Home তিন তরঙ্গের আলোকছটা তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪২

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪২

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪২
রাফিয়া জান্নাত রিফা

রাত ঠিক দশটা। পা টিপে টিপে সিঁড়ি বেয়ে ছাদের দিকে উঠছে বিথী। যে মেয়েটা কোনো প্রেমিক যুগল দেখলেই একসময় নাক সিটকাতো, আজ সেই মেয়েটাই নিঃশব্দে প্রেমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ভাবলেই বিথীর কাছে বিষয়টা অদ্ভুত রকমের রোমাঞ্চকর মনে হয়।
উপরে উঠতে উঠতে কত কী যে ভাবছে, আর সেই ভাবনার ফাঁক গলিয়েই ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠছে একরাশ প্রশান্তির হাসি।, ধীরে ধীরে বিথীর শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ছে এক অপার্থিব ভালো লাগা।
বিথী নিজেও বুঝে উঠতে পারে না, দির্শকের আশেপাশে থাকলেই তার এত ভালো লাগে কেন। শুধু মনে হয়, যদি সময় থেমে যেত তাহলে বছরের পর বছর দির্শকের কাঁধে মাথা রেখে এভাবেই হেঁটে যেতে পারত জীবন।
ছাদের রেলিংয়ে বসে আছে দির্শক। পা দুটো শূন্যে ঝুলিয়ে, তীব্র শীতের কুয়াশামাখা আকাশের দিকে তাকিয়ে আনমনে কী যেন ভাবছে সে। চারপাশের নীরবতা আর ঠান্ডা বাতাস যেন তার ভাবনাগুলোকে আরও গভীর করে তুলেছে।

অতি সন্তর্পণে এসে দির্শকের পাশেই বসে পড়ে বিথী, পা দুটো সেও ঝুলিয়ে দেয় রেলিংয়ের বাইরে। দির্শক একবার বিথীর দিকে তাকায় আর সেই তাকানোতেই যেন সময় থমকে যায়। ছাদের এক কোণে ঝুলে থাকা সাদা বাল্বটির মৃদু আলোয় বিথীর মুখখানা ঝিলমিল করে ওঠে।
ইদানীং দির্শকের বড়ো করে ইচ্ছে করে বিথীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে। বিথী যখন হাসে, তখন তার চোখের উপরে-নিচে যে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ে সেটাই বরাবর দির্শকের মন কেড়ে নেয়। সেই চেনা, মায়াময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বিথী একটু সোজা হয়ে বসে, দির্শকের চোখের দিকে তাকিয়ে এক ভ্রু নাচিয়ে নীরব ভাষায় কিছু একটা বোঝায়,,

__ কি দেখছেন?
দির্শক চোখে সড়িয়ে বললো,,
__ সেদিন চৈত্র মাস।
তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।
এই বলে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো দির্শক, বিথী ফেচেল হেসে কি যেনো সব ভেবে বলল,,
__ সুনাম নাকি দুর্নাম করলেন।
__ দুটোই।
দির্শকের বুকটা হঠাৎ হঠাৎই দ্রিমদ্রিম করে উঠছিল। সে বিথীর দিকে তাকাতে পারছিল না অজান্তেই চোখ দু’টো ভিজে উঠছিল। ঠিক তখনই বিথী দির্শকের বাহু জড়িয়ে ধরতেই তার সারা শরীর কেঁপে উঠল গাঁয়ে কাঁটা দিয়ে উঠল মুহূর্তে। বুকের গভীরে যেন অসহনীয় এক ব্যথা চেপে বসল।
দির্শক প্রাণপণে চাইছিল হাতটা সরিয়ে নিতে, নিজেকে মুক্ত করতে, কিন্তু কিছুতেই পারছিল না। যেন অদৃশ্য কোনো শক্তি তাকে স্থির করে বেঁধে রেখেছে। কাঁপা গলায় দির্শক বলে উঠল,,

