Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৬৯

দাহশয্যা পর্ব ৬৯

দাহশয্যা পর্ব ৬৯
Raiha Zubair Ripti

কয়েক দিন ক্লাস করেই আবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা দেওয়া হলো। বন্ধের ঘোষণা আসার পরের দিনই সোলেমান নওগাঁ চলে গেছে। ঢাকার নিবাসে এখন আছে শুধু এজওয়ান আর মাহি। এজওয়ান আজকাল বেশ দেরি করে বাড়ি ফিরে আর সকাল ভোরেই বেরিয়ে যায়। তখন এই ফাঁকা নিবাসে একাই থাকতে হয় মাহি কে। আজ সকালে এজওয়ান অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিলো। মাহি বারবার তার আশেপাশে দিয়ে ঘুরঘুর করছিল। সেটা এজওয়ান বুঝতে পেরে একটানে মাহির কোমর চেপে কাছে এনে গলার টাই টা তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে-

“ কিছু বলার থাকলে বলে ফেলো। ”
মাহি টাই টা বেঁধে দিয়ে বলল-
“ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে পারবেন আজ? ”
এজওয়ান ভ্রু কুঁচকালো।
“ কি জন্য? ”
“ একা একা এত বড় বাড়িতে থাকতে কেমন যেন লাগে। ”
“ ভয়? ”
মাহির সহজসরল স্বীকারোক্তি –
“ কিছুটা। ”
এজওয়ান চোখ বড়বড় করে বলল-
“ ও মাই গড। এ আমি কি শুনলাম! মিসেস মাহি সুলতান ভয় পায়! হাউ ইজ দ্যিস পসিবল! ”
মাহি ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দিলো এজওয়ান কে। এজওয়ান ফের টেনে এনে বলল-
“ আই থিংক পারবো না তাড়াতাড়ি ফিরতে। তবে তুমি চাইলে আমার সাথে অফিসে জয়েন হতে পারো। আই মিন পার্ট টাইম জবের অফার করলাম তোমায়। ভার্সিটি সেরে জয়েন হবে। ”
মাহি অবাক হয়ে বলল-

“ সুলতান বাড়ির বউ জব করবে! ”
“ ওয়াও নিজেকে তাহলে সুলতান বাড়ির বউ ভাবো! শুনে খুশি হলাম। কোথাও তো লেখা নেই যে সুলতান বাড়ির মেয়েরা জব করতে পারবে না। তবে লিমিটেশন আছে। যেখানে সেখানে জব করতে পারবে না। আমাদের স্ট্যাটাসের সাথে যাবে এমন উচ্চ স্থানে জব করতে হবে। ”
“ ওকে। তাহলে করাই যায়। ”
“ রেডি হয়ে নিচে আসো। এক সাথে ব্রেকফাস্ট করে বের হই। ”
মাহি অফ হোয়াইট প্যান্ট শার্ট কোর্ট পড়ে রেডি হয়ে নিলো। তারপর এজওয়ানের সাথে ব্রেকফাস্ট করে বের হলো।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে যাদের বাড়ি তারা ছুটি পেতেই আবার বাড়ি চলে গেছে। এখন হলে আছে দূর দূরান্ত থেকে আসা ছেলেমেয়েরা। যোহরের নামাজ পড়ে হলে আসছিল ফাহাদ, তার বন্ধু জাহিদের সাথে। পথে হঠাৎ ই দেখলো একটা ছেলেকে টেনে সূর্য সেন হলের দিকে নিয়ে যাচ্ছে ছাত্রলীগের ছেলেপেলে । ফাহাদ জাহিদ কে জিজ্ঞেস করলো-

“ ওভাবে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কেনো? ”
“ বলতে পারছি না। ”
ফাহাদ রুমে এসে শুয়ে পড়লো। তিনটার দিকে জাহিদের ডাকে ফাহাদের ঘুম ভাঙে। জাহিদ বলল-
“ তখন যেই ছেলেটাকে টেনে নিয়ে গেলো না বড় ভাইদের রুমে? ঐ ছেলেটাকে প্রচুর মে’রেছে। ”
ফাহাদ চমকালো এ কথা শুনে।
“ মে’রেছে কেনো? ”
“ মাসুদ কে নাকি বলেছিল তাদের মিছিলে অংশগ্রহণ করতে। নামাজের সময় হওয়ায় মাসুদ বলছিল সে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। সেই থেকেই ক্ষোভ জমেছিল। তার উপর ওর মাথায় সব সময় টুপি আর মুখে দাঁড়ি থাকে বড় বড়। অন্য দলের গুপ্তচর ভাবছে। এখন হল জুড়ে বলে বেড়াচ্ছে জঙ্গি,শিবির ,হলের ভেতর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল সেজন্য মে’রেছে। হল থেকে বের করে দিয়েছে। ”
“ আশ্চর্য নামাজ পড়লে,দাঁড়ি রাখলে,টুপি পড়লে তাদের দলীয় আন্দোলনে অংশগ্রহণ না করলেই সে জঙ্গি,শিবির! তাহলে তো আমাদের ও বলে বসবে আমরা জঙ্গি,শিবির। ”

