Home শিরোনামহীন অনুভূতি শিরোনামহীন অনুভূতি পর্ব ৩৬

শিরোনামহীন অনুভূতি পর্ব ৩৬

শিরোনামহীন অনুভূতি পর্ব ৩৬
রুহানিয়া ইমরোজ

বর্ণিল আলোকসজ্জায় সজ্জিত হয়েছে চৌধুরী বাড়ি। হবে নাই-বা কেনো? বাড়ির কনিষ্ঠ পুত্র তাসাওয়ার তুরাব চৌধুরীর বিয়ে বলে কথা। বিয়েটা কনভেনশন সেন্টারে হলেও বাড়ির সাজসজ্জায় কমতি রাখা হয়নি। বাড়ির বড় দুই পুত্রের আকস্মিক বিয়ে হওয়ায় যে আমেজটা মিসিং ছিলো সেটার শোধ তুলতেই এই হুলুস্থুল আয়োজন।
বহমান সময় কিভাবে পেরিয়ে যায় তার হিসেব রাখা দুষ্কর। দেখতে দেখতে আড়াই বছর পেরিয়ে গেছে।
সময়ের তালে পাল্টেছে অন্যদের জীবনের গল্প। দুষ্টু এবং বেয়াড়া খেতাবপ্রাপ্ত তাজরিয়ান মাস তিনেক পূর্বেই এক পুত্র সন্তানের জনক হয়েছে। ইশতিরাজ এবং ফারজানার ঘর আলো করে এসেছে তাদের পুত্র সন্তান। ট্রিপল বাচ্চা সমেত আরশিয়ান এবং প্রিমার টোনাটুনির সংসার ও ভালোই যাচ্ছে।

ছোটো ভাইয়ের বিয়েতে কোনো কমতি রাখতে চায় না বলেই বিয়ের সমস্ত দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে আরশিয়ান এবং তাজরিয়ান। তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে ইশতিরাজ। ফজরের নামাজ আদায় করে কনভেনশন সেন্টারে উপস্থিত হয়েছিল তারা। এরপর এক টানা কাজ করতে করতে সময় কোনদিক দিয়ে পেরিয়েছি টেরই পায়নি কেউ।
কাজ শেষপর্যায়ে পৌঁছাতেই বরযাত্রী এসে হাজির হয়। গেইটের ডেকোরেশন ঠিক করাচ্ছিলো শান এরমধ্যে হুট করে তার চোখ পড়ে পার্কিং এরিয়ার দিকে। গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছে এক রমণী। গায়ে তার ডার্ক মেরুন কালারের হাফ সিল্কের শাড়ি। চুল গুলো খুলে দেওয়া যা হাঁটু অব্দিই বিস্তৃত। মুখে হালকা প্রসাধনীর ছাপ। যা তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কে আরও ফুটিয়ে তুলেছে। আরশিয়ান তব্দা খেয়ে যায় নিজের বউয়ের চোখ ধাঁধানো রুপ দেখে। অস্ফুটস্বরে বলে,

–” মা শা আল্লাহ।
আরশিয়ানের ভাবনার মাঝেই ইরা গলা ফাটিয়ে বাবা ডেকে দৌড়ে এসে তার পা জড়িয়ে ধরে। ইরা কে বকতে বকতে প্রিমাও এসে হাজির হয় তাদের নিকট। আরশিয়ান হাতের ইশারায় পাশে দাঁড়ানো লোকটাকে যেতে বলে ইরাকে কোলে তুলে নেয়। প্রিমা তা দেখে বিরক্ত মুখে বলে,
–” হয়েছে শান্তি? সারাটাক্ষন খালি বাবা বাবা। আমি যে তোর মা সেটা আদৌ মনে আছে? ”
প্রিমার স্বভাব সুলভ রাগ দেখে মৃদু হাসলো আরশিয়ান। ইরা অবশ্য বিশেষ পাত্তা দিলো না। সে দু’হাতে বাবার গলা জড়িয়ে ধরলো। আরশিয়ান মেয়েকে জড়িয়ে নিয়ে শান্ত গলায় শুধাল,
–” খুব বেশি জ্বালিয়েছে? বাকি দু’জন কই? ”
প্রিমা হ্যান্ড ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে আরশিয়ানের কপালে লেপ্টে থাকা ঘাম মুছে দিয়ে বলল,

–” ঘুম থেকে উঠেই দুই দফা কান্নাকাটি হয়ে গেছে। আপনি কেনো নিয়ে আসেননি তাকে এই অভিমানে সকালের নাস্তাও খায়নি। জোরপূর্বক একটু সুজির হালুয়া খাওয়াতে পেরেছি কেবল। বাকি দু’জন তুরাবের গাড়িতে। ”
আরশিয়ান চোখ ভরে দেখলো প্রিমা কে। মনটা তৃপ্ত হয়ে আসতেই চোখ সরালো। এর চেয়ে বেশি দেখলে কন্ট্রোল হারাতে সময় লাগবে না। এমুহূর্তে এমন কিছু চাইছে না সে। মন ডাইভার্ট করতে ইরা কে উদ্দেশ্য করে আরশিয়ান বলল,
–” আম্মু কে জ্বালাতে বারণ করেছিলাম না? আপনি কিন্তু ভীষণ দুষ্টু হ’য়ে যাচ্ছেন। আমি..
আরশিয়ান কথা সম্পন্ন করার আগেই ইরা আধো আধো স্বরে ভীষণ কিউট করে বলল,
–” আমি অন্নেক স্যরি বাবা..
ব্যাস! মেয়ের কথায় গলে গেলো আরশিয়ান। আর একটাও কথা বলল না। বাবা মেয়ের আহ্লাদ দেখে প্রিমা ফোঁস করে একটা শ্বাস ছাড়লো। হ্যান্ড ব্যাগ থেকে ওয়াটার পট বের করে আরশিয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

–” লেবু পানি এনেছিলাম।
আরশিয়ান এক হাতে সেটা নিয়ে বলল,
–” থ্যাংকস ওয়াইফি। সকালের নাস্তা করেছেন?
প্রিমা সায় জানিয়ে বলল,
–” হ্যাঁ। আম্মু খাইয়ে দিয়েছিল। আপনি খেয়েছেন?
আরশিয়ান চোখ ছোটো ছোট করে চাইল প্রিমার পানে। দিনকে দিন ভীষণ আহ্লাদী হয়ে যাচ্ছে মেয়েটা। কথা না বাড়িয়ে ছোট্ট করে বলল,
–” খেয়েছি।
আরও কথা বাড়াবে এরমধ্যে আচমকা ফারজানা এসে হাজির হলো তাদের মাঝে। তার কোলে ছিলো দেড় বছরের ফারশাদ। ওদেরকে দেখে প্রিমা খুশি হয়ে যায়। হাত বাড়িয়ে ফারশাদ কে কোলে নিয়ে আদর করে। ফারজানাও হাসিমুখে আরশিয়ানের সাথে বাক্য বিনিময় করে। এমন সময় হুট করে কল আসাতে আরশিয়ান বলে,
–” আপনারা ভেতরে যান। আমার কিছু কাজ আছে ওগুলো শেষ করে আসছি আমি। ইরা আমার কাছে থাক। আপনি বরং নিজের মতো একটু টাইম স্পেন্ড করেন। দূরে কোথাও যাইয়েন না। কিছু দরকার হলে কল দিয়েন। ”
প্রিমা আবেশিত হলো তার একান্ত পুরুষের আহ্লাদে তবে কিছু একটা ভেবে বলল,
–” ইরা আমার কাছেই থাক। আপনি কাজে ব্যস্ত থাকবেন তারমধ্যে..
ইরা শক্ত করে আরশিয়ানের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,

–” যাব না আমিইইইই …
প্রিমা হতাশার শ্বাস ছাড়লো। আরশিয়ান তাকে আরও একবার সাবধান করে কাজে বেরিয়ে পড়ল।প্রিমারাও মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলো।
মানুষের মন বোঝা বড় দায়। ক’দিন আগেই তারান্নুম চৌধুরীর চোখের বালি ছিলো মেহরিমা। যখন তার একমাত্র পুত্র তাশফিন তাজদার চৌধুরীর জন্ম হয় তখন থেকেই ভীষণ আদুরে আচরণ পাচ্ছে। একটা মুহূর্ত তাকে বাচ্চা নিয়ে সাফার করতে হয় না। বাচ্চা একটু কেঁদে উঠলেই তারান্নুম চৌধুরী উড়ে এসে হাজির হোন মেহরিমার কাছে। নাতির সমস্তটা নিজেই দেখেন তিনি। মেহরিমা নির্বিকার ভাবে দখে বিষয় গুলো। মাঝেমধ্যে শাশুড়িকে চরম স্বার্থপর মনে হয় আবার পরক্ষণে মনে হয় তিনি তার জায়গায় ভুল নন।

গাড়িটা কনভেনশন সেন্টারের সামনে এসে দাঁড়াতেই ধীর পায়ে গাড়ি থেকে নামে মেহরিমা। হুট করে তল পেটে চিনচিনে ব্যথা অনুভূত হয়। দাঁতে দাঁত চেপে চুপচাপ সয়ে নেয় যন্ত্রণাটা। মাত্র ছয়মাস হলো তার সিজারের। দুর্বলতা জনিত কারণে এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারিনি বেচারি। প্রায়ই সাংঘাতিক রকমের ব্যাক পেইন হয়। তাশফিন কে বেশি সময় কোলে নিয়ে রাখলে সেলাইয়ে টান পড়ে। দম বন্ধ হয়ে আসে ব্যথায় কিন্তু এখন আর আর্তনাদ বেরোয় না। সয়ে গেছে সবটা। মেয়ে থেকে মা হওয়ার জার্নিটা অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়েছে তাকে।
তারান্নুম চৌধুরী নাতি কে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে এসে মেহরিমাকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন,

–” দাঁড়িয়ে আছো কেনো? ভেতরে চলো। আর শুনো, ড্যাং ড্যাং করে এদিক-ওদিক যেয়ো না। আমার দাদুভাই ছোটো মানুষ। ওর কিন্তু ঘন ঘন ক্ষুধা লাগবে। তুমি আশেপাশেই থেকো। তাজরিয়ান ডাকলেও যাওয়ার দরকার নাই। ওর মাথায় বুদ্ধি কম। সে কী আর এতকিছু বোঝে? ”
মেহরিমা মলিন হাসলো। অস্ফুটস্বরে বলল,
–” জ্বী।
তারান্নুম চৌধুরী আড় চোখে মেহরিমার মলিন মুখটা দেখে বিরক্ত হয়ে বললেন,

শিরোনামহীন অনুভূতি পর্ব ৩৫

–” মুখটা ওমন কালো করে রেখেছো কেনো? আমি কী তোমায় জোরাজোরি করছি? মা হয়ে সন্তানের জন্য এতটুকু ত্যাগ স্বীকার করতে পারবে না? ”
মেহরিমা মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। বুঝালো সে পারবে। মনে মনে তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
–” সন্তানের জন্য স্বামী হারিয়ছি আর এতটুকু পারবো না?

শিরোনামহীন অনুভূতি পর্ব ৩৭