Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৭৫

দাহশয্যা পর্ব ৭৫

দাহশয্যা পর্ব ৭৫
Raiha Zubair Ripti

সন্ধ্যার সময়,,যখন এখানে ওখানে উড়ে বেড়া পাখি গুলো তাদের নীড়ে ফিরতে ব্যস্ত ঠিক সেই সময় ইয়াসিন হুড়মুড়িয়ে বাড়িতে ঢুকলো। বাতাসি সেই যে সকালে খাবার খেয়েছিল আর খায় নি কিছু সারাদিন। খাবে কি? বাড়িতে তো খাবার নেই। চাল-ডাল লবনও নেই।
গেট খোলার শব্দ শুনে রুম থেকে বের হলো বাতাসি। দেখলো ইয়াসিনের হাতে খাবারের প্যাকেট। পেটের ক্ষুধা ভাবটা যেন তড়তড় করে বাড়তে লাগলো।
ইয়াসিন বিরক্তিকর মুখ নিয়ে খাবার গুলো শব্দ করে টেবিলে রাখলো।
সোলেমান ভাই আজ রীতিমত ধামকিয়েছে এই মেয়ের জন্য। খাবার কিনে কড়া গলায় বলেছে-

“ বউকে ভালোবাসতে না পারিস অসম্মান করেছিস শুনলে জানে মে’রে ফেলবো বলে রাখছি। বাজার-সদাই করবি। খাওয়া পড়ার কষ্ট যেন ওর না হয়। খালাম্মা দেখতে চেয়েছে তার ছেলের বউ। সকালের টিকিটে সোজা দিনাজপুর চলে যাবি। ক’টা দিন থেকে দ্যান ঢাকায় আসবি। ”
ইয়াসিন তার মুখের উপরে কথা বলতে পারে না। বললে নিশ্চিত সোলেমান আজ ইয়াসিনের গালে তার শক্ত লোহার মতো হাতটা দিয়ে কষে কয়েকটা চড় বসাতো। তাই ইয়াসিন চুপচাপ শুনে গেছে।
বাতাসির দিকে ইয়াসিন তাকিয়ে বলল-
“ খেয়ে উদ্ধার করো আমাকে। আমার জীবনে এসেছো তো আমাকে জ্বালাতে। ”
আকস্মিক এমন রেগে কথা বলার কোনো কারন খুঁজে পেলো না বাতাসি। সে কি কিছু করেছে? করে থাকলে একটু বলে দিক। বাতাসি সেটা আর দ্বিতীয় বার করবে না।
ইয়াসিন বাতাসিকে নড়তে চড়তে না দেখে ফের বলল-

“ কিছু বলেছি তো। খাচ্ছো না কেনো? খাও। ”
এই খাবার কি বাতাসির গলা দিয়ে নামবে? এত তুচ্ছতাচ্ছিল্য খাবার নিয়ে! এখনও তো তেল সাবান জামাকাপড়ই দেয় নি। ওগুলো দেওয়ার সময় তাহলে কেমন ব্যবহার করবে ইয়াসিন?
বাতাসি মাথা নত করে বলল-
“ আমার ক্ষুধা নাই। ”
ইয়াসিনের কপালে সেই আগের মতোই বিরক্তের ছাপ।
“ সারাদিন কিছু খাইছিলা? খাও নাই তো। তাইলে ক্ষুধা নাই মানে? ”
“ আপনার কথায় আমার পেট ভরে গেছে। ”
ইয়াসিন প্লেটে খাবার বাড়লো। তারপর বাতাসির ডান বাহু ধরে টেনে চেয়ারে বসিয়ে বলল-
“ চুপচাপ খেয়ে নাও তো। তোমার কেউ আছে এই পৃথিবীতে? যে না খেয়ে থাকলে খাবার এনে মুখে তুলে দিবে? ”
“ আমার আপনি ছাড়া কেউ নাই। ”
ইয়াসিন একবার তাকালো বাতাসির মুখের দিকে। বাতাসি তখন মাথা নিচু করে রেখেছিল। ইয়াসিন প্লেট টা এগিয়ে দিয়ে বলল-

