Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ১০

দাহশয্যা পর্ব ১০

দাহশয্যা পর্ব ১০
Raiha Zubair Ripti

ধানমন্ডি ২, বাড়ি নং ২৯ এর নিজ কক্ষে বিশ্রাম করছিল এক পুরুষ। বিছানার পাশেই আছে টাকার স্যুটকেস যেটা গতকাল রাতে এসেছে হাতে। আকস্মিক ফোনের শব্দে চোখ মেলে তাকায় সেই পুরুষ। বিরক্তিতে চ সূচক উচ্চারণ করে ফোন টা রিসিভ করে বলল-
-” কে?
ওপাশ থেকে ড্রাইভার ভয়ার্ত গলায় বলল-
-” স্যার মেয়ে গুলো কে নিয়ে পৌঁছাতে পারি নি।মাঝ রাস্তা থেকে কে জানি ট্রাক সমেত মেয়ে গুলো কে নিয়ে চলে গেছে।
কথাটা কর্ণকুহর হতেই পুরুষ টি সেই ড্রাইভার কি বিশ্রী রকমের একটা বকা দিয়ে বলল-

-” কু’ত্তার বাচ্চা তুই গাড়িতে থাকতে মেয়ে গুলো কে নিয়ে কি করে যেতে পারলো? মাদার** বাচ্চা তুই ঐ মেয়ে গুলো কে খুঁজে বের করবি তা না হইলে তোর ঘরের মা বোন রে নিয়ে আসতে আমার এক সেকেন্ড ও লাগবে না।
ভয়ে গলা শুকিয়ে আসলো ড্রাইভার টার। পুরুষটি ফোন কেটে দিলো। আর সাথে সাথেই সেই বিদেশি ক্লায়েন্ট গুলোর ফোন আসলো। পুরুষটি মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে ফোনটা রিসিভ করে বলল-
-” দেখুন মিস্টার ট্রাম্প, রাস্তায় পুলিশ থাকায় মেয়েগুলো কে জায়গা মতন রেখে আসতে পারি নি। দুটো দিন সময় দিন রাস্তা ক্লিয়ার হলে পৌঁছে দিয়ে আসবো।
কথাটা বলেই যুবক টা ফোন কেটে দিলো। কল লাগালো বাবার নম্বরে। পুরুষটির বাবা কল রিসিভ করতেই পুরুষটি চিৎকার করে বলল-

-” মেয়ে গুলো কে কে সরিয়ে নিয়ে গেল? আজকের দিনের মধ্যে আমার খোঁজ চাই। তা না হলে কিন্তু আমার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে আব্বা। আমার হাতে আর কোনো মেয়ে নাই যে ক্ষতিপূরণ করবো এর।
ফোন কেটে গেলো ওপাশ থেকে। পুরুষটি কাউকে গলা ছেড়ে ডাক দিলো। আর বলল-
-” ম’দ ফুরিয়ে গেছে। ম’দ নিয়ে আয় রুমে।
কাঁপতে কাঁপতে ম’দের বোতল হাতে নিয়ে ঘরের অন্ধকার কোণ থেকে বেরিয়ে এলো এক বিবর্ণ, বিধ্বস্ত নারী। চোখে ক্লান্তি আর মুখে হেরে যাওয়া দিনের ছাপ। তার পায়ের শব্দ যেন আতঙ্কের পদধ্বনি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সেই জানোয়ারটার দিকে, যাকে সমাজ তার স্বামী বলে চেনে।

পুরুষটা নারীর হাত থেকে বোতলটা এমনভাবে ছিনিয়ে নিলো, যেন সে একটা জিনিস, অনুভূতিহীন কোন বস্তু। এরপর কোনো প্রকার ভূমিকা ছাড়াই সে একরাশ ঘৃণা আর উন্মত্ততায় নারীটাকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ছুঁড়ে ফেলল। নারীর পিঠে ব্যথা জমে উঠল, কিন্তু আর্তনাদ করারও ইচ্ছে নেই তার কারণ কান্নার ভাষাও যেন ত্যাগ করেছে তাকে।
এক ঢোক ম’দ গিলে, সেই পুরুষ তার ভেতরের পশুটাকে মুক্ত করলো। নরকের অন্ধকার থেকে উঠে আসা এক দৈত্যের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল নারীর শরীরে। হাত, নখ, দাঁত সব কিছু যেন এক একটি অস্ত্র হয়ে উঠল। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে এল নারীর, বুকের ভেতর জমে উঠল এক অনুচ্চারিত চিৎকার। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছিলো, আর কতোটা মরলে একজন মানুষ পুরোপুরি মরে যায়।

