হাওয়াই মিঠাই পর্ব ১১
তামান্না ইসলাম শিমলা
দুপরের রুদ্রতাপ গা জ্বালা ধরার মতো, তার উপর গোটা রাস্তা হেটেই বাড়ি ফিরতে হয়েছে তনয়াকে। উঠোন পেরিয়ে বারান্দার কাছে আসতেই নজরে পরে বেশ কয়েক জোরা অপরিচিত জুতো। তবে কি কেউ এসেছে? কে এসেছে?
প্রশ্ন জাগল তনয়ার মনে, এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে এগিয়ে গেল বসার ঘরের দিকে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করল ভেতরে থাকা মানুষগুলোকে, এ মানুষ গুলো তার চেনা হয়েও অচেনা।
এ মুহূর্তে তাদের এখানে দেখে অবাক হয়েছে তনয়া, ওদিকে তনয়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তানিয়া ডাক দেয় তাকে।
“ভেতরে আয়!”
তনয়া কিছু না বলে ভেতরে আসে, সালাম দেয় সকলকে। সোফায় বসে থাকা রফিক ও তার স্ত্রী পায়েল তনয়ার দিকে তাকাল, সালামের জবাব দিল।
“যা ফ্রেশ হয়ে আস!”
সালমার কথায় মাথা নেড়ে তনয়া বেরিয়ে গেল, এসব নিয়ে তার মাথা ব্যথা নেই।
মূলত রফিক ও পায়েল এ বাড়ি এসেছে সব সম্পর্ক ঠিক করতে, আর টাকা গুলোও নিয়ে এসেছে।
তনয়া নিজের ঘরে আসতেই দেখতে পায় তার বিছানায় বসে আছে শিহাব, তনয়াকে দেখে সেও দাঁড়িয়ে পরে। তনয়া সৌজন্যমূলক হাসে,
“বসুন ভাইয়া, আমি ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসছি।”
তনয়া ব্যাগ রেখে আলমারি থেকে কাপড় বের করে বেরিয়ে যেতে নেয়, তবে পারে না। তার হাতে টান পরে, ভ্রুজোড়া কুঁচকে যায়। তাকায় পিছন ফিরে, একি শিহাব তার হাত ধরেছে কেন? হাত থেকে দৃষ্টি সড়িয়ে তাকাল শিহাবের মুখের দিকে, শিহাবের চেহারায় কেমন অসহায়ত্বের ছাপ। কিন্তু কেন?
দুজনেই বেশ খানিক সময় নিশ্চুপ রইল, অতঃপর শিহাবের হাতের বাঁধন আলগা হতেই হাত ছাড়িয়ে নিল তনয়া।প্রশ্ন করল,
“কিছু বলবেন?”
শিহাব নিশ্চুপ, তার আখিঁ পল্লব তনয়ার দিকে বন্দি। তনয়ার অস্বস্তি লাগছে, সে আবারও চলে যেতে নিল,
“তনয়া!”
থামল তনয়া, পেছন ফিরে আবার তাকাল।
“জি? বলুন।”
তনয়ার কন্ঠস্বর স্বাভাবিক, তবে এবারও কিছু বলল না শিহাব। তনয়া বুঝল না শিহাবের নীরবতার কারন,হঠাৎ নীরবতা ভেঙে শিহাবের ধরে আসা কন্ঠে বলে উঠল,
“ তনয়া, তুমি কাউকে ভালোবাসো?”
তনয়া চমকায়, চোখ দৃটি গোলাকার হয়। জবাব কি দেবে? এ প্রশ্নের উত্তর সে নিজেও জানে না, আর শিহাব ভাই কেন এসব জিজ্ঞেস করছে?
“কি হলো? ভালোবাসো কাউকে?”
“কি বলছেন এসব? হঠাৎ এমন কথা কেন জিজ্ঞেস করছেন?”
শিহাব মৃদু হাসল, এ হাসিতে স্পষ্ট বিষাদ।
“বল না তনয়া, ভালোবাসো কাউকে?”
তনয়া এদিক ওকিদ চোখ ফিরিয়ে বলে,
“আমি আসছি!”
