দাহশয্যা পর্ব ৬৮
Raiha Zubair Ripti
ফটিকছড়ি উপজেলার ছোট্ট একটা গ্রামে বসবাস করে বাতাসি তার মা ও সৎ বাবার বাড়িতে। বাড়িতে ছনের ঘড় আর একটা টিনের ঘর, আর আছে একটা গোয়াল ঘর। ছনের ঘড়ে থাকে বাতাসি। বড় ভাই ফাহাদ আসলে সে থাকে বারান্দার রুমে। বিদ্যুৎ নেই তাদের ঘরে। আছে হারিকেন। গরম লাগলে হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতে হয়।
আজ ঝড়বৃষ্টি হয়েছে ভোরের দিকে। এখন ফকফকা রোদ আকাশে। বাতাসি ঘুম থেকে উঠে গোয়াল ঘর থেকে গরু গুলো বের করে গোবর উঠিয়ে নিলো। মস্ত বড় উঠান টা ঝাড়ু দিলো। গাছের পাতা পড়ে নোংরা হয়ে ছিল উঠান। রান্না ঘরে গিয়ে মাটির কোলসি কোমরে করে নিয়ে টিউবওয়েলের কাছে গেল পানি আনতে। কলসি ভরে এনে রান্না ঘরে রাখতেই বাতাসি দেখতে পেল তার সৎ বাবা একটা ইলিশ মাছ এনেছে বাজার থেকে।
বাতাসির চোখ মুখ জ্বলে উঠলো খুশিতে। আজ ইলিশ খাবে তারা!
বাতাসির মা স্বামীর হাত থেকে মাছটা নিয়ে বাতাসির হাতে দিয়ে বলল-
“ ভালো মতো কেটে ধুয়ে নিয়ে আয়। আমি ভাত বসাইতাছি। ”
বাতাসি মাছ আর বটি নিয়ে পুকুর পাড়ে গেল কাটতে। সুন্দর করে কেটে ধুয়ে মায়ের কাছে দিল। কচুর ডাঁটি দিয়ে রান্না করলো তার মা ইলিশ মাছ ঝোল করে। রান্নাবান্না শেষ হতেই বাতাসির অন্য ভাই বোন দুটো উঠে পড়ে। বাতাসি তাদের হাতে ব্রাশ তুলে দিলো দাঁত মাজার জন্য। টিউবওয়েল চেপে পানি উঠিয়ে হাত মুখ ধুয়ে দিলো।
বাতাসির সৎ বাবা মতিন বাজার থেকে নিমকি এনেছিলেন। পাঞ্জাবির পকেট থেকে সেগুলো বের করে তার ছেলেমেয়েদের হাতে দিলেন। পাশে দাঁড়ানো বাতাসি তাকালো নিমকি গুলোর দিকে। বাতাসির জন্য আনা হয় নি। বাতাসি কি তার মেয়ে নাকি যে তাকে দিবে? মতিন ছেলেমেয়েদের রুমে গিয়ে খেতে বলল। বাতাসি রান্না ঘরে চলে আসলো। বাতাসির মা পাতিল থেকে গামলায় ভাত বেড়ে রুমে যেতে যেতে বলল-
“ পাতিল আর কড়াই গুলো পুকুর পাড় থেকে ধুয়ে নিয়ে আয়। কালি যেন থাকে না। ”
বাতাসি পুকুর পাড় আসলো পাতিল কড়াই নিয়ে। ছাই বালি দিয়ে ডলে ডলে মাজতে লাগলো। মাজা শেষে পাতিল কড়াই ধুয়ে উঠানে থাকা মাচায়, উপর করে রোদে শুকাতে দিলো। তারপর হাত পা ধুয়ে রুমে গেল। ক্ষুধা লেগেছে। রুমে ঢুকে দেখলো সবার প্রায় খাওয়া শেষ। বাতাসি আস্তে করে বলল-
“ মা ক্ষুধা লাগছে। ”
বাতাসির মা গতকাল রাতের পানি ভাত গুলো প্লেটে বেড়ে একটা চোকলা সমেত পেঁয়াজ আর একটা কাঁচা মরিচ দিলো।
বাতাসি পান্তা ভাতের দিকে তাকালো। সবাই খেলো গরম ভাত। আর তাকে দিলো পান্তা ভাত আর কাঁচা মরিচ পেয়াজ!
