Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৯ (২)

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৯ (২)

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৯ (২)
ইনান হাওলাদার

আহি কিছুক্ষণ আগেই খেয়াল করেছে করেছে তূর্য বাগানে গিয়েছে। তাই খেলা রেখে তাহিরকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে বসে আছে। বারবার মেইন ফটকের দিকে দৃষ্টি দিচ্ছে তূর্য কখন ফিরে। কিছুক্ষণ অতিবাহিত হওয়ার পর কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে আসতে দেখে খানিকটা উচ্চ কন্ঠে তূর্যকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল,
” খুব মজা হবে বল তাহি? দুই ,দুইটা বিয়ে বাড়িতে। আগে তূর্য ভাইয়ের পরে আমার। আচ্ছা,বলতো আমি বিয়েতে কি পরবো? শাড়ি নাকি ল্যাহেঙ্গা?”
রা’গে-জি’দে চোখ মুখ লাল করে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করছিল তূর্য। আর এসেই আহির মুখে এমন কথা শুনে রাগের পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়ে গেল।কোনো রকমের বলা-কওয়া ছাড়া মেয়েটার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে যেতে দাঁত চেপে বলল,

” কা’ফনের কাপড় পরাবো তোকে ,জা’নোয়ার”
তারপর সোজা উপরে–নিজের রুমে নিয়ে গেল। এনেই শক্ত করে দুই বাহু চেপে ধরে রে’গে বললো,
” বিয়ে করার অনেক শখ তোর ,না?”
আহি ভেবেছিল তূর্য হয়তো এবারেও তাকে ইগনোর করবে। এভাবে অ্যা’টাক করতে পারে সে ভাবতে পারেনি। এভাবে শক্ত করে চেপে ধরায় হাতে প্রচণ্ড ব্যথা পেলে মেয়েটা।হাড্ডি – মাংস যেন একত্রিত হয়ে আসছে।তবুও সেদিকে পাত্তা দিল না। সে জিদের সাথে দৃঢ় গলায় বলল,
” হ্যাঁ !”
” তোর শখ আমি মেটাবো ” তূর্য দাঁত পি’ষে কথাটা বলতে বলতে ওকে ঠেলে নিয়ে দরজার সাথে চেপে ধরলো । কোমরের ক্ষ’ততে চাপ খেতেই চোখ বন্ধ করে আর্তনাদ করে উঠলো আহি,

” আহ্.. ,তূর্য ভাই ! লাগছে ”
তূর্য আরো জোরে চেপে ধরে বলল,
” লাগুক ”
ব্যথায় মুখ কুঁচকে আসছে আহির।নাহ!এবার বেশি বাড়াবাড়ি হচ্ছে।তূর্যের হতে নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করতে করতে সে বলল,
” আপনি বিয়ে করতে পারবেন আর আমি করলেই দো’ষ?”
” হ্যাঁ, দো’ষ! আমি একশটা বিয়ে করবো। ”
” তাহলে আমিও করব ”
” তোর বাপের তালে নাচলে তোকেসহ তোর বাপকে আমি খু’ন করবো আহি ”
” আপনি এসব কেন করছেন তূর্য ভাই ?আমি জানি এখনো আমাকে ভালোবাসেন আপনি। তাহলে এভাবে ইগ’নোর কেন করছেন? কি চাইছেন আপনি? আপনার এই বিয়ের ব্যাপারটাও যে নাটক আমি বুঝছি । এসব কেন করছেন ? আপনার জন্য পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠছে।সেটা আপনি বুঝতে পারছেন না ? ” অসহায় কন্ঠে কথাগুলো বলে থামলো আহি।তূর্য ঝাঁ’ঝালো কন্ঠে বলে উঠলো,

