Home হাওয়াই মিঠাই হাওয়াই মিঠাই পর্ব ১

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ১

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ১
তামান্না ইসলাম শিমলা

গার্লস কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে আছে চৌহাট ইউনিয়নের মেম্বার ইউসুফ সরকারের বড় ছেলে তেহরাব সরকার। বাইকে হেলান দিয়ে একের পর এক সিগারেট শেষ করে যাচ্ছে ,সাথে আছে তার চ্যালা প্যালারা। নিজের ঘাড় পর্যন্ত লম্বা চুলগুলোকে বারবার পিছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। চোখ মুখ কুঁচকে কলেজ গেটের দিকে তাকাচ্ছে বারবার।
বিরক্তি নিয়ে হাতে থাকা সিগারেটটি মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষে ফেলল তেহরাব। বিরক্তি বেড়েই চলেছে তার। ওদিকে রৌদ্রের তাপ যেন বেড়েই চলেছে, গরমে অস্থিরতার সাথে সাথে রাগটাও বাড়ছে তেহরাবের। শুভ্র মুখশ্রীতে ততক্ষণে রক্তিম আভা ফুটে উঠেছে সূর্যের তাপে!
শার্টের উপরের তিনটি বোতাম খুলে কলারটা হালকা ঝাকালো। তার আশেপাশে আরো দুটি বাইক। যেখানে মোট তিনজন বসে আছে, তেহরাবের খাস চ্যালা যার নাম রিয়াদ। তেহরাবের সামনে এসে বিরক্ত নিয়ে চ শব্দ উচ্চারণ করে রিয়াদ বলল,

“ভাই আর কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হইব?”
নিজের হাতে থাকা ঘড়ির দিকে নজর ফেলল,কলেজ ছুটি দিতে আর চার থেকে পাঁচ মিনিট।
রিয়াদের দিকে তাকাতেই সূর্যের আলো চোখে এসে পড়লো তেহরাবের, সাথে সাথে চোখ মুখ কুঁচকে নিল সে। বিরক্ত নিয়ে বলল,
“চুপ করে বস, আমার মাথা খাইস না। পাঁচ মিনিট পরেই কলেজ ছুটি দেবে।”
তেহরাবের কথায় মাথা নাড়িয়ে রিয়াদ নিজের বাইকে গিয়ে বসলো। পকেট থেকে একটি সেন্টার ফ্রুট বের করে মুখে দিল তেহরাব, এর মাঝেই কলেজ ছুটি দিয়ে দিয়েছে। আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসছে গার্লস কলেজের সকল মেয়েরা, এত এত নারী মুখশ্রীর মাঝে তেহরাব খুঁজে বেড়াচ্ছে তার একান্ত নারীকে, তার এলোকেশীকে। অবশেষে দেখা পেল তার এলোকেশীর ,মাথায় ঘোমটা টেনে ভীত মুখশ্রী নিয়ে গেট দিয়ে বের হচ্ছে সে। ভীত চেহারায় বারংবার মায়াবী ঠেকে তার এলোকেশীকে!

নিজের একান্ত এলোকেশীকে নজরে পড়তেই খুশিতে অধর খানি প্রশস্ত হল তেহরাবের। তবে তার এলোকেশীর বোধ হয় ভালো লাগলো না তাকে এখানে দেখে। ভীত সন্ত্রস্ত নয়নে তাকিয়ে আঁকড়ে ধরল তার প্রিয় বান্ধবীর বাহু, পা বাড়ালো দ্রুত বাড়ির পথে। ব্যাপারটা তেহরাবের মোটেও পছন্দ হলো না, তার এলোকেশী তাকে উপেক্ষা করছে। বরাবরের মত এবারও তার মনে ঝড় তুলে দেওয়ার জন্য এটুকু উপেক্ষায় যথেষ্ট। সাথে মস্তিষ্কের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো কয়েকগুণ।
“ভাইজান ভাবি তো চইলা গেল।”
তেহরাব অগ্নিদৃষ্টিতে তনয়ার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে বিড়বিড় করল,
“তনয়া পালিয়ে যাবি কোথায়? তোকে তো সেই আমার কাছেই আসতে হবে, তুইযে আমার নসিবেই আছিস। তোকে জাস্ট একবার পেয়ে নেই আমি, তোর কপালে দুঃখ আছে এলোকেশী! “
মস্তিষ্কের জ্বলতে থাকা আগুন আরও বৃদ্ধি পেল যখন পেছন থেকে তেহরাবের বন্ধু ফাহিম বলে উঠলো,
“দোস্ত সামনে দেখ, ওই দেখ ওই স্যারটা।”

