দাহশয্যা পর্ব ৭৪
Raiha Zubair Ripti
একটা সুন্দর সকাল,মৃদুমন্দ শীতল বাতাস আর ঘন কুয়াশা। সূর্য্যি মামার দেখা নেই বললেই চলে। বাতাসির ঘুম ভাঙলো ঠান্ডা বাতাস গায়ে এসে লাগায়। দুদিন ধরে ফ্লোরে ঘুমাতে ঘুমাতে ঠান্ডা লেগে গেছে। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসতেই চোখ গেল বিছানায়। বিছানা ফাঁকা, উনি কি চলে গেছে? গতকাল এসেছে আবার অচেনা এক জায়গায়। লোকটা বাতাসি কে নিয়েই আসতে চাইছিলো না। ঐ বিদেশিনী আফায় রাগারাগি করায় নিয়ে এসেছে। আফার নাম কি জানে না বাতাসি। দেখতে অনেক সুন্দর। ঐ যে ছোটছোট চুল,ধবধবা ফর্সা গায়ের রং,কি পরিষ্কার। মনে হয় চামড়ায় নিজের মুখ দেখা যাবে এমন পরিষ্কার লাগলো বাতাসির কাছে। বাতাসি চাদর টা শরীর থেকে সরিয়ে বিছানায় রাখতেই ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসলো ইয়াসিন। বের হতেই সর্বপ্রথম চোখ গেলো বাতাসির দিকে। বাতাসি কে দেখলে এতটা বাজে অনুভূতি হতো না যদি না সে তার বউ হতো। ইয়াসিনের বউ হয়েই যত লাঞ্ছনা কুড়ালো বাতাসি।
বাতাসি ইয়াসিন কে দেখেই গুটিয়ে গেলো। তারা এসেছে গতকাল বিকেলে। রাত টা না খেয়ে থেকেছে বাতাসি। কারন ইয়াসিন খাবার আনে নি। বাতাসি সাহস করে বলেও নি। যদি গায়ে হাত তুলে?
ইয়াসিন ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করতে লাগলো। বিছানায় থাকা মুঠোফোন টা বেজে উঠতেই ইয়াসিন সেদিকে তাকালো। এগিয়ে এসে ফোনটা হাতে নিতেই দেখলো মায়ের ফোন। ইয়াসিন রিসিভ করে কানে নিয়ে সালাম দিয়ে বলল-
“ হ্যাঁ মা বলো। ”
ইয়াসিনের মা ইয়াসমিন বেগম উৎফুল্লতা নিয়ে বলল-
“ কিরে বাপ,তুই নাকি বিয়ে করছিস? সোলেমান জানালো আমায়। আমারে একবার বলে করতি বিয়ে। আমি কি না করতাম নাকি? কত ইচ্ছে ছিলো তোর বিয়ে টা নিজের চোখের সামনে দেখমু। কিন্তু তুই তো জানাইলিই না। এভাবে না জানিয়ে বিয়ে করলি ক্যান ইয়াসিন? মাইয় রে উঠায় নিয়া বিয়ে করলি নাকি? বউমারে নিয়া বাড়ি আয়। বউমারে দেখমু। ”
ইয়াসিন বিরক্ত হলো মায়ের কথা শুনে। সোলেমান ভাই মাকে বলে দিছে বিয়ের কথা! ইয়াসিন ভেবেছিল উকিলের সাথে কথা বলে মেয়েটাকে ডিভোর্স দিয়ে দিবে। সব ভাবনায় জল ঢেলে দিলো সোলেমান ভাই।
“ কিরে ইয়াসিন। আনবি না বউ বাড়িতে? আমি তো একাই থাকি। অসুস্থ মানুষ। কয়দিনই আর বাচমু বল। নিয়া আয় বউ। ”
ইয়াসিন কথাটা এড়িয়ে গিয়ে বলল-
“ খাওয়াদাওয়া করছো? ঔষধ খাইছে? ”
“ হুমম। খাইছি। তোরা খাইছস? ”
“ না। পরে ফোন দেই তোমাকে। এখন বিজি আছি। ”
“ আচ্ছা। মনে করে দিস কিন্তু। বউমা আছে পাশে? থাকলে একটু দে কথা বলি। ”
ইয়াসিন আয়না দিয়ে বাতাসি কে দেখে বলল-
“ না নেই। পরে পোন দিচ্ছি। ”
