Home জাহানারা জাহানারা পর্ব ৫৫

জাহানারা পর্ব ৫৫

জাহানারা পর্ব ৫৫
জান্নাত মুন

লোকটা ট্রিগারে রাখা আঙ্গুলে চাপ বসাতে যাবে ঠিক তক্ষুনি এক এক করে পনেরো থেকে বিশটির মতো কালো মার্সিডিজ মাঝ বাজারে আমাদের কাছে এসে থামলো।উপস্থিত শতাধিক পাবলিক সরে দাঁড়িয়েছে তৎক্ষনাৎ। ভীড়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকা লোকটা বিরক্তিতে “চ” বর্গীয় উচ্চারণ করে ঝটপট সরে গেলো।
মার্সিডিজগুলো থেকে হনহনিয়ে কালো পোশাকধারী গার্ডগুলো বেরিয়ে এসে পুরো বাজার ঘিরে দাঁড়ালো।ইনান গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে অপজিট ডোর খুলে দিতেই ইফান দ্রুত ব’ন্দু’ক হাতে নেমে আসলো।সে কোনোদিক তা থাকিয়ে বড় বড় পা পেলে আমার দিকে তেড়ে আসছে।পড়নে সফেদা রঙের শার্ট।শার্টের হাতা কনুই অব্ধি তুলে রাখা।শক্ত চোয়াল, চোখদুটো রাগে লাল হয়ে আছে।আসেপাশের মানুষ ভয়ে জড়সড় হয়ে গেছে।সকলে ইফান কে খুব ভালো করেই চেনে।এই লোক যেখানে থাকে সেখানেই আতংক ধরিয়ে দেয়।

আমি স্বাভাবিক দৃষ্টিতে ইফানের দিকে তাকিয়ে।আমার কাছে এসব নতুন কিছু না।বরং ভাবছি এই লোক এখানে কি করছে?এরই মাঝে ইফান আচমকা এসে এক হাতে আমার দু’গালে থাবা মেরে ধরে।দাঁতে দাঁত পিষে আওরায়,
–“বা’ন্দির বাচ্চা ম’রার লাগি মন চাকুম-চুকুম করছে।আমি ভালো হয়ে থাকলে তোর শান্তি লাগে না,তাই তো।না করেছিলাম না,আমার অনুমতি ছাড়া একা কোথাও না যেতে।”
আমি আশেপাশে এক নজর তাকিয়ে দেখলাম, সকলে মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। কেউ আমাদের দিকে তাকিয়ে নেই। আমি আবার ইফানের দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ওর হাত টেনে সরাতে সরাতে শক্ত কন্ঠে বললাম,”আমি তোমার দাসি নই যে তোমার সব কথা শুনে চলবো।”
ইফান দাঁতে দাঁত পিষে হিসহিসিয়ে বললো,”না দাসি হইবি কেন?তুই তো আমার বান্দি।থা’প’ড়ে না তোর সব দাঁত ফেলে দিব হা’রা’মির বাচ্চা।মা’স্তানি দেখাস রাস্তাঘাটে? এখন যদি তোর কিছু হয়ে যেতো তখন,,,”

–“মুক্তি পেতাম। তোমার থেকে মুক্তি পেতাম আর,,,”
আমি আর কিছু বলতে পারলাম না।তার আগেই ইফান তার সিগারেটে পোড়া কড়কড়ে ওষ্ঠেজোড়া দিয়ে আমার কোমল ওষ্ঠভাঁজে হামলে পড়লো।হঠাৎ এমন হামলায় আমি দু কদম পিছিয়ে গেলাম।আমি স্তম্ভিত হয়ে ইফানের চোখের দিকে তাকালাম তৎক্ষনাৎ। ইফান আমার কাজল রঙা অক্ষিপটের দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমার ওষ্ঠে গাঢ় চুম্বন এঁকে দিচ্ছে।কিছুক্ষণের মধ্যেই হুঁশ ফিরতেই ইফানের বুকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে চাইলাম। ইফান এতে আমার ঠোঁটে দাঁত বসিয়ে দিলো।তাকে একবিন্দুও সরাতে পারছি না।বরং ওর ওষ্ঠের উত্তাপে আমি ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলাম।”ওম ওম” আওয়াজ করে শার্টের কলার চেপে ধরলাম।ইফান বন্দুক ধরে রাখা হাত আমার কোমরে জড়িয়ে ধরলো।অপর হাতটা আমার ঘাড়ে রেখে তার কাছে টেনে নিলো।