তেহরাবের কর্ণে ফাহিমের কথা পৌঁছানোর সাথে সাথে সে গেটের দিকে তাকায়। দেখতে পাই সাহিলকে, ফরমাল গেটাপে কলেজ গেট দিয়ে বের হচ্ছে। একে দেখেই দ্বিতীয় দফায় মেজাজ বিগড়ালো তার। অধরে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে রিয়াদ আর ওর বন্ধুদের ইশারা করলো স্যারের কাছে যাওয়ার জন্য। সঙ্গে সঙ্গে রিয়াদ,শান্ত,ফাহিম এগিয়ে গেল। রিয়াদ গিয়ে স্যার কে বলল,
“স্যার তেহরাব ভাই আপনারে ডাকছে।”
ছেলেটি মাথা ঘুরিয়ে বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তেহরাবের দিকে তাকালো। একে সে চেনে! মেম্বারের বড় ছেলে,এর আগে পাশের কলেজের এক ছেলেকে সেই পিটান পিটিয়েছিল তাও সকলের সামনে। সেই ছেলেটি তো মার খেয়ে এখনো হাসপাতালে!

কিন্তু এই ছেলে তাকে কেন ডাকছে? প্রশ্ন ও কৌতুহল নিজের মাঝে চেপে ওদের সাথে এগিয়ে এলো তেহরাবের কাছে। সাহিল তেহরাবেব সামনে এসে দাঁড়াতে তেহরাব সোজা হয়ে দাঁড়ায়, সেন্টার ফ্রুট চিবুতে চিবুতে সাহিলের আগাগোড়া পর্যবেক্ষণ করে। অতঃপর সাহিলের কলার ঠিক করে দিতে দিতে বলে,
“তা মাস্টারমশাই বিয়ে করার খুব তারা বুঝি।”
তেহরাবের কথার মানে সাহিল বুঝলো না, ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“মানে? ঠিক বুঝলাম না!”
তেহরাব ওর সাঙ্গপাঙ্গদের দিকে তাকিয়ে শব্দ করে হাসলো, মুহূর্তেই হাসি থামিয়ে গম্ভীর দৃষ্টিতে সাহিলের দিকে তাকালো,

“আমার এলোকেশীকে বিয়ে করার খুব শখ তাই না আপনার? আচ্ছা, আপনি কী চান বলুন তো? বিয়ের আগে আপনার বউকে আমি বিধবা করে দেই? আপনার বাচ্চাকাচ্চাকে এতিম করে দেই?”
এতক্ষণে তেহরাবের বলা কথাগুলো বোধগম্য হলো সাহিলের,গতকাল তার মা-বাবা তাকে নিয়ে মেয়ে দেখতে গিয়েছিল। আর দুর্ভাগ্যবশত গিয়ে দেখে সে তার ছাত্রীকেই দেখতে এসেছে তাও পাত্রি হিসেবে। তার কথায় কি তবে তেহরাব বলছে?
সাহিল নিজের কলার থেকে তেহরাবের হাতটা নামিয়ে বলল,
“বিয়ে করার তারা তো লেগেছে বটে, কিন্তু তুমি এত উত্তেজিত হচ্ছ কেন?”
তেহরাবের চোখ অস্বাভাবিক রকম রক্তিম বর্ণ ধারণ করছে, বাম হাত দিয়ে নিজের ঘাড় ঘষতে ঘষতে বলে,
“বিয়ে করবেন ভালো কথা! আমার এলোকেশীর দিকে নজর দেন কেন? দুনিয়াতে মেয়ের অভাব পড়েছে মিয়া? আর কোনোদিন যদি দেখেছি আপনাকে আমার এলোকেশীর বা তার বাড়ির আশে পাশে,আই প্রমিস পরের দিন আপনার বাপ মা আপনার লাশ খুঁজে পাবে আমাদের বালিয়া ব্রিজের নিচে।”

