স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩৯
সানজিদা আক্তার মুন্নী
রাত এখন একটার কোলে ঢলে পড়েছে। নাযেম নিজের সমস্ত কাজ সেরে এসে ঘরের সামনে দাড়িয়েছে। বুকটা কেমন ধড়ফড় ধড়ফড় করছে। নাযেম সব সংকোচ কাটিয়ে ধীর পায়ে ঘরের ভারী কাঠের দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে। দরজা খুলতেই রজনীগন্ধা আর লাল গোলাপের মাতাল করা সুবাসে তার বুক ভরে যায়। চারদিকে রাশি রাশি ফুল আর স্নিগ্ধ আলোর ছটায় পুরো ঘরটাকে একটা স্বপ্নপুরীর মতো মনোরম করে সাজানো হয়েছে। আজ তার আর পুষ্পের বাসর রাত! অথচ এমন একটি কাঙ্ক্ষিত রাতেও সে ঘরে ফিরল মাঝরাত পেরিয়ে। নাযেম যে ইচ্ছে করে দেরি করেছে, তা কিন্তু নয়। আজ আট তারিখ, আর সামনে বারো তারিখে নির্বাচন। ক্ষমতার এই নিষ্ঠুর লড়াইয়ে এক মুহূর্তও দম ফেলার ফুরসত নেই তার। জনগণ যদি স্বেচ্ছায় ভোট না দেয় তন্ময় কে, তবে কারচুপি করে হলেও তাকে জিতাতেই হবে। রাজনীতিতে আবেগের কোনো স্থান নেই, আর সেটার জন্যই তো একটা নিখুঁত, পাকাপোক্ত পরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল আজ রাতে। ঘরের এই স্নিগ্ধ আর পবিত্র পরিবেশেও নাযেমের মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে একটু আগে করা নোংরা রাজনীতির হিসাব-নিকাশ। মানুষের ব্রেনওয়াশটা কীভাবে করতে হয়, সেটা তারা খুব ভালো করেই জানে। যারা বুঝে-শুনে, বিচার-বিবেচনা করে ভোট দেয়, এমন ভোটারের সংখ্যা আর কয়জন? গ্রামের সহজ-সরল, অভাবী আর অন্ধবিশ্বাসী মানুষের ভোটই তো সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। এদের ইমোশনকে একবার ব্ল্যাকমেইল করতে পারলেই খেল খতম!
এই তো, আজ মাগরিব পর থেকে তারা একটা প্রত্যন্ত গ্রামে পড়েছিল। সেখানকার সবাইকে তারা বড় বড় গলায় প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছে “আমাদের ভোট দিন, আপনাদের গ্রামে বাড়ি বাড়ি গ্যাসের লাইন আর পাকা রাস্তার ব্যবস্থা করে দেব।” শুধু ফাঁকা বুলিই নয়, গ্রামের মাতব্বর আর প্রভাবশালী মুরুব্বিদের পকেটে এরই মধ্যে কালো টাকার বান্ডিল গুঁজে দিয়ে এসেছে সে, যাতে পুরো গ্রামের ভোটটা একচেটিয়া তাদের বাক্সেই পড়ে।
এরপরও যদি কোনো কারণে পাশার দান উল্টে যায়, তবে বিকল্প হিসেবে কেন্দ্র দখল আর ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের ছক কষে রেখেছে তারা। প্রিসাইডিং অফিসার থেকে শুরু করে স্থানীয় মাস্তান সবাইকে ম্যানেজ করার কাজ আজ রাতেই শেষ করতে হয়েছে তাদের।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাযেম নিশব্দে দরজাটা আটকে দেয় নাযেম। বিছানার দিকে চোখ পড়তেই থমকে যায় তার দৃষ্টি পুষ্প ঘুমাচ্ছে। অতি সন্তর্পণে, ধীর পায়ে সে এগিয়ে যায় পুষ্পের দিকে। স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ ওর পানে। ঘুমন্ত অবস্থায় মেয়েটিকে কী ভীষণ স্নিগ্ধ আর মায়াবীই না লাগছে!
