Home লাল শাড়িতে প্রেয়সী লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৬২

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৬২

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৬২
Fatima Fariyal

নিজের দুই হাত দিয়ে আগুনের সেই ভয়ংকর আগ্নেয়গিরিটাকে নিভিয়ে ফেলতে চাইছে আহাদ। যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না, এই আগুনটা বাস্তব। এই ধ্বংসটা সত্যি। এই তো… এই তো একটু আগেও রাস্তায় বসেই বাবা হওয়ার আনন্দে সে ভবিষ্যৎ আঁকছিল। হাসছিল। চোখে ছিল অদ্ভুত এক নরম আলো। সে বাচ্চাদের নাম ঠিক করেছিল। তাদের ছোট ছোট আঙুল ধরে হাঁটার স্বপ্ন দেখেছিল। তাদের মুখের আধো বুলিতে “বাবা” ডাক শোনার স্বপ্ন দেখছিল। সবকিছু খুব স্পষ্ট ছিল তার চোখে। আর এখন? সবকিছু জ্বলছে। সব স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে পৈশাচিক আগুনের উল্লাসে। আগুনের লেলিহান শিখা যেন আকাশ ছুঁতে চাইছে। মৃত্যু যেন উল্লাসে নাচছে।

“ভাই, সরে আসেন! আগুনের তাপ খুব বেশি!”
“আহাদ, পাগলামো করিস না! সরে আয়!”
আদনান প্রাণপণে চেষ্টা করছে তাকে টেনে সরিয়ে আনতে।
তার নিজের চোখ ঝলসে যাচ্ছে আগুনের তাপে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আহাদ? সে ছটফট করে উঠল, যেন শেকল ভাঙা কোনো জন্তু। সে নিজের বুক চাপড়ে চিৎকার করছে,
“আমার রিদি… আদনান… আমার বাচ্চা… আমার বাচ্চারা!”
কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে। শব্দগুলো ঠিকভাবে বেরোচ্ছে না।
“ওদের বাঁচা আদনান! আমার অস্তিত্ব… আমার অংশ জ্বলে যাচ্ছে! ওরা কষ্ট পাচ্ছে… ওরা কষ্ট পাচ্ছে আদনান, ওরা পুড়ে যাচ্ছে! আমাকে ছাড়! ছাড় আমাকে! না হলে ওরা ছাই হয়ে যাবে! রিদি… রি…দি.. আমার বাচ্চারা পুড়ে যাচ্ছে… ওরা পুড়ে যাচ্ছে…”

চারপাশে ধোঁয়া, আগুন আর মানুষের আর্তচিৎকার।
আকাশ ভারী হয়ে আছে কালো ধোঁয়ায়। আহিয়া এসব দেখে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। নিঃশ্বাস নিচ্ছে, কিন্তু বুঝতে পারছে না সে বেঁচে আছে কিনা। নীলা কাতর চোখে তাকিয়ে আছে আহাদের সেই পাগলামির দিকে। তার বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিচ্ছে। আহাদ আবার ছটফট করে উঠল,
“আহহ! আদনান… ওদের কোনোভাবে বাঁচা না… ওরা কষ্ট পাচ্ছে! রিদিইই… রিদি… জানু… প্লিজ… আমাকে এভাবে ছেড়ে যাস না… আমি কিছু হতে দেব না তোর, প্লিজ একবার সারা দে। একবার মন্ত্রীমশাই বলে ডাক, জানু… প্লিজ একবার.. ”
তার কণ্ঠে করুন আর্তনাদ। এটা এক বাবা হারানোর চিৎকার। এক স্বামী সবকিছু হারানোর আর্তনাদ। শাহীন আর আদনান শত চেষ্টা করেও আর ধরে রাখতে পারল না। এক ঝটকায় তাদের ছিটকে ফেলে দিয়ে আহাদ আবার পাগলের মতো দৌড় দিল আগুনের দিকে। ঠিক তখনই আদিলের গাড়ি এসে থামল। সে দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপটে ধরল আহাদকে।