“ খেয়ে নাও। আমার কাছে বেশি কিছুর আশা করো না। তোমাকে আমার পছন্দ না বউ হিসেবে। উকিলের সাথে কথা বলবো শীগ্রই। চিন্তা করো না। টাকা দিয়ে দিব। তোমার অসুবিধা হবে না আর। ”
বাতাসি হাতে হাত কচলিয়ে বলল-
“ উকিলের সাথে কিসের জন্য কথা বলবেন? ”
ইয়াসিন সোজাসাপটা বলে দিলো-
“ ডিভোর্স দিয়ে দিব তোমায়। ”
বাতাসি বোধহয় নিঃশ্বাস ফেলতে ভুলে গেলো। কি ভয়ংকর কথা, ডিভোর্স দিয়ে দিবে! এতো অনিহা কেনো সবার বাতাসি কে নিয়ে। বাতাসির তো ইয়াসিন ছাড়া কেউ নাই। ইয়াসিন সেটা জেনেও এভাবে বলে দিল এই কথা! গায়ের রং নিয়ে তো সবসময়ই বাতাসি আল্লাহ কে দোষারোপ করতো। আজ সেই সাথে আরো একটা যোগ হলো। এখন তার এই দুর্ভাগ্য নিয়েও সে আল্লাহ কে দোষারোপ করবে। আল্লাহ ইচ্ছে করেই বাতাসি কে দুঃখ দেয়। শুধু দুঃখ হলে মানা যেত। এই দুঃখ বাতাসির পাঁজরের হাড়ে গিয়ে লাগে। বাতাসির দুই চোখ জলে ভিজে আসলো। শুধু আলতো করে জিজ্ঞেস করলো-

“ কবে ছাইড়া দিবেন আমারে? ”
ইয়াসিন উঠে চলে যেতে যেতে বলল-
“ অতিশীঘ্র। ”
ইয়াসিন চলে যেতেই বাতাসিও উঠে দাঁড়ালো। খাবারের প্লেট টা ঢেকে রেখে অন্য রুমে চলে গেলো ঘুমাতে।
সকালের ভোরের আলো ফুটতেই ইয়াসিন বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়ায়। একটা দারুন ঘুম দিয়েছিল। কিন্তু অ্যালার্মের জন্য ঘুমটা ভেঙে গেল। ভাগ্যিস ভাঙলো। নইলে তো ট্রেন মিস হয়ে যেত। ইয়াসিন ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে টাওয়াল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে খেয়াল করে বাতাসি এই ঘরে নেই। তাহলে কি অন্য রুমে? ইয়াসিন মনে মনে ভাবলো ভালোই হয়েছে এক হিসেবে।
রুম থেকে বের হয়ে খাবার টেবিলের দিকে তাকালো। প্লেট ঢাকা। খেয়েছে নাকি খায় নি? ঢাকনা উঠালো। সাথে সাথে বাজে একটা গন্ধ নাকে আসলো। নষ্ট হয়ে গেছে খাবার। রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো। খায় নি কেনো এই মেয়ে? খাবে না ভালো কথা। ফ্রিজে রাখলো না কেনো? একে তো আগে ভালোমন্দ খেতে পারতো না। আর এখন পেয়ে পায়ে ঠেলছে?
ইয়াসিন রুমের সামনে দাঁড়িয়ে দরজায় জোরে জোরে কড়া নেড়ে ডেকে বলল-

