দাহশয্যা পর্ব ৮৫
Raiha Zubair Ripti
রাত যতই গভীর হচ্ছে ততই যেন ইকবাল এক ঘোরের ভেতর চলে যাচ্ছে। দরজার ওপাশ থেকে ভেসে আসছে সূরা আয়াতুল কুরসির ধ্বনি। কি মিষ্টি সেই কণ্ঠের স্বর। ইকবাল কখন যে দরজার কাছ টায় বসে পড়েছে হেলান দিয়ে মনে নেই। যেই নারীর কন্ঠস্বর এত সুমধুর, সেই মেয়ে দেখতেও নিশ্চয়ই তেমনই হবে? ইকবালের দেখতে ইচ্ছে করছে খুব এই কন্ঠের মালিক কে। এই প্রথমবার ইকবালের মন এতটা অধৈর্য্য হয়ে গেলো। পতিতালয়ের একটা মেয়ের জন্য এভাবে অধৈর্য্য হওয়াটা কি ঠিক! ইকবালের মন মানলো না। দরজার ওখানে বসেই শুনতে লাগলো।
প্রেমা তাহাজ্জুদের নামাজ শেষ করে আয়াতুল কুরসি পাঠ করছিলো। কোরআন শরিফ নেই। তবে অধিকাংশ সূরাই তার মুখস্ত,সেজন্য সমস্যা হচ্ছে না কোরআন শরিফ না থাকাতেই। আয়াতুল কুরসি ৩ বার পাঠ করে সূরা ইখলাস পাঠ করলো। পাঠ শেষে ফ্লোরেই শুয়ে রইলো। তবে ঘুম নেই চোখে। রাতে ঘুম আসে না প্রেমার। ভয়ে আতঙ্কে। না জানি কখন তার উপর হামলে পড়ে নরখাদক রা। সিলিং এর দিকে তাকিয়ে রইলো প্রেমা। তার অমানুষ বাপ টা কি জানে প্রেমার ঠিকানা এখন পতিতালয় এসে ঠেকেছে? নাকি জেনেও চুপ আছে। অবশ্য প্রেমা তার থেকে সাহায্য পাবে এমনটা আশাও করে না। তারপরও তারই তো রক্ত প্রেমা,তার কি একটুও খারাপ লাগে না? তার রক্ত,তার মেয়েটার সাথে এত নির্মম ভাবে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। বাবা বুক টায় কি একটুও কম্পন সৃষ্টি হয় না? বাবারা এত পাষাণ এত নিকৃষ্ট হয় বুঝি! প্রেমার ঠোঁটের কোনে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটলো। প্রেমা বিরবির করে বলল-
“ জীবন তুমি কি দুদণ্ড জিরিয়ে নিতে পারো না একটু? আমি নিশ্চিত, তুমিও ক্লান্ত হয়ে গেছো আমাকে কাঁদাতে কাঁদাতে। একটু তো বিশ্রাম নাও এবার। আর কত এক টানা কষ্ট দিবে আমায়? ”
ভোরের আজান কানে আসতেই প্রেমা শোয়া থেকে উঠে দাঁড়ায়। শরীরে এখনও ব্যথা। ঘা গুলোতে পানি লাগলেই জ্বালা পোড়া করে। লম্বা চুল গুলো হাত খোঁপা করে মাথায় ওড়না দিয়ে দরজা টা খুলতেই আকস্মিক এক পুরুষ কে বসে থাকতে দেখে আশঙ্কিত এক ভয়ে চমকে উঠে কয়েক কদম পিছিয়ে যায়।
ইকবাল কখন যে তেলওয়াত শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছিল খেয়াল নেই। কিন্তু হুট করে পিঠের পেছন থেকে দরজাটা সরে যাওয়ায় চমকে ধড়ফড়িয়ে চোখ মেলে তাকায়। প্রথম চাহনিতে কিছু বুঝে না। নিজের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে বিষয় টা বুঝতেই বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়।
প্রেমা ততক্ষণে রুমের ভেতর থেকে কাঁচের ছোট অংশ হাতে নিয়ে নিছে। সেটাই সামনে বাড়িয়ে বলে-
“ কে আপনি? এখানে কেনো? কি করতে এসেছেন? মেরে ফেলবো বলে রাখছি। ”
এমন তীক্ষ্ণ কন্ঠ শুনে ইকবাল পেছন ফিরলো। এক হাত দিয়ে তাক করা কাঁচের অংশ,আর অন্য হাত ধরা ওড়নার এক অংশ মুখের কাছে। ইকবাল তাকালো হরিণের মতো সেই কাজল কালো চোখ দ্বয়ের দিকে। মুখটা দেখার বড্ড ইচ্ছে হচ্ছে। সেজন্য হাতটা বাড়াচ্ছিলো,আর ওমনি প্রেমা হাতে কাঁচের অংশ টা দিয়ে আঁচড় বসিয়ে দেয়। গলগল করে র’ক্ত বের হতে শুরু করে ইকবালের ডান হাত দিয়ে। ইকবাল র’ক্ত চোখে একবার নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে ফের তাকায় প্রেমার দিকে। দুটো ছেলে এই পথ দিয়ে আসছিলো। ইকবালের হাত দিয়ে র’ক্ত বের হতে দেখে তারা দৌড়ে আসলো এগিয়ে। প্রেমা তিনজন ছেলে দেখে এবার ভয়ে দরজা লাগিয়ে দিতে চাইলে ছেলে দুটো দরজায় হাত রাখে। ঠেলে প্রেমাকে ধরতে গেলে ইকবাল গর্জে উঠে। হুমকি দিয়ে বলে-
“ একদম না। টাচ করবি না বলে রাখলাম। ”
ছেলে দুটো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।
“ আপনার হাত দিয়ে র’ক্ত বের হচ্ছে যে। এই মেয়েটাই করছে। আর আপনি ছেড়ে দিতে বলতেছেন!”