” সিচ্যুয়েশন আমি জটিল করেছি? নাকি তুই করেছিস ? ”
” ভালো হয়েছে করেছি। আরো করবো ! পারলে ঠেকান ”
দুই আঙুলে মেয়েটার গাল চেপে ধরলো তূর্য বলল,
” খুব ত’র্ক করছিস আহি। ”
” বেশ করছি।একশো’বার করবো।যেই শা’কচুন্নিকে বিয়ে করে আনবেন ওর চুল ধরে ঘুরাবো। জ্বা’লিয়ে-পু’ড়িয়ে ছা’র’খা’র করে দিবো ওর জীবন আমি ”
কোনো রকমে আধো আধো করে কথাটা বলল আহি। তূর্য নিজের হাতের বাধন শিথিল করলো।তবে রা’গ এখনো নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলো না। কিছু একটা বলতে গিয়েও আটকালো নিজেকে।আহির ঘাড় বরাবর দরজায় সজোরে ঘু’ষি দিলো।
ভারি খাটের দরজার কোনো ক্ষ’তি না হলেও। রক্তে – মাংসে গড়া মানব হাতের আঙুলের পাশ দিয়ে ছিলে গেল। একবার দিয়েই ক্ষান্ত হলো না সে।পরপর এলোপাতাড়ি কয়েকটা আঘাত হানতেই আহি আর্তনাদ করে উঠে আটকালো তাকে।কাঁদো কাঁদো হয়ে চেঁ’চিয়ে উঠলো,

” আপনি পাগল হয়ে গেছেন তূর্য ভাই ”
” পা’গল তো তুই আমাকে করছিস । যা চোখের সামনে থেকে ” বলে তূর্য ধাক্কা দিয়ে পাশে সরালো আহিকে। হাতের নাগালে থাকা মাটির তৈরি কারুকাজ করা সোপিচটাকে ফেলে দিলো মেঝেতে।মুহুর্তেই সেগুলো চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেল।আহি তাল সামলাতে না পেরে পড়তে পড়তে বাঁচালো নিজেকে। অনেকটা রে’গে গেছে তূর্য সামলানোর জন্যে তাকেই কিছু করা দরকার।কিন্তু কি করবে ভেবে না পেয়ে পায়ের বৃদ্ধা আঙুলে ভর দিয়ে কিছুটা উঁচু হলো সে তবুও তূর্যের নাগাল পেতে ব্যর্থ হলো।দুই হাতে তূর্যের কাঁধ জড়িয়ে ধরে আর খানিকটা নিচু করলো তাকে।তারপর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার শুষ্ক, গাঢ় বাদামী রঙের ও’ষ্ঠে আচানক নিজের গোলাপী ওষ্ঠপুটের ছোঁয়া দিলো। শব্দ করে চু’মু খেয়ে সেকেন্ডের ব্যবধানে গলা ছেড়ে বুকে মাথা রাখলো আহি।তবে এই সামান্য ছোঁয়াতেই অদ্ভুদ ভাবে শান্ত হয়ে গেল তূর্য। যেন পাথর হয়ে গেছে।ঘটনাটা বুঝতে তার কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলো।বুকের ভিতরের এক ঝড় থেমে অন্য ঝড়ের আগমন হলো। হৃৎপিণ্ডের গতি অদ্ভুতভাবে বাড়তে আরম্ভ করেছে। চোখ বন্ধ করে আপন মনে একবার শুধু আউড়ালো,
” এটা তুই কি করলি আহি ! ”

তূর্য ওর আর আসলাম চৌধুরীর মধ্যে হওয়া যাবতীয় শর্ত এতক্ষণ ধরে সবটা খুলে বলল তাসিনকে। তাসিন যে তূর্যকে জোর করেছে সেটা নয়,নিজে থেকেই সকল রহস্যের উন্মোচন করলো সে।আর এতো বছরে আজকেই প্রথম বারের মতো নিজেকে এভাবে উপস্থাপন করলো তূর্য। সবসময় স্ট্রং থাকা একটা মানুষ যদি এভাবে নিজের আবেগ প্রকাশ করে তাহলে অপর দিকের মানুষটার স্বভাবতই খারাপ লাগবে। তাসিনেরও বন্ধুর জন্যে খারাপ লাগছে। তবে সে প্রকাশ করতে চায় না। এতে তূর্য আরো ভে’ঙে পড়বে। তবে কি বলবে সেটাও খুঁজে পাচ্ছে না। সে তো আর তূর্যের মতো নয় যে যেকোনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে। সবটা সামলে নিতে পারে। কিছুক্ষণের নীরবতা শেষে তূর্য বলল,

