শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১০
রুহানিয়া ইমরোজ
বিলাসবহুল এপার্টমেন্টের রাজকীয় ফ্ল্যাটে অবস্থান করছে প্রিমা এবং মেহরিমা। বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার নামে চৌধুরী নিবাসের সামনে নামিয়ে দিয়ে যাওয়া হয়েছে তাদের। প্রিমা যখন অবাক কন্ঠে আরশিয়ান এর ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করেছিল,
–” এটা কার বাসা? কেনো এনেছেন আমাদের এখানে?
তখন জবাবে আবির্ভাব বলেছিল,
–” স্যারের নির্দেশ ম্যাডাম। উনি আপনাকে এখানেই নিয়ে আসতে বলেছেন৷
প্রিমা এতটাই ক্লান্ত ছিলো যে আর তর্কে যায়নি। তার উপর মেহরিমা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল৷ এজন্যই কথা না বাড়িয়ে মেহরিমা কে নিয়ে ফ্ল্যাটে চলে আসে প্রিমা।
ফ্ল্যাটটা তিন কামরার। বেশ ছিমছাম এবং গোছানো। সর্বত্র দামী আসবাবপত্রে ঠাঁসা। ফ্ল্যাটটা দশ তালার উপরে হওয়ায় বেলকনি থেকে পুরো শহর দেখা যায়৷ প্রিমা অতো ঘুরে দেখেনি, ফ্ল্যাটে এসে সোজাসুজি একটা রুমে ঢুকে। মেহরিমা তো সরাসরি বেডের উপর হামলে পড়ে। প্রিমাও তাকে বুকে টেনে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
সকালবেলা দরজা ধাক্কানোর শব্দে ঘুম ভেঙে যায় প্রিমার। চোখ মেলে তাকাতেই দেখে বেডের এক কার্ণিশে শুয়ে আছে সে। জ্বরপীড়িত মেহু পুরো বেড জুড়ে হাত-পা মেলে শুয়ে আছে।
মেহরিমার সেবা করতে গিয়ে রাতের দিকে তেমন একটা ঘুম হয়নি তার৷ ঘুমিয়েছে প্রায় ফজরের পর তাই সকাল বেলা হাঁকডাক শুনে মেজাজ খিঁচড়ে যায় প্রিমার। মনে মনে ভাবে নিশ্চয়ই সেই মেইডটা ডাকছে।
গতকাল ফ্ল্যাটে ঢুকতেই একজন মেইড তাদের শুভেচ্ছা জানায় এবং বলে,
–” ম্যাডাম? খাবারের ব্যবস্থা করি?
প্রিমা সরাসরি সেই প্রস্তাব নাকচ করেছিল। এখন তো প্রায় ভালোই সকাল এজন্যই বুঝি নাস্তার জন্য ডাকতে এসেছে। প্রিমা বিগড়ানো মেজাজ নিয়ে ওভাবেই উঠে দরজা খুলে।
দরজা খুলতেই আরেক দফা ধাক্কা খায় প্রিমা বেচারি কারণ দরজার ওপাশে মেইড নয় বরং তার অন এন্ড অনলি পার্সোনাল ম্যান দাঁড়িয়ে আছে। আরশিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকায় প্রিমার দিকে। মেয়েটার চোখমুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে সবে ঘুম থেকে উঠেছে। সমস্যা সেটা নয় সমস্যা হলো, প্রিমার পরনে রয়েছে একটা পাতলা টিশার্ট এবং প্লাজো। বুকে ওড়না নেই।
আরশিয়ান তৎক্ষনাৎ প্রিমার কোমর ধরে তাকে ঠেলেঠুলে রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। আকস্মিক ওমন কান্ডে চমকে উঠে আরশিয়ানের চওড়া বুকের সাথে ধাক্কা খায় প্রিমা।
কোমরে আরশিয়ান হিমশীতল হাতের স্পর্শ পেয়ে শিউরে উঠে রীতিমতো। অস্ফুটস্বরে বলে,
–” ক্ কী করছেন?