“ আমার বিষয় আমি বুঝে নিব। যা এখান থেকে। ”
“ কিন্তু…”
“ যেতে বলছি কিন্তু। ”
ছেলে দুটো চলে গেলো। প্রেমা সাথে সাথে দরজা লাগিয়ে দিলো। ইকবাল তাকিয়ে রইলো নির্নিমেষ চোখে কিছুক্ষণ। তারপর ভেতরে চলে আসলো। শেখর তখন বৈঠক ঘরে বসে মাল খাচ্ছিলো। ইকবাল কে দেখেই বলল-
“ যেই বালের বাল নেই সেই আমার ইকবাল। হোয়াটসঅ্যাপ? ”
ইকবাল হাত ঝাড়তে ঝাড়তে এগিয়ে এসে সোফায় বসলো। শেখর তার হাত কাটা দেখে বলল-
“ কাটলো কি করে?”
“ জানি না। ”
“ জানিস না মানে! ”
“ প্রেমা টা কে?”
শেখর থমকে গেলো।
“ কেনো? ও কিছু করেছে? ওর কাছে গিয়েছিলি?”
“ না। এমনি জানতে ইচ্ছে করলো। ”
“ এত না জানলেও চলবে তোর। ”
“ ঠিক আছে। ”
“ বাসায় যাচ্ছিস না যে?”
“ যাব। ”
শেখর উঠে চলে গেলো। সকালের নাস্তা নিয়ে আসছে অপূর্ণা প্রেমার জন্য। ভালো লাগে কেনো জানি মেয়েটাকে তার। সেজন্য সব এগিয়ে নিয়ে আসে। প্রেমা খাবার টা খেলো। খাওয়া শেষে অপূর্ণা তাকে সব বললো পতিতালয়ে ঠিক কি কি হয়। তাদের কিভাবে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে। আর শেখর রা বেছে বেছে উপজাতি বিধর্মী মেয়েদের ধরে নিয়ে আসে যাদের বাবা মা নেই। সমাজে তেমন পরিচিত না তাদের। অপূর্ণার ইচ্ছে করে খুব এখান থেকে পালিয়ে যেতে। জানা নেই তার বাচ্চাটা জন্মের পর আদৌও বাঁচবে কি না। তারপরও অপূর্ণার ইচ্ছে হয় সন্তান টাকে দূরে কোথাও নিয়ে যেতে। তার সাথে বাঁচতে। যদিও এই ইচ্ছে পূরণ হবার নয়।
প্রেমা চুপচাপ শুনলো কথা গুলো। কেমন একটা মায়া হলো অপূর্ণার জন্য। এখানে এসে থেকে এই মেয়েটা তার জন্য কত কিছু করছে। প্রেমা গালে হাত রাখলো তার।
“ আমি হারিয়েছি আমার দু দুটো সন্তান কে। সন্তান হারানোর কষ্ট কতটা গভীর আমি তা উপলব্ধি করেছি। জানো আমি আমার সন্তানদের সর্বোচ্চ তিন মাস গর্ভে ধারণ করতে পেরেছিলাম। আট মাস গর্ভে লালন-পালন করে দুনিয়ার আলো দেখানোর সৌভাগ্য আমার হয় নি। তার আগেই আমার গর্ভ থেকে টেনে হিঁচড়ে তাদের বের করে আনা হয়েছে। কত হাতে পায়ে ধরেছিলাম শেখরের। অমানুষ টা লাত্থি দিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। আমি চাই অন্তত তোমার সন্তান বাঁচুক। তবে শেখরের মতো অমানুষ না হোক ওর মৃত্যু হয়ে আসুক। ”
“ আমার তোমার জন্য খারাপ লাগে প্রেমা। তুমি এত সুন্দরী অথচ তোমার ভাগ্য এতটা দূর্ভাগা! ”
“ ভাগ্যের সাথে সুন্দর হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই পূর্ণা। কথায় আছে ভাগ্যে জয়,ভাগ্যে ক্ষয় ,ভাগ্যে ভাগ্যে টক্কর হয়। মায়াবতি,গুণবতী,রূপবতী যে যাই হোক ! জয় কিন্তু ভাগ্যবতীরই হয়। ”
“ অথচ কিছু মানুষকে তো দেখি যেমন সুন্দর দেখতে তেমনই তাদের ভাগ্যও সুন্দর। কত বৈষম্য করেছে আমাদের সাথে সৃষ্টি কর্তা দেখেছো?”