“ এই মেয়ে ওঠো। তাড়াতাড়ি ওঠো। ”
আকস্মিক এতো জোরে দরজা ধাক্কার আওয়াজে ধড়ফড়িয়ে উঠে বাতাসি। শোয়া থেকে উঠে দরজা খুলতেই দেখতে পেলো ইয়াসিন কে। ইয়াসিন চলে যেতে যেতে বলল-
“ তারাতাড়ি ফ্রেশ হয়ে রেডি হও। বের হবো তোমাকে নিয়ে । ”
বাতাসি পেছন থেকে জিজ্ঞেস করলো-
“ কোথায় নিয়ে যাবেন? উকিলের কাছে ? ”
ইয়াসিন একবার পেছন ফিরে বলল-
“ হ্যাঁ। তাড়াতাড়ি রেডি হও। সময় নেই হাতে। ”
বাতাসি ফ্রেশ হয়ে টিয়া রঙের একটা থ্রি-পিস পড়লো। তার নিজের জামাকাপড় আনা হয় নি। এখন সাথে যা আছে তা মাহির দেওয়া দুই সেট।
ইয়াসিন নিজেও রেডি হয়ে বেরিয়ে দেখলো বাতাসি শুধু সেলোয়ার-কামিজ পড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইয়াসিন ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো-

“ বোরকা কই? এইভাবে যাবা সাথে? লোকে হা করে তাকিয়ে তাকিয়ে হাসবে। ভালো লাগবে সেটা? ”
“ বোরকা নেই আমার। ”
“ আগে বলবা না সেটা? ”
“ আপনাকে বলার মতো পরিস্থিতি আছে আমার?”
“ চলো এভাবেই। চলতি পথে মার্কেট খোলা থাকলে কিনে দিব নি। আর ওড়না দিয়ে মুখ ঢাকো। ”
বাতাসি ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে নিলো। ইয়াসিন বোধহয় লজ্জায় পড়ার ভয়ে বাতাসির মুখ ঢাকতে বললো? লোকটার মুখে কি কিছু বাঁধে না? এসব সোজাসাপটা কথা যে বাতাসিকে মারাত্মক ভাবে আঘাত করে।
ভোরের ঢাকা এখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। শাহবাগ মোড়ের বাতিগুলো ম্লান আলোয় টিমটিম করছে। শহরজুড়ে এক ধরনের নিস্তব্ধতা, ইয়াসিন বাড়িতে তালা লাগিয়ে ব্যাগটা কাঁধে তুলে বাতাসি কে নিয়ে রিকশায় চেপে বসলো। গন্তব্য তাদের কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন।

স্টেশনে পৌঁছে ইয়াসিন দেখলো মানুষে ঠাসা প্ল্যাটফর্ম। কেউ অফিসযাত্রী, কেউবা গ্রামের পথযত্রী। ইয়াসিন দের টিকিট কাটা আছে একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের। ভোর ৬টা ১০ মিনিটে ছাড়বে দিনাজপুরের উদ্দেশে।
ইয়াসিন আগে আগে হাঁটছে। পেছন পেছন বাতাসি ইয়াসিনের পথ ধরে হাঁটছে। এত লোকের ভীড়ে ইয়াসিন প্রয়োজন টুকুও বোধ করলো না বাতাসির হাত টা ধরে নিয়ে যাওয়ার! বাতাসি এই প্রথম রেলস্টেশনে আসলো। সব অপরিচিত তার কাছে। ভয় সংশয় সব মিলে একাকার।
ইয়াসিন রেলস্টেশনের পাশ থেকে ডিম ভাজা আর রুটি কিনে নিলো। সাথে একটা পানির বোতল। তারপর ট্রেনে উঠে গেলো। পেছন পেছন বাতাসিও উঠলো। ট্রেনে ইয়াসিন বাতাসির পাশে বসলো না। বরং সামনা-সামনি করে বসলো। যাতে লোকে না ভাবে বাতাসি তার সাথের লোক।
রুটি ডিম কিনে আনা খাবার টা বাতাসির দিকে দিয়ে মৃদু আওয়াজে বলল-