“ভাই! ভাই কী করছো? পাগল হয়ে গেছো? আগুন ভয়ংকর! ব্লাস্ট হতে পারে, সরে আসো।”
“আদিল, ছাড় আমাকে! ছাড়! রিদি আছে ওই গাড়িতে.. ওই গাড়িতে আমার রিদি আছে। আল্লাহ আমার রিদি!”
সে হাটুমুড়ে বসে পড়ল। মাথা দু’হাত দিয়ে চেপে ধরে চিৎকার শুরু করতে লাগল। এমন চিৎকার, যা শুনে যে কারোই বুক ফেটে যাওয়াট উপক্রম হতে পারে। আদিল তাকে ধরে রাখতে চেয়েও পারল না। সে গিয়ে গাড়ির গ্লাসে একের পর এক ঘুষি মারতে লাগল। এর মধ্যেই কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক বিকট বিস্ফোরণ। চারদিক কেঁপে উঠল। আগুনের ভেতর থেকে একটা দানব যেন গর্জে উঠল। আহাদ ছিটকে গিয়ে পড়ল দূরে। এবার আর কোনো ছটফটানি নেই। কোনো চিৎকার নেই। একদম নিস্তেজ। নিথর।

“ভাইয়া… ভাইয়া… ভাই…য়া…!”
আহিয়া চিৎকার করে উঠল। সব কিছু কেমন তার সামনে ঝাপসা হয়ে আসছে। তার চোখের সামনে যা ঘটেছে তা তার চোখ সহ্য পারল না। অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। নীলা তাকে ধরে রাখল, কিন্তু তার নিজেরই হাত পা কাঁপছে। আদিল আর আদনান ছুটে গেল আহাদের কাছে। আদনান তার মাথাটা নিজের উরুর ওপর তুলে নিল। তার কণ্ঠ কাঁপছে,
“আহাদ! আহাদ ওঠ! তোর কিছু হয়নি! রিদির কথা ভাব! তোর বাচ্চাদের কথা ভাব! তাকা… তাকা আমার দিকে… আহাদ!”
শাহীন নীলাকে বলল,
“নীলা… তুমি নিজেকে শক্ত রাখ। আহিয়াকে সামলাও। আমি আসছি।”

নীলা শুধুু মাথা নাড়ল। কন্ঠনালী থেকে কোনো শব্দ বের হলো না। এদিকে নাদিম, শাওন, আমজাদ মীর, আসাফাক মীর এসে পৌঁছেছে ঘটনা স্থলে। সুমন, তানভীর আর তারেক রায়ানও খবর পেয়ে সাথে সাথে ছুটে এসেছেন। তারেক রায়ান আজই গ্রাম থেকে রিদিতাকে দেখার উদ্দেশ্যে এসেছিলেন। রিদিতা বাবাকে বলেছিল, তালের পিঠা খেতে ইচ্ছে করছে। তিনি মেয়ের সেই ইচ্ছা পূরন করতেই মূলত এসেছেন। এখন চোখের সামনে এসব দেখে পুরোপুরিভাবে ভেঙ্গে পড়েছেন। সুমন আর তানভীর তাকে ধরে রেখেছে। ফায়ার সার্ভিসের টিম আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। ডিবি পুলিশ চারপাশে ঘেরাও করে রেখেছে। তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
আমজাদ মীর ছেলেকে নিয়ে ব্যাস্ত। তার হৃদস্পন্দন ক্ষীণ হয়ে এসেছে। আদনান মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে আহাদের হার্টবিট ঠিক রাখতে।

“আহাদ চোখ খোল, আহাদ! আহাদ চোখ খোল! আদিল, শাহীন.. আহাদকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে, ওর হার্টবিট ড্রপ করছে!”
সবাই মিলে তাকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলল। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, মানুষের ভিড়, ডিবি পুলিশের ঘেরাও সব মিলিয়ে এক রমরমে হাহাকার। আদিল এসে আহিয়াকেও গাড়িতে তুলে দিল। কিন্তু নীলা স্থির হয়ে বসে আছে। নিশ্চল তাকিয়ে আছে অ্যাম্বুলেন্সের লাল জ্বলজ্বলে আলোর দিকে। ভেতরে ভেতরে তার হৃদস্পন্দন আর্তনাদ করছে,
“আমি তো এটা চায়নি.. আমি তো কখনো এটা চায়নি। আমি তো ওদের সুখি দেখতে চেয়েছি, ওদের সুখের সংসার দেখতে চেয়েছি। সব মেনে নিয়েছি, কোনো বদ দোয়া তো করিনি.. তাহ… তাহলে তুমি এমনটা কেন করলে খোদা? কেন এমন ভয়ংকর পরিনতি করলে? কেন সব জালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খাড় করলে? কেন?”
সে অনবরত বিড়বিড় করতে লাগল,

