লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ৩৩
অহনা রহমান
নরম বিছানার এক কোণে চুপচাপ বসে আছেন কামরুল। থম মেরে বসে আছেন তিনি৷ কথা বলার শক্তি ও নেই আপাতত। চশমাটা নিচে কখন পড়ে গেছে সেটাও টের পাননি তিনি। অথচ চশমা ছাড়া মানুষটা অচল। কতক্ষণযাবত এখানে চশমাহীনা বসে আছেন কে জানে! তার তো একটাই মেয়ে_ওই রুহি৷ কখনো কোনোকিছুরই অভাব বুঝতে দেননি। সবাই বলে, বাবা’রা নাকি একটু বেশিই ভালোবাসেন মেয়েকে৷ কামরুল ও তো রুহিকে ভালোবেসেছেন। কামরুল হাসানের মনে পড়ে, রুহি যখন জন্ম নিয়েছিলো ওর মাঝে তিনি নিজের মাকে খুঁজে পেয়েছিলেন। মেয়ে হওয়ার খুশিতে সমস্ত এলাকায় মিষ্টি বিতরণ করেছিলেন তিনি৷ ছোট থেকেই তারা বাবা-মেয়ে ছিলো ফ্রেন্ডলি। বলা যায় রুহি মায়ের সাথে যতটা না ফ্রী ছিলো তার দ্বিগুণ ফ্রী ছিলো বাবার সাথে। তাহলে? এতটা দুরত্ব কবে সৃষ্টি হলো মেয়ের সাথে? ঠিক কতটা দূরত্ব সৃষ্টি হলে, একটা মেয়ে তার বাবাকে এমন অপবাদ দিতে পারে? কামরুল ইসলাম বুঝে উঠতে পারলেন না। হিমালয় মতো ঠান্ডা, পাহাড়ের মতো অটল মানুষটা রুহির ওই কথাটায় সম্পুর্ন ভেঙে পড়েছেন।
হ্যা, হিয়াকে তিনি ভালোবেসেছেন কিন্তু রুহির থেকে বেশি নয়। কখনোই না৷ তিনি জানেন তার সীমাবদ্ধতার কথা৷ হিয়াকে তিনি রুহির থেকে ভালোবাসেন এটা কোনো ক্রমেই সত্যি নয়। বরং রুহির পরে হিয়াকে স্নেহ করেন। যতটা স্নেহ করলে এতিম ভাতিজিটার বাবার অভাব না মনে হয়। যতটা খোঁজ নিলে মনে হয়, হিয়া বাবা হারিয়েও বাবার ছায়ায় তলে থেকেছে৷ এই যেমন, রুহির জন্য একটা পোশাক আনলে ওরকম একটা হিয়ার জন্যও আনতো। পাছে যদি হিয়ার মনে হয়, তার বাবা থাকলে সে এমন পোশাক পড়তে পারতো৷ ব্যাস! সবটাই ছিলো দায়িত্ববোধ৷ কিন্তু এসবের মাঝে তার মেয়েটা কবে এতটা পর হলো!
রুহির বলা কথাটা মনে পড়তেই কামরুল হাসান বিমর্ষ হয়ে পড়েন। বুকের মাঝে চাপা কষ্ট মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চায়। টু ফোঁটা অশ্রু জমে চোখে৷ কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারছেন না এসব। কামরুলের ভাবনায় ইতি টেনে রুমে প্রবেশ করলো রুহির মা৷
তিনিও কম ধাক্কা খাননি৷ মেয়েটা এভাবে বললো কেন, কিছুই বুঝতে পারেননি। তিনি চেনেন নিজের স্বামীকে। আবার বোনতুল্য জা কেও চেনেন তিনি। দুজনেই পবিত্র তাদের সম্পর্কে এটা তিনি ভালোভাবেই জানেন৷ মেয়েটা কিসের ভিত্তিতে এসব বললো! রুহির মা নিঃশব্দে স্বামীর পাশে এসে বসলেন। কামরুলের হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিলেন। ক্ষীণ কন্ঠে বললেন,
“রুহির আব্বা? আপনি কষ্ট নিয়েন না মনে। মেয়েটা ছোট মানুষ। কি বলতে কি বলেছে ওসব ধরে রাখবেন না।”
“আচ্ছা, তোমার কখনো মনে হয়েছে এমন? মানে রুহি যেটা বলেছে সেটা সঠিক!”