কিন্তু এই প্রশান্ত মুখটার দিকে তাকালেই নাযেমের বুকের ভেতরটা রাগে আর ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে। পুষ্পের সাথে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ অন্যায়টা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। অনেক খুঁজেছে সে, হন্যে হয়ে চারপাশ চষে বেড়িয়েছে, কিন্তু সেই জানোয়ারগুলোর কোনো খোঁজ এখনো সে পায়নি। আনমনেই একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে নাযেমের বুক চিরে। থাক, ও শান্তিতে ঘুমাচ্ছে, অকারণে তাকে আর জাগানোর কোনো প্রয়োজন নেই। এ ভেবে সে বিছানা থেকে আলতো করে একটা বালিশ আর কাঁথা তুলে নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ঘরের এক কোণে থাকা সোফাতেই শুয়ে পড়ে।
নাযেম সোফায় গা এলিয়ে দিতেই, বিছানায় শুয়ে থাকা পুষ্প সন্তর্পণে নিজের চোখ জোড়া খোলে। ঘাড় ঘুরিয়ে একপলক তাকায় সোফায় শোয়া নাযেমের দিকে। তারপর দৃষ্টিটা আবার ফিরিয়ে নেয় । ঠোঁটের কোণে তার ফুটে ওঠে এক চিলতে শান্ত, অদ্ভুত হাসি। স্রেফ একটা মুচকি হাসি!
নাজহা ফজরের নামাজ সেরে চুপ করে জায়নামাজে বসে আছে। দৃষ্টি তার নত জায়নামাজের পানে। তৌসির বিছানায় উপুড় হয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। নাজহার শরীরটা কিছুটা ভালো হয়েছে, হাঁটতে-ফিরতে পারার মতো শক্তি শরীরে জুগেছে। নাজহা এভাবে বসে থেকে গতরাতের কথা ভাবছে। রাতে তৌসির নিজের কথাই রেখেছিল, সে চলে গিয়েছিল। সে নাজহার দিকে ফিরেও তাকায়নি, তার কাছে টাকাই বড়। তবে তাড়াতাড়িই চলে এসেছিল। যখন এসেছিল, এসে নাজহার পাশে, নাজহার থেকে দূরত্ব নিয়ে শুয়ে পড়েছিল। নাজহা ঘুমে ছিল না, সে সজাগই ছিল, চোখ বুঁজা অবস্থায় ছিল। তৌসির ভয়ে আর নাজহাকে বুকে জড়ায়নি। তৌসির বড্ড ভয় পায় নাজহাকে—নাজহা যা বুঝল রাতের কাণ্ড দেখে। নাজহাও কিছু বলেনি, মন খারাপ নিয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছিল।
তৌসির আজ নাজহাকে বুঝিয়ে দিল, আবারো বুঝিয়ে দিল নাজহা তার কাছে কতটা মূল্যবান! নাজহাও মেনে নিয়েছে এই বিষয়টি। কী করবে, কারো থেকে তো জোর করে প্রায়োরিটি পাওয়া সম্ভব নয়, তাই চুপই থাকুক। তৌসির হড়মড়িয়ে ধীরে ধীরে ঘুম থেকে উঠে বসে। উঠে বসে বিছানায় তাকায়, দেখে বিছানা খালি, পাশে নাজহা নেই। নাজহাকে না দেখে হঠাৎ কেমন জানি ছ্যাঁত করে ওঠে তৌসিরের, তবে পরক্ষণেই নিচে তাকাতে দেখে নাজহা নামাজে। তৌসির শান্তির শ্বাস ছেড়ে উঠে লুঙ্গি ঠিক করতে করতে, হামি দিতে দিতে ওয়াশরুমে চলে যায়।
নাজহা তৌসিরকে উঠতে দেখে আর বসে থাকে না, তাড়াতাড়ি উঠে জায়নামাজ গুছিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় তৌসিরের জন্য চা নিয়ে আসতে। মানিয়ে যখন নিয়েইছে, তখন ছোটখাটো বিষয়গুলোও মানিয়ে নিক। সে তো জানে সে কার কাছে কী। তৌসিরের কাছে সে ততটাও মূল্যবান কেউ নয় যতটা সে ধারণা করেছিল। যাইহোক, এগুলো ভাবতে ভাবতেই সে রান্নাঘরে পা রাখে, আর পা রেখে সে দেখে পুষ্প শাড়ী পরে আছে, সে চা জ্বাল দিচ্ছে। আশেপাশে এখন আর কেউ নেই। পুষ্পের সাথে দেখা হতেই নাজহা দ্রুত গিয়ে পুষ্পের এক হাত চেপে ধরে, পুষ্পের চোখে চোখ রেখে রাগান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করে, “আপনি এখানে কী জন্য এসেছেন? আমি জানি আপনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে। আপনি কেন করছেন এমন? নাযেম চাচার সাথে কিছু করবেন না বলে দিলাম, কী চাই আপনার?”
