দাহশয্যা পর্ব ৭৬
Raiha Zubair Ripti
ইয়াসমিন বেগম গরম ভাত আর সাথে পুঁটি মাছের তরকারি,লাউ শাক ভাজি আর বেগুন ভাজি দিয়ে প্লেট সাজিয়ে টেবিলে রাখলো। তারপর রুমে এসে বাতাসি কে খাবার ঘরে নিয়ে বসিয়ে বলল-
“ খেয়ে নাও মেয়ে। আসলে জানতাম না তো তোমরা আসবে। সেজন্য যা ছিলো সেসব নিয়েই আসলাম। তোমার অসুবিধে হবে না তো এসব খেতে? ”
বাতাসি চোখ বুলালো খাবারে। অনেক খাবার মনে হলো বাতাসির। এভাবে প্লেট সাজিয়ে এত আদর করে কেউ তাকে খেতে ডাকে নি কখনও।
ইয়াসমিন বেগম ইয়াসিন কেউ ডেকে নিলো। ইয়াসিন টেবিলের মাথায় বসলো চেয়ার টেনে। তারপর কোনো দিকে না তাকিয়ে খেতে বসলো। সাথে বলল-
“ তুমিও খেতে বসো মা। ”
ইয়াসমিন বেগম জানালেন সে খেয়েছে দুপুরে। এখন আর খাবে না। ইয়াসমিন বেগম জিজ্ঞেস করলো-
“ বউমার নাম কি রে? ”
“ যার নাম তাকেই জিজ্ঞেস করো। ”
বাতাসি আস্তে করে বলল-
“ ডাক নাম বাতাসি। আর ভালো না রূপা। ”
“ মাশা-আল্লাহ সুন্দর নাম। ”
ইয়াসিন ভ্রু কুঁচকালো। তবে কিছু বললো না। খাওয়া দাওয়া শেষ হতেই ইয়াসমিন বেগম বললেন –
“ বউমা কে নিয়ে পলাশবাড়ী যেতে হবে তোর খালার বাড়িতে। ”
ইয়াসিন পেছন ফিরে বলল-
“ খালার বাসায় ওকে নিয়ে যেতে হবে কেনো? ”
“ বাহ্ রে বোনের ছেলে আর ছেলের বউ দেখবে না? ”
“ আমি যেতে পারবো না। খালাকে এসে দেখে যেতে বলো। ”
“ কি কথাবার্তা এসব হু? সমস্যা কি তোর? ”
“ কিছু না। তুমি দেখতে চাইছো সেজন্য নিয়ে আসছি। বউ দেখানোর মতো না যে দেখাবো ঢ্যাং ঢ্যাং করে। ”
ইয়াসিন চলে গেলো বাহিরে। বাতাসি এঁটো থালা গুলো হাতে নিতেই ইয়াসমিন বেগম বলল-
“ আরে এগুলো নিচ্ছ কেনো? ”
“ ধুতে। ”
“ আমি আছি না? ”
“ আমি পারি এসব করতে। সমস্যা হবে না। ”
“ আমার সমস্যা হবে। আমার ছেলের বউ দিয়ে কাজ করাবে নাকি আমি? আমার হাত পা এখনও মজবুত। যখন ঘরে পড়ে যাব। তখন তো তোমাকেই কাজ করতে হবে। ”
বাতাসি বিরবির করে বলল- ততদিন আমি থাকবো তো? ”
“ কিছু বললে? ”
“ না। আমি নিয়ে আসি ধুয়ে? আপনি তো আমার মায়ের মতন। ”
“ মায়ের মতন? মা নই? ”
“ মা ডাকবো আপনাকে? রাগ করবেন না? ”
“ বোকা মেয়ে রাগ করবো কেনো? আমি তো তোমার মা’ই লাগি। ”
বাতাসি একটু বাচ্চাদের মতো আবদার করে বলল-
“ একটু জড়িয়ে ধরি আপনাকে? ”
ইয়াসমিন বেগম নিজেই জড়িয়ে ধরলে বাতাসি কে। তার কোনো মেয়ে নেই। ইয়াসিন হবার পরপরই স্বামী ছেড়ে চলে গেল। কত অপমান লাঞ্ছনা সইতে যে হয় একজন ডিভোর্সি মহিলা কে তা আর না বলাই ভালো। ইয়াসমিন বেগম জানে না ছেলের বিয়ে কিভাবে হয়েছে। তবে বাতাসি কে তার ভালোই লাগছে। কেনো লাগছে ভালো? ইয়াসমিন বেগমের সবাই কেই ভালো লাগে। বাতাসির জায়গায় আজ সুন্দরী হুরপরী বউ যদি হতো ছেলের, সেখানেও ইয়াসমিন বেগম এমন ব্যবহার টাই করতো। আর গায়ের রং আল্লহ প্রদত্ত দেওয়া। সেখানে আমরা মানুষ জাতি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলে স্বয়ং আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়।
বাতাসি কলপাড়ে গিয়ে থালাবাসন ধুয়ে আনলো। পাশের বাড়ি থেকে প্রতিবেশী রা এসেছে। শুনেছে ইয়াসিন নতুন বউ নিয়ে এসেছে। উঠানে দাঁড়িয়েই ইয়াসমিন বেগম কে ডেকে বলতে লাগলো-
“ কি গো ইয়াসমিন ইয়াসিন বলে বউ লইয়া আইছে? কই পুতের বউ দেখাইবা না আমাগো? আমরা যে বিনা নিমন্ত্রণে চইল্লা আইছি। ”
ইয়াসমিন বেগম ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো। বাতাসি প্লেট গুলো নিয়ে বেরিয়ে আসলো। প্রতিবেশী মহিলা দুটে বাতাসি কে দেখে বলল-
“ কে গো এই মাইয়া টা? বাড়িতে কাজের মাইয়া রাখছো নাকি? ইয়াসিন তো ভালোই রোজগার করে এখন। তোমার জন্য ভালোই হইছে। শরীর টাও তো তোমার ভালো না। ”
ইয়াসমিন বেগম ভ্রু কুঁচকালো।
“ কিসব বলো সাইমার মা? কাজের মাইয়া হতে যাবে ক্যান বাতাসি? আমার ইয়াসিনের বউ সে। ”
মহিলা দুটো বাতাসির পা থেকে মাথা অব্দি আপাদমস্তক দেখলো। তারপর হেঁসে কুটিকুটি হয়ে বলল-
“ মজা লও আমাগো লগে? এই মাইয়া আমাগো ইয়াসিনের বউ? ”
“ তোমাগোর লগে কি আমার মজার সম্পর্ক মাজহারের মা? ”
তাদের মুখের হাসি সরে গেল। আসলেই কি এই মেয়ে ইয়াসিনের বউ!
