দাহশয্যা পর্ব ৭
Raiha Zubair Ripti
ঢাকায় থাকা আজকে নিয়ে ৫ দিন মেহরিন দের। মেহরিন ছাঁদের দোলনায় বসে আছে। ঊর্মি এখনও ঘুমাচ্ছে। মেহরিনের হাতে মায়ের ফোন৷ ইমন ভাইয়ের সাথে তো মেহরিনের দেখাই হলো। অথচ কাল বা পরশু তারা চলে যাবে বাড়ি। মেহরিন কল লাগালো ইমনের নম্বরে।
ইমন শুয়ে ছিলো, ফোন আসায় ফোনের দিকে তাকাতেই দেখলো মেহরিনের মায়ের নম্বর৷ ইমন ভাবলো ঊর্মি কল করেছে। সেজন্য ফোন রিসিভ করে বলল-
-” হ্যাঁ ঊর্মি বল।
মেহরিন মৃদু স্বরে বলল-
-” আমি মেহরিন ইমন ভাই।
ইমন কান থেকে ফোন টা নামিয়ে একবার ফোনের দিকে তাকালো। মেহরিন ফোন করেছে তাও আবার নিজ থেকে! শোয়া থেকে বসে বলল-
-” হ্যাঁ মেহরিন বলো। কেমন আছো?
-” আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি কেমন আছেন?
-” এই তো জীবন যেভাবে চালাচ্ছে সেভাবেই।
-” আপনার কি চাকরি এখনি হয় নি ইমন ভাই?
-” হবে কিভাবে বলো৷ সব তো বন্ধ করেনার জন্য। আর এই ঢাকা শহরে লোক ছাড়া জব পাওয়া দূর্বিষহ।
-” আপনি এখন কোথায়?
-” মালিবাগ।
-” আমরা কাল পরশু হয়তো চলে যাব বাড়িতে।ঊর্মি শেষ বার দেখা করতে চায় আবার।
-” আজ?
-” সময় থাকলে আজ।
-” আচ্ছা আমি দুপুরের দিকে আসছি। তুমি আসবে মেহরিন? অনেক দিন হলে তোমায় দেখি না। ভীষণ মনে পড়ে সেই দিন গুলো। গান কি গাওয়া হয় এখনও?
মেহরিন তপ্ত শ্বাস ফেললো।
-” গানের মাস্টার নেই সেজন্য গাওয়াও হয় না। আপনি গান নিয়ে ভাবলেও পারতেন ইমন ভাই।
-” গান শখের বসে শিখেছিলাম মেহরিন। খেয়েছো সকালে?
-” হুমম। আপনি?
-” এখনও খাওয়া হয় নি।
-” খেয়ে নিন। রাখছি তাহলে।
মেহরিন ফোন কেটে দিলো। ঊর্মি দের জন্য ভীষণ কষ্ট হয় মেহরিনের। কত কষ্ট করেই না তারা জীবনযাপন করছে।
দুপুরের দিকে ঊর্মি কে নিয়ে বের হলো মেহরিন। তেহরান আজ আসে নি সাথে। ইমন আজও হেঁটে এসেছে। দূর থেকে দেখলো মেহরিন ঊর্মি কে। চোখ জুড়িয়ে গেল মেহরিনের মুখশ্রী দেখে। এই মেয়েটার চেহারায় একটা কিছু আছে৷ দেখলেই হৃদয়ে প্রশান্তি বয়ে যায়। ইমন এগিয়ে আসলো। মেহরিন স্মিত হাসলো।
তিনজনে মিলে একটা বেঞ্চে বসলো। ঊর্মি ভাইকে এটা ওটা বলছে। ইমন মনোযোগ দিয়ে বোনের কথা শুনছে৷ পাশ দিয়ে ঝালমুড়ি ওয়ালা যেতেই ঊর্মি বলে উঠল-
-” ভাই ঝালমুড়ি খাব।
ইমন ঝালমুড়ি ওয়ালার দিকে তাকালো। তার পকেটে আছে তো মনে হয় ২০ টাকার একটা নোট। বোন চেয়েছে খেতে না ও করতে পারবে না। সেদিন ও কিছু খাওয়াতে পারে নি। ইমন ম্লান মুখে দুটো মুড়ি দিতে বললো লোকটাকে। লোকটা বানিয়ে দিলো৷ একটা ঊর্মি আর আরেকটা মেহরিনের জন্য। মেহরিন লক্ষ করলো ইমন পকেটে হাত দিয়ে টাকা বের করলো। ২০ টাকার একটা নোট। আবারও হাত দিলো পকেটে। কিন্তু এবার কিছু বের করলো না। টাকা আর নেই। মেহরিন জিজ্ঞেস করলো-
-” ইমন ভাই আপনি খেলেন না?
