দিশেহারা পর্ব ৬২
সানা শেখ
লাফালাফি থামিয়ে মাছগুলো শান্ত হয়ে যেতেই শ্রবণ উপরের বোলটা তুলল। দুই/চারটা মাছ একটু একটু নড়ছে, বাকিগুলো ম’রে গেছে। এক মাছের কাঁটা আরেক মাছের গায়ে বিধে গেছে। শ্রবণ তৃপ্তির হাসি হেসে বলে,
“নিজেদের কাঁটা নিজেরাই খা দেখ কেমন লাগে! বজ্জাত মাছ।”
গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে চপিং বোর্ডের উপর একটা একটা করে মাছ রেখে ছুরি দিয়ে মাথা কে’টে ফেলে সবগুলোর। এখন এগুলো পরিষ্কার করার পালা।
সোহা শোয়া থেকে উঠে রান্নাঘরে এসে দাঁড়াল। শ্রবণকে মাছ ধুতে দেখে বিস্মিত হয়ে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল ওর দিকে। যা দেখছে সব সত্যি নাকি জেগে জেগেই স্বপ্ন দেখছে? শ্রবণ চৌধুরী ধুচ্ছে মাছ! সিরিয়াসলি? মাছ কে’টেছে? কীভাবে কা’টল? ওর হাতে কাঁটা ফোটেনি? এগিয়ে এসে শ্রবণের পাশে দাঁড়াল। একটা মাছেরও মাথা নেই, সবগুলোর মাথা আলাদা করে ফেলেছে কাঁটাসহ।
শ্রবণ ঘাড় ঘুরিয়ে সোহার দিকে তাকাল। গম্ভীর গলায় বলল,
“তুই এখানে কেন? যা শুয়ে থাক।”
“তুমি মাছ কা’টা-ধোয়া করছো কেন? আমিই তো করতে পারতাম।”
“করতে হবে না, গিয়ে শুয়ে থাক।”
“শুয়ে থাকলে তো পেটে খাবার পড়বে না, রান্না করতে হবে।”
“একদম কোনকিছুতে হাত লাগাবি না। রুমে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে থাক।”
“তুমি সরো, আমি মাছ ধুচ্ছি।”
শ্রবণ কিছুটা রাগী গলায় বলে,
“যেতে বলেছি এখান থেকে। মাছ কাটতে যখন পেরেছি তখন রান্নাও করতে পারব।”
“কিহ! তুমি রান্না করবে?”
“অবশ্যই, কোনো সন্দেহ আছে?”
“তুমি রান্না করতে পারো?”
“পারি না কিন্তু আজকে শিখে যাব।”
“কীভাবে?”
“বেশি কথা না বলে রুমে গিয়ে শুয়ে থাক। হাতের ব্যথা ঠিক হয়েছে?”
“অনেক কমেছে।”
“রুমে যা।”
সোহা মিনমিন করে বলে,
“আমি করি।”
শ্রবণ কোনো কথা বলল না, চুপচাপ মাছ পরিষ্কার করায় মনোযোগী হলো।
সোহা পাশে দাঁড়িয়ে শ্রবণের মাছ পরিষ্কার করা দেখতে লাগলো। টি-শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিয়েছে। চোখ-মুখ গম্ভীর, চোয়াল শক্ত। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে রয়েছে।
এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সোহার পা ব্যথা হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে আবার এসে শ্রবণের পাশে দাঁড়াল।
শ্রবণ ওর দিকে তাকিয়ে বিশ্ব জয় করার মতো হাসি দিলো। শ্রবণের হাসি দেখে তাকিয়ে রইল সোহা।
শ্রবণ খাবলা দিয়ে কতকগুলো মাছ ধরে উচুঁ করে ধরল। ঠোঁটের কোণে হাসি ধরে রেখে বলল,
“হয়ে গেছে।”
সোহা শ্রবণের হাতের দিকে তাকাল। সবগুলো মাছ একদম চকচকে হয়ে গেছে।
হাত থেকে মাছগুলো রেখে আরো কয়েকবার ভালোভাবে ধুয়ে নিল। রান্নার জন্য কিছু মাছ রেখে বাকিগুলো ফ্রিজে তুলে রাখলো। হাত ধুয়ে ভালোভাবে মুছে ফোন হাতে তুলে নিল।
ইউটিউবে ঢুকে আবার সার্চ দিলো,
“শিং মাছ রান্নার রেসিপি।”
সার্চ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অসংখ্য রেসিপির ভিডিও চলে আসলো। কিছুক্ষণ ঘেঁটেঘুটে একটা ভিডিওতে ক্লিক করল। মনোযোগ দিয়ে ভিডিও দেখতে দেখতে একটা চেয়ার এনে সোহাকে বসতে বলল। সোহা শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে চেয়ারে বসল।
শ্রবণ হাত থেকে ফোন রেখে রান্নার জন্য যা যা লাগবে সব কিছু বের করল। টমেটো দিয়ে শিং মাছ ভুনা করবে। টমেটো ধুয়ে কেটে নিল। ধনিয়া পাতা কতটুকু সাইজ করে কাটবে বুঝতে পারছে না। সোহার দিকে তাকিয়ে দেখলো সোহা কপাল কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। শ্রবণ সোহার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ফোন হাতে নিল আবার। সার্চ দিলো,
“তরকারিতে দেওয়ার জন্য ধনিয়া পাতা কতটুকু সাইজ করে কা’টবো?”