কেউ না কেউ প্রতিদিন এই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে কখনো শ্বশুরের ক্ষুধার্ত দৃষ্টি, কখনো দেবরের চাহনি, যা যেন প্রতিনিয়ত তার শরীরের প্রতি এক অশ্লীল দাবি তোলে। এ বাড়িতে নারীর শরীর মানেই শিকার আর পুরুষেরা সবাই শিকারি, মুখোশ পরে থাকা একেকটা নেকড়ে।
যদি কখনো ইতিহাস এই নারীর কথা লেখে, তাহলে পাঠকেরা বই ছুঁয়ে রাখতে সাহস পাবে না। তার কাহিনিতে শব্দ নয়, কেবল আতঙ্কের গন্ধ থাকবে। যন্ত্রণার ঘ্রাণ থাকবে।
প্রতি রাত যেন তার কাছে মৃত্যুর রিহার্সাল। ঘুমের মাঝে চিৎকার করে ওঠে সে, কারণ স্বপ্নেও ছায়া ফেলে সেই জানোয়ারের ঘর্মাক্ত, বিষাক্ত স্পর্শ। তার শরীর শুধু নয়, আত্মাও কলুষিত হয়েছে বারবার। তবুও সে বেঁচে আছে কারণ মরতে চাইলেও আত্মহত্যা পাপ। অথচ… যদি না হতো? তাহলে ৬০ টাকার দড়ি আর রুমে ঝুলন্ত ফ্যান তো আছেই।

যদি আত্মহত্যা পাপ না হতো তাহলে হয়তো বিয়ের রাতেই নিজেকে শেষ করে দিত সে, যখন প্রথম বুঝেছিলো, এই স্বামী নামক মানুষটি আদতে তার ধর্ষক। যেদিন বুঝেছিলো এই ঘর, এই সংসার, এই সমাজ সবই তার বিরুদ্ধে এক একটি ষড়যন্ত্র।
সেই নারী নিজেকে আয়নায় দেখে না, কারণ আয়নাতেও প্রতিবিম্ব দেখে কাঁদে। এক সময়কার প্রাণবন্ত মেয়েটি আজ এক চলমান দেহমাত্র, যাকে দিনে সবাই ঘরের বউ আর রাতে দেখে উপভোগের পণ্য হিসেবে। সে কথা বলতে ভুলে গেছে, হাসতে ভুলে গেছে। আজকাল শুধু চেয়ে থাকে, নিরব, স্থির চোখে… যেন অপেক্ষা করছে কোন এক বিচার দিনের।

একদিন নিশ্চয়ই পৃথিবী জানবে তার জীবনের কথা।
একদিন হয়তো তার ঘরের দেয়ালগুলো মুখ খুলে বলবে কতবার এক নারী নির্যাতিত হয়েছিলো, আর সবাই নীরব দর্শক হয়ে বসে ছিলো। সেদিন হয়তো অনেকেই লজ্জায় মুখ লুকাবে।
শাহবাগ থানায় শরীফ মিসিং কেসের ফাইল টা নিয়ে বসে আছে নিজের ডেস্কে সাইফ। কোনো প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না সুলতান পরিবারের বিরুদ্ধে। কিন্তু সাইফের মন বলছে এই কেসের সাথে সুলতান পরিবার জড়িত। এই থানার ওসি হামিদ খাঁন এক পুলিশ কনস্টেবল কে দিয়ে ডাক পাঠালো সাইফের৷ সাইফ ফাইল টা হাতে নিয়ে ঢুকলো ওসির রুমে।ওসি বসতে বললো সাইফ কে৷ সাইফ ফাইল টা ওসির দিকে বাড়িয়ে কিছু বলার আগেই ওসি একটা খাম সাইফের দিকে এগিয়ে দিলো। সাইফ খাম টার দিকে তাকিয়ে বলল-