পুষ্প খুবই শান্ত প্রতিক্রিয়া দেখায়। সে উল্টো নাজহার গলায়-কপালে হাত ছুঁয়ে বলে, “কুত্তার বাচ্চা, জ্বর তো তোর এখনো পুরোপুরি কমেনি, তাহলে এখানে কী করছিস? এক্ষুনি ঘরে যাবি এবং যতদিন সুস্থ না হবি, ততদিন তুই ঘরে থাকবি।”
নাজহা পুষ্পের হাত সরিয়ে দিয়ে দাঁত চেপে বলে, “আমি জিজ্ঞেস করেছি সেটার উত্তর দিন, তারপর আমি চলে যাব। আমি আপনাকে মানি, আপনি তো ভালো করেই জানেন।”
পুষ্প মৃদু হেসে নাজহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, “এই যে তোকে বাঁচাতে এলাম। জানোয়ারদের সাথে সামিল হয়ে যাচ্ছিস, সেটা থেকে উদ্ধার করতে এলাম। তোকে আমি সন্তানের মতো মানি, আর তোর এমন ধ্বংস সইতে আমি পারব না, তাই এসেছি। খবরদার, তুই আর আমার সম্পর্ক যেন কেউ না জানে! যদি জানে, তাহলে যে জানবে তাকে উঠিয়ে দিব। চিনস তো কী করতে পারি!”
নাজহা পুষ্পের কথা শুনে অসহায় গলায় বলে, “কেন এমন করছেন আপনি? আমাকে একটা সুন্দর জীবন দিয়েও কেড়ে কেন নিচ্ছেন? আমি তৌসিরের সাথে ভালো আছি, থাকতে দিন না।”
পুষ্প নাজহার কথার উল্টোপিঠে তাচ্ছিল্যের সুরে ফিসফিসিয়ে ওঠে, “ও তো সবচেয়ে বড় জানোয়ার, ওর সাথে আবার কিসের সংসার! আমি এই সংসার হতে দিব না, মনে রাখিস।”
এটা বলে আর কিছু বলতে যাবে, তখনি রান্নাঘরে কেউ আসার শব্দ পায় ওরা। তাই দুজনে সরে যায়। পুষ্প চা কাপে নিতে থাকে। রান্নাঘরে ইকরা আসে, আজ সে তাড়াতাড়ি উঠে গিয়েছে তাই চলে এসেছে। ইকরার পরনে একটা কালো একরঙা টিশার্ট আর সাদা প্লাজো, ও এমনি পোশাক পরেই সবার সামনে আসে। ইকরা নাজহার পাশে এসে দাঁড়িয়ে নাজহার গাল টেনে ধরে বলে, “কী অবস্থা কৈতরি, ঘুম কেমন হলো তোমার? জ্বর কমল?”
ইকরাও নাজহাকে কৈতরি ডাকে। ইকরা বড্ড আদর করে নাজহাকে, ছোট বোনের মতো ট্রিট করে। প্রথমে প্রথমে নাজহার অস্বস্তি হলেও এখন অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। নাজহা মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলে আর বলে, “এই তো, ছোট চাচীর সাথে কথা বলছিলাম।”
পুষ্প তাদের দিকে তাকিয়ে তখন বলে, “আচ্ছা তোমরা থাকো, আমি সবাইকে চা দিয়ে আসি।”
ইকরা এ শুনে বলে, “আরে না, তোমার কষ্ট করতে হবে কেন? রহিম চাচা কই, উনি দিবেন নে নিয়ে।”
পুষ্প মেকি হেসে বলে, “সমস্যা নেই মা, আমি দিয়ে আসছি।”
এ কথা বলে পুষ্প বেরিয়ে যান। পুষ্প যেতেই বিবিজান রান্নাঘরে প্রবেশ করেন পিছনে তাকিয়ে দেখতে দেখতে। তারপর ওদের সামনে এগিয়ে এসে নাজহার দিকে তাকিয়ে বলেন, “এই যে তালুকদারের ঝি, দেখো কীভাবে শাড়ী পরেছে। তোমায় তো পরিয়ে দিলেও পরো না! দেখো সবার সাথে কথা বলছে কত সুন্দর করে, তুমি তো ঘর থেকেই বের হও না।”
ইকরা এ শুনে প্রতিবাদ করে বলে, “এভাবে বলছো ক্যান নানী? ও আর ছোট চাচীর বয়স কি এক? ও একটা বাচ্চা মানুষ, ওর সাথে এত তুলনার কী? ও এখনো বাচ্চা, ও এসবের কী বুঝে? ছোট চাচীর কাছে ম্যাচিউরিটি আছে, তিনি যথেষ্ট বুঝদার একজন মানুষ।”
বিবিজান ইকরাকে ধমকে ওঠেন, “এই তুই চুপ কর! ওর সাথে তুলনা করছি, ওকে বলছি যে ওমন হতে। তোকে তো এটাও বলতে পারব না, তোর পোশাক দেখে মাঝেমধ্যে তুই যে মেয়ে, সেটাও ভুলে যাই আমি!”
