হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৩৯
তামান্না ইসলাম শিমলা
হাত পা ছড়িয়ে চোখ জোড়া বন্ধ করে শুয়ে আছে তেহরাব, মায়ের কন্ঠ কর্ণপাত হতেই চোখ খুলল সে।
“ খেতে আসছিস না কেন? আর তনয়া কই?”
তেহরাব ধাপ করে উঠে বসে, তনয়া কই মানে!
“তনয়া কই? তোমাদের সাথে না?”
তাসলিমা বিরক্তি নিয়ে বলে,
“আমার সাথে থাকলে ডাকতে আসতাম নাকি? জলদি খেতে আস,আমি গেলাম।”
তেহরাবের কোনো কথা না শুনেই তাসলিমা প্রস্থান করল। তেহরাব দ্রুত বিছানা থেকে নেমে ঘরের বাইরে আসলো, তনয়া যে বাড়ির বাইরে যাবে না তা ভালো মতোই জানা তেহরাবের। হয়তো অভিমান করে বাড়ির কোথায় একটা বসে আছে। তেহরাব স্টাডি রুমে আসলো, নাহ তনয়া তো এখানে নেই।
কিছু না ভেবেই ছাড়ে পা বাড়াল তেহরাব, গেটের সামনে এসে থেমে গেল। হ্যাঁ মেয়েটা এখানেই, চুপ করে বসে আছে দোলনায়।। তেহরাব লম্বা একটা শ্বাস নিল, এক পা এক পা করে এগিয়ে গেল তনয়ার কাছে।৷ নিঃশব্দে বসলো তনয়ার পাশে, তনয়া ফিরে তাকাল না।
“খেতে চল।”
তেহরাবের শান্ত কন্ঠ, তবে তনয়ার পাশ থেকে কোনো জবাব মিলল না। তেহরাব তনয়ার মুখের দিকে তাকায়, তখন ওভাবে না বললেও হতো। মেয়েটাকে কষ্ট দিয়ে যে সেও ভালো থাকতে পারে না,
“সরি, এবার চল।”
তেহরাব তনয়ার হাত ধরতেই তনয়া হাত ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। শান্ত স্বরে বলল,
“আপনি যান প্লিজ, কথা বলতে চাই না আমি।”
তেহরাবও উঠে দাঁড়ায়, এগোতে নিলে তনয়া নিজেই দুপা পিছিয়ে যায়। চোখ বন্ধ করে কঠোর ভাবে বলে,
‘প্লিজ আপনি যান।”
তেহরাব অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
“আমার কথাটা শোন, বোঝার…
তনয়া এবার চোখ খুলল, গম্ভীর ও উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠল,
“শুনতে চাই না আমি, কিছুই শুনতে চাই না। দয়া করছেন আমাকে? ভালোবাসেন? ভালোবাসলে কিছুই লুকাতেন না, আসলে আপনি আমাকে দয়া করছেন, করুণা করছেন। চাই না আমার আপনার দয়া, চলে যান।”
তেহরাবের রাগটা আবারো বেড়ে যাচ্ছে, এদিক ওদিক ঘাড় বাকিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে। তনয়ার হাত ধরে যেতে নিয়ে বলে,
“নিচে চল।”
তনয়া এবারও দাঁড়িয়ে যায়, কোন রকম হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলে,
“যাব না আমি, আমাকে থাকতে দিন আমার মতো। কেউ ভালোবাসে না আমাকে, সবাই দয়া করে, করুণা করে। চাই না কারো করুণা, আমি বোকা, আমি চুপচাপ, আমার হাজারটা দোষ। তাই তো সবাই সবটা লুকিয়ে যায়, এড়িয়ে যায়, দয়া দেখায়। লাগবে না আমার, চলে যান।”
তনয়ার কান্নামিশ্রিত কন্ঠ, তেহরাবের রাগও লাগছে খারাপও লাগছে। তবুও নিজেকে শান্ত রাখার যথাসম্ভব চেষ্টা করছে সে, বড় করে শ্বাস নিয়ে তনয়ার বাহ ধরে নিজের কাছে নিয়ে আসে।
“রাগিয়ে দিস না তনয়া, আমি তোকে ভালোবাসি কিনা সেটা তুই ভালো করেই জানিস। কেন জেদ করে এসব বলছিস? আমার ভালোবাসাকে অপমান করছিস?”
তনয়া ধাক্কা দিল তেহরাবের বুকে, তবে ছাড়াতে পারল না নিজেকে। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“অপমান? আমি অপমান করছি? ছাড়ুন আমাকে, আপনিও ভালোবাসেন না আমাকে, আমার মাও জানেন আমাকে কিছুই বলতো না। বাড়িতে উৎসব হোক অনুষ্ঠান হোক বা মেহমান আসুক কখনোই আমাকে বলতো না, অথচ তানহাকে বলতো।
আমাকে কেউ কিচ্ছু বলতো না, বাবাও বলতো না। কেউ গুরত্বই দিত না, আমার মতামত, আমার চাওয়া৷ ভালো লাগা খারাপ লাগা নিয়ে কেউ ভাবেনি কখনো, জোর করে চাপিয়ে দিয়েছে সব। আমিও মেনে নিয়েছি, কিন্তু বিশ্বাস করুন তনয়া ক্লান্ত, আর নিতে পারছে না সে। আপনিও ভালোবাসেন না আমাকে, আমার কেউ নেই। সবার কাছেই আমি গুরুত্বহীন, কেউ নেই আমার।”
নিজের মতো কেঁদে চলেছে তনয়া, হুঁশ হারিয়ে যা তা বলে চলেছে। অথচ তেহরাব বিন্দু পরিমাণ রাগছে না, উল্টো তনয়ার অজান্তেই তাকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়েছে। তেহরাবেরও কষ্ট হচ্ছে, তার চোখেও জল। তবে তা কি কারো নজরে পরেছে? নাহ তো, আড়ালে সেও কষ্ট পাচ্ছে!
“আমি কি করেছি বলুন? কেন কেউ আমাকে বুঝে না? আমারও কষ্ট হয, আমি কাঠের পুতুল নয়, আমি মানুষ, জলজ্যান্ত একটা মানুষ৷ তবে কেন সবাই আমাকে কষ্ট দেয়? কেন কেউ ভালোবাসে না? আমার কেউ নেই!”
তেহরাব আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তনয়াকে, তনয়া পুরোটাই তেহরাবের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছেড়ে দিলেই পরে যাবে, তেহরাব তনয়ার চুলের ভাজে হাত রাখে।
“আমাকে কেন কষ্ট দিচ্ছিস? আমি তো ভালোবাসি, অস্বীকার কেন করছিস? তেহরাবকে কষ্ট কেন দিচ্ছিস?”
“আপনি দিচ্ছেন কষ্ট, আমাকে দিচ্ছেন। আমি ভালোবাসি আপনাকে, কেন লুকাচ্ছেন বলুন?”
“বলে দিলে খুশি?”
তনয়া থামে, মাথা তুলতে নিলে তেহরাব তুলতে দেয় না।।সেভাবে রেখেই প্রথম থেকে শেষ অব্দি পুরো ঘটনা খুলে বলে, তনয়া যেন একটি মূর্তি। নড়ছে না, কথা বলছে না। শুধু শুনছে,
“এবার আর বলিস না আমি ভালোবাসি না, তোর কেউ নেই, আমি তেহরাব শুধু তোর৷ এমন ভাবে কথা বলিস না, আর দ্বিতীয় বার এ নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করিস না। আমি চাই না অতীতের কোনো কথা বারবার উঠে আসুক!”
তনয়ার মাথা ঘুরছে, আর তাকিয়ে থাকতে পারল না সে। তেহরাবের বুকের উপরই জ্ঞান হারালো, অনেক ক্ষন অতিবাহিত হওয়ার পরেও তনয়ার সাড়াশব্দ না পেয়ে তেহরাব তনয়ার মাথাটা উচু করে।
অস্থির হয়ে পরে তেহরাব নিজেও, দ্রুত তনয়াকে কোলে তুলে নিজের রুমে নিয়ে আসে, ডাকতে লাগে মাকে।
ছেলের ডাক শুনে তাসলিমা ছুটে আসে,
“কি হয়েছ?”
তেহরাব তনয়ার মুখে পানি দিচ্ছে, তাসলিমা এসে পাশে বসল।
“আল্লাহ, কি হয়েছে তনয়ার?”
তেহরাব ফোনটা বের করতে করতে বলল,
“জানি না, আমি কাকাকে কল করছি।”
তেহরাব আনোয়ারকে কল করে দ্রুত বাড়িতে আসতে বলে, কিছু সময়ের মধ্যেই আনোয়ার চলে আসে। সাথে আসে রিমু, আনোয়ার তনয়াকে দেখে, প্রেশার মাপে। প্রেশার একদম লো,
“প্রেশার লো, তার উপর শরীর দুর্বল।”
তেহরাব অস্থির হয়ে উঠে,
“জ্ঞান ফিরবে কখন? নাকি হাসপাতালে নিযে যাব? সড়ো যেতে দাও!”
তেহরাব আসতে নিলে আনোয়ার তাকে থামিয়ে দেয়,
“হাসপাতালে নিতে হবে না, জ্ঞান ফিরবেনি একটু পরেই। রেস্ট নিতে দে, আর জ্ঞান ফিরলে খাইয়ে দিস। ভাবি আমি যাই, রিমু চল।”
আনোয়ার আর রিমু চলে গেল, তাসলিমা তনয়ার কপালে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
“মেয়েটার খাওয়া দাওয়াতে একদমই অনিহা, চড়ুই এর খাবার খাই!”
“তুমি যাও, আমি খেয়ে নাও গিয়ে। বাবাকে কল করে জিজ্ঞেস করো কখন আসবে!”
তাসলিমা উঠে দাঁড়াল, মাথা নেড়ে বেড়িয়ে গেল রুম থেকে। তেহরাব দরজা বন্ধ করে তনয়ার সাসনে এসে হাঁটু গেড়ে বসল,
“তুই আমাকে শান্তি দিবি না তনয়া? কত জ্বালাবি বল?”
টিপটিপ করে চোখ খুলে তাকাতেই চারপাশে অন্ধকার ছাড়া আর কিছু নজরে পরল না তনয়ার। কানে আসলো ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ, চোখ খুলে রাখতে পারছে না সে। হাতের কাছে এক টুকরো কাপড়ের সন্ধান পেয়ে তাই খামচে ধরল, তৎক্ষনাৎ ভেসে আসলো তেহরাবে কন্ঠস্বর।
“ঠিক আছিস? কিছু লাগবে? খিদে পেয়েছে? কিছু আনি?”
একনাগাড়ে এত গুলো প্রশ্ন শুনে তনয়া অবাক হয়ে মাথা তুলে তাকাল,তেহরাবের মুখশ্রী নজনরে পরতেই আবারো চোখ বন্ধ করে নিল। কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগছে,
“জান কি হলো? কিছু লাগবে? খারাপ লাগছে?”
তনয়া নিজে থেকেই তেহরাবকে জড়িয়ে ধরলো, মৃদু হেসে বলল,
“ভালোবাসি!
“আমিও ভালোবাসি।”
“আমি বেশি ভালোবাসি!”
“আমি তবে একটু অল্প।”
“তাতেও চলবে, ভালোবাসলেই হবে।”
“আমার যে চলছে না, আমি তো অনেকটা ভালোবাসতে চাই।”
‘না করেছে কে?”
“তবে চল আমরা হারিয়ে যাই দূর পাহাড়ে? ছোট্ট কাঠের খেলনা বাড়িতে সাজাবো সুখের সংসার, থাকবো শুধু তুমি আমি আর আমাদের প্রনয়ত্তাপ!”
তনয়া হেসে উঠে,
“সাহিত্যিক হয়ে যাচ্ছেন যে? নতুন করে প্রেমে ট্রেমে পরলেন নাকি?”
তেহরাব নিজেও হাসে, হ্যাঁ সেতো প্রেমে পরেছে। তার তনয়ার প্রেমেই সে বারংবার পরে!
“আমি বারবার, হাজারবার,প্রতিদিন নিয়ম করে তোর প্রেমে পড়ি। একটু পুরোনো, একটু নতুন, সব মিলিয়ে তোকে ভালোবাসি।”
“এত ভালোবাসেন? সারজীবন বাসবেন তো?”
তেহরাব আলতো করে অধর ছোঁয়ায় তনয়ার কপালে, স্মিত হেসে বিড়বিড়ায়,
“বেসেছি, বাসি এবং বাসবো। সারাজীবন, ইহকালেও, পরকালেও, সব মিলিয়ে আমার তোকেই চাই বারংবার।
দিন শেষে শ্রাবণ মেঘের বারিধারায় ভিজবো দুজনায়, মধ্যরাতের প্রহরে করবো চন্দ্রবিলাশ।”
“এত ভালো কেন বাসেন? আমার যে ভয় হয, কেউ তো এত বেশি ভালোবাসেনি কখনো।”
তেহরাব আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল,
“কাউকে ভালোবাসার সুযোগ দেয়নি, তোকে ভালোবাসার অধিকার শুধু এই তেহরাবের। বুঝলি?”
তনয়া তেহরাবের বুকে ছোট্ট করে চুমু খাই, চোখ বন্ধ রেখেই বলে,
“বুঝলাম, তারপর?”
“তারপর তুই আমার, আমি তোর। এইতো জীবন!”
তেহরাবের সোজাসাপটা জবাব, তবুও মুগ্ধ তনয়া। আবারো চোখ জোড়া ভিজে আসলো, তবে অধরে এখনো হাসির রেখা বিদ্যমান।
“ আপনি এত মহান কেন? কেন আমার মতো মেয়েকে ভালোবাসলেন? এতটা পাগল হলেন? আমি তো আহামরি সুন্দরীও নই।”
তেহরাব ভ্রু কুঁচকাল, তনয়ার গালে হাত রেখে নিজের দিকে ফেরালো।
“আয়নায় দেখিছিস নিজেকে?”
“দেখেছি বহুবার, নিজেকে আহামরি কখনোই লাগেনি।
“তুই ভুল আয়নায় নিজেকে দেখেছিস, আমার চোখে নিজেকে দেখ। তুই আমার রাজত্বের রানী, তুই আমার দিব্যাঙ্গনা।”
“আমি সাধারণ এক বোকা নারী!”
তেহরাব তনয়ার কপালে কপাল ঠেকালো,
“নারী তোমার পরিচয় তুমি আমার,সে তুমি বোকা হও বা চালাক। তেহরাবের কাছে তোমাকে বারংবার ধরা দিতে হবে!”
তনয়া হাসে,
“জি মহাশয়, মহাশূন্যে আমি আপনার পূর্নতা৷ আর আপনি আমার সেই শূন্যস্থানের পূর্ণসিদ্ধ, যা আপনি ছাড়া কেউ পূর্ণ করতে পারেনি, পারবেও না কখনো!”
তেহরাব তনয়ার অধর জোড়া নিজের দখলে নিয়ে নেয়, তনয়া চোখ বন্দ করে অনুভব করছে।
তেহরাব থামলো, বড় বড় করে দুবার শ্বাস নিল,
“মহারানীর যদি আপত্তি না থাকে তবে কি মহারাজা তাকে একটু ভালোবাসতে পারে?”
হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৩৮
তনয়া মুচকি হেসে চোখ বন্ধ করে নেয়, তেহরাবের কলার ধরে নিযে আসে নিজের কাছে। নিজে থেকে অধর ডুবিয়ে দেয় তেহরাবের অধরে।
তারপর? তারপর আর কি, দুজনে পারি জমায় ভালোবাসার রাজ্যে। হারিয়ে যায় একে অপরের উন্মাদনায়, একটু যন্ত্রনা পুরোটাই মিষ্টত্ব!