-” এটা কি স্যার?
-” তোমার ট্রান্সফার হয়েছে।ব্যাগ পত্র গুছিয়ে নাও। চট্টগ্রাম যেতে হবে তোমার।
-” আমার ট্রান্সফার কেনো হলো স্যার?
-” সেটা জেনে তোমার কাজ নেই। এবার আসতে পারো তুমি।আর এই ফাইল আমার কাছে থাকবে।
সাইফ বেশ বুঝতে পারলো এই কাজ টা সুলতান পরিবারই করেছে।
ঢাকা সেনানিবাসের একটি গোপন ইউনিটে কয়েকদিন ধরে চাপা গুঞ্জন চলছে,নতুন কেউ এসেছে। বলা হয়, সে এসেছে অস্ট্রেলিয়া থেকে। কেউ তাকে দেখে নাই, কেউ তার মুখোমুখিও হয়নি। কেউ তার আসল নাম জানে না। তার কন্ঠস্বর কেমন তাও বলতে পারবে না। শুধু কানাঘুষো, সে ছেলে নাকি মেয়ে এটাও অজানা। তাকে ডাকার জন্য একটা নাম হলো A.J।

এখানকার নিয়ম অনুযায়ী, নতুন কেউ এলে একটা মিটিং হয়, পরিচয়পর্ব হয়, তারপর তাকে ধীরে ধীরে কাজে জড়ানো হয়। কিন্তু এবার কিছুই হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, একজন এসেছে ট্রান্সফার হয়ে। হেডকোয়ার্টারের ফাইলরুমে তার ফোল্ডারে শুধু চারটি শব্দ লেখা: TRANSFERRED. NEED-TO-KNOW. LEVEL-OMEGA.
বাকি সব ব্ল্যাকড আউট।
এমনকি ইউনিট প্রধানকেও সরাসরি কিছু জানানো হয়নি। তার কাজ শুধু একটা অপারেশন Saffron Loop চালু করা, এবং অপেক্ষা করা।

তাকে কেউ কখনও চোখে দেখেনি। ইউনিটে যখন তখন প্রবেশ করে না, আবার যখন বেরোয় তখনও কেউ ঠিক চেনে না। অফিসের বেজমেন্ট লেভেলের গোপন একটি ঘর বরাদ্দ তার জন্য, যার দরজা বাইরে থেকে স্বচ্ছ নয়,ভেতরে কনফারেন্স টেবিল ছাড়া কিছু চোখে পড়ে না। কাঁচের জানালায় যে ছায়া দেখা যায়, সেটাও ধোঁয়াটে। সে কথা খুব কম বলে। যেটুকু বলে, সেটাও ভারী গলায়, ঘ্যাড় ঘ্যাড় শোনায় যেন কণ্ঠে ইচ্ছাকৃত একটি পর্দা আছে যা ইলেকট্রনিক কিছু ব্যবহার করে আসল কন্ঠ অপ্রকাশিত রাখার চেষ্টায় । তার পোশাক সাধারণ, সেনাবাহিনীর চিহ্ন নেই কোথাও। হাতে সবসময় থাকে একটি কালচে চামড়ার নোটবুক,যাতে আঁকিবুকি চলে, তবে তা আসলে এনক্রিপটেড কোড, যা কেবল হেড কোয়ার্টারের স্পেশাল ইউনিট বুঝতে পারে।
তার বয়স হয়তো বেশি না। জন্ম সাল দেওয়া ১৯৯৫।

অস্ট্রেলিয়ায় সে ছিল মাত্র দেড় বছর। একেবারে নিঃশব্দে ঢুকে পড়েছিল অভিবাসী বাংলাদেশিদের কমিউনিটিতে। নিজের পরিচয় দিয়েছিল আন্তর্জাতিক একটি এনজিওর ফিল্ড রিসার্চার হিসেবে। বাস্তবে সে খুঁজছিল এক মানব পাচারচক্র,যাদের মাধ্যমে বাংলাদেশি মেয়েরা পাচার হয়ে যেত অপরিচিত অন্ধকারে। মিশনটা অসম্ভব ছিল, কারণ চক্রটির ডানাগুলো বহু দেশের কূটনৈতিক ছায়ায় ঢাকা ছিল। A.J সেখানেও সিল মেরে ফিরেছে প্রমান তথ্য নিয়ে। তবে মেন মাথায় কে আছে সেটা ধরতে পারে নি।