“ আমরা শুধু সম্মুখের টা দেখি পূর্ণা। ভবিষ্যৎ টা তো আর আমরা দেখতে পাই না। আমরা হয়তো ভাবছি তারা সুখী খুব। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা তো সুখী না-ও হতে পারে। আর মনে রেখো সৃষ্টি কর্তা বৈষম্য করে না কখনও কারো সাথে। তবে আমি চাই যারা সুখী তারা সর্বদা সুখীই থাকুক। আমার পরিচিত সেই মেয়েটাও খুব সুখী হোক। ”
“ কার কথা বলছো?”
“ আছে একজন। ”
“ ওহ্,জানো আজকাল শরীর টা ভালো লাগে না। রাতে পেট ব্যথা করে। ”
“ ডক্টর দেখাও নি? ”
“ আর ডাক্তার। নিয়ে আসে না ডাক্তার হারামিরা। গর্ভপাত করাইতে চাইছিলো। দেই নাই। হুমকি দিছিলাম। গর্ভপাত করাইলে নিজেরে মে’রে ফেলমু। আমার জন্য আবার খদ্দের আসে বেশি। সেজন্য করায় নি। ”
“ ওহ্। আজ সকালে এক লোক আসছিলো। দরজার কাছে বসে ছিলো আমার দিকে হাত বাড়াতে চাচ্ছিলো দেখে হাত কেটে দিছি। ”
অপূর্ণা চমকালো।
“ কি বলো! হাত কাটছো! আমি জানলাম না! হাঙ্গামা তো হলো না কোনো। ”
“ জানি না। ”
“ লোকটা কে ছিলো?”
“ চিনি না তবে গতকাল দেখছিলাম। পালাতে গিয়েছিলাম, এই লোকটাই ধরে ফেলছিলো। ”
“ কে হতে পারে?” ভাবতে লাগলো অপূর্ণা।
“ দেখতে ভালোই লম্বা। গালে চাপ দাঁড়ি আছে। পড়নে কালো পাঞ্জাবি। একটু হুজুর হুজুর টাইপের। ”
“ ইকবাল ভাই! ”
“ উনার নাম ইকবাল? ”
“ এমন বর্ণনা তো ইকবাল ভাইয়েরই। এজন্যই হাঙ্গামা হয় নি। কিন্তু উনি তোমার ঘরের সামনে আসবে কেনো? উনি তো নারীদের থেকে দূরে থাকেন। যদিও তিনি শেখরের খুব বিশ্বস্ত। শেখরকে সাহায্য করে। কিন্তু নারীর দেহ ভোগ করে না শেখরের মতো। কেউ তাকে জোর করলে সপাট সপাট করে চাপড় মেরে গাল লাল করে দেয়। ”
“ নারী দেহ ভোগ করে না,কিন্তু সাহায্য তো করে। আমার কাছে আসলে কাউকে ছেড়ে দিব না আমি। ”
“ কতদিন এভাবে বাঁচাতে পারবে নিজেকে? প্রথম প্রথম আমিও এমন করতাম। তারপর আর পেরে উঠি নি। ”
“ গায়ে যতক্ষণ শ্বাস আছ ততক্ষণ চালিয়ে যাব। ”
“ পারবে না খুব বেশিদিন। যাই হোক আসি এখন। শরীর টা ভালো লাগছে না। গিয়ে একটা ঘুম দিবো। ”
বিকেলের দিকে প্রসব বেদনা উঠলো অপূর্ণার। কেউ এগিয়ে যাচ্ছে না তার ব্যথা দেখে। ডক্টর কেউ ডাকছে না। খবর টা প্রেমার কানে আসতেই প্রেমা ছুটে অপূর্ণার রুমে যায়। অপূর্ণার চারিদিকে মেয়ে গুলো দাঁড়িয়ে আছে অতচ কাছে যাচ্ছে না! মেয়েরাও এমন অমানুষ হয়! প্রেমা অপূর্ণার মাথাটা কোলে নিলো। তারপর মেয়েগুলোর উদ্দেশ্যে বলল-
“ এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেনো তোমরা? ডাক্তার কে ডাকো। ওর প্রসব বেদনা উঠছে চোখে দেখতে পাচ্ছো না? ”
দিপা নামের মেয়েটা বলল-
“ শেখর নাই, মনি বলছে ডাক্তার আনতে পারবে না। এভাবে হলে হবে না হলে নাই। ”
গা রাগে কটমট করতে লাগলো প্রেমার। অপূর্ণা কে ছেড়ে দিয়ে উঠে বলল-
“ কোথায় ঐ মনি?”
“ ওর রুমে। ”
প্রেমা মনির রুমের দিকে গেলো। মনি তখন পান চিবোতে চিবোতে ফোনে কথা বলছিলো। প্রেমা ফোনটা কেঁড়ে নিয়ে বলল-
“ একটা মেয়ে প্রসব বেদনায় কাতরাচ্ছে আর আপনি এখানে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছেন? ডক্টরের নম্বর বলুন। ”
মনি অবাকের চরম পর্যায়ে চলে গেছে। ফোন কেঁড়ে নিতে চাইলে প্রেমা সরিয়ে দেয়।
“ এত বড় সাহস তোর! ফোন দে। ”
“ দিব না। ”
প্রেমা ফোন টা নিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইলে করিডরে ধাক্কা লাগে ইকবালের সাথে। মনি পেছন পেছন আসছে আর গলা ফাটিয়ে বলছে- ফোন দে প্রেমা।
প্রেমা নাম টা শুনে চকিতে তাকালো ইকবাল প্রেমার দিকে। মেয়েটাকে সে দেখেছে। হুম দেখেছে। পালাতে চাচ্ছিলো এই মেয়েই। মনি এসে প্রেমাকে ধরতে চাইলে ইকবাল হাত দিয়ে আঁটকে দিয়ে বলল-
“ কি হয়েছে? ”
“ আমার ফোন কেঁড়ে নিয়েছে। ”
ইকবাল এবার প্রেমার উদ্দেশ্যে বলল-
“ ফোন কেনো নিয়েছেন? ”
প্রেমা কাটকাট গলায় বলল-
“ দরকার সেজন্য। ”
“ কি দরকার? কাকে ফোন করবেন? ”
“ ডক্টর কে। পূর্ণার প্রসব বেদনা উঠেছে। এভাবে রাখলে তো মা সন্তান দু’জনই ম’রে যাবে। ”
“ আমি ফোন দিচ্ছি ডক্টর কে। আপনি ফোনটা দিয়ে দিন প্রেমা। ”
“ আমার সামনে ফোন করুন। ডক্টর আসবে তারপর দিব। ”
ইকবাল নিজের ফোন দিয়ে ডক্টর কে আসতে বলল। ডক্টর আসার পর প্রেমা ফোন টা দিয়ে দিলো। প্রেমা পুরোটা সময় পূর্ণার সাথে ছিলো। নরমালেই এক মেয়ে সন্তানের জন্ম দিলো অপূর্ণা। র’ক্ত মাখা বাচ্চাটাকে যখন প্রেমার কোলে দেওয়া হলো তখন প্রেমার মনের অবস্থা টা ভাষায় প্রকাশ করার মতে না। নিজের দুটো সন্তানের কথা মনে পড়ে গেলো। মাতৃত্ব মন টা আবেশে জড়িয়ে ধরলো পূর্ণার মেয়েটাকে। তার স্বামীরই অবৈধ সন্তান এটা। অথচ তাকেই কি আদরে বুকের সাথে মিশে রেখেছে। পরিষ্কার করে পূর্নার বুকের উপর শুইয়ে দিলো। পূর্ণা মেয়েকে আদর চুমু খেতে ব্যস্ত। দু চোখ ভরে প্রেমা দেখলো মা মেয়ের এক সুন্দর মুহূর্ত। বিরবির করে ঠোঁটের কোনে আওড়ালো- তোমরা আজ বেঁচে থাকলে মা তোমাদেরও এভাবে আদর করতো আমার মানিকেরা। তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করার অপেক্ষায় আছি। খুব আদর করবো তখন কেমন?
প্রেমা চোখের জল মুছে বের হয়ে যাচ্ছিলো পথিমধ্যে দেখা হলে ইকবালের সাথে। জিজ্ঞেস করলো-
“ বাচ্চাটা কেমন আছে? ”
“ জ্বি সুস্থ আছে। একটু বাচ্চাদের যাবতীয় যা যা জিনিস লাগে সেগুলো এনে দিবেন। কিছুই নেই। পারলে একটু আজান দিয়ে দিবেন ওর কানের কাছে। ”
“ ঠিক আছে দিব। ”
প্রেমা চলে যাচ্ছিলো,তখন নজরে আসে ইকবালের সেই কেটে যাওয়া হাত। ইকবাল পেছন থেকে বলে উঠলো-
“ আপনার বাসা কোথায় প্রেমা? ”
প্রেমা একবার পিছু ফিরে বলল-
“ নেই। ”
ইকবাল কিয়ৎক্ষন দাঁড়িয়ে চলে গেলো বাজারে। বাজার থেকো ছোট বাচ্চাদের যা যা লাগে সব নিয়ে আসলো।
অপূর্ণা তখন বাচ্চা কে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছিলো। ইকবাল দিপার হাতে প্যাকেট গুলো দিয়ে পাঠালো। দিপা প্যাকেট গুলো অপূর্ণার পাশে রেখে বলল-
“ ইকবাল ভাই এসেছে। দাঁড়িয়ে আছে বাহিরে। বাবুকে দেখবে হয়তো। ”