__ সড়ে বসো বিথী?
__ কেনো?
দির্শক বিথীর দিকে তাকিয়ে বললো,,
__ আমাদের প্রেম ডেট এক্সপায়ার্ড।
বিথী আরো জোরে দির্শকের বাহু চেপে বলে,,
__ কি সব বলেন স্যার?
__ সত্যিই বলছি বিথী।
বিথী চোখ কুঁচকে দির্শকের দিকে তাকিয়ে বলে,,
__ প্রেম প্রেম মুডে আছি স্যার,এসব কথা একদম বলবেন না।
দির্শক অনেকটা অবাক হয়, নিজের বাহু থেকে বিথীর হাত ছড়িয়ে বলে,,
__ তুমি কি আমাকে ভালোবেসে ফেলেছো বিথী।
বিথী নির্বিকার উওর,,
__ ওফ কোর্স।
দির্শক তাড়াৎ দমে রেলিং থেকে নেমে বিথী কে বলে,,
__ কতটা?
বিথীও নেমে দির্শকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে,,

__কতটা ভালোবাসি, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কিন্তু যখন অসংখ্য মানুষের ভিড়ের মাঝেও আপনার অনুপস্থিতি আমাকে তীব্রভাবে আঘাত করে, তখন সেই অনুভূতির কষ্ট ভাষা ছুঁতে পারে না।
তখনই বুঝি চোখের আড়াল মানেই হৃদয়ের আড়াল হয়ে যাওয়া নয়। আর সেই ভাবনাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ব্যথিত করে, কারণ তা আমার নীতি, আমার বিশ্বাস সবকিছুরই পরিপন্থী।
এ কথা গুলো নরম স্বরে বললেও এবার কঠোর কন্ঠে চোখ বড় বড় রেখে বিথী বলে,,

__ভালোবাসা,টালোবাসা ওসব কি জানি না বাপু, আপনাকে আমার লাগবে মানে লাগবেই,সে হাজার খুন,হাজার মিথ্যা,হাজার অন্যায়, হাজার পাপ করে হলেও আপনাকে লাগবে।লাগবে মানে লাগবেই আপনি না চাইলেও আপনি আমার,চাইলেও আপনি আমার।আমি আর দুটো সাধারণ মেয়ের মতো ভালোবাসার মানুষকে না পেয়ে ঘর অন্ধকার করে ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদবো, ভালোবাসা ছিনিয়ে নিবো আমি, বুঝলেন,তাই ডোন্ট ইগনোর মি,এন্ড ডোন্ট প্লে উইথ মি।
চলুন এবার প্রেম করবো।
আজ এই মুহূর্তে দির্শক এক নতুন বিথীকে আবিষ্কার করলো, কিন্তু দির্শক এমনটা মোটেও চাইনি,সে জানতো বিথী অনেক শক্ত তার এসব আসক্তিকর ভালোবাসা জন্মানো এতো সহজ নয়,দির্শক শীতল স্বরে বিথীকে,,

__ বাট আই ডোন্ট লাভ ইউ।
মুখ কুঁচকে বিথী বলে,,
__ সো হোয়াট,আমার একার ভালোবাসাই যথেষ্ট।
এতো ঠান্ডাঊ ও দির্শকের শরীর ঘামতে শুরু করলো,জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,,,
__ বাট আই উইথ প্লে ইউ।
__ নো প্রবলেম,আই উইল ম্যানেজ।
হঠাৎ বিথীর রাগ তার সমগ্র শরীরে ছড়িয়ে পড়ল, আর সেই ক্রোধের ছোঁয়ায় সে দির্শকের কলার শক্ত করে ধরেই বলল,,

__ আমি যখন বলছি আপনি আমাকে ভালোবাসেন মানে ভালোবাসেন,আর একটা কথা উচ্চারণ করবেন না এ বিষয়ে, আমাকে হার্ট করা এতো সহজ না,এটা বাংলা সিনেমা না।
দির্শক হো হো করে হেঁসে উঠলো,,,
__ কথাটা বাংলা সিনেমার মতোই ছিলো বিথী,বাট….বাট…বাট এটা জাস্ট তিনদিনের প্রেম ছিল,ডু ইউ আন্ডাসটেন্ড।
দির্শক বিথীর মাথায় দুটো টোকা মেরে ফের বললো,,

