দাহশয্যা পর্ব ৮৪ (২)
Raiha Zubair Ripti
রাত এখন আনুমানিক তিনটে বাজে। নিবাসের পেছনের জঙ্গল থেকে একাধারে ঝিঁঝিপোকার শব্দ শোনা গেলেও সেই শব্দ নিবাসের ভেতর অব্দি আসতে পারে না। ছাঁদে দাঁড়ালে দেখা যায় এই বিস্তার জঙ্গলের ভেতর কয়েকটা পুরোনো রংচটা দালান রয়েছে। সেই দালানগুলোর মধ্যে একটা জলাসারঘর,একটা সালিসিঘর,আর একটা কোষাগার। তবে সব কিছুই এখন অচল। আমজাদ সুলতানের মৃত্যুর সাথে সাথে সব বন্ধ হয়ে গেছে।
সোলেমান ধীর পায়ে রুম থেকে বের হলো। মেহরিনের ঘুমের অপেক্ষায় ছিলো। যখন টের পেলো মেহরিন এখন গভীর ঘুমে ঢুকে গেছে,ঠিক তখনই সোলেমান বের হলো। রুমের দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে করিডর দিয়ে হাঁটা ধরলো। লাইব্রেরি রুমের দিকে যাওয়ার পথে স্টাডি রুমের দিকে চোখ পড়লো। চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে এজওয়ান ঘুমিয়ে আছে। ভ্রু কুঁচকে আসলো। রুম রেখে স্টাডি রুমে ঘুম! চোয়াল দ্বয় শক্ত হয়ে আসলো। শরীরে থাকা চাদর টা এজওয়ানের শরীরে দিয়ে ফের হাঁটা ধরলো। লাইব্রেরির দরজা টা খুলে ভেতরে ঢুকে দরজাটা লাগিয়ে দিলো। কাঙ্খিত এক বইয়ের তাকের সামনে দাঁড়ালো। তারপর একটি নির্দিষ্ট বই ধরে হাল্কা টান দিতেই হাল্কা শব্দ হয়। বইয়ের তাকগুলোর মাঝে একটি তাক স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরে গিয়ে খুলে দেয় গোপন রাস্তা। গোপন রাস্তার সম্মুখে একটা দরজা আছে। সোলেমান একটা কোড লিখলো। কোড লিখতেই দরজাটা খুলে গেলো। সোলেমান ভেতরে ঢুকলো। সরু চিকন করিডরের মতো লাইন। দেওয়ালের সাথে থাকা একটা সুইচ টিপে আলো জ্বালালো। তারপর দ্রুত পায়ে হাঁটা ধরলো। যত ভেতরে ঢুকছে ততই এই গোপন সুড়ঙ্গের আসল রূপ বেড়িয়ে আসছে। চারিদিকে দেওয়ালে র’ক্তের ছাপ। মাটিতে মানুষের হাত পা মাথার হাড়গোড় পড়ে আছে। কোনো স্বাভাবিক মানুষ হুট করে এখানে ঢুকে পড়লে নিশ্চিত ব’মি করে সেন্সলেস ও হতে পারে। করিডরের দুপাশে কক্ষ আছে কয়েকটা। কক্ষ গুলো কয়েদখানার মতো। আগে এখানে মানুষ আঁটকে রাখা হতো। সোলেমান একদম শেষ প্রান্তে গেলো। দেখলো তার চাচা বসে আছে। সোলেমান জিজ্ঞেস করলো-
“ কোথায়? ”
বাশার সুলতান বাহিরের দিকে ইঙ্গিত করে বলল-
“ ওখানে। ”
সোলেমান একবার পাশে তাকালো। জরাজীর্ণ এক কক্ষ। পুরোনো দুটো আসবাব আছে এক কোনায়। আর মাঝখানে আছে বড় একটা “স”মিল মেশিন। যেটা দিয়ে বাহিরের জগতে গাছের কাঠ কাটা হলেও, এই কসাইখানায় কাটা হয় অন্য কিছু। হুম ঠিকই শুনছেন। এই গুপ্ত সুড়ঙ্গপথ দিয়ে বেয়ে আসা জায়গাটার নাম কসাইখানা। এখানে যখন-তখন মানুষ খু’ন করা হয়। আজও হয়তো কাউকে খু’ন করা হবে।
সোলেমান পেছনের দরজা দিয়ে জঙ্গলে চলে গেলো। পেছন পেছন বাশার সুলতান ও আসলো। জলসা ঘরের সেই পরিত্যক্ত দালানের ভেতরে চেয়ারে হাত পা বেঁধে রাখা হয়েছে এক লোক কে। সেই লোকটি একটি নামকরা সংবাদ চ্যানেলের সাংবাদিক। অপরাধ একটাই,সুলতান পরিবারের বিষয়ে অত্যাধিক নাক গলায়। যেখানে প্রতিটি সংবাদমাধ্যম কে সোলেমান বলে দিয়েছে তার পরিবারের বিশেষ করে মেয়েদের ছবি পাবলিশ করতে না সেখানে এই সাংবাদিকের এতো বড় সাহস! তার বউয়ের ছবি ছাপিয়ে দিয়েছে সোজা খবরের কাগজে! সোলেমান তো উত্তম-মধ্যম দিয়েছে সেই প্রতিষ্ঠানের মালিক কে। এখন এটাকে দেখবে।