কাঙ্ক্ষিত ভিডিও পেয়ে গেল শ্রবণ। ধনিয়া পাতা ধুয়ে কে’টে নিল আস্তে ধীরে। কাঁচা মরিচ কা’টতে গিয়ে পড়ল আবার ঝামেলায়। লম্বা করে কা’টবে নাকি গোল গোল করে কুচি করবে?
সমস্যা কী? ইউটিউব তো আছেই। তরকারিতে দেওয়ার জন্য কাঁচা মরিচ কা’টার পদ্ধতিও দেখে নিল। কাঁচা মরিচ কে’টে পেঁয়াজ কুচি করতে গিয়েও করতে পারছে না। আবার ইউটিউবে ঢুকে সার্চ দিলো,
“সুন্দর করে পেঁয়াজ কুচি করব কীভাবে?”
খুব সুন্দর না হলেও অসুন্দর হলো না শ্রবণের পেঁয়াজ কুচি করা। সবকিছু রেডি করা শেষ, এখন রান্না করার পালা।
চুলায় প্যান বসিয়ে তেল ডেলে দিলো নিজের মন মতো। এত তেল দিতে দেখে সোহা চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে বলল,
“আমি রান্না করি, তুমি বসো।”
“রান্না আমিই করব। যেখানে তোর মতো ডাইনির বাচ্চার সঙ্গে এতগুলো দিন ধরে সংসার করতে পারছি সেখানে এই রান্না কিছুই না। শ্রবণ চৌধুরী পারে না এমন কোনো কাজ এই দুনিয়ায় নেই।”
সোহা উল্টো ফিরে মুখ ভেংচি কে’টে বিড়বিড় করে বলল,
“নিজের পেট থেকে একটা বাচ্চা জন্ম দিয়ে দেখাও, নয়তো একটা ডিম পেড়ে দেখাও।”
“এই ডাইনির বাচ্চা, কী বললি?”
সোহা চেয়ারে বসতে বসতে বলল,
“কই? কিছুই তো বলিনি।”
“না। কী যেন বলেছিস, স্পষ্ট শুনতে পেলাম না।”
“ভুল শুনেছো, আমি কিছু বলিনি।”
শ্রবণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে রান্না করায় মনোযোগী হয়। সোহা চেয়ারে বসে শ্রবণের দিকে তাকিয়ে রইল।
যোহরের আযান হয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। শ্রবণের তরকারি রান্না শেষ হলো মাত্র। আবারো বিশ্ব জয় করা হাসি হাসল। তরকারির কালার বেশি গাঢ় হয়ে গেছে, থাক ব্যাপার না। প্রথমবার রান্না করল, একটু এদিক ওদিক তো হতেই পারে। তবে সুন্দর ঘ্রাণ ভেসে আসছে তরকারি থেকে।
একটা ছোটো চামচের সাহায্যে একটু ঝোল তুলে ফুঁ দিয়ে ঠান্ডা করে মুখে নিল স্বাদ কেমন হয়েছে চেক করার জন্য। ঝোল মুখে দেওয়ার পর কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তরকারির দিকে তাকিয়ে রইল আরো কিছুক্ষণ। ওর এমন রিঅ্যাকশন দেখে সোহা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে ওর মুখের দিকে। শ্রবণ নিজের রান্না টেস্ট করে নিজেই হয়তো অবাক হয়ে গেছে। তরকারি অনেক মজা হয়েছে বোধহয়। চেয়ার ছেড়ে উঠে আসলো নিজেও তরকারি টেস্ট করার জন্য। চামচ হাতে নিয়ে প্যানের দিকে বাড়াতেই সোহাকে অবাক করে দিয়ে শ্রবণ প্যান ধরে সবটুকু তরকারি বিনের মধ্যে ঢেলে দিলো। সোহা বিস্মিত হয়ে দ্রুত বলল,
“আরে কী করছো? তরকারি ফেলে দিচ্ছো কেন?”
শ্রবণ প্যানটা সিংকের উপর রেখে হাত ধুতে ধুতে গম্ভীর হয়ে বলল,
“আমার ইচ্ছে হয়েছে আমি ফেলে দিয়েছি।”
“তাহলে রান্না করলে কেন? আর এত কষ্ট করে যখন রান্না করলে তাহলে ফেলেই বা দিলে কেন”
“খাব না, তাই ফেলে দিয়েছি।”
“তুমি না খেলে, আমি খেতাম।”
“জামাইয়ের হাতের রান্না খাওয়ার এত শখ কেন?”
সোহা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে শ্রবণের দিকে তাকিয়ে রইল। নিজেই তো জোর করে রান্না করতে গেল। সোহা রান্না করতে চাইছিল বলে ওর সঙ্গে রাগও দেখাল, আর এখন বলছে, ‘জামাইয়ের হাতের রান্না খাওয়ার এত শখ কেন?’ ও নিজে থেকে খেতে চেয়েছে নাকি? শ্রবণ নিজেই তো রান্না করে খাওয়াতে চাইলো।
শ্রবণ ফোন হাতে নিয়ে রান্নাঘর থেকে বের হতে হতে বলল,
“সোহা, রুমে আয়।”
সোহা একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল। বিনে ফেলে রাখা তরকারির দিকে তাকাল আবার। কতগুলো মাছ রান্না করেছিল, সব ফেলে দিলো। সিংকের সামনে এসে দাঁড়াল সোহা। প্যানে দুটো টমেটোর খন্ড আটকে আছে। শ্রবণের রান্না কেমন হয়েছে এটা টেস্ট না করা পর্যন্ত সোহার শান্তি লাগবে না। হাতে থাকা চামচ দিয়ে প্যান থেকে একটা টমেটোর খন্ড তুলে মুখে দিলো, কয়েকবার চিবিয়েই ঠেলে বমি আসতে চাইলো। থু থু করে ফেলে দিয়ে দ্রুত কুলি করল। জঘন্য হয়েছে রান্না, খুবই বাজে স্বাদ। লবণ তো বেশি দিয়েছেই, সঙ্গে মসলাও বেশি দিয়েছে। এই রান্না সোহা করলে এতক্ষণে টর্নেডো, সাইক্লোন, সুনামি সব বয়ে যেত এই ফ্ল্যাটে। নিজে রান্না করেছে তাই চুপচাপ ফেলে দিয়ে চলে গেল।
“অ্যাই ডাইনির বাচ্চা, আসছিস না কেন?”
“আসছি।”
সোহা একটু পানি খেয়ে দ্রুত পায়ে রুমের দিকে এগোয়। খিদে পেয়েছে ভীষণ। রুমে আসতেই শ্রবণ মেজাজ দেখিয়ে বলল,
“ডেকেছি কখন?”
সোহা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। রাগ তো ওর দেখানোর কথা, সেখানে উল্টো শ্রবণ রাগ দেখাচ্ছে। মিনমিন করে বলল,
“কী হয়েছে? ডাকছো কেন?”
“শুয়ে থাক।”
সোহা ঠোঁট উল্টে বলল,
“খিদে পেয়েছে আমার, শুয়ে থাকলে কী পেট ভরবে?”
শ্রবণ ঝিম ধরে রইল। এত কষ্ট করে, এতক্ষণ ধরে, এত যত্ন নিয়ে মনোযোগ সহকারে রান্না করল আর সেই রান্না শেষে কি-না এমন জঘন্য হলো? ছিঃ! খুবই বাজে!
রান্না করা সহজ হলেও রান্নায় স্বাদ আনা যে সহজ নয় সেটা খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে আজ।
শ্রবণকে কিছু বলতে না দেখে সোহা বলল,
“তুমি গোসল সেরে নাও, আমি স্যুপ বানাচ্ছি। স্যুপ বানাতে বেশি সময় লাগবে না।”
শ্রবণ হাতের ফোন রেখে গম্ভীর গলায় বলল,
“তুই বলে দে কীভাবে বানাতে হবে, আমি বানাচ্ছি।
সোহা কিছু বলার জন্য উদ্যত হতেই শ্রবণ ওর হাত ধরে বলল,
“রান্নাঘরে চল। তুই দেখিয়ে দিবি, আমি রান্না করব।”
সোহা শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে ওর সঙ্গে রান্নাঘরের দিকে এগোয়। কী রান্নার ভূত উঠলো আজ এই ছেলের মাথায়?
স্যুপ শ্রবণ নিজেই বানিয়েছিল সোহার নির্দেশনা অনুযায়ী। টেস্ট দারুন হয়েছিল। স্যুপ খেয়ে গোসল সেরে সোহা ঘুমিয়ে পড়েছে। অন্যদিন আগে গোসল করে তারপর খায়, আর আজ আগে খেয়েছে তারপর গোসল করেছে।
আজকে সোহার সঙ্গে শ্রবণ ঘুমায়নি। গোসল সেরে রান্নাঘরে ঢুকেছিল আবার। এখন সাড়ে পাঁচটা বাজে। শ্রবণ আবার রান্না করেছে। এবারেও টমেটো দিয়ে শিং মাছ ভুনা করেছে, টমেটো আগুনে পুড়ে ভর্তা বানিয়েছে আর ঝরঝরে করে ভাত রান্না করেছে।
রান্না শুরু করার আগে প্রতিজ্ঞা করেছিল। এবার যদি রান্না ভালো না হয় তাহলে আজকে নিজে না খেয়ে থাকবে। সোহাকে একমাসের জন্য চৌধুরী বাড়িতে রেখে আসবে। আর আগামী তিনদিন সোহার মুখ দেখবে না, যেটা ওর জন্য সবচেয়ে বড়ো শাস্তি। সোহাকে কয়েক ঘণ্টা না দেখলেই ওর অস্থির অস্থির লাগে, মন ছটফট করে, পাগল পাগল অবস্থা হয়। তিনদিন দেখতে না পেলে সত্যি সত্যিই পাগল হয়ে যাবে। আর এই দেখতে না পাওয়ার শাস্তি যেন না পেতে হয় সেজন্য এবার আরো বেশি মনোযোগী হয়ে রান্না করেছে।
সবকিছু ডাইনিং টেবিলের উপর গুছিয়ে রেখে হাত ধুয়ে বেডরুমে এলো। সোহা এখনো ঘুমিয়ে আছে। ডান হাতটা বুকের উপর রাখা। হাতটা দেখেই বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো আবার।
“সোহা। এই সোহা, ওঠ।”
শ্রবণের ডাক আর ছোঁয়া পেয়ে সোহার ঘুম ভাঙে। পিটপিট করে তাকিয়ে দেখল শ্রবণ ওর উপর ঝুঁকে আছে।
শ্রবণ সোহার গায়ের উপর থেকে ব্ল্যাঙ্কেট সরিয়ে দিয়ে বলল,
“ওঠ।”
সোহার শরীর ম্যাজম্যাজ করছে, উঠতে ইচ্ছে করছে না। হাতের ব্যথাও বেড়েছে আবার।
শ্রবণ নিজেই সোহাকে ধরে তুলে বসাল। সোহা ওড়না ঠিক করে বিছানা ছেড়ে নামার জন্য উদ্যত হয়। শ্রবণ ওর ডান হাত ধরে হাতের দিকে তাকাল ভালোভাবে। বজ্জাত মাছের কাঁটার জন্য হাতটার কী অবস্থা হয়েছে! কাঁটা হাতের রগের উপর দাবিয়ে দিয়েছিল সেজন্যই ব্লিডিং বন্ধ হচ্ছিল না। মাজেদা আন্টি না থাকলে জীবনে আর এই মাছ আনবে না ফ্ল্যাটে, যদি আনেও তবে কে’টে আনবে। যেকোনো মাছ না কে’টে ফ্ল্যাটেই আনবে না আর।
“হাতে ব্যথা করছে?”