সাহিল এমনিতেও তনয়াকে বিয়ে করতো না, সে তো তার বাবা-মার চাপে শুধু দেখতে গিয়েছিল। কারণ সে অন্য কাউকে ভালোবাসে, প্রায় চার বছরের সম্পর্ক তাদের। তার মধ্যে এই তেহরাবের সাথে ঝামেলায় জড়াতে চায় না সে, এই ছেলেকে দিয়ে কোন ভরসা নেই তার। ঝগড়ুটে, বখাটে, উশৃঙ্খল ছেলে,যে সারাদিন নিজের সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। পড়ালেখা কাজকর্ম করে কিনা কে জানে,বয়স তো চব্বিশ – পঁচিশের ঘরে। তবে একে গ্রামে টুটু করা ছাড়া আর কোনো কাজে দেখা যায় না। ওহো দেখা যায়! যেখানেই ঝামেলা সেখানেই তেহরাব সরকার। একেতো দেশ খেলো হাসিনা সরকার, আর এই গ্রামের নিরবতা খাচ্ছে তেহরাব সরকার। এই সরকার মানেই ঝামেলা!
“ চিন্তা করো না, আমি এমনিতেও তনয়াকে বিয়ে করব না!”
তেহরাব তার সাঙ্গ পাঙ্গদের চলে আসতে বলে ইশারার মাধ্যমে। অতঃপর সাহিলের কাঁধে হাত রেখে বলে,
“ তাই মঙ্গল, আপনার জন্যেও আর আমার জন্যেও৷ যান যান বাড়ি যান!”
সাহিল বিরক্তি নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রস্থান করে। বাইকে হেলান দিয়ে আবার পকেট থেকে সিগারেট বের করে তেহরাব। সিগারেট ঠোঁটে চেপে রিয়াদকে বলে,

“ তোর কলেজ নেই?”
রিয়াদ মাথা চুলকে বলে,
“ কালকে থেকে যামু, ভাল্লাগে না পড়ালেখা।”
তেহরাব গম্ভীর মুখে সিগারেটে টান দিচ্ছে, পেছন থেকে শান্ত রিয়াদকে বলে,
“তুই পিচ্চি মানুষ হয়ে আমাদের টিমে থেকে করিস কী বলতো? লাভ কী তোর?”
রিযাদ ভাব নিয়ে বলে,
“এই দুনিয়ায় স্বার্থ ছাড়া কেউ কিছু করে শান্ত ভাই?”
রিয়াদের কথা শুনে শান্ত ও, ফাহিম চোখ মুখ কুঁচকে রিয়াদের দিকে তাকাল, ফাহিম প্রশ্ন করল,
“তোর আবার স্বার্থ কী?”
রিয়াদ বাঁকা হেসে বলে,
“ আমার স্বার্থ হলো ভাবির ছোট বোন, আর ভাইয়ের একমাত্র শালিকা!”
রিয়াদের কথা শুনে ফাহিম আর শান্ত টাস্কি খেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, হঠাৎ বাইক স্টার্ট দেওয়ার শব্দ কানে আসতেই সবাই তেহরাবের দিকে তাকায়। তেহরাব কাউকে কিছু না বলে গম্ভীর মুখ নিয়ে চলে যায় বাইক নিয়ে, রিয়াদ তম্বা খেয়ে পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলে,
“ আরে ভাই আমাকে নিয়ে যাও!”

তারাহুড়ো করে বাড়ি এসেছে তনয়া, এই মেম্বারের ছেলের ভয়ে অতিষ্ঠ সে। তনয়ার মা তানিয়া উঠান ঝাড়ু দিচ্ছে। টিনের বাড়ি, চারপাশে আম,কাঁঠাল ও নিম গাছ।টিনের গেট খুলে তনয়া বাড়িতে আসতেই তানিয়া ঝাড়ু দিতে দিতে বলল,
“ গোসল করে খেয়ে নে যাহ!”
তনয়া কিছু না বলে দ্রুত নিজের ঘরে চলে আসলো। ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামিয়ে বিছানায় বসল। বড় বড় করে কয়েকবার শ্বাস নিল সে, কিছুই ভালো লাগছে না তার। এই মেম্বারের ছেলেটা পথে ঘাটে এসে তার রাস্তা আটকায়, সে কি বুঝে না গ্রামের লোক এসব দেখলে তার নিন্দা করবে। মাথা থেকে ওড়না ফেলে নীলরঙের থ্রি-পিস নিয়ে বাইরে আসলো তনয়া।
তাদের গোসলখানাটা বাইরে, তার উপর চাপ কল। কলপারে আসতেই দেখে এক বালতি পানি ভরে রাখা, নিশ্চয় তার মা ভরে রেখেছে। স্মিত হাসল তনয়া, দ্রুত গোসল শেষ করল।
ভেজা কাপড় গুলো উঠানে বাঁধা তারে মেলে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। এখন একটু শান্তি লাগছে।
“ এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ভাত খেয়ে নে!”
তানিয়ার হাতে এক বোল কাঁচা আম, গতরাতে ঝড় হয়েছে বিধায় এই ছোট ছোট আমগুলো পড়ে গেছে। চিলেকোঠার রুম থেকে রান্নাঘরে নিয়ে যাচ্ছে সেগুল। হয়তো আচার বানাবে।
“ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে না থেকে খেয়ে আয়, আমগুলো ছিলে দে। আমসত্ত্ব বানাব!”
তনয়া মাথা নাড়িয়ে খাবার রুমে চলে আসে। টেবিলে ভাত বেড়ে রাখা, সাথে রুই মাছ ভাজা আর ডাল।
দ্রুত খাওয়া দাওয়া শেষ করে চলে আসল রান্নাঘরে। তানিয়া আম ছিলছে। তনয়া বসল পাশে।
“ আমার কাছে দাও!”
তানিয়া দেয় না, উল্টো মুখ গম্ভীর করে নিজের মতো কাজ করতে লাগে। তনয়া ভ্রু কুঁচকাল, হঠাৎ তার মায়ের হলো কী?

“ আম্মু কী হয়েছে? কিছু নিয়ে রেগে আছো?”
তানিয়ার হাত থেমে যায়। কিছুক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে তনয়ার দিকে তাকায়। থমথমে গলায় বলে,
“ মলি কালকে রাতে কোন এক ছেলের সাথে পালিয়ে গেছে, মান সম্মান শেষ একদম!”
মায়ের মুখে এমন কথা শুনে আহাম্মকের ন্যায় তাকিয়ে থাকে তনয়া। মলি তার ছোট খালার মেয়ে, সবে নাইনে উঠেছে, এর মাঝেই এসব? অবশ্য মনে মনে কিছুটা খুশিও হলো তনয়া, কারন তার ছোট খালা প্রতিবার তাদের বাড়িতে আসলেই একটি কথা বলে তার মায়ের কান ভাঙাতো, “ মাইয়া বড় হয়ছে আপা, বিয়া দাও। এহনকার মাইয়াগো ভরসা আছে?কহন কার লগে কেচ্ছা কইরা ভাইগা যায়!”
এখনতো তার মেয়েই ভেগে গেছে, আনমনে ফট করে হেঁসে ফেলে তনয়া। তার খেয়ালই নেই তার সামনে যে তার মা বসা। তানিয়া আঁড়চোখে তনয়ার দিকে তাকাল। তনয়া হাসি থামিয়ে মাথা নিচু করে ফেলল,
“আর যাইহোক, তুই যেন আমাদের মান সম্মান ডুবাস না!”
তানিয়ার ঠেস মারা কথায় মন খারাপ হলো তনয়ার, সে ওই রকম মেয়ে না! দুচোখ মুহূর্তেই অশ্রুতে টইটম্বুর হয়ে উঠল, ঠিক সেই সময় শফিকের ডাক পরল তনয়ার। বাবার কন্ঠস্বর শুনে আড়ালে চোখের পানি মুছে উঠে দাঁড়াল সে। শব্দ করে বলল,

“ আসছি!”
মায়ের দিকে একবার তাকিয়ে মুখ ভেঙিয়ে রান্নাঘর থেকে প্রস্থান করল। দৌড় লাগাল বসার ঘরের দিকে। মোট চারটি রুম, একটিতে মেহমান আসলে বসতে ও থাকতে দেওয়া হয়। দুটি বেডরুম আর একটি চিলেকোঠা,যেখানে খাবার রাখা হয়। বসার ঘরের দরজার সামনে আসতেই পা জোড়া থেমে যায় তনয়ার। সোফাতে পেছন ঘুরে বসে থাকা লোকটার মুখ না দেখলেও ঠিক চিনতে পেরে গেছে সে। শুকনো ঢোক গিলল তনয়া, এই তেহরাব এখানে কী করছে?
তনয়া খেয়াল করল তার বাবা ও তেহরাব গুরুতর কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে, কিন্তু তেহরাবের সাথে তার বাবার কীসের দরকার? নানা রকম প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তনয়ার। এর মাঝে শফিক বলে উঠল,
“ ওখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? নাস্তা পানি নিয়ে আয়!”
শফিকের দৃষ্টি অনুসরণ করে তেহরাব পেছনে তাকায়। গম্ভীর গলায় বলে,
“ কিছু লাগবে না, শুধু এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে আয়!”
তনয়া দ্রুত মাথা নাড়িয়ে চলে গেল। নিজের নখ কামড়াতে কামড়াতে খাবার রুমে চলে আসলো। জগে পানি নেই, এখন আবার কল চাপতে হবে। ঠোঁট উল্টে বিরক্তি নিয়ে কলপাড়ে আসে তনয়া। এসে দেখে তেহরাব দাঁড়িয়ে আছে। তনয়ার দিকে গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে,