আরশিয়ান বেহায়া নজরে বউয়ের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
–” তাজরিয়ান এসেছে আমার সাথে। আমি চাই না আপনি ওর সামনে এমন অপ্রস্তুত অবস্থায় যান।
প্রিমা হকচকিয়ে উঠে আরশিয়ানের থেকে দূরে সরে যেতে চায় কিন্তু আরশিয়ান ছাড়ে না। প্রিমার থুতনি ধরে মুখটা উঁচু করে বলে,
–” আমার দিকে তাকান প্রেম।
” প্রেম ” ডাকটা শুনে চট করে আরশিয়ানের চোখের দিকে তাকায় প্রিমা। তার চোখেমুখে বিস্ময়। এই ডাকটা আগেও শুনেছে আরশিয়ানের মুখে তবে এতটা আকর্ষণীয় লাগেনি কখনো।
আজ ক্ষণে ক্ষণে শিউরে উঠছে প্রিমা। আরশিয়ান টের পায় বউয়ের অস্বস্তি কিন্তু আজ ছেড়ে দেওয়ার মুড নেই তার। গতকালের মেসেজটার বদলা নিতে হাত নিশপিশ করছে। মন চাইছে মেয়েটাকে ধরে বেঁধে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে চিল্লিয়ে বলতে,
–” আপনাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য সম্পর্কে বাঁধিনি প্রেম। না তো বৈধ অধিকার ফলানোর জন্য বিয়ে করেছি। আপনাকে নিজের নামে দখল করেছি……. তৃষ্ণা মিটিয়ে দেখার জন্য। আলতো করে বুকে টেনে নিয়ে সমস্ত যন্ত্রণা ভুলে যেতে। ব্যস, আর কিছু না…
আরশিয়ানের ঠোঁট কাঁপে কিন্তু কথা বেরোয় না। প্রিমা ওভাবে থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠে। শানের বুকে আলতো করে ধাক্কা দিয়ে বলে,
–” ছাড়ুন আমায়। ওড়না..
আরশিয়ান অপলকভাবে চেয়ে থেকে ঠান্ডা গলায় বলে,
–” পর্দা পরপুরুষের জন্য বাঞ্ছনীয়। আমার সামনে নয়।
প্রিমা গুটিয়ে যায়। চোখ নামিয়ে ধীর কন্ঠে বলে,
–” মেহু উঠে যাবে..
আরশিয়ান একপলক বেঘোরে ঘুমাতে থাকা মেহরিমার পানে চেয়ে প্রিমাকে আরেকটু কাছে টেনে বলে,
–” আপনি শান্ত থাকলে সে টেরও পাবে না..
লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে যায় প্রিমা। সে ভদ্রলোক ভেবেছিল আরশিয়ানকে। মনে মনে নিজেকে গালি দিয়ে বলে,
–” লানত তোর ভাবনায়।
দু’জন ওভাবেই নৈঃশব্দে একে-অপরকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। আচমকা মিনিট দুয়েকের মাথায় কারও পায়ের শব্দ পাওয়া যায়৷ আরশিয়ান চোখের পলকে সামান্য ঝুঁকে বেড সাইডে থাকা শিফনের ওড়নাটা প্রিমার মাথায় জড়িয়ে দিয়ে আঁচলটা কাঁধে তুলে দেয়।
প্রিমা বিস্মিত হয় খানিকটা। আরশিয়ান সেসব এর তোয়াক্কা না করে প্রিমার কপালে পড়ে থাকা চুল গুলো কানে গুঁজে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,
–” কন্ট্র্যাক্ট যেহেতু আমি করেছি সেহেতু ওটার দায় ভার আমার৷ আপনাকে শর্ত নিয়ে মাথাব্যথা করতে হবে না। এলার্মের মতো রিমাইন্ডার ও দিতে হবে না। পাক্কা বিজনেসম্যান আমি। লসের ভীড় থেকে নিজের লাভটা ঠিকঠাক বুঝে নিতে জানি।
আরশিয়ান কথাটা শেষ করা মাত্রই দরজায় টোকা পড়ে। প্রিমা চমকে উঠে। আরশিয়ান তার পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে কটাক্ষ করে বলে,
–” সামান্য স্পর্শে ঘোরের মাঝে ডুবে যাওয়া মানুষ আবার মেসেজ পাঠায়,কোথায় আসতে হবে জানিয়ে দিয়েন স্যার। আপনি আদৌ জানেন দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক বিবাহিত ছেলেমেয়ে এক কামরায় গেলে ঠিক কোন কোন পর্যায় অতিক্রম করে?