” এই প্রথমবারের জন্যে মনে হচ্ছে আমি আহিকে হারিয়ে ফেলব।চাচ্চু এমনটা কেন করছেন ,তাসিন? ” তূর্যের করুণ সুরে বলা কথার বিপরীতে তাসিন কি বলবে খুঁজে পায় না । সে বন্ধুকে বোঝানোর ভংগিতে বলল,
” এভাবে হুট করে কোনোদিন বিয়ে ঠিক হতে পারে না, ভাই। হয়তো তোর ফ্যামিলি মিলে নাটক সাজাচ্ছে।বিয়েটা আলটিমেটলি তোর সাথেই দিবে। ”
” উহু! ” মৃদু কন্ঠে বলল তূর্য।
“তুই তো লজিক ছাড়া কোনো কথা বলিস না।একটু লজিক্যালি ভেবে দেখ,অন্য কারো সাথে বিয়ে হলে আহি এমন খুশি হতো ? সে মেয়েটা আজ সকাল পর্যন্তও পা’গলামি করেছে সেই মেয়েটা হুট করেই এমন হাসি খুশি কিভাবে হলো? হয়তো তোকে সারপ্রাইজ দিবে বলে কেউ কিছু জানাচ্ছে না ”

” হুট করেই না।এসব কিছু আসলাম চৌধুরীর চাল। উনি মি’থ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমার কাছ থেকে এক মাসের টাইম নিয়েছেন। আর এই সময়ের মধ্যে বিয়ের সকল অ্যারেনজমেন্ট করেছে। কিছুদিন আগে চাচ্চু একবার আহিকে নিয়ে ওনার কোন ফ্রেন্ডের বাসায় গিয়েছিলেন। খবর নিয়ে জানতে পেরেছি ওই বাড়িতেও নাকি বিয়ের অ্যারেঞ্জমেন্ট চলছে। জানে বাড়িতে আহির বিয়ের কোনো সম্বন্ধ আনলে আমি সিন’ক্রিয়েট করবো। ”
এইটুকু বলে থামলো তূর্য ।একটু বিরতি নিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে বলল,
” চাচ্চু বেইমানি করলেন আমার সাথে,তাসিন। ”
তাসিন মানতে পারলো না তূর্যের কথা। সে বলল,
” তাহলে আহি এত হাসি খুশি কিভাবে ভাই? ”
” হয়তো ওই স্টু’পিডটাও এসবের কিছু বুঝতে পারছে না। আমার ভালোবাসার প্রতি বিশ্বাস আছে আমার,ও জেনে বুঝে কখনো অন্য কাউকে বিয়ে করতে রাজি হবে না। ”
বন্ধুর এরকম অসহায়ত্ব মানতে পারছে না তাসিন।এরকম সিরিয়াস পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা দরকার। সে তূর্যের কথা ধরে দুষ্টুমি করে বলল,

” বাহ! বাহ! ভালোই তো তূর্য। তুই তো দেখি তোর চাচার চেয়ে বেশি গিরগিটি। এক কথার মধ্যেই একবার ‘স্টুপিড ‘ ,আরেকবার
‘ আমার ভালোবাসা ‘ । আহির উচিত-ই তোকে বিয়ে না করা।মেয়েটার বিরহে ম’রছিস আবার তাকেই ‘ স্টুপিড ‘ বলছিস ”
মলিন হাসলো তূর্য। তাসিন পুনরায় বলল,
“শোন , তোর চাচার কথা আর ভাবতে হবে না তোকে। তুই আহিকে নিয়ে কাজী অফিসে আয়। আলিয়া,নাবিল আর পিংকিকে আমি আসতে বলছি ”

” এই মে’ন্টাল প্রেসার আমি আর নিতে পারছি না। জাস্ট ডি’জগাস্টিং লাগছে।আমি আর কিছু করবো না। নাথিং! বাট,একবার যদি দেখি বিয়ের জন্যে চাচ্চু আহিকে ফো’র্স করছেন।তাহলে ঐ মুহূর্তে পৃথিবীর কোনো শ’ক্তি আহিকে আমার থেকে আলাদা করতে পারবে না।”
এই পুরোটা ঘটনা,কথপোকথন কেউ আড়াল থেকে দেখে গেল,অথচ সেটা তূর্যের অজানা রইলো। লোকটার চোখ মুখে শুকনো ভাব।হয়তো নিজেকে অপরাধী ভাবছেন। দরজার গোড়া থেকে কিছুটা সরে গেলেন আসলাম চৌধুরী ।মনে মনে বললেন,