“ খেয়ে নিও। অনেকটা লম্বা পথ। ক্ষুধা লাগবে পরে। ”
বাতাসি জানালা দিয়ে বাহিরে তাকালো। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। আজই কি তাদের তালাক হয়ে যাবে? উকিলের বাড়ি অনেকদূর? এই পথ তাহলে শেষ না হোক। ট্রেন নষ্ট হয়ে যাক। তাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য টা না আসুক। বাতাসি একটু বাঁচতে চায়। ইয়াসিন ছেড়ে দিলে বাতাসির মাথার উপর ছাঁদ টাও যে হারিয়ে যাবে। একটু স্বার্থপর হলো না হয় বাতাসি।
আধঘন্টা পর রুটি ডিম টা খেয়ে নিলো বাতাসি। তাদের পাশে এসে দুজন বৃদ্ধ বৃদ্ধা দাঁড়ালো। বৃদ্ধ লোকটা ইয়াসিনের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ তুমি এদিকটায় বসো বাবা। আমার গিন্নি টা জানালার ধারে বসতে পছন্দ করে। ”
কি আশ্চর্য তার গিন্নি জানালার ধারে বসতে পছন্দ করে তাতে ইয়াসিনের কি? ইয়াসিন পাশে সরে বসে বলল-
“ আপনার গিন্নিকে বসতে দিলাম জানালার ধারে। বাট আপনাকে না। ”
লোকটা বলল-

“ আমার গিন্নির পাশে তুমি বসে থাকবে নাকি? তুমি বাবা এপাশে এসো বসো। আমার গিন্নি আমার কাঁধে মাথা রেখে পুরো সময়টা থাকে ট্রেনে। তুমি তো বিবাহিত নও তাই না? তাই বউয়ের সুবিধা অসুবিধা বুঝো না। ”
ইয়াসিন বিরবির করে বলল-
“ বললেই হয় বুইড়া তুমি নিজেই বউ ছাড়া থাকতে পারো না। ”
বসা থেকে উঠে বাতাসির পাশে এসে বসলো ইয়াসিন।
প্রায় আট ঘণ্টা পরে ট্রেন এসে পৌঁছায় দিনাজপুর স্টেশনে। সেখানে নেমে ইয়াসিন বাতাসিকে নিয়ে ফের স্থানীয় ট্রেনে চেপে যায় বিরামপুর। ছোট্ট স্টেশন, শান্ত, ধুলোহীন। সেখানে পৌঁছে একটা অটোরিকশায় উঠে পড়ে। কয়েকটা গ্রামীণ রাস্তা, সবুজ গাছের ছায়া পেরিয়ে অবশেষে পৌঁছে যায় মুকুন্দপুর গ্রামে।
একতলা ছাদ বিশিষ্ট বাড়ি। বাড়ির সামনে খোলা উঠান। কোনো পাঁচিল বা গেট নেই। উঠানের এক পাশে খড়ের পালা। খড়ের পালা থেকে কয়েক মিটার দূরত্বে দুটো গরু বাঁধা।
ইয়াসিন উঠানে দাঁড়িয়ে মা মা বলে ডেকে উঠলো। ছেলের ডাক শুনে ঘর থেকে হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে আসলো ইয়াসমিন বেগম। ছেলে যে আজই আসবে জানতেন না তিনি। ছেলেকে ধরে মুখে পিঠে মাথায় হাত বুলিয়ে চুমু খেলো।

“ তুই যে আজই আসবি আগে বললি না কেনো? বউমা কই? বউমা। ”
বউমা বলে ডাকার পরই ইয়াসমিন বেগমের চোখ গেলো পেছনে। পাতলা দেহের সেলোয়ার-কামিজ পড়া এক মেয়ে দাঁড়ানো। ইয়াসমিন বেগম বললেন-
“ ওটা বউ মা? ”
ইয়াসিন ছোট্ট করে হু বলে ভেতরে চলে গেল। ইয়াসমিন বেগম বাতাসির দিকে এগিয়ে গেলো। বাতাসি গুটিশুটি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। ইয়াসমিন বেগম বাতাসির ওড়না দিয়ে বেঁধে রাখা মুখে হাত রেখে বলল-