“না, না… এটা সত্যি না… এটা স্বপ্ন… এটা স্বপ্ন..”
শাহীন এসে তার পাশে বসল। আজ আর দ্বীধা কাজ করছে না। সে নীলাকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কন্ঠে এক টুকরো আশ্বাস,
“নীলা, নীলা রিল্যাক্স… সব ঠিক হয়ে যাবে… কিছু হয়নি সব ঠিক হয়ে যাবে। রিল্যাক্স!”
নীলা ভঙ্গুর কন্ঠে ফিসফিস করে উঠল,
“এটা মিথ্যা। এটা সত্যি না… বলুন.. এটা সত্যি না তাই না?”
শাহীন আর কিছু বলতে পারল না। শুধু শক্ত করে ধরে রাখল। কিছুক্ষণ পর সে টের পেল নীলা নিস্তেজ। সে বুঝল নীলা অজ্ঞান হয়ে গেছে। শাহীন তাকে তুলে গাড়িতে তুলল। গন্তব্য হাসপাতাল। পেছনে পড়ে রইল পোড়া গাড়ির ধ্বংসস্তূপ। নাদিম, শাওন, আসফাক মীর আর সুমন ঘটনা স্থলে ডিবি পুলিশদের সাথেই আছে। আগুন এখন নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু ভেতরে রিদিতার অবশিষ্ট কিছু আছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা দুষ্কর!

চারদিকে ঘন অন্ধকার ভেদ করে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে সূর্যের সুপ্ত আলো। রাতের দীর্ঘ, ক্লান্ত নিঃশ্বাস যেন ভোরের আলোয় একটু একটু করে হালকা হচ্ছে।কেবিনের পর্দার ফাঁক গলে সূর্যের এক চিলতে রশ্মি এসে আহাদের চোখে পড়তেই সে অস্বস্তিতে চোখ-মুখ কুঁচকে নিল। মাথার ভেতর যেন কেউ হাতুড়ি মারছে। শরীরটা ভারী, অবশ। খানিকক্ষণ পর চোখ খুলে সে নিজেকে আবিষ্কার করল হাসপাতালের একটি কেবিনে। সাদা দেয়াল। ওষুধের গন্ধ। মেশিনের একঘেয়ে শব্দ। প্রায় সাত ঘণ্টা পর চেতনা ফিরে পেয়েছে আহাদ। কিন্তু চেতনা ফিরতেই, গতরাতের সেই ভয়ংকর, নির্মম দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। পৈশাচিক আগুন। চিৎকার। আর্তনাদ। মুহূর্তেই আহাদ পাগলের মতো ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়ল। চারপাশে হাতের কাছে যা পেয়েছে সব ভাংচুর শুরু করেছে। দরজার কাছে থাকা গার্ডরা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ডাক্তার, নার্সরা দৌড়ে এসেছে। দরজার কাছেই সীমাবদ্ধ। কেউই সাহস পাচ্ছে না কাছে যেতে।