“ কি দেইখা বিয়ে করলো এই মাইয়ারে? তাবিজ টাবিজ করছিলো নাকি ইয়াসিন রে? ”
ইয়াসমিন বেগম বাতাসির দিকে তাকিয়ে বলল-
“ মা বাতাসি তুমি ঘরে যাও। আমি আসতাছি। ”
বাতাসি মাথা নেড়ে চলে গেলো। দাঁড়িয়ে পড়েছিল তাদের কথা শুনে। বাতাসি আর কি দোষ দিবে এদের? ছোট থেকে নিজের মা ই বলে এসেছে এসব। বাহিরের মানুষ তো আরো বলবে।
ইয়াসমিন বেগম তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ তোমাগো মুখে কি কিছু আটকায় না? তোমরা এমন কেনো? ”
“ আমরা কি করলাম ইয়াসমিন? এত সুন্দর একটা পোলা শেষ পর্যন্ত এমন মাইয়া বিয়া করলো! ”
“ কি আশ্চর্য কোথাও কি লেখা আছে যে সুন্দর ছেলে মেয়ে কালো ছেলে মেয়েদের বিয়ে করতে পারবো না? সুন্দর হয়ে লাভ কি? তোমরাও তো সুন্দর কিন্তু মন টা তো কয়লার থেকেও কালো। আমার ছেলে আমার ছেলের বউ আমাদের তো সমস্যা নাই। তোমাদের এত হাহুতাশ কেনো থাকবে? বউ দেখছো না? এখন আইতে পারো। মানুষজনকে কষ্ট দিতে তোমরা আবার উস্তাদ। ”
মহিলা দুটো মুখ কালো করে চলে গেলো। দেখবে এই সংসার কদিন টিকে। যেই না চেহারা নাম তার পেয়ারা।
সন্ধ্যার দিকে ইয়াসমিন বেগমের বোন ফোন দিলো। তার শ্বশুর বাড়ি পলাশবাড়ী । এই মুকুন্দপুর টা ইয়াসিনের নানার বাড়ি। নানা নানি মা-রা গেছে। এই ভিটায় আগে টিনের দুটো ঘর ছিলো। এই পাকা দালান সোলেমান করে দিয়েছে। মাঝেমধ্যে যখন সোলেমানের মন খুব বেশিই খারাপ থাকে তখন ইয়াসমিন বেগমের কাছে এসে দেখা করে যেত। মাঝেমধ্যে রাত থাকতো। কেনো যেন সোলেমান ইয়াসমিন বেগম কে খুব শ্রদ্ধা করে। পরিচয় খুব বেশি দিনের নয়। সাত কি আট বছরের।
ইয়াসিনের খালা পইপই করে বলে দিলো কাল যেন ইয়াসিন বউ নিয়ে আসে বাড়িতে। বাজার-সদাই করেছেন তিনি। না আসলে খুব রাগ করবেন। ইয়াসমিন বেগম বোন কে বলে দিলেন- তার ছেলের বউকে দেখার পর যেন তারা কেউ একটুও বিষন্নতা প্রকাশ না করে। যদি শুনেছে কেউ কিছু বলেছে তাহলে আর কখনও বোনের বাড়ি তিনি যাবেন না।
বোন বুঝলো না। বিষন্নতা প্রকাশ করবে কেনো তারা ইয়াসিনের বউ দেখে? তবে আশ্বস্ত করলো।
ইয়াসিন রাত আট টার দিকে ফিরলে আবার বলল কাল পলাশবাড়ী যেতে। তার খালা সব আয়োজন করেছে না গেলে রাগ কষ্ট দুটোই পাবে। অনেক বলাবলির পর ইয়াসিন রাজি হয়েছে।
এদিকে ইয়াসমিন বেগম বাতাসি কে শাড়ি পড়তে বলল। কিন্তু তার যে দু সেট থ্রিপিস ছাড়া আর কিছু নেই। সকাল হতেই ইয়াসিন কে কাছের বাজারে পাঠালো। দুটো শাড়ি কিনে আনার জন্য। ইয়াসমিন বেগমের যেগুলো আছে সেগুলো বয়স্কদের পড়ার মতে। ইয়াসিন লাল আর সাদা রঙের দুটো শাড়ি কিনে আনলো। ইয়াসমিন বেগম লাল শাড়িটা পড়িয়ে রেডি করলো বাতাসি কে। যেহেতু সে বয়স্ক মানুষ,সাজগোছ করে না। তাই তার সাজগোছের জিনিস ও নেই। বাতাসির চুল গুলো হাত খোপা করে মাথায় কাপড় দিয়ে দিলো। যাবে তো অটোতে। সমস্যা হবে না।
ইয়াসিন বের হবার সময় একটি বার তাকানোরও প্রয়োজন বোধ করলো না যে কেমন লাগছে শাড়িতে বাতাসি কে। কালো শরীরে লাল মানায়?
পাকা রাস্তায় এসে একটা খালি অটো দেখে সেটায় উঠে পড়লো।
অটোটা চলছে গোরিন্দগঞ্জ মহাসড়ক দিয়ে। বাতাসি ঘাড় ঝুঁকে দেখছে বাহির টা। অটোটা যখন করতোয়া ব্রিজের উপর দিয়ে যাচ্ছিল বাতাসি তখন আরেকটুখানি মাথা ঝুকাতেই ইয়াসিন জোরেসোরে একটা ধমক দিয়ে বসলো। রাগী গলায় বলল-
“ জীবনে ব্রিজ দেখো নি নাকি? এভাবে ঘাড় ঝুকিয়ে দেখার কি মানে? ”
বাতাসি মাথা সোজা করলো। মিনমিন করে বলল-
“ অনেক সুন্দর এটা। ”
ইয়াসিন আর কিছু বলে নি। পলাশবাড়ী এসে অটো টা থামতেই নেমে পড়ে। ভাড়া মিটিয়ে রাস্তার ধারের দোকান গুলো থেকে ফল মিষ্টি দই কিনে নিলো।
এক তালা বিশিষ্ট বাড়ি। চারিপাশে ওয়াল করা আর উপরে টিনের চাল। ইয়াসিন বাড়িতে পা রাখতেই রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসলো ইয়াসিনের খালা। দেখেছে রান্নাঘরের জানালা দিয়ে। ইয়াসিনের হাতে ফলমূল দেখে কপট রাগ করলো। সে কি দূরের আত্মীয় নাকি যে এসব আনতে হবে? মাথা শরীর হাতিয়ে আদর করলো। পাশে তাকাতেই অপরিচিত মেয়েকে দেখে ভ্রু কুঁচকালো। নজরে আসলো গায়ের রং। এই মেয়ে টা কে? ইয়াসিনের বউ? ধূর ইয়াসিন কি এমন মেয়ে বিয়ে করবে নাকি? কিন্তু আপা তো বলেছিল তার ছেলের বউ দেখে যেন বিষন্নতা প্রকাশ না করে। খালা আস্তে করে জিজ্ঞেস করলো-
“ ওটা তোর বউ? ”
এই এক শব্দ বউ বউ। কানটা ঝালাপালা করে দিচ্ছে ইয়াসিনের। কিসের বউ? মানে না তো এই বিয়ে। বাতাসি একটা বোঝা ইয়াসিনের কাছে। এই বোঝার ভার অনেক। ইয়াসিন পারবে না সামলাতে।
খালা বাতাসির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেঁসে রুমে নিয়ে গেলো। মাথায় কত প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এমন মেয়ে কেনো বিয়ে করলো?
ইয়াসিনের খালা তার স্বামী শাশুড়ী কে গিয়ে বলল বাতাসির বিষয়। তারা যেন ওর সামনে মুখের উপর কিছু না বলে। কিন্তু খালার শাশুড়ী একটু পাঁজি। খেতে বসার সময় বাতাসি আর ইয়াসিনের মুখের উপর ই বলে বসলো-
“ এমন মাইয়া কেউ বিয়ে করে ইয়াসিন? এরচেয়ে আমার নাতনি ডা কত সুন্দর। তারেই করতা বিয়া। দেখলেই তো কেমন ভয় করে। রাতের অন্ধকারে মনে হয় চেহারা টাও অন্ধকারে তলায় যায়। ভয় পাও না রাইতে হুট করে দেইখা?
ইয়াসিনের খাওয়া তখনই থেমে যায়। এদিকে বাতাসি একটু একটু করে খাবার মুখে দিচ্ছে। ইয়াসিনের চোখ মুখ শক্ত দেখে খালা এসে শাশুড়ী কে থামালো। কতবার করে বলল না বলতে তারপরও বলে দিলো! ইয়াসিন আর খাবার খেলো না। ভাতের ভেতরই হাত ধুয়ে বসা থেকে উঠে বাতাসির দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল-
“ তুমি খাবার ছেড়ে উঠবে নাকি তোমাকে রেখেই আমি একা চলে যাব? ”
খালা চমকালো ইয়াসিন চলে যাবে শুনে। যাওয়া আটকাতে চাইলে ইয়াসিন হাত উঁচু করে বলল-
“ আটকিয়ে লাভ নেই। আমি থাকবো না। আম্মা বলছিল আসতে এসেছি। দেখা শেষ অপমান করা শেষ এখন চলে যাচ্ছি। ”
বাতাসি হাত ধুলো। ইয়াসিন টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। এ তো কেবল শুরু অপমান ইয়াসিনের। এই মেয়েকে সাথে রাখলে প্রতিনিয়ত মানুষের কথা শুনতে হবে।
বাড়ি ফিরে মায়ের সাথে একদফা ঝগড়া বাঁধিয়ে দিলো ইয়াসিন। ইয়াসমিন বেগম বোনের শাশুড়ির উপর বেশ রাগ করলো। বয়স্ক মানুষ এমন হবে কেনো? আর ইয়াসিন কেও প্রশ্ন করলো জানে এমন কথা শুনতে হবে তাহলে জেনেও বিয়ে করার পর এমন করার মানে কি?
ইয়াসিন মাকে সব খুলে বলল। কিভাবে বিয়ে হয়েছে সব। সবটা শুনে ইয়াসমিন বেগম কি বলবে বুঝতে পারলো না। বেশি খারাপ লাগলো বাতাসির জন্য। ভাইটা মা-রা গেল। আর মা টাও এমন জঘন্য ছিঃ!
ইয়াসিন সব বলার পরও মায়ের বাতাসির প্রতি টান দেখে আরো রেগে গেলো। কি আশ্চর্য তার ছেলের যে এত বড় সর্বনাশ করলো সেটা নিয়ে খারাপ লাগছে না? তার খারাপ লাগছে বাতাসির জন্য! থাকবে না ইয়াসিন। সকাল হলেই চলে যাবে।
যেই ভাবা সেই কাজ। দরজা লাগিয়ে দিলো রাতে ভেতর থেকে। বাতাসি রাতে ঘুমাবে কোথায় এখন? ইয়াসমিন বেগম ছেলেকে বকতে বকতে বাতাসি কে নিজের সাথে নিয়ে গেল রুমে।
মেয়েটার কি দোষ এখানে? ও নিজেও তো পরিস্থিতির স্বীকার। ইয়াসমিন বেগম বাতাসির মাথায় হাত বুলালো। তার পরিবারের সম্পর্কে সব জানার চেষ্টা করলো। যা বুঝলো শুনে মেয়েটা ছোট বেলা থেকেই অবহেলিত গায়ের রঙের জন্য। একটা ভাই ছিলো সেটাও অকালে নির্মম ভাবে মা-রা গেল। এখন এই মেয়েটার তারা ছাড়া তো কেউ নাই। এখন সেও যদি মেয়েটাকে দূরছাই করে তাহলে মেয়েটা যাবে কার কাছে?
বাতাসির আজকের রাতের ঘুমটা মনে হলো জীবনের শ্রেষ্ঠতম একটা ঘুম। কেমন মা মা গন্ধ পেয়েছে আজ। শীতে কেঁপে উঠলে ইয়াসমিন বেগম আগলে নিয়েছে বাহুতে। বাতাসি এই ইয়াসমিন বেগমের কাছে সারাজীবন থাকতে চায়।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই ইয়াসিন রেডি হয়ে নেয়। সে ঢাকায় ফিরেই বাতাসি কে ডিভোর্স দিয়ে দিবে। সে কি মানবতার দোকান খুলে বসে আছে? তার নিজের পছন্দ নেই? যেভাবে ঘাড়ে ঝুলিয়ে দিয়েছে সেভাবেই ঘাড় থেকে নামাবে।
গলা ছেড়ে বাতাসির উদ্দেশ্যে বলল রেডি হতে। বাতাসি রেডি হলো না। ইয়াসিন ব্যাগ টেনে বাহিরে এসে বাতাসি কে রেডি অবস্থায় না দেখে রেগে গেলো। কানে কি ময়লা জমেছে? শুনেনি ইয়াসিনের কথা সে?
ইয়াসিন দাঁত চেপে বলল-
“ রেডি হও নি কেনো? আমি বলি নি রেডি হতে? ”
বাতাসি মাথা নত করে বলল-
“ আম্মা রেডি হতে দেয় নি। ”
“ কেনো দেয় নি? আম্মা, আম্মা, তুমি বাতাসি কে রেডি হতে নিষেধ করছো কেনো? ”
ইয়াসমিন বেগম গোয়ালঘর থেকে বেরিয়ে আসলো।
“ তুই ওরে ডিভোর্স দিয়া দিবি নিয়া? ”
“ হ। আমি রাখবো না ওরে। ”
“ সোলেমান রে বইলা দিব আমি? ”
“ ভাইয়ের ভয় দেখাচ্ছ আমারে? ”
“ সোলেমান কইছে তোর লগে বাতাসি রে না পাঠাইতে। তুই একলা চলে যা। আমার পুতের বউ আমি দেখে রাখবো যা তুই। বাতাসি রুমে আসো তুমি। ইয়াসিন যাক গা। ”
ইয়াসিন কড়া চোখে তাকালো। বাতাসি নরম গলায় বলল-
“ আমি কয়টা দিন আপনার আম্মার সাথে থাকি?গুনে গুনে সাতটা দিন,সাতটা দিন থাকি? আপনার আম্মা না অনেক ভালো। আমাকে অনেক আদর করে। এমন আদর আমি জীবনেও আমার আম্মার কাছ থেকে পাই নাই। আমার গায়ে রং কালো দেখেও আপনার মতো আপনার আম্মা আমায় অবজ্ঞা অবহেলা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে নাই। আমি থাকি না কয়টা দিন আপনার আম্মার সাথে? আমি বাড়ির সব কাজ করে দিব। আপনার আম্মাকে একটা কাজ ও করতে দিব না। কয়দিন পর তো তালাক দিয়েই দিবেন। তখন তো আর আপনার আম্মার কাছে আসতে পারমু না। আপনার আম্মাকে আমার অনেক মনে পড়বে জানেন? এই কয়দিন অনেক ভালোবাসা পাইছি তো সেজন্য।
ইয়াসিন ব্যাগ নিয়ে বলল-
“ থাকো তাহলে, এক সপ্তাহ পর ফিরে এসে তোমায় আমি তালাক দিয়ে দিব। এতে সোলেমান ভাই আমাকে মে’রে ফেললে মেরে ফেলুক আর কে’টে ফেললে কে’টে ফেলুক। তোমার সাথে সংসার করা সম্ভব না আমার পক্ষে। তুমি বাচ্চা মেয়ে বড় হও ভালো স্বামী পাবে। আমি তোমার জন্য স্বামী হিসেবে ভালো না,খুব খারাপ বুঝেছো?”
বাতাসি মাথা নেড়ে বলল-
“ জ্বি বুঝছি। ”
ইয়াসিন ডানে বায়ে আর না তাকিয়ে চলে গেল। বাতাসি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে তার যাওয়া দেখলো।
আজ তুমুলঝগড়া হয়েছে মাহির সাথে এজওয়ানের। অফিসে রীতিমত চুলোচুলি হয়েছে। চুলোচুলির কারন অ্যাকাউন্ট ডিপার্টমেন্ট আজ টাকার গণ্ডগোল হয়েছে। যেহেতু মাহিকে অ্যাকাউন্ট ডিপার্টমেন্ট দেওয়া হয়েছে সেহেতু তার এসব পাই টু পাই হিসাব রাখতে হবে। মাহি খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো টাকা গুলো এজওয়ান নিয়েছে। দু এক লাখ টাকা না পুরো ১ কোটি টাকা সরানো হয়েছে। এত টাকা দিয়ে এজওয়ান কি করলো? সেটা জানতেই এজওয়ানের কেবিনে আসে মাহি। আর দেখে বাবু মশাই টেবিলের উপরে দু পা উঠিয়ে মুরগির রান খাচ্ছে। মাহি সোজা ফাইল টা শব্দ করে টেবিলে রেখে বলল-
“ এত গুলো টাকা দিয়ে কি করছেন আপনি? ”
এজওয়ান রানের হাড্ডি টা ফেলে দিতে গিয়েও ফেললো না। বরং চিবাতে চিবাতে বলল-
“ মিসেস মাহি সুলতান, এটা কোন ধরনের অভদ্রতা? বসের কেবিনে আসেন নক না করেই? আবার বসকেই জিজ্ঞেস করছেন সে টাকা নিয়ে কি করেছে! ভেরি ব্যাড ম্যানার্স। যান বাহিরে গিয়ে নক করে পারমিশন নিয়ে তারপর ঢুকুন। এত শিক্ষিত মানুষ অথচ ম্যানার্স জানা নেই!
মাহি কিড়মিড় করতে লাগলো। তার ভুল হয়েছে জব নেওয়া। এই এজওয়ান তাকে উঠতে বসতে অফিসে অপমান করে। বাড়িতে তো পারে না। অফিসে তার শোধ নেয়। মাহি গেলো না বাহিরে। টেবিলে দু হাত ঠেকিয়ে ভর দিয়ে হাল্কা ঝুঁকে বলল-
“ বাড়িতে ফিরবেন না আজ? ঘরে আসবেন না? ”
“ না যাব না। বাড়ি গিয়ে কি করবো আমি? বাড়িতে কে আছে আমার? যে ঘরে বউ মাঝখানে কোলবালিশ দিয়ে ঘুমায়। সেই ঘরে ঢুকতে আমার ঘেন্না করে। ”
“ টাকার হিসাব দিন। আপনার ভাইজানের কাছে জবাবদিহিতা করতে পারবো না আমি। তাও আবার আপনাকে নিয়ে তো নয়ই। ”
“ ক্ষুধা লাগছিল তাই খেয়ে ফেলছি। এই যে খাচ্ছি। খাবে তুমি? ”
“ ১ কোটি টাকা আপনি ক্ষুধা মিটাতে নিয়েছেন? মশকরা করছেন? ”
“ হু আর ইউ? মশকরা করার মতো সম্পর্ক আমার তোমার সাথে? ”
“ মাথা গরম করাবেন না এজওয়ান। ”
“ এই ছ্যেমড়ি স্যার ডাক। কিসের এজওয়ান? সিনিয়র না আমি? গিভ মি সম্মান। ”
“ ইউ ডিজার্ভ অলওয়েজ অসম্মান। ”
“ নো আই ডিজার্ভ অলওয়েজ তরিকুলের বেটির ভালোবাসা। ”
“ গু খা শালা। তোর চাকরির কপালে জুতা। তুই বাড়ি আয় আজকে। ”
“ শালি ভয় দেখাস? ”
“ হ দেখাচ্ছি। ”
“ আমি তো ভয় পেয়ে প্যান্ট ভিজিয়ে ফেললাম বোধহয়। ”
কথাটা শেষ করে এজওয়ান রানের হাড় মাহির দিকে ছুঁড়ে মারলো। মাহি ভয়ঙ্কর রেগে গেলো। এজওয়ান কিছু বোঝার আগেই এজওয়ানের চুল মুঠোয় নি জোরে টেনে ধরলো। এজওয়ান ও কম না। বা হাত দিয়ে মাহির চুল টেনে বলল-
“ তরিকুলের বেটি আমার বা’ল ধরে টানাটানি করছিস কেনো? বা’ল ছাড়। ”
কি অবস্থা! চুল কে এমন বিশ্রী ভাষায় ডাকতে হবে কেনো? আর এজওয়ান নিজেও তো মাহির চুল টেনে ধরছে। মাহি এজওয়ান চুল সহ মাথা ঝাঁকিয়ে বলল –
“ আমার চুল ছাড় তুই। ”
এজওয়ান ছেড়ে দিলো। মাহি জোরে করে টেনে তারপর ছেড়ে দিলো। এজওয়ান ব্যথায় চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো। মাহির হাতে নিজের কিছু উঠে আসা চুল দেখে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বলে উঠলো-
“ দেখছো নি কারবার! আমার চুল টাইন্না ছিঁড়া ফেলছে। শালি ফাজিলের আছাড়ি। মনডায় চাইতাছে তুইল্লা আছাড় মারি। ”
মাহি যেতে যেতে বলে গেল-
“ বাসায় আসেন আজকে। সারা রাত যদি আপনাকে আমি বাহিরে দাঁড় করায় না রাখছি তো তাইলে আপনার নাম ছাগল।
মাহি চলে গেল। এজওয়ান আয়নায় নিজেকে দেখলো। ছি ছি ছিঃ তার মতো এমন ভদ্র জেন্টলম্যান এভাবে বউয়ের হাতে অত্যাচারীত হলো! লজ্জা কি লজ্জা! এজওয়ান চুলো গুলো হাত দিয়ে ঠিক করে বাকি চিকেন গুলো খেতে লাগলো। ফিরবে না বাসায় আজ। খাওয়া শেষে বাহাদুরের ফোন আসলো। তার আজ কে বারে যেতে ইচ্ছে করছে। অনেক দিন হলো প্রানপ্রিয় বন্ধুর সাথে সময় কাটানো হয় না। কি অভিযোগ বাবাগো। মনে হয় এজওয়ান তার গার্লফ্রেন্ড আর এজওয়ান তাকে ছেড়ে আরেকটা বয়ফ্রেন্ড জুটিয়েছে বলে বাহাদুরের অভিমান হয়েছে। এজওয়ান দুটো বকা দিয়ে বলল-
“ লেসবিয়ানের মতো কার্যকলাপ তোর। আইতাছি তর জ্বালা মিটাইতে। শা’লা বিয়া না কইরা বিয়াইত্তা বন্ধুরে জ্বালাও? ”
এজওয়ান গুলশানের একটা বারে আসলো। বারটায় এ নিয়ে বেশ অনেকবারই আসলো। পরিচিত হয়ে গেছে লোকজন। বাহাদুর আর এজওয়ান আসতেই তাদের আর চাইতে হলো না ওয়াইন। স্টাফ এসেই দিয়ে গেলো। এজওয়ান টুলের উপর বসে খেতে শুরু করলো। এজওয়ান খাচ্ছে আর বাহাদুর দাঁড়িয়ে বারের মেয়েদের নাচ দেখছে। পোশাক আশাক জঘন্য একদম। একটা মেয়ে এগিয়ে আসলো ওয়াইন নিতে। বোতল নিয়ে ফিরতি যেতে চোখ আটকে গেলো এজওয়ানের দিকে। স্যুটবুট গলায় টাই পরিহিত সুপুরুষ লাগলো বটে। মেয়েটা এগিয়ে গিয়ে হাত নাড়িয়ে বলল –
“ হাই। ”
এজওয়ান না তাকিয়েই হাত উঁচু করে বলল-
“ বাই। ”
মেয়েটা ঝুঁকে বলল-
“ আই স্যে হাই। ”
এজওয়ান বা হাত দিয়ে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে বলল-
“ আই স্যে বাই। ”
“ হোয়াটস ইউর নেম? ”
“ Aj ”
“ Aj মিনস? ”
“ এজওয়ান সুলতান। ”
“ মিস্টার এজওয়ান সুলতান ডু ইউ লাইক সে*ক্স উইথ মি?
“ নো থ্যাংকস। ”
“ হোয়াই? ”
“ বিকজ দিস মাদারফা*কিং ব্লা’ডি সে*ক্স অলওয়েজ ফা*ক মি। ”
“ ট্রাই করে তো দেখো আমার সাথে। ”
“ আই হেট ডুইং ইট উইথ এনি গার্লস। ”
“ হোয়াই?”
“ আই হ্যাভ অ্যা তরিকুলের বেটি। এন্ড আই ওনলি লাভ ইট উইথ মাই তরিকুলের বেটি..সো ইউ গো টু হেল ১২ ব্যাটারি গার্ল। ”
“ হোয়াট মিনস ১২ ব্যাটারি গার্ল? ”
“ বাহাদুর খালাম্মা কে একটু বলে দে তো ১২ ব্যাটারি মানে কি। ”
মেয়েটা রীতিমতো রেগে গেল। খালাম্মা ডাকছে! তাও তার মতো এত সুন্দর মেয়েকে!
বাহাদুর মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল-
“ ১২ ব্যাটারি মানে একটা ব্যাটারি দিয়ে ১২ টা গাড়ি চার্জ দেওয়া কে বলে। ”
মেয়েটা এজওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ নিজেকে কি মনে করো কি তুমি? ”
এজওয়ান বোতলে চুমুক দিয়ে বলল-
“ অবশ্যই একজন হ্যান্ডসাম ড্যাশিং কোটিপতি ভদ্র আলাভোলা কিউট কিডস। ”
“ এত ভদ্র তাহলে বারে কি তোমাদের। ”
“ অবশ্যই তোমার ইয়েটা দেখতে আসি নি। ”
“ দেখলে তোমারই লাভ হতো। ”
মেয়েটা কথাটা বলতে বলতে এজওয়ানের বাহুতে হাত রাখলে এজওয়ান ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়ে বলল-
“ মা’গি সর। গায়ে হাত দিবি না একদম। হাগু করে মনে হয় হাত পরিষ্কার করস না। দুর্গন্ধ তোকে দিয়ে। যা লাক্স সাবান দিয়ে গোসল কর গিয়ে। বা’লের বার। আসলেই বা’লের মাইয়ারা গায়ের উপরে এসে পড়ে। জুতা খুইল্লা পিটাইতে ইচ্ছে করে তগো মা’গিরা। এতই যখন শরীরের জ্বালা তগো পতিতালয় যাইতে পারস না? তগে ধইরা ধইরা সেখানে বেইচা দেওয়া উচিত। দাড়া তগো লাইগা একটা ব্যবসা খুলতে হইবো আমার। চুলের মুঠি ধইরা থাবরানি মা’রার লাইগা। এ বাইদ্দার ঘরে বাইদ্দা বাহাদুর আমি গেলাম। ”
এজওয়ান হাঁটা ধরলো ওয়াইনের বোতল হাতে নিয়ে। বাহিরে এসে বাইকে উঠে বসলো। বাহাদুর এসে পেছনে বসলো। এজওয়ান বাইক চালাচ্ছে। বাহাদুর জিজ্ঞেস করলো-
“ কই যাবি এখন? ”
“ ক্যান বাড়ি। ”
“ তুই যে কইলি তোর বউ বাড়ি গেলে তোরে মুরগির মতন টেনে ছিঁড়বো? ”
এজওয়ানের মনে পড়লো মাহির কথা। আসলেই তো। মাহি তো বলছে আজ বাড়ি ফিরলে খবর আছে। না বাড়ি ফেরা যাবে না।
“ আজকে তোর ভাবি আমারে মারছে। আমারে নির্যাতন করে প্রতিনিয়ত। আমি পুরুষ নির্যাতনের স্বীকার। তোর ভাবির নামে মামলা করতে চাই। এই অত্যাচার আর মেনে নেওয়া যায় না। ”
“ কিন্তু পুরুষ নির্যাতনের তো কোনো মামলা নাই বাংলাদেশে। ”
“ তাহলে কি বউয়ের হাতে অকালে প্রাণ দিয়ে মরবে পৃথিবীতে সবচেয়ে কিউট ভদ্র ছেলে এজওয়ান? ”
“ খেতে চেয়েছো মাছ। জলে যে কুমির থাকে জানো না? এখন মাছের সাথে সাথে কুমিরের কামড় ও খাও। স্বাস্থ্য ভালো হবে। ”
“ তোর নানির হে** হবে। ”
এজওয়ান বামের রাস্তা রেখে ডানের রাস্তা ধরলো। সামনেই একটা বিয়ে বাড়ি। সেখানে গান বাজনা হচ্ছে। ভোজপুরির গান বাজছে। এজওয়ান সেই বিয়ে বাড়ির সামনে বাইক থামালো। বাহাদুর আকস্মিক বিয়ে বাড়ির গেটের সামনে বাইক থামাতে দেখে জিজ্ঞেস করলো-
“ এখানে থামলি কেনো? ”
রাত বাজে এখন ১ টার বেশি। এজওয়ান বাইক থেকে নেমে বলল-
“ আমার নাচতে ইচ্ছে করছে ওদের সাথে। আমি নাচবো। ”
এজওয়ান ওয়াইনের বোতলে চুমুক দিয়ে রাস্তার মাঝে নাচতে থাকা বিয়ে বাড়ির ছেলেপেলের সাথে এজওয়ান ও নাচা শুরু করলো।
এদিকে অফিস সেই কখন ছুটি হয়ে গেছে। বাশার সুলতান দেশে ফিরেছে। সেদিন অল্পের জন্য বেঁচে গেছে। কি জন্য যে পুরোনো গাড়ি নিয়ে বের হয়েছিল। ছেলে ফিরছে না দেখে টেনশন হচ্ছে। মাহিকে জিজ্ঞেস করলো-
“ এজওয়ান আসছে না কেনো? অফিস না ১০ টার দিকে ছুটি হয়ে গেছে? ”
মাহি তো আর মুখের উপরে বলতে পারতেছে না যে ঝগড়া হয়েছে। সেজন্য বলল-
“ আমাকে বলেনি আপনার ছেলে কোথায় গেছে। ”
“ ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করো। ”
মাহি নিজের ফোনটা দিয়ে এজওয়ান কে ফোন দিলো। ফোন বাজছে। লাউডস্পিকারে দেওয়া। একবার কেটে গিয়ে দ্বিতীয় বার রিসিভ হলো। মাহি জিজ্ঞেস করলো-
“ কোথায় আপনি? ”
এজওয়ান নাচতে নাচতে বলল-
“ কার জানি বিয়ে হচ্ছে। ভোজপুরি গান শুনে নিজেকে আর কন্ট্রোল করতে পারি নি তরিকুলের বেটি। এখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে নাচতেছি। ”
“ বাড়ি ফিরবেন কখন? ”
এজওয়ান নিশ্চুপ। কথা আসতেছে না ওপাশ থেকে। মাহি হ্যালো হ্যালো করতেছে। কি আশ্চর্য চুপ করে আছে কেনো? আবার ঘেউঘেউ শব্দও শোনা যাচ্ছে। হচ্ছে টা কি?
“ কি হলো কি? আসবেন কখন বাসায়? ”
নাচতে নাচতে এজওয়ান বারবার একটা খাবার খেতে থাকা কুকুরের শরীর ঘেঁষে চলে যাচ্ছিলো। এবার শুধু শরীর ঘেঁষা অব্দি থাকলো না। লেজে পাড়া দিয়ে ফেললো। কুকুর টা এই এজওয়ানের উপর আগে থেকেই রেগে ছিলো। বারবার গায়ের উপরে এসে পড়ছিলো বলে। এবার লেজে পাড়া দেওয়ায় আর ঠিক থাকতে পারলো না। তার মনে হলে এই পাগলা মার্কা মানুষ টা তার চরম শত্রু। তার খাবার গুলো খেয়ে ফেলবে। একে শায়েস্তা না করলেই নয়। তাই এঁটো খাবার খাওয়া বাদ দিয়ে তার গলার সর্বোচ্চ জোর দিয়ে শব্দ করতে করতে এজওয়ানের দিকে তেড়ে যেতে লাগলো। এজওয়ান তখনও নাচে মশগুল। যখন বাহাদুর দেখলো কুত্তাটা দৌড় দিয়ে হিরো দের মতো এজওয়ানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। ঠিক সেই মুহূর্তে বাহাদুর তার বা পা দিয়ে এজওয়ান কে লাত্থি দিয়ে সরিয়ে দিলো । এজওয়ান আকস্মিক লাত্থি খেয়ে টাল সামলাতে না পেরে রাস্তার কাদায় পড়ে গেল। রাগে শরীর কাপছে। বাহাদুরের বাচ্চার এত বড় সাহস! এজওয়ান কে লা’ত্থি মেরে কাদায় ফেলে দিলো।
কুকুর টা বাহাদুরের এমন কাজে আরে রেগে গেল। তার হিরো গিরি কে অপমান করলো এরা! এই অপমান কুকুর মেনে নিবে না। লাগা দৌড় এই বজ্জাত বেডাদের পেছন।
এজওয়ান পেছন ফিরে কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাবে এমন সময় কুত্তার দৌড় দেখে বুঝলো এজওয়ান কিছু তো একটা ঘটেছে। কিন্তু কি ঘটলো? কোনো রকমে উঠে উড়াধোরা দৌড় শুরু করলো বাইকের দিকে। পেছন পেছন বাহাদুর ও। এজওয়ান দৌড়াতে দৌড়াতে বাহাদুর কে বলছে-
“ গোলামের পুত বেঁচে ফিরি শুধু। আমারে লা’ত্থি দিয়ে কাদায় ফেলছিস না? তোর টুনটুনি কেটে পার্টি করবো আমি। ”
দাহশয্যা পর্ব ৭৫
কি আশ্চর্য বন্ধুর ভালো করতে গিয়ে এখন নিজের টুনটুনি নিয়ে টানাটানি করা লাগবে বাহাদুরের!
এদিকে মাহি হ্যালো হ্যালো করেই যাচ্ছে। এজওয়ান ব্লুটুথে বা হাত ঠেকিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে বলল-
“ শালি ফোন রাখ। কুত্তায় দৌড়ানি দিছে। বেঁচে ফিরলে তোরেও আমি দেখে নিব শালি।