সোলেমান সোজা সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। হাতে গ্লাভস পড়তে পড়তে বলল-
“ বিবাহিত তুই? ”
লোকটা সোলেমানের গলার আওয়াজ পেয়ে তাকালো। ব্যথায় সারা শরীর জখম হয়ে আছে। তারপরও কোনো রকমে প্রাণ বাঁচানোর আশায় বলল-
“ ভুল হয়ে গেছে মাফ করে দেন। ”
সোলেমান ঘাড় বেঁকিয়ে তাকালো।
“ আমি প্রশ্ন করেছি কি,আর তুই উত্তর দিলি কি? বিবাহিত নাকি অবিবাহিত সেটা বল। ”
“ অ…অবিবাহিত। ”
“ তোর পরিবারে কে কে আছে? ”
“ মা বাবা বড় ভাই। ”
“ তোর বড় ভাই কি করে? ”
“ ব্যাংকে চাকরি করে। ”
“ উমম তাহলে তুই না থাকলেও খুব একটা অসুবিধে হবে না তাদের । তোর বাপ মা কে দেখার মতো কেউ আছে তাহলে। গুড! তা কোন হাত দিয়ে আমার বউয়ের ছবি তুলেছিলি যেন? ডান নাকি বাম? ”
সোলেমান এগিয়ে এসে লোকটার ডান আর বাম হাত ধরে ধরে জিজ্ঞেস করছে। লোকটা ভয়ে বারবার শিউরে উঠছে। তাদের কাজই তো এটা। লোকটা তো ভেবেছিল সোলেমান সুলতান বিবাহিত। তার বউয়ের ছবি খবরে দিলে রিচ বেশি হবে। আর হয়েছেও তাই। সামান্য ছবি প্রকাশ করার জন্য এতো হিংস্রতা! একবার যদি সে ভুলক্রমেও বেঁচে ফিরে তাহলে এই সুলতান পরিবারের মুখোশ টেনে খুলে দিবে। প্রানের মায়া বড় মায়া। লোকটা বলল-
“ ভুল হয়ে গেছে স্যার। সব জায়গা থেকে ছবি সরিয়ে ফেলছি। এবারের মতো মাপ করে দেন। ”
সোলেমান হাতে চাপাতি টা তুলে নিলো। লোকটার বাম হাত টা টেবিলের উপর চেপে ধরে বলল-
“ এটা মোটেও কোনো ভুল নয়। এটা অন্যায়। আমি মানা করে দিয়েছিলাম। শুনিস নি তোরা। অন্যায় করলে তার সাজা পেতে হয়। এটাই নিয়ম। বল কোন হাত দিয়ে তুলেছিস? ডান নাকি বাম? নাকি দু হাত দিয়েই?”
লোকটা বললো না কিছু। শুধু ছেড়ে দিতে বলল। সোলেমান আর পেঁচাল পেড়ে মুখ ব্যথা করতে চাইছে না। সেজন্য চাপাতি দিয়ে ক্রমাগত হাতের উপর কোপ বসাতে লাগলো। যেভাবে আমরা পেঁয়াজ কাটি কুচিকুচি করে। ঠিক সেভাবেই। লোকটা গগনবিদারী করে চিৎকার করতে লাগলো। সোলেমান বিরক্ত হয়ে চাচা কে বলল-
“ চাচা এর চিৎকার বন্ধ করো তো। কানের পর্দা ফেটে যাচ্ছে। ”
বাশার সুলতান এসে কাপড় দিয়ে মুখ বেঁধে দিলো। সোলেমান হাতটা কুচি কুচি করে কাটতে কাটতে কনুই অব্দি কে’টে ফেললো। তারপর অন্য হাত শুরু করলো। লোকটা ছটফট করতে লাগলো। শরীর র’ক্তে ভেসে যাচ্ছে। অন্তরাত্মা ছটফট করছে এই ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায়। কিন্তু পাচ্ছে না। সোলেমান পেতে দিচ্ছে না। আজরাইল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সামনে। প্রাণ নিয়ে তবেই খ্যান্ত হবে। হাত কাট শেষ হতেই সোলেমান সরে আসলো। গলগল করে পানির কলের মতো র’ক্ত পড়ছে ফ্লোরে। এখন লোকটা আর চিৎকার করতে পারছে না। চিৎকার করার শক্তিটাও নেই। চেয়ারে লুটিয়ে পড়লো। বাশার সুলতান রশি খুলে দিলো। লোকটা ফ্লোরে র’ক্তের মাঝে ব্যথায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। সোলেমান ফিরে তাকালো না আর। তার মনে হচ্ছে সে সঠিক কাজটাই করেছে। সেজন্য তাকানোর প্রয়োজন বোধ করছে না। বাশার সুলতান জিজ্ঞেস করলো-
“ এবার কি করবো? ”
সোলেমান নিজের দিকে তাকালো। সাদা শার্ট টায় র’ক্তের দাগ ভরেছে। চাচার থেকে লাইটার টা নিয়ে শার্ট আর গ্লাভসটা পুড়িয়ে ফেললো। তারপর বলল-
“ আমাকে কাট’তে বলছো মানুষ? সময় নেই আমার। বউ উঠে পড়বে। স্পেশালিষ্ট কাউকে নিয়ে এসে কাটাও। আর কাটা শেষ হলে চোখ, কিডনি,হার্ট সব ডিলারের কাছে পাঠিয়ে দাও। বাকি দেহ ওদের খেতে দাও। আমাকে আর এসবে টানবে না। বলে দিয়েছি করে নাও এবার। আসছি। ”
