Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৪৫

দাহশয্যা পর্ব ৪৫

দাহশয্যা পর্ব ৪৫
Raiha Zubair Ripti

ফোন কানে নিয়ে হ্যালো হ্যালো করে যাচ্ছে ঊর্মি কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো আওয়াজ আসছে না। ঊর্মি রাগী গলায় বলতে লাগলো-
-” এ্যই কে রে তুই? আমার আব্বা লাগিস তুই? তোর মেয়ে হই আমি? আয় আমার সামনে আয় ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিচ্ছি তোকে…
আরো অনেক কথা বললো ঊর্মি। বকাও দিলো। কিন্তু নো রেসপন্স। বিরক্ত হয়ে কান থেকে ফোনটা সামনে এনে দেখলো ফোন তো কেটে গেছে। বেয়াদব লোক ফাইজলামি করার জায়গা পায় না। এত শখ ঊর্মির বাপ হওয়ার?
ইব্রাহিম জাস্ট থ হয়ে বসে আছে। তার সাথে এটা কি হচ্ছে ভাই? হতে চাইলো স্বামী আর হয়ে গেলো ড্যাডি! এত কট খাচ্ছে এই বাচ্চা মেয়েটা জন্য! কি লজ্জা! কি লজ্জা!
ইব্রাহিম আর ফোন দিবে না। শিক্ষা হয়ে গেছে তার। একটু ফ্লার্ট ই তো করতে চেয়েছিল।
ইব্রাহিম ওয়াশরুম থেকে মুখ ধুয়ে আসলো। ঊর্মির মায়ের বকা গুলো যেনো এখনও কানে ভাসছে ইব্রাহিমের। এমন বকা সে জীবনেও খায় নি।
সোলেমান নিবাসে ফিরে নিজের রুমে ঢুকে বউকে দেখতে না পেয়ে কিঞ্চিত কপাল কুঁচকালো। কোথায় গেছে তার ল্যাদা বউ?
সোলেমান ঘুরে নিচে আসলো। বাড়ির ম্যেড রফিক কে জিজ্ঞেস করলো-

-” আমার বউ কই?
রফিক রান্না ঘরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল-
-” ম্যাডাম রান্না ঘরে।
আশ্চর্য এই মেয়ে রান্না ঘরে কি করছে? রান্না ঘরের জন্য তো ম্যেড রাখা আছেই। শুধু বলে দিলেই তো বানিয়ে দেয়।
সোলেমান বিরক্ত হয়েই রান্না ঘরের দিকে আসলো। এসেই দেখতে পেলো তার বউ উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে কিছু রাঁধছে। সোলেমান নিশ্বাস নিতেই বুঝতে পারলো তার ল্যাদা বউ চা বানাচ্ছে।
সোলেমান এগিয়ে আসলো।
মেহরিন চায়ের কাপটায় ধীরে ধীরে গরম চা ঢালছিল। চা ঢেলে পেছন ফিরতে যাবে ঠিক তখনই সোলেমান হঠাৎ করেই এসে দাঁড়াল ঠিক তার পেছনে। হঠাৎ সেই উপস্থিতি আর কাঁধে সামান্য ধাক্কা সব মিলিয়ে মেহরিনের হাতে ধরা কাপটা কেঁপে উঠলো।

কাপ থেকে গরম চা ছিটকে পড়লো মুহূর্তেই মেহরিন থমকে গেল ঘাবড়ে গিয়ে কাপ ফেলে দিতে দিতে হাতে থাকা চায়ের কিছুটা এসে পড়লো তার নিজের হাতে আর বাকিটা সোলেমানের বুকে। ব্যথায় মেহরিন কেঁপে উঠলো, ঠোঁটের কোণে অস্ফুট একটি শব্দ উঠে এলো। অন্যদিকে সোলেমানও হঠাৎ বুকে গরম চা পড়ায় পেছনে সরে গেলো, তীব্র গরমে মুখটা কুঁচকে উঠলো।
কিন্তু পরক্ষণেই তার চোখ চলে গেল মেহরিনের হাতে। দেখলো, সেই গরম চা পড়েছে তার বউয়ের হাতের নরম ত্বকে। তার নিজের পোড়ার যন্ত্রণার চেয়ে যেনো বেশি যন্ত্রণা হতে লাগলো মেহরিনের পুড়ে যাওয়া হাতের অংশটা দেখে।
সোলেমান অস্থির হয়ে এগিয়ে এলো। চোখে উদ্বেগ, কণ্ঠে শীতল ব্যথা তুলে বলল-