বাইরে তখন ডিবি পুলিশের সঙ্গে কথা বলা আমজাদ মীর আর আদনান ছুটে এল। পেছন থেকে শাহীনও ঢুকল।
আহাদকে থামাতে আদনান আর শাহীন দু’জনেই পেছন থেকে জাপটে ধরল। আহাদ ছটফট করতে লাগল।
আদনান গলা নামিয়ে, কিন্তু শক্ত করে বলল,
“আহাদ, কী করছিস? এটা হাসপাতাল। শান্ত হ। তোর শরীর ভালো নেই। এই অবস্থায় এমন করিস না।”
কিন্তু আহাদ বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠল,
“আদনান, ছাড় আমাকে! ছাড়! না হলে আমি তোকে মেরে চালের ড্রামে ঢুকায়া রাখবো! ছাড় বলছি!”
চোখ রক্তবর্ণ। কণ্ঠে উন্মত্ততা।
“আমাকে রিদির কাছে যেতে দে! ছাড়!”
আদনান ছাড়ল না। বরং আরও শক্ত করে ধরে রাখল।
শাহীন হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“ভাই প্লিজ… আপনার শরীর ভালো না। এমন করবেন না।”
শেষমেশ আদনান তাকে জোর করে সোফায় বসাল।
নিজের নিঃশ্বাস ঠিক করতে করতে বলল,

“ঠিক আছে। ঠিক আছে। নিয়ে যাব। কিন্তু তার আগে শান্ত হ। এমন পাগলামো করিস না।”
একটু থেমে নরম স্বরে যোগ করল,
“আমরা রিদিতাকে আনার ব্যবস্থা করছি। ওকে?”
এই কথায় আহাদের কণ্ঠ ভেঙে গেল। সে ধীরে ধীরে আদনানের দিকে ফিরল। কম্পিত হাতে বাতাসে কিছু একটা আঁকার চেষ্টা করল, যেন শব্দ খুঁজছে।
“আমার… রিদি… পুড়ে গেছে আদনান…”
চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। “আমার অংশ… আমার অস্তিত্ব পুড়ে গেছে। আমি… আমি ওদের বাঁচাতে পারিনি।”
শ্বাস কাঁপছে।

“আমি ব্যর্থ… আমি নিজের সন্তানদের রক্ষা করতে পারিনি। আমার প্রেয়সীকে… আমি বাঁচাতে পারিনি…”
আদনান শক্ত করে তার ভাইয়ের কাঁপতে থাকা দেহটাকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। বোধহয় এই প্রথম সে সত্যিই অনুভব করল, তার একটা ছোট ভাই আছে। যাকে আজ প্রথমবার সে আগলে ধরছে। তার চোখ ঝাপসা হয়ে এল। আহাদের পিঠে ধীরে ধীরে হাত বুলাতে বুলাতে আদনান বলল,
“কিচ্ছু হয়নি… কিচ্ছু হয়নি।” কণ্ঠ চাপা, কিন্তু দৃঢ়, “আমার কথা শোন। মন দিয়ে শোন।”
একটু থেমে, স্পষ্ট করে বলল, “ওই গাড়িতে রিদিতা ছিল না। গাড়ি ব্লাস্ট হওয়ার আগেই রিদিতা গাড়ি থেকে নেমে গেছিল। ও ওই গাড়িতে ছিল না।”
আহাদ আচমকা ঝটকা মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল।
চোখে অবিশ্বাস। সে বিড়বিড় করে উঠল,

“মিথ্যা…”
গলা আবার চড়ল,
“সব মিথ্যা! আমাকে ভুংবাং বোঝাস না আদনান।”
“আমার চোখের সামনে সব হয়েছে। আমি ওকে গাড়িতে রেখে গেছিলাম।”
কণ্ঠ ফেটে যাচ্ছে,
“আমার চোখের সামনে সব শেষ হয়ে গেছে… আর আমি কিছু করতে পারলাম না…কিচ্ছু নাআআ!””
চিৎকার করে উঠল সে। আবার ভাঙচুর শুরু করল।
ঠিক তখনই কেবিনের ভেতরে প্রবেশ করলেন আমজাদ মীর। তার সঙ্গে ডিবি পুলিশের প্রধান কর্মকর্তা আনিসুজ্জামান। আমজাদ মীর কঠোর গলায় বললেন,
“কী করছো এসব? শান্ত হও। এই ভাঙচুর বন্ধ করো।”
আহাদ তার বাবার দিকে তাকাল। চোখে শিশুর মতো অসহায়ত্ব।