“ চলো মা,রুমে চলো। ”
বাতাসিকে ইয়াসমিন বেগম রুমে নিয়ে আসলো। বিছানায় বসিয়ে বলল-
“ ওড়না খুলে ফেলো মুখ থেকে। পুতের বউ টারে দেখি আগে। ”
বাতাসি পড়ে গেলো বিপাকে। তার মুখ দেখলেই হয়তো উনার মুখটায় আর এখনকার মতো হাসি থাকবে না।
“ কি হলো খুলো। ”
ইয়াসমিন বেগম ফের বললেন। বাতাসি পায়ের দিকে দৃষ্টিপাত করে বলল-
“ আমারে দেখার পর নাক ছিটকাইবেন? ”
ইয়াসমিন বেগম হকচকিয়ে গেলো। নাক ছিটকাবে কেনো সে?
“ পুতের বউ দেখে নাক ছিটকাতে যাবো কেনো শুনি? ”
“ আমি যে কালো। সুন্দর না। ”

ইয়াসমিন বেগম এবার হাত পায়ের দিকে তাকালো বাতাসির। নজরে আসলো গায়ের রং। আসলেই মেয়েটা কালো। ইয়াসমিন বেগম নিজেই হাত দিয়ে বাতাসির মুখে ওড়না টা সরালো। বাতাসি সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে ফেললো। এই বুঝি উনি তাকে কটাক্ষ করবেন গায়ের রং চেহারা নিয়ে।
কিন্তু ইয়াসমিন বেগম বাতাসির সকল ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করে বাতাসির থুতনি ধরে বলল-
“ মাশা-আল্লাহ, আমার পুতের বউ কি মায়াবী। ”
বাতাসি চমকে তাকালো। মায়াবী! এই শব্দ টা তার ভাই ফাহাদও বলতো। যখন সবাই তার গায়ের রং নিয়ে কথা শোনাতো।
পৃথিবীতে কালো রঙের মেয়েদের বোধহয় এই একটা শব্দ দিয়েই স্বান্তনা দেওয়া যায় যে তুমি কালো হলেও তোমার চেহারা কাটিং সুন্দর, কিউট,মায়াবী। বাতাসি বোধহয় সেই স্বান্তনাদের দলের কেউ।
বাতাসি ইয়াসমিন বেগমের মুখের দিকে তাকালো। পাকা মাথার চুল। গায়ের রং ইয়াসিনের মতোই হলদেটে ফর্সা। গায়ের চামড়া কুঁচকাতে শুরু করছে। বয়স হচ্ছে কি না।

“ আপনার আমাকে দেখে ঘৃণা লাগলো না? ”
“ ওমা ঘৃণা কেনো লাগবে? ”
“ গায়ের রং কালো দেখে। ”
“ ধূর পাগলি, তুমি বসো। আমি আসতেছি। অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছো। ক্ষুদা লেগেছে নিশ্চয়ই? ”
ইয়াসমিন বেগম চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর মা’কে খুঁজতে খুঁজতে ইয়াসিন এই রুমে আসলো। বাতাসি কে দেখে বলল-
“ আম্মাকে দেখছো? ”
“ কোথায় যেন গেলো। ”
ইয়াসিন চলে যাচ্ছিলো। বাতাসি ডেকে বলল-
“ শুনুন। ”
ইয়াসিন পেছন ফিরে বলল-
“ বলো। ”
“ আপনার আম্মাকে আমি একটু আম্মা বলে ডাকি? আপনার আম্মা খুব ভালো। আমার আম্মা না, আমাকে আম্মা বলে ডাকতে দিত না আমি কালো বলে। আপনার আম্মাও কি আমায় বকবে আম্মা ডাকলে?
ইয়াসিনের খারাপ লাগলো বাতাসির কথায়। নরম গলায় বলল-

“ তোমার আম্মা তো বহুত পাঁজি। আমার আম্মা তোমার মায়ের মতো না। তার কাছে গায়ের রং-টং কিছুই গণ্য করে না। তুমি চাইলে তাকে আম্মা বলে ডাকতে পারো। ”
বাতাসি নিচু গলায় বলল-
“তাইলে আপনার কাছে গায়ের রং এত গুরুত্ব পায় কেন? আপনিও তো আমি কালো বইলা দেখতে পারেন না। আপনার আর আমার মায়ের মধ্যে তাইলে পার্থক্য রইলো কিসে? অথচ আপনার মায়ের সাথে আপনার কত পার্থক্য। ”
ইয়াসিন জবাব দিলো না। বেরিয়ে গেলো।

ইমন সকালের ব্যাচ পড়িয়ে ফ্রী হতেই জুনায়েদের সাথে কথা বললো বিয়ে নিয়ে। জুনায়েদ তাড়াহুড়ো করতে না করলো ইমন কে। বললো খালার চাপে রাজি না হয়ে ইমন যেন নিজ থেকে রাজি হয়। তাদের কারো একজনের অমত নিয়ে সে বিয়ে করতে চাচ্ছে না ঊর্মি কে। ইমন আচ্ছা বললো। সে আরো ভেবে দেখবে। দু’দিন পর জানাবে।
ঊর্মি ইব্রাহিম কে ফোন করে জানিয়েছে। বাসায় নাকি তার বিয়ে নিয়ে কথাবার্তা উঠেছে। ইব্রাহিম যেন তার ভাইকে মানায়। আর বিয়ের বিষয় টা যেন না জানায় প্রথমেই।
ইব্রাহিম ঢাকায় ফিরেই ইমন কে খুঁজে চলছে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো ইমন এখন একটা কোচিং সেন্টারে জব করে। ইব্রাহিম ইমনের কোচিং সেন্টারের বাহিরে গাড়িতে মাক্স পড়ে বসে আছে। একজন লোক পাঠালো ভেতরে যেন ইমন বাহিরে আসে।
ইমন কেউ বাহিরে অপেক্ষা করছে তারজন্য শুনে বেরিয়ে আসে। গাড়িটা দেখে চিনতে অসুবিধে হলো না এটা কার গাড়ি। এগিয়ে গিয়ে বলল-

“ আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন শুনলাম। ”
ইব্রাহিম গাড়ির দরজা খুলে দিলো। ইশারায় ইমন কে উঠে বসতে বলল। ইমন মানা করে বলল-
“ কি বলতে চান বলুন। আমার ক্লাস আছে। ”
“ অনেক কথা বলার আছে। এখানে বলতে শুরু করলে দিন পেড়িয়ে রাত হবে। রোদে তোমার শরীর পুড়ে যাবে। ইম্পর্ট্যান্ট কথা। এটা সব জায়গায় বলা যায় না। ”
“ কিসের কথা? আপনার সাথে আমার কোনো এমন ধরনের কথা থাকতে পারে বলে মনে হয় না।”
“ আসলেই ইম্পর্ট্যান্ট। তোমার বোন কে নিয়ে। ”
ইমন ভ্রু কুঁচকালো।
“ আসো উঠে আসো। কিউরিওসিটি জাগছে না? ”

আসলেই কিউরিওসিটি জাগছে ইমনের। বোনকে নিয়ে ইব্রাহিমের কি কথা থাকতে পারে? গাড়িতে উঠে বসলো ইমন। ইব্রাহিম গাড়িটা চালিয়ে সোজা নিজেদের ক্লাবে আসলো।
ক্লাবে আগে থেকেই এজওয়ান ছিলো। সোলেমান একটা ফাইল নিতে পাঠিয়েছে। ইব্রাহিম কে দেখে বলল-
“ ভাই তুমিই যেহেতু আসবা ক্লাবে। ভাইজান তাইলে হুদাই আমারে পাঠাইলো ক্যান। তুমিই নিয়া যাইতা ফাইল টা। ”
কথাটা শেষ করে পেছনে ইমন কে দেখে ভ্রু কুঁচকালো। এই ছেলেটা আগে ড্রাইভার ছিলো না? হ্যাঁ ইব্রাহিমের। শুনেছে এই ছেলে রাজনীতি তে যোগ দিয়েছে। তাও আবার শিবিরে। এখনও মাইর গুতা দু একটা খায় নি নাকি? এজওয়ান পুরো শরীরে আপাদমস্তক চোখ বুলালো। না কোনো চিহ্ন তো দেখা যাচ্ছে না। তাইলে ছ্যামড়া ভালোই আছে।
ইব্রাহিম ইমন কে বসতে বললো। ইমন সোফায় বসে বলল-

