Home হাওয়াই মিঠাই হাওয়াই মিঠাই পর্ব ১২

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ১২

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ১২
তামান্না ইসলাম শিমলা

গোসল করে ঘরে আসে তনয়া, তার চাচা চাচিরা এখনো যায়নি। অবাক করা বিষয়!
নিজের ঘরে আসতেই দেখতে পেল তানহা কাপড়চোপড় বের করছে, কিন্তু এই দুপুর বেলা তানহা এখানে কি করছে?
নিজের মাথায় থাকা গামছা দরজায় মেলে দিতে দিতে তানহাকে প্রশ্ন করল,
“স্কুল পালিয়ে এসছিস?”
“উহু, আজকে একটা গন্ডগোল হয়েছে স্কুলে তাই ছুটি দিয়ে দিয়েছে।”
তানহা কাপড় বের করতে করতেই কথাটা বলল, তনয়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল তানহার দিকে। ওদের স্কুলে আবার কি হলো?
“কীসের গন্ডগোল?”
তানহা তনয়ার সামনে এসে দাঁড়াল, ভাব নিয়ে বলল,
“সে অনেক কাহিনী!”
“কি কাহিনী বল শুনি?”
তানহা বিছানায় বসল, তনয়াও চেয়ারে বসল মুখোমুখি।

“ সেদিন বলেছিলাম না মানবিক শাখার একটা মেয়ে প্রেমিক নিয়ে পালিয়েছে? রিতু করে নাম, ওই মেয়ে আজ স্কুলে এসেছিল৷ কামারপাড়ার ফজলু স্যারের ছেলে পারভেজকে চেনো? ওই ছেলের সাথেই পালিয়েছিল, কিন্তু ছেলেটা নাকি ওকে বিয়ে না করেই রাত কাটিয়েছে। মানিকগঞ্জেই ফেলে রেখেই চলে এসেছিল, রিতু গতকাল কোনোরকম বাড়ি ফিরে, বাসাই মাইরও খেয়েছে। কিন্তু মানসম্মানের বিষয়, তাই স্কুলে এসেছিল ফজলু স্যারের সাথে কথা বলতে। স্যার তাদের অপমান করে বের করে দিতে চাইলে রিতুর আব্বু আম্মু ঝামেলা করে লোকজন এনে। হেড স্যারও খেপে গেছে, আর কি! এখন ওসব নিয়েই গন্ডগোল হচ্ছে, আমাদের ছুটি!”
মনোযোগ সহকারে প্রত্যেকটি কথা ভালোমতো শুনল তনয়া, মানুষ কতটা খারাপ হতে পারে। ভালোবাসার নাম করে.. ছি ছি!

“সব চেয়ে ইন্টারেস্টিং বিষয় কি জানিস?”
তানহা ভ্রু নাড়িয়ে মৃদু হেসে প্রশ্ন করে, তনয়া শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
“কি?”
তানহা গর্ব করে বলে,
“এই ঘটনার জন্যই তো সেদিন তেহরাব ভাই পারভেজকে মেরেছিল, বেশ করেছে। সাধে কি তাকে এত্ত ভালোলাগে?”
তনয়া আরো বেশি আশ্চর্য হয়, সেদিন এই কারনে তেহরাব ভাই ওখানে মারামারি করেছিল? আর সে কিনা উল্টো তাকেই খারাপ ভাবল, নিজের ভাবনার প্রতি নিজেরই রাগ হলো। চোখ তুলে তাকাল তানহার দিকে,
“তুই জানলি কি করে এসব?”
তানহা ভাব নিয়ে বলে উঠে,
“আমি জানব না তো কে জানবে হুহ? কোথায়, কেন, কি হয় সব কিছুর খবর এই তানহা রাখে বুঝলি মেরি বেহেনা! আর সেটা যদি হয় তেহরাব ভাই তাহলে তো আরো বেশি!”
শেষ কথাটা ফিসফিস করেই বলে তানহা, অগত্যা কানে যায় না তনয়ার।
তানহা নাচতে নাচতে জামাকাপড় নিয়ে বেড়িয়ে যায় ঘর থেকে, তনয়া কিংকর্তব্যবিমুঢ়ের ন্যায় বসে থাকে।
কারো পায়ের শব্দে ধ্যান ভাঙে তনয়ার, পেছন ফিরে দরজার দিকে তাকাতেই নিজের মাকে দেখতে পায়। হাসি ফুটে উঠে অধরে, তানিয়ার হাতে খাবারের প্লেট, খাবারটা রাখল টেবিলের উপর।