__আমি তোমাকে ভালোবাসি না বিথী এই শব্দটাই বোধহয় আমার জন্য সবচেয়ে সত্য। ভালোবাসার মতো পোশাক আমার গায়ে মানায় না।
তবু অস্বীকার করতে পারি না ‘তুমি’ নামের এই নারীটা আমার জীবনে এসে আমাকে পথভ্রষ্ট করেছে। বারবার আমাকে বিপাকে ফেলেছে, নিজের ভেতরেই আমাকে অচেনা করে তুলেছে।
বহুবার ভেবেছি, বহুবার স্বপ্ন দেখেছি এই ধানিলঙ্কাকেই সঙ্গী করে একটা সংসার গড়ি, ভালোবেসে না হয় এই একটিমাত্র জীবন অনায়াসেই পার করে দিই। ভাবনাটা সুন্দর ছিল, স্বপ্নটা নিখুঁত ছিল।
কিন্তু আমার পক্ষে তা সম্ভব নয়।
জানো কেন?
বিথী অবাক হয়েই বলে,,

__ কেন।
__ তোমার পরিবারের কিছু সদস্যদের জন্য।
__ মানে।
দির্শক বিথীর গালে ছড়ানো চুল গুলোকে কানে গুঁজে দিয়ে বলে,,
__ মানের জন্য অপেক্ষা করো।
,আজ থেকে তোমার জীবনে যে নকল প্রেমিক নামের পুরুষটির অস্তিত্ব ছিল তার ইতি এখানেই। আর কোনো অভিনয় নয়, আর কোনো ভান নয়।
দ্যা ইন্ড ওফ ফেইক রিলেশন, ইয়েস।
এই কথা বলেই দির্শক চলে যায়। বিথী বরফের মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল এক মুহূর্তের জন্যও নড়ল না। বুকের ভেতর জমে ওঠা কান্নাগুলো দল বেঁধে বাইরে আসতে চাইছে, অথচ সে তো শক্ত! তবু কেন আজ হাউমাউ করে কেঁদে উঠতে ইচ্ছে করছে?
দির্শক তাকে ঠিক কী বলে গেল তার মানে বিথীর কাছে অস্পষ্ট, এলোমেলো। এই মুহূর্তে নিজের ভেতরে ঠিক কী ভেঙে পড়ছে, সেটাও সে বুঝে উঠতে পারল না।
শুধু এটুকু বুঝল শূন্যতাটা অসহনীয়।
অজান্তেই তার পা দু’টো ছুটে গেল দির্শকের দিকে। এক মুহূর্তের দ্বিধাও না রেখে হঠাৎ করেই পেছন দিক থেকে দির্শককে জড়িয়ে ধরল বিথী। গাল বেয়ে টপটপ করে অশ্রু ঝরতে লাগল কথাহীন, নিরুপায়।
কান্নায় ভেঙে যাওয়া, থরথর কাঁপা কণ্ঠে বিথী বলে উঠল,,

__ আপনি আমার ভালোবাসার দু্ষ্শমন হতে পারেন না,এ ব্যাথা সইতে পাবো না আমি।আমার অনুভূতি আপনাকে ঘিরে,আ আমি ভা ভালোবাসি আপনাকে।
“আমি আপনাকে ভালোবাসি ” এ কথা বলায় বিথীর গলাটা প্রচুর ব্যাথা অনুভব করলো সে,আজ প্রথম এমন হলো।
পিছন থেকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বিথী বলল,,
__ যতটা পাগলের মতো ভালবাসা যায় ততটা ভালোবাসি আপনাকে, অকারণেই ভালোবাসি,ভালোবাসার কোন কারণ নেই আমার কাছে।
আমার এই ভালোবাসা আপনাকে কাঁদতে না পারলেও আমার ভালোবাসার পাগলামোতে আপনি কাঁদতে বাধ্য, ভালোবাসতেও বাঁধ্য,দির্শক স্যার , হ্যাঁ কাঁদবেন আপনি,খুব কাঁদবেন।
দির্শক কী বলবে কোনো ভাষাই সে খুঁজে পাচ্ছিল না। বিথীর এমন কথা গুলো দির্শকের হৃদয়টা ক্ষত বিক্ষত করে দিচ্ছে বারংবার।একের পর এক কান্নার ঢোক গিলে নিচ্ছিল নীরবে। সেও তো বিথীকে ভালোবাসে হয়তো বিথীর ভালোবাসার থেকেও বেশি।