“ আমার বোন কে নিয়ে কি বলবেন তাড়াতাড়ি বলুন। ”
এজওয়ানের কপালে দু ভাজ পড়লো। মেয়েলি ব্যাপার স্যাপার হবে নাকি এখানে? যেখানেই মেয়ে সেখানেই তো এজওয়ান। পৃথিবী এই কথাটা খুব ভালো করে জানে।
ইব্রাহিম পানি খেয়ে তারপর বলল-
“ শুনলাম তোমার বোনের বিয়ের কথাবার্তা চলছে? কথাটা কি সত্যি? ”
ইমন কথার উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো-
“ আপনি জানলেন কি করে? ”
“ আমাদের হাত সম্পর্কে তুমি ভালো করেই জানো। কোনো কিছু সম্পর্কে আমাদের জানাটা খুব বেশি কঠিন কজ নয়। ”
“ নজর রাখছেন আমার উপর? ”
এজওয়ান চেয়ার টেনে বলল-
“ ধূর মিয়া আপনার উপর নজর রাখতে যাবে ক্যান? আমার মনে হয় আপনার বোনের উপর নজর রাখছে ভাইয়ে? ”
ইব্রাহিম গরম চোখে তাকালো। এজওয়ান ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ভদ্র হয়ে রইলো।

“ আমার বোনের উপর নজর রাখছেন কেনো? ”
“ দেখো ইমন আমি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলতে একদমই পছন্দ করি না। যা বলার সোজাসাপটা বলছি। আমি তোমার বোন কে পছন্দ করি। বিয়ে করতে চাই। তুমি রাজি হয়ে আমার প্রস্তাব গ্রহণ করো। ”
ইমন সাথে সাথে উঠে দাঁড়ালো। নিশ্চয়ই রাজনীতি জড়িত এইখানে! ইমন কে কোনঠাসা করে রাখতে চাইছে তার বোন কে তাদের কব্জায় রেখে?
“ আপনাকে আমি একদিন একটা কথা বলেছিলাম মনে আছে? ”
“ রাজনীতি করা ছেলের সাথে বোন বিয়ে দিবে না।”
“ তাহলে আপনি এই কথা বলেন কি করে দ্বিতীয় বার? ”
“ তুমিও তো রাজনীতি করো। তুমিও তো বিয়ে করবে। তাহলে তোমাকে মেয়ে দিবে কেনো ঐ ব্যাটারা? ”
“ কে বললো আমি বিয়ে করবো? ”
“ কেনো, করবে না? ছ্যাকা খেয়ে ব্যাকা হয়ে গেছো? ”
ইমনের চোখ মুখ শক্ত হলো।

“ সেটা পুরোটাই আমার ব্যক্তিগত বিষয়। আপনি এই কথা বলার জন্য ডেকেছেন? তাহলে শুনুন। আপনার কাছে আমার বোন দিব না। আমার বোনের বিয়ের কথাবার্তা চলছে। আমার খালাতো ভাইয়ের সাথেই তার বিয়ে হবে। ”
“ তোমার বোনও আমাকে ভালোবাসে ইমন। ”
ইমন চমকালো এমন কথা শুনে। তার বোনও ভালোবাসে মানে? কিসব উল্টাপাল্টা কথা বলছে?
“ মাথা ঠিক আছে? আমার বোন যদি ভালোও বাসে আপনায় তারপরও আমি আপনার সাথে আমার বিয়ে দিব না। ”
এবার এজওয়ান মুখের সামনে থেকে আঙুল সরিয়ে বলল-
“ এই মিয়া সমস্যা কি? বোন দিলে কি তোমার জায়গা সম্পত্তি কমে যাবে নাকি? আমার ভাই কি যৌতুক চাইছে? উল্টা যৌতুক দিয়ে বিয়ে করবে দরকার পড়লে। ”
ইমন এবার এজওয়ানের দিকে তাকালো।
“ আপনার ভাই তার সকল সম্পত্তি আমার নামে করে দিলেও আমার বোনকে আমি তার সাথে বিয়ে দিব না। ”
“ হ আমার ভাইয়ে তো আপনারে তার সকল সম্পত্তি লিখে দেওয়ার জন্য বসে আছে। আপনি মিয়া রাজি হন। ভাইজান,আমি কইলে লোক চিনি। ”
ইব্রাহিম জিজ্ঞেস করলো-