A.J এর জন্য DGFI তে একটি আলাদা ছদ্মনাম তৈরি হয়েছে The Silent Seal। এবার সে এসেছে ঢাকায়,নতুন একটি মিশনে। A.J কনফার্ম করেছে এই শহরের অভিজাত শ্রেণির আড়ালে গড়ে উঠেছে একটি পাচার চক্র, যা আন্তর্জাতিক রুটে মেয়েদের সরবরাহ করে। মিশনটি স্পর্শকাতর, কারণ এতে জড়িত কিছু সামরিক, কিছু রাজনৈতিক ও কিছু বিদেশি সংস্থা। এখানে তার পরিচয় কেউ জানবে না, চেহারা কেউ দেখবে না। শুধু তার ছায়া থাকবে। যেমনটা ছিল অস্ট্রেলিয়ায়। তবে এবার পরিস্থিতি আরও জটিল। কারণ এবার সে মাঠে নামছে নিজের দেশের মাটিতে। এখানে ভুল করার সুযোগ নেই, কারণ প্রতিটি ভুল শুধুই তাকে বিপদে ফেলবে না, বরং প্রভাব ফেলবে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রে। এখানকার চক্রগুলো অদৃশ্য, কিন্তু শক্তিশালী। দিনের আলোয় তারা জাতীয় পুরস্কার পায়, রাতের আঁধারে মানুষ বিক্রি করে।

ঢাকায় A.Jর আগমন ঘটেছে ঠিক গত কাল রাতেই। হেডকোয়ার্টারের সিকিউরিটি লগে রেকর্ড আছে একটি গাড়ির প্রবেশ, যার চালকের পরিচয় গোপন। রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে সেই গাড়ি প্রবেশ করে দক্ষিণ গেট দিয়ে, তারপর বেজমেন্টের গোপন করিডোর পেরিয়ে থামে সেই ঘরের সামনে যেখানে আলো জ্বলে না, সিসিটিভি চালু থাকে না, আর দেয়ালের কাঁচগুলো বাইরে থেকে প্রতিফলিত।
A.J এর শরীর থাকে কালো, লম্বা, হুডি সহ জ্যাকেটে ঢাকা, যা তার কাঁধ থেকে নেমে এসে হাঁটুর কাছে থেমে গেছে। এটি ছিল স্টাইলিশ, স্যুট সেলাইয়ের জ্যাকেট, কোনো বাহিনীর লোগো বা পরিচিতি ছাড়া, যা এক্সক্লুসিভ, সিক্রেট ফোর্সের সদস্যের পোশাক। তলায় কার্গো প্যান্ট কোমরের কাছে চাপা দেওয়া এক ক্ষুদ্র ছুরি আর ছোট একটি সাইলেন্সার। তার জুতার শব্দ নেই, কারণ পায়ে স্পেশাল অপস বুট। মুখ ঢাকা অর্ধেক ব্ল্যাক মাস্কে, চোখে গাঢ় সানগ্লাস। হাতে কালো গ্লাবস
এর মাঝেই সে রাতে হেডকোয়ার্টারে আসে একটি এনক্রিপটেড কোড মেসেজ-
-” Unit-10 engaged target at 2200hrs, 10Xtra on route. No official logs, shadow exit via Route Bravo.
মেসেজ টা পড়েই A.J কিছু লোক কে গুলশানে পঠিয়ে দেয়। সেই ১০ জন নারী কে বাঁচানোর জন্য৷ আর সে নিজেও যায় একা সেই গুলশানের নাইট হেইভেন ক্লাবে।

আজ জুন মাসের ২৪ তারিখ,,,
ঊর্মি উঠানে বসে আছে। পরশু মেহরিনের বিয়ে অথচ তার কোনো নতুন জামা নেই। বেস্ট ফ্রেন্ডের বিয়ে কি সে পুরোনো জামা কাপড় পড়ে খাবে? ঊর্মি মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল-
-” মা একটা নতুন জামা কিন্না দাও না। মেহরিনের বিয়েতে কি পড়মু আমি?
ইতি বেগম মেয়ের কথা শুনে বিরক্ত হলো। জানেই মেয়ে তাদের অবস্থা। জেনেও এ কথা বলছে।
-” মা ভাইরে ফোন দাও না একটা। ভাইয়ের তো চাকরি হয়ে গেছে। কিছু টাকা পাঠাতে কও।
-” টাকা পেলে কি না পাঠিয়ে থাকতো তোর ভাই? বুঝেও অবুঝের মতন কথাবার্তা কেনো বলছিস?
ঊর্মি মুখ গুমরা করে বসে রইলো।
সুলতান নিবাসে,,