“বাবা…”
কণ্ঠ বের হতে চাইছে না। গলা আটকে আসছে।
“বাবা… আমার রিদি… আমার বাচ্চারা…”
সে কথা শেষ করতে পারছে না।
“ওদের বাঁচাতে পারলাম না আমি… ওরা পুড়ে… ছা…ই…”
আমজাদ মীর জোর করে তাকে আবার সোফায় বসালেন।
তার কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে বললেন,
“হুসস! শান্ত হও। রিদিতার কিছু হয়নি। তোমার অনাগত সন্তানদেরও কিছু হয়নি।”
একটু থেমে, গম্ভীর স্বরে বললেন,
“রিদিতা ওই গাড়িতে ছিল না। রিদিতাকে মাতাব্বরের লোক তুলে নিয়ে গেছে।”
এক মুহূর্তে সব শব্দ থেমে গেল। আহাদ বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। চোখ পলক ফেলছে না। মস্তিষ্ক যেন কথাগুলো বুঝে উঠতে পারছে না। আমজাদ মীর এবার তার পাশে বসে শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
“তুমি যদি এমন উন্মাদনা করতে থাকো, তাহলে রিদিতাকে সামলাবে কে? তোমার বাচ্চাদের দায়িত্ব কে নেবে?”
আহাদ ফিসফিস করে বিড়বিড় করল,

“মা… মানে…”
শ্বাস আটকে যাচ্ছে। কণ্ঠ কাঁপছে।
“র-রিদি… আমার রিদি ঠিক আছে? ও ঠিক আছে বাবা? তাহলে আমার রিদি এখন কোথায়? কোথায়?”
পুলিশ প্রধান আনিসুজ্জামান ভারাক্রান্ত এক নিশ্বাস ছাড়লেন। তার চোখেমুখে পেশাগত কঠোরতার আড়ালে চাপা উদ্বেগ স্পষ্ট। কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি ধীরস্বরে বলতে শুরু করলেন,
“দেখুন, মি. আহাদ… গাড়ির আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনার পর আমরা ঘটনাস্থলে বিস্তৃত তদন্ত চালাই। ফরেনসিক রিপোর্ট এবং প্রত্যক্ষ প্রমাণ অনুযায়ী নিশ্চিত হওয়া গেছে ওই গাড়িতে কেউই ছিল না।”
আহাদের দৃষ্টি স্থির। চোখ পলক ফেলছে না আনিসুজ্জামান কথা চালিয়ে গেলেন,
“আমাদের নির্ভরযোগ্য সোর্স থেকে জানা গেছে, শামিম পোদ্দার আর খলিল মাতাব্বরের লোকজন একসাথে পরিকল্পনা করে আপনার স্ত্রীকে অপহরণ করেছে।”

এই কথাটা যেন বাতাস কেটে আহাদের বুকে আঘাত করল। আনিসুজ্জামান গম্ভীর স্বরে বললেন,
“আপনি তো ভালো করেই জানেন, আপনার সাথে খলিল মাতাব্বরের শত্রুতা আজকের নয়। ও অনেকদিন ধরেই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। আপনার কাছ থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার তাড়নায় ছিল। আর সেই শত্রুতায় শামিম পোদ্দারও হাত মিলিয়েছে।”
তিনি এক মুহূর্ত থেমে চোখ তুলে তাকালেন,
“তারা আপনাদের গতিবিধি অনেকদিন ধরেই নজরে রেখেছিল। আজ রাতে আপনাদের সাথে কোনো নিরাপত্তা রক্ষী ছিল না। তার উপর এত রাতে শহরের বাইরে বের হওয়া… এই সুযোগটাই তারা পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে।”
কথা শেষ হওয়ার আগেই আহাদের চোখে হিং’স্র আগুন জ্বলে উঠল। কপালের শিরা-উপশিরা ধপধপ করে ফুলে উঠেছে। নীলচে শিরার ভেতর দিয়ে র’ক্তে’র প্রবাহ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সে চোয়াল শক্ত করে, দাঁত চেপে জিজ্ঞেস করল,