দাঁড়ায় না সে, দ্রুত প্রস্থান করে। শিহাব চেয়ে রয়, তবে কি তার ধারনাই ঠিক? তার ভালোবাসার মানুষেরও ভালোবাসার মানুষ আছে? ইশ তীক্ষ্ণ ব্যথা অনুভব হলো শিহাবের বুকের মাঝে, না না তনয়া কাউকে ভালোবাসে না। নিজেকে নিজে শান্তনা দিল, আদেও কোনো লাভ হলো? শান্ত করতে পারল নিজেকে?
“আজ থেকে না তোমার মিলে যাওয়ার কথা? সারাদিন কোথায় ছিলে?”
সবে বাড়ি ফিরেছে তেহরাব, এসেই মায়ের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হলো তাকে। থামল সে, এগিয়ে গেল তাসলিমার কাছে। জড়িয়ে ধরল শক্ত করে, তাসলিমা রাগে ফুস করে উঠল,
“তোমার স্বামীর ফরমাইস খাটলাম, এখন খেতে দাও।”
“সর যাহ তো, এত রঙ ডং ভালো লাগে না! সারাদিন খাওয়া নাওয়ার খবর থাকে না, এখন এসে আহ্লাদ দেখাচ্ছে।”
তেহরাব গা ছেড়ে বসে পরল সোফায়, শরীর এলিয়ে চোখ বন্ধ করে নিল।
“একবার বিয়েটা করিয়ে দাও, তখন বউকে নিয়ে আহ্লাদ করব।”
তাসলিমা রেগে যায়, তার ছেলেটা এমন কেন? সোফা থেকে কুশন ছুড়ে মারে তেহরাবের দিকে,
“কাম নেই যাম নেই, বিয়ে বিয়ে লাগিয়েছে। বিয়ে করে খাওয়াবি কি বউকে?”
তেহরাব চোখ খুলে তাকায় তার মায়ের দিকে, দুষ্টু হেসে বলে,
“আমি আছি না? আমাকে খাবে!”
ক্ষেপে যায় তাসলিমা, রেগে ফুলদানি হাতে নিতেই তেহরাব চট করে উঠে দাঁড়ায়৷
“আরে আরে মা আমার, ওটা রাখো। বিয়ের আগেই আমার বউকে বিধবা বানাতে চাইছ নাকি?”
বলেই দৌড়ে উপরে চলে যায় তেহরাব, তাসলিমা ফোস করে শ্বাস ফেলল। এই ছেলেটা এত বাচ্চামো করে, ইশ। মেয়েটা তো হোস্টেলে পড়াশোনা করছে, যেখানে যাওয়ার কথা ছিল তেহরাবের। অথচ দু বাপ ছেলে মিলে কি কলা পরামর্শ করে থেকে গেল এখানে, কে জানে।
ঘরে এসে বিছানায় বসে পরল তেহরাব,আজ বড্ড বেশি গরম পরেছে। পা উঠিয়ে ক্ষত জায়গাটা দেখে নিল, নাহ ঠিকি আছে এখনো। হঠাৎ কিছু একটা মনে পরতেই ওয়ারড্রবের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, কিছু কাগজ পত্র বের করে দেখতে শুরু করে। পকেট থেকে ফোন বের করে কল করে কাউকে, ওপাশ থেকে কিছু বলতেই সে নিজে বলো উঠে,
“ উহু, কাউকে বলার দরকার নেই।কালকে হয় আমরা নাহয় সোহলের দল, শালারা অনেক করেছে। চাঁদাবাজী বন্ধ না করলে কালকে ওদের একদিন কি আমাদের যতদিন!”
অতঃপর কল কেটে দেয় তেহরাব, মাথা ধরেছে তার। কাগজ পত্র গুলো গুছিয়ে একটি ফাইলে রেখে গোসলে চলে গেল সে, দীর্ঘ সাওয়ার শেষে মাথা মুছতে মুছতে ঘরে আসে তেহরাব। টি-টেবিলে খাবার রাখা আর সামনে তার মা খাবার বারছে, তেহরাব মুচকি হেসে বস পরে মায়ের পাশে।
তাসলিমা মুখ গোমড়া করেই তেহরাবের মুখে ভাত তুলে দেয়, তেহরাব মুখে নেয়! আজ তার মা একটু বেশিই চটে আছে, বিষয়টা কি?