বাশার সুলতান নিজের জামা কাপড় গুছিয়ে নিয়েছেন ব্যাগে। আজ তারা গ্রামের বাড়ি যাবে সোলেমানের বিয়ে উপলক্ষে। এজওয়ান যাবে না বলেছে। তার কি বলে একটা কাজ আছে সে ভীষণ ব্যস্ত। পারলে বিয়ের দিন যাবে।
ইব্রাহিমও নিজের জামা কাপড় গুছিয়ে নিয়ে ইমন কে ডেকে বলল-
-” ইমন কয়েক দিন আমি ঢাকায় থাকবো না। তুমি এ কয়েক দিন ইয়াসিনের সাথে থাকবে। একা থাকবে না। কারন বিরোধী দলের লোকেরা তোমায় চিনে ফেলেছে তো একা থাকা টা রিস্কি। তুমি ইয়াসিনের বাড়িতেই থেকো।
-” জ্বি। আসবেন কবে?
-” বিয়ে তো ২৬ তারিখ,,আজ ২৪ তারিখ৷ ৫-৬ দিনের ভেতর চলে আসবো।
কথাটা বলেই ইব্রাহিম পকেট থেকে ৮ হাজার টাকা বের করে ইমনের হাতে দিয়ে বলল-
-” বাসায় টাকা পাঠিও। আর নিজের জন্য খরচ করিও এই কয়েক দিন। আসছি।
ইমন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো। কিছু টাকার আসলেই দরকার ছিলো।
ইব্রাহিম চলে গেলো সোলেমানের বাড়ি। সোলেমানের বাড়িতে এসে দেখলো বাশার সুলতান রেডি কিন্তু সোলেমান এখন বসে ব্রেকফাস্ট করছে৷ এই ছেলে কি যাবে না নাকি?

-” কিরে এখনও খাচ্ছিস? যাবি না?
সোলেমান ছোট্ট করে জবাব দিলো-
-” হুমম।
-” কখন?
-” খাওয়া শেষ হলেই।
সোলেমানের খাওয়া শেষ হলে তারা তিনজন বেরিয়ে পড়ে। ইয়াসিনের কত শখ ছিলো সোলেমান ভাইয়ের বিয়ে খাওয়ার। কিন্তু এজওয়ান ভাই একা দেখে ইয়াসিন কেও থাকতে হলো ঢাকা। দুঃখে কষ্টে তার ইচ্ছে করছে কচু গাছের সাথে ফাঁসি নিতে। ইয়াসিন ইমনের কাছে গেলো।ইমন বিকাশের দোকানে দাঁড়িয়ে মায়ের কাছে টাকা পাঠাচ্ছিল। ইয়াসিনের মুখ টা গুমরা দেখে জিজ্ঞেস করলো-

-” কি হয়েছে তোমার ইয়াসিন?
-” কি আর হবে ইমন ভাই। কত আশায় ছিলাম ভাইয়ের বিয়ে খাব। কিন্তু ভাই আমায় নিয়ে গেল না। আমিও দেইখেন ভাইরে আমার বিয়েতে দাওয়াত দিমু না।
ইমন হেঁসে ফেললো।
-” চিন্তা করো না আমার বিয়েতে তোমায় দাওয়াত দিব।
-” আপনার সামনে বিয়ে নাকি?
-” ঠিক হয় নি,,এবার ছুটিতে বাড়ি গিয়ে ঠিক করবো বিয়ে।
-” ওহ্ আগে থেকে পছন্দ করা নাকি মেয়ে?
-” হুমম।
-” আপনাদের কপাল কি সুন্দর। আর দেখেন আমার কপাল,ভাইয়ের ভয়ে জীবনে একটা প্রেমও করা পারি নাই।
-” প্রেম করায় বাঁধা দেয় নাকি?
-” আবার জিগায়,,ভাইয়ে প্রথম দিনই কইয়া দিছে,,ইয়াসিন মেয়ে মানুষের মায়ায় কিন্তু পড়বি না। মেয়ে মানুষ সর্বনাশ ডেকে আনে জীবনে। যদি শুনি কাজ রেখে মেয়ে নিয়ে ঘুরতে তাইলে তরে বস্তায় ভরে বুড়িগঙ্গায় ফেলে আসবো। অথচ দেখেন ভাই আজ নিজেই মাইয়া বিয়ে করতে গেছে।
ইমন ইয়াসিনের কথার টোন শুনে হেঁসে ফেললো।