“এখন কোথায়?”
কণ্ঠ নিচু, কিন্তু ভয়ংকর।
“কোথায় নিয়ে গেছে আমার স্ত্রীকে?”
আনিসুজ্জামান চোখ নামিয়ে নিচু স্বরে বললেন,
“যতদূর আমরা জানতে পেরেছি… কামারপট্টির একটি পরিত্যক্ত কারখানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওটা শামিম পোদ্দারের আস্থানা। তবে…”
এক মুহূর্তের নীরবতা। আহাদ চোখ তুলে তাকাল,
“তবে?”
শব্দটা বজ্রপাতের মতো কেবিন কাঁপিয়ে দিল।আনিসুজ্জামান গম্ভীর হয়ে গেলেন। ধীরে ধীরে বললেন,
“তবে… মিসেস মীর এই মুহূর্তে কেমন আছেন, কিংবা আদৌ জীবিত আছেন কি না; এই বিষয়ে আমরা এখনো নিশ্চিত কিছু বলতে পারছি না।”
এই কথাটা যেন আহাদের সমস্ত সংযম ছিন্নভিন্ন করে দিল।
সে গর্জে উঠল,
“তাহলে আইন হাতে নিয়েছেন কেন?”
কণ্ঠ ক্রমশ উঁচু হচ্ছে।
“একজন সাধারণ মানুষের কথা বাদই দিলাম। একজন মন্ত্রীর স্ত্রীর নিরাপত্তাও যদি দিতে না পারেন, তাহলে আপনারা কিসের ডিবি?”
চোখে উন্মত্ততা। কণ্ঠে তীব্র ঘৃ’ণা।
“কোন বা’লে’র ডিবি প্রধান আপনি?”

আহাদ তেড়ে এগোতেই আদনান মুহূর্তে মাঝখানে এসে বাধা হয়ে দাঁড়াল। দুই হাতে তাকে শক্ত করে ধরে ফেলল। আহাদ র’ক্তচক্ষু করে তাকাল তার দিকে। হঠাৎ সোফায় এক সজোরে লাথি মারল। আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। হনহন করে বেরিয়ে গেল। পেছন থেকে আমজাদ মীর কঠোর স্বরে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন,
“কোথায় যাচ্ছো এই শরীর নিয়ে?”
আহাদ থামল না। হাঁটতে হাঁটতেই ঠান্ডা, অমানবিক স্বরে জবাব দিল,
“রিদিকে আনতে।”
এক মুহূর্ত থেমে যোগ করল, “আর মাতাব্বরের হিসাব চুকাতে।”
তার পেছনে ছুটল শাহীন আর আদনান। আমজাদ মীর কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন। ছেলের চোখের সেই আগুন তিনি চিনে ফেলেছেন। তিনি বুঝে গেছেন, এখন আর দেরি করা যাবে না। এক মুহূর্তের মধ্যেই তিনি আনিসুজ্জামানের দিকে তাকালেন। কোনো কথা না বলেই ইশারায় জানালেন, এখন কাজ শুরু করার সময়। তারপর দু’জন একসাথে দ্রুত কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।

কামারপট্টির পুরো এলাকাটি আগেই আইন প্রশাসনের ডিবি পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। চারদিক থেকে সিল করে দেওয়া হয়েছে রাস্তা, অলিগলি, পরিত্যক্ত গুদাম আর কারখানাগুলো। যেন কোনোভাবেই খলিল মাতাব্বর, শামিম পোদ্দার কিংবা তাদের সঙ্গপাঙ্গ পালিয়ে যেতে না পারে। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে শুধু শোনা যাচ্ছে পুলিশের বুটের শব্দ, ওয়াকিটকির ফিসফাস আর দূরে অ্যাম্বুলেন্সের প্রস্তুত অবস্থার সাইরেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে পুলিশ প্রধান আনিসুজ্জামান হাতে মাইক তুলে নিলেন। কণ্ঠে ছিল কর্তৃত্ব আর শেষ সতর্কতার দৃঢ়তা,