“ গরম ভাত নাই আম্মা? ”
বাতাসির মা স্বামীর এঁটো থালা ধুতেধুতে বলল-
“ আছে। দুপুরে খাইস। এহন পান্তা ভাত খা। না খাইলে ভাত গুলা পচবো। ”
“ তাইলে একটা ইলিশ মাছ দাও আম্মা। ”
বাতাসির মায়ের হাত থেমে গেল। বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল-
“ যা দিছি সেটাই খা। ইলিশ মাছ কি তোর জন্য আনছে? কত দাম জানস ইলিশ মাছের? নিজের চেহারা দেখছস জীবনে আয়নায়? কই রুপালি ইলিশ আর কই তুই। তর কপালে এত দামি মাছ জুটবো না। তরে এত দামি মাছ খাওয়াইয়া লাভ ও নাই। খাইলে পেঁয়াজ মরিচ দিয়াই খা। নইলে যা এন থে। আসছে পাতিলের কালি রুপালি ইলিশ খেতে।”
“ একটুখানি ভাইঙ্গা দাও আম্মা। একটু খাই না। কত দিন ধরে খাই না ইলিশ আমি। সামান্য দাও। আল্লাহ রে কমু আমারে যেন তোমাগো মতন সুন্দর বানায় দেয়। ”
বাতাসির মা বিরক্ত হয়ে বলল-
“ যাবি এনথে? তরে দিতে না করছে মাছ। সর ঘ্যানঘ্যান করিস না। ”
“ দিতে না করছে ক্যান আম্মা? আমি সুন্দর না বইলা? আম্মা আমিও কি তোমার চোখে অসুন্দর?”
“ হ। তুই তো অসুন্দরই। একদম কয়লার মতন কালো। তোরে দেখলেই তো ঘেন্না লাগে। আমার পেট থেকে তুই হইছস ভাবলেই থুথু বের হয়। ”
বাতাসি ভাতের থালা টা নিয়ে নিজেদের ঘরে এসে পড়লো। আম্মা উঠতে বসতে গায়ের রঙ নিয়ে কথা শোনায়। বাতাসি আয়নায় দেখলো নিজের চেহারা টা। আসলেই কালো বাতাসি। তার ফাহাদ ভাইয়া শ্যামলা। তার আব্বাও কালো ছিলো। কিন্তু বাতাসির মতন এত কালো ছিলো না। স্টিলের ছুবা দিয়ে ডলে ডলে গোসল করলে কি এই কালো রঙ ধুয়েমুছে সাফ হইবো? রোজ ছুবা দিয়ে ডলে ডলে গোসল করে বাতাসি। কই সুন্দর তো হয় না । ইশ আল্লাহ একটু রূপ দিত বাতাসি কে। তাহলে আজ একপিস ইলিশ মাছ খেতে পারতো।
বাতাসি পান্তা ভাত গুলো চটকিয়ে মাখলো। স্মরনে আসলো পেয়াজ টা ছোলা হয় নি। দাঁত দিয়ে কামড়িয়ে চোকলা ছাড়ালো। পেঁয়াজে কামড় বসিয়ে ভাত মুখে দিতেই চোখ মুখ কুঁচকে গেলো। টক হয়ে গেছে ভাত। মা ধুয়ে দেয় নি।
বাতাসি কলপাড়ে গেল। ভাত গুলো ধুয়ে ফের খেতে শুরু করলো। গলা দিয়ে নামতে চায় না ভাত। তারপরও নামাতে হচ্ছে। এই খাবার টা নে খেলে সারাদিন তো না খেয়েই থাকা লাগবে।
