আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৩৪
কায়নাত খান কবিতা
—আরেহ অরিন।’’
পরিচিত কণ্ঠস্বরটি কানে ভেসে আসতেই অরিন অন্যমনস্কতার ভাঙন টেনে পিছনে ফিরে তাকায়।
পিছনে ফিরতেই চোখে পড়ে এক গাল হাসি মুখে দাড়িয়ে থাকা রাজকে।
—– রাজ?’’
— ইয়াপ।”
রাজ ধীরে ধীরে অরিনের দিকে এগিয়ে আসে। আর এতদিন পর রাজকে চোখের সামনে পেয়ে, মুহূর্তের জন্য হলেও অরিনের স্মৃতির আড়ালে মিলিয়ে যায় কিংশুকের উপস্থিতি।
—- এখানে কী করো অরিন?’’
রাজের করা প্রশ্নে অরিন কিছুটা বিব্রত বোধ করে। কী বলবে তাকে? সে তো এখানে রয়েছে তার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপের সঙ্গেই। কীভাবে বলবে তাকে?
রাজ কিছুক্ষণ ধরে প্রশ্নমাখা দৃষ্টিতে অরিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার সেই নিরব তাকিয়ে থাকাটুকু অনুভব করেই অরিন ধীরে ধীরে নিজের জড়তা কাটিয়ে
—- হাসবেন্ডের সাথে এসেছি।’’
অরিনের মুখে হাসবেন্ড শব্দটা শুনতেই রাজের মুখটা হঠাৎ করেই শুকিয়ে আসে। বুকের ভেতর কোথাও যেন নিঃশব্দে কিছু একটা ভেঙে পড়ে। কারণ অরিনই ছিল সেই একমাত্র মেয়ে, যাকে রাজ নিঃশর্ত যত্নে, গভীর ভালোবাসায় চেয়েছিল। ভেবেছিল দেশে ফিরে একদিন অরিনকে নিজের করে নেবে, সমস্ত অপেক্ষার শেষ হবে তার হাত ধরেই।
কিন্তু বাস্তবতা নির্মম। তার আগেই অরিন হয়ে গেছে অন্য কারো। সেই সত্যিটা মেনে নেওয়ার ক্ষমতা রাজের নেই, তবুও মুখে কিছু বলার অধিকারও নেই। দৃষ্টির উজ্জ্বলতা ধীরে ধীরে নিভে যায়, হাসির জায়গায় জমে ওঠে একরাশ হতাশা।
তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে রাজ জোর করে মুখে একফোঁটা হাসি টেনে আনে। সেই হাসিটা হাসি কম, ভাঙা অনুভূতিগুলো আড়াল করার নিঃশব্দ চেষ্টা মাত্র।
—- বিয়ে করে ফেলেছো অরিন?’’
—- হুম।’’
—- ওহহ। বললে না তো।’’
—- হঠাৎ করেই হয়ে গেছে।’’
অরিনের মুখে সৌজন্যের সেই হালকা হাসিটুকু দেখে রাজও নিজেকে সামলে নেয়। যা হওয়ার, তা তো হয়েই গেছে, তার মেনে নেওয়া কিংবা না নেওয়ায় আর কিছুই বদলাবে না। বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া ছাড়া এই মুহূর্তে তার আর কোনো উপায় নেই।
—- যাক বেশ ভালো।’’
নিয়তি যদি ইচ্ছেমতো বদলে ফেলা যেত, তাহলে হয়তো এই মুহূর্তেই রাজ তার আর অরিনের ভাগ্যের রেখা পাল্টে দিত হাতটা শক্ত করে ধরে বলে দিত, এবার আর ছাড়বো না। কিন্তু নিয়তি তো এমন নয়।
কীই বা করার আছে তার? মানুষ চাইলেই কি আর নিজের ভাগ্য বদলে ফেলতে পারি! কিছু মানুষ শুধু ভালোবেসে যায়, কিছু গল্প অপূর্ণই থেকে যায় নিয়তির কাছে হেরে গিয়ে।
—- আপনি এখানে? মানে কবে এলেন।’’
অরিনের করা প্রশ্নে রাজ কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না, কী বলবে সে। সে তো বাংলাদেশে গিয়েছিল অরিনের কাছেই। কত আশা, কত বিশ্বাস নিয়ে। অথচ তাকে আর পাওয়া হয়নি। পরে বাইকারের কাছ থেকেই জানতে পারে, অরিন এখন লন্ডনে। এক মুহূর্তও দেরি না করে ছুটে আসে সে, মনে হয়েছিল এবার অন্তত ভাগ্য মুখ ফেরাবে।
কিন্তু কে জানতো, নিয়তি এতটা নির্মম পরিহাস করবে তার সঙ্গে! চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও যে মানুষটাকে ছুঁতে পারবে না, এই সত্যিটা রাজের বুকের ভেতর ভার হয়ে চেপে বসে। এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে, যেন সেই নিঃশ্বাসের সঙ্গেই বেরিয়ে আসে অপূর্ণ ভালোবাসার সমস্ত ক্লান্তি।
— কাজের পারপাসে এসেছিলাম।’’
— ওহহ।’’
—- হেই ওটা কী?”
— কোনটা?’’
— তোমার চুলে! ওয়েট।”
কথার ফাঁকে হঠাৎ করেই ঘাড় ঘুরিয়ে অরিনের দিকে তাকায় কিংশুক। হাতে থাকা ফোনটা অজান্তেই শক্ত হয়ে আসে তার মুঠোয়। অরিনের পাশে একটি ছেলে—তাও এতটা কাছে! তার ওপর ছেলেটার হাত অরিনের চুলে।
দৃশ্যটা চোখে পড়তেই কিংশুকের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। দৃষ্টিতে জমে ওঠে তীব্র, অদম্য আগুন যেন চোখ দিয়েই অরিনকে গ্রাস করে নিতে চায় সে।
তড়িৎ গতিতে ছুটে এসে এক হাতে অরিনের কোমর জাপটে ধরে সামনে এসে দাঁড়ায় কিংশুক। হঠাৎ সেই স্পর্শে ভয়ে অরিন একেবারে শক্ত হয়ে যায়। সে তো মুহূর্তের জন্য ভুলেই গিয়েছিল। কিংশুক নামক সেই অভিশাপটা এখনো তার সঙ্গেই
ভয়ের চাপে অরিনের মুখের রং মুহূর্তেই পাল্টে যায়।ফ্যাকাসে হয়ে পড়ে তার চেহারা, যেন সমস্ত রক্ত হঠাৎ করেই সরে গেছে।
কিংশুককে দেখে রাজের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী মানুষটি এই মুহূর্তে তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে। বিশ্বাস আর বাস্তবতার মাঝখানে রাজ যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। ধরতে গেলে কিংশুক তারও আইডল।যার সাফল্য, ক্ষমতা আর প্রভাব দূর থেকে মুগ্ধ হয়ে দেখেছে সে। অথচ আজ সেই মানুষটিই দাঁড়িয়ে আছে অরিনের পাশে, এমন এক বাস্তবতায়, যা রাজ কখনো কল্পনাও করেনি।
—– অরিন উনি?’’
—- মাই হাসবেন্ড।’’
—-ওহহহ। আই নো হিম। আই মিন, আই এম ইউর বিগেস ফ্যান স্যার।’’
একটুকরো সৌজন্যের হাসি ঠোঁটে টেনে কুশল বিনিময়ের উদ্দেশ্যে সামনে হাত বাড়ায় রাজ। আর কিংশুকও তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ না করেই নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের হাতটা বাড়িয়ে।
—– বাড়ি চলো জান।’’
রাজকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই অরিনের কোমর শক্ত করে জাপটে ধরে সামনে পা বাড়ায় কিংশুক। তার ভঙ্গিতে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, আছে শুধু নিঃশব্দ অধিকারবোধ।
রাজ আর কিছু বলে না। নীরবে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে তাদের পানে। যে মানুষটাকে সে একদিন নিজের ভবিষ্যৎ ভেবে নিয়েছিল, সে এখন ভালো আছে, নিরাপদ আছে, সুখে আছে। এর বেশি আর কীই বা চাওয়ার থাকতে পারে? বুকের ভেতরের অসমাপ্ত ইচ্ছেগুলো চেপে রেখে রাজ মেনে নেয় নিজের ভাগ্যকে।
অরিনকে প্রায় টেনে গাড়িতে বসিয়ে নিজেও ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে পড়ে কিংশুক। পরমুহূর্তেই এমন জোরে গাড়ি স্টার্ট দেয় সে। যেন ইঞ্জিনের শব্দে চারপাশ কেঁপে ওঠে। কিংশুকের মুখে স্পষ্ট হয়ে আছে তার রাগের মাত্রা।যেন সামনে কেউ পড়লেই দ্বিধা না করে পি’ষে ফেলবে।
নিজেকে কোনোভাবে সামলে শান্ত রাখার চেষ্টা করে অরিন। গাড়ির তীব্র ঝাঁকুনিতে বুকের ভেতর দমবন্ধ করা আতঙ্ক জমে উঠলেও প্যানিক না করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায় সে। তবু মনটা কেমন অশান্ত হয়ে কুঁকড়ে থাকে।অজানা আশঙ্কায় বারবার ধক করে ওঠে
কিংস ম্যানশনের সামনে এসে হঠাৎ করেই তীব্র ব্রেক কষে কিংশুক। আকস্মিক ঝাঁকুনিতে অরিন কোনো রকমে নিজেকে সামলে সামনে ঝুঁকে পড়ে।হৃদপিণ্ডটা যেন মুহূর্তের জন্য বুক ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চায়।
হঠাৎ করেই খুব জোরে দরজা ঠেলে বেরিয়ে পড়ে কিংশুক। তার দেহভঙ্গি, চোখেমুখে জমে থাকা আগুন দেখে অরিন ভয়ে একেবারে জমে যায়। বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে।এই রাগের পরিণতি কী হতে পারে, সেই আশঙ্কায় সে নিশ্বাস নিতেও ভুলে যায়।
অরিনের পাশের দরজাটা এক ঝটকায় খুলে তাকে টেনে গাড়ি থেকে নামায় কিংশুক। তার আচরণে কোনো কোমলতা নেই। অরিনের শরীরটা অনিচ্ছায় তার টানে সাড়া দেয়, আর ভয়ের ছায়া আরও গাঢ় হয়ে ওঠে তার চোখে।
অরিনকে টেনে নিজের সঙ্গে নিয়ে যেতে থাকে কিংশুক। তার তীব্র গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না অরিন।পা হড়কে সিঁড়িতে পড়ে যায় সে। এক মুহূর্তও দেরি না করে কিংশুক তাকে কোলে তুলে নেয়, আর ভারী পায়ে জোরে জোরে হাঁটতে থাকে। তার প্রতিটি পদক্ষেপ অরিনের ভিতরের শঙ্কা আরো দ্বিগুণ বাড়িয়ে তুলে।
রুমে ঢুকেই অরিনকে বিছানার দিকে ঠেলে দেয় কিংশুক। আচমকা ধাক্কায় মুহূর্তেই অরিনের মাথা ঘুরে যায়।চারপাশটা ঝাপসা হয়ে আসে, শরীরটা অবশের মতো হয়ে যায় অরিনের।
দরজাটা ভেতর থেকে লক করে ধীরে ধীরে অরিনের দিকে এগিয়ে আসে কিংশুক। তার ভঙ্গিতে জমে থাকা উত্তেজনা আর অদম্য রাগে ঘরের বাতাসটাও যেন ভারী হয়ে ওঠে।
অরিন শুকনো ঢোক গিলে নেয়। বুকের ভেতরটা কাঁপতে থাকে ভয়ে। কিংশুক খুব কাছে এসে এক ঝটকায় তাকে নিজের দিকে টেনে আনে।অরিনের শরীরটা মুহূর্তে ভারসাম্য হারায়, আর আতঙ্কটা আরও গাঢ় হয়ে ওঠে তার।
——কোথায় ছুঁয়েছে তোকে দেখি। দেখি কোথায় ছুঁয়েছে ও তোকে।’’
—- কিং…!’’
অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে অরিনের পুরো সর্বাঙ্গ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে কিংশুক। অরিনের গ্রীবা পেট, কন্ঠদেশ, পিঠ, কোমর সমস্ত জায়গা উন্মাদের মতো দেখতে থাকে কিংশুক। অরিন বাঁধা দিতে থাকে কিংশুককে। কিন্তু কিংশুকের এই জোরাজোরিতে দমবন্ধ হয়ে আসে অরিনের।
—– কিং স্টপ ইট।’’
প্রচণ্ড ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে অরিন। তার কান্নায় বুক ভেঙে আসলেও কিংশুক অচল পাথরের মতোই থাকে। সে নির্দয় দৃষ্টিতে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে অরিনকে। কোথাও কোনো দাগ, কোনো চিহ্ন আছে কি না।
—- কোথায় ছুঁয়েছে তোকে বল। এই কথা বল কোথায় ছুঁয়েছে তোকে। কী কী করেছিস ওর সাথে? ‘’
নিজের রাগকে কন্ট্রোল করতে না পেরে অরিনের শাড়ি টেনে টেনে খু’লতে থাকে কিংশুক। এক পর্যায়ে সমস্ত পোশাক পরিচ্ছেদ খুলে ফেলে অরিনের কিংশুক। তারপর ও তার সন্দেহের শেষ নেই। হার হাত-পা সব কিছু দেখতে থাকে।
অরিনের দম যেন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আসছিল। আর সহ্য করতে না পেরে হঠাৎ করেই সে সমস্ত ভয় আর অসহায়তা জড়ো করে কিংশুকের গালে এক চড় বসিয়ে দেয়।
আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৩৩
—- আপনার মতো জা’নোয়ার আমি একটা ও দেখিনি। আমি বলছি তো কিছু করিনি। আপনি তো ছিলেন ওখানে। কী করতাম এই কম সময়ের মধ্যে?’’
প্রচন্ড জোরে জোরে ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকে অরিন। তার ক্ষোভ প্রকাশ করাটাই যেন আরো ভড়কে দেয় কিংশুককে।
—- মানে সময় পেলে করতি?’’
—-কিং…?’’
—- পর’কিয়া করবি? তাও আমার চোখ ফাঁকি দিয়ে। তোকে…তোকে আজকে মে’রে ফেলবো। তুই ম’র।
অরিনের গলা চে’পে ধরে কিংশুক। একদম শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিলো তার। চোখের সামনে সমস্ত কিছু অন্ধকার হয়ে আসতে থাকে তার। কিংশুকের শক্তির কাছে আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে পরে অরিন।
—— নিজের হাতে মার’বো তোকে।’’