ভদ্রমহিলা জিহ্বা কামড় দিলেন। অতিদ্রুততার সাথে বললেন,
“এসব কি বলছেন? ছিঃ! ছিঃ! এসব কথা তো আমরা কখনো কল্পনায় ও আনতে পারিনি। এ-সব বলবেন না দয়া করে।”
কামরুল তখন পুরোপুরি বিধ্বস্ত ভেঙে যাওয়া গলায় বললেন,
“তাহলে কোন কমতির কারনে মেয়েটা এমন অপবাদ দিলো, বলতে পারো? রুহির মা, আমার যে সমস্ত শরীর ভেঙে আসছে। এই নির্মম নিয়তি দেখতেই কি, সারাজীবন ত্যাগ করে সন্তান মানুষ করেছিলাম বলো?”
রুহির মা জবাবে কোনো কথা বলতে পারলেন না। শুধু কামরুল হাসানের গলাটা জড়িয়ে ধরলেন। কেঁদে ফেললেন তিনি। কাঁদতে কাঁদতেই বললেন,
“জানি না ও এসব কেন বললো। সব আমার দোষ! সব সব! মেয়েটাকে আদরে মানুষ করতে গিয়ে মনুষ্যত্বের শিক্ষাটা দিতেই ভুলে গেছি। যার জন্য আজ আপনাকে এমন কথা শুনতে হলো৷ আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন রুহির আব্বু।”
কামরুল জবাবে শুধু একটা কথা বললেন,
“আমাকে একটু একা থাকতে দাও। যাও গিয়ে হেলেনাকে দেখো। না জানি বেচারি কি করবে! জীবনের অর্ধেকটা সময় বিধবা হয়ে সম্মানের সাথে বেঁচেছে। অথচ আজ মেয়ের মুখে এমন কথা শুনতে হলো!”
রুহির মা সময় দিলেন নিজের স্বামীকে। আসলেই তো! হেলেনা সেই যে ঘরের দরজা দিয়েছে। তার তো আর দেখায় নেই। না জানি কতটা কষ্ট পেয়েছে। রুহির মা আর থাকলো না সেখানে।
রুহিকে তখন মারার পরে ও তল্পিতল্পা গুটিয়ে নিয়ে চলে গেছে ওই বাড়িতে। এজন্য রুহির মা সিদ্ধান্ত নিলেন, রাজের কাছে কল করে জিজ্ঞেস করবেন রুহি পৌছেছে কি’না! রাত তখন বেশ গভীর। যদিও শহরাঞ্চলে এসব স্বাভাবিক। তবুও রুহির মায়ের চিন্তা হলো রুহির জন্য। শত হলেও মা তো!
রাতের সুবিশাল আকাশে থালার মতো মস্ত একটা চাঁদ উঠেছে। যার মিষ্টি আলো নিকষ কালো রাতটাকে অসম্ভব মায়াময় করে তুলেছে। একটা নির্জন রোড। সেখানেই থামলো কালো একটা — ব্রান্ডের কালো রঙা গাড়ি। গাড়ি থেকে প্রথমে নামলো সাদা পাঞ্জাবি পড়া এক অতি সুদর্শন পুরুষ৷ সে নেমে গিয়ে ড্রাইভিং সিটের অপর পাশের দরজাটা খুলে দিলো। এরপর আস্তেধীরে গাড়ি থেকে বের হলো একটা মিষ্টি পরী। গোলাপি রঙা শাড়ি পরিহিত সে। তার হাসবেন্ড এর গোলাপি নাকি ভীষণ পছন্দের। তাই তো সে বারবার গোলাপি পড়ে নিজের স্বামীকে মুগ্ধ করে। মেয়েটির লম্বা চুলগুলো ছেড়ে দেওয়া৷ হাতে সাদা কাঁচের চুড়ি। যেগুলো চাঁদের আলোয় ঝকমক করছে। মাথায় আবার টিকলি পড়েছে সে৷ কি যে স্নিগ্ধ অপরূপা লাগছে!
হিয়া গাড়ি থেকে বেড়িয়ে নাফির উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,
“আমাকে এভাবে কেন সাজালেন শুনি? আমি নিজেই পারি না নড়তে চড়তে।”
“তোমাকে নড়তে কে বলেছে শুনি?”