নাজহা বিবিজানকে এবার বলে, “আর শাড়ী তো পরতাম বিবিজান, আমিও তো পরি। কিন্তু পরে তো বেশিক্ষণ গায়ে থাকে না, আপনার নাতি তো খুলে নেন! এখন এটা কি আমার দোষ?”
এ শুনে ইকরা ঠোঁট টিপে হেসে ওঠে। বিবিজান মেজাজ দেখিয়ে বলেন, “বেইজ্জতের মতো কথা বলিস না! মনে রাখিস, যত শাড়ী পরবি তত জামাইকে আঁচলের নিচে রাখতে পারবি। চা নিয়ে উপরে যা, পরে কথা বলবি।”
এটা বলে বিবিজান চলে যান। বিবিজান যেতেই নাজহা আর ইকরা হেসে ওঠে। নাজহা মন থেকে হাসেনি, ইকরা যাতে মনে করে বিবিজানের কথাগুলো সে মজা হিসেবে নিয়েছে, তাই হেসেছে। এই বিবিজানের প্রতিটি কথাই তো তার বিষ বিষ লাগে, অসহ্য একজন মহিলা! ইকরা নাজহাকে বলে, “আরে চিল, এগুলোতে কিছু মনে করো না। নানি এমনি, উনি একটু বেশি রোমান্টিক আরকি।”
নাজহা উত্তরে একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলে, “আরে না, আমি কী মনে করব! আমিও উনার সাথে মজা করি। উনি তো আমাদের ভালোই চান, আমরা সবাই যেন সুখী হই।”
এরূপ টুকটাক আলাপ করে নাজহা তৌসিরের জন্য চা নিয়ে আসে ঘরে। এসে দেখে তৌসির ওয়াশরুম থেকে মুখ ধুয়ে এসে আবারো ঘুমিয়ে গিয়েছে। নাজহা চায়ের কাপটা খাটপাশের টেবিলের উপর রেখে তৌসিরের মাথার পাশে বসে তৌসিরকে ডাক দেয়, “উঠুন তৌসির, আর কত ঘুমাবেন?”
তৌসির নাজহার এক ডাকেই চোখ খোলে। নাজহার দিকে তাকায়, বুকের ভেতর ধড়ফড় ধড়ফড় করছে নাজহা তার সাথে সুন্দর করে কথা বলছে, যাক, রাগ করছে না। তৌসিরের কী যে শান্তি লাগে এ দেখে, তা বলে বোঝানোর মতো নয়! প্রাণ ফিরে পায় নিজের মধ্যে। নাজহা যখন তৌসিরের সাথে খারাপ আচরণ করে বা কথা বলা বন্ধ করে দেয়, তখন কতখানি যন্ত্রণায় দগ্ধ হয় তৌসির, তা তৌসিরের নিজেরও অজানা। তৌসির মুখে একটা শান্তির হাসি ফুটিয়ে উঠে বসে আর বলে, “হুমউম, কাপটা দাও!”