ইয়াসিন ফোন কেটে দিলো। বাতাসি বুঝলো লোকটা তার মায়ের সাথে কথা বললো এতক্ষণ। ইশ উনি কত সৌভাগ্যবান,উনার আম্মা কত সুন্দর করে কথা বলেন উনার সাথে। বাতাসির মা ও যদি এভাবে একটু আদর করে কথা বলতো,তাহলে বোধহয় বাতাসি অতি সুখে কিছুক্ষণ কান্না করতো।
ইয়াসিন বাতাসির সাথে কোনো রকম কথাবার্তা না বলেই ডিঙিয়ে চলে গেল বাহিরে। বাতাসি তার যাওয়ার পানে তাকালো। যতক্ষণ দেখা যায় দেখলো। চোখের আড়াল হতেই বসা থেকে উঠে ওয়াশরুমে ঢুকে হাত মুখ ধুয়ে আসলো। এই বাড়িটা বেশি বড় না। দুটো রুম,একটা ড্রয়িং রুম,আর কিচেন রুম। রুমে একটা সুন্দর বারান্দা আছে। সেখানে হরেক রকমের গাছ ও লাগানো। বাতাসি নাম জানে না সেসবের। এই বারান্দায় দাঁড়ালেই সর্বপ্রথম দেখতে পাওয়া যাবে ঘন লম্বা কুয়াশা। নিচে তাকালেই বুঝা যাবে মাঠে যেমন ঘাস থাকে তেমন ঘাস। বাড়ির সামনের দিকে পাঁচিল দিয়ে ঘেরাও করা। কিন্তু পেছনের দিকে পাঁচিল দেখতে পেলো না বাতাসি। হয়তো কুয়াশার জন্য দেখা যাচ্ছে না।
বাতাসি কিছুক্ষণ ওড়না জড়িয়ে বসে থাকলো। সূর্যের দেখা মিলছে না কেনো? কি শীত! বাতাসির যে শীতের পোশাক নেই। সূর্য কি জানে না সেটা? জেনেও কেমন লুকোচুরি করছে।
বেশ কিছুক্ষণ পর গেট খোলার শব্দে বাতাসি পেছন ফিরলো। দেখলো ইয়াসিন হাতে খাবারের প্যাকেট নিয়ে ঢুকছে।
খাবার টেবিলে রেখে দু প্লেটে বাড়লো। তারপর বিরক্ত গলায় বাতাসি কে ডেকে বলল-
“ খেতে আসা হোক। ”
বাতাসি ধীর পায়ে এসে টেবিলের সামনে দাঁড়ালো। ইয়াসিন ততক্ষণে খাওয়া শুরু করে দিছে। বাতাসি চেয়ার টেনে বসবে নাকি ফ্লোরে বসবে এই নিয়ে যখন দ্বিধায় ভুগছিল তখন ইয়াসিন খেতে খেতে বলল-
“ চেয়ার টেনে বসো। ”
বাতাসি বাধ্য মেয়ের মতো চেয়ার টেনে বসলো। প্লেটে ভাত। আর পাশেই ইলিশ মাছের তরকারি খোলা। বাতাসি ইলিশ মাছের দিকে একবার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলো। এই মাছ সে দেখতে চায় না জীবনে। শুধু লবন দিয়ে যখন খেতে লাগলো বাতাসি তখন ইয়াসিন বিরক্ত গলায় বলল-
“ আশ্চর্য তরকারি কি আনি নি আমি? লবন দিয়ে খাচ্ছ কেনো? ”
বাতাসি ইয়াসিনের মুখের দিকে তাকালো। কেমন সব সময় কপালে দুটো ভাজ পড়ে থাকে উনার। এটা তো বিরক্তের ছাপ। বাতাসি সবার জীবনে শুধু বিরক্ত হয়েই রইলো দেখছি!
“ পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ আছে? তাইলে ভালো হইতো। ”
“ কেনো পেঁয়াজ কাঁচা মরিচ দিয়ে কি করবা? ”
“ পান্তা ভাত বানিয়ে খাইতাম। আছে? ”
“ কি আশ্চর্য সামনে তরকারি থাকতেও ওসব চাইছো কেনো? ইলিশ মাছ খাও না? ভালো তরকারি চোখে ধরে না? ওহ্ ভুলে গেছি ধরবে কি করে। হয়তো পাও নি জীবনে। ”
বাতাসি স্মিত হাসলো। বোকা মেয়েকে কেউ আকার ইঙ্গিতে অপমান করলেও হাসে। অসহায় দের জীবন বুঝি এটাকেই বলে?