প্রিমা স্তব্ধ হয়ে যায়৷ সাতসকালে উঠে এসব দেখতে হবে সেটা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি । জানলে হয়তো দরজায় খুলতো না। এসবের মাঝে আবারও টোকা পড়ে দরজায়৷ এবার প্রিমাকে ছেড়ে দূরে সরে আরশিয়ান। এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে।
দরজা খুলতেই তাজরিয়ানের বিরক্তি মাখা দৃষ্টিতে তাকায় ভাইয়ের দিকে। চোখমুখ কুঁচকে বলে,
–” একজন প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের ঘরে ঢুকে দরজা এঁটে দিয়ে কী করছিলে তুমি?
আরশিয়ান হকচকিয়ে যায় তাজরিয়ানের প্রশ্নে৷ চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে বলে,
–” দরজা অটোমেটিক লক হয়ে গিয়েছিলো৷
তাজরিয়ান বুঝদারের মতো মাথা নাড়িয়ে সরল কন্ঠে বলল,
–” বুঝলাম।
আরশিয়ান ভ্রু কুঁচকে শুধাল,
–” কী বুঝলি?
তাজরিয়ান আঁড়চোখে স্তম্ভিত প্রিমাকে দেখে বাঁকা হেসে বলল,
–” ব্লুটুথ যেনো ডিভাইসের সাথে কানেক্ট হতে পারে তাই শরম পেয়ে দরজা একাই লক হয়েছিল। এখন ডাটা শেয়ার করা শেষ তাই অটোমেটিক আনলক হয়ে গেছে দরজা।
আরশিয়ান বুঝেছে তাজরিয়ানের ইঙ্গিত কিন্তু এখন কথা বাড়ানো বিপদজনক হতে পারে বিধায় দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
–” যা বলেছি দ্রুত সেটা করে বের হ।
তাজরিয়ান বুঝল ভাইয়ের মেজাজ তাই ঘরে ঢুকে বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল। ওখানে দাঁড়াতেই তার চোখ পড়ল মেহরিমার উপর।
মেয়েটা কম্বল মুড়ি দিয়ে উল্টা পাশ ফিরে মরার মতো ঘুমাচ্ছে। তার ভারিক্কি শ্বাস বাড়ি খাচ্ছে তাজরিয়ানের কানে। ঠান্ডা লেগেছে বোধহয় মেয়েটার। এজন্যই এমন শোঁ শোঁ আওয়াজ করে নাক ডাকছে। বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে যায় তাজরিয়ানের। বিড়বিড়িয়ে বলে,
–” নাক টিপলে দুধ পড়বে ওমন মেয়েকে চুমু খাওয়ার জন্য নাকি স্যরি বলতে হবে। ছ্যাহ্.. নীতির কী ছিরি।
[ অনুগ্রহ পূর্বক যথাযথ রেসপন্স করবেন। এক বাক্যের হলেও একটা মন্তব্য করে যাবেন। আপনাদের জন্য রেগুলার দিচ্ছি। আপনারাই যদি এড়িয়ে যান তাহলে আমি কাদের জন্য লেখব? ]
তাজরিয়ানকে ওমন থমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরশিয়ান এগিয়ে এসে প্রিমাকে ইঙ্গিত করে বলে,
–” Say sorry to her. ( তাকে স্যরি বলো)
তাজরিয়ান এবার সরাসরি প্রিমার দিকে তাকায়। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে মেহরিমার দিকে তাকিয়ে বলে,
–” আমি তো ওই তুলার বস্তাকে সিগারেটের ধোঁয়া খাইয়েছি তাহলে এই ভদ্রমহিলাকে স্যরি বলব কেনো?
আরশিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছু বলতে নিবে তার আগেই প্রিমা বিড়বিড়িয়ে বলে,
–” ম্যানার্সলেস..
তাজরিয়ানের কানে আসে কথাটা। এবার সে সরাসরি তাকায় প্রিমার দিকে। ভ্রু কুঁচকে হেয়ালি কন্ঠে শুধায়,
–” who are you?
প্রিমা দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
–” আপনার ভাইয়ের পিএ।
তাজরিয়ান মাথা দুলিয়ে বোঝার ভঙ্গিতে বলে,
–” Oh I see. You are a Punishment from Allah.