“ বলতেই পারে। ”
“ ছেলেটাকে কি একেবারে বের করে দিছে? ”
“ হুমম। বোধহয় ভার্সিটি থেকেও বের করে দিবে। ”
“ কি অবস্থা! এভাবে চলতে থাকলে তো আমাদের ও মে’রে বের করে দিবে। ”
“ দিতেই পারে। আমি ভাবছি হলে থাকবো না রে। কষ্ট করে হলেও আলাদা বাসা নিব। কবে না জানি আমাদের এসে মা’রে। ”
“ আমার তো সেই পথ নেই। ইনকামও তেমন নেই যে বাসা নিব আলাদা। তবে এভাবে অন্যায় মেনে চুপ থাকলে তো ওরা আরো জেঁকে বসবে। ”
“ কে থামাবে ওদের? ওদের পাওয়ার সম্পর্কে কোনো ধারণা আছে তোর? ওরা অনেক ডেঞ্জারাস। ওদের কথার ভয়ে ডিনে রা পর্যন্ত কাপড় ভিজিয়ে ফেলে। ”
ফাহাদ ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে পানি ঝাপ্টা দিয়ে আসলো। চার টার পর বের হলো হল থেকে। আসরের নামাজ পড়ে টিউশনিতে যাবে। একটা টিউশনি মিলেছে। হল থেকে বের হয়ে হাঁটতেই ছাত্রলীগের বড় ভাইদের সাথে দেখা ফাহাদের। তারা এক ঝলক ফাহাদের দিকে তাকালো। ফাহাদ সালাম দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে ছাত্রলীগের একজন ফাহাদ কে ডাক দিলো। ফাহাদ পেছন ফিরতেই বলল-

“ কত নম্বর রুমে থাকো তুমি? ”
ফাহাদ জবাব দিলো-
“ ১০১১। ”
ছেলেটা ফাহাদের মাথা থেকে টুপিটা খুলে নিয়ে বলল-
“ কোথায় যাচ্ছ? ”
“ টিউশনি তে। ”
“ শুনেছি আমাগো সোলেমান ভাইয়ের ছোট ভাইয়ের সাথে তুমি ঝগড়া করছিলা? ”
“ বিষয় টা ঝগড়া ছিলো না ভাইয়া। জাস্ট অ্যাক্সিডেন্ট ছিলো। ”
“ ক্ষমা চাইছিলা? তোমাকে বলা হয় নি ক্ষমা চাওয়ার জন্য? ”
“ আমি তো দোষ করি নি। ক্ষমা কেনো চাইতে যাব? ”
ফাহাদ পাশ কাটিয়ে চলে গেল। ছাত্র লীগের ছেলেগুলো ফাহাদের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো। একটা ছেলে বলে উঠলো-

“ এটা খুব শীগ্রই মা-রা খেতে যাচ্ছে। কি তেজ দেখছস! শা’লা তোরে ক্ষমা চাইতে বলছে গিয়া ক্ষমা চাইবি। তা না হেডাম দেখিয়ে বলতেছে দোষ করিনি ক্ষমা কেনো চাইবো! ফয়সাল ভাইয়ের কানে গেলে তো এটারে টুকরা টুকরা কইরা কাইট্টা নদিতে ভাসায় দিব। ”
ফাহাদ টিউশনি করিয়ে হলে ফিরে আসে সন্ধ্যার পর। এর আগেও নাকি ভার্সিটি তে মেয়েদের ও হিজাব পড়ে আসায় শিবির ট্যাগ দিয়ে অপদস্ত করেছে।
ফাহাদ নিজের রুমে বসলো। ফেসবুকে ঢুকে নিজের আইডিতে তার এই বিশ্ববিদ্যালয় কে নিয়ে বিতৃষ্ণা থেকে একটা পোস্ট লিখলো-

“ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আজকাল যেন প্রকৃত শিক্ষার জায়গা না হয়ে রাজনীতির আখড়ায় পরিণত হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মুক্তভাবে জ্ঞানচর্চা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলা। কিন্তু আজকাল দেশের অনেক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে ঢাবি,রাবি,জাবি,চবি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মর্যাদাপূর্ণ জায়গাগুলোও ধীরে ধীরে রাজনৈতিক দখলদারিত্বের কারণে তাদের আসল চরিত্র হারিয়ে ফেলছে।
ক্যাম্পাসে এখন পড়াশোনার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে রাজনৈতিক আনুগত্য। কে কোন সংগঠনের সাথে যুক্ত, কে কোন দলে যাবে, কে দাড়ি রাখে, কে নামাজ পড়ে, বা কে হিজাব পড়ে এসব দিয়েই অনেক সময় একজন ছাত্র বা ছাত্রীকে বিচার করা হচ্ছে। নিয়মিত নামাজ পড়া বা হিজাব পড়াকে বিনা প্রমাণে শিবির বা জঙ্গি তকমা দেওয়া যেন এখন খুব সাধারণ ব্যাপার। ধর্মীয় অনুশীলনের মতো ব্যক্তিগত বিষয় নিয়েও সন্দেহ, তাচ্ছিল্য আর নজরদারির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। কোনো প্রমাণ ছাড়াই শুধু চেহারা বা ধর্মীয় চর্চার ভিত্তিতেই সন্দেহের চোখে দেখা হয়। যেটা একদিকে মৌলিক অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করছে, অন্যদিকে শিক্ষাঙ্গনের মুক্ত পরিবেশও ধ্বংস করছে।

ছাত্র রাজনীতির এই অন্ধকার দিকের একটি ভয়াবহ দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছিল ২০১২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, যখন প্রকাশ্যে আসে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ছাত্রদের পরিচালিত এক টর্চার সেল কেলেঙ্কারির ঘটনা।
সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে শাসন করত একাধিক ছাত্রলীগ গ্রুপ। হলের সিট বণ্টন থেকে শুরু করে নতুন ছাত্রদের আচরণ সবকিছুতেই ছিল তাদের অনুমতি। কোনো ছাত্র যদি দলীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করত, ভিন্ন মত পোষণ করত, বা নির্দিষ্ট গ্রুপের কথায় না চলত, তাহলে তাকেই নির্যাতনের জন্য টার্গেট করা হতো।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ হলে (তৎকালীন জাহাঙ্গীরনগর হল) একটি রুমকে গোপনে টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করা হতো। রাতের বেলা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সেই রুমে ডেকে এনে শুরু হতো অমানবিক নির্যাতন।
নির্যাতনের ধরন ছিল ভয়াবহ ও অপমানজনক। ভুক্তভোগীদের অনেক সময় নগ্ন করে মারধর করা হতো, যাতে তারা সমাজের চাপে মুখ খুলতে না পারে। কারও চুল কেটে দেওয়া, মুখে কালো রঙ মাখানো, বেল্ট ও লোহার রড দিয়ে পেটানো ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। ভয় দেখানোর জন্য অনেক সময় নির্যাতনের দৃশ্য মোবাইলে ভিডিও ধারণ করা হতো, যাতে পরবর্তীতে ব্ল্যাকমেইল করা যায়।
এই নির্যাতনের শিকার ছিলো মূলত সাধারণ ছাত্রছাত্রী, যারা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের অংশ ছিল না, কিংবা ভিন্ন মত প্রকাশ করেছিল।

একসময় এক সাহসী ভুক্তভোগী বিষয়টি কয়েকজন শিক্ষক ও সাংবাদিকদের কাছে ফাঁস করেন। এরপর শিক্ষক-শিক্ষার্থী ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ জানালে ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা ছাড়িয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। টর্চার সেল শব্দটি তখনই প্রথম জাতীয় আলোচনায় উঠে আসে। সংবাদ প্রকাশের পর সারা দেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েকজন ছাত্রকে সাময়িক বহিষ্কার ও রাজনৈতিক পদ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে প্রভাবশালী নেতৃত্বের কারণে খুব বেশি শাস্তি কার্যকর হয়নি।
তেমনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি আবাসিক হলে আছে কিছু নির্দিষ্ট ছাত্রনেতা ও তাদের অনুসারী। তারা অনেকটা অঘোষিত প্রশাসকের মতো আচরণ করে। হলের রুম বণ্টন থেকে শুরু করে ক্যান্টিনে কে কবে খাবে, কে কার সাথে ঘুরবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখে তারা। নতুন শিক্ষার্থীরা হলে উঠার পর থেকেই একধরনের দলীয় ইনডাকশন-এর মুখোমুখি হয়, যাতে তারা নির্দিষ্ট সংগঠনের প্রতি আনুগত্য দেখায়। কেউ যদি ভিন্নমত পোষণ করে বা রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশ না নেয়, তাকে নানা রকমভাবে চাপ দেওয়া হয়। কখনও সরাসরি হুমকি দিয়ে তো কখনও মানসিক চাপের মাধ্যমে।