ইমন টাকা টা দিয়ে বলল-
-” আ…আমি খেয়ে এসেছি৷ পেট ভরা।
বেশ কিছুক্ষণ থাকার পর এবার মেহরিন দের উঠার পালা। ঊর্মি ভাইকে জড়িয়ে বলল-
-” ভাই আর থাকা লাগবে না ঢাকায়৷ আমাদের সাথে চল। গ্রামে কিছু একটা করা যাবে।
ইমন স্মিত হেসে বলল –
-” তা বললে হয় না বোন। ভালো থাকিস৷ খুব শীগ্রই বাড়ি যাব।
মেহরিন ঊর্মি কে হাঁটতে বলে ইমনের সামনে এসে দাঁড়িয়ে সাইড ব্যাগ থেকে একটা খাম বের করে ইমনের হাতে দিয়ে বলল-
-” বাসায় গিয়ে খুলে দেখবেন ভাইয়া,আসছি। সাবধানে থাকবেন।
মেহরিন চলে গেলো। ইমন তাকিয়ে দেখলো মেয়েটার যাওয়া। কি আছে এই খামে? ইমন ভাবতে ভাবতে হাঁটা ধরলো খামটার দিকে তাকিয়ে।
সোলেমান আর ইব্রাহিম একটু বেরিয়েছিল। আর্মি অফিস থেকে ফিরছে৷ এখন তারা ক্লাবে যাবে শরীফের কাছে। গাড়ি চালাচ্ছে ইয়াসিন। সামনের সিটে ইয়াসিনের পাশে ইব্রাহিম আর পেছনে সোলেমান। সোলেমান ফোনে কিছু একটা করছে৷ আকস্মিক জোরে গাড়ির ব্রেক কষতেই সোলেমান ইয়াসিন কে বকা দিয়ে বলল-
-” মা-রার প্ল্যান করছিস নাকি আমায় ইয়াসিন?
ইয়াসিন সামনে তাকালো। এক পুরুষ এখনই তাদের গাড়ির তলে এসে ম’রতে যাচ্ছিলো।
-” ভাই এক ছেমড়া গাড়ির সামনে আসছে ম’রতে।
-” ম’রে গেছে?
-” না।
-” যা দেখে আয়।
ইব্রাহিম বের হলো। ইমনের শরীরে ধুলোবালি লেগে আছে। সেটা পরিষ্কার করে মাটিতে পড়া মেহরিনের খাম টা তুলতেই দেখতে পেলো সামনে এক লোক দাঁড়িয়ে আছে। ইমনেরই দোষ ছিলো। সেটা বুঝতে পেরেই ইব্রাহিম কে উদ্দেশ্য করে বলল-
-” সরি স্যার,বেখেয়ালির কারনে এমন টা হলো।
ইব্রাহিম আপাদমস্তক দেখলো ইমন কে।
-” নাম কি তোমার?
-” জ্বি ইমন।
-” বাসা কোথায়?
-” বাসা মহাদেবপুর, এখন থাকি মালিবাগ।
সোলেমান দের বাড়িও তো মহাদেবপুর।
-” জানো না দেশের যা অবস্থা তার পরও মাক্স ছাড়া এভাবে বের হয়েছো কেনো?
-” মাক্স আছে পকেটে।
-” কি করো তুমি?