কথাটা বলেই নাফি হিয়াকে পাঁজা কোলে করে তুললো। এতে হকচকিয়ে উঠলো হিয়া৷ এই লোকের সমস্যা কোথায়? হুটহাট এভাবে কোলে কে নেয়?! ফুটপাতের রাস্তার এক পাশে হিয়াকে নামিয়ে দিলো নাফি৷ এরপর দুজনে একসঙ্গে বসলো ফুটপাতের রাস্তায়। হিয়া কিছু বললো না৷ চুপচাপ রাতের প্রকৃতি উপভোগ করতে লাগলো। তবে কিছুক্ষনের মধ্যে হিয়ার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিলো নাফি তার দিকে তাকিয়ে আছে। হিয়া ঘাড় ফিরিয়ে পাশে তাকালো। দেখলো সত্যিই নাফি হাঁটুতে ভর দিয়ে গালে হাত রেখে তাকেই দেখে যাচ্ছে। এতে খানিকটা লজ্জা পেল হিয়া। এই মানুষটা সবসময় তাকে স্পেশাল ফিল করায়। হিয়া বলল,
“দেখুন কি সুন্দর চাঁদটা। আপনি চাঁদ না দেখে এভাবে কি দেখছেন?”
নাফি হিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। হালকা হেঁসে বলল,
“দেখছি তো আমার ব্যক্তিগত চাঁদকে। ওই আকাশের চাঁদও যে সৌন্দর্যের কাছে হার মেনেছে৷ আমি দেখছি তো আমার ভালোবাসার চাঁদকে।”
হিয়া লাজুক হাসলো। নিজের মাথাটা রাখলো নাফির কাঁধে।
“আমাকে এতটা ভালোবাসলেন কেন?”
“ভালোবাসতে ঘটা করে কোনো কারন লাগে না।”
হিয়ার কপালের টিপটা ঠিক করে দিলো নাফি। গাড়িতে বসে নিজে হাতে সাজিয়ে দিয়েছে হিয়াকে। এটা মানতেই হবে, স্বামীর হাতে সেজে হিয়ার সৌন্দর্য বহুগুণে বেড়ে গেছে৷ তাকে দেখে মনে হচ্ছে পূর্ণচন্দ্রের শোভা। নাফি মুগ্ধ হয়ে দেখলো হিয়ার নয়নাভিরাম সৌন্দর্য। এরপর বলল,
“সত্যি বলতে আমি জানি না, কেন তোমাকে ভালোবাসি। তোমাকে ভালোবাসার জন্য আমার কোনো কারন লাগে না ময়না। তোমাকে দেখলেই আদর আদর লাগে। ভালোবাসতে ইচ্ছে করে ভীষণ করে।”
হিয়া নাফির চোখে চোখ রাখলো। অমনি শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল একটা শীতল শিহরণ। এরচেয়ে রোমান্টিক বোধহয় আর কিছুই হয়না। কে বলে, রোমান্টিক শুধু শারীরিক ছোঁয়াতে হয়? হিয়া তো জানে, এ-র চেয়ে ভালোলাগার মুহুর্ত আর দু’টো নেই৷
“সারাজীবন আমাকে এভাবে ভালোবাসবেন তো নাফি?”
নাফি কুটিল হেঁসে জবাব দিলো,
“নাহ।”
নাফির হুট করে বলা কথাটা সোজা হিয়ার কলিজায় লাগলো। মুখটা কালো হয়ে এতটুকু হয়ে গেল। নাফি তাকে সারাজীবন ভালোবাসবে না! তাহলে এসব কি! কেন? হিয়ার চোখের কোনে অশ্রু জমলো। অবিশ্বাসের স্বরে বলল,
“কি বললেন?”
নাফি সাবলীল ভাবে জবাব দিলো,
“বলেছি, সারাজীবন এভাবে ভালো বাসবো না।”
হিয়া কান্না আটকাতে ঢোক গিললো। তবে শেষ রক্ষা হলো না। চোখের কোন বেয়ে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। তা দেখে কেবলই হাসলো নাফি। মেয়েটা এতো অবুঝ কেন? নাফি হিয়াকে কাছে টেনে নিলো। চাঁদের নরম আলোই কি যে সুন্দর লাগলো দুজনকে৷
“কেন বোঝো না ময়না, এখন যেমন ভালো বাসছি আগামীতে এমন ভালোবাসা থাকবে না। বরং দিনকে দিন নাফির ভালোবাসা প্রখর হবে। এটা শেষ হবে না কখনো আবার একই রকম ও থাকবে না।”
“কি হলো? বাপের বাড়িতে জায়গা হয়নি বুঝি!”
রাজের এমন আক্রমনাত্মক কথা শুনে রুহির খারাপ মনটা ফের খারাপ হলো। খারাপ বলতে রাগ উঠলো তার। রুহি কড়া গলায় বলল,
“মুখ সামলে কথা বলবে রাজ। আমি তোমার ওয়াইফ!”