“হ্যাঁ। ব্যথা বাড়ছে আবার।”
“খাবার খেয়ে পেইন কিলার খেতে হবে আবার। হাত-মুখ ধুয়ে আয়।”
“ক’টা বাজে?”
“মাগরিবের আযান হবে কিছুক্ষণ পর।”
সোহা বিছানা ছেড়ে নেমে ধীরে ধীরে হেঁটে ওয়াশরুমে প্রবেশ করল। শরীর ভার হয়ে গেছে, নড়তে-চড়তে ইচ্ছে করছে না এখন।
সোহা ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসতেই শ্রবণ ওকে ধরে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের কাছে এলো। একটা চেয়ার টেনে সোহাকে বসিয়ে প্লেটে ভাত বেড়ে দিলো নিজেই।
সোহা এতক্ষণ চুপ করে ছিল, এবার মুখ খুলে বলল,
“তুমি আবার রান্না করেছো?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“খাওয়ার জন্য।”
“আমি এখন খাব না, তুমি খাও।”
“আমার খাওয়া নিয়ে তোকে চিন্তা করতে হবে না। তোর জন্য রান্না করেছি, তুই খা।”
“আমার এখন খেতে ইচ্ছে করছে না।”
“অল্প খা।”
“তুমি খাও।”
“তুই আগে খা।”
“খেতে ইচ্ছে করছে না তো।”
শ্রবণ হাত ধুয়ে টমেটো ভর্তা দিয়ে ভাত মেখে সোহার মুখের সামনে ধরে বলল,
“হাঁ কর।”
“সত্যিই খেতে ইচ্ছে করছে না এখন। আমি রাতে খাব, তুমি খাও এখন।”
“হাঁ করতে বলেছি হাঁ কর।”
সোহা নাক-মুখ কুঁচকে হাঁ করল। শ্রবণ ওর মুখে ভাত পুরে দিয়ে তাকিয়ে রইল মুখের দিকে। ভাত চিবুতেই সোহার চোখ-মুখের ভাব পরিবর্তন হলো।
শ্রবণ গম্ভীর গলায় বলল,
“কেমন হয়েছে?”
সোহা ঢোঁক গিলে উচ্ছসিত কন্ঠে বলল,
“মজা।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ। দারুন হয়েছে।”
“হাঁ কর।”
সোহা হাঁ করল। শ্রবণ সোহার পাশে দাঁড়িয়ে থেকেই ওকে খাওয়াতে থাকল। দুপুরে স্যুপ-ও নিজের হাতে সোহাকে খাইয়ে দিয়েছিল।
সোহা ভাত চিবুতে চিবুতে বলল,
“তুমিও খাও।”
“দেরি আছে, তুই খাওয়া শেষ কর।”
“দেরি কেন? একসঙ্গেই খাই।”
শ্রবণ চেয়ারে বসে সোহাকে খাওয়াতে খাওয়াতে নিজেও খেতে শুরু করে। ভর্তা আসলেও দারুন মজা হয়েছে।
ভর্তা দিয়ে খাওয়া শেষ হলে তরকারি নিল।
খেতে খেতে সোহার চোখজোড়া ভিজে উঠল। যেই শ্রবণ নিজের জন্য কোনোদিন এক মগ কফি বানায়নি, চুলা কীভাবে অন-অফ করতে হয় জানতো না, মাইক্রোওভেন কীভাবে ব্যবহার করতে হয় জানতো না, সেই শ্রবণ আজ শুধুমাত্র ওর জন্য রান্না করল, তাও দুবার! সেদিন রাতেও নিজে খাবার গরম করে পরিবেশন করেছিল।
যারা বলে শ্রবণ চৌধুরী ভালো না, তারা এই শ্রবণ চৌধুরীকে দেখেনি, দেখলে অবশ্যই বলতো, ‘শ্রবণ চৌধুরী শুধু ভালো নয়, লাখে একজন।’
দিশেহারা পর্ব ৬১
“কী হয়েছে?”
সোহা দুদিকে মাথা নেড়ে চোখের পানি দ্রুত মুছে হাসি মুখে বলল,
“কিছু না। তরকারিও অনেক মজা হয়েছে, তুমি খাও।”
শ্রবণ সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে নিজের মুখে ভাত পুরে দিলো আবার। সোহার চোখজোড়া বেয়ে ঝরঝর করে পানি গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে আবার। এই চোখের পানি বড্ড অবাধ্য, ওর কোনো কথা শোনে না কখনো।