-” অনেক টা পুড়ে গেছে। রফিক এ্যাই রফিক। কইরে? বয়রার বাচ্চা ডাক শুনতেছিস না কেনো? কু’ত্তার বাচ্চারা ডক্টর ডাক তাড়াতাড়ি।
ব্যথায় মেহরিনের চোখে জল চলে আসলো। সোলেমান বউয়ের চোখে জল দেখে আরো অস্থির হয়ে গেলো। বউকে পাঁজা কোলে নিয়ে সে ছুটলো বাহিরে। মেহরিন হকচকিয়ে গেলো। বাগান পাড় হবার সময় সোলেমান দেখলো রফিক গাছে পানি দিচ্ছে। সোলেমান গলা উঁচু করে রফিক কে বলল-
-” পুরো ট্যাঙ্কির পানি আমি তোর পেটে চালান করবো। জাস্ট বউ নিয়ে ফিরতে দে বাড়িতে।
রফিক হঠাৎ করে সোলেমানের রাগের কারন বুঝলো না। এগিয়ে আসতে আসতে সোলেমান ততক্ষণে বউকে নিয়ে গাড়িতে বসে গেছে।

যতটা সম্ভব দ্রুত গতি তুলে ঢাকার রাস্তায় ছুটছে সে। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে একাধিকবার হর্ন দিয়েছে, রিকশা পাশ কাটিয়েছে, সংকীর্ণ গলিতে হেডলাইট জ্বালিয়ে গতির ছন্দ ভেঙেছে।
বউয়ের হাতে গরম চা পড়েছে বিষয় টা সবার কাছে সামান্য লাগলেও, সোলেমানের কাছে এটা তুচ্ছ নয়। সে কোনো রকম ঝুঁকি নিতে চায় না। মেহরিনের একটুখানি ব্যথাও যেন ওর হৃদয়ে লালাভ ক্ষতের মতো লাগে।
মেহরিন চলতি গাড়িতে মাথা ঘুরাতেই দেখতে পেলো ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের নাম ফলক টা। নামটা দেখা মাত্রই সে থমকে গেলো। এই তার স্বপ্নের মেডিক্যাল কলেজ! মূহুর্তে যেন এক নিমিষে মেহরিনের সব ব্যথা, সব কষ্ট কোথাও একটা মিলিয়ে গেলো।
মেহরিনের বাবা, মোতালেব ভুঁইয়ার আজীবনের স্বপ্ন ছিলো তার মেয়ে এই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজেই পড়বে। এখান থেকে একদিন সাদা এপ্রোন পরে ডিগ্রিধারী ডাক্তার হয়ে বের হবে। সেদিন তার নামের আগে জ্বলজ্বল করবে এক উপাধি-“ডক্টর মেহরিন তাবাসসুম।”

গাড়িটা মেডিক্যাল কলেজের গেট ছাড়িয়ে চলে গেলো। মেহরিন চোখ ফিরিয়ে নিলো।
গাড়িটা এসে থামলো শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। মেহরিন হতবিহ্বল হয়ে গেলো। সামান্য গরম চা হাতে পড়ায় তার স্বামী তাকে এখানে নিয়ে এসেছে! মেহরিন ভেবেছিল কোনো এক ফার্মেসীর দোকানে হয়তো নিয়ে যাবে। কিন্তু এখানে নিয়ে আসবে এটা তার ভবনাতেও আসে নি।
সোলেমান দ্রুত গাড়ি পার্ক করে মেহরিনকে ধরে নামাল। মেহরিন সোলেমানের হাত ধরতেই সোলেমান বলে উঠলো-

-” এইতো বউ চলে এসেছি আর কষ্ট হবে না।
সোলেমান মেহরিন কে কথা বলারও সুযোগ দিলো না। শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের ভেতরে ঢুকেই রিসিপশন ডেস্কে গিয়ে সোলেমান তাড়া দিয়ে বলল-
-” জরুরি ইনজুরি কেস, রোগীর হাতে গরম চা পড়েছে।
ডেস্কে বসে থাকা নার্স মুখ তুলে একবার তাকালো। বললো-
-“কতটুকু পুড়েছে?
সোলেমান উত্তরে কেবল বললো-
-” ডক্টর কোথায়?
-” আমাকে দেখান হাতটা।
সোলেমান মেহরিনের হাতটা দেখালো। খুব বেশি জায়গায় চা পড়ে নি।
নার্স যেন একটু বিরক্ত হয়ে বললো,
-” এইটুকুর জন্য এখানে আসতে হয়? একটু পানি ঢাললেই হতো।
সোলেমান কণ্ঠ শক্ত করে বললো-
-” আমার স্ত্রী… তার শরীর অনেক সেনসিটিভ। আমি কোনো রিস্ক নিতে চাই না। ডক্টর কোথায় সেটা বলুন। আপনার কাছে জ্ঞান শুনতে চাই নি।
নার্স একপাশে থাকা জুনিয়র ইন্টার্নকে ইশারা করলো। সে এসে বললো-
-” আপনি আমার সাথে আসুন। স্যার করিডর ৮, কক্ষ নম্বর ১৭ এ আছেন। আমি প্রাথমিক ড্রেসিং করে দিচ্ছি।
সোলেমান দাঁত চেপে বলল-

-” আই নিড ডক্টর। ডক্টর কোথায় সেটা বলুন।
নার্সের কণ্ঠে হালকা তাচ্ছিল্য-
-” ইনজুরি সিরিয়াস না হলে স্যার দেখবেন না। আপনি উনার সাথে যান। উনি ড্রেসিং করিয়ে দিবে।
সোলেমান শুনলো না। সে নিজেই মেহরিন কে নিয়ে করিডর ৮ এর ১৭ নম্বর কক্ষের দিকে ছুটলো। তাদের পেছন পেছন নার্সও ছুটলো। এই লোক দেখছি তার চাকরি খেয়ে দিবে।
১৭ নম্বর কক্ষের দরজার বাইরে লেখা:
প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন পরিচালক
শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট
রোগী দেখার সময়: সকাল ৯টা – দুপুর ১টা ৩০ মিনিট (রবি – বৃহস্পতি)
কক্ষ নম্বর: ১১৭, করিডর – ৮
জরুরি নম্বর (অভ্যন্তরীণ): ২৩১
গুরুতর রোগীর অগ্রাধিকার। অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নিষেধ।
সোলেমান নক না করেই সোজা ভেতরে ঢুকে পড়েন। নাসির উদ্দীন আকস্মিক নক না করে কাউকে ঢুকতে দেখে মাথা উঁচু করে দরজার দিকে তাকাতেই এমপি নওয়াজ সোলেমান সুলতান কে দেখে হকচকিয়ে যায়। বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো।
নার্সও হুমড়ি খেয়ে ঢুকলো। নাসির উদ্দীন মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল-

-” আরে সোলেমান যে! কোনো দরকার নাকি?
কথাটা শেষ করেই সোলেমানের পেছনে তাকাতেই দেখতে পেলো মেহরিন কে। মেহরিন দেখলো ভদ্রলোক টাকে। গায়ে সাদা এপ্রোন, গলায় স্টেথোস্কোপ।
সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে চেয়ারে বসে অস্থির গলায় বলল-
-” ওর হাতটা একটু দেখে দিন। অনেক টা পুড়ে গিয়েছে।
ডা. নাসির উদ্দীন মেহরিনের হাত ধরে দেখলেন। মৃদু কণ্ঠে বললেন-
-” এটা ফার্স্ট ডিগ্রি বার্ন। সঠিক ড্রেসিং আর ক্রিম দিলে ঠিক হয়ে যাবে।
তিনি নার্সকে নির্দেশ দিলেন অ্যান্টি বার্ন ক্রিম দিতে। নার্স সেটা দিতেই ডক্টর নাসির উদ্দীন ক্রিম টা মেহরিনের হাতে লাগিয়ে দিয়ে বলল-

-” অ্যান্টি-বার্ন ক্রিম লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছি। তিনদিন পর আবার নিয়ে আসবে। যদি ফোস্কা বড় হয়, সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে আসবে। আর এই প্রেসক্রিপশনে লিখে দেওয়া ঔষধ গুলো খাওয়াবে।
নার্স রুম থেকে যেতে যেতে ভেঙচি কেটে গেলো সোলেমান কে। পাগল ছাগল লোক কোথাকার। এই সেম কাজটাই তো তারা করে দিত। নাহ্ ঢং, মাইনসের বউ নেই আর। পুরো শরীর পু’ড়ে ছাই হয়ে যায় তারপরও এমন পাগলামি করতে দেখে না। আর কি একটু হাত পুড়ছে ওমনি সোজা এখানে!
সোলেমান ডক্টরের কথা শুনে কিছুটা স্বস্তি পেলো। ডক্টর জিজ্ঞেস করলো-
-” মেয়েটা কে সোলেমান?
সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল-
-” বউ।

তারপর চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসলো। নিবাসে ফিরে বউকে কিছু খাবার নিজ হাতে খাইয়ে দিলো। ডান হাতেই পড়েছে চা টা। খাওয়া শেষে ঔষধ টা খাইয়ে ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমে আসলো।
গোসল করার জন্য পড়নের শার্ট টা খুলতে গিয়ে বুকে টনটনে ব্যথা অনুভব করলো। শার্টের বোতাম খুলে সামনের মিররে দেখলো বাম পাশের বুকের অংশ টা লাল হয়ে পোড়া দাগ বসে ফোস্কা পড়তে শুরু করেছে। ঔষধ লাগাতে হবে। ঝটপট কোনোরকমে গোসল করে রুমে এসে দেখলো বউ তার ঘুমিয়ে গিয়েছে। সোলেমান মিররের সামনে দাঁড়িয়ে অ্যান্টি বার্ন ক্রিম টা লাগিয়ে শার্ট পড়ে মেহরিনের গা ঘেঁষে শুয়ে পড়লো।
মেহরিনের ঘুম ভাঙে আসরের আজান কানে আসতেই। শোয়া থেকে উঠতেই দেখতে পেলো সোলেমান ঘুমিয়ে আছে। মেহরিন ওয়াশরুমে গিয়ে ওজু করে নামাজ টা আদায় করে নেয়।
সোলেমানের ঘুম ভাঙে সন্ধ্যার পর। শরীরে হাল্কা জ্বর চলে এসেছে। ঘুম থেকে চোখ মেলে তাকাতেই দেখতে পেলো মেহরিন তার জন্য ব্লাক কফি নিয়ে এসেছে। সোলেমান ভীষণ বিরক্ত হলো মেহরিনের কাজে। এই অবস্থাতেও তার রান্না ঘরে যাওয়া লাগবে! রান্নার কাজকর্ম করানোর জন্য কি সে মেহরিন কে নিয়ে এসেছে?
মেহরিন কফির মগটা বাড়িয়ে দিতেই সোলেমান কালো মুখে মগটা হাতে নিলো। মেহরিন ভ্রু কুঁচকালো।

-” রেগে আছেন নাকি?
সোলেমান পাশের বেড টেবিলে মগ টা রেখে বলল-
-” তোমাকে কি ঝিগিরি করার জন্য আমি সুলতান নিবাসে নিয়ে এসেছি? দুপুরে একটা অঘটন ঘটালে। তার ৫ ঘন্টা হতে না হতেই তুমি আবার রান্না ঘরে গেলে!
মেহরিন সোলেমানের পাশে বসলো। হাত টা সোলেমানের বুকের উপর রেখে কিছু বলার আগেই সোলেমান ব্যথায় আহ্ করে উঠলো। মেহরিন চমকে উঠলো। সোলেমান চোখ খিঁচে বলল-
-” ধরো না এখানে। ডান পাশে ধরো।
মেহরিন দ্রুত হাতে সোলেমানের শার্টের বোতামে হাত রাখলো। সোলেমান মেহরিনের হাত ধরে বলল-
-” আহ কি করছো?
মেহরিন শুনলো না। সোলেমানের হাত সরিয়ে দিয়ে বোতাম খুলতে লাগলো। বোতাম গুলো খুলতেই মেহরিনের চোখ আঁটকে গেলো সোলেমানের বুকে। ফর্সা বুক টা পু’ড়ে গিয়ে ফোস্কা পড়ে গেছে। মেহরিন আঙুল ছোঁয়াতেই সোলেমান ব্যথা গিলে নিলো। মেহরিনের চোখে জল চলে আসলো।

-” ক..কি করে হলো এটা?
সোলেমান বউয়ের জলে টইটম্বুর চোখ দেখে বলল-
-” আরে ল্যাদা বউ কাঁদছো কেনো?
-” বলুন না কি করে হলো?
-” গরম চা পড়েছিল।
মেহরিন বিস্ফোরিত চোখে চাইলো।
-” আমার হাত থেকে? তখন?
-” হুমম।
মেহরিন এবার শব্দ করে কেঁদে ফেললো। সোলেমানের জখম তো তার থেকেও বেশি। আর সেই লোকটা কি করলো? নিজের জন্য ডক্টর না দেখিয়ে তাকে নিয়ে গেছে বার্ন হসপিটালে! ডক্টরের দরকার তো উনার নিজের বেশি দরকার ছিলো।
মেহরিন বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। সোলেমানের হাত টেনে বলল-

-” উঠুন। ডক্টরের কাছে যাবেন। গা টাও গরম লাগছে। জ্বর এসেছে।
সোলেমান বউকে টেনে বসালো।
-” এই সামান্য কারনে ডক্টর লাগবে না। ঔষধ লাগিয়েছি। ঠিক হয়ে যাবে।
-” আমার ব্যথা টা তো এর থেকেও তুচ্ছ ছিলো। তাহলে আপনি কেনো আমায় ডক্টরের কাছে নিয়ে গেলেন। আপনি চলুন। ডক্টরের কাছে যাবেন। ফোস্কা পড়ে গেছে। আমার কষ্ট হচ্ছে।
সোলেমান বউয়ের মাথা ডান বুকে চেপে ধরে বলল-
-” ইউ আর সো এক্সপেনসিভ ফর মি, মিসেস মেহরিন সুলতান। ডোন্ট ইউ এভার ফরগেট দ্যিস।
ইভেন অ্যা স্ক্র্যাচ অন ইউ,ফিলস লাইক অ্যা উউন্ড অন মাই সোউল।
-” ভালো টালো বেসে ফেললেন নাকি?
সোলেমান জবাব দিলো না। সে এই প্রশ্নের উত্তর জানে না। আর জানতেও চায় না। ভালোবাসলেই মানুষ হারিয়ে যায়।

রাতের দিকে ডিনার সেরে রুমে ফিরেই ভীষণ অস্বস্তি হতে লাগলে সোলেমানের। বুকের ভেতর টা পুড়ছে নাকি বাহিরের পোড়ার যন্ত্রণা হচ্ছে বুঝতে পারছে না। হুট করে কেমন বিদঘুটে অনুভব হচ্ছে। অশান্ত অশান্ত লাগছে। মেহরিনের বিষয়টা নিয়ে? বোধহয় তাই। এদিকে শরীরেও তো জ্বর। মনে হচ্ছে সব যন্ত্রণা এক সাথে মিশে গিয়ে আরেক নতুন রকমের যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। হাসফাস করছে। মনে হচ্ছে কোথাও কিছু একটা হচ্ছে। কিন্তু কি হচ্ছে সোলেমান আন্দাজ করতে পারছে না।
মেহরিন স্বামী কে এমন অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে দেখে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো-

-” ব্যথাটা কি আরো বেড়েছে? বললাম ডক্টর দেখাতে। শুনলেন না তো।
সোলেমান মেহরিনের মুখের দিকে তাকালো। মূহুর্তে যেনো সব যন্ত্রণা কিছুটা সরে গেলো শরীর থেকে।
-” এখন আর ব্যথা হচ্ছে না। ঘুমোবে চলো।
মেহরিন কে নিয়ে ঘুমানোর পর আড়াইটার দিকে সোলেমানের ঘুম ভেঙে যায় তীব্র যন্ত্রণায়। শরীরের জ্বরটা আরো বেড়েছে। শুয়ে থাকতে পারলো না আর। মেডিসিন খাওয়ার ফলে মেহরিন ঘুমে বিভোর। সোলেমান শোয়া থেকে উঠে বসলো। জোরে জোরে শ্বাস নিলো। এ আবার কেমন যন্ত্রণা হচ্ছে যার স্থান সোলেমান শনাক্ত করতে পারছে না। এত খারাপ কেনো লাগছে?

সোলেমান রুম থেকে বেরিয়ে লাইব্রেরি রুমে আসলো। ভালো লাগছে না তার। টেবিলের চেয়ার টেনে বসলো। ল্যাম্প জ্বালালো। হাতে কলম তুলে নিয়ে বইয়ে দাগাদাগি করতে লাগলো। এতেও অস্বস্তি কমছে না। রাগে ফেলে দিলো কলম টা। ড্রয়ার থেকে আরো একটা কলম বের করার জন্য ড্রয়ার খুলে কলম বের করতে গিয়ে হাতের সাথে ধাক্কা খেলো একটা বই। হুমায়ুন আহমেদের কোথাও কেউ নেই বইটা। সোলেমান বইটার দিকে তাকালো। বইটা তাকে এক সময়ের খুব কাছের কেউ দিয়েছিল। বইটা এই ড্রয়ারে এখনও কি করছে?
সোলেমান ফেলে দেওয়ার জন্য বইটা হাতে নিতে গিয়েও কেনো যেনো ফেলে দিতে পারলো না। বইটা টেবিলের উপর রেখে পৃষ্ঠা উল্টালো। মুহূর্তে জ্বলজ্বল করে উঠলো ছলনাময়ী নারী প্রেমার হাস্যজ্বল ছবি। বুকে চিনচিন ব্যথা হতে শুরু করে। জীবনে ভালোবেসে আসা প্রথম নারী সে। ভুলতে চাইলেও কি ভোলা যায়? অতীত পেছন ছাড়ে না। এরা বর্তমান ভবিষ্যৎ জুড়েই বিরাজ করে।
এই মেয়েটাকে সে দেখতে চায় না। সেদিন সব ছবি পুড়িয়ে ফেলার পরও এটা রইলো কি করে?
সোলেমান ছবিটা অজান্তেই হাতে তুলে নিলো। নীল রঙের শাড়িতে কি সুন্দর ই না লাগছিলো সেদিন! কলেজের নবীন বরণ অনুষ্ঠান ছিলো প্রেমার। সোলেমান তুলেছিলো ছবিটা।
সোলেমানের অতীত ভাবলেই বুকের অসম্ভব ব্যথা হয়। সোলেমান নির্নিমেষ চোখে চেয়ে রইলো ছবি টার দিকে।

-” যেই সুখের লোভে তুমি আমায় ছেড়েছিলে
সেই সুখ কি তুমি পেলে?
সোলেমান ছবিটা ফের ড্রয়ারে রাখতে গিয়েও থেমে গেলো। জীবনের কিছু সুন্দর মুহূর্ত সে কাটিয়েছিল এই নারীর সাথে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর দুঃখ টাও পেয়েছে এই নারীর থেকে। তারপরও সোলেমান আজ কেনো ভাবছে তাকে নিয়ে? আর ভাববে না। এসব ভাবা ঠিক না।
সোলেমান ম্লান হাসলো। বাহির বলে এক কথা আর ভেতর বলে আরেক কথা। সে কেনো আজ আবার প্রেমা কে স্মরণ করছে! তার খুব প্রেমার কথা মনে পড়েছে। দীর্ঘ অনেক গুলো বছর ধরে সে প্রেমাকে দেখে নি সামনা-সামনি সেদিনের পর।
নিজের ভাবনা গুলো দেখে আশ্চর্য হচ্ছে সোলেমান। ছবিটা রেখে দিলো সে ড্রয়ারে। টেবিলের উপর মাথা রেখে চোখ বন্ধ করলো। ঠোঁটের কোনা গেয়ে উঠলো তার-
সবই বুঝি, তবুও অবুঝের মতো
তোমায় খুঁজি, নিয়ে হারানোর ক্ষত
আজো ভাবি, কেনো বেদনার মতো
হৃদয়ে আঁকি, নীল প্রজাপতি শত
ফেরাতে পারিনি আমি, পারিনি তোমার হতে
তুমি তো গিয়েছো চলে, দ্রুতলয়ে আলোর পথে…

রাত তিনটা বেজে তেত্রিশ মিনিট। রুমের ঠান্ডা মার্বেল মেঝেতে পড়ে আছে প্রেমা। শরীরে একবিন্দু শক্তিও আর অবশিষ্ট নেই। অনুভূতিহীন হয়ে গেছে সে। একটা মেয়ে কখন নারী তে পরিপূর্ণ হয়? যখন সে মাতৃত্বের স্বাদ গ্রহণ করে। তার শরীর থেকে আরেকটা শরীরের জন্ম হয় তখন। কিন্তু প্রেমার বেলায় কি হলো? সেদিন জানতে পারলো সে প্রেগন্যান্ট। তার শরীরে ছোট্ট একটা প্রাণ বেড়ে উঠছে। হোক তার জন্ম ঘৃণা আর জুলুমের ফল, কিন্তু সেই সন্তান তার দেহের অংশ ছিল, তার মনেরও। প্রেমা চেয়েছিল রাখতে, বাঁচাতে, আগলে রাখতে সেই প্রাণটাকে। কিন্তু জীবন কেবল তার ইচ্ছের ওপর চলে না। শেখর বুঝে গিয়েছিল প্রেমা প্রেগন্যান্ট। বুঝা মাত্রই আজ টেনেহিঁচড়ে তাকে হাসপাতালে নিয়ে
গিয়েছিল। প্রেমা কত হাতে পায়ে ধরে আকুতি বিনতি, আহাজারি করলো। কিন্তু শেখর ফিরেও তাকালো না। সে বাচ্চা চায় না। সে তার সিদ্ধান্তে অটল। বাচ্চা জন্মানোর জন্য সে প্রেমা কে বিয়ে করে নি।
অগ্যতা প্রেমার অনিচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে হাত-পা শক্ত করে বেঁধে তারপর অ্যাবর্শন করানোর জন্য ওটির ভেতরে নেওয়া হয়।

