নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৩১
নাজনীন নেছা নাবিলা
নীলা আজ একাই ইউনিভার্সিটিতে যাবে। ইকরার মাথা ব্যথা করছে তাই সে আর যাবে না।আর তাছাড়াও ইকরার তেমন জরুরী ক্লাস নেই আজকে।তাই না গেলেও চলবে।এই কারণেই নীলা আজ আর ক্যাব নিল না। ভাবলো যেহেতু একা একা যাবে তাই আজ না হয় বাসে করেই যাক।এতে করে প্যারিস শহরটি বাসে করে দেখতে পাবে।
নীলার আ্যপার্টমেন্ট থেকে বাস স্ট্যান্ড বেশি দূরে না। নীলা বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে কিছুক্ষণ বাসের জন্য অপেক্ষা করতেই বাস তার সময় মতোন চলে এলো।ভির আছে মানুষের অনেক।নীলা এই ভীরের ভেতরেই বাসে চড়ে উঠলো। বাসে উঠার সময় মনে হলো কেউ তাকে স্পর্শ করেছে। নীলা ভাবল হয়তো ভীরের কারণে ভুল বসত এমনটা হয়েছে।বাসে চড়ে উঠলো। ভীষণ ভীর বাসে।বাসের ভীড় যেন আজ বড্ড বেশি অসভ্য। নীলা হাতলে শক্ত মুঠি চেপে ধরে টাল সামলানোর চেষ্টা করছিল। ঠিক তখনই সে অনুভব করল—পিছন থেকে একটা অস্বস্তিকর স্পর্শ। প্রথমটায় ভেবেছিল বাসের ঝাঁকুনিতে হয়তো কারো অনিচ্ছাকৃত ধাক্কা লেগেছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড যেতেই ভুল ভাঙল। স্পর্শটা কেবল স্থির নয়, বরং অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং কদর্যভাবে সচল।
নীলার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমশীতল স্রোত নেমে গেল। বাসের ভ্যাপসা গরমেও তার হাত-পা বরফ হয়ে আসছে। লোকটার শরীরের তপ্ত নিশ্বাস প্রায় তার ঘাড়ের কাছে। নীলা একটু সরে দাঁড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল, কিন্তু চারপাশের ভিড় তাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে। প্রতিবার বাস ব্রেক কষলে সেই অশুভ হাতের চাপ আরও বাড়ছে। ঘেন্নায়, অপমানে তার চোখ ফেটে জল আসতে চাইছে, কিন্তু গলার কাছে একটা পাথরের মতো পিণ্ড আটকে আছে। চিৎকার করে প্রতিবাদ করতে গিয়েও যেন সে শব্দ হারিয়ে ফেলেছে। বাসের সাধারণ হট্টগোলের মাঝে অত্যন্ত নিঃশব্দে কেউ একজন তার অস্তিত্বকে অপমান করে চলেছে, আর চারপাশের মানুষগুলো নির্বিকার মুখে জানলার বাইরে তাকিয়ে আছে। কিন্তু নীলা তো চুপ করে থাকা মেয়ে না।পেছন ফিরে দেখলো এক যুবক তার দিকে তাকিয়ে লুচু হাসি দিচ্ছে। ঘৃন্যায় নীলার গা গুলিয়ে এলো। দাঁতে দাঁত পিষে যুবকটির দিকে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ফরাসি ভাষায় জিজ্ঞেস করল ____
সমস্যা কি আপনার?মেয়ে মানুষকে দেখলেই ছুঁতে ইচ্ছে করে?