“আমি শেষবারের মতো আইন প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্ক করছি। আপনারা ভালোয় ভালোয় আত্মসমর্পণ করুন। আপনাদের আর পালানোর কোনো রাস্তা নেই। কোনো সুযোগ নেই। যদি পালানোর চেষ্টা করেন, তাহলে বাধ্য হয়ে ইনকাউন্টার করা হবে। তাই সময় থাকতে থাকতে বেরিয়ে এসে আত্মসমর্পণ করুন।”
কিন্তু ভিতর থেকে কোনো সাড়া এলো না। কারখানার ভেতর যেন নিস্তব্ধতা আরও ঘনীভূত হয়ে উঠল। এই নীরবতা আহাদের ধৈর্য ভেঙে দিল। প্রেয়সীকে হারানোর ভয়, অনাগত সন্তানদের অনিশ্চয়তা; সব মিলিয়ে তার বুকের ভেতর যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে। সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“আপনারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী দেখছেন? ওরা এখনো বের হচ্ছে না কেন?”
কণ্ঠে তীব্র উৎকণ্ঠা।

“ভিতরে কী অবস্থা? আমার স্ত্রীর কী অবস্থা কিছু জানেন? কোনো খবর আছে?”
সে এক ধাপ সামনে এগিয়ে গেল।
“আপনারা যদি না পারেন, বলুন। আমি নিজেই ভিতরে যাচ্ছি!”
একজন ডিবি কর্মকর্তা দ্রুত সামনে এসে বলল,
“সরি স্যার। কিন্তু আপনি ভিতরে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যাবে। একটু ধৈর্য ধরুন। ইঁদুর জীবন বাঁচাতে গর্ত থেকে ঠিকই বেরোবে।”
“ভা… ভাই! ওদিকে তাকান!”
শাহীন ভয়ার্ত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল। সবাই একযোগে তাকাল সামনের দিকে। খলিল মাতাব্বর ধীরে ধীরে বেরিয়ে এসেছে কারখানার ভেতর থেকে। তার এক হাতে পি’স্ত’ল, আরেক হাতে রিদিতার চুলের মুঠি। ব’ন্দু’কের নল ঠেকানো রিদিতার মাথায়। মুহূর্তেই বাতাস ভারী হয়ে উঠল। পালানোর আর কোনো উপায় না থাকায় রিদিতাকেই ঢাল বানিয়েছে তারা। আহাদের বুকের ভেতর ধুকপুকানি অসহনীয় হয়ে উঠল। বুকের মাঝখানে যেন কেউ ধারালো ছু’রি চালাচ্ছে। রিদিতার ঠোঁটের কোণে জমাট বাঁধা শুকনো র’ক্ত। চোখে আ’তঙ্ক জমে আছে। এক হাত দিয়ে উদর চেপে রেখেছে। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে গরম অশ্রু।

“মন্ত্রীমশাই!”
আহাদের কণ্ঠ ভেঙে উঠল,
“রিদি… জানু…!”
সে দিশেহারা হয়ে এক পা এগোতেই খলিল মাতাব্বর আরও শক্ত করে ব’ন্দু’ক চেপে ধরল রিদিতার মাথায়। রিদিতা চোখ বন্ধ করে গুগিয়ে উঠল। আহাদের পা থেমে গেল। সে অসহায়, করুণ কণ্ঠে মিনতি করল,
“ওকে ছেড়ে দে মাতাব্বর… ওকে কিছু করিস না।”
গলা ভীষন কাঁপছে।
“তোর শত্রুতা তো আমার সাথে। প্লিজ… ওকে ছেড়ে দে।”
সে প্রায় কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“তুই যা চাস, সব দেবো। টাকা, ক্ষমতা, সব! শুধু রিদিকে ছেড়ে দে… আমার বাচ্চাদের কোনো ক্ষতি করিস না… প্লিজ!”
খলিল মাতাব্বর তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে উঠল। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