সোলেমান চলে গেলো। বাশার সুলতান ফোন করে কাউকে আসতে বললো। একজন আসলো। এসে জ্যান্ত দেহ টাকেই কেটে কেটে কিডনি হার্ট চোখ সব আলাদা করে নিয়ে চলে গেল। ফ্লোরে পড়ে রইলো শুধু দেহ টা। বাশার সুলতান পকেট থেকে রিমোট টা বের করে সুইচ টিপে দিয়ে কক্ষ থেকে বের হয়ে দরজা বাহির থেকে লাগিয়ে দিলো। রিমোটের সুইচ টেপার কারনে একটা বন্ধ দরজা খুলে গেলো। আর সেই বন্ধ দরজা টা খোলা পেতেই বেরিয়ে এলো এজওয়ানের সেই ইউক্রেনের আন্ডারগ্রাউন্ড সামরিক গবেষণা ল্যাব থেকে আনা কুকুর গুলো। বাশার সুলতান ছোট জানালা দিয়ে দেখলো, নির্জন,নেমেসিস আর ব্লিটজ আয়েশ করে খাচ্ছে দেহটা। খাওয়া শেষ হলে আবার একাই এরা এদের জায়গায় চলে যায়। এজওয়ানের ভক্ত কি না। এজওয়ান ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও কিছু বলবে না। কিন্তু বাশার সুলতান কে দেখলেই তেড়ে আসতে চায়। তখন বাশার সুলতানের মনডায় চায় কুচিকুচি করে কাটতে এদের। মালিকের বাপরে সম্মান দিতে জানে না অশিক্ষিত ম্যানারলেস কুকুর গুলো।
যাই হোক ছেলে কুকুর গুলো এনেছিল বলেই এভাবে মানুষ লুকাতে পারে। তা না হলে এদের যে কই কই লুকাতে হতো!
বাশার সুলতান জঙ্গল থেকে বেরিয়ে সুড়ঙ্গ দিয়ে লাইব্রেরি তে আসলো। গোপন দরজাখানা বন্ধ করে লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে রুমের দিকে হাঁটা ধরলো। কিন্তু স্টাডি রুমের সামনে দিয়ে যেতে বসে ছেলেকে ঘুমাতে দেখে কপাল কুঁচকে আসলো রাগে। আলাদা ঘুমাচ্ছে ছেলে! এভাবে চেয়ারে ঘুমানো যায়! ঐ মেয়ের জন্য! ঐ মেয়েকে বের করে দিতে পারে না? সকাল হোক। ইচ্ছে মতো কথা শোনাবে ঐ মেয়েকে। অসভ্য মেয়ে কোথাকার।
সোলেমান রুমে এসে একটা শার্ট জড়িয়ে বিছানায় এসে দেখলো মেহরিন এখনও ঘুমে। স্বস্তির শ্বাস ফেললো। কম্বলের ভেতর ঢুকে মেহরিনের গা ঘেঁষে শুয়ে জামা ভেদ করে মেহরিনের কোমরে ঠান্ডা হাত রাখতেই কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠলো মেহরিন। তবে ঘুম ছাড়ে নি। ঘুমের ঘোরের সোলেমানের দিকে ফিরে সোলেমান কে বা হাত দিয়ে জড়িয়ে সোলেমানের বুকের কাছটায় মাথা রাখলো। সোলেমান মেহরিনের মাথায় হাত বুলাতে লাগলো। তারপর কপালে চুমু খেলো।
কি শান্তিতে ঘুমাচ্ছে মেহরিন স্বামীর বুকে। অথচ একটু আগেই যে তার এই স্বামী একটা খু’ন করে আসলো। মেহরিন জানলে কি এই বুকে এভাবে মাথা রেখে শান্তিতে ঘুমাতে পারতো এভাবে? কি জানি বোধহয় পারতো না?
মেহরিনের জন্যই তো খু’ন করা হলো। মেহরিন কি জানবে কখন? তার অগোচরে তারই জন্য একটা প্রাণ বিদায় নিয়েছে অকালে এই পৃথিবী থেকে। মোটে একটা প্রাণ? সংখ্যা তো ক্রমাগত বাড়বে বই কমবে না। এত এত প্রাণের মৃ’ত্যুর দায় তার মাথায়। সেগুলো কিভাবে বহন করবে মেহরিন?
সকালে বাশার সুলতানের চেঁচামেচি তে সবার ঘুম ভাঙলো। মাহিকে ইচ্ছে মতো বকে যাচ্ছে সে। এই মেয়ের জন্য কেনো তার ছেলে স্টাডি রুমে গিয়ে ঘুমাবে? এত কিছু হয়ে গেলো তাও এই মেয়ে সংসারে মনোযোগ দিচ্ছে না। স্বামীর খেয়াল রাখছে না! তার অসুস্থ ছেলে এখনও সুস্থ হয় নি পুরোপুরি। এভাবে চেয়ারে শুয়ে ঘুমায়!
মাহি স্পিচলেস হয়ে গেছে। বাশার সুলতানের ছেলে কোথায় ঘুমাবে না ঘুমাবে তারজন্য তাকে কথা শুনতে হবে?
“ আপনার ছেলেকে তো আমি স্টাডি রুমে গিয়ে ঘুমাতে বলি নি আঙ্কেল। এরজন্য আমাকে কেনো কথা শোনাচ্ছেন? আপনার ছেলেকে জিজ্ঞেস করুন। ”
বাশার সুলতান আরো চিৎকার করে বলল-
“ আমার ছেলেকে কি জিজ্ঞেস করবো? সে কোনোদিন বলবে তোমার বিপরীতে কথা? উল্টো আমার ছেলেটাকে শোষণ করে করে খাচ্ছ তুমি। তোমাকে বেরও করে দিতে পারি না। আমার ছেলেটা চলে যাবে বলে। গলায় কাটা বিঁধে থাকার মতো তুমি বিঁধে আছো আমাদের জীবনে। ছেড়ে দাও আমার ছেলে টাকে। মেয়ে বানিয়ে রাখছো। কদিন পর ওটাকে মেয়ে বলে পরিচয় করাতে হবে আমার। যত্তসব। ”
বাশার সুলতান চলে গেলো। মাহির মাথা ভীষন গরম হয়ে গেলো। এজওয়ানের জন্য তাকে কথা শুনতে হবে! লোকটা ইচ্ছে করেই আলাদা রুমে ঘুমায় এখন। আজ আসুক রুমে। মাথা ফাটিয়ে দিবে।
মাহি রুমে চলে গেলো। এসেছিল কফি নিতে। আর নেওয়া হলো না।
চাচার এমন চেঁচামেচি শুনে মেহরিন বেলকনি থেকে বেরিয়ে আসে। রুমাইসা সদ্য ঘুম থেকে উঠে হাই তুলতে তুলতে বসার ঘরে এসে দেখে কেউ নেই! একটু আগেই না চেঁচামেচি হচ্ছিলো? রুমাইসা মেহরিন কে দেখে বলল-
“ চাচা কার সাথে এতক্ষণ চেঁচামেচি করলো? ”
“ বলতে তো পারবো না। ভাইয়া নাকি আপুর সাথে?”
“ বোধহয় মাহি ভাবির সাথে। ভাইয়ের সাথে তো এতো উঁচু গলায় কথা বলতে পারে না চাচা। ”
“ হবে হয়তো। ”
“ হুম। আজ নাকি মতিঝিল যাবে? ”
“ হুম। আব্বুর সাথে দেখা করতে। ”
“ ওহ্ কখন?”
“ নাস্তা করেই। তুমিও চলো। ভালো লাগবে। ”
“ ভাইয়া যেতে দিবে? ”
“ কেনো দিবে না যেতে? আমি বলবো। ”
“ ঠিক আছে। ঊর্মিও যাবে? ”
“ হ্যাঁ। ”
“ আচ্ছা ঠিক আছে। ভাইয়াকে রাজি করিও কিন্তু। ”
মেহরিন এক কাপ চা আর এক মগ কফি নিয়ে রুমে আসলো। সোলেমান এখনও ঘুমে আছে। ফজরের নামা পড়ে ঘুমিয়েছিল। মেহরিন কফির মগ টা বেডের পাশে রেখে ড্রেসিং টেবিলের সামনে টুলে বসে চা খেতে লাগলো।
রোদের হাল্কা আলো চোখে পড়তেই সোলেমানের ঘুম ভেঙে গেলো। ঘাড় বেঁকিয়ে তাকাতেই মেহরিন কে দেখে তার দিকে উপর হয়ে শুলো। মেহরিন চা খেতে খেতে আড়চোখে তাকিয়ে কফির মগের দিকে ইশারা করলো। সোলেমান উঠে দাঁড়ালো। কফির মগ টা হাতে নিয়ে মেহরিনের পেছনে দাঁড়িয়ে চুমুক দিলো। মেহরিনের চা খাওয়া শেষ। খালি কাপ টা টেবিলের উপর রেখে বলল-
“ আপুকে সাথে নিয়ে যাই? সন্ধ্যার দিকেই তো চলে আসবো। ”
“ রুমাইসা গিয়ে কি করবে?”
“ আমার ভালো লাগবে সেজ..”
“ ঠিক আছে। ”
সকালের ব্রেকফাস্ট টা করে সোলেমান মেহরিন,ইব্রাহিম, রুমাইসা, ঊর্মি বেরিয়ে গেলো। আমিরুল সুলতান আর আনোয়ার সুলতান চলে গেছে নওগাঁ। ড্রাইভিং সিটে সোলেমান আর পাশে মেহরিন। পেছনে সিটে মাঝখানে ঊর্মি আর দুপাশে রুমাইসা আর ইব্রাহিম। মতিঝিলে একদম তেহরান দের বাসার সামনে গাড়ি দাঁড় করালো। সোলেমান ইব্রাহিম ঢুকে মোতালেব ভুঁইয়ার সাথে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে চলে গেলো। তানজিলা বেগম আয়োজন করেছিল খাবার দাবারের কিন্তু ওরা দুজন খেলো না চলে গেলো।
বাড়িতে তেহরান নেই আছে তানভীর। মেহরিন আর ঊর্মি কে সে তো অনেক খুশি। তানভীর এবার ইন্টার প্রথম বর্ষে উঠছে। ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করে। কদিন পর পরই সিটি কলেজের সাথে মারামারি লাগে। তানভীরের কি যে দুঃখ লাগে। এই দুই কলেজ মনে হয় দুই সতীন। সহ্য করতে পারে না কেউ কাউরে।
মেহরিন বাবার পাশে বসলো।
“ ডক্টর কি বললো আব্বু? ”
“ ভালোই আছে শরীর টা। উন্নত হয়েছে বললো। ”
“ দেখি রিপোর্ট টা দাও। ”
মোতালেব ভুঁইয়া আমতা-আমতা করে বলল-
“ রিপোর্ট তো আনি নাই। ”
“ রিপোর্ট আনো নি কেনো?”