“ কিসের লোক? ”
এজওয়ান ইব্রাহিমের কানের কাছে মুখ টা নিয়ে বলল-
“ তাবিজ করার। এই ব্যাডা বোন না দিলে তোমায় সেখানে নিয়ে যাব। তুমি তাবিজ করে কাছে টেনে নিবা। আমি বলদ আগে এটা করলেই পারতাম। তাহলে বউয়ের দুষমন হইতাম না। তুমি আমার মতো ভুল কইরো না ভাইয়ে। ”
ইব্রাহিম কথাটা শুনে প্রথমে নাক ছিটকানোর মতো করলেও পরে মনে হলে মন্দ না কথাটা। ইমন বোন না দিলে তাই করতে হবে। ইব্রাহিম ঠান্ডা গলায় বললো-
“ তোমার বোন কে ভালোয় ভালোয় দিয়ে দাও ইমন। আমার কোনো রাজনৈতিক স্বর্থ জড়িয়ে নেই এখানে। তোমার সাথে আমার কোনো শত্রুতাও নেই। দিয়ে দাও তোমার বোন টা। সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো আমি। ”
ইমনের আগের ন্যায় সোজা জবাব-
“ সম্ভব নয়। ”
ইব্রাহিম এবার চাপা স্বরে বলল-

“ তুমি তোমার বোন কে আমায় দিবে না তাই তো?
ওকে ফাইন। তোমার বোনের বিয়ে যদি অন্য কোথাও দাও তাহলে তোমার বোনকে তাবিজ করে তার সংসার আমি নষ্ট করে দিব। এরচেয়ে ভালো হয় যদি বোনের সংসার বাঁচাতে চাও তাহলে তাকে আমার সাথে সংসার করতে দাও। ট্রাস্ট মি এক মাসের মাথায় তোমাকে আমি মামু ডাক শোনাবো। যদি না পারি তাহলে আমার নাম ইব্রাহিম পাশা না।
এজওয়ান ভ্রু কুঁচকালো লাস্ট কথা শুনে। ভাবনায় পড়ে গেল। কিরে ভাই এক মাসে কিভাবে মামু ডাক শুনাবে ইমন কে? প্রসেসিং হতেও তো সময় লাগে। পাকিস্তানি ড্রামা না তো এটা। যে হাতে হাত ছোঁয়া লাগলো,দরজা বন্ধ করে দিলো আর পরের দিন সুখবর শোনা গেলো। বাংলাদেশে একমাসে কিভাবে সম্ভব? যদিও সম্ভব কিন্তু সুখবর পেতে তো দুই থেকে আড়াইমাস লাগে। ইব্রাহিম ভাইয়ের থেকে পদ্ধতি টা শিখে রাখতে হবে এজওয়ানের। সেও তাহলে চলতি মাসেই বাপ হওয়ার প্রস্তুতি নিবে।
ইমন যেতে যেতে বলল-

দাহশয্যা পর্ব ৭৪

“ যা করার করেন আপনি। আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল। ”
“ ওকে যাও বোনের বিয়ের আয়োজন করো তাহলে। বাকি টা আমি নিজ দায়িত্বে করে নিচ্ছি। তোমার জন্য শুভ কামনা রইলো আমার একমাত্র শালা সরি সুমুন্দি হওয়ার জন্য। ”

দাহশয্যা পর্ব ৭৬