হলের ক্যান্টিনে ভাতের সাথে ডাল নিয়ে সকালের খাবার খেলো ফাহাদ। রোদ টা কমলেই টিউশনি খুঁজতে বের হবে। করোনায় এসে সব টিউশন গুলো বন্ধ করে দিয়েছে। এই ১৮ মাস ফাহাদ বাড়িতে সবজি বুনেছে,মাছ ধরেছে। এসব টুকিটাকি বিক্রি করেই চলেছে। কিন্তু এখন তো আর সেসব নেই। টিউশনি খুঁজতে বের হওয়ার আগে বাড়িতে ফোন দিলো। একটা বাটন ফোন কিনে দিছে বাতাসি কে ফাহাদ। সেটাতে ফোন দিতেই বাতাসি রিসিভ করলো।
এতক্ষণ যেন ভাইয়ের ফোনটার জন্যই অপেক্ষা করছিলো সে। ভাইয়ের ফোন পেতেই খুশি হয়ে গেল। ফাহাদ বলল-
“ হ্যালো রুপাই। ”
“ হ্যাঁ ভাইয়া বলো। ”
“ কি করছিস? ”
“ বারান্দায় বসে আছি। তুমি? ”
“ টিউশনি খুঁজতে বের হয়েছি। খেয়েছিস সকালে?”
বাতাসি সামনে থাকা থালার দিকে তাকালো। ফাহাদ বোনের জবাব না পেয়ে ফের জিজ্ঞেস করলো-
“ কিরে খেয়েছিস? ”
বাতাসি ছোট্ট করে জবাব দিলো-
“ হুম খেয়েছি। ”
“ কি দিয়ে? ”
“ পান্তা ভাত, মরিচ আর পেঁয়াজ দিয়ে। ”
ফাহাদ ভ্রু কুঁচকালো। সাত সকালে পান্তা ভাত খেয়েছে! তাও আবার পেঁয়াজ মরিচ দিয়ে!
“ তরকারি রাঁধে নি? ”
“ রেঁধেছে তো। ইলিশ মাছ রেঁধেছে। ”
“ তোকে দেয় নি?”
“ না। ”
“ কেন? ”
“ আম্মু বলছে আমি নাকি ইলিশ মাছের মতো দেখতে সুন্দর না। আমি কয়লার মতন কালো। সেজন্য রূপালি ইলিশ খেতে পারবো না। ভাইয়া কালো মানুষদের কি ইলিশ মাছ খাওয়া বারন? কালো মানুষ রা ইলিশ মাছ খায় না? আম্মু আমাকে এক পিসও দেয় নি জানো? বললাম একটু খানি ভেঙে দাও। তাও দিলো না। ভাইয়া বাড়ি আসার সময় একটা ইলিশ মাছ নিয়ে আসবা? খুব খেতে ইচ্ছে করে আমার। ”
ফাহাদের বুক টা ফেটে যেতে লাগলো। তার বোনের রূপ কে ইলিশ মাছের সাথে এভাবে তুলনা করলো খেতে চেয়েছে বলে! ইলিশ মাছ খেতে হলে রূপ লাগে! ফাহাদের গলা কেঁপে উঠলো। দলা পাকানে গলায় বলল-
“ খুব পছন্দ ইলিশ মাছ তোর? ভাইয়া নিয়ে আসবে আসার সময়। মন খারাপ করবি না হু? আমি নিয়ে আসবো। ওদের দেখিয়ে দেখিয়ে খাওয়াবো আমার বোন কে। ”
“ আসবা কবে ভাইয়া? ”
“ দেখি বন্ধ দিলেই আসবো। ”
“ ভাইয়া একটা কথা জিজ্ঞেস করি? ”
প্রচণ্ড মন খারাপ নিয়ে বলল বাতাসি।
“ হ্যাঁ বল। ”
“ তোমারও কি আমারে দেখলে ঘেন্না লাগে মায়ের মতন? আম্মা আজ বলল আমারে দেখলে তার ঘেন্না লাগে। ”
ফাহাদের প্রচণ্ড রাগ হলো তার মা নামক রমণী টার উপর। একজন মা এভাবে কি করে বলতে পারে নিজের মেয়েকে?
“ উনার কথা কানে নিবি না রুপাই। আমার বোন কে আমি নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। সেখানে ঘৃণা কেন করতে যাব আমার কলিজা টা কে? ”
“ এই যে আমি কালো বইলা। ”
“ ধূর পাগলি। গায়ের রং ফর্সা হলেই যে সবাই তাকে ভালোবাসে এই লজিকলেস কথা কে বলেছে তোকে হু? আমার বোন বেস্ট। সব দিক দিয়ে বেস্ট। গায়ের রং ডাজেন্ট ম্যাটার। এখন রাখি হু? পরে ফোন দিব। উনার কথায় মন খারাপ করবি না কখনও। ভাইয়া ভালোবাসে তো। পৃথিবীর আর কারো ভালোবাসা দরকার নেই আমার বোনের। ”
ফাহাদ ফোন কেটে দিলো। ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে খুঁজতে লাগলো টিউশনি।
আজকে প্রথম বার মেহরিন আর ঊর্মি কলেজে এসেছে। মোতালেব ভুঁইয়া দিয়ে গেছেন। বলেছে কলেজ ছুটি হলে এসে নিয়ে যাবে। একা একা যেন না চলে আসে। অপেক্ষা করে যেন।
নওগাঁ সরকারি কলেজের মেইন গেট দিয়ে ঢুকে তারা সাইন্স ভবনে চলে গেল। এর আগেই প্রথম দিন স্যার ম্যাম দের সাথে স্টুডেন্ট দের পরিচিত পর্ব শেষ হয়ে গেছে। আজ যারা ক্লাস নিতে আসলো তাদের চিনতে একটু অসুবিধেই হলো মেহরিন দের। তিনটার মতন ক্লাস হয়ে ছুটি হয়ে গেল। মেহরিন ফোন করে জানাল মোতালেব ভুঁইয়া কে যে কলেজ ছুটি হয়ে গেছে। মোতালেব ভুঁইয়া আসছে বলল।
মেহরিন আর ঊর্মি মাঠের এক পাশে বসে বাবার অপেক্ষা করতে লাগলো। এরমধ্যে সোলেমান ফোন করলো। মেহরিন রিসিভ করে কানে নিতেই বলল-
“ আসসালামু আলাইকুম ম্যাডাম।”
মেহরিন সালামের জবাব দিলো। সোলেমান জিজ্ঞেস করলো-
“ কোথায় তুমি? শোরগোলের আওয়াজ পাচ্ছি যে? কলেজে? ”
“ হুমম। ”
“ ক্লাস হচ্ছে না? ”
“ তিনটা হয়েছে। তারপর ছুটি দিয়ে দিলো। আপনি কি করছেন? ”
“ ক্লাবে বসে আছি। বাসায় যাচ্ছ না? ”
“ না,আব্বু আসতেছে। আসলে যাব। ”
“ শ্বশুর আব্বাকে বেশ প্যারা দিচ্ছ তুমি। এই বয়সে ব্যবসা সামলাবে নাকি তোমাকে বলো তো?”