অপূর্না মেক্সির বোতাম লাগিয়ে আসতে বলল। ইকবাল ভেতরে ঢুকে অপূর্ণার মেয়েটাকে দেখলো। অপূর্ণাই সেধে তার কোলে দিলো। ইকবাল কোলে নিলো। ভীষণ মিষ্টি দেখতে। এর ভবিষ্যৎ কি ইকবাল তা জানে না। ছেলে হলে হয়তো বাঁচার চান্স ছিলো। কিন্তু মেয়ে হয়ে সেই চান্স টাও হারিয়ে গেলো। শেখর যেহেতু মুসলমান। সেহেতু বাচ্চাটাও মুসলমানই হবে। ইকবাল কানের কাছে মুখ নিয়ে বিরবির করে আজান দিলো। এই প্রথমবারের মতো পতিতালয়ের ভেতরে আজানের ধ্বনি শোনা গেলো কারো মুখে। এমনি তে মসজিদ থেকে ভেসে আসতো। অপূর্ণা বলল-
“ ওর একটা নাম রেখে দেন ইকবাল ভাই। ”
ইকবাল হকচকিয়ে গেলো।
“ আ..আমি রাখবো! ”
“ হুমম,রাখুন। আপনি তো ওর চাচা হোন। ”
ইকবাল কিছুক্ষণ ভেবে বলল-
“ সিমরান। ”
“ সুন্দর নাম তো। ”
ইকবাল দিয়ে দিলো বাচ্চা টাকে অপূর্ণার কোলে। তারপর বেরিয়ে গেলো।
শেখর জানতে পেরেছে অপূর্ণা মেয়ে সন্তান জন্ম দিয়েছে। বাচ্চা টা একটু বড় হলেই বাচ্চাটাকে সে নিয়ে নিবে। সব পরিকল্পনা করা শেষ। এখন শুধু বাস্তবায়নের জন্য অপেক্ষা। পতিতালয় এসে প্রেমার সাথে তর্কাতর্কি করে। এক পর্যায়ে দুটো চ’ড় দিয়েছিল প্রেমার গালে মনির কথায়। গাল লাল হয়ে গেছে । আঙুলের ছাপ বসে গেছে। মনিটা সহ্য করতে পারে না প্রেমা কে।
প্রেমা অপূর্ণার রুমে থাকা শুরু করলো। বাচ্চাটা খুব কান্না করে। পূর্ণা একা সামলাতে পারে না। প্রেমাই রাত জেগে বাচ্চা টাকে সামলায়। যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন মায়ের পাশে শুইয়ে দিয়ে আল্লাহর দরবারে দু হাত তুলে। অপূর্ণা প্রেমার গালে মলম লাগিয়ে দিয়েছিল। জানোয়ারের বাচ্চারা পারে শুধু গায়ে হাত তুলতে। জ্বর আসলো সেদিনের পর প্রেমার গায়ে প্রচণ্ড। এক মধ্য রাতে অপূর্ণার ঘুম ভেঙে যাওয়ায় চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে প্রেমা দু হাত তুলে স্রষ্টার নিকট কান্নারত গলায় সাহায্য চাইছে। তাকে পথ দেখাতে বলছে। অপূর্ণা অবাক হলো। সে আজ স্রষ্টা কে ডাকে না কয়েক বছর হলো। অভিমান বা রাগে। কিন্তু এই মেয়ে এখনও স্রষ্টার কাছে সাহায্য চাইছে এত কিছুর পরও! এই অসুস্থ শরীর নিয়ে! খুব ক্ষোভ থেকেই অপূর্ণা বলল-
“ তোমার জীবনে যা হয়েছে, তা কোনো মানুষের পক্ষে সহ্য করার কথা নয়, প্রেমা। তোমার স্বামীই তোমাকে পতিতালয়ে টেনে এনেছে,তোমার শরীরকে দিয়েছে নির্মম নির্যাতন,কাটা ঘায়ে মরিচের গুঁড়ো ছিটিয়ে দিয়েছে নিষ্ঠুর ভাবে। তবুও তুমি এই অসুস্থ দেহ নিয়ে, এই নরকের ভেতর দাঁড়িয়ে আল্লাহর ইবাদত করছো! এখনো তার কাছেই সাহায্য চাইছো যে তোমার জীবনে সুখ বলে কিছুই রাখেনি!”
প্রেমা মোনাজাত টা শেষ করে ক্লান্তি মুখে পূর্ণার দিকে তাকালো। চোখে মুখের পানি মুছে, স্মিত হেঁসে বললো –
“ এই পৃথিবীতে আল্লাহ ছাড়া আমার আপন বলতে আর আছেই বা কে? ভাগ্যকে নিয়ে যতই অভিযোগ করি না কেন,দিন শেষে আমি একজন মুসলমান। মৃত্যুর পর আমাকে তার কাছেই ফিরে যেতে হবে । এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার দেওয়া দুঃখের জন্য তো আমি কখনোই চিরস্থায়ী পরকালের শান্তি বিক্রি করতে পারি না। পরিস্থিতি যেমনই হোক আমাকে তার ইবাদত করতেই হবে,। আমার সব ব্যথা, সব না-বলা কষ্ট জানাতে হবে একমাত্র তাকেই। তার উপর রাগ অভিমান করে তাকে ডাকা বন্ধ করে দিতে পারি না। আমাদের কে তো তারই ইবাদত করার জন্য পাঠানো হয়েছে পূর্ণা। আমার বিশ্বাস, আমার আল্লাহ একদিনের জন্য হলেও আমার দিকে দয়ার দৃষ্টিতে তাকাবেন, আর পুরস্কার স্বরূপ এই নরকসমান যন্ত্রণা থেকে আমাকে মুক্তি দেবেন।”
ঠিক তখনই বাহির থেকে মেয়েলি কান্নার স্বর ভেসে আসলো। প্রেমা উঠে দাঁড়ালো। কেউ বারবার বলছে আজকে অন্তত আমায় ছেড়ে দিন। আমার শরীর অসুস্থ। আমি পারবো না।
পূর্ণা সেই আওয়াহ শুনে বলল-
“ জোর করে নিয়ে যাচ্ছে। ”
প্রেমা বেরিয়ে গেলো ততক্ষনাৎ ই রুমের দরজা খুলে। মতের বিরুদ্ধে গিয়ে ওসন করবে! মেয়েটা তো বারবার অনুনয় করে বলছে শরীর টা খারাপ তার। পেছন থেকে পূর্ণাও ছুট লাগালো। এই মেয়ে কেনো যাচ্ছে। বাঁধা দিলে তো তাকেও পেটাবে। পূর্ণা আটকানোর চেষ্টা করলো কিন্তু প্রেমা শুনলো না। অগ্যতা পূর্ণা ইকবালের কাছে গেলো। ইকবাল ঘুমাচ্ছিলো পূর্ণার গলার ডাক শুনে ঘুম ভাঙে। দরজা খুলে জিজ্ঞেস করলো-
“ সিমরান ঠিক আছে? ”
“ হ্যাঁ, সিমরান ঠিক আছে। প্রেমা কে বাঁচান। ”
ইকবাল চমকে উঠলো –
“ উনার কি হয়েছে আবার? ”
“ কাকে যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো জোর করে। সেটাকে থামানোর জন্য প্রেমা ছুটে গিয়েছে। জানেন তো বাঁধা দিলে কি করে। ”
ইকবাল বিষয়টা বুঝতে পেরেই দ্রুতলয়ে হাঁটা ধরলো। এদিক ওদিক তাকিয়ে খুঁজতে খুঁজতে যখন প্রেমাকে দেখতে পেলো। সাথে সাথে প্রেমার ডান হাত টা টেনে ধরে নিয়ে চলে গেলো।
আকস্মিক এমন টানে চমকে যায় প্রেমা। ইকবালের দিকে তাকিয়ে বলে-
“ আপনি! টেনে নিয়ে আসলেন কেনো? হাত ছাড়ুন। ওরা জোর করে নিয়ে যাচ্ছে মেয়েটাকে। ”
ইকবাল ঠান্ডা গলায় বলল-
“ আপনি রুমে যান। ”
“ না যাব না। আপনি হাত ছাড়ুন। ”
“ ওদের সাথে পারবেন না আপনি প্রেমা। বুদ্ধি দিয়ে ভাবুন। আপনার উপর পাল্টা আক্রমণ আসবে। আপনি আহত হবেন। ”
“ কম তো আহত হই নি। আরেকটু না হয় হলাম। ”
ইকবাল পূর্ণা কে ডেকে বলল-
“ উনাকে নিয়ে যাও পূর্ণা। আমি দেখছি। ”
পূর্ণা প্রেমার হাত ধরে বলল-
“ চলো প্রেমা। ইকবাল ভাই দেখবেন বিষয় টা। ”
এক প্রকার টেনেই নিয়ে গেলো রুমে। প্রেমাকে রুমে রেখে পূর্ণা ইকবালের কাছে গিয়ে বলল-
“ ইকবাল ভাই প্রেমাকে কি এখান থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া যায় না? মেয়েটা এসবে অভ্যস্ত না। রোজ মার খায়। শেখর মারে,মনি মারে। মেয়েটা অনেক ভালো জানেন? অনেক কষ্ট পাইছে। একটু দেখেন না যদি পারেন একটু সাহায্য করতে। কদিন আগে যে খু’ন হলো না? ওটা প্রেমাই করছে। ওর রুমে পাঠিয়েছিল লোকটাকে শেখর। ”
শেখর তাহলে ইকবাল কে মিথ্যা বললো সেদিন!
“ ওর বাসার ঠিকানা টা জেনে থাকলে আমাকে জানিও। ”
“ আপনি চিনেন না প্রেমা কে? ”
“ আমার চেনার কথা ছিলো? ”
“ শেখরের বউ প্রেমা। ”
বজ্রপাতের মতো চমকে উঠলো ইকবাল। শেখরের বউ! জানতো শেখর বিবাহিত। কিন্তু বউ কে,বাড়ি কোথায়,নাম কি তা তো জানতো না। নিজের বউকে শেষমেশ পতিতালয় নিয়ে এসেছে শেখর!
ইকবাল কিছু বললো না চলে গেলো।
বাতাসি কে আজ স্কুলে দিয়ে আসার সময় বাতাসির এক ম্যাডাম ইয়াসিন কে ডেকে উঠে। নতুন এই ম্যাডাম টা এসেছে অল্প ক’দিন হলো। বাতাসি দের ইংরেজি ক্লাস নেয়। ইয়াসিন কে প্রায় দেখে বাতাসি কে দিয়ে যেতে নিয়ে যেতে। কিন্তু জানা হয় নি বাতাসির কি হয়। সেজন্য আজ কৌতূহল থেকে তিনি ইয়াসিন কে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করলো- তিনি বাতাসির কি হয়।
ইয়াসিনের কপালে দু ভাজ পড়লো এ কথা শুনে। ম্যাডাম তাড়া দিতেই ইয়াসিন বললো-
“ কাজিন হয়। ”
যেহেতু কদিন পরই তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবে। সেজন্য এটাই বললো।
“ আপনার বোন! ওহ্ আচ্ছা। আপনার নাম কি? ”
“ ইয়াসিন। আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন? আমার তাড়া আছে। ”
“ আপনার নম্বর টা পাওয়া যাবে? ”
“ কেনো? কিসের জন্য আমি আপনাকে আমার নম্বর দিতে যাব? ”
“ বাতাসির পড়ালেখা সম্পর্কে আপডেট দিতে আর নিতে। খুব কম মনোযোগী তো। ”
অথচ বাতাসি ভীষণ মনোযোগী একটা মেয়ে। ইয়াসিন বাতাসির কথা শোনায় ফেন নম্বর টা দিলো। তারপর চলে গেলো। ম্যাডাম টা ইয়াসিনের নম্বর টা পেতেই ব্লাশ করতে লাগলো। ছেলেটাকে তার ভীষণ ভালো লাগে। দেখতে কি হ্যান্ডসাম।
বাতাসি কে ইংরেজি ম্যাডাম অন্যান্য ম্যাডাম দের তুলনায় ইদানিং একটু বেশিই দেখাশোনা করছে। মানে পড়াশোনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। কোনো টপিক বুঝতে অসুবিধা হয় কি না। কদিন আগেও তো কেমন নাক ছিটকাতো বাতাসি কে দেখে। এখন এত আদর করে দেখে একটু অবাকই হচ্ছে। টিফিন টাইমে বাতাসির কাছে আসলে ম্যাডাম তিন্নি। বাতাসি তখন রুটি আর আলু ভাজি খাচ্ছিলো। তিন্নি ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলো-
“ বাতাসি তোমাদের বাসায় কে কে থাকে? ”
বাতাসি চুপচাপ খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলো-
“ আমি আর আমার স্বামী। ”
“ তুমি বিবাহিত! ”
“ হুমম। ”
“ কে করলো তোমায় বিয়ে! ”
বাতাসি তাকালো তিন্নির দিকে। কটাক্ষ করে বললো কথাটা মনে হলো। টিফিন বক্স বন্ধ করতে করতে বলল-
“ একটা রাজপুত্রের মতো দেখতে ছেলে আমায় বিয়ে করছে। ”
“ বাহ্! দেখতে হবে তো। আচ্ছা তোমার থেকে একটা ইনফরমেশন জানার ছিলো। ”
“ বলুন। ”
“ ইয়াসিন কি করে? আই মিন জবটব? উনি কি সিঙ্গেল? ”
বাতাসি বাঁকা চোখে তাকালো।
“ না উনি সিঙ্গল না। বিবাহিত। আর কিছু? ”
তিন্নির মুখটা বাংলার ঙ এর মতে হয়ে গেলো। ছেলেটা বিবাহিত! ইশ!
“ দেখে তো মনে হয় না বিবাহিত। ”
“ আমাকে দেখেও তো ভাবেন নি আমি বিবাহিত। তাহলে উনাকে দেখে কি করে ভাববেন? আসছি। ”
বাতাসি চলে গেলো। তিন্নির এখন হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কে এই ছেলের বউ? ইশ ছেলেটাকে দেখলেই এখন খারাপ লাগবে।
সন্ধ্যা ঠিক ৭ টার মতো বাজে। সোলেমান এসেছে একটা ফাইভস্টার হোটেলে। রাজনৈতিক কিছু মিটিং হচ্ছে। সোলেমানের ভালো লাগছে না। কি একটা ড্রিংকস খেলো শরীর গরম হয়ে যাচ্ছে। মিটিংয়ে কি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তা বুঝতে অসুবিধা হতে লাগলো সোলেমানের। খুবই বিরক্ত। এক পর্যায়ে সে বলে বসলো-
“ আমি আর কন্টিনিউ করতে পারছি না মিটিং টা। আমাকে যেতে হবে। ”
“ জ্বি শিওর। ”
সোলেমান বেরিয়ে গেলো। মিটিংয়ে থাকা লোকজন একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। বদ ছেলেটাকে মিটিং থেকে তাড়াতে পারলো তাহলে।
ড্রাইভ করে নিবাসে ফেরা সম্ভব না সোলেমানের। বউ ছাড়া রাত কাটানোও সম্ভব না। সেজন্য হোটেল থেকে বেরিয়ে পাশের হোটেলে বুক করা নিজের রুমে গিয়ে গলার টাই টা ঢিলে করে ইব্রাহিম কে কল করলো। ইব্রাহিম ফোন রিসিভ করতেই সোলেমান বলল-
“ এই আমার বউ দিয়ে যা। ”
ফোনের শুরুতেই এমন কথা শুনে ভরকে যায় ইব্রাহিম।
“ কি আশ্চর্য তোর বউ কি আমার কাছে নাকি। ”
“ পৌঁছে দিয়ে যা আমার কাছে। ”
“ মিটিংয়ে গিয়েও বউ বউ করছিস! কি বলে নিয়ে আসবো?”
“ বল আমার শরীর ভালো না। তাকে দেখতে চাচ্ছি। ”
ইব্রাহিম ফোন কেটে মেহরিনের রুমের সামনে আসলো। দরজায় কড়া নাড়তেই মেহরিন দরজা খুলে জিজ্ঞেস করলো-
“ কিছু বলবেন ভাইয়া? ”
“ রেডি হয়ে নাও। সোলেমান নিয়ে যেতে বলছে তোমায়। ”
মেহরিন ভ্রু কুঁচকালো। সোলেমান তো আজ বাড়ি ফিরবে না বলেছিল। তাহলে?
“ উনি তো বলেছিল উনি বাড়ি ফিরবেন না আজ। তাহলে? ”
“ শরীর খারাপ বললো। ”
মেহরিন চমকে উঠলো। শরীর খারাপ মানে! কি হয়েছে!
মেহরিন কোনো রকমে বোরকা টা গায়ে দিয়ে ছুটলো ইব্রাহিমের সাথে। আধঘন্টা পর একটা হোটেলের সামনে এসে গাড়ি দাঁড় করাতে দেখে মেহরিন জিজ্ঞেস করলো-
“ হোটেলে কেনো ভাইয়া? উনি এখানে? ”
“ হুম। ”
ইব্রাহিম ফোন করলো সোলেমান কে। সোলেমান বলল রুম অব্দি পৌঁছে দিতে মেহরিন কে। তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না হাঁটা। ইব্রাহিম তাই করলো। রুম অব্দি পৌঁছে দিয়ে আসলো। মেহরিনের সাথে ইব্রাহিমও রুমে ঢুকলে সোলেমান ইব্রাহিম কে দেখে বলল-
“ এই তুই ভেতরে আসছিস কেনো? যা বাড়ি যা। ”
ইব্রাহিম মুখ বাঁকালো। শা’লা নিমকহারাম, বউ দেখতেই এখন বন্ধুকে চিনে না। একটু আগেই তাকে জ্বালালো। ইব্রাহিম চলে গেলো। সোলেমান মেহরিন কে বলল-
“ দরজা লাগিয়ে আসো। ”
মেহরিন দরজাটা লাগিয়ে এসে সোলেমানের পাশে বসে গালে হাত রেখে বলল-
“ কি হয়েছে আপনার? শরীর খারাপ বলে? ডক্টরের কাছে যাবেন চলুন। ”
“ ডক্টর লাগবে না। তুমি আছো তাতেই চলবে। ”
“ আপনাকে অস্বাভাবিক লাগছে কেনো? ”
“ শালার,সামান্য একটা ড্রিংকসই তো খেলাম। শরীর কেনো কন্ট্রোলে রাখতে পাচ্ছি না। মেহরিন…”
“ হুমম। ”
“ কিছু মিছু করতে গেলে বাঁধা দিও না। আমি কন্ট্রোলে নেই তেমন। ”
“ আজেবাজে কিছু খেয়েছেন। ”
“ মেবি। ”
“ লেবুর পানি খাওয়াই আপনায়? ”
“ নেই তো। ”
“ খেলেন কি করে। দেখুন তো কেমন হয়ে যাচ্ছেন। ”
“ আমি তো সামান্য ফলের জুশই নিয়েছিলাম। উফফফ খারাপ লাগছে আমার। ”
সোলেমান লাইট নিভিয়ে দিলো। বিছানায় এসে মেহরিনের কোমড় চেপে ধরে ওষ্ঠদ্বয় আঁকড়ে নিলো নিজের মধ্যে। মেহরিনের চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। সোলেমান মেহরিনের কানের কাছে মুখটা নিয়ে বলল-
“ সরি,আই কান্ট কন্ট্রোল মাইসেল্ফ। সো সরি মাই ওয়াইফি। ”
মেহরিনের মাঝে ডুবে গেলো সোলেমান। দরজার ওপাশে থাকা একটা মেয়ে সোলেমানের রুমের দরজায় হাত রাখতেই ভেতর থেকে লাগানো বুঝতে পেরে কাউকে ফোন করে বলল-
“ দরজা তো ভেতর থেকে লাগানো। এখন ঢুকবো কি করে? ”
ওপাশ থেকে জবাব আসলো-
“ ডুপ্লিকেট চাবি নিয়ে ঢুকো। ”
“ পাঠান আপনি। ”
দাহশয্যা পর্ব ৮৪ (৩)
লোকটা হোটেলের ম্যানেজারের সাথে কথা বলে জানতে পারলো সোলেমান সুলতানের রুমের ডুপ্লিকেট চাবি নেই । সোলেমান রাখতে দেয় নি। দুটোই তার কাছে নিয়ে নিয়েছে। ”
ফোনের ওপাশে থাকা লোকটা শিট! বলে রেগে উঠলো। এই একটা সুযোগ ছিলো সোলেমান কে বদনাম করার। লোকটা সেটাও হতে দিলো না। দরজা বন্ধ করে রেখেছে ভেতর থেকে! কত পরিকল্পনা করলো। সোলেমান কে নেশাগ্রস্ত করে মেয়েটাকে তার রুমে পাঠিয়ে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি তুলে,মিডিয়ায় ছেড়ে বদনাম করবে। সবটা ভেস্তে দিলো বদ খাটাশ অহংকারী ঠেঁটা বদমেজাজি এমপি নওয়াজ সোলেমান সুলতান!