নাজহা তৌসিরের হাতে কাপটা তুলে দেয় আর বলে, “নিন, চা খেয়ে ভেজা কাপড়গুলো কষ্ট করে ছাদে মেলে দিয়ে যেদিকে যাওয়ার যাইয়েন। আমার অশান্তি করছে ভেতরে, শীত শীত লাগছে। মনে হচ্ছে আবারো জ্বর উঠবে।”
এ শুনে তৌসির চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে অন্যহাতে নাজহার গাল-গলা ছুঁয়ে বলে, “জ্বর উঠবো কী, জ্বর রয়েছে গায়ে৷ শুনো, নিচে যাইয়ো না, ঠান্ডা লাগাইয়ো না। ঠান্ডা ছুঁইবা তো আরো উঠবে।”
নাজহা তৌসিরের কথায় তার দিকে তাকিয়ে থাকে চুপচাপ কিছুক্ষণ, তারপর বলে, “আচ্ছা, দেখি কী হয়।”
এ কথা বলে নাজহা শুতে যায়। তখনি তৌসির চায়ের কাপটা নাজহার উপর দিয়েই হাত বাড়িয়ে খাটপাশের টেবিলের উপর রাখতে রাখতে বলে, “তোমারে একটা কথা জিগাইতাম।”
নাজহা শরীরটা বাঁকা করেছিল বালিশে মাথা রাখবে বলে, কিন্তু তা আর করে না। সোজা হয়ে বসে কপালে কয়েক ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করে, “কী?”
তৌসির নাজহার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “আমার উপর রাইগা আছো? আমি জানি তুমি রাগ করছো।”
নাজহা এ শুনে এমন একটা ভান ধরে যেন এইমাত্র আকাশ থেকে মাটিতে পড়ল! ও অবাক হয়ে বলে, “অদ্ভুত তো, আমি রাগ করব কেন?”
“রাইতে যে তোমার সাথে থাকি নাই, এজন্য।”
এটা শুনে নাজহার বুকের ভেতরটা মুচড়াতে থাকে। তারপরও নাজহা মুচকি হেসে বলে, “ওহ ঐটা! আরে, ঐটা নিয়ে রাগ করার কী আছে? আমি তো দেখতেছিলাম এমনিই যে আপনি কার কাছে যান। আমি তো জানি কার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ আমি, তো এসব বিষয়ে রাগ করার কী? কে আমি যে আমার জন্য এত এত টাকার ডিল নষ্ট করবেন! না, বাদ দিন। গেল কথা গিয়ে, কাপড়গুলো রোদে দিয়ে আসুন। পরে ছাদের রশি খালি পাবেন না।”
‘কে আমি যে আমার জন্য এত এত টাকার ডিল নষ্ট করবেন’ এই যে এই কথায় নাজহা বুঝিয়ে দিল সে তৌসিরের কাছে কিছুই না, তৌসির তাকে নিজের মনে করে না। এই মেয়েটি বড্ড চালাক। ইদানীং সে রাগ করে না, তবে ছোট্ট ছোট্ট কথায় একদম কলিজা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। তৌসির নাজহার হাত টেনে ধরে নাজহাকে বলে, “আমি জানি আমার ভুল হইছে, তাই বলে এমনে কথা কবি? তুই না বড় শয়তান হয়ে যাচ্ছিস, আমার লগে ছিনালা করস! আগে তো রাগ দেখাইতি, এখন তো সেটাও করস না। এমনটা করিস না নাজহা, আমার ঘরের শান্তি তুই। আমি সারাটাদিন অশান্তি আর দৌড়াদৌড়ির উপর থাকি, খালি তোর সাথে থাকলে একটু শান্তিতে থাকি। আমার শান্তিটা কাইড়া নিস না। আমি যদি গতরাইতে না যাইতাম, আট লাখ টাকার ডিল লস হইতো। আব্বার জন্য ছিল এইটা, তাই যাইতে বাধ্য হইছি। আব্বা একলা গেলে ওরা আব্বারে মাইরাও ফেলতে পারত, তাই লগে গেছি। বাকি সব কয়টা ততক্ষণে মদ খাইয়া বেহুশ আছলো, নইলে ওরাই যাইত।”
নাজহা কথাটা শুনে তৌসিরের চোখের দিকে কিছুক্ষণ হিমেল নদীর মতো স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে। তারপর বিষণ্ণতার ভারে নুয়ে পড়া কণ্ঠস্বরে বলে, “এই কথাটা কাল আমার পাশে দু-মিনিট বসে বুঝিয়ে বললে খুব বড় কোনো ক্ষতি মনে হয় হতো না। বাদ দিন, যা হবার হয়ে গিয়েছে। আমি যা বুঝার বুঝে নিয়েছি, বাদ দিন এগুলো।”