শেরেবাংলা হল, জহুরুল হক হল, স্যার এ.এফ. রহমান হলসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হলে সিট দখল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যা চলছে। অনেক সময় মেধাবী বা নিরপেক্ষ শিক্ষার্থীদের সিট না দিয়ে দলীয় কর্মীদের জন্য রুম সংরক্ষণ করা হয়। আবার নতুন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয় দলীয় লাইনের বাইরে গেলে নানাভাবে হয়রানির মুখে পড়তে হবে।
২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময়ও দেখা যায়, যারা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল বা সমর্থন জানিয়েছিল, তাদের উপর হামলার ঘটনাও ঘটে। ভিন্ন মত বা সরকারবিরোধী অবস্থান নেওয়া মানেই যেন শত্রু হয়ে যাওয়া।
ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রায়ই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে অসংখ্যবার দেখা গেছে দুই পক্ষের রাজনৈতিক সংঘর্ষে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জীবন ঝুঁকিতে পড়েছে, পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে, সেশনজট তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন অনেক সময় এসব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি নীরব থাকে। প্রকৃত মেধাবীরা ক্রমে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। তারা রাজনীতি না করেও শান্তিতে পড়াশোনা করতে চায়, কিন্তু পরিবেশ তাদের সেই সুযোগ দিচ্ছে না। অনেকেই রাজনীতিতে না থেকেও ভয়ে, চাপে নির্দিষ্ট সংগঠনের সাথে নাম লেখায়, শুধু টিকে থাকার জন্য। দলের নাম আর উল্লেখ করলাম না। আপনারা বুঝে নেন।

~ফাহাদ মোস্তফা।
আজ দুপুরের দিকে বাতাসি তার সৎ ভাই বোন দের নিয়ে খেলার সময় এক অঘটন ঘটিয়েছে। ছোঁয়াছুঁয়ি খেলার সময় তার সৎ বোন সুমা পড়ে গিয়ে ইঁটের সাথে লেগে মাথা ফেটে গেছে।
মতিন মেয়ের ফাটা মাথা দেখে প্রচণ্ড রেগে গেছে। হুংকার দিয়ে বলেছে বাতাসি কে যেন এই বাড়িতে না দেখে। তাহলে পিটিয়ে চামড়া উঠিয়ে ফেলবে। বাতাসি বাড়ির নামায় দাঁড়িয়ে বারবার বলেছে সে ফেলে নি। সুমা একাই পড়ে গেছে। কিন্তু তারা মানতে নারাজ এই সত্য। এখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। শেয়াল ডাকাডাকি করছে। আশেপাশের বাড়ি গুলোও কপাট লাগিয়ে দিয়েছে। এখন এই সময় বাড়ির বাহিরে আছে একমাত্র বাতাসি। ক্ষুধাও লেগেছে। কিন্তু কি করবে বুঝতে পারছে না। শুধু কেঁদেই চলছে অসহায়ের মতন। সবাই যখন খেয়ে দেয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো তখন বাতাসির সৎ ভাই সিহাব আসে প্রস্রাব করতে বাহিরে। বাতাসি তাকে দেখেই আস্তে করে ডেকে বলে-
“ সিহাব, ভাই আমার আমাকে একটু রুম থেকে ফোন টা এনে দিবি? ভাইয়াকে কল দিতাম। একটু এনে দে না। ”
সিহাবের মায়া হলো। ধীর পায়ে কুঁড়ে ঘরে গিয়ে বাতাসির ফোনটা খুঁজে এনে বাতাসির হাতে দিয়ে রুমে চলে গেল।
রাত বাজে ৮.১৩। ফাহাদ রাতের ডিনার টা করে পড়তে বসেছে। টিউশন টা পাকা হয়েছে। সামনের মাসে বেতন পেলেই বাতাসির জন্য ইলিশ মাছ কিনে বাড়ি যাবে। বোন কে পেট ভরিয়ে খাইয়ে আসবে। পাশেই জাহিদ ও পড়ছিলো। এমন সময় ফাহাদের ব্যাচের তিনজন সহপাঠী এসে রুমে কড়া নেড়ে ফাহাদ কে ডাকে। ফাহাদ পড়া ছেড়ে উঠে দরজা খুলতেই তার সহপাঠীদের মধ্যে একজন বলল-

“ ফয়সাল ভাইয়েরা তোকে ডাকছে। ২০১১ তে আয়। ”
ফয়সাল নাম টা আগেও শুনেছে ফাহাদ। তাদের হলের কর্তা। মানে সেই সব ঠিক করে হলের। ছাত্রলীগের বড় নেতাদের মধ্যে একজন। কিন্তু ফাহাদ কে কেনো ডাকছে?
ফাহাদ জিজ্ঞেস করলো-
“ কেনো? ”
“ যেতে বলেছে যাবি। এত কথা কিসের? ”
“ কখন যাওয়া লাগবে? আমি এখন পড়তেছি। ”
“ এখনই আসতে বলছে। ফোন ল্যাপটপ নিয়ে আয়। ”
“ আমার ল্যাপটপ নেই। ”
“ তাহলে ফোন টা দে। ”
আশ্চর্য ফাহাদ তার ফোনটা ওদের দিবে কেনো?
“ কেনো? আমার ফোন দিয়ে কি কাজ? ”
“ দিতে বলছি তাই দিবি। ভাইরা বলছে দিতে। ”
ফাহাদ তার ফোনটা তাদের হাতে দিলো। জিহাদ এগিয়ে এসে বলল-

“ কি জন্য ডেকেছেরে ভাইয়ারা ফাহাদ কে? ”
ছেলেগুলোর মধ্যে একজন বলল-
“ দরকার সেজন্য ডাকছে। তুই তোর কাজ কর ব্যাটা। ”
ছেলে গুলো ফোনটা নিয়ে বলল-
“ চল এখন। ”
ফাহাদ হাঁটা ধরলো। পেছন পেছন ঐ ছেলে গুলোও আসলো। ২০১১ নম্বর রুমের সামনে আসার সাথে সাথে ছেলেগুলো ফাহাদ কে ধাক্কা দিয়ে রুমের ভেতর ঢুকিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলো। আকস্মিক ধাক্কায় টাল সামলাতে না পেরে ফ্লোরে উপর হয়ে পড়ে গেল ফাহাদ। ব্যথা পেয়েছে কনুই তে। মাথা উঁচু করে সামনে তাকাতেই দেখতে পেলো তার সামনে ও পাশে চেয়ারের পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে ৪ জন। আর আশেপাশে তো ছেলেপেলে আছেই।
দু’জন এগিয়ে এসে ফাহাদ কে উঠিয়ে দাঁড় করালো। ফয়সাল সিগারেটে ফু দিয়ে বলল-

“ নাম কি তোর? ”
ফাহাদ আশেপাশে একবার তাকিয়ে চশমা টা ঠিক করে বলল-
“ ফাহাদ মোস্তফা। ”
“ বাড়ি? ”
“ চট্রগ্রাম। ”
“ কোন ইয়ারে, কোন ডিপার্টমেন্টে পড়স? ”
“ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দ্বিতীয় বর্ষে। ”
“ কুরআন পড়তে পারস? ”
“ জ্বি। ”
“ নামাজ পড়স ৫ ওয়াক্ত? ”
“ জ্বি। ”
ফয়সাল পাশের ছেলেটাকে বলল-
“ ফোন টা চেক কর। ”
ছেলেটা দেখলো ফোনে পাসওয়ার্ড দেওয়া।
“ পাসওয়ার্ড দেওয়া ফোনে। ”
ফয়সাল ফাহাদের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ পাসওয়ার্ড বল। ”

ফাহাদ ফোনটা হাতে নিয়ে পাসওয়ার্ড টাইপ করে ফোনটা খুলে দিলো।
ছেলেটা ফোনের সব খুঁজতে লাগলো এক এক করে।
আজ সেন্ট্রাল থেকে ফোন দিয়ে জানানো হয়েছে ঢাবির এক শিক্ষার্থী কিছু দিন ধরে ভারত বিদ্বেষ পোস্ট করছে। আর আজ সরাসরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কে নিয়ে করেছে। তাদের দলের ছাত্রদের উপর নিন্দা জানিয়ে পোস্ট করেছে! পোস্ট টা নজরে আসতো না যদি না পোস্ট এত শেয়ার এত লাইক এত কমেন্ট না হত। পোস্টের নিচে সবার একটাই কমেন্ট ছাত্রলীগের ছেলেপেলে এসব করে। আওয়ামিলীগের পালা,পাচাটা কু’ত্তা এগুলো। ক্যাম্পাস টাকে নিজেদের হাতের মুঠোয় করে নিয়েছে। প্রচুর হেনস্তা করে ছেলেপেলে দের।
এসব কমেন্ট দেখেই মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। ছাত্রলীগ অব্দি চলে গেছে। কদিন আগে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের সরকার কে নিয়ে কথা বলেছে। সেই পোস্ট টাও আজ মানুষ শেয়ার দিচ্ছে।
ফাহাদের অপরাধ এখন তাদের চোখে মারাত্মক! ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্ট্যাটাস দিয়েছে সে। ঢাবি,জাবির ছাত্রলীগ দের নিয়ে পোস্ট করেছে!
ফাহাদের সহপাঠীদের মধ্যে একজন সন্দেহ করে বলেছে-