ভ্যাকুয়াম অ্যাসপিরেশন যন্ত্রের একটি পাতলা ক্যানিউলা প্লাস্টিকের টিউব, যেটি সরাসরি জরায়ুর ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। ধীরে ধীরে সেটা প্রেমার জ’রায়ুর মুখ দিয়ে ঢোকানো হলো তখন যেনো প্রেমা স্বয়ং মৃত্যু কে যেন কাছ থেকে দেখতে পেলো। মনে হলো ভেতরটা কেউ আঁকড়ে ধরেছে, মুচড়ে দিচ্ছে। হৃদয়টা কেউ টেনে বের করে নিচ্ছে। প্রেমার আর্তচিৎকারে ডক্টর নার্সরাও শিউরে উঠলো। প্রেমার সার্ভিক্সকে ধীরে ধীরে প্রসারিত করতে ধাতব ডাইলেটারগুলো ব্যবহার করা হলো। হাতেগোনা কয়েক সেকেন্ডে সেটা প্রসারিত হয়ে যায় যন্ত্রটি ঢোকানোর জন্য।
ক্যানিউলা থেকে উচ্চ শক্তির ভ্যাকুয়াম সাকশন চালু করা হলো। গড়ে ঘণ্টার মত আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে, তখন মনে হলো প্রেমার গায়ের ভেতর থেকে হুট করে সবকিছু টেনে নিচ্ছে।
একধরনের টান লাগে, মরণ যন্ত্রণার একটা ব্যথা নিচের পেটটাতে তীব্র খামচে ধরা কষ্ট।
মাসিকের সময় যেমন পেট মোচড়ানো ব্যথা হয়, তার চেয়েও কয়েকশো গুন বেশি ব্যথা।
ভেতরে একটানা টান দেওয়া হলো। ভ্রূণের নরম টিস্যু, প্ল্যাসেন্টা, র’ক্তের কল্লোল সব একে একে টেনে বাইরে ফেলা হলো।

প্রেমা চেয়ে দেখলো তার সন্তানের এক এক করে শরীরের অংশ গুলোকে কে শরীর থেকে টেনে ছিঁড়ে বের করা হচ্ছে। ওর বয়সই বা কত? সবে ৩ মাস। চোখ, নাক, কান, ঠোঁট স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করেছিল,হাত ও পায়ের আঙ্গুল পরিষ্কার ভাবে গড়ে উঠেছিল, হৃদপিন্ড নিয়মিত ধুকতে শুরু করেছিল, অন্যান্য অভ্যন্তরীণ অঙ্গ যেমন কিডনি, লিভার, মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটতে শুরু করেছিল।হাড়ের কাঠামো তৈরি হতে শুরু করেছিল, পেশী শক্তিশালী হচ্ছিলো,লিঙ্গ বোঝা যাচ্ছিলো। ডক্টর ফিসফিস করে একে অপরকে বলছিল ছেলে সন্তান ছিলো সেটা।
প্রেমা ভেজা চোখে শুধু দেখে গেলো তার নাড়িছেঁড়া ধন টাকে। যে পৃথিবীতে আসার আগেই চিরতরে হারিয়ে গেলো। কি নি’র্মম ভাবে এই টুকু একটা শিশুকে মৃ’ত্যু দিলো তার বাপ! প্রেমা একটুও পারলো না বাঁচাতে! আসলো কেনো তার গর্ভে এই বাচ্চাটা? কেনো পাঠালো আল্লাহ তার গর্ভে এই শিশুটাকে যদি তার ভবিতব্যে এটাই লেখা ছিলো! প্রেমার বাচ্চাটার শরীরে টুকরে টুকরে অংশ গুলো কে ট্রে তে করে নিয়ে যাওয়া হলো। পেছন থেকে প্রেমা অনুনয় করে বলল-