কিন্তু এই মুহূর্তটা, এই সময়টা দির্শকের জন্য ভীষণ ভুল।
বিথী অনেক কিছুই জানে না। সে হয়তো কেবল আবেগের বশেই এমনটা করেছে। দির্শক মনে মনে নিজেকে বোঝাতে লাগল চোখের আড়াল হলে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে আপনাআপনি মনের আড়ালেও চলে যাবে। ধীরে ধীরে সবকিছু আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
এই ভেবেই নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করল দির্শক। বিথীর পেট জড়িয়ে ধরা হাতগুলোর ওপর নিজের হাত রেখে গভীর নিঃশ্বাস নিল সে। বুকের ভেতর জমে থাকা ভালোবাসা আর দায়িত্বের সংঘর্ষ চেপে ধরে কঠিন কণ্ঠে নিজেকে সামলে নিয়ে দির্শক বলল,,

__ ভালোবাসার আগুনে তুমি জ্বললে, আমি ছাই হবো,তাই চিন্তা নেই বিথী।
আমি নিরুপায়।
নিজ ইচ্ছার বিরুদ্ধে, বিথী দুহাত পেটের উপর থেকে ছড়িয়ে, অচেতনভাবে গটগট পায়ে চলে গেলো দির্শক। বিথী স্থির হয়ে দাঁড়ালো, মূর্তির মতো নিরব হৃদয়ের গভীরে এক ধরণের তীব্র ব্যথা জমে আছে। তার মনের কোনে, হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু সেই কান্না আটকে থাকা অনুভূতির ঘন অন্ধকারে গলায় দম বন্ধ করে রেখেছিল। উত্তেজনার ঢেউয়ে বিথী নিজের চুলগুলো জোরে জোরে টানতে লাগলো, যেন আঘাত করতে চায় সেই সব আবেগকে যা তাকে ভেতর থেকে কেঁচে ধরছে। ভেতরভর্তি ব্যথা আর বিরক্তি দুই একসাথে মিলেমিশে তার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়েছিল, আর বিথী ফিসফিস করে বললো,,,
__ ওসব বালের কথার ধার ধারবি না তুই বিথী, ছিনিয়ে হলেও তারে নিজের করে নিবি,ওসব বাল ছাল কথায় গলবি,কাদবি না,চুপ একদম চুপ।

সকাল বেলা
আজ আকাশ পরিষ্কার, ধরনিতে উঁকি দিয়েছে সূর্য মামা। আলবান নিজের ঘরের সোফায় বসে ল্যাপটপে মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে। অন্যদিকে ইতি ও নিধি সকাল সকাল রান্নাঘরে গিয়েছিল। একটু সাহায্য করতে গিয়ে দু’জনেই বেশ কিছু রান্না করেছে, আর সেই সঙ্গে নতুন নতুন রান্নার কৌশলও শিখেছে আজ।
কিছুক্ষণ পর ইতি হেলেদুলে হাতে একটি কফির মগ নিয়ে এসে আলবানের সামনে দাঁড়াল। মগটি তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মিষ্টি সুরে বলল,,,
__নেন।
আলবান ইতির দিকে তাকিয়ে কফির মগটি নিল। এক চুমুক কফি খেয়ে সে আবার ইতির দিকে ভালো করে তাকাল। গত দু’দিন ধরেই সে লক্ষ করছে, ইতির গায়ে একই জামা। আলবানের দৃষ্টি বুঝতে পেরে ইতি মুখটা একটু কুঁচকে নিল। তখন আলবান ভ্রু কুঁচকে হালকা বিরক্তির সুরে বলল,,

