হাওয়াই মিঠাই শেষ পর্ব
তামান্না ইসলাম শিমলা
ডাক্তারের চেম্বারের বাইরে বসে নাক টানছে তনয়া। রাগে জিদে তেহরাবকেও দেখতে ইচ্ছে করছে না এখন। তেহরাব নিজেও গম্ভীর মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে কিছুটা দূরে। একটু পরপর ঘাড়ে হাত রেখে চাপ দিচ্ছে, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য।
একই ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। তবে এবার আর তেহরাব অস্থির হচ্ছে না। উল্টো রাগ ও বিরক্ত প্রকাশ পাচ্ছে তার মাঝে। তনয়ার সিরিয়াল আসতেই চেম্বারে প্রবেশ করে তনয়া। নিজেকে স্বাভাবিক করে বসে ডাক্তার মনিরার সামনে।
“দুজনেই সুস্থ আছে চিন্তার কোনো কারন নেই। তবে সেই প্রথম দিনের কথাটায় আবার বলতে হচ্ছে। এই সময়ে একটু সাবধানে থেকো। ওষুধ কিছু লিখে দিচ্ছি ঠিক মতো নিও।”
আরো কিছু টুকটাক কথা শেষে বেরিয়ে আসে তনয়া। তনয়াকে বেরিয়ে আসতে দেখে তেহরাব কিছু না বলে নিজেও পা বাড়ায় সামনের দিকে। হাসপাতালের বাইরে এসে থামে দুজনেই তবে তেহরাব এবারও কিছু বলল না। তনয়া নাক টানলো।
“এখন সব দোষ আমার?”
তেহরাব বাইকে বসল। মাথা ধরেছ তার। তাই তনয়ার কথার কোনো জবাব দিল না।
তনয়াও আর কিছু না বলে বাইকে উঠে বসল। বাইক চলল কিছুদূর। হঠাৎ করেই তনয়া বলে উঠল,
“আমি জানাতাম তো। কিন্তু সুযোগই পাইনি।”
তেহরাব তাচ্ছিল্যে হাসে।
“তুই বলতি? তাও আমাকে? তাও সেটা আমাকে মানতে হবে?”
তনয়া মুখ গোমড়া করে বলে,
“সরি। সত্যি বলতাম তো….
“হয়েছে থাম। এখন কিছু একটা হয়ে গেলে তখন তো সব দোষ আমাকেই দিতি।”
তেহরাবের গম্ভীর অভিমানী স্বর। তনয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“সরি প্লিজ। এখন তো আমি আর বাবু দুজনেই সুস্থ আছি। প্লিজ আর রেগে থাকবেন না।”
তেহরাব আর জবাব দেয় না। সোজা চলে আসে বাড়িতে। তনয়াকে নামিয়ে দিয়ে তৎক্ষনাৎ চলে যায় কিছু না বলেই। তনয়া জিজ্ঞেস করলেও জবাব দেয় না তেহরাব। কে জানে কোথায় যাচ্ছে।
“আম্মু পাপা কুতায়?”
ফোন হাতে নিয়ে বিছানায় বসে আছে তনয়া। সন্ধ্যা নেমেছে ধরণীর বুকে। আরিশের কন্ঠ পেয়ে পেছন ফিরে তাকায় তনয়া। আরেকবার ফোনের মেসেজটা পড়ে নিয়ে বলে,
“তিতলিকে ডাক দাও।”
“কেন?”
“আমরা যাব এক জায়গায়।”
আরিশ খুশিতে আত্মহারা। সে হাসতে হাসতে চলে যায় তিতলির কাছে।
কিছুসময় বাদে তিতলিকে নিয়ে আবারো তনয়ার কাছে আসে। তনয়া দুজনকে সুন্দর করে সাজিয়ে দেয় গুজিয়ে তৈরি করে দেয়। কিছুক্ষণ আগেই তেহরাবের নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছে তনয়ার কাছে। তেহরাব তিতলি ও আরিশকে নিয়ে বাড়ির বাইরে দাঁড়াতে বলেছে। তনয়া রিপ্লাই করে কারন জানতে চেয়েছিল অবশ্য তবে আর কোনো জবাব আসেনি। তনয়া থ্রি-পিস পরে মাথায় ওড়না পেঁচিয়ে নিল। বাচ্চাদেরও তৈরি করা শেষ।
নিচে এসে তাসলিমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাইরে আসে। তেহরাব গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
হয়তো তাদের অপেক্ষাতেই আছে। তেহরাবকে দেখে তিতলি ও আরিশ দৌড়ে যায় তার কাছে। তেহরাব দুজনকেই কোলে তুলে নেয়। আরিশ তিতলি একসাথে তেহরাবের গালে চুমু খেয়ে বলে,
“কুতায় যাব পাপা.?”
তেহরাব নিজেও দুজনের গালে চুমু খেয়ে নেয়। দুজনকে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে বলে,
“যাচ্ছি কোথাও একটা।”
তেহরাব নিজে ড্রাইভিং সিটে উঠে বসে। তনয়ার দিকে তাকাতেও দুজনের চোখাচোখি হয়। তনয়া তৎক্ষণাৎ তেহরাবের পাশের সিটে বসে পরে। তেহরাব গাড়ি স্টার্ট করে। গোটা রাস্তায় দুজনের মাঝে কোনো কথা হল না। গাড়ি এসে থামলো একটি মেলার সামনে। জমজমাট পরিবেশ।
হুট করে মেলায় আসার কারন কি? তনয়া অবাক হয়ে মেলার দিকে তাকিয়ে আছে। আরিশ তিতলি তো মহাখুশি।
“পাপা তাত্তারি দরজা কুলে দাও। বাইরে দাব।”
তিতলির বলা শেষ হতে না হতে আরিশও বলে উঠে,
“পাপা আইসকিম, আইসকিম খাব পাপা।”
তেহরাব পেছনে তাকিয়ে হাসে। হাসি মুখেই বলে,
“সব হবে চলো।”
তেহরাব তনয়ার দিকে তাকায়। তনয়া অবাক নয়নে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। তেহরাব ভ্রু নাচিয়ে হাসে। মুখে বলে,
“চলুন ম্যাডাম ঘুরে আসি।”
তনয়া মুখেও ফুটে উঠে প্রফুল্লতার হাসি।সবাই নেমে পরে গাড়ি থেকে।তেহরাব এক হাতে তিতলি ও অপর হাতে তনয়ার হাত ধরে রেখেছে। তনয়াও আরেক হাতে আরিশকে ধরে রেখেছে। আজ প্রথম বারের মতো মেলায় ঘুরছে বাচ্চাদুজন। তনয়ার কাছে প্রথম না হলেও অনেক বছর পর আসা।
“পাপা ঘোড়া চড়ব।”
তিতলির কথা শুনে সবাই তাকায় সামনের দিকে। মেয়ের বায়না কি তেহরাব পূরণ না করে থাকতে পারে? তিতলি ও আরিশ দুজনকেই উঠেয়ে দিল ঘোড়ায়। বাচ্চাদুটো একদমই ভয় পাচ্ছে না উল্টো হাসছে। সেই হাসির দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে তনয়া। বাম হাতটা আপনা-আপনি পেটে চলে গেল। বিড়বিড় করে বলল,
“তনয়া তুই সত্যি ভাগ্যবতী। এত সুখ লেখা ছিল তোর কথালে? এই অপয়া মেয়ের কপালে পৃথিবীর সকল সুখ এসে জমা হয়েছে।”
“কি ভাবছেন ম্যাডাম?”
তনয়া চমকায়। চটজলদি তেহরাবের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। তনয়া তেহরাবের বাহু আঁকড়ে ধরে তাতে মাথা রাখে। তাকায় আরিশ তিতলির হাস্যজ্জ্বল মুখশ্রীর দিকে। মৃদু হেসে বলে,
“ভাবছি আপনার তনয়া এত ভাগ্যবতী কেন। এত সুখী কেন।”
তেহরাব নিজেও বাচ্চাদের দিকে তাকাল।
“তারপর? ভেবে কি জবাব পেলি?”
তনয়া মাথা উচু করে তেহরাবের দিকে তাকায়। অশ্রুসিক্ত নয়ন সাথে হাস্যজ্জ্বল মুখশ্রী।
“কারন আপনাকে পেয়েছি। আপনি ছিলেন, আছেন, থাকবেন বলেই তনয়া সুখী। এতটা সুখী।”
তেহরাব হাসে। আলতো করে জড়িয়ে নেয় তনয়াকে।
“আর তেহরাব সুখী তার এলোকেশীকে পেয়েছে বলেই। “
তনয়া চোখ বন্ধ করে নেয়।
“তেহরাব।”
তেহরাব ছোট করে হুমি নেয়।
“জ্বি বলুন।”
তনয়া তেহরাবের কাঁধে মাথা রেখেই বলে,
“ভালোবাসি।”
তেহরাব হাসে। প্রশ্ন করে,
“কতটা?”
তনয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে।
“যতটা আপনি কল্পনাও করতে পারছেন না ঠিক ততটা।”
তেহরাব নিজেও চোখ জোড়া বন্ধ করে তনয়ার মাথার উপর নিজের মাথার ভর ছেড়ে দেয়।
“আমিও ভালোবাসি।”
“কতটা?”
“অল্প অল্প।”
তনয়ার কপালে ভাজ পরলো।
“অল্প থেকে বেশি হবে কবে?”
তেহরাব একই অবস্থায় থেকেই বলে,
“না হলে কি বেশি ক্ষতি হয়ে যায়?”
তনয়া হাসে,
“উহু। আপনি বরং আমাকে অল্প ভালোই বাসুন। আমি বরং আপনাকে বেশি ভালোবাসব। তাতেই চলবে।”
তাদের কথার মাঝে বাচ্চারা রাইড থেকে নেমে ছুটে এসেছে তাদের কাছে। তেহরাব দুজনকেই কোলে তুলে নিল। আবারো ঘুরতে লাগলো মেলায়। সাথে আরিশ তিতলিকে খেলনা কিনে দিচ্ছে। খেলনা পেয়ে ওদের খুশি আর দেখে কে। একটু পরপর তেহরাবকে চুমু খাচ্ছে দুজনে। সেদিকে তাকিয়ে হাসছে তনয়া।
“মামা হাওয়াই মিঠাই নেবেন?”
থেমে যায় তেহরাব। পাশ ফিরে তাকায় হাওয়াই মিঠাই নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক মধ্যবয়স্ক লোকের দিকে। মুচকি হেসে বলে,
“দিন সবাইকে একটা করে।”
মামা খুশি হলেন। তিতলি, আরিশ ও তনয়ার হাতে একটা করে হাওয়াই মিঠাই ধরিয়ে দিল। তেহরাব টাকা পরিশোধ আবারো হাঁটা শুরু করল।
“পাপা আমারতা পিংক কালার।”
“আমারতা ইউলো কালার।”
তেহরাব হাসে দুজনের কথা শুনে। তেহরাব তাকায় তনয়ার হাতে থাকা হাওয়াই মিঠাই এর দিকে। শুভ্র রঙের হাওয়াই মিঠাই। তেহরাব আরিশ তিতলি বেবি প্লে গ্রাউন্ডে ছেড়ে দিল। দুজনে বসলো পাশের একটি বেঞ্চে। তনয়া হাওয়াই মিঠাই হাওয়াই দুলোতে দুলোতে বলল,
“জানেন আপনি যখন প্রথম দিকে আমার আশে পাশে ঘুরঘুর করতেন আমার প্রচুর বিরক্ত লাগতো। অথচ সেই বিরক্তিকর মানুষটি এখন আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি। আমার বাচ্চার বাবা। আমার গোটা পৃথিবী।”
তেহরাব হাসে।
“আর তুই আমার পৃথিবী, আমার জীবনের আলোড়ন।”
তনয়া হাওয়াই মিঠাইটা তেহরাবের মুখের সামনে ধরে। দুজনেই দুদিক থেকে কামড় বসায়। খিলখিল করে হেসে উঠে তনয়া।
“আমাদের এই ভালোবাসার কি নাম দেওয়া যায় বলুন তো?”
তেহরাব হাওয়াই মিঠাইয়ের দিকে তাকিয়ে তনয়ার দিকে তাকায়। মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে বলে,
“হাওয়াই মিঠাই। যে হাওয়াই মিঠাই রাঙিয়ে দিয়েছে আমাদের জীবন নিজেদের রঙে। যে হাওয়াই মিঠাই মিষ্টত্ব প্রদান করেছে আমাদের সম্পর্কে নিজেদের মিষ্টত্বে। যে হাওয়াই মিঠাই হুটহাট মিলিয়ে গিয়েও কোথাও এসে জড়ো হয়েছে নিজেদের স্থানে। আমাদের ভালোবাসাটা সেই হাওয়াই মিঠাই।”
তনয়া হাসে। তেহরাবের কাঁধে মাথা রাখে। তেহরাব তনয়ার হাতটা নিজের কাছে নিয়ে তার হাতে এক মুঠো কাঁচের চুড়ি পরিয়ে দেয়। তনয়া অবাক হয়। চুড়ি গুলো কখন কিনল তেহরাব?
তনয়ার বিস্মিত চেহারার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে তেহরাব। আলতো করে চুমু খায় তনয়ার কপালে। তনয়াকে নিজের কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে দিয়ে বলে,
“শুভ জন্মদিন এলোকেশী। এভাবেই সারাজীবন পাশে থাকিস। এই পাগল, উৎশৃঙ্খল, বেপরোয়া তেহরাবকে সামলে রাখিস। তেহরাব যে তনয়ার কাঙালি। “
তনয়া দ্বিতীয় দফায় চমকায়। প্রতিবারের মতো এবারের জন্মদিনেও তেহরাব তনয়াকে চমকে দিয়েছে। তনয়া স্নিগ্ধ হাসে।
“ভালোবাসি।”
“আমিও ভালোবাসি।”
“আমাদের ভালোবাসার নাম কি?”
তেহরাব তনয়া দুজনেই সামনের দিকে তাকায়। দুজনেই বিড়বিড় করে বলে উঠে,
হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৫৪
“হাওয়াই মিঠাই”
এই জনম জনমের হাওয়াই মিঠাই এর মতো ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ থাকুক তেহরাব তনয়া নামক দুটি দেহ, দুটি প্রাণ। দুনিয়ার সকল বাঁধা বিপত্তি ঠেলে তারা ভালো থাকুক। সুখী থাকুক।
আর বেঁচে থাকুক তাদের ভালোবাসা অনন্তকালের জন্য।
সমাপ্ত