নাজহার কথাগুলো কোনোভাবেই মানতে পারছে না তৌসির। উচাটন হয়ে পড়ে সে। ব্যাকুল কণ্ঠে সত্যটা প্রতিষ্ঠিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করে বলে, “না, আমি বাদ দিমু না। আমি জানি তোর অভিমান সম্পর্কে, আমি জানি। তালুকদারের মাইয়া তুই, ফারদিনের রে… তোর হাতে মারা ঐ ইংলেশের মারা যাওয়া, তোকে বিবিজান মারা, খাওয়া, আমার করা খারাপ আচরণ এইসবের জন্য তুই আমারে মাফ করসনি আমি জানি। তুই যে অভিমানে সব চাপা দিয়ে গিয়েছিস আমি জানি। আমি তোর পায়ে পড়লেও তুই মাফ করবি না জানি। কিন্তু কালকের জন্য এমন বলিস না কৈতরী। তুই আমার কাছে রত্নের মতো, বিশ্বাস কর। আমার একান্ত নিজের কিছু যদি থাইকা থাকে এই দুনিয়ায়, সেইটা তুই। তুই এভাবে বলিস না যে তুই আমার কে! তুই আমার সবকিছুর উপরে যা আছে তা তুই। ভুল হলেও আমার, শুদ্ধ হলেও আমার, তুই মানেই আমার।”
নাজহা কথাগুলো শুনে স্থির হয়ে বসে থাকে। তারপর একটু এগিয়ে এসে তৌসিরের গলা জড়িয়ে ধরে আর বলে, “আমি জানি এই যে এগুলো বললেন, তার একটিও সত্যি নয়। হ্যাঁ, আপনি ঠিক ধরেছেন, আমি আপনাকে ওসবের জন্য ক্ষমা কখনোই করব না। আমি এখন চাই আমাদের সাধারণ একটা সংসার হোক, এতটুকুই আমার চাওয়া। আর কোনো চাওয়া নেই। আমি জানি আপনার জীবনে আমি অপশনাল একটা মানুষ।”
তৌসির নাজহাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে, “সাওয়ার সাওয়ার কথা কস ক্যান? আমি তো তোরে বুঝাইতে পারমু না তুই কী আমার লাইগা! কইয়া বুঝানির সাধ্য তো নাই, থাকলে এতক্ষণে বুঝাইয়া দিতাম।”
নাজহা তৌসিরের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, “আপনি এমনি সবসময় বড় বড় ভুল করে আমার কাছে এভাবে বিনয় করে নিলেন, আর আমি বোকার মতো সবসময়ই মেনে নিলাম! আমি না বড্ড বোকা, অবুঝ একটা মানুষ। আমি একটু উষ্ণতায় গলে পড়ি আর সেটারই সুযোগ নেন আপনি, তাই না?”
তৌসির বিপাকে পড়ে যায়। আজ আর মাফ হবে না এত সহজে। তৌসির জানে সে এভাবে করেই নাজহার কাছ থেকে পার পেয়ে যাচ্ছে। তৌসির দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে নাজহাকে বলে, “এইবারের জন্য মাফ করে দেওয়া যায় না? এই, আমারে একটুখানি ছাড় দিও, এভাবে ছোটখাটো বিষয়ে মাফ করিও।”
এটা শুনে নাজহা তৌসিরের কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে বালিশে মাথা রাখতে রাখতে বলে, “যান তো এখান থেকে! আমার ভালো লাগছে না এসব নিয়ে আর কথা বাড়াতে।”
তৌসির নাজহার উপর ঝুঁকে এসে নাজহার চোখে চোখ রেখে বলে, “তোর সমস্যা কী? সাওয়ার সাওয়ার করিস না। ঐটা মন থাইকা মুইছা নে, ঐ কথার জের ধইরা থাকিস না।”
তৌসিরের কথা শুনে নাজহা তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলে, “ছেড়ে দিয়েছি, এখন উপর থেকে সরুন। আমি একটু ঘুমাই, শরীর নুয়ে যাচ্ছে।”
তৌসির নাজহার কথায় তোয়াক্কা না করে নাজহার ঠোঁটের কিনারায় চুমু খায়। নাজহা তৌসিরের কাঁধে ধাক্কা দিয়ে বলে, “সরুন, ভালো লাগে না এসব।”
তৌসির নাজহার কথার এবারো কোনো তোয়াক্কা না করে নিজের শক্ত হাত দুটো নাজহার কোমল আঙুলগুলোর ভেতর দিয়ে মিশিয়ে দিয়ে নাজহার দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরে বিছানায়। নাজহার আঙুলের ফাঁকে তৌসিরের আঙুলগুলো এক নিবিড় শিকলের মতো আটকে যায়। নাজহা তৌসিরের মতিগতি দেখে ছটফটিয়ে ওঠে, “না, না, না! এমন করবেন না তৌসির।”