-” বেকার আমি৷ চাকরির জন্য ঢাকায় এসেছি।
ইব্রাহিম পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে বলল-
-” কাজ না পেলে এই নম্বরে কল দিও৷ কাজের ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
ইমন তপ্ত শ্বাস ফেলে চলে আসলো। কি তখন থেকে এই লোক এটা ওটা জিজ্ঞেস করছিলো৷ কে এই লোক?
ইব্রাহিম গাড়িতে এসে বসলো। সোলেমান বিরক্ত হয়ে বলল-
-” নিজের বিয়ের কথাবার্তা বলতে গিয়েছিলি নাকি?
-” ছেলেটাকে ভীষণ অসহায় লাগলো৷ ঢাকায় এসেছে কাজের সন্ধানে৷ তোদের মহাদেবপুরে ছেলের বাড়ি।
-” সেজন্য কাজের ব্যবস্থা করে দিলি?
-” দিলাম। দেশের বেকারত্ব হ্রাস করা আমাদের দায়িত্ব।
ইয়াসিন গাড়ি স্টার্ট দিলো। ক্লাবের সামনে এনে থামালো। গাড়ি থেকে নেমে সোলেমান সোজা ভিতরে ঢুকে দোতলায় গিয়ে শেষের এক কক্ষে ঢুকে। পুরো রুম ফাঁকা। শুধু আছে একটা আলমারি। যা দেখতে বাহির থেকে আলমারি কিন্তু আসলে এটা একটা দরজা। সোলেমান সেই দরজা খুলতেই একটা সিঁড়ি দেখা গেলো। সোলেমা সিঁড়ি দিয়ে একদম নিচে আসলে। পেছন পেছন ইব্রাহিম ও৷ চেয়ারে হাত পা বাঁধা শরীফ দেহে প্রাণ নেই৷ শরীরে বিভিন্ন স্থান কাটা। র’ক্ত এখনও চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। সোলেমান এগিয়ে আসলো৷ শরীফের বন্ধ থাকা চোখের পাতা উচু করতেই দেখতে পেলো ফাঁকা। সোলেমান সরে আসলো। পাশ থেকে কেরোসিন তেল নিয়ে শরীফের মৃত দেহের উপর ছিটিয়ে দিলো। তারপর পকেট থেকে লাইটার দিয়ে জ্বা’লিয়ে দিলো। মুহূর্তে দাউদাউ করে আ’গুন জ্বলে উঠলো। পু’ড়তে শুরু করলো মৃতদেহ।
ইব্রাহিম চোখ ফিরিয়ে নিলো। আসলেই রাজনীতি কখনই শুধু নীতি মেনে হয় না৷ নীতির বাহিরেও একটা নীতি আছে যা স্বয়ং সোলেমান নিজে বানিয়েছে।
ইমন মেসে ফিরে খাম টা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলো। তারপর খাম টা খুলতেই দেখতে পেলো তাতে তিন হাজার টাকা আছে।
মেহরিন মূলত ইমন কে টাকা গুলো দেওয়ার জন্যই দেখা করতে চেয়েছিল। মেহরিন ভালো করেই বুঝতে পেরেছে ইমনের পকেট শূন্য। আর সরাসরি টাকা টা দিলে ইমন কখনই নিত না। সেজন্য খামে করে দিয়েছে। খামে টাকার সাথে একটা চিরকুট ও আছে৷ ইমন পড়লো।
-” ইমন ভাই টাকা গুলো আমি জমিয়েছিলাম ঈদের সালামি,টিফিনের টাকা দিয়ে। আমি ধারণা করেছিলাম আপনি ভালো নেই। সেজন্য এই গুলো আপনায় দিলাম। আমি চাই খনিকের জন্য হলেও আমি আপনার এই দূর্বিষহের সময় পাশে থাকতে। টাকা গুলো সামনা-সামনি দিলে কখনই নিতেন না। তাই বলছি টাকা গুলো আপনি আপনার মনে করে কাজে লাগান৷ যখন আপনার চাকরি হয়ে যাবে তখন না হয় ফিরিয়ে দিয়েন। আপনি ভালো থাকুন। আপনার উপর অনেক আশা নিয়ে বসে আছে ঊর্মি আর চাচি। আপনি সফল হোন। আপনাদের এই দুঃসময় কেটে যাক অতিশীঘ্র।
ইমন মৃদু হাসলো। টাকা গুলো সযত্নে রেখে দিলো খামে। বিরবির করে বলল-
-” শুধু দূর্বিষহের সময় না,, সারাটা সময় দুঃখের সাথে সাথে সুখের সময়ও আমি তোমাকে পাশে চাই মেহরিন।
সোলেমান বাসায় ফিরে ইজি চেয়ারে বসে সিগারেট খাচ্ছে। এখন কিছুটা শান্তি লাগছে৷ হুট করে পকেটে থাকা ফেন বেজে উঠলে৷ সোলেমান না দেখেই ফোনটা রিসিভ করে হ্যালো বলতেই অপাশ থেকে অতিপরিচিত এক কন্ঠস্বর ভেসে আসলো-
-” কেমন আছো সোলেমান?