” আমি জানি তূর্য, আমার মেয়ের খেয়াল তোমার থেকে বেশি এই পৃথিবীর কেউ রাখতে পারবে না। আমি হাজার চেষ্টা করলেও তোমার থেকে ভালো ছেলের সাথে আমার মেয়েকে জুড়তে পারবো না। তবুও আমার আহিকে তোমার হাতে তুলে দিতে পারবো না,বাবা।শুধু এইটুকুই জানি এই সম্পর্ক হওয়ার নয়।আমাকে ক্ষ’মা করে দিস তোরা। ”
কথাগুলো বলে পাশ ফিরতেই বড় ভাইয়ের মুখোমুখি হলেন আসলাম চৌধুরী।কিছুক্ষণের নীরবতা চললো দুজনের মাঝে।তারপর মুখ খুললেন আকবর চৌধুরী।ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
” ভালোবাসা কোনো অপরাধ নয়। এসব মনের কাজবাজ। নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নেই।নাহলে তূর্যের মতো বুঝদার,সোস্যাল ছেলে কখনোই আহির মায়ায় জড়াতো না। আমি কখনোই এসব বিষয় নিয়ে তোর সাথে আলাপ চারিতা করতে চাইনি । কিন্তু,চোখের সামনে এসব সহ্য করা যায় না আসলাম। ” বলে একটু থামলেন তিনি।তারপর পুনরায় বললেন,

” আমার ভাই কখনোই এমন কঠোর ছিল না। তাহলে হঠাৎ করে আজ কি হলো ? ” আসলাম চৌধুরীর চোখ লাল হয়ে উঠেছে।তিনি নিজের কাঁধ থেকে ভাইয়ের হাত নামিয়ে দুই হাতে মুঠ করে ধরলেন। ভেজা গলায় বললেন,
” পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও ভাইজান ”
ব্যস! তারপর আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলেন না। চোখ মুছতে মুছতে জায়গা ছাড়লেন। আকবর চৌধুরী জানেন না ভাইয়ের কি হয়েছে ।এই সম্পর্কে কেন সে এতটা বাঁধা দিচ্ছে।কিন্তু ,এর পিছনে যে কোনো রহস্য আছে বুঝতে পারছেন তিনি।কি সমস্যা সেটা বললে তো সবাই মিলে একটা সমাধান বের করা যায়।সেটাও বলছে না।আবার ভিতরে ভিতরে অপরাধ বোধে ভুগছে। ছোট দুই ভাইকে দুই হাতে মানুষ করেছেন তিনি।তিনি মনে করতেন তাদের মতি-গতি বোঝা খুব বেশি কঠিন কাজ না তার কাছে।কিন্তু এখন কেমন যেন বুঝে উঠতে পারছেন না। তিনি ভুলে গেছিলেন তার ভাইয়েরা বড় হয়েছে।

পুরো পরিবার একদিকে আর আসলাম চৌধুরী অন্যদিকে। এজন্যে যেন পরিবারের ভিলেইন হয়ে উঠেছেন তিনি। ঘরের স্ত্রীও বুঝছেন না তাকে।বুঝবেই বা কি করে! না বোঝার-ই কথা। মারুফা বেগম ঠিকমতো কথা বলাও ছেড়ে দিয়েছেন আসলাম চৌধুরীর সাথে। শেষ বয়সে এসে এত মা’নসিক প্রে’সার নেওয়াও ক’ষ্টসাধ্য। তিনি বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে মারুফা বেগমকে ডাকলেন। এক কাপ চা আনার জন্যে বললেন। কিছুক্ষণ বাদে থমথমে মুখে চা নিয়ে হাজির হলেন মারুফা বেগম। স্বামীর ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বুকের মধ্যে মুচড়ে ওঠলো। তিনি জানেন আসলার চৌধুরী যখন এতটা কঠোর ভাবে বাঁধা দিচ্ছেন এর পিছনে নিশ্চয়ই বড় কোনো কারণ আছে।কিন্তু নিজে থেকে জানতে চান না তিনি।এত বছর ধরে সংসার করছেন তারা লোকটার কি উচিৎ না নিজে থেকেই সকল সমস্যার কথা বলা? যদি সুখে-দুঃখে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের পাশে না থাকে ,নিজেদের মধ্যের সর্বোচ্চ গোপনীয় কথা শেয়ার করতে না পারে তাহলে এত বছর ধরে তাদের মধ্যে যেই সম্পর্ক সবটা কি দায়িত্বের? কোনো ভালোবাসা নেই এর মধ্যে?
তিনি চায়ের কাপটা দিয়ে চলে যাচ্ছিলেন তখনই পিছু ডাকলেন আসলাম চৌধুরী,