“কি হয়েছে ইউসুফ সরকারের বউ? আমার ছেলেকি তোমাকে বকেছে বউমা?”
তাসলিমা দাঁত কটমট করে তাকায়, তেহরাব নিজের হাসি চেপে বলে,
“আমার ছেলেটাও না একদম বাচ্চা স্বভাবের, কিছু মনে কর না বউমা। স্বামী স্ত্রীর মাঝে একটু আকটু ঝামেলা লেগেই থাকে!”
কিছুটা গম্ভীর ভাব নিয়েই বলে তেহরাব, তাসলিমা তেহরাবের বাহুতে চাপড় মারে। তেহরাব পিছিয়ে যায়,
“ইশ, এভাবে কেউ মারে? বড় হয়েছি না আমি? কদিন পর বউ আনব, বাচ্চা কাচ্চা হবে এখনও যদি তোমার হাতে মার খেতে হয় তাহলে কীভাবে চলবে?”
তাসলিমা বিরক্ত, এই ছেলে কি একটু সিরিয়াস হতে পারে না? কথায় কথায় বউ বউ, অথচ বিয়ের খবর নেই।
“সারাদিন কীসের বউ বউ করিস? প্রেম করছিস নাকি?”
“উহু!”
“তাহলে?”
“বিয়ে!”
তাসলিমা চমকায়,
“কিহ? না জানিয়ে বিয়ে করে নিয়েছিস? এটা কি করে করতে পারলি তুই তেহরাব? “
তেহরাব নিজেও হতভম্ব, তার মা তার কথাটা সিরিয়াসলি নিয়েছে। ভাবতেই হুহু করে হেসে উঠে তেহরাব,
“আরে মজা করছিলাম, তেহরাব সরকার লুকিয়ে চুরিয়ে কিছু করে না। আর বিয়ে তো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় এচিভমেন্ট, এটা লুকিযে করব ভাবলে কি করে?”
তাসলিমা খপ করে শ্বাস ছাড়ে, এ ছেলেকে দিয়ে ভরসা নেই।
“এবার কাজের দিকে মনোযোগ দে, আমি মেযে দেখছি।”
তেহরাব হাসে,
“বিকেলে মিলেই যাব, রশিদ গুলো বের করেছি। আর রইল বিয়ে, মেয়ে দেখা। সেটা তোমাকে কষ্ট করে করতে হবে না, তোমার ছেলে তোমার জন্য বউমা ঠিক করে রেখেছে!”
তাসলিমা ভ্রু কুঁচকায়,
“কিহ? সত্যি করে বলত ঘটনা কি? কাউকে পছন্দ? “
তেহরাব হা করে, তাসলিমা খাবার মুখে পুরে দেয়। কিছু সময় পর বলে,
“উহু, পছন্দ করি না, ভালোবাসি। একটু বেশিই ভালোবাসি!”
“মেয়েটা কে?”
তেহরাব পানি খেয়ে উঠে দাঁড়ায়, চেয়ার থেকে
টি শার্ট নিয়ে পরতে পরতে বলে,
“পরে বলব! বিকেলে ইরা বাড়ি আসবে,এখন আসছি।”
বলেই রশিদের কাগজ গুলো নিয়ে ছুট্টে চলে গেল তেহরাব, তাসলিমাকে ফেলে রেখে গেল ভাবনায়।দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে নিজের হাত ধুয়ে প্লেট নিয়ে নিজেও নিচে চলে আসল, প্লেট ধুতে ধুতে ডুব দিল এক ভাবনায়।
আজকাল ছেলেটাকে নিয়ে তার ভীষণ চিন্তা হয়, সারাদিন দেখা পায় না। বাড়ি আসার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই, বাপ ছেলে মিলে কিসব আলাপ আলোচনা করে বেরায়। এই ঝামেলা, মারামারি, রাজনীতি জিনিসটা এখন তার কাছে আর ভালো লাগে না। আর যায়হোক ছেলেটাকে রাজনীতিতে ঢুকতে দেবে না সে!
“ এই মেয়ে আমি আমার ঘরে তুলব না, কোনোদিনও না!”