ইফানের আগমনে পুরো বাজার স্তব্ধ। সেখানে সাইরেন আওয়াজ করতে করতে পুলিশ আর সিআইডির গাড়ি এসে থামলো।তারা দ্রুত গাড়ি থেকে নামতেই আমাদের এই অপ্রীতিকর দৃশ্য দেখে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো।জিতু ভাইয়া গাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসতেই আমাকে আর ইফান চুম্বনরত অবস্থায় দেখতে পায়।তিনি তৎক্ষনাৎ দৃষ্টি নত করে ফেলে।হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে রাগে ফেটে পড়ছে।
আমি দৃষ্টি ঘুরিয়ে ভাইয়াকে দেখতে পেয়ে ইফানকে শরীরের সকল শক্তি দিয়ে ধাক্কা মেরে সরিয়ে আরও দু কদম পিছিয়ে গেলাম।হঠাৎ ধাক্কায় তাল সামলাতে না পেরে ইফানও এক পা পিছিয়ে গেলো।
আমি হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঠোঁট মুছে রাগে রিরি করতে করতে চাপা স্বরে বলে উঠলাম,”জা’নো’য়ার একটা।”
পরমুহূর্তে আবার আড় চোখে জিতু ভাইয়ার দিকে তাকালাম। তিনি এখনো দৃষ্টি নত করে দাঁড়িয়ে। ইফান হাতের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে ঠোঁট মুছে আবার আমার কাছে এগিয়ে আসতে লাগলো।আমি ল’জ্জায় আর কোনো দিকে তাকাতে পারলাম না।তাড়াতাড়ি এখান থেকে চলে যেতে লাগলাম।আমি ইফানের পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছি। ইফান ঘাড় কাঁধ করে আমার দিকে শান্ত চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো।অতঃপর জিহ্বার ডগা দিয়ে গাল ঠেলতে ঠেলতে ক্রুর হাসলো।

আমি জনগনের মাঝখান থেকে বেরিয়ে গেলাম।আমার পিছুপিছু আমার বান্ধবী সহ পলিও বেড়িয়ে আসলো।আমি চোখের আড়াল হাতেই ইফানও আমার পিছু আসার জন্য উদ্ধত হলো। তার লম্বা ঘন কালো চুলগুলো কে পিছনের দিকে ঠেলতে ঠেলতে জিতু ভাইকে ক্রস করে চলে যাবে তখনই জিতু ভাইয়ার কন্ঠ ইফানের কর্ণধার হলো,
–“কোথায় যাচ্ছেন মি ইফান চৌধুরী?”
ইফান থামলো।এক পা পিছিয়ে এসে জিতু ভাইয়ার দিকে তাকালো।জিতু ভাইয়া ইফানের উপর থেকে নিচে একবার দৃষ্টি বুলালো। ইফানের হাতে রিভলবার দেখে জিতু ভাইয়া ঠোঁট বাকিয়ে ক্রুর হেসে হেয়ালি কন্ঠে বললো,
–“দিন দুপুরে দেখছি অ’স্ত্র নিয়ে ঘুরছেন!বাংলাদেশকে কি ফ্রান্স মনে করছেন নাকি?”
ইফান সুক্ষ্ম দৃষ্টি বুলালো জিতু ভাইয়ার উপর। অতঃপর শান্ত ভঙ্গিমায় বললো,”কিসের ফ্রান্স আর কিসের বাংলাদেশ?সব-ই তো আমার শ্বশুরবাড়ি, মাই ডিয়ার এক ইঞ্চি নু’নুওয়ালা শা’লার ভাই ।”
ইফানের বাক্যটা জিতু ভাইয়ার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন অফিসারের কানে যেতেই তারা শুকনো কেশে উঠলো।জিতু ভাইয়ার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। ক্রুদ্ধ নয়নে ইফানের দিকে তাকিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে হিসহিসিয়ে বললো,