“ আনা হয় নি। কি যেন সমস্যা হয়েছিলো। ডাক্তার বললো নওগাঁ পাঠিয়ে দিবে রিপোর্ট। ”
“ এখনও বুকে ব্যথা হয় রাতে আব্বু? ”
যদিও প্রায় সময়ই একটু দুশ্চিন্তা বেশি হলেই বুকে ব্যথা উঠে। এখন মেয়েকে বললে মেয়ের দুশ্চিন্তা বেড়ে যাবে বলে মোতালেব ভুঁইয়া বলল-
“ আগের থেকে কমছে। চিন্তা করিও না। চলো খাওয়ার জন্য ডাকছে। ”
মোতালেব ভুঁইয়া উঠে গেলেন। মেহরিন ঠোঁট চেপে ধরলো। আল্লাহ তার আব্বাকে সুস্থ করে দিক। সকল ব্যথা নিঃশেষ করে দিক।
দুপুরের পরপর তেহরান আসলো বাড়িতে। জানতো মেহরিন আসবে। কিন্তু মেহরিনের ননদ টা যে আসবে সেটা তো জানতো না! রুমাইসা তানভীর আর ঊর্মি মিলে গল্প গুজব করছিলো। তানভীর বলছে তার বড় ভাই কতটা হার্টলেস একটা মানুষ। তানভীর কে সহ্য করতে পারে না। খুব বদমায়েশ। তানভীর আবার বড় ভাইয়ের নামে বদনাম রটাতে পারলে খুব আনন্দিত হয়। সবাইকে জানায় তার ভাই কতটা পাষাণ। তেহরান তার কোনো কিছুই ধরতে দেয় না তানভীর কে। রুমাইসা শুনছে সব। কতবড় পাজি তেহরান নামের লোকটা। ছোট ভাইকে নাকি ঝাড়ু,চার্জারের ফিতা দিয়ে মা’রে। অথচ তার বড় ভাইরা কত ভালো। যা চায় তাই দেয়। শুধু বাহিরেই যেতে দিতে চায় না। ঊর্মি তানভীরের কথা শুনে বলল-
“ তুমি নিজেও তো কম পাজি না তানভীর। শুধু বড় ভাইয়ের পেছনে লাগো। ভাইয়ার ল্যাপটপ তুমি গুড়ো সাবান দিয়ে ভিজিয়ে রাখো পানিতে। তুমিও যেমন দুষ্টুমি করো তেমন পানিশমেন্টই তেহরান ভাইয়া দেয় তোমায়। ”
তানভীর মুখ বেঁকিয়ে বলল-
“ শত্রুস কোথাকার। আমার সাপোর্ট না নিয়ে ভাইয়ার সাপোর্ট নিচ্ছ! দোয়া দিলাম গাদি গাদি বাচ্চার মা হও। আর সব গুলো যেন তানভীরের ফটোকপি হয়। ”
দুপুরের খাবার খেতে সবাই খাবার টেবিলে বসলো। তেহরান রুমাইসা কে দেখে বলল-
“ হাই বেয়াইন। হাউ আর ইউ?”
কিছুটা পুরান ঢাকার ভাষার টোনে কথা বলল তেহরান। রুমাইসা হাসার চেষ্টা করে বলল-
“ আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি?”
“ জ্বি এখন আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। ”
তানজিলা বেগম খাবার বেড়ে দিলেন। খাওয়াদাওয়া শেষ করে বিকেলের দিকে রওনা হলেন মোতালেব ভুঁইয়া নওগাঁর উদ্দেশ্যে। মেহরিন বলল- বাড়ি ফিরে জানাতে। মোতালেব ভুঁইয়া মাথা নাড়িয়ে আচ্ছা বললো। মেহরিন ততক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো যতক্ষণ না গাড়িটা চোখের বাহিরে চলে যায়। বাড়ি ফেরার আগে তেহরান মেহরিন কে ফোন করে বলল- তারা কি খাবে। মেহরিন বললো যা মনে চায় নিয়ে আসতে। ঊর্মি বললো ভাজাপোড়া কিছু আনতে। এদিকে রুমাইসা আবার ভাজাপোড়া খায় না বললেই চলে। রুমাইসা মেহরিন কে বলল- ”ভাবি আমি কিন্তু ভাজাপোড়া খাই না।”
মেহরিন বলল-
“ তুমি তাহলে কি খাবে? বলো ভাইয়া নিয়ে আসবে। ”
রুমাইসা সবেই বলতে যাবে আর তখনই ফোন কেটে গেলো। কেমন যেন অপমানিত বোধ হওয়ার মতো হলো বিষয়টা। মেহরিন ভেবেছিলো টাকা শেষ সেজন্য কল কেটে গেছে। তেহরান হয়তো কল করবে। কিন্তু না করলো না। মেহরিন ফোন দিলো দুবার। ধরলো না।
তেহরান চটপটি, ভাজাপোড়া আর ভ্যানিলা আইসক্রিমের বাটি নিয়ে ফিরলো। ঊর্মি ভাজাপোড়া নিয়ে বসলো। মেহরিন তেহরান কে দেখামাত্রই বলল-
“ ফোন ধরো নি কেনো ভাইয়া? আপু এসব ভাজাপোড়া খায় না। ”
তেহরান আইসক্রিমের বাটিটা ধরিয়ে দিয়ে বলল-
“ এটা তোর ননদের জন্য। আশা করি খেতে কোনো অসুবিধা হবে না। ”
মেহরিন আইসক্রিমের বাটি টা নিয়ে রুমে আসলো। রুমাইসা তখন ফোনে ব্যস্ত। এই তূর্ণ কে মাঝেমধ্যে রুমাইসা পায়ই না বলতে গেলো। একটু আগেই কথা বললো মেসেজে। এখন অফলাইন দেখাচ্ছে!
মেহরিন আইসক্রিমের বাটি টা রুমাইসার পাশে রেখে বলল-
“ আপু নাও তোমার পছন্দের আইসক্রিম। ”
রুমাইসা মাথা ঘুরিয়ে দেখলো ভ্যানিলা আইসক্রিম। চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো আনন্দে।
“ তুমি আনলে নাকি ভাবি?”
“ না না ভাইয়াই আনছে। ”
“ কার জন্য? ”
“ তোমার জন্য। ”
রুমাইসা অবাক হয়ে বলল-
“ উনি এনেছেন! উনি জানলো কি করে আমার ভ্যানিলা আইসক্রিম পছন্দ? ”
“ তা তো বলতে পারবো না। হয়তো না ভেবেই নিয়ে আসছে চলে। মেয়েরা তো আইসক্রিম টা একটু বেশি পছন্দ করে। ”
রুমাইসা খাওয়ায় মনোযোগ দিলো।
৮ টার দিকে সোলেমান আসলো মেহরিন দের নিতে। তানভীরের কি যে মন খারাপ। সোলেমানের সামনেই বলে বসলো-
“ বউ নিতে চলে আসছেন এমপি দুলাভাই! কয়েকদিন থাকলে কি হয়? আপনি তো নিজ থেকে আমাদের যেতেও বলবেন না আবার আপুকে থাকতেও দিবেন না। ”
সোলেমান ছোট শালা কে আদর করে বলল-
“ যখনই মন চায় তখনই চলো এসো নিবাসে। কোনো বাঁধা নেই। ”
“ রাত বেরোতে চলে যাব কিন্তু। ”
“ বললামই তো যখন মন চায় তখনই। ”
মেহরিন রা চলে যাওয়ার সময় তেহরান কে আর দেখা গেলো না। তখন কোথাও একটা গিয়েছিল। বাড়ি ফিরে এসে শুনে মেহরিন রা চলে গেছে। তেহরান মায়ের পাশে বসে বলল-
“ একটা কথা বলতাম আম্মা। ”
“ বল শুনছি। ”
“ আমার বয়স কত হলো? ”
“ ভুলে গেছি রে। কত হলো? ”
“ ২৮-২৯ তো হবেই। ”
“ ওহ্ আচ্ছা। ”
“ ওহ্ আচ্ছা আবার কি? আমাকে কি বিয়ে শাদি দিবে না নাকি? ”
তানভীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো। বড় ভাইয়ের এমন কথা শুনে গালে তওবা কাটতে কাটতে বলল-
“ আস্তাগফিরুল্লাহ আস্তাগফিরুল্লাহ। কি নির্লজ্জ ছেলে তোমার আম্মু! কিভাবে বিয়ের কথা বলছে। এই বেকার ছেলে ইনকাম করো তুমি? আবার বিয়ে করতে চাইছো! বয়স কত তোমার? নাক টিপলে হিনুত বের হয় এখনও। ”
তেহরান সোফা থেকে বালিশ টা তানভীরের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল-
“ জু’তার বাড়ি খাইস না আমার হাতে তানভীর। যা এখান থেকে। ”
তানভীর মুখ বাঁকিয়ে বলল-
“ আম্মু রাজি হবা না বিয়ে দিতে। আমি বড় হবো তারপর রাজি হবা। ”
“ গেলি তুই?”
তেহরানের ধমক খেয়ে অর্ধেক চলে গিয়ে ফের ফিরে এসে বলল-
“ তোমার ছেলে মনে হয় আম্মা প্রেম করে। খেয়াল করলেই দেখবা মাঝেমধ্যে কি ব্লাশ টাই না করে একা একা। ”
“ তানভীরের বাচ্চাআআআআ…”
তানভীর দৌড়ে চলে গেলো। তানজিলা বেগম ছেলের পানে তাকিয়ে বলল-
“ আসলেই প্রেম করিস তুই? মেয়ে কে? কোন মেয়ের মাথার তাড় ছিঁড়ে গেছে যে তোর মতো আবুলের সাথে প্রেম করে!”
“ আম্মুউউ তুমিও! ”
তেহরান রেগে উঠলো। মা ছেলে দুটোই চরম শত্রু তেহরানের। তেহরান রেগে চলে গেলো। শালার জিন্দেগী। এরা জীবনেও নিজ থেকে তেহরানের বিয়ে দিবে না।
মেহরিন রা বড়ি ফিরে দেখলো এজওয়ান তার বাবার সাথে বাগানে কথা-কাটাকাটি করছে। সোলেমান বিরক্ত হয়ে বউ নিয়ে চলে গেলো রুমে। এদের এই কথা-কাটাকাটি আজীবনেও শেষ হবে না। মেহরিন রুমে এসে বোরকা খুলে বলল-
“ সকালেও দেখলাম চাচা চেঁচামেচি করছিল। এখনও দেখছি। কি নিয়ে সমস্যা এতো?”
“ মাহি কে নিয়ে বোধ-হয়। ”
“ উনি কিছু করেছে আবার? ”
“ এজওয়ান স্টাডি রুমে ঘুমায় আলাদা। সেটা হয়তো দেখে ফেলছে চাচা। ”
“ আমিও সেদিন দেখেছি বালিশ নিয়ে যেতে। কিন্তু বুঝতে পারি নি ঘুমাতে গিয়েছিল। দুজনের মধ্যে কিছু হয়েছে আবার? আপনারা বড়রা মিলে একটা সমাধান করলেও পারেন। আপুও কেমন বেখেয়ালি আচরণ করে। ভাইয়া কে তো দেখি যথেষ্ট করে আপুর জন্য। তারপরও আপু যে কেন এমন করে! ”
“ এমনটা করবে এটাই স্বাভাবিক।
“ মানে?”
“ ওদের বিয়েটা স্বাভাবিক ভাবে হয় নি। এজওয়ান জোর করে করছে বিয়েটা। ঐ যে যাকে জড়িয়ে ধরছিলো না মাহি? ওটা মাহির প্রেমিক ছিলো। ”
মেহরিন চমকে উঠলো কথাটা শুনে। জোর করে করছে বিয়ে!
“ জোর করে কেনো করলো বিয়ে? যেখানে মাহি আপু অন্য জনকে ভালোবাসতো জানার পরও?”
“ জানি না। এজওয়ানের যা চাই তা এজওয়ান নিজের করে নেয়। হয় সেটা ভালো ভাবে আর তা না হলো আঙুল বেঁকিয়ে। ওদের বিষয়ে তুমি কথা বলিও না। ওদের টা ওদের বুঝে নিতে দাও। ”
“ শুধু শুধু আপুকে এখানে দোষ দেওয়ার তো তাহলে কোনো মানে হয় না। ”
“ হুম নিজের ভাইয়েরও দোষ আছে বলেই ওদের বিষয়ে আমি কথা বলি না। যা ইচ্ছে হয় করুক। ”
এজওয়ান রুমের দিকে যেতো যেতো বিরবির করে বলতে লাগলো-
“ শালার কি এক বিয়ে করছি। উঠছে বসতে কখনও বাপ তো কখনও ভাই তো কখনও বউ ফুটবলের মতো গোল খাওয়ায়। এমন জিন্দেগীই কি চাইছিলাম গড? জীবনটা তেজপাতা ভাজাপাতা দুটোই বানিয়ে দিলা। না দিলা বউয়ের ভালোবাসা না দিলা জীবনে শান্তি। সব হারাম কইরা দিলা। ”
রুমে ঢুকে দেখলো মাহি রুম জুড়ে পায়চারি করছে। এজওয়ান শরীর ঝাড়া দিয়ে টানটান করে নেয়। চুল গুলো ঠিক করে রুমে ঢুকডেই মাহি তেড়ে আসে। এজওয়ান ভ্রু কুঁচকালো এভাবে এগিয়ে আসতে দেখে। এজওয়ান গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“ এভাবে তেঁড়ে আসার কি মানে?”
“ সমস্যা কি আপনার?”
“ তোমার সমস্যা কি সেটা বলো। ”
“ কয়েকদিন ধরে লক্ষ্য করছি আপনি আলাদা রুমে ঘুমান। আপনার জন্য তো আমাকে কথা শুনতে হচ্ছে। আপনার বিছানা তো যথেষ্ট বড়। সমস্যা হবার তো কথা নয়। তাহলে? নাকি ইচ্ছে করে আমাকে বকা খাওয়ানোর জন্য এমনটা করছেন?”
এজওয়ান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলল-
“ আসলে বিষয়টা তেমন না, যেমনটা তুমি ভাবছো।”
মাহি পেছনে দাঁড়িয়ে বলল-
“ তাহলে বিষয়টা কেমন? ”
এজওয়ান বালিশ টা নিয়ে যেতে যেতে বলল-
“ বিষয় টা হলো তোমার শরীর থেকে এখন চি’কামরা দুর্গন্ধ আসে। আর তুমি বোধহয় তোমার এক্সের শোকে গোসল করতে ভুলে গেছো। আমার আবার দুর্গন্ধে অ্যালার্জি আছে। পেটটা মোচড় দিয়ে উঠে,তোমার কাছে এসে দাঁড়ালে । সম্ভব হলে জমজমের পানি ছিটিয়ে শরীর টা একটু পরিষ্কার হয়ে নিও। এতে যদি শরীর থেকে দুর্গন্ধ টা কমে গিয়ে আমার সংসার টায় একটুখানি বরকত আসে…. ”
মাহি রেগে চিৎকার করে বলল-
“ এজওয়ানের বাচ্চা…”
এজওয়ান পেছন ফিরে বলল-
“ মিস্টেক। বাশার সুলতানের বাচ্চা আমি। ”
মাহি বালিশ ছুঁড়ে দিয়ে বলল-
“ ছাগলের বাচ্চা আপনি। ”
“ তোমার বাচ্চা ছাগলের বাচ্চা। মাইনসের বাচ্চা কে ছাগলের বাচ্চা বলো কোন সাহসে? নিজের বাচ্চাকে গিয়ে বলো। ননসেন্স মেয়ে কোথাকার। দরজা লাগিয়ে নাকে সরিষার তেল দিয়ে ঘুমাও। গুড নাইট। ”
এজওয়ান চলে গেলো। মাহি দরজার কাছে পড়ে থাকা বালিশ টা নিয়ে বলল-
“ এই ঘরে আর একবার আসলে মে’রে ফেলবো আপনায় বাশারের ভণ্ড ছেলে। দু’দিন পরপর নাটক? বাপ ভাইকে বলতে পারেন না কেনো আলাদা রুমে গিয়ে ঘুমান? ”
“ বললামই তো তোমার শরীর দিয়ে দুর্গন্ধ আসে সেজন্য ঘুমাই না। এখন কি মাইক দিয়ে সবাইকে জানিয়ে বলবো? মানসম্মান নিলামে তুলবো? স্বামীর সাথে ঘুমাতে চাইলে ডলে ডলে গোসল করো। তারপর আসছি আদর করতে। ”
মাহি শব্দ করে দরজা লাগিয়ে দিলো ভেতর থেকে। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দেখলো নিজেকে। তারপর কি মনে করে যেন গায়ে থাকা জামার কাছে নাক টা নিয়ে দেখলো আসলেই কি দুর্গন্ধ? এ্যাহ কোথায় দুর্গন্ধ। ফাজিল লোক অসভ্য লোক কোথাকার।
কান্দাপাড়ার পতিতালয়ের বাহিরের গেট দিয়ে হেঁটে আসছে সৈয়দ ইকবাল পাটোয়ারী। পড়নে কালো পাঞ্জাবি আর কালো চাদর। শেখরের খুবই বিশ্বস্ত একজন লোক ইকবাল। আজ অনেক দিন পর এসেছে কান্দাপাড়া। শেখর ডেকেছে। আর্জেন্ট কিসের বলে একটা কাজ আছে। ইকবাল হেঁটে চলছে। করিডরের দুই ধারে মেয়েরা সেজে বসে আছে। খদ্দের রা এক এক করে আসছে যাচ্ছে। ইকবাল একবার তাকিয়ে সোজা হাঁটা ধরলো। শরীরে জ্বর আছে গতকাল রাতে হুট করে। মাথাটাও প্রচন্ড ব্যথা। হাঁটতে হাঁটতে ভেতরে যেতেই একটা মেয়ে এগিয়ে এসে বলল-
“ কেমন আছেন ইকবাল ভাই? অনেকদিন পর আসলেন। ”
ইকবাল জবাব দিলো না। হাঁটতেই থাকলো। আকস্মিক এক ঘরের পাশ দিয়ে যেতে নিলে ভেতর থেকে গোঙানির আওয়াজ পেয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। গোঙাচ্ছে কে আবার? ইকবাল শুনেছে এখানকার একটা মেয়ে নাকি পোয়াতি। তার ব্যথা ট্যথা উঠছে নাকি? দরজায় হাত রাখবে এমন সময় মনি এসে বলল-
“ ইকবাল ভাই আপনি এখানে! শেখর তো ভেতরে। যান ভেতরে যান। ”
ইকবাল মাথা নেড়ে চলে গেলো। মনি সেই ঘরের দিকে একবার তাকিয়ে চলে গেলো। ঘরের ভেতর পড়ে আছে প্রেমা। খু’ন করার অপরাধে মারাত্মক ভাবে অত্যাচার করা হয়েছে প্রেমার উপর। শেখর মনি দুজনে মিলে খুব মেরেছে প্রেমাকে। সেই মা’রে শরীরের বেশ অনেক জায়গা কে’টে গেছিলো। সেই কেটে যাওয়া জায়গায় আবার মরিচের গুড়া লাগিয়ে দিয়েছে মনি। মরিচের গুঁড়ো লাগিয়ে এতেই খ্যান্ত হয় নি মনি। মরিচের গুঁড়ো লাগানোর পর প্রেমার হাত পা মুখ বেঁধে রেখেছে যাতে ব্যথায় শব্দ করতে না পারে ।
দাহশয্যা পর্ব ৮৪
কি অমানুষ এরা! একটু ও মায়া হলো না! এক প্রেমাকে আর কতভাবে অত্যাচার করবে! মনি যখন বলে কৈ মাছের জান প্রেমার। আসলেই, ঠিকই বলে। তা না হলে এতো অত্যাচারের পরও কি করে বেঁচে আছে প্রেমা? এতদিনে তো মৃ’ত্যুকে আলিঙ্গন করে নেওয়ার কথা এই অসহায় মেয়েটার। অথচ সংগ্রাম করে বেঁচে আছে। কিসের আশায়? কিসের লোভে? কিছুই তো আর পাওয়ার নেই প্রেমার। এই যন্ত্রণায় এবার ম’রে যাও প্রেমা। আর বেঁচে থেকো না। বেঁচে থাকলেই শুধু কষ্ট আর কষ্ট!