“ আমার সুপারম্যান বাবা সব সামলাতে জানে। ”
“ লাইক আই অ্যাম। আচ্ছা সাবধানে ফিরো। শুনতেছি আবার নাকি বন্ধ দিবে স্কুল কলেজ। বন্ধ দিলে চলে আসবো। এসে আদর করবো। ”
মেহরিন লজ্জা পেলো। মেহরিনের লজ্জা মাখা মুখ দেখে ঊর্মির ইব্রাহিমের কথা মনে পড়লো। তার ব্যাডাও তাকে মাঝেমধ্যে লজ্জায় ফেলে অসভ্য অসভ্য কথা বলে। তখন মেহরিনের মতই এভাবে লজ্জা পায়। আজ সকালেও ফোন দিয়েছিল। দিয়ে বলল-
“ তোমার জামাই জান অসুস্থ, এসে সেবা করে স্ত্রী ধর্ম পালন করো ঊমু। ”
ঊর্মি ইব্রাহিমের অসুস্থতার কথা শুনেই অস্থির হয়ে গিয়েছিল। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই বান্দা জানায়-
“ প্রেমের অসুখে জর্জরিত হয়ে আছি। এসে ভিটামিন, ইনজেকশন, ভালোবাসার ডোজ একত্রে পুশ করে সুস্থ করে দাও। ”
ঊর্মি অসভ্য বলে ফোন কেটে দেয়।
মোতালেব ভুঁইয়া আসতেই মেহরিন ঊর্মি উঠে দাঁড়ায়। গেটের বাহিরে বেরিয়ে আসতেই মোতালেব ভুঁইয়া জিজ্ঞেস করে –
“ কিছু খাবা আম্মা? ”
মেহরিন শুধু বলল-
“ পানি খাব আব্বু। ”
মোতালেব একটা পানির বোতল সাথে দু প্যাকেট ঝালমুড়ি আনলো। খালি পেটে পানি খাবে নাকি তার মেয়ে ? ঝালমুড়ি খেতে ভীষণ ভালোবাসে।
মেহরিন বাবার হাতে ঝালমুড়ি দেখে বলল-
“ এটা আনলে ক্যান আব্বু? ”
“ তুমি না খাইতে ভালোবাসো? অটোতে উঠে বসো। ”
ঊর্মির হাতে আরেক প্যাকেট দিয়ে উঠে বসলেন অটোর সামনের সিটে মোতালেব ভুঁইয়া। ঊর্মির কি যে ভালো লাগে মেহরিনের প্রতি মোতালেব ভুঁইয়ার এমন অগাধ ভালোবাসা দেখে। বাবারা এমনই হয় তাই না? ঊর্মির বাবাটাও তো এমনই ছিলো।
আসলেই কি সব বাবারা এমন হয়? না হয় না। সব বাবারা এমন হলে আজ মেহরিনের মত সুখী প্রেমা,মাহি হত।
মেহরিন অটোতে উঠে মুখের সামনে থেকে নিকাব টা সরিয়ে আগে পানি খেলো। ঊর্মি উঠে বসে অটোর দরজা লাগিয়ে দিল। মেহরিন সাইডে ব্যাগ টা রেখে খেতে শুরু করলো।
মোতালেব ভুঁইয়া মেহরিন দের বাসায় নামিয়ে দিয়ে সেই অটো নিয়েই বাজারে দোকানে চলে গেল।
মাস্টার্সের ক্লাস শুরু হওয়ায় মাহিকে ভার্সিটি আসতে হয়। এজওয়ান দিয়ে যায় আবার ক্লাস শেষে নিয়ে যায়। আজ অফিসে মিটিং থাকায় এজওয়ান আসতে পারে নি নিতে। সেজন্য ফোন করে বলেছে যেন রিকশা নিয়ে বাসায় চলে যায়।
মাহি ক্লাস রুম থেকে বের হয়ে পায়ে হেঁটে ফিরতে লাগলো। কিছুটা পথ হেঁটে এসে ক্যাফেটেরিয়ার সামনে আসতেই মাহি দেখলো একটা ছেলে রাস্তার দেওয়ালে খাম্বি তে কাগজ লাগাচ্ছে আঠা দিয়ে। পড়ে দেখলো টিউশনির জন্য বিজ্ঞপ্তি। মাহি ফের হাঁটা ধরলো। টিএসসি থেকে ফুচকা খেয়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলো।
ফাহাদ দেওয়ালে টিউশনির বিজ্ঞপ্তির কাগজ লাগিয়ে একটু বাজারের দিকে গেল। ইলিশ মাছের দাম কত জানতে হবে।
