে।
কিছু সময় অতিক্রম হলো।তারপর আয়রা ভাবলো,

বাড়িতে নাহয় যাওয়া যায় না ,ফোন করে তো খোঁজ – খবর নেওয়া যায়।সে একবার হাতে থাকা ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে নিল।রো’গী দেখতে এখনো দশ মিনিট । কয়েকবার ভেবে-চিন্তে কল করলো তূর্যের মোবাইলে। খুন না’র্ভাস ফিল হচ্ছে।পড়ালেখা,ইন্টার্নির সময় কত প্রেজেন্টেশন দিয়েছে সে , কখনো নিজেকে এরকম নার্ভাস লাগেনি।অথচ একটা কল করেই গলা শুকিয়ে আসছে।এমনকি কলটা এখনো রিসিভও হয়নি। সে সামনে থাকা টেবিল হতে ঢেকে রাখা গ্লাসটা তুলে এক ঢোক পানি পান করে নিলো।পানি গালে দিতেই কল রিসিভ হলো ।সে তড়িঘড়ি করে পানিটুকু গিলে একটা সালাম দিলো। তূর্য সালামের উত্তর দিলো।সে নিজের নার্ভাসনেস ভিতরে চেপে রেখে স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় জিজ্ঞেস করলো,

” এখন শ’রীর কেমন আছে?”
ওপাশের ব্যক্তির রাশ’ভারী কন্ঠস্বর,
” ফাইন ” সৌজন্যতার খাতিরে হলেও তূর্যের একবার জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল ‘ তোমার কি অবস্থা ?” কিন্তু সে করলো না। আয়রা অবশ্য তাতে কিছু মনে করেনি।
সে নিজের ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে বলল,
” আজকে তো চেম্বারে আসার কথা ছিল।আসলেন না তাই ভাবলাম একটা কল করে জানা উচিত ”
” হুম।এনিথিং ইলস্?”
” নো। ” বলেই আবার আয়রা বললো,
” তাহলে কবে থেকে আসছেন?”
” নেক্সট ডে ”
” আচ্ছা।রাখি , স্যার। বাই ” সে তূর্যকে পছন্দ করতে পারে। তাই বলে অন্যসব মেয়েদের মতো নিজের পার্সোনালিটি হারিয়ে ছ্যাঁ’চড়ার মতো পিছনে লেগে থাকবে না। তাই আর কথা বাড়ালো না আয়রা।
” বাই “ছোট্ট করে কথাটা বলে আয়রার আগেই কল কাটলো তূর্য। তূর্য যে তার কথার উত্তরে বাই বলবে আয়রার ধারণার বাইরে ছিল। বিষয় খানা খুব ভালো লাগলো তার। আহামরি কিছুই না তবুও ভালো লাগলো।

টানা এক সপ্তাহ ধরে জ্ব’র আসে – যায় করতে করতে সুস্থ হয়েছে তূর্য। কিন্তু মুখের রুচি এখনো ফেরেনি। ইদানিং জ্ব’রটাই এমন । কোনো ভাবে জ্ব”রের হাত থেকে মুক্তি মিললেও মুখের রুচির সাথে পেরে ওঠা দায়। কম হলেও মুখের স্বাদ মাস খানেকের জন্য ছুটিতে থাকবে। গালে কিছু দিলেই মনে হয় গরুর ঘাস চিবোচ্ছে।
এখন বেলা প্রায় গোধূলি লগ্ন। আকাশ জুড়ে সোনালী আভা ছেয়ে আছে। খুব অপরূপ দৃশ্য।একদম মোবাইল বন্দি করে রাখার মতো। কিন্তু মোবাইল বের করে ফটাফট পিকচার ক্যাপচার করার মতো অভ্যাস, ধৈর্য বা ইচ্ছা কোনোটাই তূর্যের নেই। এমন কি মোবাইলটাও বোধ হয় সাথে নেই। সে ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কফির মগে ধীরে সু’স্থে একের পর এক চু’মুক দিয়ে যাচ্ছে। হয়তো মনে মনে কিছুর হিসাব মেলাচ্ছে।এরমধ্যে আহি একটা মোবাইল এনে তূর্যের দিকে এগিয়ে ধরে বলল,

” তূর্য ভাই? আপনার মোবাইল।বারবার রিং হচ্ছে ।
ডাইনিংয়ে রেখে এসেছিলেন কেন ?”
তূর্য আহির প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে উল্টে নিজে প্রশ্ন করলো,
” আজকে আসতে এতো লেইট হলো কেনো?”
” ব্যাচে গিয়েছিলাম না? তাই! ”
ভার্সিটি,ব্যাচ শেষ করে বাড়ি ফিরতে সাড়ে বারোটা বা একটা বেজে যায় আহির।সেটা তূর্য জানে। কেননা এই টাইমে সেও বাড়িতে ফেরে।সে আসার দশ থেকে পনেরো মিনিট পরই আহি ফেরে বা কোনো দিন তার আগেও ফেরে।কিন্তু আজকে টানা এক ঘন্টা লেইট করে ফিরেছে আহি। তূর্য আর জে’রা না করে গ’ম্ভীর গলায় বলল,

” হোম টিউটরে হচ্ছিলো না?”
” আমার তো হচ্ছিল আপনার চাচির হচ্ছিল না।” আহির কন্ঠে বরাবরের মতো চঞ্চলতা।
কিছুক্ষণ নিরবতা গেল তারপর তূর্য শীতল কন্ঠে বললো,
” নেক্সট ডে থেকে তোকে কোচিং থেকে আমি পিক করবো। গেইটে ওয়েট করবি ”
” কিন্তু আপনার তো উল্টো দিক হবে ”
” সেটা তো তোকে ভাবতে বলিনি। উল্টো – সদর আমি বুঝে নিবো।এখন যা এক কাপ কফি করে আন ”
” হাতে এক কাপ তো আছেই ।আবার কেন?”
” খাবো ”
” আপনি তো পরপর দুই কাপ খান না কখনো ”
” এখন খাবো ”
” কেন ? ”
” আই ফিল লাইক ইট ”
” কেন ইচ্ছে হচ্ছে ?”

“জাস্ট এক কাপ কফি করতে বলেছি তোকে,এতেই কোশ্চেনের পর কোশ্চেন করেই যাচ্ছিস। অথচ, যার তার বার্থডে উপলক্ষে পায়েস রান্না করে খাওয়াচ্ছিস ” ক্ষি’প্ত গতিতে কথাগুলো বলল তূর্য।কন্ঠে চাপা ক্রো’ধ স্পষ্ট। কথাগুলো বলতে বলতে আহির দিকে কয়েক ধাপ এগিয়েও এসেছে সে। ভ’ড়কে গিয়ে কয়েক ধাপ পিছিয়ে গেল আহি।
উৎ’কণ্ঠায় চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলেছে সে। যেভাবে তেড়ে আসছিলো তূর্য সে ভেবেছিল হয়তো মে’রে বসবে। তবে তেমন কিছু ঘটেনি দেখে আস্তে আস্তে চোখ খুললো। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুঠাম দেহের পুরুষের শক্ত মুখাবোয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলো না আহি।চোখ নামিয়ে মাথা নুইয়ে ফেলল সে।ভ’য়ে জড়ানো মৃদু কন্ঠে বললো,

” করে দিচ্ছি কফি ”
তূর্য শীতল, ভারি কন্ঠে বললো,
“নো নিড ”
আহি মৃদু কন্ঠে ফের বলল,
” দিচ্ছি ”
” বলেছি তো, না । যা চোখের সামনে থেকে ” স্বাভাবিক ভাবেই কথাটা বলতে চেয়েছিল তূর্য।কিন্তু নিজেকে সামলাতে না পেরে ফের মে’জাজ হারালো। এবার আহিরও রা’গ হলো। সামান্য একটা বিষয় এতে এত রে’গে যাওয়ার কিছু দেখছে না সে। সেও তূর্যের সাথে সমান তালে গলা করে বলল,
” পায়েস রান্না করেছি তো কি হয়েছে? আর দুধ, চাল ,চিনি ,বাদাম আপনার টাকা দিয়েও কেনা না।তাহলে এত গায়ে লাগছে কেন?”