রাজ হেঁসে ফেললো রুহির কথা শুনে৷ হাসতে হাসতেই বলল,
“কি? আমার ওয়াইফ আপনি? রিয়েলি? ও মাই গড! জানতাম না তো।”
“রাজ এখন মজা করার সময় নাই৷ প্লিজ আমাকে একটু একা থাকতে দাও।”
রাজ মজা পেল রুহির কথা শুনে। রুহি কখনো ওর পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেছে, যে ও করবে? রাজ দ্বিগুণ উৎসাহের সাথে নিজের শার্টের বোতাম খুলতে লাগলো। একপা একপা করে রুহির দিকে এগোতে লাগলো। বলল,
“ওয়াইফ না তুমি? এসো ওয়াইফ একটু হাঙ্কি-পাঙ্কি করি৷ আই মিন বাসর টা সেরে নিই৷ এখনো তো বাসর হলো না আমাদের।”
রাজের কন্ঠ শুনে রুহি থমকালো। ও বসা থেকে দ্রুত উঠে দাঁড়ালো।
“ক,কি বলছো র,রাজ? মা,মাথা ঠিক আছে তো?”
রাজ শুনেও শুনলো না রুহির কথা। ও এগিয়ে এলো রুহির দিকে। একটা সময় রুহি রাজকে বাঁধা দিতে না পেরে খাটে ধপ করে বসে পড়লো। রাজ তখন রুহির অনেকটা কাছাকাছি। ও নিচু হয়ে রুহির মুখের কাছে মুখ নিলো। রুহি তখন ভয়ে একাকার।
“এসব কি করছো রাজ? আর ইউ আউট অফ সেন্স?”
“নোপ! আমি ঠিকই আছি।”
রুহি সজোরে ধাক্কা মারলো রাজকে। যদিও তাতে রাজ একটুও টললো না৷ বউয়ের অধিকার যখন দেখাতে এসেছে, ওর ও তো কিছু হক আছে তাই না! রুহির কাছে রাজের এই আচরণ সম্পুর্ন অপ্রত্যাশিত ছিলো। ব্যাপারটা মোটেও মানতে পারছে না রুহি। রাজের সাথে তো ডিল করা আছে। তাহলে রাজ কেন এমন করছে?
রুহি যখন দেখলো রাজ কথা শুনছে না। ও তখন দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“বাড়াবাড়ি করছো কিন্তু। ভুলে যেওনা….!”
রুহির কথা শেষ হওয়ার আগেই রাজ ও ঠোঁটে আঙুল ছোঁয়ালো।
“শশশশশ!”
রুহি কেঁপে উঠলো রাজের স্পর্শে। কথা বলার শক্তিও হারালো মেয়েটা।
ওই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে সে রাজকে কল করেছিলো। রাজই ওকে নিয়ে এসেছে৷ তবে রাস্তাতে একবারও রাজ জিজ্ঞেস করেনি কি হয়েছিলো। কেনই বা রুহি এতো রাতে ফিরে এসেছে। বরং রুহিই সবটা বলেছে। মনে মনে একটু আধটু অনুশোচনা হচ্ছে বৈকি৷ তবে সে সেটা রাজকে বুঝতে দেয়নি৷ এইজন্যই রাজ ওকে বারবার খোঁচা মেরে যাচ্ছে।
এসব ভাবতে ভাবতেই রুহি আনমনে সামনে তাকালো। চোখের সামনে এবং খুব কাছে রাজকে দেখে মেয়েটি হকচকালো। রাজ তখন চুমু খাবে বলে এগিয়ে আসছে৷ রুহি ওই দৃশ্য দেখে তড়িৎ চোখ দুটো খিঁচে বন্ধ করে ফেললো। কিন্তু…….
লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ৩২
কিন্তু অনেকক্ষণ পরও যখন রাজের কোনো হদিস পেল না। তখন রুহি আবারও চোখ তুলে তাকালো। দেখলো, রাজ ওর জায়গাতেই আছে। রাজ রুহির দিকে তাকিয়ে আছে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। ঠোঁটে বাঁকা হাসি৷ রুহি চোখ তুলে তাকালে সেই হাসি আরও বিস্তৃত হলো। রাজ হঠাৎ করেই বলে উঠলো,
“স্যরি! রুচিতে আসছে না।” একটু থেমে রাজ আবারও বলল,
“যে মেয়ে নিজের বাবাকে ওসব বলতে পারে, তার মতো স্ত্রী আমার চাই না। খুব শীঘ্রই এই সম্পর্ক থেকে বেড়িয়ে যাবো আমরা।”