ফাহাদ বাজারে এসে ইলিশ মাছ খুঁজতে লাগলো। কয়েক দোকানেই পেল ইলিশ। মাছের দাম জিজ্ঞেস করতেই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতন অবস্থা। মাঝারি সাইজের মাছ ১৪০০ টাকা কেজি! আর বড় গুলোর তো আরো দাম। ফাহাদ অবাক হয়েই বলল-
“ এত দাম কেনো মাছের মামা? এত দাম তো হওয়ার কথা না । ”
দোকান দার বলল-
“ সব মাছ ভারত পাঠানো হইছে। দাম হইবো না তো কি হইবো? ”
“ কিন্তু মামা ভারতে তো মাছ প্রতি কেজিতে ৮৫০ এ পাওয়া যাচ্ছে। আপনারা তাহলে নিজের দেশের মানুষের কাছে এত চড়া দামে কেনো বিক্রি করতেছেন? এটা তো রীতিমত ডাকাতি । ”
দোকানদার বিরক্ত হয়ে ঝাড়ি দিয়ে বলল-
“ তাইলে ভারত গিয়ে কিনো গা। এখানে আসছো কেনো ইলিশ কিনতে? ”
ফাহাদ দীর্ঘ শ্বাস ফেলে হলে আসলো। এমনিতেও পকেটে টাকা নেই ইলিশ কেনার। দেশের মানুষ না খেয়ে ম’রবে কিন্তু প্রতিবেশী দেশে ইলিশ পাঠানো বন্ধ হবে না। নিজের দেশের লোকজন কে মে’রে বাংলাদেশ দৌড়ায় ভারত কে খুশি করতে। মানছি তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় সাহায্য করেছিল। তারজন্য এভাবে নিজেদের সর্বশ টা বিলিয়ে দিতে হবে তাদের?
ফাহাদ ফেসবুকে ঢুকলো। মন টা তার ভীষণ ক্ষেপে আছে। কয়েক দিন আগেই আম পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ভারত কে। এখন ইলিশ! না জানি কবে বাংলাদেশ টাকেই উপহার দিয়ে দেয় প্রধানমন্ত্রী।
ফাহাদ নিজের আইডি তে লিখলো-
“ নিজের খেয়ে পরের মহিষ তাড়ানোই যেন বাংলাদেশের একমাত্র কাজ। বিশেষ করে ভারতের জন্য। এই যে দেশের মানুষের ইলিশের চাহিদা পূরণ না করে তারা ভারত কে প্রতি বছর ইলিশ পাঠায়। এ বছর ইলিশ পাঠিয়েছে ৪হাজার ৬০০ মেট্রিক টন। যা ভারতে প্রতি কেজি তে বিক্রি হয় ৮৫০ করে। আর বাংলাদেশ সেই সেম ইলিশ-ই বিক্রি হয় ১৪০০ টাকা থেকে। সেই ভারত ই সারা বছর পানি দেয় না। কিন্তু ইলিশ পাওয়ামাত্র ফারাক্কা খুলে দেয়। আর আমরাও মনের সুখে তখন ইলিশ দেওয়ার বিনিময়ে পেট ভরে ঘর বাড়ি ভাসিয়ে পানি খাই।
নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তরভারত কয়লা-পাথর রপ্তানি বন্ধ করে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দেই। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কারখানা বন্ধ করা লাগে সেখানে নিজের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাই।
বাংলাদেশের এই ভবিষ্যতের কথা ভেবেই হয়তো কবি কামিনী রায় লিখেছিলেন-
দাহশয্যা পর্ব ৬৭
পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মত সুখ কোথাও কি আছে
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।