“ হ ঠিক কইছেন। জীবনে আসলেই পাই নাই এসব। তবে ভাইয়া তার চেষ্টা দিয়া যতটুকু পারছে খাওয়াইতে আলহামদুলিল্লাহ আমি তাতেই খুশি আছিলাম। ”
” তাড়াতাড়ি খাওয়াদাওয়া শেষ করো তো। কাজে যাব আমি। ”
বাতাসি ফের লবন দিয়ে ভাত খেতে লাগলে ইয়াসিন এবার ধমক দিয়ে বলল-
“ সমস্যা কি তোমার? তরকারি নাও। ”
“ আর কিছু আনেন নাই এই মাছ ছাড়া? ”
“ এই মাছে কি সমস্যা তোমার? ”
“ যেই মাছ খাইবার চাওয়ার লাইগা আমার ভাইডা রে ওমনে কু’ত্তার মতন পিটাইয়া মাইরা ফেললো। সেই মাছ আমি খাই কেমনে কন? আমি জীবনে এই মাছ খামু না। আমার ভাইরে কাইড়া নিছে আমার থিকা এই মাছ। ”
ইয়াসিন একটু নরম হলো এবার। একবার দেখেছিল শুধু ফাহাদের লাশ টা ইয়াসিন। তারপর আর সাহস হয় নি।
পাশ থেকে মাংসের তরকারি লর বাটির ঢাকনা সরিয়ে দিয়ে বলল-
“ এটা দিয়ে খাও। ”
বাতাসি পেট ভরে ভাত খেলো। খাওয়া শেষে ইয়াসিন এঁটো প্লেট রেখে রুমে চলে গেলে বাতাসি সব প্লেট ধুয়েমুছে উপর করে রাখে। ইয়াসিন শার্ট বদলিয়ে রুম থেকে বের হয়ে দেখে বাতাসি টেবিল পরিষ্কার করছে। করুক যা ইচ্ছে ইয়াসিনের কি তাতে। ইয়াসিন মানিব্যাগ টা পকেটে ভরে বাতাসির নাম ধরে ডাকতে গিয়েও থেমে গেল। কি অদ্ভুত নাম বাবা! ডাকতে গেলেও রাগ উঠে। ইয়াসিন হাতের ইশারায় ডেকে বলল-
“ এই শোনো। ”
বাতাসি তার দিকে তাকিয়ে বলল-
“ জ্বি বলেন। ”
“ এই তোমার ভালো নাম নেই? বাতাসি নাম টা তোমার সাথে যায় না। নাম বাতাসি। অথচ বাতাসির মতো সুন্দর না তুমি। ”
বাতাসি সেই আগের মতোই স্মিত হেঁসে বলল-
“ ভালো নাম আছে তো। ”
“ কি? ”
“ রূপা। ”
রূপা নামটা শুনে ফের বিরক্ত হলো। কিসব নাম এই মেয়ের! কোনো মিল নেই নামের সাথে তার।
“ এই নাম টাও তো মানায় না। তুমি তো রূপার মতন দেখতে নও। তাহলে এসব নাম কেনো রেখেছে? ”
“ জানি না। আব্বু রাখছে বলে। কেনো কালো দের কি এসব নামে মানায় না? ”
“ কিভাবে মানায়? রুপা নামের মেয়েরা রূপবতী হয়। কিন্তু তুমি তো কালো।”
“ তাইলে আমার গায়ের রঙের লগে কি নাম মানাইবো? সেটাই রাইখা দেন আপনে। ”
“ মনে হয় না এমন নাম আছে যেটা তোমার সাথে মানাবে। যাই হোক আসতেছি। চুরি টুরির স্বভাব নেই তো আবার তোমার? যদি আবার চুরি টুরি করে পালিয়ে যাও তখন তো আরেক বিপদ। ”
কি অবলীলায় চোর বলে দিলো বাতাসিকে উনি। বাতাসি কালো বলে কি তাকে চোর মনে হয়? চোর রা কি কালো বাতাসির মতো?