“ ফাহাদ শিবির করে। ”
ব্যাস কেল্লা ফতে। ছাত্রলীগ পেয়ে গেল মোক্ষম সুযোগ। ফাহাদের সহপাঠীরা বলল-
“ ভাই এই যে পোস্ট গুলো। হালায় সরকার বিরোধী পোস্ট মারাইছে ফেসবুকে। ভারতের বিরুদ্ধে পোস্টাইছে। কাশ্মীর নিয়াও। আবার আজকে আমাগো বিরুদ্ধে পোস্ট দিছে। ”
“ খুঁজে দেখ আরো কিছু পাস কি না।?
ফোন খুঁজে সেই ভারত বিদ্বেষী, ঢাবির বিপক্ষে দেওয়া পোস্ট গুলো ছাড়া আর তেমন কোন প্রমাণ পেলো না।
রুমে থাকা ফয়সাল ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ফাহাদ কে ডেকে বলে-
“ এই এদিকে আয়। চেয়ার টা টেনে বস সামনে।
ফাহাদ চেয়ার টেনে বসলো।
“ চশমা খোল। ”
ফাহাদ চশমা খোলার সাথে সাথে ফয়সাল প্রচন্ড জোরে তার গালে কয়েকটা চড় মারে। হাত দিয়ে গাল চেপে চেয়ার সমেত পড়ে যায় ফাহাদ। ফয়সাল শার্টের কলার চেপে ধরে বলল-
“ সব স্বীকার কর ফাহাদ। কে কে আছে তোর সাথে? কারা পাঠইছে তোরে? তোদের মিশন কি? সব স্বীকার কর। তরে কেউ কিছু বলবো না। শুধু স্বীকার কর। নইলে এমন পিটান পিটামু যে মারতে মারতে তর হাত পা থেকে মাংস খুলে খুলে পড়বো। ”
ফাহাদ হাত জোর করে বলল-

“ বিশ্বাস করেন ভাই আমায় কেউ পাঠায় নাই। আমার সাথে কেউ নাই। আমি কোনো রাজনীতির সাথে জড়িত না। আমি সাধারণ একজন শিক্ষার্থী। ”
ফয়সাল ফাহাদের শরীরে লা’ত্থি মেরে বলল-
“ তাইলে এসব পোস্ট করছস ক্যান তুই? বল কারা কারা আছে তোর সাথে। ”
“ বিশ্বাস করেন ভাই কেউ নাই। আমরা ভারত কে এত সাহায্য করি তার বিনিময়ে ভারত আমাদের বিভিন্ন ভাবে শোষণ করে। সেই রাগ কষ্ট থেকেই পোস্ট টা করেছিলাম। ”
“ শালা শু’য়োরের বাচ্চা স্বীকার করবি না তাই না? ভয়ডর নাই মনে? ”
“ সত্য তো স্বীকার করলামই। আর কি স্বীকার করাইতে চাচ্ছেন আমারে দিয়ে? ”
“ দেখ ফাহাদ তোর সাথে ঝামেলায় জড়াইতে চাই না। হলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে তোর সাথে আর কে কে জড়িত আছে সেটা বলে দে। ”

“ কেউ জড়িত নেই। আমি বলছি তো আমি সাধারণ একজন শিক্ষার্থী মাত্র।
এরই মধ্যে ফাহাদের সহপাঠীরা কাঠের তৈরি শক্ত ক্রিকেট স্ট্যাম্প নিয়ে আসে। ফাহাদ ঘাবড়ে যায়।
ফাহাদের সহপাঠীদের মধ্যে একজন এসে ফয়সালের মতোই গায়ের জোরে থাপ্পড় মারে ফাহাদ কে।
এরপর হাতে তুলে নেয় ক্রিকেট স্ট্যাম্প। পিঠে, পায়ে, পায়ের তালুতে, হাতে সর্বশক্তিতে মারতে থাকে। প্রচণ্ড শক্তিতে মারার কারণে কয়েক বাড়ি দেওয়ার পরই স্ট্যাম্প ভেঙে দুই টুকরা হয়ে যায়। ফাহাদ ততক্ষণে চিৎকার দিতে দিতে লুটিয়ে পড়ে মেঝেতে। সেই চিৎকার শুনে আশেপাশের রুমের জানালা গুলোও যেন ভয় পেয়ে যায়।
ফয়সাল আদেশ দিলো নতুন স্ট্যাম্প নিয়ে আসার জন্য। এবার ফয়সাল স্ট্যাম্প হাতে তুলে নেয়। একাধারে মাটিতে লুটিয়ে থাকা ফাহাদের সারা শরীরে আঘাত করতে থাকে।
প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি আঘাত করে ফয়সাল নিজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। মেঝেতে পড়ে কাতরাতে থাকে ফাহাদের শরীর। তখনই বিকট আওয়াজ করে বেজে উঠে ফাহাদের ফোনটা। ফয়সাল জিজ্ঞেস করলো-

“ কে ফোন দিছে রে? ”
ফাহাদের সহপাঠী জানালো-
“ বাতাসি নামের কেরা জানি ফোন দিছে। ”
“ এই বাতাসি আবার কেরা? ”
ফাহাদ ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে বলল-
“ আ..আমার ব..বোন ফোন দিছে। একটু কথা বলতে দিন।
ফয়সাল রেগে বলল-
“ ফোন কেটে দে। ”
ফোন কে’টে দেওয়া হলো। বাতাসি বারবার ফোন দিতে লাগলো ভাইকে। এই রাতে সে এখন কোথায় যাবে? এখানে থাকলে তো শিয়াল কুত্তায় ছিঁড়ে খাবে। ভাই ফোন কেনো ধরছে না? তার বোনটার যে এখন তাকে খুব দরকার। বাতাসি কান্নারত অবস্থায় বারবার বলছে-