শাশুড়ির এহেম কথায় ভ্রু কুঁচকায় ইরা, ভাবলেশ ভাবে বলে,
“আপনার বাড়িতে উঠতে যাব কোন দুঃখে? আমি আমার স্বামীর বাড়ি উঠব!”
বলেই গটগট করে ভেতরে চলে আসে ইরা, পেছন পেছন শৃকনো ঢোক গিলে সাহিলও প্রবেশ করে। এদিকে সাহিলের মা রেগে বুম, সে পারছে না তো বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিতে। ইরা ড্রয়িং রুমে এসে তার শশুড়ের পা ধরে সালাম করে, মিষ্টি হেসে বলে,
“ হেই ড্যাড, ভালো আছেন? চিনতে পেরেছেন আমাকে? আমি কিন্তু চিনতে পেরেছি!”
ইরা হাসি হাসি মুখ করে কথাটা বলে, মালেক ভালো ভাবে ইরাকে পর্যবেক্ষণ করে। চেনা চেনা লাগছে বটে, হ্যাঁ সে চিনতে পেরেছে। হাসি ফুটে উঠল তার অধরে,
“তুমি মেম্বর সাহেবের মেয়ে না?”
ইরা মাথা নাড়ায়, ওদিকে সাহিলের মা রুমা তেরে আসে ইরার দিকে। বড়বড় চোখ করে তাকায় ইরার দিকে, মুহুর্তেই অজানা কারনে মুখশ্রী উজ্জ্বল হয়।
“তুমি মেম্বারের মেয়ে?”
ইরা মনে মনে বাঁকা হাসে, তার মিম ডার্লিং যে একটু লোভী মানুষ সেটা সে জানে। তবে বাইরে কঠিনতা বজায় রেখে বলে,
“হ্যাঁ!”
উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায়, ইরা সহ সাহিলও বুঝতে পারে বিষয়টা। আর মালেক? সে কি তার সহধর্মিণীকে চেনে না? খুব ভালো করেই চেনে!
“আগে বলবে না মা, এভাবে কেউ বিয়ে করে? আমাদের বলতে পারতে, আমরা সব ব্যবস্থা করতাম।”
হাসি হাসি মুখ করে কথাটি বলে রুমা, ইরা আড়ালে হাসে। অতঃপর তার দিকে গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
“এখন বলছি! আমার বাড়িতে সম্মন্ধ পাঠাবেন, রাজি করানোর দায়িত্ব আমার। তবে খবরদার আমার মা বাবা যদি জেনেছে আমি আর আপনার ভীতু ছেলে আগেই বিয়ে করেছি তাহলে আপনার খবর আছে।”
ইরা চোখ সড়িয়ে তাকায় মালেকের দিকে, মুচকি হেসে বলে,
“আমি স্ব সম্মানে এ বাড়ির বউ হতে চাই। আপনাদের গুনধর ছেলে বোধহয় এই জন্মে নিজের ভালোবাসার কথা আপনাদের বলতে পারত না, তাই এই কাজটা করতে বাধ্য হলাম। ক্ষমা করবেন!”
মালেক দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কিছুটা মনঃক্ষুণ্ন হয়েছিল বয় কি তবে৷ এখন তা করে গিয়েছে। মালেক ইরার মাথায হাত রাখল,
“জন্ম মৃত্যু বিয়ে সব আল্লাহর হাতে, তোমরা ভালো থাকলেই আমাদের খুশি!”
ইরা হাসল, আর সাহিল? সে তো এক কোণে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছে, সবটা এত সহজে মিটে যাবে কল্পনার বাইরে ছিল তার।
ইরা শেষ বারের মতো রুমার দিকে তাকাল, মুচকি হেসে বলল,
হাওয়াই মিঠাই পর্ব ১০
“সো মমি ডার্লিং, দেখা হচ্ছে খুব শীঘ্রই!”
বলেই বেড়িয়ে যায় ইরা, সাথে সাহিলও বোকা বোকা হেসে বেড়িয়ে আসে।
ওদিকে রুমার উচ্ছ্বাস দেখে কে? সে তো ভাবছে ইরার কথা, মেম্বরের মেয়ে বলে কথা৷ মেয়েকে তো ভালোই গয়না গাটি দেবে, সাথে জায়গা জমি। ভাবতেই মনটা নেচে উঠছে তার!.