–“ভদ্র ভাবে কথা বলুন।”
জিতু ভাইয়ার কথায় ইফান একটা ব্রু উঁচালো।অতঃপর হাতের রিভলবার পিছনে গুজে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দু’হাতে শার্টের কলার ঠিক করে বললো,”ঠিক আছে মাননীয় পাখি ছোট শালাবাবু।”
জিতু ভাইয়ার মুষ্টিবদ্ধ হাতদুটো আরও শক্ত হয়ে আসলো।তিনি রাগে দাঁত কটমট করছে।ইফান চোখ মেরে ঘাড়ে হাত বুলাতে বুলাতে বাঁকা হেসে শিশ বাজিয়ে স্থান ত্যাগ করলো।
জিতু ভাইয়া ঘাড় কাঁধ করে সেদিকে তাকিয়ে রইলো।পাশ থেকে অফিসার আবির বললো,”ইফান চৌধুরী কে যেতে দিলেন স্যার?”
জিতু ভাইয়া ইফানের যাওয়ার দিকে তাকিয়েই বাঁকা হেসে বললো,”এক মাঘে শীত যায় না।জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ।”

পিছন থেকে তন্নিরা ডাকছে।আমি কোনো কিছু না শুনে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। আর পারছি না।সত্যি এ জীবন না থাকলে বেশি ভালো হয়।এক এক করে জীবন থেকে আপন মানুষগুলো কিভাবে হারিয়ে যাচ্ছে!
আমি মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়লাম।ভেতরে চেপে রাখা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে চোখ বন্ধ করলাম।তন্নিরা আমার কাছে এসে থামলো।আমার পিছনে ছুটে এসে এখন হাঁপাচ্ছে। পলি আমার কাঁধে হাত রেখে বললো,
–“বাসায় যাবে না?”
কিছু আর বললাম না।আমি ক্লান্ত চোখে পলির দিকে তাকালাম। মেয়েটাও হাঁপিয়ে উঠেছে।সুমাইয়া বললো,”আল্লাহ কি হয়ে গেলো!জাহান বাসায় চলে যা তুই।র’ক্তে মেখে আছিস।”

আমি নিজের দিকে তাকালাম।শাড়ি হাত দু’টোতে র’ক্ত লেগে আছে।মানুষের র’ক্ত। ভাবতেই ভেতর থেকে ক্লান্তি আরও বেড়ে যাচ্ছে। তবুও নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করলাম।কারণ তন্নিরা আজকের এই দৃশ্য দেখে ভেতর থেকে অনেক ভেঙে পড়েছে। ভয়ও পাচ্ছে। কিন্তু আমাকে সামলানোর জন্য নিজেদের সামলে নিচ্ছে। আমি তন্নিদের বললাম,”সন্ধ্যা হলো বলে।তোরা তাড়াতাড়ি বাসায় চলে যা।একা না যেতে পারলে জিতু ভাইয়াকে বল। তিনি ব্যবস্থা করে দিবে।ভাইয়াকে তো আমি আর এই মুখ দেখাতে পারবো না।”

নাফি আামর কাঁধে হাত রেখে বললো,”তুই এত ভাবিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
সত্যিই কি সব ঠিক হবে?নিজের মন কে প্রশ্ন করলাম। কোনো উত্তর পেলাম না।আমি তন্নিদের বলালম চলে যেতে।ওরা বাধ্য হয়ে হোস্টেলের উদ্দেশ্য চলে গেলো।আমি তাকিয়ে দেখলাম ওরা গাড়িতে উঠে চলে যাচ্ছে। ওরা চোখের আড়াল হতেই পলি কিছু বলতে যাবে তার আগেই আলাল দুলাল এসে হাজির হলো।পলির উদ্দেশ্য দুলাল বললো,”ভাবি ইমরান ভাই ডাকছে চলুন।”
পলি আমার দিকে তাকালো।আমি হ্যাঁ বলতেই দুলালের সাথে চলে গেলো।আলাল আমার দিকে পানির বোতল এগিয়ে দিলো।আমি হাত দু’টো ধুয়ে নিলাম।অতঃপর অন্যদিকে তাকিয়ে বোতলটা এগিয়ে দিলাম।শাড়ির আচঁলে হাত মুছতে মুছতে বললাম,”কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হবে?তোর ভাই কোথায়?”

–“এখানে জান।”
ইফানের কন্ঠ কানে আসতেই ঝটপট ঘুরে দাঁড়ালাম।ইফান আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে হাতের বোতলটা ফেলে দিলো।আমি অন্যদিকে দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম।ইফান তার শীতল হাত আমার গালে স্পর্শ করতেই হালকা কেঁপে উঠলাম।ইফান সুক্ষ্ম চোখে আমায় পরুক করে কপালেও হাত ছুঁইয়ে দেখলো।আমি হাত সরিয়ে হাঁটা ধরলাম।ইফান আমার হাতে টান মেরে তার বক্ষে এনে ফেললো।রক্তে ওর সফেদা শার্টও মাখামাখি। ইফান উতলা হয়ে উঠলো,”জান ঠিক আছ তুমি।”
–“বাড়িতে নিয়ে চল।”
আমি মৃদু স্বরে বাক্যটা উচ্চারণ করতেই ইফান আমাকে পাজাকোলে তুলে নিলো।হঠাৎ এভাবে কোলে তোলায় তাড়াতাড়ি ওর গলা জড়িয়ে ধরলাম।বিরক্তিতে বললাম,”কি শুরু করেছে তুমি? তোমার জন্য মনে হয় এখন আর বাইরে মুখও দেখাতে পারবো না।”
ইফান আমাকে শপিং মলের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বললো,”বাইরে দেখানোর দরকার নেই। আমাকে দেখালেই হবে।”
–“তুই একটা কু’ত্তা, বান্দর, শ’য়’তান…. ”
আমি বকাঝকা করতে লাগলাম। ইফান খালি হাসছে।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে।রাস্তা দোকানপাট সহ আসেপাশের সবকিছুই কৃত্রিম আলোয় আলোকিত।ইফান আমাকে নিয়ে শোরুমে আসলো।যা বুঝলাম আগেই ইফানের লোক কথা বলে রেখেছে। তাই আমরা আসতেই ম্যানেজার সহ সকল স্টাফরা ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। ম্যানেজার আমাদের ট্রায়াল রুমের সামনে দিয়ে চলে গেলো।আমি ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতে যাব তখনই ইফান হাত দিয়ে বাঁধা দিয়ে ভেতরে চলে আসে।আমি কপাল কুঁচকে বললাম,
–“এটা লেডিস ট্রায়াল রুম। বেড়িয়ে যাও।”

ইফান আমার কোনো কথা শুনলো না।বরং ডোর অফ করে আমাকে সামনের দিকে ঘুরিয়ে নেয়।আমি আশ্চর্য হলাম।কারণ পুরো ট্রায়াল রুম ভর্তি নামি-দামি ব্র্যান্ডের শাড়ি,থ্রি পিস সহ সুন্দর সুন্দর গাউন__ক্লথিং রেকে সাজিয়ে রাখা।সবচেয়ে অবাক হওয়ার বিষয় বেশিরভাগ কাপড়ই পিংক কালারের বিভিন্ন শেডের উপর। আমার নজর আটকালো আলাদা করে হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখা রোজ পিংক কালার শাড়িটার উপর।হ্যাঁ,এটাই তো সেই শাড়িটা যা আজকে মার্কেটে আমি পছন্দ করেছিলাম।ঐ শাড়িটা এখানে কি করে আসলো?
–“জান তাড়াতাড়ি চেইঞ্জ করে হুডি পরে নাও।তোমার নিশ্চয়ই ঠান্ডা লাগছে।”
আমার ভাবনার মধ্যেই ইফানের কন্ঠ স্বর কানে আসে।আমি ইফানের দিকে তাকালাম।সত্যিই আজ ঠান্ডা পড়েছে।ইফান আমার হাত ধরে ক্লথিং রেকগুলোর কাছে নিয়ে গেলো,,

–“বেইবি কোনটা পছন্দ হয়েছে তোমার?তোমার যা পছন্দ তা পড়ে নাও।বাকি ড্রেসগুলো প্যাকিং করে নিয়ে যাব, কেমন।”
আমি রোজ পিংক কালার শাড়িটির দিকে তাকালাম। ইফান আমার দৃষ্টি অনুযায়ী সেদিকে তাকালো।অতঃপর শাড়িটা হাতে নিয়ে আমার বাহুতে জড়িয়ে বললো,”ওয়াও পারফেক্ট।”
আমিও দেয়ালের মিররের দিকে তাকালাম। ইফান আমার কানে ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো,”তাড়াতাড়ি পড়ে নাও।”
আমি ইফানের থেকে সরে দাঁড়িয়ে বললাম,”চেইঞ্জ করবো। বেরিয়ে যাও।”

–“হোয়াট?”
–“বললাম বেরিয়ে যাও।চেইঞ্জ করবো।”
–“তো কর।বেরিয়ে যাব আবার কি?”
বলতে বলতে ইফান বসে পড়লো।তারপর তার শার্টের বোতামে হাত চালাতে লাগলো।তারও শার্ট চেইঞ্জ করতে হবে।আমি ইফানের ভাবলেশহীন ভঙ্গি দেখে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে আরেক পাশে ঘুরে দাঁড়ালাম।অতঃপর শাড়িটা খুলে ব্লাউজের বোতামে হাত চালালাম।ইফান নিজের শার্ট খুলে হাতে আরেকটা সাদা শার্ট তুলে পড়ে নিলো।শার্টের বোতাম লাগাবে তখনই আমার উপর নজর আটকালো।আমি ব্লাউজ খুলতেই দৃশ্যমান হলো ভেতরের কালো রঙের অন্ত:বাস।আমি পিছনে হাত বাড়িয়ে হুকগুলো খুলতে লাগলাম।ইফান বড়সড় ঢোক গিলে সিঙ্গেল কাউচটায় গা ছেড়ে দিলো।অতঃপর ঠোঁট ভিজিয়ে চোখ বন্ধ করে শার্টটা আরেকটু মেলে দিলো।হঠাৎই তার প্রচুর গরম লাগছে।ইফান আবার আমার দিকে তাকালো।আমি ইনারের ফিতা কাঁধ থেকে নামাচ্ছি। ইফান পরপর ঢুক গিলে বিরবির করলো,

–“কন্ট্রোল ছোট ভাই কন্ট্রোল।”
আমি গা থেকে ইনার খুলতেই দেহের উপরের অংশ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হলো।ইফানের চোখে আমার ফর্সা খালি পিঠ দৃশ্যমান।সেখানে অনেক জায়গায় তার করে দেওয়া লালচে দাগ ভেসে আছে।ইফান তৎক্ষনাৎ উঠে দাঁড়াল। আমি আরেকটা ইনার নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই পিছন থেকে ইফান জড়িয়ে ধরে।আমি কোনো মতে সামনে রাখা শাড়ির একাংশ এলোমেলো করে বুকের সামনে ধরলাম।ইফানের খালি বুক আমার পিঠের সাথে মিশে আছে।লোকটা হঠাৎ উন্মাদের মতো আচরণ করছে।আমার উদরে তার এলোমেলো দু’হাতের বিচরণ।আমি চোয়াল শক্ত করে বললাম, “কি হচ্ছে কি?”
সে আমার ঘাড়ে কখনো ঠোঁট তো কখনো নাক ঘষে আমার দেহের ঘ্রাণ নিচ্ছে। সেভাবেই মাদকীয় হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বললো,

–“তুমি অনেক জুসি জান।নিজেকে সামলাতে পারছি না।বউ চল এখানেই,,,,”
–“ইফান,, ”
আমি দূরে সরে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম।ইফান ঢুক গিললো। ঘাড়ে হাত বুলিয়ে আমার দিকে অদ্ভুত নজরে তাকিয়ে রইলো।আমি বুকে ধরে রাখা কাপড়টা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললাম,”এভাবে তাকাবে না।দৃষ্টি সরাও।”
ইফান জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে হাস্কি স্বরে বললো,”বউ বেশি সময় নিব না।জাস্ট টুয়েন্টি,,,,,”
ইফান বাক্য সম্পূর্ণ করতে পারলো না।তার আগেই দৃষ্টি পরে আমার পায়ের দিকে। কারণ ইতোমধ্যে আমি পায়ের জুতা খুলতে উদ্ধত হয়েছি।ইফান শুকনো ঢুক গিলে পুনরায় কাউচে গিয়ে বসে পড়লো।আমি গাল ফুলিয়ে শ্বাস বের করে ড্রেস চেইঞ্জ করে নিলাম।ইফান গোমড়া মুখে আমার দিকে তাকিয়ে বারবার ঢুক গিলতে গিলতে শার্টের বোতামে হাত চালাতে লাগলো।

চৌধুরী ম্যানশন…।।
লিভিং রুমে বাড়ির সকলে উপস্থিত হয়েছে। সকলের দৃষ্টির কেন্দ্র বিন্দু নোহা।সে সোফায় দু পা তুলে বসে ভে ভে করে কেঁদে ভাসাচ্ছে।আসেপাশে টিস্যুর ছোড়াছুড়ি।তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুজন মহিলা পুলিশ কনস্টেবল। সোফার এক কোণে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে নুলক চৌধুরী।নাবিলা চৌধুরীও উপস্থিত। তিনি মূলত অফিস থেকে সবে মাত্র বাসায় এসেছে। এসেই দেখে বাড়িতে পুলিশ। একজন মহিলা কনস্টেবল নোহাকে শান্তনা দিয়ে বললো,
–“ম্যাম চিন্তা করবেন না।আপনার মূল্যবান সম্পদ আমরা যে করেই হোক খুঁজে বের করবো।”

তক্ষুনি বাড়ির চারকোণা থেকে কিছু পুলিশ বেরিয়ে এসে নোহার সামনে দাঁড়ালো।নোহা কান্না থামিয়ে সোফার উপর উঠে দাঁড়িয়ে খুশিতে গদগদ করতে করতে জিজ্ঞেস করলো,”পু আংকল, পেয়েছেন?”
পুলিশ অফিসার শুকনো কেশে বললো,”জি না ম্যাম। আমরা এখনো আপনার মূল্যবান সম্পদের সন্ধ্যান পাই নি।”
নোহা আবার ধপ করে সোফায় বসে ভে ভে করে কাঁদতে লাগলো।মিরা,পলি আর ইতি নিজের হাসি কোনো মতে আটকাতে চাইছে।ইমরান ঠোঁট কামড়ে বসে আছে।তার চোখে স্পষ্ট হাসি দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ভেতর থেকে হাসিতে ফেটে পড়ছে।
দাদি নোহাকে শান্তনা দিয়ে বললো, “বোইন আর কান্দিস না।”
নোহা দাদির বুকে মাথা রেখে তার বুকে দু’হাত দিয়ে হালকা আ’ঘা’ত করে কাঁদতে লাগলো,”ও গ্র্যানি,গ্র্যানি গোওওও।”
আমি তক্ষুনি চৌধুরী বাড়ির সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম।ঢুকতেই দাদির সাথে চোখাচোখি। দাদি মুচকি হেসে শাড়ির আচল দিয়ে মুখ ঢাকল।আমি যেদিক দিয়ে এসেছি আবার সেদিক দিয়ে বেড়িয়ে যেতে যেতে চোখমুখ খিচকে বিরবির করে বলতে লাগলাম,,

–“আস্তাগফিরুল্লা আস্তাগফিরুল্লা।”
সদর দরজা দিয়ে বের হতে নিলেই ইফানের বুকে ধাক্কা খেলাম।ইফান আমার বাহুতে ধরে বললো,”কি হয়েছে?আবার বেরিয়ে যাচ্ছ কেন?”
আমি দাঁত কটমট করে বললাম,”বালের বেডা,তুই আমার ই’জ্জ’ত কিছু রাখলি না।”
ইফান ঠোঁট কামড়ে ঘাড়ে হাত বুলাতে লাগলো।কিছু বলতে যাবে তার আগেই নোহার কন্ঠ কানে ভেসে আসে,
–“প্রিটি গার্ল তুমি এসেছঅঅঅ…।”
আমি তৎক্ষনাৎ পিছনে ফিরে তাকাতে না তাকাতেই নোহা ব্যাঙের মতো লাফিয়ে এসে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো।প্রথমত এতগুলো দিন পর নোহাকে এই বাড়িতে হঠাৎ দেখে বিস্মিত হলাম।তার উপর এই মেয়ে এভবে কাঁদছে কেন?আমি বেশি দূর আর ভাবতে পারলাম না।তার আগেই নোহা আমার হাত ধরে টানতে লাগলো সদর দরজার দিকে।

–“প্রিটি গার্ল কুইকলি আমার সাথে চল।”
–“কেন কি হয়েছে?”
আমার কথায় নোহা বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ভেঙে নাক টানতে টানতে বললো,”এক্ষুনি সিআইডি অফিসে গিয়ে তাদের ইনফর্ম করতে হবে।যে করে হোক আমার জিনিস চাই।”
নোহার কথা আমার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। তখনই চোখ পড়ে বাড়ি ভর্তি পুলিশের উপর। আমি আশ্চর্য হয়ে জিগ্যেস করলাম ,”বাসায় পুলিশ কেন?কি হয়েছে?”

অতঃপর পুলিশ অফিসার সবটা খুলে বললো।।নোহা সকালে সিআইডি অফিস থেকে চৌধুরী বাড়িতে ফিরে।অতঃপর দুপুরে শাওয়ার নিয়ে তার জাঙ্গিয়াটা বেলকনিতে রোদে শুকাতে দেয়।বিকেলে সেটা আনতে গিয়ে দেখে জাঙ্গিয়াটা নেই। তারপরই শুরু হয় নোহার পাগলামি। পুলিশ কে ফোন করে বলে জলদি চৌধুরী বাড়িতে আসতে।এখানে বিশাল বড় চুরি হয়েছে।পুলিশ মূহুর্তেই ফোর্স নিয়ে চৌধুরী বাড়িতে আসে।এসে যখন শুনে জাঙ্গিয়া কেইস।তখন পুলিশ অফিসাররা বাকহারা হয়ে পড়ে।আর সেই বিকাল থেকে এখন রাত সারে সাতটা অব্ধি পুলিশ অফিসাররা পুরো বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজছে। কিন্তু জাঙ্গিয়ার খুঁজ কোথাও পাচ্ছে না।এদিকে নোহা কেঁদে কেঁদে পুরো বাড়ি মাথায় তুলছে।
ইফান পুলিশদের চলে যেতে বললো।পুলিশ আর এক মূহুর্ত দেরি না করে পালালো।তাদের জীবনে তাদেরকে নোহার মতো এমন নাকানিচুবানি কেউ করে নি।ইফান নোহার কৃত্তি-কলাপ শুনে নিজের রুমের দিকে যেতে যেতে বিরক্তি নিয়ে বললো,”কোন মা’দা’রির পোয়া জাঙ্গিয়া নিয়ে গেলো রে?তরে নিয়ে যাইতে পারলো না!”
ইফানের কথা নোহা কানে তুললো না।সে তার মতো বকেই যাচ্ছে,,

–“ও প্রিটি গার্ল তাড়াতাড়ি চল কেইস করতে হবে।সিআইডি কে সবটা জানাতে হবে তো।”
নোহার কথা শুনে বেশ বিরক্ত হচ্ছি।এদিকে নোহা আমাকে টেনে নিয়ে যেতে না পেরে ফ্লোরে বসে হাত-পা ছড়িয়ে বাচ্চাদের মতো ভে ভে করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো,

জাহানারা পর্ব ৫৪

–“কত কষ্ট করে সিক্স মানথ আগে জিতু বেইবির জাঙ্গিটা চুরি করেছিলাম।এখন আবার কিভাবে করবো ওওওও।”
নোহা নিজের কথা বলে আবার ভে ভে করে কাঁদতে লাগলো।আমি যেন আরেক দফা হোটচ খেলাম।এই মেয়ে এসব কি বলে?আমি হা করে নোহার দিকে তাকিয়ে রইলাম।পলি, ইমরান, মিরা, ইতি এমনকি দাদিও হাসছে।আবার দাদির সাথে আমার চোখাচোখি হতেই আমি গলা খাঁকারি দিতে দিতে তাড়াতাড়ি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যেতে লাগলাম।তক্ষুনিই সদর দরজায় কলিং বেল বেজে উঠে।আমার পা থেমে যায়।আমি ঘাড় কাঁধ করে সদর দরজার দিকে তাকালাম।

জাহানারা পর্ব ৫৬