“আমি চাই প্রতিশোধ!”
তার কণ্ঠে বিষ।
“তুই আমার জীবন তছনছ করছিস আহাদ রাজা। আমার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিস। আজ চাওয়া-পাওয়ার দিন শেষ। এখন শুধু প্রতিশোধ!”
সে রিদিতার চুল আরও শক্ত করে ধরল,
“এই মেয়েটার জন্য তুই আমার বাড়িতে এসে আমাকে অপমান করেছিস। আমি কিছুই ভুলিনি। আজ আমাকে যদি ভালোয় ভালোয় যেতে দিস, তাহলে ওকে ছেড়ে দেবো। নইলে ওকে শেষ করেই আমি সারেন্ডার করবো।”
চারদিক থেকে নিরাপত্তা বাহিনী বন্দুক তাক করে আছে।
আনিসুজ্জামান কঠোর কণ্ঠে গর্জে উঠলেন,
“পি’স্ত’ল নামা মাতাব্বর। তোর আর পালানোর রাস্তা নেই। শেষবারের মতো সতর্ক করছি।”
কিন্তু আহাদ আর অপেক্ষা করতে পারল না। সে প্রায় কাতর হয়ে বলল,
“নো… নো… ফাইন! তুই যা চাস তাই হবে। সবাই ব’ন্দু’ক নামান।”
এক পা এগিয়ে গেল। কণ্ঠ ভেঙে আসছে,

“রিদিকে ছেড়ে দে। ওর কষ্ট হচ্ছে। আমার বাচ্চাদের কিছু করিস না। দোহাই লাগে ওকে ছেড়ে দে।”
আহাদের কথায় নিরাপত্তা বাহিনী ধীরে ধীরে ব’ন্দু’ক নামাল। খলিল মাতাব্বর রিদিতাকে ঢাল বানিয়ে পিছু হটতে লাগল। গাড়ির কাছে পৌঁছে হঠাৎ রিদিতাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। সে দৌড়ে গাড়িতে উঠতে যেতেই; পরপর কয়েকটা গু’লি’র শব্দ। মুহূর্তেই খলিল মাতাব্বর নিথর হয়ে লুটিয়ে পড়ল রাস্তায়। এদিকে রিদিতা তার ধাক্কায় পড়ে গিয়ে প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছে। র’ক্ত’ক্ষর’ণ শুরু হয়েছে। সে রাস্তায় গুটিশুটি হয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে।
“আহহ… আমার বেবি.. আ.. মা.. র বা চ্চা।”

আহাদ ছুটে এসে তার পাশে বসে পড়ল। কাঁপা হাতে রিদিতার মাথা নিজের উরুর ওপর তুলে নিল। পাগলের মতো কপাল, গাল, ঠোঁটে একের পর এক চুমু দিতে লাগল। রিদিতা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল,
“আমার বেবি… আমার বাচ্চারা… মন্ত্রীমশাই… ওরা ঠিক নেই… প্লিজ কিছু করুন… আমি আর পারছি না…”
তার নিশ্বাস ক্ষীণ। আহাদ দুই হাতে তার গাল ধরে বলল,
“কিছু হবে না। আমি আছি তো হুম। কিছু হবে না।”
“আমি আর পার..ছি না। অনেক কষ্ট হচ্ছে। পারছি না..হ!”
আহাদ দিশেহারা হয়ে চিৎকার করে উঠল,
“আদনান! কিছু কর, কুইক!”
আদনান যদিও গাইনলজিস্ট না। তবুও দ্রুত এসে নার্ভ চেক করল। চোখ সাদা, তা দেখে আদনানের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

“ইতিমধ্যে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হয়েছে। অবস্থা খুব খারাপ।”
একটু থেমে বলল,
“আমার মনে ইমিডিয়েটলি সিজার করতে হবে।”
আমজাদ মীর আতঙ্কে বললেন,
“কী বলছো? ওর তো ডেলিভারি ডেট এখনো অনেক দেরি। প্রায় পাঁচ-ছয় সপ্তাহ পর। এখনো তো অনেক সময় বাকি!”
আদনান নিচু গলায় বলল,

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৬১

“আই নো ছোট আব্বু! কিন্তু এই মূহুর্তে ঢিলে হলে বড় দুর্ঘটনা হতে পারে। ওর অবস্থা বেশি একটা ভালো না।”
আর এক মুহূর্ত দেরি না করে আহাদ রিদিতাকে কোলে তুলে অ্যাম্বুলেন্সে তুলল। গন্তব্য হাসপাতাল। এদিকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে বিশাল গো’লাগু’লি হয় শামিম পোদ্দার ও তার দল বলের সাথে। কিন্তু শেষ পরিনতি হয় মাতাব্বরের মতোই, মৃত্যু।

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৬৩