” কথা বলা পুরোটাই ছেড়ে দিলে, আহির মা? ”
” তাছাড়া আর কি করবো।যে বাবা মেয়ের সুখের দিক দেখে না ,মেয়ে কি চায় বুঝে না ,সেই মেয়ের মা হয়ে কিভাবে আমি কথা বলি? ” বিদ্রুপের সাথে বললেন মারুফা বেগম।
মারুফা বেগম পুনরায় বললেন,
” তুমি মেয়েকে কি বুঝিয়েছ আমি জানি না। কিভাবে মেয়েটা আমার এত খুশি হচ্ছে জানি না। কিন্তু যখন ও জানতে পারবে তোমার এই সবটা ছলনা,সবটা মিথ্যা,ওর অগচরে বিয়ে ঠিক করে এসেছো । তখন কি করবে তুমি? কিভাবে মুখ দেখাবে নিজের মেয়েকে? মেয়েকে না জানিয়ে বিয়ে ঠিক করেছ ভালো কথা! মেয়েকে না জানিয়ে বিয়ে দিবে কিভাবে?
তোমার কি মনে হয়? তুমি বলবে আর ও কবুল বলে দেবে ? আর কান খুলে শুনে রাখো, তোমার ঐ অতিথি আপ্যায়ন আমি করতে পারবো না।আমি কেন ? এই বাড়ির কেউ করতে পারবে না।”
বলে হনহন করে বেরিয়ে গেলেন তিনি।
মারুফা বেগম যাওয়ার কিছুক্ষন পর নীরব কক্ষে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন আসলাম চৌধুরী। বি’ষাদ হাসলেন তিনি।বললেন,

” আসলেই আমি ভালো বাবা না।ভালো বাবারা কখনো এমন কঠোর হতে পারে না।কিন্তু,তুমি যে তূর্যের দুধ মা ভুলে গেলে? মেয়ের ভালো বাবা হতে গিয়ে কি আমি এখন ধর্ম বি’সর্জন দিবো?
হালাল – হা’রাম ত্যাগ করবো? ”
তার কথা মারুফা বেগমের কান অবধি না পৌঁছালেও অন্য কারো কানে পৌঁছালো। আর কথাগুলো বি’ষের মতো গিয়ে বাঁধলো বুকে। তূর্য কথা বলার জন্যে আসছিল আসলাম চৌধুরীর রুমে।কিন্তু এসব কথা শুনে আর যেতে পারল না। আপনা-আপনি পা জোড়া স্থির হয়ে গিয়েছে। মস্তিষ্কে বারবার আসলাম চৌধুরীর বলা কথাগুলো দামামা বাজাচ্ছে। সত্যিটা কেন এত নি’ষ্ঠুর হলো ? নিঃশ্বাস আটকে আসছে তার।মনে হচ্ছে এই বুঝি দম বন্ধ হয়ে মা’রা যাবে। এটা কি সত্যি ঘটনা ? নাকি আসলাম চৌধুরী আবার ছ’লনা করছে তার সাথে ?
তূর্য নিজের অসাড় শরীরটাকে কোনো রকমে ঠেলে আসলাম চৌধুরীর রুমে নিয়ে গেল।তূর্যকে দেখে তিনি নড়ে-চড়ে বসলেন।কথাগুলো শুনেছে কিনা বুঝে উঠতে পারলেন না।তবে যদি শুনে থাকে ভালোই। ঘটা করে ছেলেটাকে বলা আরো বেশি যন্ত্র’ণাদায়ক।যার কারণে নিজে সবার কাছে দো’ষী হয়ে
আছে তবু আসল সত্যটা জানাতে পারছে না।
তূর্য ওনার কাছে গিয়ে মেঝেতে হাঁটু গেঁড়ে বসলো। ওনার দুই হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে ক’রুণ সুরে বলল,

