হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৪০
তামান্না ইসলাম শিমলা
কিছুসময় আগেই বাবার বাড়ি এসেছে তনয়া, সাথে তেহরাব। ফ্রেশ হয়ে মাকে রান্নার কাজে সাহায্য করতে ছুটেছে রান্না ঘরে, তেহরাবও হাত মুখ ধুয়ে বিছানায় শুয়ে আছি। কিইবা করবে আর, করার কি আছে?
“শুনছেন?”
তনয়ার কন্ঠস্বর পেয়ে দরজার দিকে তাকাল তেহরাব, উঠে বসল বিছানায়।
“আব্বু ডাকছে আপনাকে, বসার ঘরে যেতে বলল।”
তেহরাব সামান্য ভ্রু কুঁচকাল,
“এখনো তো খাওয়ার সময় হয়নি, এখনই কেন?”
তনয়া মাথা নিচু করে কিছু একটা ভাবছে, সাথে হাত কচলাচ্ছে। বিষয়টা নজর এড়ালো না তেহরাবের, এগিয়ে আসলো তনয়ার কাছে,
“কি হয়েছে?”
তনয়া চোখ তুলে তাকায়, লম্বা শ্বাস নিয়ে বলে,
“শিহাব ভাই এসেছে, প্লিজ স্বাভাবিক ভাবে কথা বলিয়েন।”
তেহরাবের কুঁচকানো ভ্রুজোড়ক আরেকটু প্রস্বস্থ হলো, লুঙ্গির এক কোণা ধরে কোমড়ে হাত রাখল।
“অস্বাভাবিক আচরণ করতে যাব কেন? যতই হোক শিহাব্বা আমার শালক, শালক নাকি কি যেন বলে? যায় হোক, আসছি।”
তেহরাব তনয়াকে পাশ কাটিয়ে বাইরে চলে গেল, তনয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানায় এসে বসল। মাথা যন্ত্রণা করছে তার, একটু বিশ্রামের প্রয়োজন।
বিছানায় শুতে যাবে এমন সময় রুমে প্রবেশ করে তানহা, তনয়া অস্থির তানহার দিকে তাকায়।
তানহা দৌড়ে আসে তনয়ার কাছে,
“আপু কিছু কর।”
তনয়া বুঝতে পারল না তানহার কথার মানে, তানহার কাঁধে হাত রাখল সে।
“কি হয়েছে? এত অস্থির হচ্ছিস কেন?”
“শিহাব ভাইয়া ইতালি চলে যাবেন, আর আসবেন না। তুই আটকানা ওনাকে, শিহাব ভাই চলে গেলে আর আসবেন না। ফুপি কান্নাকাটি করছে,আর…..
তনয়া আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে আছে তানহার দিকে, এসবের কিছুই তো সে জানে না।
“আর? আর কি?”
তানহা এবার কেঁদে ফেলল,
“আপু এতদিন আমি কনফিউজড ছিলাম আমার অনুভূতি নিয়ে, আমি ভাবতাম আমি সবার উপরেই ক্রাশ খাচ্ছি। এসব আকর্ষণ, ভেবেছিলাম তেহরাব ভাইয়া আমার আসল ক্রাশ। মানে আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না, আমি যদি তাকে ভালোবাসতাম তাহলে তোর বিয়ে তার সাথে হওয়ার কথা শুনে আমার কষ্ট লাগত। কিন্তু সেদিন কষ্ট আমার সে কারনে লাগেনি, বরং লেগেছিল কেন আমার ক্রাশ গুলো তোকেই পছন্দ করে এই ভেবে। কিন্তু আজ আমি বুঝতে পারছি আমি আসলে শিহাব ভাইকেই ভালোবাসি, প্রথমে ক্রাশ ছিল, আকর্ষণ ছিল তবে আজ বুঝতে পারছি আমি তাকে ভালোবাসি। আপু উনি চলে গেলে আর আসবেন না, কিছু কর না। ওদিকে খালামণি আমার বিয়ের সম্মন্ধ এনেছে, মাও রাজি। সেটার জন্যই শিহাব ভাইকে আজ আসতে বলেছে, সাথর তেহরাব ভাইকেও। কিছু কর না আপু, বিশ্বাস কর আমি মজা করছি না। আমি সিরিয়াস, আমি সত্যি ভালোবাসি তাকে।পাগল পাগল লাগছে সব কিছু, কিছু একটা কর।”
তনয়া হতভম্ব, কি বলবে সে? এক দমে কথা গুলো বলে শব্দ করে কাঁদতে লাগল তানহা, সত্যি কেমন পাগল পাগল লাগছে মেয়েটাকে।
“আপু আজ এক সপ্তাহ ধরে আমার এই অবস্থা, যেদিন শুনেছি সে চলে যাবে। তার উপর এই বিয়ের সম্মন্ধ…. আমি আর পারছি না আপু। কাকে কি বলব বুঝতে পারছি না, তুই কিছু কর না।”
তনয়া জাপ্টে জড়িয়ে ধরল তানহাকে, তনয়ার নিজের মাথায় কাজ করছে না এখন। তানহার চোখ মুখ শুকিয়ে কি অবস্থা, এই মেয়ে কি সত্যি ভালোবাসে? নাকি সব আবেগ? যা সময়ের সাথর মিলিয়ে যাবে!
“আচ্ছা শান্ত হ, কাঁদিস না। আচ্ছা তুই তো শিহাব ভাইকে ভালোবাসিস, আমি মানলাম। কিন্তু সে? সে কি বাসে?”
“জানি না, কিছুই জানি না। জানতেও চাই না, আমার শুধু ওই শিহাইব্বাকেই লাগবে, আমি নিজেও জানি না আমি এমন সিরিয়াস কবে হলাম।”
তনয়া তানহাকে সোজা করে দাঁড় করায়, ঠান্ডা গলায় বলে,
“কাঁদিস না, দেখছি কি করা যায়। শিহাব ভাইয়ের সাথে কথা বলে দেখবনি, যদি যে রাজি হয় তবে মা বাবাকেও মানাতে পারব। কিন্তু….
তানহা হিচকি তুলতে তুলতে বলে,
“কিন্তু কি?”
তনয়া চুপ হয়ে যায়, যদি শিহাব তানহাকে বালোই না বাসে? নাই মেনে নেয়?
“কি হলো বল না!”
তনয়া কিছু বলে না, তানহার গালে হাত রেখে মৃদু হেসে বলে,
“আমি দেখছি কি করা যায়, যাইহোক খাওয়া দাওয়া করেছিস? চোখ মুখের কি অবস্থা করেছিস দেখ তো।”
ধীরে ধীরে তানহার কান্নার গতি কমে আসে, তবুও ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে চলেছে। দুদিকে মাথা নেড়ে বলে,
“উহু।”
“এখন যা খেয়ে নে, আর তুই এসব আগে কেন বলিস নি?”
তানহা কিছু জবাব দেয় না, সে নিজেও কি জানত সে এতটা ভালোবাসে শিহাবকে। তানহা জানে শিহাব তাকে ভালোবাসে না, সে তনয়াকে ভালোবাসে। অনেক বেশি ভালোবাসে, কিন্তু সে যে এটা মানতে পারছে না, তার তো শুধু শিহাবকেই চাই!.
“আচ্ছা যা খেয়ে নে, আমি যাচ্ছি বসার ঘরে।”
তনয়া তানহাকে রেখেছমই চলেনগেল বসার ঘরের দিকে, দরজার সামনে আসতেই শুনতে পেল শিহাবের কন্ঠস্বরে বলা কিছু কথা।
“কাগজ পত্র আজ নিয়ে পাসপোর্ট করতে দিব, আর বাবা কাল হয়ত বাড়ি আসবে। বিয়ের কথা তাদের সাথেই করলে ভালো হয়, আমি এসেছি কাগজ পত্র গুলো নিতে।”
শিহাবের বলা শেষ হতেই তেহরাব বলে উঠল,
“তানহাকে বিয়ে করতে চাওয়ার কারনটা কি? আর তানহা রাজি কি না সেটা না জেনেই পাসপোর্ট বানাতে চাইছ!”
শিহাব হাসল কিঞ্চিৎ,
“ ভালোবাসার মানুষকে না পেলে কতটা যন্ত্রণা হয় সেটা আমি জানি, তাই চাইছি না তানহাও সেই কষ্টটা পাক। আর তানহা আমার কাছে ভালো থাকবে, এতুটু ভরসা রাখতে পারেন। আর মামা আপনার হাতেই এখন সব, বড় মেয়েকে বুঝেছেন ছোট মেয়েকেও নিশ্চয় বুঝবেন।”
“তারমানে বলতে চাইছ যে তানহা তোমাকে ভালোবাসে?”
শফিকের কথায় শিহাব লম্বা শ্বাস টানে,
“বলতে চাইছি না, এটাই সত্য। আর আমি আমার জীবনে পিছিয়ে থাকতে চাই না, এগোতে চাই। থেমে থাকতে চাই না, তানহায় নাহয় আমার নতুন সূচনা হোক!”
তেহরাব হায় তুলতে তুলতে লুঙ্গি মুঠোয় নিয়ে উঠে দাঁড়াল, শিহাব ও শফিকের দিকে তাকিয়ে বলল,
“দেখুন যা ভালো মনে হয়, আমার কোনো অমত নেই। আর আব্বা, শিহাব সত্যিই ভালো ছেলে, তানহাও ওকে ভালোবাসে, তবে এত ভাবাভাবির কিছু দেখছি না। এক কাজ করুন বিয়ে ঠিক করে ফেলুন, আমি আসছি। “
তেহরাব বেরিয়ে আসে, দরজার সামনে আসতেই তনয়াকে দেখে কপালে ভাজ পরে তেহরাবের।
“তুই এখানে?”
তনয়া হা করে দাঁড়িয়ে আছে, গোটা বিষয়াটা তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।
তনয়া হতভম্বের ন্যায় তেহরাবের মুখের দিকে তাকাল,
“ কি হলো এখানে? কিছুই তো বুঝতে পারছি না।”
তেহরাব তনয়া হাত ধরে রুমে চলে আসে, তানহা ঘরে নেই। তেহরাব দরজা বন্ধ করে বিছানায় এসে বসল, শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে তনয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“গরম প্রচুর, ফ্যান ছাড়।”
তনয়া কথা মতো ফ্যানের সুইচ টিপে এসে বসে তেহরাবের পাশে, এখনো সে অবাক হয়ে সব জানার জন্য তাকিয়ে আছে তেহরাবের দিকে।
তেহরাব ধপ করে শুয়ে পরল, সাথে তনয়াকেও টেনে নিল বুকের উপর।
“ভালো লাগছে না, চল বাড়ি চলে যাই।”
“,আসলামই কিছুক্ষণ আগে, এখুনি শুরু হয়ে গেল? এসব বাদ দেন, বলুন তো বসার ঘরে কি নিয়ে কথা হলো?”
তেহরাব কিঞ্চিৎ বিরক্তি নিয়ে বলল,
“তানহার বিয়ের বিষয়ে কথা হচ্ছিল, একটা ভালো সম্মন্ধ এসেছে। তবে তার আগেই শিহাব বলল সে নাকি তানহাকে বিয়ে করবে, তানহা নাকি তাকে ভালোবাসে৷ ব্লা ব্লা ব্লা……
“সে জানল কি করে তানহা তাকে ভালোবাসে?”
“সেটা বলেনি, জেনেছে কোনো ভাবে। যাইহোক আমার কি, যার যার বিষয়। এবার চল বাড়ি যাই।”
তনয়া মনে মনে অনেক খুশি হলো, যাক তানহার মনে আশা পূর্ণ হবে তবে। তবে তেহরাবের শেষ কথাটা শুনে ভ্রু কুঁচকে নিল সে।
“এক সপ্তাহের আগে নড়ছি না, আপনার ইচ্ছে হলে চলে যান।”
তেহরাব কিছুটা সিরিয়াস ভঙ্গিতে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“সত্যি চলে যাব? আমাকে ছাড়া থাকতে ভালোই লাগে তাই না? আচ্ছা তবে চলে যাব।”
তনয়া কিছু না বলে পাশেই শুয়ে পরে, মাথাটা বড্ড যন্ত্রনা করছে তার। ঘুমও পাচ্ছে প্রচুর, তেহরাবের বাহুতে মাথা রেখে আলতো করে জড়িয়ে ধরল। তেহরাব মৃদু হেসে তনয়ার কপালে চুমু খেল,
“বিকেলেই চলে যেতে হবে, কালকে সকালে আবার ঢাকা যেতে হবে। অনেক কাজ আছে, বেশিদিন থাকিস না।”
তনয়া জবাব দিল না, ততক্ষণে মেয়েটা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। এমন সময় ফোন বেজে উঠল তেহরাবের, তনয়াকে ভালোভাবে শুইয়ে দিয়ে টেবিল থেকে ফোনটা হাতে নিল। ফাহিমের নাম্বার, কিছুটা অবাক হলো এসময় ফাহিমের কল পেয়ে।
কল রিসিভ করে কানে ধরল,
“হ্যাঁ হ্যালো বল।”
“কই আছিস তুই?”
“শশুড় বাড়ি, হঠাৎ কল দিলি যে। কিছু হয়েছে?”
ওপাশ থেকে ভেসে আসল ফাহিমের উচ্ছাস্বিত কন্ঠস্বর, তেহরাব কপাল কুঁচকায়।
“ভাই সুখবর আছে তোর জন্য। “
সুখবর! কি সু খবর?
“আব্বে কথা প্যাচাইস না, যা বলার স্পষ্ট বল।”
ফাহিম আনন্দিত কন্ঠে বলে উঠে,
“ ভাই মাহিম নিজে থেকে ওর দোষ শিকার করেছে, তাও আমার বাবার কাছে স্টেটমেন্ট দিয়েছে কি কি করেছিল সে। মাহিমকে খুঁজতে খুঁজতে মিজুও পুলিশ স্টেশন মে এসেছিল, বেচারাকেও ফাঁসিয়ে দিয়েছে। আনএক্সপেক্টেড কাহিনী ভাই, হঠাৎ কি থেকে কি হলো।”
তেহরাব নিজেও আশ্চর্য, সে কি সব ঠিক শুনছে?
“মাহিম মানসিক ভাবে সুস্থ, তাই ওর বলা স্টেটমেন্ট গুলোও সত্য আইনের চোখে। আর মিজুর বিরুদ্ধে মূল সাক্ষী মাহিম নিজেই, এবার আর কেউ আটকাতে পারবে না ভাই। অন্যায়ের শাস্তি পাবেই। আঙ্কেল তো এসব নিয়েই আজ ব্যস্ত, তোকে জানায়নি কারন সে ভেবেছিল এসব আবার নতুন কোনো চাল। কিন্তু এখন দেখে এসব কিছু কোনো চাল নয় বরং সত্যি। “
তেহরাব নিশ্চুপ, সত্যি বলতে কথা বের হচ্ছে না তার গলা দিয়ে। বড় বড় করে শ্বাস নিয়ে ঘুমন্ত তনয়ার দিকে তাকিয়ে রইল কিছু সময়, অতংপর ফাহিমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এখন কোথায় আছিস? আর মাহিম মিজু?”
“ওদের গ্রেফতার করা হয়েছে, ভুক্তভোগী সবকল পরিবার এখন এক জোট। মিজুর ছেলেকেউ গ্রেফতার করা হবে, সাংবাদিক এসে ভরে গেছে। আমি, আঙ্কেল সহ অনেকেই এখানেই আছি।”
তেহরাব চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস নেই,
হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৩৯
“আসছি আমি।”
আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কল কেটে দেয় তেহরাব, দ্রুত শার্ট প্যান্ট পরে বেরিয়ে যায় রুম থেকে। যাওয়ার আগে শফিককে শুধু বলে দরকারি কাজ পরেছে, এই বলেই বাইক নিয়ে বেরিয়ে যায় তেহরাব।
এসব কি সত্যি নতুন কোনো চাল? নাকি সপ্ন দেখছে? সত্যিই কি তবে অন্যায়ের শাস্তি পাবে তারা?