-” আহা কষ্ট পেও না। তোমারও বিয়ে হবে একদিন।
-” দোয়া করেন ইমন ভাই। আমার স্বপ্ন একটা হলেও যেন বিয়া হয় আমার।
মহাদেবপুরের সুলতান ভিলা আজ আনন্দমুখর হয়ে উঠেছে। বাড়ির বড় ছেলে এসেছে আজ অনেক গুলো মাস পর। আফিয়া সুলতান ছেলের পছন্দ মতন সব খাবার রেঁধে টেবিল সাজালো। দীর্ঘ ১১ মাস পর এসেছে সোলেমান এ বাড়িতে। বিয়ে না হলে বোধহয় এ বছর আসাও হত না। রুমাইসা ভাইকে দেখেই গল্প জুড়ে দিয়েছে। রুমাইসার মুখে শুনতে পারলো তার বউয়ের নাম মেহরিন। সোলেমান একবার উচ্চারণ করলো সেই নাম ঠোঁটে।

আফিয়া সুলতান এজওয়ানের কথা জিজ্ঞেস করলো। দেশে ফিরে একবারও দেখা করে নি এই ছেলে। আল্লাহই জানে কি দিয়ে যে তৈরি করেছে এই ছেলেকে। ইব্রাহিম আমিরুল সুলতান আর আনোয়ার সুলতানের সাথে কথা বলছে। মেয়ের বাড়ি এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়। যা শুনলো মেয়ের বাবা একজন ব্যবসায়ী। দুপুরের খাবার টা খেয়ে তারা একটু আশেপাশটা হেঁটে দেখলো। আগামীকাল অলংকারপুর গ্রামে যেতে হবে বিয়ের শাড়ি দিয়ে আসতে। আফিয়া সুলতান বলেছে সোলেমান আর ইব্রাহিম কে যেতে। এই ফাঁকে সোলেমান মেয়েটাকেও দেখতে পারবে।
ঊর্মি বিকেলে মাকে নিয়ে বাজারে আসে নতুন জামা কেনার জন্য। ভাই তার টাকা পাঠিয়েছে। এবার সে নতুন জামা পড়তে পারবে। পছন্দ মতন একটা মিষ্টি কালারের গ্রাউন কিনলো। এটা পড়বে বিয়ের দিন।
পরের দিন সকাল ১০ টার দিকে সোলেমান বের হলেন বাড়ি থেকে। হাতে মেহরিনের বিয়ের শাড়ি। যেতে চাচ্ছিলেন না একদমই, কিন্তু মায়ের জোরাজুরিতে বাধ্য হয়েই বের হতে হলো। বিয়েশাদি, সাজগোজ এসবের প্রতি তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।

এদিকে মেহরিন দের বাড়িতে চলছে ঘরোয়া করে গায়ে হলুদের তোড়জোড়। সেরিন খুব যত্ন করে মেহরিনের হাতে মেহেন্দি দিচ্ছে। পাশে বসে আছেন ঊর্মি, নিজের চোখে সারা বাড়ির ব্যস্ততা দেখে মুগ্ধ। আফিয়া সুলতান ফোন করে সানজিদা বেগমকে জানিয়ে দিয়েছেন,মেহরিনের বিয়ের শাড়ি পাঠানো হয়েছে।
কিন্তু সোলেমান বাড়ি অবধি গেলেন না। বাড়ির পাশের গাছবাগানের কাছে এসে গাড়ি থামালেন। পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে পাশে বসা ইব্রাহিমের হাতে ধরিয়ে দিলেন। আসার পথে আফিয়া সুলতান দিয়েছিল।
-” ফোন দিয়ে কাউকে এসে শাড়িটা নিয়ে যেতে বল ইব্রাহিম। আমি বাড়ির ভেতরে যেতে পারবো না।
ইব্রাহিম নম্বর টা ফোনে উঠিয়ে কল দিলো।সানজিদা বেগম ধরলেন। ইব্রাহিম সালাম দিয়ে বলল-