আহির ব্যবহারে অনেকটা অবাক হলো তূর্য। এই প্রথম বারের মতো এভাবে কথা বলল আহি।সাধারণত ব’কাবকি করলে মন খা’রাপ করে রাখে বা কান্না করে দেয়।কয়েকদিন না হয় কথাই বললো না,দেখা হলে কয়েকটা ঠে’স মে’রে কথা বললো।কিন্তু এভাবে প্র’তিবাদ কখনোই করে না।তূর্যের আরো রে’গে যাওয়ার কথা ছিল।কিন্তু সে রা’গলো না। ভালো লাগা কাজ করলো। বুদ্ধি হচ্ছে আহির।পার্সোনালি বলে একটা জিনিস আসছে তার মধ্যে। ব্যাপারটা ম’ন্দ নয়।
তূর্য বুঝলো, ভবিষ্যতে অনেক মান – অ’ভিমানের সম্মুখীন হতে হবে। যদিও প্রিয়জনের রা’গ – অ’ভিমান ভা’ঙ্গানোর বিষয়টা বেশ রো’মান্টিক। কিন্তু পায়েসের কথা মাথায় আসলেই মে’জাজ আপনা – আপনি খা’রাপ হয়ে যাচ্ছে।এটাকে কি জে’লাসি বলে? হয়তো সেটাই! কিন্তু তূর্য মানলো না।তার মতে এটা জে’লাস – টেলাস কিচ্ছু না।
অযথা এত লুতুপুতু করার কোনো দরকার নেই।পড়তে যায় পড়ে চলে আসবে।
সকল চিন্তা একপাশে রেখে সে নিজের সঠতা বজায় রেখে ধা’রালো কন্ঠে বললো ,

” যেতে বলেছি তোকে ”
পুনরায় কন্ঠে আগের মতো তে’জ নিয়ে আহি বললো,
” যাবো না আমি।ছাদ আপনার নামে দলিল করা না যে আপনি বললেই চলে যাবো ”
বলেই আবার গটগট করে ছাদ থেকে চলে গেল সে।
” ছাদ দলিল করা নেই। বাট এ্যাজ সুন এ্যাজ পসিবল তোকে দলিল করে নিবো।” যদিও আহি শুনতে পেল না তূর্যের কথা।
পায়েস রান্নার খবর তূর্য কোথা থেকে পেয়েছে জানে না আহি ।সে যে লু’কিয়ে চু’রিয়ে করেছে এমনও না।
তবে সে তূর্যকে এমনিতেই প্রশ্নগুলো করছিল।
তূর্য কোনো সময়ই একের পর এক প্রশ্নের উত্তর দেয় না।সব কথার মাঝখানে থেকে থেমে যায় অথবা কঠিন কিছু বলে, যার আগা – মাথা কিছুই বোঝে না সে।এখন খুব সুন্দর করে উত্তর দিচ্ছিল তাই আহি আগ্রহী হয়েই একের পর এক প্রশ্ন করছিল। হঠাৎই তূর্য এভাবে রে’গে যাবে বোঝেনি সে।

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৭

সব সময় তূর্য ভাই ব’কবেন। মে’হেদী তার টিচার ,সবাই কিছু না কিছু নিয়ে গেছে।সে কি জন্মদিনে খালি হাতে যাবে নাকি? টিচার যেমন তেমন আত্মীয়ও তো হয়। এই পায়েসের কথা উঠাতেই আরেক কাপ কফি খেতে চেয়েছিল তূর্য।বেশ বুঝতে পারলো আহি। সব সময় তাকে ব’কাবকির জন্য ছুতো খুঁজবে। আর জীবনেও কথা বলবে না সে তূর্যের সাথে। অনেক বে’হায়া হয়েছে । কিন্তু আর না। তবে তূর্য ভাই যদি এসে স্য’রি বলেন তাহলে আলাদা বিষয়। কিন্তু,আদেও বলবেন তো? ম’রে গেলেও না ।

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ২৯