“ ভাইয়া ফোনটা ধরো না একটু। মা আমারে বাড়িতে ঢুকতে দিতেছে না। ”
বারবার ফোন আসছে বলে ফোনটা সুইচ অফ করে রাখতে বলল ফয়সাল। তাই করা হলো। ফাহাদ ফোনটার দিকে নির্নিমেষ চোখে চেয়ে রইলো। তার বোনটা কেনো ফোন করেছিল? ঠিক আছে তো? মা মা’রে নি তো? আরো কত-শত কথা মাথায় আসলো বোন কে ঘিরে। বোনের সাথে কথা বলতে দিলো না তারা!
মোটা দড়ি দিয়ে মারতে শুরু করলো তারা। ফাহাদ তখনও আকুতি-মিনতি করে বলল- একটু ফোনটা অন করুন। আমাকে আমার রুপার সাথে কথা বলতে দিন। আমার বোনটার বোধহয় আমাকে খুব দরকার। একটু কথা বলে নেই। তারপর মাইরেন আমি কিছু বলবো না। শুধু একবার একটু কথা বলিয়ে দিন।
ফাহাদের এত আকুতি ভরা কথায় কারো মন গলেনি। কারো মধ্যেই মনুষ্যত্ব ফিরে আসেনি। বরং একজন এগিয়ে এসে অন্য আরেকজনের হাত থেকে ক্রিকেট স্ট্যাম্প নিয়ে ফাহাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে সর্বশক্তিতে মারতে থাকে।
রাত সাড়ে দশটা। অমানুষিক মার খেয়ে মেঝেতে লুটিয়ে গোঙাতে থাকে ফাহাদ। ফয়সাল ধমক দিয়ে টেনে দাঁড় করায়। তারপর সর্বশক্তিতে কয়েকটি চড় মারে। এরপর আবার স্ট্যাম্প দিয়ে পেটাতে থাকে।
রাত এগারোটা। ২০১১ নাম্বার কক্ষে এসে হাজির হয় ফয়সালের চেয়েও পাওয়াফুল এক ব্যক্তি। এসেই সবাইকে জিজ্ঞেস করলো,

“ কি অবস্থা? কিছু বের করা গেছে মুখ থেকে? ”
ফয়সাল জানালো-
“ না ভাই। কোন কিছু বলতেছে না।”
“ না বলা অব্দি মারতেই থাক। ”
এই ব্যক্তির আদেশে ফাহাদ কে আবার ক্রিকেট স্ট্যাম্প, স্কিপিং রোপ দিয়ে মারা শুরু হয়। হাতের কনুই দিয়ে পিঠে প্রচণ্ড আঘাত করে। উৎসাহিত হয়ে তখন সবাই মিলে প্রচন্ড শক্তিতে ফাহাদ কে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি চড়-থাপ্পড়, লাথি মারতে থাকেন। ফাহদের কুঁকড়ে যাওয়া শরীর থেকে তখন শুধু গোঙানি শোনা যাচ্ছিলো।
রাত সাড়ে এগারোটা। কিছুক্ষণের জন্য রুম থেকে বের হওয়ার আগে ফয়সাল অন্যদের বলে যায়-
“ তোরা ঐ শালার কাছ থেকে যেমনেই হোক তথ্য বের কর। ”
এবার ১০-১২ জন মিলে একের পর এক স্টাম্প দিয়ে পেটাতে থাকে ফাহাদ কে। মুমূর্ষু ফাহাদ তখন বমি ও প্রস্রাব করে ফেলে। ব্যথায় চিৎকার করার মতো শক্তিও অবশিষ্ট নেই। বাঁচার জন্য ইশারা-ইঙ্গিতে কাকুতি-মিনতি করে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়। শ্বাসকষ্ট দেখে একজন ফাহাদের মাথার নীচে বালিশ দেয়। পরপর আরো কয়েকবার বমি করে ফাহাদ। তারপর হলের বাথরুমে নিয়ে যাওয়া হয়। ধুয়ে মুছে জামা কাপড় বদলানো হয়।
রাত সাড়ে বারোটা। ফয়সালের নির্দেশে ফাহাদ কে ধরাধরি করে ২০০৫ নম্বর কক্ষে নিয়ে আসা হয়। হলের মেস বয় কে ডেকে আনে। ২০১১ নম্বর রুমে ফাহাদের বমি তাকে দিয়ে পরিষ্কার করানো হয়।
২০০৫ নম্বর কক্ষে আনার পর ফয়সাল বলে-