__ ক’দিন ধরে গোসল করিস
ইতি হাই তুলে বলে,,
__ মাএ দুইদিন থেকে।
__ তুই কত্তো গেডরি ইতি।
__ ধন্যবাদ।
__ যা গোসল করে আয়,যা।
__ রোদটা ভালোভাবে উঠুক তারপর ভেবে দেখবো গোসল করা যাবে কি না।
__ এখুনি গোসল করবি তুই যা।
__ আপনার গোসল করার শখ তো আপনি করুন গে,আমার ইচ্ছা নেই বাবা।
আলবান ইতির দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ ভেবে, ল্যাপটপের শাটার ওফ করে ইতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে,,,
__ চল দুজনেই গোসল করবো আজ।
ইতি চোখ কটমট রে বলে,,
__ পাগল নাকি, এই ঠান্ডায় গোসল করবো না আমি,যান তো।
__ যাবি না?
__ না।
আলবান আর কোনো কথা না বলে ইতিকে কাঁধে তুলে নিল। দৃঢ় পায়ে সে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে চলল। ইতি মুক্তি পাওয়ার আশায় প্রাণপণে ছটফট করতে লাগল, কিন্তু তার সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো। আতঙ্কে ও অসহায়তায় সে চিৎকার করে উঠল…
__ আমাকে ছাড়েন আলবান ভাই, ছাড়েন বলছি,আমি পরে গোসল করবো, সত্যি বলছি।
ওয়াস রুমে এসে টাস করে দরজা লাগিয়ে দিয়ে ইতিকে কাঁধ থেকে নামিয়ে বললো,,
__ আজ আমার সাথে গোসল কর।
ইতি ছটফট করে বলতে লাগলো,,,
__ প্লিজ আলবান ভাই, আপনি গোসল করেন,আমি পরে গোসল করে নিবো।
আলবান দাঁতে দাত চেপে বলে,,,
__ ইডিয়ট স্টপ, স্বামীর সাথে গোসল করলে মহব্বত বাড়ে।
বিথী সমানে হাত দি বাঁধা দিয়ে বলে,,,

__ এভাবে না তো, অন্যভাবে, প্লিজ আমাকে যেতে দিন।
আলবান ইতির কোনো কথায় কর্ণপাত না করে হাত বাড়িয়ে হ্যান্ড শাওয়ারটি চালু করে দিল। মুহূর্তের মধ্যেই ঝরঝর করে নেমে আসা পানির স্রোত দুজনকেই ভিজিয়ে দিতে লাগল। হঠাৎ ঠান্ডা পানি শরীরে লাগতেই ইতি আর্তচিৎকার করে উঠল। ইতির সেই তীক্ষ্ণ চিৎকারে আলবান কিছুটা ভীত হয়ে পিছু হটল। কিন্তু ইতি আগের মতোই ঠান্ডায় দাঁতে খট খট আওয়াজ তুলে চিৎকার করেই বলল,,
__ আলবান ভাই ঠান্ডা, গিজার ওন করেন?
আলবানের একদম মনে ছিলো না গিজার ওন করতে, তাড়াহুড়ো করে আলবান গিজার ওন করে ইতিকে নিয়ে সেদিকে দাঁড়ালো,ইতির হালকা কাঁপুনি দেখে আলবান ঝাড়ি দিয়ে বলে,,,
__ কিছু করলাম না, ছুইলাম না তাতেই এতো কাঁপাকাপির কি আছে,সোজা হয়ে দাড়া।
আলবানের একেবারেই মনে ছিল না যে গিজারটি চালু করতে হবে। তাড়াহুড়ো করে সে গিজার অন করে ইতিকে নিয়ে তার নিচে দাঁড়াল। ইতির শরীরে হালকা কাঁপুনি লক্ষ্য করে আলবান বিরক্তির সুরে ঝাড়ি দিয়ে বলল,,,