প্রিমা হতভম্ব হয়ে যায় তাজরিয়ানের সম্বোধনে। সে পানিশমেন্ট আরশিয়ানের জন্য? ওদিকে আরশিয়ান পড়েছে বিপদে। একদিকে ঘাড়ত্যাড়া ভাই অন্যদিকে নাছোড়বান্দা বউ। এসবের মাঝে মেহরিমা উশখুশ করে উঠে। বিরক্ত হয়ে এপাশ ফিরে বিড়বিড়িয়ে বলে,
–” ঠান্ডা লাগছে আপা.. একটু জড়িয়ে ধরো না আমায়। উফ্..
মেহুর কথায় সকলে তার দিকে তাকায়। এপাশ ফেরায় তার মুখটা স্পষ্ট হয় সবার সামনে। ফর্সা মুখটা লাল হয়ে আছে। ঠোঁটটাও রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। আশেপাশে একটু আঘাতের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। হয়তো কোনোকিছু দিয়ে জোরপূর্বক ঘষামাজা করা হয়েছে।
তাজরিয়ানের হুঁশ ফেরে আরশিয়ানের ধাক্কায়। সে পুশ করছে তাজরিয়ানকে স্যরি বলার জন্য। এই পর্যায়ে এসে ভীষণ মেজাজ খারাপ হয় তাজরিয়ান এর। সে প্রিমার দিকে চেয়ে বিরক্তির স্বরে বলে,
–” স্যরি নয় স্বামীর দরকার আপনার বোনের। ঠান্ডা লাঘব করার জন্য আরকি। তখন জ্বর আসলেও আলাদা করে মেডিসিন নেওয়া লাগবে না। স্…
বাকি কথা বলতে পারল না তাজরিয়ান। প্রিমা রাগে ক্ষোভে চিল্লিয়ে বলল,
–” গেট লস্ট ইডিয়ট।
তাজরিয়ান চুপ হয়ে যায় প্রিমার চিল্লানি শুনে। বউ কে ওভাবে রেগে যেতে দেখে আরশিয়ান পেছন থেকে হাত টেনে ধরে তাজরিয়ানের। রুম থেকে বেরোতে বেরোতে বলে,
–” আমারই ভুল হয়েছে তোকে এখানে আনা। বুঝা উচিত ছিলো গাধাকে পিটিয়ে ঘোড়া বানানো যায় না।
তাজরিয়ান নির্লজ্জের মতো হাসে। মনে মনে ভাবতে থাকে,” যাক যা চেয়েছি তা ভালোই ভালোই হয়ে গেছে। স্যরিও বলতে হয়নি আর ব্যাপারটাও বিগড়ায়নি। ভাই একটু রেগেছে। উনাকে সামলানো আমার বাঁ হাতের কাজ।
আরশিয়ান ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে ঝাড়া মেরে ছেড়ে দেয় তাজরিয়ানের হাত। লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে রাগে গজ গজ করতে থাকে। তাজরিয়াম অবাক হ’য়ে যায় ভাইয়ের রাগ দেখে। এর পূর্বে কখনোই এমন কিছু হয়নি। তাজরিয়ান বহুত বড় বড় ভুল করেছে কিন্তু আরশিয়ান এমন রিয়েক্ট করেনি।
হুট করে তাজরিয়ানের মাথায় খেলে যায় প্রিমার প্রসঙ্গটা। এরমধ্যেই আরশিয়ান রাগী স্বরে বলে,
শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ৯
–” আমি খুব করে চেয়েছিলাম হালকার উপর ব্যপারটা সামলে নিতে কিন্তু নাহ্। তুমি তো ঘাউড়ামি করবাই। ফাইন, যদি আমার মানসম্মানের বিন্দুমাত্র পরওয়া থাকে তোমার কাছে তাহলে ওই মেয়ের কাছে ভদ্রভাবে মাফ চাইবে তুমি।
তাজরিয়ান স্থির দৃষ্টিতে তাকায় ভাইয়ের দিকে। হুট করে কেমন করে যেনো জিজ্ঞেস করে,
–” তুমি কী অনেক বেশি ভালোবাসো ওই মহিলা কে?