তৌসির নাজহাকে এমন চিল্লাতে দেখে ধমকে ওঠে, “ছিনালা কমাইয়া কর। হইয়া গেছে সব আমাগো মধ্যে, এখন এগুলা নরমাল।”
নাজহা তৌসিরের চোখের দিকে জমাট বাঁধা ব্যথার নীরব দৃষ্টিতে তাকিয়ে ম্লান আকাশের মতো ম্রিয়মাণ কণ্ঠে বলে, “আপনার শরীরের ভারটা আমি নিতে পারি না তৌসির। বিশ্বাস করুন, আমার অনেক কষ্ট হয়েছে। আপনার শক্তির সাথে আমি পেরে উঠতে পারি না। আপনার এই শক্ত পেশিবহুল দেহ আমাকে গিলে নেয়। আমি পারব না, ছেড়ে দিন।”
তৌসির নাজহার কথাগুলো শুনে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নাজহার অনিন্দ্য সৌন্দর্যে ঘেরা চেহারার দিকে, আর বলে, “এভাবে কেন বলসো? এগুলো তো স্বাভাবিক। আমি তো ইচ্ছে কইরা তোমায় কষ্ট দেই না। আচ্ছা, আমি সরে যাচ্ছি।”
এটা বলে তৌসির উঠে যেতে নেয়। মন চাচ্ছে না, একদমই চাচ্ছে না সরতে, কিন্তু কিছুই করার নেই। নাজহার এত সমস্যা যখন, তখন আর কী করার! নাজহা এটা দেখে তড়িঘড়ি করে তৌসিরের গলা জড়িয়ে ধরে আমতা-আমতা করে বলে, “না না, এমন করবেন না! আমি শুধু বলছিলাম। রাগ করছেন কেন? আমার সমস্যা নেই, আপনি যা ইচ্ছে করুন। আমি এমনিই… এমনিতেই বলছিলাম।”
তৌসির নাজহার এমন ঢং দেখে মনে মনে বলে, “কত রঙের ঢং করবি লো আমার ঢংগি ছিনাল!”
তৌসির নাজহার থেকে দূরে সরে যেতে যেতে বলে, “না থাক, আমি সামলে নিলাম।”
নাজহা তৌসিরের কলার চেপে ধরে চিল্লিয়ে ওঠে, “বললাম না আমার কাছে আসতে! তাহলে এত নাটক কেন করছেন? যদি এখন চলে যান, তাহলে আর জীবনেও আমার শরীরের লোম পর্যন্ত ছুঁতে দিব না।”
নাজহার এমন ধমকে তৌসিরও ধমকে ওঠে, “আসছি! কিন্তু এরপর যদি কান্নাকাটি করস, তাইলে মাইরা তক্তা বানাইয়া রাইখা দিমু, মনে রাখিস।”
এতটুকু বলে তৌসির নাজহার গলায় মুখ গুঁজে দেয়। মুখ গুঁজেই এলোপাতাড়ি চুমু আঁকতে শুরু করে নাজহার গলায়। নাজহা তৌসিরের মাথাটা নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে চোখ বুঁজে জোরে শ্বাস ছাড়ে। কষ্ট হবে, হোক! যখন তৌসির তার কাছে আসে, খুব যন্ত্রণা হয় নাজহার। হয়তো তাদের বয়সের তারতম্য বজায় না থাকায় এমন হয়। তারপরও নাজহা তৌসিরকে কাছে টানল। সে চায় না তৌসির তার উপর অসন্তুষ্ট থাকুক এই বিষয় নিয়ে, তাই সব দগ্ধতা সহ্য করে নিচ্ছে। তৌসিরকে নিজের কন্ট্রোলে রাখতে হলে এটাই মোক্ষম উপায়।
ধোঁয়া ওঠা কফির মগে আলতো চুমুক দিতে দিতে সারা ঘরে আনমনে পায়চারি করছে ইকরা। বিয়ের পর থেকে এই বাড়িতে ধ্রুবর সাথে তার দেখা মেলা রীতিমতো ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে রাত দশটায় অফিস থেকে ফেরে, আর সকাল ন’টা বাজতেই আবার বেরিয়ে যায়। এর মাঝে ইকরার সাথে একটাবার ভালোভাবে কথা বলারও প্রয়োজন বোধ করে না সে। আজ বেশ সকালেই ঘুম ভেঙে গেছে ইকরার। তাই ঘটনাক্রমে ধ্রুবর দেখা পেয়ে যায় সে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে ধ্রুব। মনের ভেতরের দ্বিধা আর সংকোচ ঝেড়ে ফেলে ইকরা তাকে জিজ্ঞেস করে বসে, “আচ্ছা ধ্রুব ভাই, তোমার কি আমাদের এই সম্পর্কটা এবার ঠিক করা উচিত না?”