“খাবারটা খেয়েনে, ওষুধ গুলোও খেয়ে নিস!”
তানিয়া দ্রুত যেতে নিলে তনয়া জিজ্ঞেস করে,
“চাচারা এসেছে কেন?”
তানিয়া থামে, তার মুখটা কেমন গম্ভীর।গম্ভীর গলায়ই জবাব দিল,
“সেসব তোর জানতে হবে না, খেয়ে ওষুধ খেয়ে নিস।”
আর দাঁড়ায় না সে, চলে যায় গটগট করে। তনয়া দ্রুত খাবার শেষ করে ড্রয়ার থেকে ওষুধ বের করে, প্রতিদিন নিয়ম করে এত্ত এত্ত ওষুধ খেতে হয় তাকে, এগুলো খেয়েই তো পেট ভরে যায়।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওষুধ গুলো কোনো রকম গিলে নিল, বসে রইল চেয়ারে। ব্যাগ থেকে নিজের প্রিয় ডাইরিটা বের করল তনয়া, এটা তানহা তার জন্মদিনে গিফ্ট করেছিল। ডাইরিটা খুলে ভেতরে থাকা শুকনো গোলাপটা হাতে নিল, এই গোলাপটার বয়স কত হতে? তাও আড়াই বছর, অজান্তেই হাসে তনয়া। গোলাপটা দিয়েছিল তেহরাব, কোনো কথা নেই বার্তা নেই, হুট করে কোথা থেকে উড়ে এসে হাতে ফুলটা ধরিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছিল। দিনটা ছিল তাদের দশম শ্রেনীর বিদায় অনুষ্ঠান,স্কুলের সভাপতি হওয়ায় তেহরাবের বাবা প্রধান অতিথি ছিলেন। সেদিন তেহরাবও এসেছিল, তবে বাবার সাথে অনুষ্ঠান দেখতে নয়, একটা ছেলেকে মারতে।

ফুলটা সেদিন না চাইতেও বাড়ি অব্দি নিয়ে এসেছিল, ফুলযে তার ভিষণ প্রিয়! মুচকি হেসে ফুলটা আগের যায়গাই রেখে দিল, ডাইরিটা ব্যগে রেখে উঠে দাঁড়াল। এখানে ভালো লাগছে না, পুকুর পারে গিয়ে বসবে, এই ভেবেই বের হয় তনয়া। বাড়ির পাশেই পুকুর, তার চারদিকে আম গাছ ছায় হয়ে আছে। আর পুকুরের সামনে দিয়ে সরু রাস্তা, যেখান দিয়ে সচারাচর বাইক আর মানুষ হাঁটাচলার জন্য ব্যবহার করে৷ তাও খুব কম!
পুকুর পারে এসে দেখে সেখানে আগে থেকেই বসে আছে শিহাব, তনয়া একবার ভাবল থাক যাবে না। আবারও ভাবল সমস্যা কি গেলে? তাই চলে আসল, সিড়ির দু’পাশে বসার জায়গা, এক পাশে শিহাব বসে আছে। অপর পাশে গিয়ে তনয়া বসে, শিহাব চমকায় তনয়াকে এখানে দেখে।

“এখানে একা একা কি করছেন?”
তনয়া হাসি মুখে প্রশ্ন করে, শিহাবের এতটা সময় দ্বিধাগ্রস্থ মুখশ্রী উজ্জ্বল হয়। স্মিত হেসে বলে,
“একা কোথায়? তুমি আছো তো।”
তনয়া হাসির বেগ বারে, মুগ্ধ হয় শিহাব।
“আমি তো সবে মাত্র আসলাম, এতটা সময় তো একাই ছিলেন!”
“তোমার আসা যাওয়া তো লেগেই থাকে, তোমাকে তো সারাটাদিনই আমি আমার পাশাপাশি কাছাকাছি অনুভব করি। বড্ড বাজে ভাবে ফেসে গেছি আমি!”
শিহাবের বিড়বিড়ানো কথা শুনতে পেল না তনয়া, উল্টো জিজ্ঞেস করলেন,
“কিছু বললেন?”
শিহাব মৃদু হেসে মাথা নাড়ে, তনয়াও কিছু বলে না। এখানে প্রচুর বাতাস, আপাতত তনয়ার ভেজা চুল গুলো সেই বাতাসেই উড়ছে, দুলছে, স্পর্শ করছে। সেই পানেই দৃষ্টি শিহাবের, তা খেয়াল করেনি তনয়া। এই বোকা পাখির প্রতিযে কেউ কতটা দুর্বল সে খেয়াল কি সে রাখে?
“তনয়া!”
“হুম?”
তনয়া সেভাবেই বসে থেকে সাড়া দেয়, শিহাব আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
“সামনের সপ্তাহে চেকাপ আছে, রবিবার সোমবার তরি পরবে। আমি ফোন করলে বালিয়া চলে এসো!”

এবার তনয়া তাকায় শিহাবের দিকে,ঠোঁটে লেগে থাকা মৃদু হাসি মিলিয়ে গেছে। চোখ নামিয়ে বলে,
“আচ্ছা!”
আবারো দুজনে চুপ, দুজনের দৃষ্টি সামনে। যেখানে দূর দূরান্তে শুধু সবুজের ছড়াছড়ি, ধানক্ষেত!
“একটা কথা বলব?”
তনয়া আবারও শিহাবের দিকে তাকায়, লোকটার কথা বলার ধরন খু্ব সুন্দর।
“হুম বলুন।”
শিহাব কিছু সময় তাকিয়ে রইল তনয়ার চোখের দিকে, তারপর বলে,
“গতকাল রাত তোমাকে বাইরে থেকে ঢুকতে দেখলাম, এত রাতে কোথায় গিয়েছিলে?”
অন্তর আত্মা কেঁপে উঠে তনয়ার, এই ভয়টাই পাচ্ছিল। তারমানে শিহাব কি সবটা দেখে ফেলেছে? ছিহ!
তনয়া শুকনো ঢোক গিলে এদিক ওদিক তাকাতে থাকে, এখন কি বলবে সে? তেহরাবের কথা শোনাটাই ভুল ছিল, এখন তো কান্না পাচ্ছে তার।
“কি হলো?”

তনয়া চমকে উঠে, নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করে বলে,
“না মানে, আসলে রাতে ওয়াশরুমে যাব বলে রুম থেকে বের হয়েছিলাম। হঠাৎ নজর পরল গেটের দিকে, গেটটা খোলা ছিল। ওইটাই বন্ধ করতে গিয়েছিলাম, পরে দেখি বাইরে থেকে কেমন শব্দ আসছিল তাই বাইরে গিয়েছিলাম।”
তনয়া শিহাবের দিকে তাকাল, দেখে তো মনে হচ্ছে হয়ত বিশ্বাস করছে। শিহাব কিছুটা কপাল কুঁচকে বলে,
“,ওহ, কাল গিয়েছ গিয়েছ আর যাবে না। রাত করে একা একা বাইরে যাও, এত সাহস পাও কোথায়? রাতে এমনিতেও গ্রামের কিছু ছেলেরা নেশা করে ঘুরে বেড়ায়! আর যাবে না!”
তনয়া বোকা বোকা হাসল, মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানার। যাক বাবা এই যাত্রায় বেঁচে গিয়েছে!
“চলো এখন বাড়ি যায়।”
শিহাবের কথা শুনে তনয়া উঠে দাঁড়ায়, সকালের পরে যাওয়াও মাজার ব্যথাটা আবারও চিলিক দিয়ে উঠল। পরে যেতে নিলে শিহাব দ্রুত তনয়ার বাহু ধরে দাঁড় করার, ব্যস্ত কন্ঠে সুধাল,
“আরেহ আস্তে, কি হয়েছে?”
তনয়া সোজা হয়ে দাঁড়ায়, শিহাব ছেড়ে দেয় তাকে,।
“তেমন কিছু না, আপনি যান আমি আসছি।”

শিহাবও আর কথা বাড়ায় না, এগিয়ে যায় সামনের দিকে। পেছন পেছন তনয়াও পা বাড়ায়। অথচ গোটা বিষয়টা দূর থেকে যে কেউ একজন লক্ষ করেছে সেটা কেউ খেয়ালও করে নি। খেয়াল করেনি ব্যক্তির অগ্নিচক্ষু, যা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে পারে সবকিছু।
পুকুরের সামনে দিয়ে যাওয়া রাস্তাটাতেই বাইকে বসে এতক্ষণ যাবৎ তনয়া আর শিহাবকে দেখছিল তেহরাব।। আর এটাও দেখেছে তার এলোকেশীকে অন্য কেউ স্পর্শ করছে, এতেই নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে সে।
চোখ বন্ধ করে বাম হাত দিয়ে নিজের ঘাড় ঘষতে লাগল, এই মুহূর্তে তাকে শান্ত হতে হবে। সে একটা কাজে যাচ্ছে, প্রথম কাজ। কিন্তু না নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, বড় বড় করে শ্বাস ফেলছে, যেন এই নিশ্বাসেই পুড়িয়ে মারবে তনয়াকে।
চোখ খুলে তেহরাব, দাঁতে দাঁত খিঁচে বলে,
“সব হিসাব তোলা রইল তনয়া, তোকে আমি আমার ভালোবাসার দহনে পুড়িয়ে মারব৷ ছারখার করে দেব সব, একবার হাতে পায় তোকে তোর নিস্তার নেই। অনেক জ্বালিয়েছিস আমাকে, অনেক!”
অতঃপর নিজের বিগড়ে যাওয়া মস্তিষ্ককে কোনোরকম আয়ত্তে এনে বাইক স্টার্ট দিল সে। আজ থেকে সে কাজের প্রতি মনোযোগী হবে, শুরুর দিনটাতে কোনো ঝামেলা করে বসুক এটা সে চায় না। তনয়ার হিসাবটা নাহয় পরে তুলে নেবে।

চালের মিলের সামনে এসে বাইক থামে তেহরাবের, বাইক এক কোণায় রেখে চলে আসে হারুন বেপারীর কাছে। মূলত সবটা উনিই দেখাশোনা করেন সারাদিন, শুধু টাকা হিসাব ও শ্রমিকের পারিশ্রমিকের কাজটা ইউসুফের কাছে ছিল। তিনি ব্যস্ত মানুষ, বাসাই বসে যতটুকু করা যেত করত, এতে অবশ্য অনেক চুরিও হতো। যেমন যেখানে এক গাড়িতে পঞ্চাশ বস্তা চাল নিত সেখানে বলত পয়তাল্লিশটা, তাই দিন শেষে হিসাবে বড়সড় গড়বড় দেখা যেত৷
কিন্তু এখন থেকে সবটা তেহরাবই তদারকি করবে, কখন কয় বস্তা ধান আসছে, কয় বস্তা চাল যাচ্ছে, শ্রমিকদের পারিশ্রমিক সব নিজে করবে।
তেহরাব হারুনের কাছে এসে দাঁড়াল,

“চাচা আজ কত গাড়ি ধান এসেছে?”
হারুন নিজের পান খাওয়া লাল টকটকে দাঁত বের করে হাসে,
“ আরে বাজান, আপনে নিহি। বড় সাহেব কইছিল তয় আফনে আইবেন।”
তেহরাব গম্ভীর কন্ঠে আবারও বলে,
“এখন থেকে রোজ আসব, এখন বলুন সকালে কয় বস্তা ধান এসেছিল?”
হারুন পানের পিচকি ফেলে বলল,
“আজকে ছয় গাড়ি আইছিল, হয়ব আড়াইশো খানেক! কম বেশি হয়তে পারে।”
তেহরাব মাথা নাড়ল, চলে আসল গোডাউনে, প্রতি রবিবারে ধান আসে, সপ্তাহ খানিক ভরে প্রসেসিং চলে তারপর তা পাঠানো হয় কম্পানিতে। তারা সেগুলো প্যাকেটজাত করে বাজারে সাপ্লাই করে।
আজ নতুন করে ধান এসেছে, এগুলোর প্রসেসিং শেষ হলে আবারও নতুন করে আনা হবে ধান।
গোডাউন থেকে বস্তায় করে চাল গুলো ট্রাকে উঠানো হচ্ছে, আপাতত সব কিছুই পর্যায়ক্রমে পর্যবেক্ষণ করছে তেহরাব।
তাকে ব্যসাত থাকতে হবে, নাহলে এই তনয়ার কথা মনে পরলে তার মাথা খারাপ হয়ে যাবে।

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ১১

হিসাব নিকাশে বসে পরল তেহরাব, গত এক সপ্তাহের সব ডেটা রশিদ আকারে আছে। সেগুলো খাতায় তুলল, আজকে কত বস্তা বের হলো তাও হিসাব করল।
এমন সময় ফোন বেজে উঠল, ফোন হাতে নিয়ে দেখে তার বাবা। এই সময় বাবার ফোন, একটু অবাক হলো। রিসিভ করল তেহরাব,
“হ্যাঁ বাবা হলো।”
ওপাশ থেকে কিছু একটা শুনে হাত থেকে কলমটা পরে গেল তেহরাবের, অস্থির কন্ঠে বলে উঠল,
“আসছি আমি, এখুনি আসছি।”
কল কেটে দিল,খাতাটা টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দ্রুত বেড়িয়ে আসল মিল থেকে। বাইকে চেপে বসল, তেহরাবকে প্রচুর অস্থির লাগছে, ছেলেটা রীতিমতো ঘামছে।
অতঃপর ফুল স্পিডে বাইকে স্টার্ট দিয়ে ছুট লাগাল কোথাও, কে জানে আবার নতুন করে কি হলো?

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ১৩