সোলেমানের পায়ের র’ক্ত মাথায় চড়ে গেলো এই কন্ঠ শুনে। তীব্র কন্ঠে বলল-
-” ফোন কেনো দিয়েছিস?
-” শুনলাম বিয়ে করছো?
সোলেমানের কপালে রাগের কারনে দু ভাজ পড়লো।
-” নজর রাখছিস আমার উপর?
ফোনের ওপাশ থেকে নিঃশব্দ হাসির রোল শোনা গেলো। হাসির শব্দ শুনে গায়ে জ্বালা ধরে গেলো সোলেমানের।
-” নজর রাখা লাগে না সোলেমান। মেয়েটা কি ভীষণ সুন্দরী সোলেমান?
সোলেমান তো মেয়েটাকে দেখে নি। মেয়েটা সুন্দর? আম্মা তো বলেছে তার পছন্দ হয়েছে তাহলে নিশ্চয়ই রূপে গুণে অতুলনীয়।
-” তোর চেয়ে হাজার গুন সুন্দরী সে।
কথাগুলো বুক চিরে ছুরির মতো বিধে গেল প্রেমার মনে। চোখের কোণে জমে থাকা জল মোছে সে, গলা আটকে আসা কণ্ঠে বলে ওঠে-
-” তুমি বিয়ে করবে এটা আমি মানতে কেনো পারছি না সোলেমান? আমার বুক ফেটে যাচ্ছে।
-” তোর বুক ফেটে গেলে তোর জামাইকে গিয়ে বল ডক্টর দেখিয়ে সেলাই করিয়ে আনতে তোর বুক।
অভিমানের সুরে প্রেমা বলল-
-” বিয়েটা না করলে হয় না?
সোলেমান চেয়েছিল বিয়েটা করবে না৷ কিন্তু এই মেয়ের কথার প্রেক্ষিতে এখন মায়ের পছন্দ করা মেয়েকেই সোলেমান বিয়ে করবে।
-” তুই জামাইয়ের বিছানায় ফূর্তি করবি আর আমি তোর শোকে কুমার হয়ে থাকবো সারাজীবন? এই তোর কি লজ্জা নেই একজন বিবাহিত নারী হয়ে পর পুরুষ কে ফোন দিচ্ছিস এত রাতে।
প্রেমার মুখ অপমানে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। আবেগে ভেসে ফোন করেছিল, এখন মনে হচ্ছে কান্নায় ডুবে যাবে। সোলেমানের বিয়ের খবর শুনতে পেয়ে নিজেকে আর আঁটকে রাখতে পারে নি। সেজন্য আবেগে ফোন করে মনে যা আসছে তাই বলে দিয়েছে। প্রেমা ছোট্ট করে বলল-
-” সরি। রাখছি ভালো থেকো। আর পারলে প্লিজ আমায় ক্ষমা করে দিও।
সোলেমান তীব্র তাচ্ছিল্যের সহিত বলল-
-” ক্ষমা তাও আবার তোর মতো মেয়েকে? ইহকালে কেনো পরকালেও তোর মতন মেয়েকে আমি সোলেমান ক্ষমা করবো না। আমার ঘৃণায় বাঁচবি তুই। ফোন রাখ। আর ফোন দিবি না কোনোদিন আমায়।
সোলেমান ফোন কেটে দিলো। নাম্বার টা ব্লক লিস্টে ফেলে রাখলো। মেয়েটা ফোন করে দিলো আজ তার মুডের ১২ টা বাজিয়ে।
প্রেমা ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইলো। জীবনের কোন প্রান্তে, কোন অজান্তে প্রেমা এতটা নিঃস্ব হয়ে গেল?
প্রায় সময়ই দেখে নম্বর টা। কিন্তু কল দেওয়ার সাহস হতো না। আজ সাহস করে দিয়েছিল। তার সোলেমান অন্য কাউকে বিয়ে করবে। অন্য কাউকে ভালোবাসবে এটা মানতেই পারছে না প্রেমা। তারপর ও মেনে নিতে হবে। সোলেমানেরও অধিকার আছে কারো সাথে সুন্দর মতন বাঁচার। কিন্তু প্রেমার জীবন? সে তো সুখী নেই। তার জীবনে সুখ কবে ছিল শেষবার?সোলেমান কে হারানোর পর থেকে জীবন তার জাহান্নাম। কম কষ্ট তো তার হয় নি সোলেমান কে ছেড়ে আসার সময়৷ এক পাহাড় সম কষ্ট নিয়ে সে সোলেমান কে ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল।
কিন্তু কেউ জানতে পারলো না সেদিন প্রেমার অগোচরে করা কান্নার কথা। কেউ জানতে পারলো না সেদিন এক বুক কষ্ট নিয়ে সে সোলেমান কে ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে ছেড়েছে। অথচ পৃথিবীর লোকেরা জানলো প্রেমা প্রতারণা করছে। চুপচাপ, ক্লান্ত ভঙ্গিতে প্রেমা এগিয়ে গেল বেলকনির দিকে। গ্রিল আঁকড়ে ধরলো দুহাতে। ঠাণ্ডা ধাতব স্পর্শে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়লো জমাট বাধা কষ্টের অনুভূতি। গালের এক পাশে রক্ত জমে নীলচে দাগ হয়ে উঠেছে। শরীর টা তার আঘাতের ব্যথায় জর্জরিত। ফর্সা সুন্দর নূরের মতন চেহারা টায় এখন আর সেই আগের নূর নেই। আছে শুধু আঘাতের চিহ্ন। প্রেমা আহাজারি করে বলতে লাগলো-
-” আমি কোথাও একটা শুনেছি পুরুষ তার প্রথম নারীর চেয়ে দ্বিতীয় নারীকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। আমার সোলেমানও তার বউকে ভালোবাসবে,আমাকে মনে রাখবে না, ভুলে যাবে, এই সত্য টা আমি কি করে সহ্য করবো, আল্লাহ! তুমি তো জানো, আমি আজও
সোলেমানকে পাগলের মতো ভালোবাসি। আমার প্রতিটি মোনাজাতে কেবল এই মানুষটিই থাকে। আল্লাহ, আমি কিভাবে সহ্য করবো ঐ নারীকে? যাকে একদিন আমারই ভালোবাসার জায়গায় বসাবে সোলেমান। যার হাত ধরবে, যাকে চোখ ভরে দেখবে,
যার পাশে ঘুমাবে নিশ্চিন্ত হয়ে,আল্লাহ, তুমি বলো, কিভাবে আমি দেখবো, আমার চোখের সামনে সে এক অচেনা নারীর চোখে পৃথিবী খুঁজে নিচ্ছে?কিভাবে আমি শুনবো, কারও ঠোঁটের কোনায় তার নাম উচ্চারিত হচ্ছে ভালোবাসার অধিকার নিয়ে?
আমি কিভাবে সহ্য করবো এই অসম ভালবাসার যন্ত্রণা? কিভাবে সহ্য করবো তার হাতে অন্য কারো হাত দেখে?কিভাবে বাঁচবো নিজের বুকের ভিতর মৃত্যুর মতো হাহাকার নিয়ে?আমি তো রাতের আঁধারে কাঁদবো নিঃশব্দে,আমি দিনের আলোয় মুখ লুকাবো।কোনো নামহীন অপেক্ষায় কাটবে আমার প্রতিটি ক্ষণ, শুধু একটিবারের জন্যও যদি সে মনে করতো আমাকে…
আল্লাহ, তুমি সাক্ষী থেকো, আমি তার জন্য আজীবন দোয়া করবো। তবুও বুকের ভিতরের এই হাহাকার,এই ঈর্ষা,এই অসহ্য জ্বালা। কীভাবে সহ্য করবো বলো?আমি তো তার দ্বিতীয় নারী হতে চাই নি কখনো,আমি তো চেয়েছিলাম শুধু তার একমাত্র ভালোবাসা হয়ে থাকতে। কিন্তু এখন? আমি কেবল হারানো গল্পের এক ক্ষতবিক্ষত পাতা হয়ে থাকবো সোলেমানের জীবনে। আর সে?সে হাসবে অন্য কারও জন্য।সে ভালোবাসবে অন্য কাউকে। আমি শুধু দূর থেকে তাকিয়ে দেখবো ভাঙা হৃদয় নিয়ে, দুঃখ গিলে চিরকাল।
প্রেমার বুকে অসহ্য জ্বালা হতে শুরু করলো। বুক চেপে জোরে জোরে শ্বাস নিলো। নাহ্ কমছে না এই আহাজারি। বুক ফেটে যাচ্ছে।
প্রেমা আবার অর্ধ চাঁদের দিকে তাকিয়ে, ক্ষীণ কণ্ঠে প্রেমা বলে উঠলো –
-” তুমি জানতেই পারো না তোমায়, কত ভালবেসেছি। তো…তোমাকে ছেড়ে আসার পর থেকে আমি আর সুখের মুখ দেখি নি । জানি না আর কখনও দেখতে পারবো কি না। তবে জেনে রেখো আমি আজও তোমায় ভালোবাসি। আমার প্রথম ও শেষ প্রেম,ভালোবাসা তুমি ছিলে আর মৃত্যুর আগ অব্দি তুমিই থাকবে। কিন্তু তুমি তা জানতেই পারবে না। তোমার চোখে ঘৃণা নিয়েই আমার মৃত্যু হবে একদিন দেখে নিও। তোমার ঘৃণা কে আমি প্রচণ্ড ভয় পাই।
কথাগুলো শেষ হতেই বুকের ভেতর থেকে গুমরে উঠলো কান্না। খুব চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে প্রেমার।কিন্তু এ বাড়িতে কান্নারও অনুমতির প্রয়োজন। এ বাড়িতে ব্যথাও যেন শিষ্টাচারের আবরণে ঢাকা। ঠিক তখনই দূরের এক গাছের ডালে নিঃশব্দে এসে বসলো একটি ছোট্ট চড়ুই পাখি। রাতের নীরবতা ছুঁয়ে ওর ডানা ভিজে উঠেছে বেদনায়। ঠান্ডা হাওয়ায় পাখিটার পালক হালকা কেঁপে উঠলো, ঠিক যেমন প্রেমার বুকের ভেতর থরথর করে কাঁপছিল চাপা কান্না।
চাঁদের ম্লান আলোয় পাখিটির অবয়ব আবছাভাবে দেখা যাচ্ছিল। সেই নিঃশব্দ সাক্ষীর মতো বসে থাকা পাখিটার দিকে তাকিয়ে প্রেমার বুকের ভেতর জমে থাকা সুর যেন ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো নিভৃত কাঁপুনির মতো। চাঁদের ম্লান আলোয় ঝাপসা হয়ে ওঠা পাখিটার দিকে তাকিয়ে, নিজের অচিন্তনীয় বেদনার স্বর বয়ে নিয়ে প্রেমা গেয়ে উঠলো এক নিঃশব্দ প্রার্থনা-
দাহশয্যা পর্ব ৬
যাও পাখি যারে উড়ে
তারে কইও আমার হয়ে
চোখ জ্বলে যায় দেখবো তারে
মন চলে যায় অদূর দূরে…
যাও পাখি বলো তারে,
সে যেন ভোলে না মোরে,
সুখে থেকো ভালো থেকো
মনে রেখো এ আমারে…