“ কল চাপ, আমি হাতমুখ ধুবো!”
তনয়া বাধ্য মেয়ের মতো জগ পাশে রেখে কল চাপতে লাগল। তেহরাব বেশ লম্বা হওয়ায় তাকে ঝুঁকে হাত মুখ ধুতে হচ্ছে, তার উপর শার্টের উপরের বোতাম গুলো খোলা যার কারনে তেহরাব যতবার নিচু হচ্ছে ততবার তনয়ার নজর পরছে তেহরাবে লোমশহীন ফর্সা বুকের দিকে। পুরুষালী শক্ত গড়নের দেহে শার্টটা চিপকে আছে, তনয়া না চাইতেও তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছে তেহরাবের দৃশ্যমান বুকে।
তেহরাবের নজরে পড়ল বিষয়টা। ভ্রু কুঁচকে সোজা হয়ে দাঁড়াল সে।
“ আমার মতো সুদর্শন জামাই পেলে স্বয়ং মিস ইউনিভার্স পর্যন্ত রাতদিন তাকিয়ে থাকবে৷ আর তুইতো সেখানে গ্রামের পীড়ে কামেল, ঝটিকা!”
তেহরাবের কথা শুনে তনয়া হতবম্বের ন্যায় তার দিকে তাকিয়ে রইল। হ্যাঁ এটা ঠিক তেহরাব দেখতে বেশ সুদর্শন। এই গ্রামের ছোট ছোট নিব্বি থেকে শুরু করে সবাই একে পছন্দ করে। তার উপর গুন্ডা বদমাশদের উপর মেয়েদের নাকি দুর্বলতা বেশি থাকে।
কিন্তু সেও কম কীসে? রোজ কত কত ছেলে তাকে প্রপোজ করে, নেহাতই সে পাত্তা দেয় না। আর তেহরাব কিনা তাকে অপমান করল, তাও আবার “ পীড়ে কামেল, ঝটিকা” বলে!
হাত দিয়ে মুখে লেগে থাকা পানি গুলো ঝেড়ে ফেলে তনয়ার দিকে তাকাল তেহরাব, তনয়ার ওড়নার কোণা দিয়ে মুখ মুছে বলে,

“এখন থেকেই স্বামী সেবা করার অভ্যাস কর। বিয়ের পর সারাদিন তোকে দিয়ে কাজ করাব। পা টেপানো থেকে শুরু করে রান্নাবান্না, ঘর মোছা কোনোটাই বাদ রাখব না!”
তেহরাবের এমন কান্ডে তনয়া হকচকিয়ে যায়। তাকাতে লাগে এদিক ওদিক। ভাগ্যিস কেউ নেয়। তাহলে কী হতো? মনে মনে বিড়বিড় করল,
“ আপনার বউ হতে আমার বয়েই গেছে, দুনিয়াতে ছেলের অভাব নাকি?”
তনয়া কিঞ্চিৎ রাগ নিয়ে মুখে কিছু বলতেই যাবে তার আগেই তেহরাব তাকে আটকে দিয়ে বলে,
“ একদম কথা বলবি না। আজকে তুই আমাকে দেখে ফরফর করে চলে এসছিস। মাথা মেজাজ এমনিতেই চটে আছে। এখন তুই ভুল ভাল কিছু বললে এখানে এক আছাড় মারব!”
তনয়া চুপ হয়ে যায়। জগটা হাতে নিয়ে পানি ভরতে থাকে। তেহরাব পেছনে দাঁড়িয়ে তনয়াকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“ আজকে তোকে একদম নীল পরীর মতো লাগছে এলোকেশী।”

তেহরাবের হাস্কি স্বরে বলা কথাটি শুনে তনয়া জমে যায়।কিছুতো আছে ওই নামে যে নামে ডাকলে তার অন্য রকম শিহরণ কাজ করে। এলোকেশী!
কী আছে এই নামে? গা শীতল করা শব্দ, না চাইতেও বারবার অন্য রকম অনুভূতি ডানা মেলতে চায় যখন তেহরাবের কন্ঠে এই নামটি শোনে তনয়া।
কিন্তু না সে এটা করতে পারেনা। সে তার মা বাবার বিরুদ্ধে যাবে না। এমন কোনো কাজ করবে না যার জন্য তার বাবা কষ্ট পাক বা সম্মান নষ্ট হোক।
তনয়া জগ হাতে নিয়ে তেহরাবকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। তেহরাব সেদিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে,
“কেন বুঝিস না আমাকে এলোকেশী? তোর জন্য এতটা পথ পারি দিয়ে আসলাম, পড়ে রইলাম এই টুটু বন্দরে। আর তুই কিনা আমাকে অবজ্ঞা করিস!”

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ২