শিরোনামহীন অনুভূতি শেষ পর্ব
রুহানিয়া ইমরোজ
পূর্ণতা এক চমৎকার গন্তব্য। হাজারো প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তবেই প্রাপ্তি হিসেবে ঠাঁই মিলে এখানটায়। তুরাব এবং ইসরাত পেরেছে এই মহাযুদ্ধে জয়ী হতে। যার ফলস্বরূপ তাদের দীর্ঘ সাত বছরের ভালোবাসা পরিশেষে বৈধতার স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়েছে।
কবুল বলা শেষ হতেই চারপাশ থেকে উল্লাসধ্বনি শোনা যায়। তীব্র শব্দে ফারজানার কোলে থাকা ছোট্ট ফারশাদ গলা ফাটিয়ে কেঁদে উঠে। বাচ্চাটা একদমই ভিড়ভাট্টা সহ্য করতে পারে না। উচ্চ শব্দ হলে তো কেঁদেকুটে একেবারে নাজেহাল হয়ে যায়। ছেলেকে কাঁদতে দেখে ফারজানা ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তার পাশে দাঁড়ানো প্রিমা ধীর স্বরে বলে,
–” শাদ বাবুর কী হয়েছে বুবু?
ফারজানা ব্যস্ত ভঙ্গিতে ছেলের পিঠে চাপড় দিতে দিতে বলে,
–” আশেপাশে অতিরিক্ত শব্দের কারণে এরকম করছে। অনেক্ক্ষণ ধরে ওকে খাওয়ানো হয়নি। হয়তো ক্ষুধা লেগেছে…
প্রিমার কপালে ভাঁজ পড়ে। এদিক-ওদিক চেয়ে শান এবং রাজকে খুঁজলেও তাদের দেখতে পায় না। বাধ্য হয়ে আরশিয়ান কে কল দিতে দিতে বলে,
–” তুমি বরং ওকে নিয়ে সেকেন্ড ফ্লোরের দুইশো তিন নম্বর রুমে যাও। ওটা আমাদেরই বুক করা রুম। সমস্যা হবে না..
ফারজানা একটু ইতস্তত করে বলে,
–” আমি একা যাবো?
ফারশাদ তখনও গলা ফাটিয়ে কাঁদছে। ক্রমাগত কান্না করার কারণে টকটকে ফর্সা মুখটা একদম লাল হয়ে গেছে। শ্বাস আঁটকে ফেলছে রীতিমতো। প্রিমা বেচারার অবস্থা দেখে তাড়া দিয়ে বলল,
–” আমিও যেতাম সাথে কিন্তু এদিকটায় না থাকলে সমস্যা হবে। বাড়ির বড় বউ বিধায় দায়িত্বের ভারটা বিশাল। তুমি নিশ্চিন্তে যাও। আমি রাজ ভাই কে ইনফর্ম করে দিচ্ছি।
ফারজানা প্রিমার থেকে চাবি নিয়ে ঘরের দিকে গেলো। চলতি পথে মনে মনে ইশতিরাজ কে বকা দিতে ভুললো না অবশ্য। ভীড় থেকে বেরিয়ে আসায় ফারশাদও ততক্ষণে কান্না থামিয়েছে। ফারজানার কাঁধে মাথা ফেলে ফোঁপাচ্ছিল কেবল। ফারজানার ভীষণ খারাপ লাগে ছেলের অবস্থা দেখে।
করিডরের বিষয়টা নিয়ে ব্যস্ত ছিলো ইশতিরাজ আর আরশিয়ান। তন্মধ্যে প্রিমার কল আসায় আরশিয়ান সমস্ত দায়িত্ব বুঝে নিয়ে ইশতিরাজ কে পাঠিয়ে দেয়। বউ বাচ্চার ম্যাটার বলে ইশতিরাজ ও দ্বিমত করে না। একপ্রকার ছুটে আসে দোতালায়।
রিসেপশন থেকে আনা কার্ডটা সেন্সরে টাচ করাতেই দরজা খুলে যায়। ইশতিরাজ ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখে তার ছেলে আরামসে বিছানায় পড়ে ঘুমাচ্ছে। তবে তার হালকা লালচে বর্ণের মুখশ্রী দেখে বুকটা মুচড়ে উঠে। ইশ্ কতোই না কেঁদেছে তার কলিজাটা।ছেলেকে বুকে টেনে আদর করতে মন চাইলেও শাদ এর ঘুমটা এমুহূর্তে ভাঙাতে চাইলো না ইশতিরাজ।
ছেলের দু’পাশে থাকা বালিশ দু’টো ঠিক করে দিয়ে বউয়ের খোঁজ করতে লাগলো। পুরো ঘরটায় চোখ ঘুরিয়ে বুঝলো তার বউ ঘরে নেই। কিছু একটা মনে পড়তেই বারান্দার দরজাটা খুলে বেলকনি চেক করতে গেলো। ব্যস! থমকে গেলো ইশতিরাজ। চক্ষু শীতল করা দৃশ্য দেখে বেড়ে গেলো হৃৎস্পন্দনের গতি।
প্রিয়তমা কে চোখ ভরে দেখার জন্য নিশ্চুপে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে ইশতিরাজ। আচমকা পেছনে কারও অস্তিত্ব টের পেয়ে চমকে পিছু ফিরলো ফারজানা। আতঙ্কে বুক ধড়ফড় করছিলো তার। তবে পেছনে ফিরে শুভ্র রাঙা পাঞ্জাবি পরিহিত ইশতিরাজকে দু’হাতে ভাজ করে দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিছুটা স্বস্তি পায়। রাগও হয় খানিকটা। তাই অভিযোগের স্বরে বলে,
–” কে আপনি? এখানে কেনো এসেছেন?
বউয়ের অভিমান বুঝে মুচকি হাসে ইশতিরাজ। হেয়ালি করে বলে,
–” কারও অসভ্য জামাই আমি। এখানে এসেছি আমার একমাত্র বউকে আদর করতে..
ফারজানা হকচকিয়ে যায়। রাজের লাগামহীন কথা শুনে চোখ পাকিয়ে বলে,
–” কথা এড়িয়ে যেতে চাইছেন? আর কীসব বলছেন আপনি? ভালো হচ্ছে না কিন্তু..
ফারজানার অপ্রস্তুত মুখটা দেখে ভীষণ হাসি পায় ইশতিরাজের। তবুও হাসিটা চাপিয়ে রেখে জানাকে জ্বালাতে পুনরায় একই ভাবে বলে,
–” কথা এড়িয়ে যাচ্ছি না তবে একটা সিরিয়াস বিষয় নিয়ে ভাবছি। ফারশাদ আসার পর পরই তার আরেকটা ভাই-বোন আনার পরিকল্পনা করা উচিত ছিলো। এতটা দেরি করে মোটেও ভালো করিনি।
ফারজানার চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়। বেলেহাজ মানুষটার বেলাগাম কথায় তার রাগ উবে লজ্জা ভর করে চেহারায়। ইশতিরাজ বাঁকা হাসে তা দেখে। ফারজানা চুপ করে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে। তবে বাসন্তী রাঙা লেহেঙ্গা পরিহিত ফারজানা কে মাথা থেকে পা পর্যন্ত স্ক্যান করছিলো ইশতিরাজ। তা দেখে ফারজানা খানিকটা অস্বস্তি নিয়ে বলে,
–” কী দেখছেন এভাবে? ”
ইশতিরাজ জবাব দেয় না। ধীর পায়ে একটু একটু করে এগিয়ে আসতে থাকে। ফারজানা নড়তে পারে না বরং নিজের জায়গায় স্থির থাকে। ইশতিরাজ সন্নিকটে এসে দাঁড়াতেই ফারজানার চোখে চোখ রেখে মৃদু হেসে বলে,
–” আমার বউয়ের সীমাহীন সৌন্দর্য..
ব্যাস! ফারজানার গলা শুকিয়ে আসে। এই মোহনীয় দৃষ্টি তার বড্ড বেশি পরিচিত। এসব কথাবার্তাও তার অজানা নয়। দিনে দুপুরে কী শুরু করেছে এই অসভ্য লোকটা? পরিস্থিতি সামলাতে ফারজানা আমতা আমতা করে বলল,
–” কীসব বলছেন! বয়স বেড়েছে। এক বাচ্চার মা হয়েছি। স্বাস্থ্য বেড়েছে আগের তুলনায়। এখন কী আর সেই সৌন্দর্য আছে?
ইশতিরাজ এবার শব্দ করে হেসে ফেলল। ফারজানা চোরা চোখে দেখলো সেই মনোমুগ্ধকর হাসি। হাসলে ভীষণ সুন্দর লাগে লোকটাকে। সে চোখই ফেরাতে পারে না কেনো জানি। খানিকক্ষণ পর ইশতিরাজ থামলো। হাসি থামিয়ে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল জানার দিকে। তার মাথার টিকলিটা ঠিক করে দিতে দিতে স্পষ্ট গলায় উত্তর দিলো,
–” তোমার একেকটা পরিবর্তন আমাকে আরও একটা করে কারণ দিয়েছে কেবল তোমার প্রতি অবসেসড্ থাকার জন্য। বুকে আতঙ্ক ধরিয়ে দেওয়ার মতো মারাত্মক সুন্দর তুমি সুরঞ্জনা। ”
ফারজানা চমকে তাকাল। তার দৃষ্টিতে অবিশ্বাস। একটা মানুষ কীভাবে কাউকে এতটা ভালোবাসতে পারে? ইশতিরাজ তার দৃষ্টি উপেক্ষা করে তাকে এক হাতে বুকে জড়িয়ে নিলো। চুলে মুখ ডুবিয়ে সুবাস টেনে বলল,
–” শান্তিইইইইইই…
অশ্রুভেজা চোখ নিয়েও হেসে ফেললো ফারজানা। লোকটার পাগলামি দেখে না হেসে উপায় আছে? একটু দূরত্বে গেলেই ইশতিরাজ ছটফটায়। ডিউটি শেষে বাসায় আসলে তাকে জড়িয়ে ধরে ঠিক একই কাজ করে। কে বলে মানুষ পরিপূর্ণ সুখ পায় না? তাদের জানা উচিত, ভয়ংকর অতীতের রেশও কর্পূরের ন্যায় উবে যায় যদি তার বাছাই করা মানুষটা সঠিক হয়।
বিয়ের কার্যক্রম শেষ হয়েছে। বর বউকে নিয়ে খেতে বসেছে সবাই। সারাদিন কাজকর্ম শেষে একটু ফ্রী হয়েছিল আরশিয়ান তবে বিজনেস ম্যানদের ছুটি বলে কিছু থাকে না। খেতে বসা মাত্রই অফিস থেকে ইমার্জেন্সি কল আসে আরশিয়ানের। না চাইতেও সে খাওয়া ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ভীড় থেকে একটু বাহিরে এসে কথা বলতে থাকে ফোনে।
প্রায় ঘন্টাখানেক কথা বলার পর তার ফোনে আরেকটা কল আসে। কলার আইডির নাম দেখে আরশিয়ানের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। কলটা রিসিভ করলেও ওপাশের কথা ঠিকঠাক শুনতে পায় না। নেটওয়ার্ক ইস্যু থাকায় বাধ্য হয়ে আরশিয়ান ভেন্যু থেকে বেরিয়ে খানিকটা দূরে যায়। ফোনটা কানে ধরে ক্রমাগত বলতে থাকে,
–” হ্যালো? অফিসার? ক্যান ইয়্যু হেয়ার মি? ”
অপর পাশে থাকা ইন্সপেক্টর বিমর্ষ গলায় বললেন,
–” ইয়েস মিস্টার আরশিয়ান। আপনারা কাইন্ডলি একটু নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার চেষ্টা করুন। আজ ফাঁসির রায় ছিলো আশরাফ ওয়াসীত্বের কিন্তু হুট করে তিনি জেল থেকে উধাও হয়ে যান।
অফিসারের কথায় আরশিয়ান হকচকিয়ে উঠে। না পারতে চিল্লিয়ে বলে উঠে,
–” হোয়াটটট? কীভাবে সম্ভব? জেল থেকে কয়েদি পালায় কীভাবে? ”
অফিসার হতাশ কন্ঠে বললেন,
–” এটার সাথে অভ্যন্তরীণ কেউ জড়িত নিশ্চয়ই। খোঁজ করলে হয়তো পাওয়া যাবে তবে এমুহূর্তে আপনাদের সেফটি এনশিওর করাটা বেশি জরুরি।আশরাফ ওয়াসীত্বের টে রোরিস্ট টিমের সাথে ভালো সম্পর্ক আছে। কখন কী ঘটিয়ে ফেলে বলা যায় না।
আরশিয়ানের মনে হয় তার পায়ের তলার জমিন সরে গেছে। অতিরিক্ত টেনশনে সে ঘামতে থাকে। ওদিকে আরশিয়ানের উত্তর না পেয়ে অফিসার বলেন,
–” আর ইয়্যু ওকে মিস্টার চৌধুরী? ”
আরশিয়ান শুষ্ক ঢোক গিলে বলে,
–” আম্…
বাকি কথা শেষ হয় না। এর পূর্বেই বিকট একটা শব্দ শোনা যায়। আরশিয়ান ব্যালেন্স হারিয়ে রাস্তায় পড়ে যায়। হাতে থাকা ফোনটা ছিটকে পড়ে অদূরে। কী হয়ে গেলো সেটা বুঝতে খানিকক্ষণ সময় লাগলো তার। শব্দের উৎস অনুযায়ী পেছনে তাকাতেই নজরে আসলো আগুনের স্ফুলিঙ্গ।
দাউদাউ করে জ্বলছে কনভেনশন সেন্টারটা। যেখানে শ’খানেক মানুষ বিয়ের দাওয়াত খেতে এসেছিলো । তাদের মধ্যে তার পরিবারও ছিলো। আরশিয়ান প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে উঠে দাঁড়ায়। অবাক চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে পাগলের মতো দৌড়ে যায় সেদিকে। অস্ফুটস্বরে বলতে থাকে,
–” আমি আসছি প্রেম.. আমি আসছি তোমাদের বাঁচাতে।অপেক্ষা করবেন কিন্তু..
বিচ্ছিরি একটা সপ্ন দেখে ধড়ফড়িয়ে ঘুম থেকে উঠে বসে আরশিয়ান। হাঁপাতে হাঁপাতে পিটপিটিয়ে চোখ মেলে চারপাশে তাকায়। ভালো করে লক্ষ্য করতেই বুঝতে পারে সে তার রুমেই আছে। আর ওটা জাস্ট একটা বাজে সপ্ন ছিলো। মাথায় খানিকটা চাপ প্রয়োগ করতেই মনে পড়ে আশরাফ ওয়াসীত্ব ধরা পড়েছিল পাঁচ বছর আগেই। জেল থেকে পালানোর চেষ্টা করায় ইনকাউন্টারে মৃত্যু হয় তার।
আর তুরাবের বিয়েও নির্ভেজালে শেষ হয়েছে। ঘন্টা তিনেক আগেই বাড়ি ফিরেছে তারা। সারাদিন যাবত কাজ করায় আরশিয়ান ভীষণ ক্লান্ত ছিলো। এজন্যই বাসায় ফিরে শাওয়ার নিয়ে সে ঘুমিয়ে যায়। সবকিছু মনে পড়ায় আরশিয়ানের হৃৎস্পন্দনের হতি নরমাল হয়।
বেড সাইড টেবিলে থাকা পানিটা খেয়ে নিজেকে শান্ত করে অতঃপর প্রিমা কে খুঁজতে থাকে। কিন্তু তার বউ রুমে নেই। বিষয়টা বুঝতে পেরে অতি মাত্রায় মেজাজ খারাপ হয় আরশিয়ানের। হাজার বার সে প্রিমাকে বলেছে,
–” আমি থাকাকালীন রুম থেকে বের হবেন না প্রেম
অথচ এই মেয়ে শুনতেই নারাজ। বিরক্ততে আরও বেশি মেজাজ খিঁচড়ে আসে তার। অনাবৃত দেহে একখানা টিশার্ট জড়িয়ে বেরিয়ে পড়ে বউয়ের খোঁজে।
লিভিংরুমের সোফায় চোখবুঁজে গা এলিয়ে বসে আছে প্রিমা। দিনদুনিয়া অন্ধকার লাগছে তার। বিয়ের ব্যস্ততায় শরীরের দিকে নজর দেওয়া হয়নি। এখন নড়াচড়া করার শক্তিটাও পাচ্ছে না। মাথা ভার লাগছে ভীষণ বিধায় এখানেই বসে আছে।
আরশিয়ান রুম থেকে বেরিয়ে দেখে তার বউ সোফায় শুয়ে আছে। প্রিমার ক্লান্ত মুখশ্রী দেখে মেজাজের পারদ আরও চওড়া হয়। বাসায় কাজের লোকের অভাব আছে? তার অসুস্থ বউ কেনো দৌড় ঝাঁপ করবে? হাজারবার বলেও এই মেয়েকে বোঝানো যায় না। নিশ্চিত শরীর খারাপ লাগছে বলেই এভাবে বসে আছে।
প্রিমার পানে রক্তিম চোখে চেয়ে থাকে আরশিয়ান। অথচ প্রিমার কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। সে চোখবুঁজে মরা মানুষের মতো নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে। কিছু একটা ভেবে আরশিয়ান আশেপাশে তাকায়। চারপাশে কাউকে না দেখতে পেয়ে হনহনিয়ে হেঁটে প্রিমার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর এক ঝটকায় তাকে কোলে তুলে নেয়। আচমকা এমন হওয়ায় প্রিমা অস্ফুটস্বরে আর্তনাদ করে উঠে। আতঙ্কিত হয়ে চোখ মেলে তাকিয়ে বলে,
–” ক্ কী করছেন…
আরশিয়ান ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে ঘরের দিকে এগোতে এগোতে বলল,
–” বিচার করার জন্য আসামি কে কাঠগড়ায় নিয়ে যাচ্ছি।
কথাটা কান অব্দি আসলেও উত্তর দেয় না প্রিমা। ক্লান্তিতে নেতিয়ে পড়ে আরশিয়ানের বাহুডোরে। তার বুকে মাথা ঠেকিয়ে থেমে থেমে বলে,
–” একটু ঘুম পাড়িয়ে দিন প্লিজ…
প্রিমার কথায় আরশিয়ানের কপালে ভাঁজ পড়ে। রাগটা নিমিষেই মাটি হয়ে যায়। একরাশ চিন্তা ঘিরে ধরে তাকে। প্রশ্নাত্মক চোখে চেয়ে অনুসন্ধানী স্বরে আরশিয়ান প্রশ্ন করে,
–” কী হয়েছে আপনার? মুড সুয়িং হচ্ছে? নাকি বুক ধড়ফড় করছে?
সিজারের পর প্রায়ই এমন হতো প্রিমার এজন্যই আরশিয়ান প্রশ্নটা করলো। প্রিমা ঠোঁট দিয়ে জিভ ভিজিয়ে শান্ত গলায় বলল,
–” কিচ্ছু হয়নি আমার। সব ঠিকাছে। একটু বেশিই ক্লান্ত লাগছে আরকি। আর কতক্ষণ কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন? বেডরুমে চলুন নয়তো নামিয়ে দিন আমায়। ”
খানিকটা অস্বস্তি নিয়েই বললো প্রিমা। আরশিয়ান চুপচাপ তাকে নিয়ে ঘরে গেলো। বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বলল,
–” এখানেই বসুন। আমি ইশতিরাজ কে ডেকে আনছি। আপনার ছলচাতুরী বোঝা হ’য়ে গেছে আমার।
প্রিমা প্রত্যুত্তর করতে পারলো না। তার আগেই গা গুলিয়ে আসলো তার। বমি আসছে বুঝতে পেরে বেচারি এক ছুটে ওয়াশরুমে যায়। প্রিমা কে ওভাবে ছুটে যেতে দেখে আরশিয়ান ভীষণ অবাক হয়। হুঁশ ফিরতেই সেও প্রিমার পিছু গিয়ে তাকে আগলে নেয়।
প্রিমার ততক্ষণে এক দফা বমি হয়ে গেছে। দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে হাঁপাচ্ছে কেবল। শান কিছু বলতে নিবে তার আগেই আবারো গা ভাসিয়ে বমি করে ফেলে প্রিমা। প্রিমার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে চিন্তিত স্বরে আরশিয়ান শুধায়,
–” আর ইয়্যু ওকে? বেশি খারাপ লাগছে ওয়াইফি?
প্রিমা ভার ছেড়ে দেয় আরশিয়ানের উপর। লম্বা শ্বাস টেনে হাঁপানো কন্ঠে বলে,
–” আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরুন প্লিজ.. স্ সব অন্ধকার লাগছে।
আরশিয়ান হাত বাড়িয়ে প্রিমার নতজানু দেহখানা নিজের সাথে আগলে নিলো। প্রিমাও পরম শান্তিতে চোখ বুঁজে পড়ে রইল তার বুকে। খানিকক্ষণ বাদে আরশিয়ান নরম স্বরে শুধাল,
–” হুট করে কী হলো প্রেম? এত অসুস্থ হলেন কীভাবে? ”
প্রিমা ক্লান্ত স্বরে বলল,
–” ক’দিন থেকেই শরীরটা একটু খারাপ। ভেবেছিলাম ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু…
সবটা শুনে আরশিয়ানের কপালে চিন্তার ভাজ পড়লো। সময় নষ্ট না করে প্রিমা কে ফ্রেশ করিয়ে কোলে তুলে রুমে ঢুকলো। তারপর তাকে বেডে শুইয়ে দিয়ে পাশেই বসে রইল। আরশিয়ানের চিন্তিত মুখশ্রী দেখে প্রিমা আদুরে ভঙ্গিতে তার কোলে মাথা রেখে পেটে মুখ গুঁজে অস্পষ্ট স্বরে বলল,
–” জাস্ট একটু দুর্বল লাগছে। ইট’স নরমাল। আপনি অযথা চিন্তা করছেন জনাব।
আরশিয়ান স্মিত হাসলো কেবল। জবাব দিলো না। প্রিমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো নিশ্চুপে। কিছুটা সময় পেরোতেই হঠাৎ করে আরশিয়ানের মাথায় খেলে গেলো এক অপ্রাসঙ্গিক চিন্তা। প্রিমার দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে শুধাল,
–” আপনার লাস্ট মেন্সট্রুয়াল সাইকেলের ডেট কবে ছিলো প্রেম ? ”
আরশিয়ানের প্রশ্ন শুনে প্রিমাও হকচকিয়ে উঠে চোখ মেলে তাকাল। ইতিউতি চেয়ে মাথায় একটু চাপ প্রয়োগ করতেই মনে পড়লো লাস্ট দু-মাসের সাইকেল মিস গেছে। সর্বনাশ!
আরশিয়ান তখনও প্রশ্নাত্মক চোখে চেয়ে আছে। প্রিমা তার পানে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
–” ইয়ে মানে.. পিরিয়ড.. আসলে.. মানে…
স্ট্রেইট ফরওয়ার্ড কথা বলা বউয়ের জড়তা দেখে যা বোঝার তা বুঝে গেলো আরশিয়ান। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে রাগটা কন্ট্রোল করার চেষ্টা করলো। প্রিমা ইনোসেন্ট চোখে চেয়ে রইল কেবল। সংসার জীবনে এই প্রথম আরশিয়ানের রণমুর্তি চেহারা দেখলো সে। কী বলবে বুঝে উঠতে না পারাই চুপ রইল। খানিকক্ষণ পর আরশিয়ান রাগী স্বরে শুধাল,
–” প্রেগন্যান্সি স্ট্রিপ আছে?
প্রিমা দু’পাশে মাথা নাড়িয়ে বলল,
–” নাই…
আরশিয়ান ফোঁস করে শ্বাস ফেলে ফোনটা হাতে তুলে নিলো। তার অশান্ত আচরণ লক্ষ্য করে প্রিমা মিনমিনে স্বরে বলল,
–” এত রাগছেন কেনো? বাচ্চারা তো ফেরেশতা। আল্লাহ কী সবাইকে এই উপহার দেয়? আমরা কত্ত লাকি দেখুন। আমার হেলথ নিয়ে চিন্তা করছেন? এখন তো আমি একদম ফিট এন্ড ফাইন। আগের প্রেগন্যান্সির পাঁচ বছর পেরিয়েছে৷ এখন..
ফোন কানে ধরে রাখা অবস্থায় আরশিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–” জাস্ট শাট আপ প্রেম ..
বাকি কথা শেষ করতে পারলো না প্রিমা তার আগেই বাজখাঁই ধমকে চুপসে গেলো সে। সারাজীবন নরম সুরে কথা বলা মানুষটার এহেনও ভয়ংকর ধমকে রীতিমতো গুটিয়ে গেলো বেচারি। আরশিয়ানের কোল থেকে সরে গিয়ে দুর্বল শরীরে উঠে বসল প্রিমা। তাকে সরে যেতে দেখে আরও এক দফা মেজাজ খারাপ হলো আরশিয়ানের তবে কিছুই বললো না।
অনলাইনে ভালো ব্র্যান্ডের কয়টা স্ট্রিপ অর্ডার দিয়ে চুপচাপ বেডে হেলান দিয়ে বসে রইল আরশিয়ান।
প্রিমার দিকে ফিরেও তাকালো না। ওদিকে প্রিমাও দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিশ্চুপে বিছানার একপাশে হাত পা গুটিয়ে শুয়ে থাকলো। খানিকক্ষণ পর আরশিয়ান উঠে গিয়ে একটা পার্সেল হাতে রুমে আসলো। তার মধ্যে থেকে একটা প্রেগ্ন্যাসি কীট প্রিমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
–” চেক করে রেজাল্ট জানান।
ভয়ংকর লেভেলের শরীর খারাপ লাগছিল প্রিমার।ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছিল। সবে একটু ঘুম এসেছিল তার। আরশিয়ানের ডাকে সেটারও রফাদফা হ’য়ে গেলো। প্রিমা টু শব্দও করলো না। ধীরেসুস্থে উঠে বসে আরশিয়ানের হাত থেকে কীটটা নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে অগ্রসর হলো।
প্রিমার অভিমান বুঝেছে আরশিয়ান কিন্তু সে-ও যে নিরুপায়। নতুন অস্তিত্বের জন্য নিজের আত্মাকে কীভাবে হারাবে সে? সেকেন্ড টাইম বেবি প্ল্যানিং এর ক্ষেত্রে ডক্টর কড়া গলায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। প্রিমার শরীরও খুব একটা ভালো থাকে না। কখনও যদি আরশিয়ান একটু কন্ট্রোল হারায় তবে বেচারি প্রিমা পরপর দু’দিন বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না। অতিরিক্ত ব্যথায় জ্বরাক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়। খুব বেশি স্ট্রেস নিতে পারে না। ভারী কিছু উঠালেই শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ইভেন ইরাকেও কোলে রাখতে পারে না বেশিক্ষণ। বাচ্চারা একটু-আধটু জ্বালালে মাথা ব্যথায় কাহিল হয়ে পড়ে প্রিমা। সামান্য বিষয়গুলো মানতে পারে না সেখানে প্রেগ্ন্যাসির মতো রিস্কি জোনে কীভাবে সারভাইভ করবে সে? আতঙ্কে বুক কাঁপছে আরশিয়ানের। এবার বোধহয় হার্ট এট্যাক হয়েই যাবে..
আরশিয়ানের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রিমা বেরিয়ে আসে। বেচারি টলছে রীতিমতো। আরশিয়ান এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে নেয় তাকে। প্রিমাও চুপচাপ লেপ্টে পড়ে থাকে প্রিয় পুরুষের বক্ষে। আরশিয়ান উত্তেজিত স্বরে জিজ্ঞেস করে,
–” রেজাল্ট কী আসছে?
প্রিমা কথা না বাড়িয়ে প্রেগন্যান্সি কীটটা শানের দিকে বাড়িয়ে দেয়। আরশিয়ান একপ্রকার থাবা দিয়ে ছিনিয়ে নেয় ওটাকে। চোখের সামনে কীটটা ধরতেই বুঝতে পারে রেজাল্ট নেগেটিভ। অর্থাৎ প্রিমা প্রেগন্যান্ট নয়। বিষয়টা বুঝতে পেরে আঁটকে আসা শ্বাসটা ছাড়ে আরশিয়ান। শক্ত করে প্রিমা কে জড়িয়ে ধরে বলে,
–” ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন ওয়াইফি। বকা দেওয়ার জন্য আম স্যরি..
প্রিমা বুঁজে আসা কন্ঠে বলে,
–” নট ফেয়ার..
আরশিয়ান প্রত্যুত্তর করে না। ক্লান্ত প্রিমাকে জড়িয়ে ধরে শান্ত স্বরে বলে,
–” মানুষ জানে আমি একজন সফল বিজনেসম্যান। বিনিয়োগ আর বিনিময়ের হিসেবে বড্ড পাকা। অথচ তারা জানে না, পৃথিবীর নামী-দামী মূল্যবান জহরত এর বিপরীত পাল্লায় যদি তুচ্ছ আপনিটাকে রাখা হয় তবে আমি সবকিছু হারিয়ে স্রেফ আপনাকেই চাইবো।
পরিশিষ্টঃ
নিস্তব্ধ রজনী। বাসরের যাবতীয় কার্যক্রম শেষ হয়েছে। আত্মীয় স্বজনেরা বিদায় নিয়েছে সন্ধ্যায়।বাড়ির বড়রা ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাচ্চারা অলরেডি ঘুমিয়ে পড়েছে। বড় হয়ে যাওয়ায় প্রান্তিক আর আহিয়ানকে আলাদা কম্বাইন্ড রুম দেওয়া হয়েছে। ইরা এখনও আরশিয়ান আর প্রিমাদের সাথেই ঘুমায় তবে বেশিরভাগ সময় সে ঘুমায় তার দাদা-দাদির কাছে। আজও তাই হয়েছে।
বিকেলে ঘুমিয়ে রাত দশটায় উঠেছে প্রিমা। ভালো ঘুম হওয়ায় শরীরটা বেশ ফুরফুরে লাগছিল তার। এজন্যই উঠে সরাসরি কিচেনে এসেছে। সবাইকে খাবার দিয়ে এখন গোছগাছ করছে। এরমধ্যে আরশিয়ান বহুবার তার সাথে ভাব জমাতে এসেছে কিন্তু প্রিমা কথা বলেনি।
হাতের কাজ শেষ শেষ হতেই ফারজানা আর মেহু এসে হাজির হয় কিচেনে। প্রিমা তাদের দেখে বলে,
–” কী ব্যপার? তোমরা এখানে যে..