যুবকটি কিছু বলল না বরং সাহস করে নীলা বুকের দিকে হাত বাড়াতে লাগল।বাস তখন একটি স্ট্যান্ডে থেমেছিল।তাই পেছন থেকে কয়েকজন লোক নেমে যাওয়ায় ভির কিছুটা কম হয়। নিজের বুকের দিকে বাড়তে থাকা হাত দেখে নীলা মাথায় রক্ত চড়ে বসলো। রক্ত চোখে তাকিয়ে যুবকটির হাত শক্ত করে চেপে ধরল। যুবকটির চোখ বিষ্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। নীলা বাম হাত দিয়ে যুবকটির হাত শক্ত করে ধরে ডান হাত দিয়ে কষে চড় বসালো।বাসের সবাই এক মূহুর্তের জন্য থমকে গেল।সবার দৃষ্টি এখন এই যুবক যুবতীর দিকে।চড় খেয়ে যুবকটির ইগো হার্ট হলো।সে কিছু বলতে যাবে তার আগেই নীলা নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে যুবকটি কে ধাক্কা দিল।এই অনাকাঙ্ক্ষিত ধাক্কার জন্য যুবকটি প্রস্তুত ছিল না এবং পেছনে মানুষ না থাকায় পরে গেল যুবকটি।নীলা আজকে হিল পরে এসেছিল।রাগে জেদে যুবকটির দুই পায়ের গোপন স্থানের মাঝখানে হিল সমেত পা রেখে ভয় দিয়ে দাঁড়ায় এবং বলে___
ইউ আকসড ফর দিস।
যুবকটি ব্যাথায় চিৎকার করে উঠল।সবাই অবাক দৃষ্টিতে এদিকেই তাকিয়ে আছে।নীলা নিজের পা সরিয়ে বলতে লাগলো ____
You should be ashamed before touching girls in a bad way. I hope you won’t want to touch any girl from now on.
বাসের মানুষের যা বোঝার বোঝা হয়ে গেল। এইটা বাংলাদেশ না যে মেয়েদেরকেই দোষারোপ করা হবে। নীলার সাহস দেখে সামনে থাকা একটি মেয়ে তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটিকেও থাপ্পড় দেয়। হয়তো ছেলেটিও তাকে বাজে ভাবে ছুঁড়েছে। তারপর আর বাসে থাকা লোকজন এই দুই যুবককে বাস থেকে নামিয়ে দেয় আর সবাই নীলার জন্য তালি বজালো। যুবকটির বন্ধুরা মিলে তাকে ধরে নিয়ে গেল।
আজকে লিসা ইউনিভার্সিটিতে এসেছে ঠিকই কিন্তু সে খুব চুপচাপ।নীলা ক্লাস রুমে ঢুকেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল লিসা কে দেখে। আজকে লিসাকে চুপচাপ দেখাচ্ছে।নীলা অবাক হলেও পরক্ষণে খুশি হলো লিসা কে শান্ত দেখে।নীলা সামনের সিটে বসল। নীলা বসতেই লিসা এসে নীলার পাশে বসল। নীলা কিছুটা অবাক হলেও লিসা কে পাত্তা দিল না।
লিসা নিচু স্বরে বলতে লাগলো ___
তুমি কি কোনো গুন্ডি?
নীলার চোখ আপনা আপনি বড় হয়ে গেল লিসার কথা শুনে।সে বুঝতে পারছে না লিসা হঠাৎ তাকে এমন প্রশ্ন কেন করছে। কিন্তু তাকে তো জানতে হবে সবটা।তাই স্বাভাবিক ভাবেই বলল____
তোমার যদি আমাকে দেখে গুন্ডি মনে হয় তাহলে আমি গুন্ডি।
লিসার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।এখন তার মনে হচ্ছে নীলা সেদিন তাকে কিডন্যাপ করেছিল। সে তো এইটার প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়বে।তাই নীলার কানের কাছে গিয়ে রাগান্বিত কন্ঠে বলল____