__ শম্পু করবি?
ইতি মুখ কুঁচকে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে,,
__ বাল করবো,যান এখান থেকে আমি নিজেই গোসল করে নিতে পাবো,আউট।
আলবান ক্ষীণ হেঁসে বললো,,
__ শাওয়ার তো আজ তোর সাথেই করবো,সব মেপে মেপে দেখবো আজ।
ইতি আলবানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু উল্টো আরও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ল তার বুকে। কয়েক মুহূর্ত দুজনের চোখাচোখি চলল,নীরব, অথচ ভারী এক টানটান অনুভূতির মধ্যে। হঠাৎ সচেতন হয়ে ইতি আলবানের বক্ষ থেকে চোখ সরিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। দ্রুত ওয়াশরুমের দরজা খুলে সে আলবানকে এক ধাক্কায় বাইরে ঠেলে দিল।
আলবান বিস্মিত দৃষ্টিতে ইতির দিকে তাকিয়ে থাকতেই ইতি বিকট শব্দে দরজাটি বন্ধ করে দিল। বন্ধ দরজার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থেকে আলবান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
এই মেয়েটা কবে যে তাকে বুঝবে?এই ভাবনাই ঘুরপাক খেতে লাগল তার মনে।
অতঃপর আলবান টাওয়াল দিয়ে ধীরে ধীরে মাথা মুছতে লাগল। কিছুক্ষণ নীরবতা কাটার পর হঠাৎ ওয়াশরুমের ভেতর থেকে ইতির ডাক ভেসে এলো,,

__ আলবান ভাই আমার গোসল শেষ জামাটা দিন না প্লিজ,খুব ঠান্ডা লাগছে।
আলবান নিরেট জবাব,,,
__ আন ড্রেস এ আয়,এসে নিয়ে যা,আমি পাবো না।
ইতির দরজা দিয়ে ইতির হাত বের করে ঝাঁকিয়ে বলে,,
__ দিন না।
__ বললাম তো আনড্রেস এ আয়।
__ মেজাজ খারাপ হচ্ছে কিন্তু।
__ তো।
__ জামা দিন।
__ দিবো না।
__ এমন করে না আলবান ভাই, ঠান্ডা লাগছে খুব,দিন না তাড়াতাড়ি।
__ স্বামী তোকে যখন বলছে আনড্রেস এ আসতে তখন সমস্যা কোথায়।এসে জামা নিয়ে যা।
ইতির মেজাজ খারাপ হলো, ইতি আর কিছু বললো না বলে আলবান বাঁকা হাসলো।
এর মাঝেই ইতি শরীরে টাওয়াল জড়িয়ে আলমারি খুলে দ্রুত জামা কাপড় নিয়ে আবার ওয়াস রুমের দরজা বন্ধ করে।

পলক ফেলার আগেই সবকিছু ঘটে গেল। আলবান বিস্ময়ে হাঁ হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল। সে তো ইতিকে ধরতেই যাচ্ছিল, কিন্তু কে জানত মেয়েটা এভাবে হঠাৎ দৌড়ে পালাবে! ঠিকমতো দেখেও নেওয়ার সুযোগ পেল না শুধু গামছা জড়ানো অবস্থায় ইতিকে কেমন লাগছিল, সেটুকুও নয়। এই ভেবেই আলবানের ভেতরে প্রচণ্ড রাগ চেপে বসল। রাগে সে ফোঁসফোঁস করে উঠল।
আরও কিছুক্ষণ পর গোলাপি রঙের থ্রি-পিস পরে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো ইতি। আলবানের দিকে তাকিয়ে সে মুখ ভেংচিয়ে নিল, তারপর দৌড়াতে দৌড়াতে ছাদের দিকে চলে গেল রোদ পোহাতে।

কাল রাত থেকেই বিথীর মনটা ভালো নেই। চারপাশে সবকিছু থাকা সত্ত্বেও এক অদ্ভুত অসহায়ত্ব তাকে গ্রাস করে রেখেছে। গায়ে চাদর জড়িয়ে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে সে আনমনে ফিরে যায় গতকালের প্রতিটি ঘটনায় একটার পর একটা দৃশ্য যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সারারাত চোখে ঘুম আসেনি। ফজরের নামাজ আদায় করে ক্লান্ত শরীরে একটু ঘুম এলেও তা বেশিক্ষণ টেকেনি; একটি অস্বস্তিকর স্বপ্ন মুহূর্তেই তার ঘুম ভেঙে দেয়।
বিথী ভালো করেই বুঝতে পারছে, ঠিক কোন কারণটা তাকে এতটা ব্যথিত করছে। তবু নিজের মনকেই প্রশ্ন করে এতটুকু ব্যাপারে কষ্ট পাওয়ারই বা কী আছে? বিথী তো বরাবরই দৃঢ় ব্যক্তিত্বের মেয়ে, শক্ত হতে সে জানে। কিন্তু তবুও কেন এমন বারবার সে ভেঙে পড়ে? কেন নিজেকে সামলে রাখতে পারে না? কাল রাত থেকে এই প্রশ্নগুলোই ঘুরপাক খাচ্ছে তার মনে, উত্তরহীন এক ভারী নীরবতায়।