ফারজানা আগ্রহ নিয়ে বলল,
–” কাজে এসেছিলাম। তুই ফ্রী হয়েছিস?
পাতিলে থাকা অবশিষ্ট চা মগে ঢেলে প্রিমা বলল,
–” হ্যাঁ। কিন্তু কী কাজে এসেছো?
মেহরিমা হাসি চাপিয়ে রেখে বলল,
–” ছাদে গানের আসর বসেছে। আজ ইশতিরাজ ভাই গান গাইবেন। আমাদের দায়িত্ব তাল মেলানো। জলদি চলো বউমনি..
প্রিমা শান্ত গলায় বলল,
–” আজ না মেহু। অন্য কোনোদিন যাবো। তোমরা ইনজয় করো। আমি চা খেয়ে একটু ঘুমাবো..
ফারজানা চোখ ছোটো ছোটো করে বলে,
–” আমার দেড় বছরের বাচ্চা ছেলেকে মেহুর শাশুড়ির কাছে রেখে আমি যেতে পারছি অথচ তুমি ঘুম ছেড়ে আসতে পারছো না? আমার জামাইয়ের ট্যালেন্ট কে ইগনোর করা হচ্ছে? বউ হয়ে তাতো মানবো না আমি…
প্রিমা অসহায় বোধ করলো। তাদের দ্বিমুখী আক্রমনের কবলে পড়ে না চাইতেও রাজি হতে হলো তাকে। তিন রমণী রওনা দিলো ছাদের উদ্দেশ্যে।
সময়টা প্রায় মধ্যরাত। চারদিক নিস্তব্ধ। দূরদূরান্তে কোনো শব্দের উৎস নেই। ছাদে এসে উপস্থিত হতেই চোখ ঝলসে যায় প্রিমার। চারপাশটা ভীষণ সুন্দর করে ডেকোরেট করা। কোনো ধরণের এক্সট্রা কিছু নেই। ভীষণ ছিমছাম করে গোছানো। ছাদের মধ্য খানে চাদর বিছিয়ে রাখা হয়েছে। তার উপর বসে আছে তিনজন সুদর্শন পুরুষ। ইশতিরাজের হাতে গিটার আর শান এবং তাজের হাতে কফির মগ। তিনজন রমণী ছাদে আসতেই ইশতিরাজ মজার ছলে বলল,
–” আমাগো বরবাদি আই মিন বিবিরা হাজির ভাই গন্স। এবার শুরু করা যাক তবে?
ইশতিরাজের ডবল মিনিং কথায় তেতে উঠে ফারজানা। এগিয়ে এসে বসতে বসতে সে বলে উঠে,
–” দিনশেষে কিন্তু ঘরেই ফিরতে হবে মিস্টার সুর ছাড়া সুরকার। কথাটা মাথায় রাইখেন! ”
বউয়ের হুমকিতে কেশে উঠে ইশতিরাজ। বাকিরা না চাইতেও হেসে ফেলে। প্রিমার মুখেও স্মিত হাসি দেখা যায়। আরশিয়ান আঁড়চোখে দেখে সেটা। ওদিকে মেহরিমার দিকে ঘোরলাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তাজরিয়ান। অন্ধকার রাতের ফায়দা উঠাতে মোটেও ভুলেনা সে। মেহরিমার কোমর জড়িয়ে ধরে তার কানে ফিসফিসিয়ে বলে,
–” আপাতত সং শুন। সিনেমা দেখানোর দায়িত্ব আমার। ডোন্ট ওয়ারি বউজান.. ইট উইল বি লং এন্ড এনজয়িং।
মেহরিমা বেচারি লাজে মরে যায়। অস্ফুটস্বরে বলে,
–” একটু তো সভ্যতা রাখুন..
তাজরিয়ান তার কোমর খামচে ধরে হিসহিসিয়ে বলে,
–” এক বছর চার মাস যথেষ্ট সভ্যতা দেখিয়ে ফেলেছি। নাও ইটস টাইম টু বি লিটল অসভ্য।
মেহরিমা কথা বাড়ালো না। ইশতিরাজের গান শোনায় মনোযোগী হলো। তাজরিয়ান তার দুষ্টুমি চলমান রাখলো। ওদিকে আরশিয়ান প্রিমার পাশ ঘেঁষে বসে ধীর কন্ঠে বলে,
–” আম স্যরি ওয়াইফি.. বাট আই ওয়াজ ওয়ারিড..
আরশিয়ান কে কথা শেষ করতে না দিয়ে তার বাহুতে মাথা রাখলো প্রিমা। শান্ত গলায় বলল,
–” আমি জানি সবটা। বুঝি আপনার চিন্তা। তবে অতি মাত্রায় আহ্লাদে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায় সামান্য ধমকটা হজম করতে পারিনি। পরবর্তীতে হিসেব করে দেখলাম, ব্যপারটায় আমার ভুল ছিলো।
আরশিয়ান আলতো করে তাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় আলতো করে চুমু দিয়ে বলে,
–” বোঝার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ প্রেম।
প্রিমা হাসলো। প্রাণোচ্ছল সেই হাসি। দৃশ্যখানা চোখ ভরে দেখে নিয়ে আরশিয়ান সামনে তাকালো। দেখলো ইশতিরাজ গিটারের সাথে যুদ্ধ করছে। কী যেনো সমস্যা হয়েছে। ওটা দেখে আরশিয়ান বিরক্ত কন্ঠে বলল,
–” তাড়াতাড়ি কর ভাই। আমার ঘরে ফিরতে হবে। কাজ আছে।
ইশতিরাজ চোখ ছোটো ছোটো করে তার পানে চেয়ে বলল,
–” আমারও ঘর আছে। আল্লাহর দেওয়া একটা ব্রিটিশ ঘরণী ও আছে। সুতরাং আমারও বহুত কাজ আছে। তুই আমারে অহেতুক খোঁচা দিয়ে আকাইম্মা প্রমাণ করার চেষ্টা করিস না। ”
ইশতিরাজের কথায় সবাই হো হো করে হেসে ফেলে।আরশিয়ান বিরক্ত হয়ে বলে,
–” আম নট জোকিং ইয়ার।
ইশতিরাজ বুঝলো সিরিয়াস কিছু তাই মাথা নাড়িয়ে বলল,
–” অলমোস্ট ডান..
আরশিয়ান সায় জানিয়ে চুপ রইল। প্রিমা আনমনে ভাবতে লাগলো, কী কাজ আছে শানের? হুট করে মনে পড়লো এ-সময় তো নামাজ পড়ে আরশিয়ান।কিছু একটা মনে পড়তেই আরশিয়ানের বুকের সাথে আরেকটুখানি জড়িয়ে গিয়ে প্রিমা জিজ্ঞেস করলো,
–” একটা প্রশ্ন করি?
আরশিয়ান তার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
–” হ্যাঁ বলুন।
প্রিমা প্রশ্নাত্মক চোখে চেয়ে বলল,
–” আমার জানামতে আপনি ছোটো বেলা থেকেই পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করতেন। সে হিসেবে খুব একটা কাযা নামায থাকার কথা না তাহলে রোজ রাতে আলাদা করে আপনি কিসের সালাত আদায় করেন? ”
প্রিমার প্রশ্নটা শুনে আরশিয়ানের মুখে স্মিত হাসি খেলে গেলো। প্রিমার কৌতূহলী দৃষ্টিতে চোখ রেখে ধীর স্বরে বলল,
–” আপনি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন প্রেম। তুচ্ছ জীবনটায় বহু মূলব্যান কিছু দিয়ে ফেলেছেন খোদা।এজন্যই রোজ দু’রাকাআত নফল নামাজ আদায় করে শুকরিয়া জানায় উনাকে। মোনাজাতে প্রার্থনা করি, আমার রাজত্বের অবাধ্য রাণীটাকে অসীম পরিমাণ ভালোবাসার সক্ষমতা দেন আমায়।
কথাটা শুনে চোখ ছলছল করে উঠে প্রিমার। এক জীবনে আর কী চাই তার? ধৈর্যের ফল সুদসহ ফেরত এসেছে। যে পুরুষ স্বীকারোক্তি দিতে ভয় পেতো সেই মানুষটাই রোজ চিৎকার করে কেঁদে খোদার দরবারে তাকে সুস্থ রাখার আর্জি জানায়।
নিজের ভাবনায় ডুবে থাকার মাঝেই প্রিমার কর্ণে পৌঁছায় কিছু পঙক্তি,
তু মিলা হে এ মেরি দুয়া কা আসার
তু মুঝসে দূর না জানা….
লম্বা একটা সুর টেনে অতঃপর প্রিয়তমা স্ত্রীর চোখে চোখ রেখে ইশতিরাজ গেয়ে উঠে,
শিরোনামহীন অনুভূতি পর্ব ৩৭
–” তেরি নাজরো কা দিল পে হুয়া হে আসার,
তু মেরা মেহবুব হে জানা।
তেরি উলফাত মে জিতা হার পাল,
তু এক তোহফা হে খুদাকা।
সমাপ্ত