তাই বলে আমাকে কিডন্যাপ করবে তুমি? আমাকে ভয় দেখানোর সাহস করেছো তুমি।এত সহজে তো তোমাকে আমি ছাড়ছি না।আর কিডন্যাপ যেহেতু করেছিলে তাহলে পুরুষের সাহায্য নিলে কেন?আর আমার সামনে আসতে সাহস থাকলে। কিন্তু তুমি তা না করে অন্য রুমে থেকে পুরুষকে দিয়ে কথা বলিয়েছো।এই তোমার সাহস।
লিসার কথা শুনে নীলা যেন আকাশে।চোখ বের হয়ে আসার উপক্রম।লিসা কে কেউ কিডন্যাপ করেছিল এবং লিসা ভাবছে সেই ব্যক্তিটি নীলা। কিন্তু নীলার কেন জানি মিহাল কে সন্দেহ হচ্ছে।নীলা সন্দেহ তখনই পরিষ্কার হয়ে গেল যখন লিসা বলল___
আর ওই পুরুষের কন্ঠ অনেকটা মিহাল স্যারের মতোন।তোমার কি মনে হয় এইসব করে আমার এবং আমার মিহাল স্যারের মাঝে ঝামেলা তৈরি করতে পারবে? তাহলে ভুলে যাও।মিহাল স্যার কেবল আমার।
লিসা যে এতক্ষণ ধরে নীলাকে অহেতুক দোষারোপ করে যাচ্ছে এতে নীলা ক্ষিপ্ত না হলেও যখন লিসার মুখ থেকে যখন শুনলো মিহাল নাকি তার তখন যেন নীলার মাথা গরম হয়ে গেল। নীলা জীবনে প্রথমবার কারোর উপর হিংসে অনুভব করল। এতক্ষণ নিজের বইয়ের দিকে দৃষ্টি থাকলেও এখন লিসার দিকে তাকালো এবং দাঁতে দাঁত চেপে
বলল ____
আমার সাহস আমি এখনো দেখাইনি তোমাকে। আর বেশি মিহাল মিহাল করবে না জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো।মিহাল তোমার স্যার হয় তার কাছ থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে থাকবে। মাইন্ড ইট।
নীলার হুমকি লিসার শুনে মুখ শুকিয়ে গেল। যত যাই হোক সেদিন রাতে কিডন্যাপ হবার পর থেকে সে নীলাকে কিছুটা ভয় পাচ্ছে। যখন সেই রাতে বাড়ি ফিরে ছিল সে, রাতে একটুও ঘুমায় নি সে। সারারাত একটা কথাই ভেবেছিল যে এই কাজটি হয়তো নীলা করেছে। তাই তো আজ ইউনিভার্সিটিতে এসে আগে নীলা কে প্রশ্নটি করল। এখন মিলার হুমকি শুনে সে শিওর হয়ে গেছে যে সেদিন তাকে নীলা কিডন্যাপ করেছিল। লিসা আরো কিছু বলতে যাবে তার আগেই প্রফেসর চলে এলো। লিসা এখান থেকে উঠে গিয়ে নিজের বেঞ্চে বসলো।
নীলা জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে নিজের রাগ কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছে।তার ইচ্ছে করছে লিসার যতগুলো চুল এখনো বাকি আছে সেগুলো টেনে ছিড়ে ফেলতে। নীলা দাঁতে দাঁত চেপে একা একাই বিড়বিড় করেছে ___
কত বড় সাহস আমার পেয়ারে লাল কে নাম ধরে ডাকে। ইচ্ছে করছিল থাবড়িয়ে কান চাঁপা লাল বানিয়ে দিতে। শিক্ষককে সম্মান করার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই এই মেয়ের। আরেকবার ওর মুখে যদি মিহাল নাম শুনেছি তাহলে ঘুষি মেরে দাঁত ভেঙে ফেলবো। যত্তসব।
একা একা বিড় বিড়ানি যখন শেষ হলো তখন নীলা উপলব্ধি করতে পারল সে এতক্ষন জেলাস ফিল করছিল তাও আবার লিসাকে।নীলা অজান্তেই কপাল চাপড়ালো।আর মনে মনে বলল ___
হায় আল্লাহ আমি কিনা পেয়ারে লালের জন্য জেলাস ফিল করছি? কি হয়েছে আমার? উফ্ ফুফু সব দোষ তোমার। সেদিন তুমি সেই সব কথা বলার পর থেকে আমার মাথা থেকে তোমার ছেলে সরছে না।কি যে হচ্ছে আল্লাহ জানে।
নীলা আর কিছু ভাবলো না। চুপচাপ ক্লাসে মনোযোগী দিল। একটির পর একটি ক্লাস শেষ হয়ে গেল। এখন মিহালের ক্লাসের পালা।এই প্রথম নীলার মনে এক অজানা অনুভূতি বর্ণা বইয়ে দিয়ে যাচ্ছে। নীলার গায়ের পশম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যাচ্ছে।নীলা বোরকার অংশ চেপে ধরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। এমন সময় মিহাল প্রবেশ করল। কিন্তু আজকে আর নীলার দিকে তাকালো।এর পেছনে অবশ্য দুটি কারণ আছে। একটি হলো নীলার দিকে তাকালে সে ঠিক থাকতে পারে না। ইচ্ছে করে নীলাকে সব সত্যি বলে দিয়ে ইরফানের সাথে ডিভোর্স করিয়ে দিতে।আর দ্বিতীয় কারণ হলো গতকাল তার মা নীলার সামনে যা যা বলেছে এতে অবশ্যই নীলা লজ্জা পেয়েছে। এবং সে আর নীলার লজ্জা বাড়াতে চায় না।তাই নিজের মতো করে পড়িয়ে যাচ্ছে। নীলাও নিজের বাজে চিন্তা ভাবনা দূর করে পড়ায় মন দিয়েছে। কিন্তু তার মাথায় একটা কথাই ঘুরছে সেটি হলো মিহাল কি লিসা কে কিডন্যাপ করেছিল। কিন্তু কেন? আসলেই কি মিহাল নীলাকে এতটাই ভালোবাসে ফেলেছে যে নীলা জন্য এমন কাজও করতে পারে? নীলার যে ভালোবাসায় বিশ্বাস নেই তবুও কেন মিহালের প্রতি দুর্বল হয়ে পরছে? নীলার জানা নেই। কিন্তু নীলা একটি জিনিস জানতে চায় যে মিহাল কেন লিসা কে কিডন্যাপ করেছিল। এবং তার জন্য তাকে ক্লাস শেষে মিহালের সাথে কথা বলতে হবে।
দিগন্ত থেকে ধেয়ে আসা কালচে মেঘের চাদর ঢাকতে থাকে নীল আকাশ, দূরে মেঘের গর্জন আর অদ্ভুত বাতাসে গাছের পাতাগুলো যেন আসন্ন বৃষ্টির সংকেত পেয়েই ভয়ে কাঁপতে শুরু করে।জানালা দিয়ে সুরসুর করে ঠান্ডা হাওয়া আসছে।
ইকরা বসে বসে রিসল দেখছিল এমন সময় তার ফোন কল এলো। জেন্টলম্যান নাম জ্বল জ্বল করে ভেসে উঠল তার ফোনের স্ক্রিনে। ইকরার ঠোঁটে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। খুশি মনে ফোন রিসিভ করে সালাম দিল।মুনভি মুচকি হেসে সালামের জবাব দিয়ে বলল____
কেমন আছেন ফিউচার ডক্টর ?
ইকরা বাচ্চাদের মতোন খিলখিলিয়ে হেসে দিল।মুনভির যেন প্রান জুড়িয়ে গেল এই হাসির শব্দে।ইকরা হাসতে হাসতে বলল____
আমি তো এখনো ডাক্তার হয়নি মিস্টার ডাক্তার সাহেব।
মুনভি ঠোঁট কামড়ে হাসলো। তারপর বলল____
তার জন্যই তো ফিউচার ডক্টর বললাম।
ইকরা ফিচলে হেসে বলল____
যদি ডাক্তার হতে না পারি তাহলে কি বলে ডাকবেন?
মুনভি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল ___
ফিউচার ওয়াইফি।
ইকরা মূহুর্তেই থমকে গেল।কি প্রতি উত্তর করবে বুঝতে বেগ পেতে হলো তার।ইকরা প্রায় অনেক্ষণ নীরব থাকলো । ইকরা কে নীরব থাকতে দেখে মুনভি আবেগময় সুরে বলল___
এখন আপনি কি কিছু বলবেন নাকি আপনার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনে মন ভরতে হবে? যদি বলে তাহলে আমি এভাবেই গোটা জীবন কাটিয়ে দিতে রাজি।
ইকরা শ্বাস ভারী হয়ে উঠল মুনভির বলা কথা শুনে। হঠাৎ বাইরে ঝুম বৃষ্টি শুরু শুরু হলো। বারান্দায় গ্লাস এবং জানালা গুলো খোলা থাকার কারণে বৃষ্টির পানি আসছে রুমের ভেতর।ইকরা বিছানা ছেড়ে নেমে ফোন হাতে নিয়েই জানালা বন্ধ করে বারান্দার গ্লাস লাগাতে যাচ্ছিল ঠিক সেই সময় মুনভি গান গেয়ে উঠলো _____
হো..আগে কত বৃষ্টি যে দেখেছি শ্রাবণে।
জাগেনি তো এতো আশা ভালোবাসা এ মনে।
সেই বৃষ্টি ভেজা পায়ে
সামনে এলে হায় ফোটে কামিনী।
আজ ভিজতে ভালো লাগে
শূণ্য মনে জাগে প্রেমের কাহিনী।
সেই বৃষ্টি ভেজা পায়ে
সামনে এলে হায় ফোটে কামিনী।
আজ ভিজতে ভালো লাগে
শূণ্য মনে জাগে প্রেমের কাহিনী।
রিমঝিম এ ধারাতে, চায় মন হারাতে।
রিমঝিম এ ধারাতে, চায় মন হারাতে।
ইকরা আর বারান্দার গ্লাস বন্ধ করল না। বরং মুনভি গান শুনে সে নিজের দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে চোখ বন্ধ করে নিল। বৃষ্টির ফোঁটা এসে তাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে সেইদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। হয়তো প্রথম প্রেমের প্রথম অনুভূতি।হয়তো ইকরার তার জেন্টলম্যান কে ভালোবাসতে শুরু করেছে।
ক্লাস শেষ হতে না হতেই সব স্টুডেন্টরা একে একে বেরিয়ে গেল।মিহাল ঘন্টা পড়ার সাথে সাথেই বের হয়ে গেছে। নীলা কোনমতে ব্যাগ গুছিয়ে ছুটে চলল মিহালের পেছনে।মিহাল করিডোর দিয়ে হাঁটছিল হঠাৎ মনে হলো তার নীলাঞ্জনা তার খুব কাছে। এমন অনুভূতি হতে থেমে গেল। মনে মনে
বলল ____
যদি নীলাঞ্জনা কে পাওয়ার সম্পূর্ন চান্স থাকে তাহলে নীলা এখন আমার খুব কাছে থাকবে।
কথাটি বলেই মিহাল যেইনা চোখ বন্ধ করল অমনি তার পেছন থেকে নীলার কন্ঠ ভেসে এলো।নীলা বলল___
প্রফেসর কিছু কথা ছিল।
নীলার কন্ঠ শুনে মিহালের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু তার মনে হচ্ছে সে স্বপ্ন দেখছে তাই চোখ খুলছে না।নীলা যখন দেখলো মিহাল এখনো তাকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে আছে সে মিহালের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।মিহাল কে চোখ বন্ধ করে থাকতে দেখে তার কপালে ভাঁজ পরলো। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল ___
চোখ বন্ধ করে আছেন কেন?
মিহাল চোখ বন্ধ রাখা অবস্থাতেও বলল___
চোখ খুললেই তুমি হারিয়ে যাবে নীলাঞ্জনা। চোখ খুললে হয়তো তোমার লীলা দেখতে পারি লীলা রানী কিন্তু নীলাঞ্জনা হয়ে ঠিক তখনই কাছে আসো যখন আমায় চোখ বন্ধ থাকে।তাই তো তোমাকে নিয়ে কল্পনা করতে ভালো লাগে।
মিহালের বলা কথাগুলো শুনে নীলার গালে লজ্জার আভা ফুটে উঠল।মিহাল কি বুঝতে পারছে তার কথাগুলো নীলাকে কতটা লজ্জা দিচ্ছে? হয়তো না ।যদি জানতে পারতো তাহলে কি করতো? নিজের কথা গুলো বলা বন্ধ করতো নাকি নীলা কে লজ্জা দেওয়ার জন্য আরো বেশি বেশি করে বলতো? নীলার জানা নেই।নীলা জানতে চায়ও না কারণ পরে দেখা যাবে লজ্জায় আর ইউনিভার্সিটিতে আসতে পারবে না।
নীলা নিজেকে সামলিয়ে বলল_____
লিসা কে কিডন্যাপ করেছিলেন কেন?
মিহাল চোখ বন্ধ রেখেই বলল___
তোমাকে আঘাত করার চেষ্টা করেছিল তাই।
কথাটি বলেই সঙ্গে সঙ্গেই চোখ খুলে ফেলল। বলে ফেলেছি এবং কি ঘটছে উপলব্ধি করতে পারলো সে।দেখলো তার সামনে নীলা বাহু ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে। মিহাল শুকনো ঢোক গিলে ভীতু হাসলো।নীলা সরু চোখে তাকিয়ে
বলল___
কেন করছেন এমন? আমি কি একবারও বলেছিলাম আমার জন্য এমনটা করতে? তাহলে কেন করছেন আপনি? কি বোঝাতে চাচ্ছেন? কি প্রমাণ করতে চাচ্ছেন?
মিহাল কিছুক্ষণ নিরব থাকলো। সে নিজের মনের অনুভূতি গুলো এখন বলতে চাইনি কিন্তু পরিস্থিতি এমন হয়ে গিয়েছে যে এখন তার সব সত্য কথা বলে দেওয়া উচিত।তাই এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল___
আই লাভ ইউ টু নীলা।
নীলার মনে হলো যেন সে ভুল শুনেছে।আর সে তো আই লাভ ইউ বলেনি তাহলে কেন মিহাল তাকে আই লাভ ইউ টু বলবে।
নীলা বিরক্তি নিয়ে বলল___
কিন্তু আমি তো আপনাকে আই লাভ ইউ বলেনি। তাহলে আপনি কেন আই লাভ ইউ টু বলছেন? আপনার কি মাথা ঠিক আছে?
কথা বলতে বলতে তারা করিডোর পার করে ইউনিভার্সিটির গেইটের কাছে চলে এসেছে। এদিকটা এখন ফাঁকা। বেশিরভাগ স্টুডেন্ট হয়তো চলে গিয়েছে আর বেশিরভাগ স্টুডেন্ট লাইব্রেরীতে গেছে। আবার অনেকে ইউনিভার্সিটি’র অন্য পাশে বসে আড্ডা দিচ্ছে।
মিহাল বাঁকা হেসে নীলার দিকে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করল ___
কি বলোনি আমাকে?
নীলা নাক ফুলিয়ে বলল ___
আই লাভ ইউ।
মিহাল মুচকি হেসে বলল ____
আই লাভ ইউ টু।
নীলা বড় বড় চোখ তাকিয়ে রইল মিহালের পানে।মিহাল ঠোঁট কামড়ে চোখ টিপ মারলো। নীলার কাশি উঠলো।এমন পরিস্থিতিতে পরতে হবে সে ভাবতে পারেনি।নীলাকে কাশতে দেখে মিহাল হাসলো। কিন্তু মিহালের হাসি এক নিমিষেই মিলিয়ে যায় যখন নীলা বলল____
আমি একজন বিবাহিত মেয়ে প্রফেসর।
মিহালের মুখ চুপসে গেলেও সে নিজের যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে বলল___
আমি জানি নীলাঞ্জনা।
নীলা অবাক হলো না কারণ সে জানে যে মিহাল তার সম্পর্কে ভুল তথ্য জানে। কিন্তু নীলা মিহাল কে স্বাভাবিক দেখে অবাক হলো। তবুও কিছুটা রাগ দেখিয়ে বলল___
কি চান আপনি?
মিহাল পকেটে হাত গুজে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল__
বিয়ে করতে চাই তোমাকে।
আজকে যেন নীলার অবাক হাওয়ার দিন।সে ভাবতেই পারেনি মিহাল তাকে বিয়ের কথা বলবে।তাই রাগ দেখিয়ে বলল ____
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৩০
আপনার জানামতে আমি তো বিবাহিত তাহলে আমাকে কেন বিয়ে করতে চান?
মিহাল ঠোঁট কামড়ে হেসে গান গাইলো____
My Heart
Say’s you are mine only Mine.
Never ever leave me behind.
I wanna Be with you every time.
নীলা ভাষা হারিয়ে ফেলল।কি বলবে জানে নেই তার। কল্পনা করতে পারেনি এমন পরিস্থিতি স্বীকার হতে হবে আজকে তাকে। এবং না চাইতেও মনের ভেতর এক অদ্ভুত ভালো লাগায় সে দোলা দিচ্ছে। চাইলেও এই ভালোলাগা থেকে সে নিজেকে দূরে রাখতে পারছে না।