” চাচ্চু,এগুলো মিথ্যা বলুন? মিথ্যা বলছেন কেন?
আপনি ওর লাইফ পার্টনার হিসেবে যেমন ছেলে চান আমি ঠিক তেমন হয়ে যাব। আপনি চাইলে নিজেকে টোটালি চেইঞ্জ করে ফেলবো।আই প্রমিজ ইউ চাচ্চু। তবুও বলুন এসব মিথ্যা ”
আসলাম চৌধুরী ছেলের এমন অ’সহায়ত্ব সহ্য করতে পারলেন না। দুই চোখ বেয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়লো। তিনি ভেজা গলায় বললেন,
” ভাগ্য তোদের সহায় না ,বাবা। জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে তিন, বিধাতা নিয়ে। বাস্তবতা যত শিগগিরি মানতে পারবি তোদের জন্যে তত মঙ্গল।”
দ্বিতীয় কোনো কথা বললো না তূর্য। জড় বস্তুর ন্যায় উঠে জায়গা ছাড়লো। রুম থেকে বাইকের চাবিখানা নিয়ে বের হয়ে গেল।পারভিন বেগম বারবার পিছু ডেকে জানতে চাইলেন কোথায় যাচ্ছে কিন্তু কোনো কথাই ওর কান অবধি পৌঁছালো না।কানে শুধু আসলাম চৌধুরীর বলা কথাগুলোই বাজছে।

আজকের আকাশটা বিকেল থেকেই কেমন গুমোট মে’রে পড়ে আছে। যখন-তখন গগন ফেঁটে বৃষ্টি পড়তে পারে। সেদিকে কোন খেয়াল নেই তূর্যের।একটা খোলা মাঠের এক পাশে রাখা বেঞ্চিতে বসে আছে সে।এইযে সেই মাঠ ! যেখানে জীবনের প্রথমবার আহিকে নিয়ে ঘুরতে এসেছিল সে। সেদিন আহিকে নিয়ে বেরোনোর শুরু থেকে শেষ অবধি সকল মুহূর্ত গুলো একবার কল্পনা করলো।রেল পাতের উপর দিয়ে হাঁটা , এটা – ওটা খাওয়ার বায়না,সকল প্রকার বাচ্চামি-বো’কামি ।সবশেষে আহিকে উৎসর্গ  করে ওর গাওয়া গান।এখানে বসেই দূরের সেই রেললাইনটা দেখা যাচ্ছে।আজও কিছু ছেলেরা গান করছে।তূর্যের থেকে খানিকটা দূরে তারা। সমবেত কন্ঠে গাইছে,

” পরাণ যদি দুইটা হয়রে
একটি গেলে একটি রয় যে
পরাণ যদি দুইটা হয়রে …..
ও জ্ব’লেরে…..জ্ব’লেরে……জ্ব’লেরে
হিয়া জ্বলে প্রিয়ার দরদে
হিয়া জ্বলে প্রিয়ার দরদে
প্রেম যে বোবা ,প্রেম যে কালা
তাই প্রেমে এত জ্বা’লা
এই জ্বালায় পরাণ কাঁদে রে ”

গানটা পুরোপুরি শেষ করতে পারে না ছেলেগুলো।ঝরঝর করে বৃষ্টি পড়তে আরম্ভ করায় দৌঁড়ে চলে গেল তারা। ছেলেগুলো কোথায় গেল খেয়াল করেনি তূর্য।কিন্তু এতক্ষণ ধরে তাদের গাওয়া গানের প্রত্যেকটি কথা অনুভব করেছে সে। যেন ওর হৃদয়ের পরিস্থিতি পড়তে পেরে ছেলেগুলো গান গেয়ে গেল।
ঘন বৃষ্টি হওয়ায় অল্প কিছুক্ষন পার হবার মধ্যেই পুরো কাক ভেজা হয়ে গেছে ছেলেটা।এদিকে খেয়ালও নেই সে বৃষ্টির পানি স’হ্য করতে পারে না।খেয়াল থাকলেও বা কি ! সে উঠতো নাকি? বেশ অনেক্ষণ মূর্তির মতো সেই জায়গায় বসে রইলো ও।
তারপর হঠাৎ মাথায় এলো বৃষ্টির সময়ের দোয়া নাকি আল্লাহ বেশি কবুল করেন।এশার আযান পড়েছে বেশ খানিকক্ষণ হয়েছে। ও ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক চাইলো । একটু সামনেই একটা চায়ের টং।এলোমেলো ভঙ্গিতে হেঁটে সেখানে পৌঁছালো। দোকানের পাশে একটা মগ রাখা আছে। টিনের চাল থেকে সারি বেঁধে বৃষ্টির পানি পড়ছে।সেখান মগটা ধরার কিছুক্ষণের মধ্যেই পানিতে ভরে গেল সেটা। ওযু সেরে রাস্তায় নামলো। হাই ওয়ে না হওয়ায় খুব  কম সংখ্যক গাড়ি-ঘোড়া দেখা যায়।আর বৃষ্টির কারণে সেটা শূন্যে এসে দাঁড়িয়েছে।মাঝ রাস্তায়ই সৃষ্টিকর্তার ইবাদতে মশগুল হলো সে।
নামাজ শেষে লম্বা মোনাজাতে বসলো,