কিছুক্ষণ সেভাবেই ভাবনায় ডুবে থেকে হাতে থাকা ফোনটা তুলে দির্শকের নম্বরে ডায়াল করল বিথী। কিন্তু ওপাশ থেকে ভেসে এল যান্ত্রিক উত্তর নট রিচেবল। একবার নয়, বারবার কল দিল সে; প্রতিবারই একই নিষ্ঠুর শব্দ। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিথীর হাত চলে গেল চুলে। রাগ আর অস্থিরতায় চুলগুলো মুঠো করে টানতে লাগল, যেন ইচ্ছে করছে এক নিমিষেই সব ছিঁড়ে ফেলতে।
নিজেকে সামলাতে কয়েকবার গভীরভাবে শ্বাস নিল স
জোরে জোরে। ভেবেছিল এতে হয়তো মনটা একটু শান্ত হবে, কিন্তু ব্যর্থ হলো। অস্থিরতা আরও গাঢ় হয়ে উঠল বুকের ভেতর।

ঠিক তখনই বিথীর দৃষ্টি আটকে গেল দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কালো হুডিতে আবৃত এক পুরুষের ওপর। পিট টাই ছাড়া আর কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না, তবু বুঝতে এক মুহূর্তও লাগল না সে দির্শকই। মুহূর্তের মধ্যেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তবে সে হাসি বেশিক্ষণ টিকল না পরমুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
কারণ দির্শকের খুব কাছেই দাঁড়িয়ে আছে এক অচেনা মেয়ে।
রাগে বিথী অস্বাভাবিকভাবে নিজের ঘাড় ঘষতে লাগল। চোখ দুটো রক্তিম হয়ে উঠল ক্ষোভে। আর দেরি না করে দৃঢ়, গটগট পদক্ষেপে সে এগিয়ে যেতে লাগল সরাসরি নিজের উদ্দেশ্যের দিকে।

এই কথা বলে দির্শককে আলিঙ্গন করতে এগিয়ে গেল নাতাশা। ঠিক সেই মুহূর্তেই তার মাথার চুলে প্রবল টান পড়ল। দির্শকের দিকে এগোতে চেয়েও সে আর এক পা এগোতে পারল না। নাতাশার মুখ কুঁচকে উঠল যন্ত্রণায়।
বিথী এক হাতে নাতাশার চুল মুঠো করে শক্ত করে ধরে রেখেছে, অথচ নাতাশার দৃষ্টি তখনও স্থির দির্শকের দিকেই নিবদ্ধ। বিথী চুলের সেই মুঠি ধরে নাতাশাকে নিজের দিকে টেনে ঘুরিয়ে নিল।
নাতাশা দু’হাত দিয়ে বিথীর হাত ছাড়ানোর মরিয়া চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু কোনোভাবেই সফল হলো না। অবশেষে বিরক্তি ও ক্ষোভ চেপে রেখে নাতাশা বলল,,,
নাতাশা দির্শক হাঁসি খুশি মনোভাব বললো,,

__ লাভ ইউ বেব।
এই কথা বলে দির্শককে আলিঙ্গন করতে এগিয়ে গেল নাতাশা। ঠিক সেই মুহূর্তেই তার মাথার চুলে প্রবল টান পড়ল। দির্শকের দিকে এগোতে চেয়েও সে আর এক পা এগোতে পারল না। নাতাশার মুখ কুঁচকে উঠল যন্ত্রণায়।
বিথী এক হাতে নাতাশার চুল মুঠো করে শক্ত করে ধরে রেখেছে, অথচ নাতাশার দৃষ্টি তখনও স্থির দির্শকের দিকেই নিবদ্ধ। বিথী চুলের সেই মুঠি ধরে নাতাশাকে নিজের দিকে টেনে ঘুরিয়ে নিল।
নাতাশা দু’হাত দিয়ে বিথীর হাত ছাড়ানোর মরিয়া চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু কোনোভাবেই সফল হলো না। অবশেষে বিরক্তি ও ক্ষোভ চেপে রেখে নাতাশা বলল,,