“ আপনে নিশ্চিন্তে থাকেন। চুরি করলেও যাওয়ার জায়গা নাই আমার। তাই চুরি করে এই শেষ আশ্রয় টাও হারাইতে চাই না। ”
ইয়াসিন দীর্ঘ শ্বাস ফেলে চলে গেলো।
ইমন আজ ছাত্র শিবিরের সংগঠনে এসেছে। শিবিরের নেতারাই ডেকেছে। আসার পরই তারা জিজ্ঞেস করলো-
“ শুনলাম তুমি নাকি কাজকর্ম করো না? খুব চেষ্টা করছো কাজ পাওয়ার? ”
ইমন মাথা নেড়ে বলল-
“ জ্বি। আজকের দিনে তো ঘুষ না দিলে ভালো চাকরি পাওয়া যায় না। তার উপর কোটা তো আছেই। আমাদের মতো মধ্যবিত্তরা এজন্যই বেকার হচ্ছে। ”
লোকটা সাইডে একজন কে বলল-
“ কোচিং সেন্টারের জব টা ওকে দাও। ”
ইমনের দিকে তাকিয়ে ফের বলল-
“ পড়াতে পারবে তো? কোন সাবজেক্টে দক্ষ তুমি?”
“ জ্বি ইংলিশ টায়। ”
“ ঠিক আছে। কাল থেকে সেন্টারে এসে ক্লাস করাবে। সেলারি যা প্রাপ্য তাই পাবে তুমি। এটা দিয়ে শুরু করো। আস্তে ধীরে দেখবে আরো সামনে আগাবে। ”
“ ধন্যবাদ আপনাকে। ”
ইমন আরো টুকটাক কথাবার্তা বলে চলে আসলো। যদিও শিবির দের আচার-আচরণ সবই মুগ্ধকর। তবে ইমন জীবনেও বিশ্বাস করবে না যে শিবিরের সবাই ভালো। হাতের পাঁচ আঙুল যেমন সমান হতে পারে না। তেমনই সব শিবির ভালো হবে এটা আশা করে আগানো বোকামি। নিজে এই দলে যুক্ত হয়েছে বলে তাদের নিয়ে মুখে ফ্যানা তুলবে ইমন তেমন ছেলে না। ইমন এসেছে তাদের আচার-আচরণ কথাবার্তা নিয়মনীতি ভালো সেজন্য। যদি কখনও দেখে তারাও দেশের মানুষের জন্য ক্ষতিকর ইমন তখন তাদের বিরুদ্ধেও আওয়াজ তুলবে।
হেঁটে শাহবাগে আসতেই দেখা হলো ইয়াসিনের সাথে। ইয়াসিন চা খাচ্ছিল টঙের দোকানে বসে। ইমন কে দেখেই তার দিকে তাকালো। চোখাচোখি হলো দু’জনের। ইমনই এগিয়ে আসলো। ইয়াসিন সরে বসার জায়গা দিলো। ইমন বসে বলল-
“ কেমন আছো ইয়াসিন? ”
ইয়াসিন মন খারাপ নিয়ে বলল-
“ ভালো থাকার দিন শেষ ভাই। ”
“ কেনো কি হয়েছে? ”
“ ফাহাদের বোন কে দেখছেন না? ”
ইমন মনে করলো ফাহাদের বোন কে। কালো বর্নের পিচ্চি মেয়েটা।
“ হ্যাঁ দেখেছি তো। মেয়েটা ভীষণ ভালোবাসতো ভাইকে। ভাইয়ের মৃ’ত্যু তে সে কি কান্না। ”
“ ঐ মেয়েকে আমার বিয়ে করা লাগছে। ”
ইমন অবাক হলো। সাথে ভাবলো সোলেমান সুলতান কি তাদের অপকর্ম ঢাকার জন্য এটা করলো!
“ সোলেমান সুলতান করিয়েছে নাকি? ”
“ না ভাইয়ে তো বলছিল বিয়ে টা না করাইতে। কিন্তু ঐ মেয়ের গ্রামের লোকেরা মিথ্যা অপবাদ দিয়ে জোর করে গাছের সাথে বেঁধে বিয়ে পড়ায় দিছে। ”
ইমন বুঝলো না কথার আগামাথা। গাছের সাথে বেঁধেছিল কেনো?
“ ঠিক বুঝলাম না ইয়াসিন। খুলে বলবে? ”
ইয়াসিন সব খুলে বলল। সবটা শোনার পর ইমনের বুঝতে বাকি নেই ফাহাদের মা ইচ্ছে করে করেছে এসব। আপন মা-ও এমন হয় ছিঃ! এদের জন্যই মা নামটার অসম্মান হয় মাঝেমধ্যে।
ইমন ইয়াসিনের কাঁধে হাত রেখে বলল-
“ বিয়ে তো হয়েই গেছে ইয়াসিন। মেয়েটাকে ভালোবাসতে না পারো অন্তত অসম্মান করো না। গায়ের রঙের জন্য মায়ের ভালোবাসা পায় নি। এক ভাই ছিলো সেটাকেও তোমাদের দলের ছেলেপেলেরা মে’রে ফেললো। এখন বাতাসির তুমি ছাড়া কেউ নেই। তুমিও যদি খারাপ ব্যবহার করো তাহলে মেয়েটা কোথায় যাবে বলো? ”
“ ভাই আপনি জানেন তো আমার বিয়ে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিলো। একটা সুন্দর বউ হবে আমার। সেখানে এই মেয়েকে কিভাবে মানি? ”
“ সবার সব স্বপ্ন পূরণ হয় না ইয়াসিন। যদি হতো তাহলে এই পৃথিবীতে এত দুঃখ কষ্ট থাকতো না। ”
মসজিদের মাইক দিয়ে আজানের আওয়াজ ভেসে আসায় ইমন বলল-
“ নামাজ পড়বে? চলো এক সাথে পড়ে আসি। ”
ইয়াসিন না করলো। বলল-
“ আপনি পড়ে আসেন। ”
ইমন গিয়ে নামাজ পড়ে আসলো। ইয়াসিন অপেক্ষা করছিলো দোকানে। ইমন আসতেই ফের জিজ্ঞেস করলো-
“ শুনলাম আপনি রাজনীতি তে নাম দিছেন? ”
ইমন মৃদু হাসলো।
“ হুমম দিলাম। দেখি রাজনীতি আমাকে পশু বানাতে পারে কি না। ”
“ আপনি রাজনীতি বুঝেন? ”
“ ভাগ্যিস বুঝি না। ”
“ আপনি যে এখন আমার শত্রু পক্ষ জানেন? ”
“ তুমি শত্রু ভাবলে শত্রু। ”
“ হুদাই আপনি রাজনীতি তে ঢুকলেন। আপনাকে রাজনীতি তে মানায় না। রাজনীতি করতে হলে সোলেমান ভাইয়ের মতো করতে হয়। ”
“ সে কিভাবে করে? ”
“ তার জনপ্রিয়তা কতটা জানেন না আপনি? কত পাওয়ার। বড় বড় মন্ত্রী এমপি তার কাছে আসে সাহায্য চাইতে। ”
“ এত বড় পাওয়ারফুল হলো কি করে? সেও তো একজন এমপি। ”
“ ভাইয়ের পুরো পরিবারই তো রাজনীতির লোক। তার নানার গুষ্টি দাদার গুষ্টি সবাই। তো আগে থেকেই তাদের নামডাক অনেক। ”
“ ওহ্। তোমাদের সোলেমান ভাই কখনও অন্যায় করে নি রাজনীতি তে এসে? ”
“ অন্যায় করবে কেনো? ”
“ রাজনীতি ন্যায়ের হয় কখনও? ”
“ তাইলে আপনি ঢুকছেন কেনো রাজনীতি তে? ”
“ নিজেকে নিয়ে প্রুফ হতে। যে আদৌও আমি খারাপ হই কি না। ”
“ না না সোলেমান ভাই অন্যায় কে কখনও প্রশ্রয় দেয় না। যার যেমন কর্ম তেমন সাজাই দেয়। ”
“ তাই? ”
“ হুমম। এখন আসি। আপনি বিরোধী দল। আপনার সাথে বেশি কথা বললে না জানি কোন কথা প্যাচ মেরে লাগায় দিবেন। তখন আমার পাছার কাপড় নিয়ে টানাটানি লাগবে। তবে ভাই আপনি রাজনীতি তে ঢুকছেন ভালো কথা। সোলেমান ভাইয়ের লগে পাঙ্গা নিয়েন না। সোলেমান ভাইয়ের সাথে পাঙ্গা নিলে বাঁচা মুশকিল। সে আগে কিছু বলবে না। আপনি যা ইচ্ছে করুন সে চুপ থাকবে। কিন্তু আপনি যদি সেধে তার কাছে আসেন তাকে কামড়ে ধরার জন্য তাহলে সে এমন ভাবে দাঁত ভেঙে দিবে যে তার আশেপাশে আসার আগে আপনাকে সেই দাঁতের কথা ভাবাবে একশো বার। সে ভীষণ ঝামেলা এড়িয়ে চলা মানুষ। তবে ঝামেলা নিজ থেকে তাকে গ্রাস করতে চাইলে অবস্থা খারাপ করে দিবে। তাই ভাই সাবধান করে দিলাম। আপনার সাথে অনেক টা দিন মিশেছি। তাই বললাম। ”
ইমন শুধু মুচকি হাসলো। প্রতিত্তোরে কিছু বললো না। বসা থেকে উঠে মেসের দিকে হাঁটা ধরলো।
ইয়াসিন তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো। কি এক অবস্থা সবাই রাজনীতি তে ঢুকে শুধু সোলেমান ভাইয়ের পিছু লাগতে চায়। কত শত্রু ভাইয়ের। এখন ইমন না হলেই হয়। তাহলে তো ভাই একেবারে খেয়ে দিবে রাজনীতির মাঠে তাকে।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে, পশ্চিমের আকাশে সূর্যটা ডুবে গেছে মাত্র, আকাশের কিনারায় লালচে আলো ছড়িয়ে আছে। সেই আলো গাছের মাথায়, তাল-নারিকেলের পাতায়, ঘরের চালায় লেগে একটা গাঢ় সোনালি রঙ এনে দিয়েছে চারপাশে।
দূরে ধানক্ষেত থেকে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে টানা সুরে। সুলতান ভিলার বাগানে চেয়ারে বসে আছে সোলেমান আর ইব্রাহিম।
ইব্রাহিম ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে সোলেমান কে বলল-
“ জানিস ইমন রাজনীতি তে যুক্ত হয়েছে। ”
সোলেমান ইব্রাহিমের দিকে না তাকিয়েই চোখ ফোনের স্ক্রিনে রেখে বলল-
“ তো? ”
“ না এমনি। ”
“ হয়তো রাজনীতি করার ইচ্ছে হয়েছে সেজন্য রাজনীতি করছে। যার যার ব্যক্তিগত ব্যপার এসব কে কি করবে না করবে। ”
“ কোন দলে যুক্ত হয়েছে জানিস? ”
“ বিএনপি? ওর সাথে যাবে না বিএনপি । বোধহয় শিবির টিবির। ”
“ হুমম। শিবিরই। ”
“ টিকে থাকতে পারলে হয়। ”
“ কেনো কি করবি? ”
সোলেমান এবার ইব্রাহিমের দিকে তাকালো। ভ্রু কুঁচকে বলল-
“ আশ্চর্য আমি কি করবো? কিছু করার কথা আমার? ”
ইব্রাহিম ভরকে গেলো।
“ না মানে বললি যে টিকতে পারলে হয়। ”
“ ঠিকই তো বলেছি। বিএনপি জামায়েত শিবির যে আওয়ামী লীগের চোখের কাটা জানিস না সেটা? ছেড়ে দিবে নাকি? দেখবি কোনো না কোনো একটা মামলায় ঢুকিয়ে গুম খু’ন করে দিবে কেউ। ”
ইব্রাহিমের কপাল আঙুল দিয়ে স্লাইড করতে লাগলো। আহারে শালার সুমুন্দি রাজনীতি তে ঢোকারও সময় পাইলো না। ইমনের সাথে ঠান্ডা মাথায় কথা বলতে হবে ঊর্মির বিষয় টা নিয়ে।
সোলেমান ফের ফোনে ডুব দিয়ে বলল-
“ মহসিন আলী কি ভালো হয়ে গেছে নাকি? অনেক দিন হলো সংসদে দেখি না। আমার পেছনেও লাগতে দেখি না। ”
“ বোধহয় দেশে নেই। সঠিক জানি না। তোর এক্সের শ্বশুরের খবর। ”
সোলেমান ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলল-
“ শাট-আপ। কিসের এক্স? ফালতু মেয়ে একটা। নিজের রুচি যে এত খারাপ ছিলো সেটা ভেবেই তো রাগ হয়। ঐ মেয়ে আমার শত্রু দলের ছিলো। সেটা জেনেও ওরে আপন করে নিয়েছিলাম। আর ঐ মেয়ে কি করলো? প্রেমের জ্বালে ফাঁসিয়ে আরেকজন কে বিয়ে করে নিলো। ”
মেহরিন কফির মগ নিয়ে আসছিলো। লাস্টের কথা শুনে কফির মগ টা টি টেবিলের উপর রেখে সোলেমান কে জিজ্ঞেস করলো-
“ প্রেমের জ্বালে ফাঁসিয়ে কে কাকে বিয়ে করেছে?”
সোলেমান চমকে উঠলো মেহরিন কে দেখে। কফির মগ টা হাতে নিলো। মেহরিন ফের জিজ্ঞেস করলো-
“ কি হলো বলুন? ”
সোলেমান কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। আর একটু পরই আসতো। আর ইব্রাহিম কেনো কথাটা তুলতে গেলো? সব দোষ ওর। সোলেমান ইব্রাহিমের দিকে আঙুল তাক করে বলল-
“ ইব্রাহিমের এক্স ইব্রাহিম কে প্রেমের জ্বালে ফাঁসিয়ে আরেকজন কে বিয়ে করে নিছে। সেটাই বলছিলাম। কিরে ইব্রাহিম বল তোর ভাবি কে। ”
ইব্রাহিম ভরকে গেলো। তার এক্সা! সে জীবনে একজন রে পছন্দ করছে সেই একজন কেই তো বিয়ে করে নিছে।
সোলেমান চোখের ইশারায় শাঁসালো। ইব্রাহিম বাধ্য ছেলের মতো বলল-
“ হ্যাঁ আমার একটা এক্স ছিলো। তার কথাই বলছিলাম। মেয়েটা আমাকে ধোঁকা দিয়ে আরেক জায়গায় বিয়ে করে নিছে। ”
মেহরিন চুপচাপ শুনলো। আহারে,কিসের জন্য যে এরা প্রেম করে বিয়ের আগে। ভাগ্যিস সুলতান সাহেবের কোনো এক্স টেক্স নেই। তাহলে তো মেহরিন বোধহয় দু’দিন নাওয়া খাওয়া ভুলে শুধু কেঁদেই যেত তার জীবনের প্রথম নারী হতে না পারার আক্ষেপে। আবার হয়তো মানিয়েও নিত চুপচাপ। বোধহয় নিজেকে বুঝ দিত যে, প্রথমে কে ছিলো জীবনে সেটা মূখ্য বিষয় না। শেষে কে আছে সেটাই মূখ্য বিষয়।
আবার হয়তো দুটোর একটাও করতো না মেহরিন। ভাগ্য বলে মেনে নিয়ে নিজেকে শক্ত রাখতো। মেহরিনের অনুভূতি সব নির্ভর করছে পরিস্থিতির উপর। কোন ভাবে সে শুনতো আর কোন ভাবে সে রিয়াক্ট করতো।
মেহরিন ট্রে নিয়ে চলে আসতে নিলে পেছন পেছন সোলেমান ও চলে আসে। ইব্রাহিম একা বসে রইলো বাগানে। জীবনে একটা বন্ধু পাইছে ইব্রাহিম। কখনও সোলেমানের দোষ তাকে নিতে হয়। আবার কখনও ইব্রাহিমের দোষ সোলেমান নিজের কাঁধে নিয়ে নেয়।
দাহশয্যা পর্ব ৭৩
ভাগ্যিস সোলেমানের মতো একটা মানুষ তার বন্ধু হয়েছিল। তা না হলে আজ তার ঠিকানা হয়তো তুর্কীর ঐ টর্চার সেলে হতো। তা না হলে সেদিনই ঐ লোকদের হাতে প্রাণ চলে যেত। এক সোলেমান ই সেদিন তাকে বাঁচিয়েছিল,আশ্রয় দিয়েছিল । ছেলেটার কাছে ইব্রাহিম সবসময় ঋণী হয়ে থাকছে।