কথাগুলো শুনেই আয়না থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ইকরার দিকে তাকায় ধ্রুব পালে বিরক্তির ভাঁজ ফেলে, ভুরু কুঁচকে বলে ওঠে, “কিসের সম্পর্ক?”
ওর এমন অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে ইকরা থতমত খেয়ে যায়। ঠিক কী উত্তর দেবে বুঝতে না পেরে কিছুটা অসহায় গলায় বলে, “আমাদের সম্পর্ক… তুমি কি আমাকে মেনে নেবে না? আমাকে তোমার বউ হিসেবে একটু মেনে নাও না! তুমি বউ হিসেবে মেনে নিলে, আমি সত্যি সব দিক থেকে ভালো হয়ে যাব।”
ইকরার আকুতি শুনে ধ্রুবর ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক তাচ্ছিল্যের হাসি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ আর শীতল গলায় ও বলে, “তোকে কোনদিক দিয়ে আমার যোগ্য মনে হয়? তোর চেহারা, মুখের ভাষা, আচরণ, চলাফেরা সবই তো থার্ডক্লাশ! তোকে বউ হিসেবে মেনে নেওয়া আমার পক্ষে কোনোভাবেই পসিবল নয়।”
কথাগুলো চাবুকের মতো আছড়ে পড়ে ইকরার গায়ে। সে স্তব্ধ হয়ে যায়। স্থির, পলকহীন চোখে শুধু ধ্রুবর দিকে তাকিয়ে থাকে। বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যায়, আর কেন জানি নিজের কাছেই নিজেকে ভীষণ বেহায়া আর ছোট মনে হতে থাকে তার। এক বুক অপমান নিয়ে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে নীরবে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ইকরা। ধ্রুব কি করে কথাগুলো তাকে বলতে পারল?
স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩৮
আজ ধ্রুবর ওই নিষ্ঠুর কথাগুলো শুনে ইকরা জীবনের এক রূঢ় বাস্তবতা উপলব্ধি করে। সে বুঝতে পারে, মেয়েদের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি বা চাকচিক্য হয়তো অনেক পুরুষই মন থেকে পছন্দ করে না। সুন্দরী, মডার্ন আর স্মার্ট মেয়েদের সাথে হয়তো সুন্দর প্রেম হয়, সবার আলাদা একটা মনোযোগ বা অ্যাটেনশন পাওয়া যায়, কিন্তু সংসার হয় না।
সংসার হলো একটা বিশাল বড় ময়দান। ফোর-কে রেজ্যুলেশনের দুনিয়া কোনো কাজে আসে না। এই ময়দানে টিকে থাকতে কাজে আসে সাংসারিক জ্ঞান, অসীম ধৈর্যশক্তি, হাড়ভাঙা পরিশ্রম আর বাস্তববাদী মানসিকতা। তাই এই চরম জটিল জগতে দিনশেষে সাধারণ মেয়েগুলোই আসলে অসাধারণ। ইকরা হয়তো কখনোই একটা সুন্দর সংসার করতে পারবে না।

plz taratari dew
Opekhay achi 😩😩😩
Ami jei golpo pori oitai ken running hoy 😭😭 plz apu taratari den next part ta ken je ekdin e shob part porte gelam 😭😭