-” একটু দেখতে দাও আমার বাচ্চা টাকে। নিয়ে যেও না তোমরা। কোথায় ফেলে দিবে তোমরা ওকে?
জবাব আসলো না। হয়তো কোনো এক ডাস্টবিনে ঠাঁই হবে তার বাচ্চাটার শরীরের অংশগুলোর। তার বাচ্চার এই নরম শরীর গুলো হয়তো কোনো এক কুকুর বেড়ালের এক বেলার খাবার হবে। এক বেলার হবে? কম পড়ে যাবে না?
প্রেমার জীবন টা অ্যাবর্শনেই থেমে রইলো না। অ্যাবর্শনের পরপরই তাকে আরেকটা অস্ত্রোপচারের জন্য প্রস্তুত করা হলো। তার পেটের নিচের অংশে ছোট একটি চিরচেরা কাট দেওয়া হলো। অপটিক্যাল ল্যাপারোস্কোপের মাধ্যমে দেখা হলো ফ্যালোপিয়ান টিউবগুলো।
তারপর ফ্যালোপিয়ান টিউব গুলো খুঁজে বের করে,একটি ইলেকট্রিক কারেন্ট ব্যবহার করে টিউবের নির্দিষ্ট অংশ পুড়িয়ে দেওয়া হলো।
এর ফলে ডিম্বাণু আর শুক্রাণুর সাক্ষাৎ ঘটবে না। আর অন্তঃসত্ত্বা হবার চান্স নেই। ভবিষ্যতে মা হবার দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেলো প্রেমার।
প্রেমা শুধু বোবার মতন দেখে গেলো সব। সে অনুভূতি শূণ্য হয়ে গেছে। তার ঘন্টা কয়েক পরই প্রেমা কে বাসায় নিয়ে এসেছে শেখর।

এখন আর চিৎকার করে কাঁদার ইচ্ছেও হচ্ছে না প্রেমার। কাঁদতে কাঁদতে চোখের জল ও ফুরিয়ে এসেছে,অথচ তার জীবনের আয়ু আর ফুরায় না। সে মৃত্যু চায়। একটা জঘন্য মৃত্যু হোক তার সেটাকেও সে সাদরে গ্রহণ করে নিবে।
কেউ যদি এখন তাকে এই অবস্থায় দেখত তাহলে বলত এই মেয়েটার ভেতর বেঁচে থাকার আর কোনো ইচ্ছা নেই। আর কীই বা বাকি আছে তার জন্য? শরীর নিস্তেজ, চোখের পাতায় কষ্ট জমে আছে ধূসর আবরণ হয়ে। প্রেমা হিসেব করে দেখলো এই জীবনে সে কিছুই পেলো না। বাবার স্নেহ পেলো না জীবনে। মা’কে ধরে রাখতে পারলো না। সোলেমান তার হয়েও শেষে আর হলো না। শেখর কে সে আজও স্বামী হিসেবে মেনে নিতে পারলো না। তার দুটো সন্তানের একটা সন্তান কেও সে বাঁচাতে পারলো না। দিনশেষে সে আজ পেলো একটা অক্ষম, বন্ধ্যাত্বকরণ জীবন। যেখানে আর সে ভবিষ্যতে মা হতে পারবে না। এই জীবনের আর কি বা মানে আছে? শেখর আর কি চায় প্রেমার কাছে? এই শরীর টার লোভেই,সোলেমান কে হারাতেই তো বিয়ে করেছিল। আত্মহত্যা টা পৃথিবীতে হারাম না করে হালাল করে দেওয়া হোক প্রেমার জন্য। সে আর বইতে পারছে না এ জীবন। এত কষ্ট এত যন্ত্রণা! প্রেমা একটু সুস্থ জীবন চেয়েছিল সোলেমানের সাথে। এটাই ছিলো তার অপরাধ! সেই অপরাধের সাজা আজ জন্ম জন্মান্তরের হয়ে দাঁড়ালো। আহারে জীবন! তার বড্ড মায়া হয় এই জীবনটার জন্য।
জানালা দিয়ে দূর থেকে ভেসে আসলো একটা গান। প্রেমার কানে এসে বিঁধল।

দাহশয্যা পর্ব ৪৪

না জানি কোন অপরাধে
দিলা এমন জীবন
আমারে পুড়াইতে তোমার
এতো আয়োজন
আমারে ডুবাইতে তোমার
এতো আয়োজন!
সুখে থাকার স্বপ্ন দিলা
সুখতো দিলা না
কতো সুখে আছি বেঁচে
খবর নিলা না, বিধি
খবর নিলা না….
আমি ছাড়া কেউ নাই আমার
দুখের পরিজন
আমারে পুড়াইতে তোমার
এতো আয়োজন……
গানটার প্রতিটি কথার মাঝে যেনো প্রেমা নিজেকে দেখতে পেলো।

দাহশয্যা পর্ব ৪৬