-” বিয়ের শাড়িটা এনেছিলাম। তো আপনাদের বাসা টা চিনছি না। কাউকে যদি পাঠিয়ে দিতেন।
-” অবশ্যই বাবা। আমি মেহরিন কে পাঠাচ্ছি। তুমি কোথায়?
-” গাছ বাগানের পাশে।
সানজিদা বেগম ফোন কেটে দিয়ে আশেপাশে তাকালো। সবাই ব্যস্ত। হঠাৎ খেয়াল হলো,তিনি ভুলে মেহরিনের নাম বলে দিয়েছেন। অথচ মেহরিন তো এখনো মেহেন্দি দিচ্ছে। সানজিদা বেগম ঊর্মির দিকে তাকিয়ে বলল-
-” ঊর্মি মা একটা কাজ করে দে তো।
উর্মি মেহেন্দি ভরা হাত নিয়ে উঠে বলল-
-” হ্যাঁ চাচি বলো।
-” গাছ বাগানের ওখানে দেখ তোর ভাইয়া আছে।মেহরিনের শাড়ি নিয়ে এসেছে। নিয়ে আয় তাদের।
ঊর্মির কপাল কুঁচকালো-
-” ভাইয়া মানে মেহরিনের জামাই?
-” হুমম।
ঊর্মি হাত ধুয়ে ছুট লাগালো গাছ বাগানের ওখানে।

ইব্রাহিম শাড়ির ব্যাগ টা নিয়ে গাড়ির বাহিরে অপেক্ষা করছিলো। সোলেমান শুনেছে মেহরিন কে পাঠাবে। ঊর্মি দূর থেকে দেখলো সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত এক লোক দাঁড়িয়ে আছে। কিছুটা এগিয়ে আসতেই চেহারাটা স্পষ্ট হলো। এই লোকটাকেই তো সে ঢাকায় দেখেছিল! তার মানে এই লোকই মেহরিনের স্বামী?
ঊর্মির মুখে একটু লজ্জার ছায়া দেখা গেল।
ইশ! আর সে কিনা এই লোককে নিয়ে,অন্যরকম কল্পনা করেছিল!
আস্তাগফিরুল্লাহ! বান্ধবীর স্বামীকে নিয়ে এমন ভাবা,তওবা তওবা।
ঊর্মি ভদ্র মতন এগিয়ে এসে বলল-

-” ভাইয়া আপনারাই তারা একটু আগে ফোন দিয়ে আসতে বলেছিলেন?
ইব্রাহিম তাকালো ঊর্মির দিকে। কিভাবে যেন এক দেখাতেই চিনে ফেললো। এই মেয়েকেই তো সে সেদিন রাস্তায় দেখেছিল। গরীব অসহায় ভেবে ত্রাণ ও দিয়েছিল। বন্ধুর কানে যদি যায় তার বউকে ইব্রাহিম ত্রাণ দিয়েছিলো তাহলে তো অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে। আর এই মেয়েও যদি বলে দেয় তখন?
ইব্রাহিম এক ঢোক গিলে শাড়িটা হাতে দিয়ে বলল-
-” এই যে ভাবি এটায় বিয়ের শাড়ি। আসছি।
ঊর্মি ভ্রু কুঁচকালো ভাবি ডাক শুনে। আরেহ্ তাকে কি বিবাহিত মনে হয় নাকি?

দাহশয্যা পর্ব ৯

-” আপনারা বাড়িতে যাবেন না?
-” না ভাবি। আসছি আসসালামু আলাইকুম।
গাড়িতে গিয়ে উঠলো ইব্রাহিম। ভেতরে বসে থাকা সোলেমান জানালার ফাঁক দিয়ে এক ঝলক দেখলো ঊর্মি কে । চিকন গড়ন, কিন্তু মুখখানি উজ্জ্বল। বয়স টাও কেমন কম কম লাগছে।
এই মেয়েটাই তার বউ! বাসায় কি ভাত খেতে দেয় না এই মেয়েকে? এমন হালকা-পাতলা শরীর!
সোলেমানের চোখে মুখে স্পষ্ট হলো বিরক্ত।

দাহশয্যা পর্ব ১১