“ তোরা এবার অর থেকে তথ্য বাইর কর। ওর লগে ঢাবি তে কে কে শিবির করে বাইর কর। ”
দুই-একজন ফাহাদের মুমূর্ষু অবস্থা দেখে ভয়ে ভয়ে বললো-
“ ভাই, অবস্থা বেশ খারাপ। হাসপাতালে নেওয়া দরকার। ”
এই কথা শোনার পর ফয়সাল তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে। রেগে বলে-
“ যা বলছি তাই কর। এইগুলি সব নাটক। ভং ধরছে। তোরা শিবির চেনস না। শিবির চেনা কষ্ট। ”
ফয়সালের রেগে ওঠা দেখে সবাই ভয়ে জলদি ফাহাদ কে আবার ইন্টারোগেট শুরু করে। কিন্তু ফাহাদের মুখ থেকে কোন শব্দ আসে না। নিশ্চল, নিস্তেজ পড়ে থাকা দেহ কোন সাড়া না দেওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে আবার আরেক দফা পেটানো শুরু হয়। ঘরের ভেতর প্রতিধ্বনিত হতে লাগল নির্মম আঘাতের শব্দ, আর তার মাঝেই ফাহাদের চোখে ফুটে উঠল এক অমোচনীয় যন্ত্রণা। শেষবার বোনের সঙ্গে একটু কথা বলতে না পারার গভীর আফসোস। বুকের ভেতর হু হু করে কাঁদতে লাগলো তার বোনের জন্য। ফাহাদ বুঝে গেল আজ তার জীবনের অন্তিম সময় এসে গেছে। তার ভীষণ কষ্ট হতে লাগলো বোনের জন্য। এই দুনিয়ায় তার বোনের যে সে ছাড়া আর কেউ নেই। সে চলে গেলো তার বোনটাকে আগলে রাখবে কে? তার মা যে ভালোবাসে না বাতাসি কে। তার বোন যে ভাই হারানোর শোকে পাগল হয়ে যাবে। তখন দুঃখ পেলে কার বুকে গিয়ে কাঁদবে? কাকে ফোন করে বলবে এটা খাব ওটা খাব? কে আদর করে তার বোন কে বুকে টেনে বলবে- আমি আছি তো।

এই শেষ মুহূর্তে হঠাৎ মনে পড়লো বাতাসি বলেছিল ইলিশ মাছ নিয়ে যেতে। ফাহাদ আজ ঠিক করেছিল সামনের মাসে ইলিশ কিনে নিয়ে যাবে। বোনকে সামনে বসিয়ে তার খাওয়া দেখবে। কিন্তু কে জানত ভাগ্যের পাতায় তার জন্য লেখা ছিল এক অন্য সমাপ্তি। সে হেরে গেল নিষ্ঠুর সময় আর মানুষের নিষ্ঠুরতার কাছে। খোদার কাছে ফাহাদ একটাই আর্জি জানালো এই অন্তিম সময়ে- তার বোনকে আগলে রাখার জন্য যেন তার মতো কেউ একজন থাকে এই নিঃস্ব পৃথিবীতে। তা না হলে তার মতই অচীরেই হারিয়ে যাবে সকলের কাছে অবহেলিত তার কালো বর্নের মায়াবী ফুলের মতো নিষ্পাপ বোন টা।
চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসছে ফাহাদের। পরপর চোখ ঝাপটানি দিয়ে ফাহাদ স্পষ্ট দেখতে পেলো ঐ তো তার সামনেই বসে আছে তার বোন টা। পাগলের মতো কেঁদে কেঁদে বলছে— আমারে ছাইড়া যাইও না তুমি ভাইয়া। তুমি ছাড়া কেউ নাই আমার।

দাহশয্যা পর্ব ৬৮

ফাহাদও তো যেতে চায় না তার বোন কে ছেড়ে। কিন্তু জীবনের সাথে যে সে আর লড়তে পারছে না। চোখ টা এবার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আসলো। বাতাসি মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। ফাহাদ আর দেখতে পেলো না বাতাসি কে। শেষ বারের মতন সে নিঃশ্বাস টা টেনে ধরে রাখলো। আর ছাড়লো না। বোন কে আর ইলিশ মাছ খাওয়ানো হলো না ফাহাদের।
৬ ই অক্টোবর বিনাদোষে শুধুমাত্র সন্দেহের জালে বন্দি হয়ে একটা প্রাণ অকালে ঝড়ে গেল শেরে-বাংলা হলের এক অভিশপ্ত কক্ষে। সাথে রেখে গেল এক অমোঘ বাক্য-
❝অনন্ত মহাকালে মোর যাত্রা
অসীম মহাকাশের অন্তে ❞

দাহশয্যা পর্ব ৭০