__ হেই হোয়াট’স ইয়ুর প্রবলেম,আমার চুল ছাড়ো বলছি।
বিথী এবার দির্শকের থেকে চোখ সড়িয়ে নাতাশার দিকে তাকালো,আরো জোরে নাতাশার চুলে মুঠি চেপে ধরলো নাতাশা ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো, বিথী দাঁত দাঁত চেপে বললো,,
__ কে তুই?সাহস কি করে হয় ওনাকে জড়িয়ে ধরার।
নাতাশা নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেই বলতে লাগলো,,
__ এখানে সাহসের কি আছে,সি ইজ মাই বয়ফ্রেন্ড,ইটস নরমাল,আর তোমার সাহস কি করে হয় আমার চুল ধরার,হু আর ইউ।
বিথী কেমন যেনো একটা ধাক্কা পোলো, আলগোছে নাতাশার চুল থেকে হাত সরিয়ে নিলো বিথী, নিরন্তর ছলছল চোখ তাকালো দির্শকের পানে,না সে চোখে পানি ছিলো এক অসহায়ত্ব ছিলো সে চোখে, বিথী কান্নারত ঢোঁক গিলে দির্শককে বললো,,,

__ কি বলছে স্যার,এসব মিথ্যা তাই না?
দির্শক ও একই ভাবে বিথীর দিকে তাকিয়ে ছিলো সে চোখের ভাষা আজ বিথীর কাছৈ অজানা ঠেকলো,দির্শক উওর দিলো না, কিন্তু নাতাশা আঙ্গুল নাড়াতে নাড়াতে বিথীকে বললো,,
__ এই মেয়ে এই আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলো।
একই ভাবে অসহায় চোখে দির্শকের চোখেই তাকিয়ে রইল বিথী, দির্শকের উওরের আশায় চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে বিথী, নাতাশা কথা উওর করলৌ না সে,এভাবে দির্শকের দিকে তাকিয়ে থাকা এটা নাতাশার পছন্দ হলো তাই নাতাশা বিথীর বাহুতে পরপর দুটো থাপ্পর মারলো পিছিয়ে গেলো বিথী।
তাতে রাগে হলো দির্শকের রাগি ঝাঁঝালো কন্ঠে দির্শক বলে,,

__ নাতাশায়য়।
অসহায় দৃষ্টিতে বিথী দির্শকের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। দির্শকের সদয় প্রতিক্রিয়ার আশায় তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। নাতাশা কোনো উত্তর দিল না, তবুও দির্শকের দিকে তাকিয়ে থাকা যেন তার পছন্দের অংশ হয়ে উঠল।
এমন দৃশ্যে, নাতাশা বিথীর বাহুতে একের পর এক দু’টি থাপ্পর মারল। বিথী বিস্ময়ে পিছিয়ে গেল।
এর ফলে রেগে গেল দির্শক, এবং তার ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললেন,,
দু হাত মেলে দিয়ে দির্শককে ঢেকে নিলো বিথী এবং আগের ন্যায় দাঁতে দাঁত চেপে বললো,,

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪১

__ উনাকে টাচ করার দুঃসাহস ও দেখাবি না সে তুই যে বালই হ না কেন?আর একবার এনাকে টাচ করতে এলে হাত কেটে দিবো, বাজে নজরে তাকাবি তো চোখ উপড়ে নিবো,মুখ দিয়ে ভালোবাসার কথা বলবি তো জিভ টেনে ছিঁড়ে নিবো, পরিশেষে খুন করে ফেলবো।
কথা গুলো কিছু তো ছিলো সে কথায় দির্শক ও নাতাশা কেঁপে উঠলো।

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৩