” হে আল্লাহ ! এ কিসের শাস্তি দিচ্ছ আমায়।যে শুরু থেকে হা’রাম তার জন্যে মনে কেন অনুভূতি আনলে? দয়া করে একটা কিছু করো,এই সবটা মিথ্যা করে দেও আল্লাহ।একটা দুঃস্বপ্ন করে দেও। ওকে পাওয়ার আর কোনো আশা রইলো না আমার।
আহিকে শুধু আমার করে দেও জীবনে আর কিচ্ছু চাইবো না তোমার দরবারে।তোমার এই অ’ধম বান্দাটাকে একটু দয়া করো,মাবুদ।
এই য’ন্ত্রণা আমার আর সহ্য হচ্ছে না।ওকে আমার করে দেও ,নাহলে আমাকে তোমার করে নেও,খোদা। ”
বৃষ্টির ফোঁটা আর নীরব পানিতে ছেলেটার হাত ভরে উঠছে।
মোনাজাতটা আর দীর্ঘ করতে পারলো না সে। গলা দিয়ে আর কথা বের হচ্ছে না।মনে হচ্ছে গলাটা কেউ যেন দুই হাতে শক্ত করে চেপে রেখেছে।

মোনাজাত শেষে আবার সিজদায় পড়লো তূর্য। এতক্ষণ ধরে নীরবে চোখের পানি ফেললেও সিজদায় পড়ে ডুকরে কেঁ’দে উঠলো সে।খুব করুণ সেই সুর কোনো কালেই কান্না করতে পারে না ছেলেটা।ফলস্বরূপ শুধু গগন বিদারী চিৎ’কার আর গোঙানোর আওয়াজ হচ্ছে। কান্না করতে করতে একপর্যায়ে সেখানেই হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়লো।
ততক্ষণে বৃষ্টির গতি অনেকটা কমেছে।ব্যস্ত ভঙ্গিতে উঠে পকেট হাতিয়ে বাইকের চাবি বের করলো। বাইকটা চালিয়ে কিছুটা দূর না যেতেই সেটা রোডে পিছলে পড়লো। বাইক হতে কয়েক হাত দূরে গিয়ে ছিটকে পড়লো শরীরটা। মাথা গিয়ে বাড়ি খেল একটা গাছের সাথে।

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৯

না! তেমন কোনো বড় এ’ক্সিডেন্ট না। মাথায় হেলমেট থাকায় শুধু কপালের কাছে একটু ক্ষ’ত সৃষ্টি হয়েছে।আর হাত-পায়ের কিছু জায়গা হতে চামড়া উঠে ছিঁলে গিয়েছে। ও আবার উঠে এলো বাইকের নিকটে ।এমন কায়দায় এলো যেন গায়ে কোনো ব্যথা-ই লাগেনি। তারপর বাইক স্টার্ট দিয়ে আবারও ছুটে চলল। গতি কমানোর কোনো প্রয়োজন মনে করলো না। বরং ,এবারে সর্বোচ্চ গতিতে ছুটে চলেছে। মানছে কোনো ট্রাফিক রুলস।একটু এদিক – ওদিক হলেই জীবন প্রদীপ সাথে সাথে নিভে যেতে পারে। ব্যক্তিটা হয়তো চাইছেই নিভে যাক। এতে যদি একটু শান্তি মেলে। এই ন’রক য’ন্ত্রণা থেকে রেহায় পায়।

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫০