Home শিরোনামহীন অনুভূতি শিরোনামহীন অনুভূতি পর্ব ৩৭

শিরোনামহীন অনুভূতি পর্ব ৩৭

শিরোনামহীন অনুভূতি পর্ব ৩৭
রুহানিয়া ইমরোজ

বেলা গড়িয়েছে। সময়ের সাথে অডিটোরিয়ামে ভীড় বেড়েছে।রাজকীয় সোফায় বসে থাকা বর বউয়ের সাথে কুশল বিনিময় করে নানান ধরনের উপহার দিয়ে যাচ্ছেন আত্মীয় স্বজনরা।
আনন্দময় পরিবেশ শুধুমাত্র মেহরিমায় থম মেরে বসে আছে। তার কোলে থাকা ছয় মাসের তাশফিন একটু পর পর কেঁদে উঠছে অকারণে। ফিডার মুখে ধরলেও খাচ্ছে না। হাঁটাহাটি করলেও থামছে না। কী হয়েছে সেটাই বুঝতে পারছে না মেহরিমা। উল্টো তার মাথা ধরে যাচ্ছে ছেলের ননস্টপ কান্নায়। গত কাল রাতেও এভাবেই জ্বালিয়েছে। এখন আবারও। রাগ লাগলো মেহরিমার কিন্তু সেটা প্রকাশ করার অধিকার নেই। সে জন্ম দিলেও রক্ত তো চৌধুরী বংশের। তাদের আবার শাসন করা বারণ।

মেহরিমা যখন বিক্ষিপ্ত চোখে স্তব্ধ হ’য়ে তাকিয়ে ছিলো তাশফিনের দিকে তখন হুট করে পেছন থেকে কেউ একজন তাকে সজোরে টান দেয়। মেহরিমা হকচকিয়ে উঠে আছড়ে পড়ে কারও বলিষ্ঠ বুকে। পরপরই ঠাস করে কাঁচ ভাঙার শব্দ শোনা যায়। আচমকা এমন হওয়ায় মেহরিমা ঘাবড়ে যায়। তাশফিন ও গলা ফাটিয়ে কেঁদে উঠে। ঘটনার আকস্মিকতায় সকলেই তাদের দিকে তাকায়।
মাঝারি আকারের একটা ক্যান্ডেল ঝাড়বাতি আছড়ে পড়েছে ফ্লোরে। খানিকটা জায়গা জুড়ে দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন। তৎক্ষনাৎ ক’জন এগিয়ে এসে আগুন নেভাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাজরিয়ান তখনও বউ বাচ্চাকে জড়িয়ে রেখে শান্ত চোখে তাকিয়ে ছিলো ফ্লোরের দিকে। সে সময় মতো না আসলে কী হতো ভাবতেই হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে।
মেহরিমা নিজেকে সামলে সরে আসে। এক পলক তাজরিয়ানের দিকে তাকিয়ে তাশফিন কে চুপ করাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাজরিয়ান সবটা দেখে শীতল কন্ঠে শুধায়,

–” ঠিক আছিস? কোথাও লেগেছে? ”
মেহরিমা মুখ ফুলায় তবে জবাব দেয় না। কী বলবে? ওমন বাঘের মতো থাবা দিয়ে ধরায় সে হাতে ব্যথা পেয়েছে এটা? নাকি শক্তপোক্ত বুকে আছড়ে পড়ায় নাকের হাড্ডি ভেঙে যাওয়ার মতো যন্ত্রণা হচ্ছে সেটা? সে কিছুই বলবে না কারণ এই অসভ্য লোক সারাটাক্ষন তাকে নাজুক প্রমাণ করতে চায়।
মেহু কে ওমন চুপ থাকতে দেখে তাজরিয়ান ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ে। কিছু বলার জন্য মুখ খুলবে তার আগেই তারান্নুম চৌধুরী এসে হাজির হোন। মেহরিমার বুক থেকে ক্রন্দনরত তাশফিন কে কেড়ে নিয়ে ক্রুদ্ধ স্বরে বলেন,
–” অপয়া মেয়েলোক। সামান্য একটা বাচ্চা সামলাতে পারো না? তোমার জন্য আমার নাতির বিপদ কাটছে না। দূরে থাকবে তুমি ওর থেকে..
লজ্জায় অপমানে মেহরিমা স্তব্ধ হয়ে যায়। মুখ ফুটে একটা শব্দও বের হয় না। তাজরিয়ান এর চোখমুখ শক্ত হয়ে যায়। রেগেমেগে কিছু বলার পূর্বে মেহরিমা ভাঙা গলায় বলে,

–” ও আমার ছেলে মেজো মা। আমি কেনো ওর ক্ষতি চাইবো..
তারান্নুম চৌধুরী নাতি কে আদর করতে করতে বললেন,
–” তোমার উপস্থিতি অলক্ষুণে। প্রথমে আমার ছেলের মাথা খেয়েছো এখন…
তাজ আর চুপ থাকতে পারলো না। মেহরিমার হাত টেনে ওকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে উচ্চ স্বরে বলল,
–” ইনাফ ইজ ইনাফ আম্মা। তুমি আমার স্ত্রী কে এভাবে অসম্মান করতে পারো না। লাস্ট টাইমের মতো ওয়ার্ন করছি ।তোমার প্রতিটা কথার উত্তর দিতে বাধ্য করো না আমায়। নয়তো সুসম্পর্ক বিগড়াতে সময় লাগবে না।
রাগে কাঁপছে তাজরিয়ান। আশেপাশে জমেছে মানুষ এর ভীড়। সকলে উৎসুক হয়ে চেয়ে আছে। তারান্নুম চৌধুরী নিস্তব্ধ চোখে চেয়ে আছেন ছেলের পানে। ঝামেলার খবর কানে পৌঁছাতেই বাড়ির লোকজন ছুটে আসে। সবাই মিলে বিষয়টা শর্ট আউট করতে চাইলে তাজরিয়ান রেগেমেগে মেহরিমার হাত চেপে ধরে তাকে শাসিয়ে বলে,
–” সারাদিন বাচ্চা বাচ্চা করিস কীজন্য? আমি মরে গেছি? ওই পটল আম্মার কাছেই থাক। আমি তোরে নতুন একটা প্রোডাক্ট এনে দিবো। আল্লাহর ওয়াস্তে এসব কান্নাকাটি আর ঝগড়াঝাটি অফ কর। আমি জাস্ট ফেড আপ। ”
উচ্চ স্বরে বলা কথাটা সবারই কানে গেলো। কেউ মুখ চেপে হাসলো আবার কেউ জোরালো শব্দে। কেবল মেহরিমাই নিউট্রাল থাকলো। তাজরিয়ান যেদিকে নিয়ে যাচ্ছে পুতুলের মতো চুপচাপ সেদিকেই গেলো।

স্বামী স্ত্রী একে অপরের পরিপূরক। তাদের মধ্যে গোপনীয়তা থাকতে নেই। অথচ এই ভুলটাই করেছে মেহরিমা। ডক্টরের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এবং তাজরিয়ানের বিরুদ্ধে গিয়ে কনসিভ করে সে। তাজ শুরুতে মেনেও নিয়েছিল কিন্তু ডক্টর যখন জানায়, প্রেগন্যান্সিতে কমপ্লিকেশন আছে তখন তাজরিয়ান ক্রমাগত মেহরিমা কে এবরশন করানোর জন্য জোর করতে থাকে। একটা পর্যায়ে মেহরিমা রাজি হলেও তারান্নুম চৌধুরীর হুমকির মুখোমুখি হয়ে আর পেরে উঠে না। ফলস্বরূপ একদিকে তাজরিয়ানের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হতে থাকে অন্যদিকে নিজেও মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে।
সময় যেতে থাকে। মেহরিমাও নানান অসুস্থতায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে। তাজরিয়ান সবটা দেখেও তার সংস্পর্শে আসে না। মেহরিমা বহু চেষ্টা করেছে তাকে মানানোর কিন্তু দিনশেষে তাজরিয়ানের থেকে নিরব প্রত্যাখান পেয়েছে। শেষমেশ মেহরিমাও হাল ছেড়ে দেয়। নিয়তি মেনে নিয়ে নির্লিপ্ত হয়ে পড়ে। এরপর জন্ম হয় তাশফিনের। মেহরিমা কোনোপ্রকার ঝুট ঝামেলা ছাড়াই সুস্থ ভাবে বেঁচে ফিরে আসে। তবে তাজ মেহুর অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক ঠিক হয় না। এক বেডে ঘুমালেও দু’টো মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয় যোজন যোজন দূরত্ব।
মেহরিমা কে আঁধারে আছন্ন ফাঁকা করিডরে টেনে এনে দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড় করায় তাজরিয়ান। আপাতত এই কনভেনশন হলে এর থেকে সিকিউর জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না সে। বউ এর মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা কতটা জটিল সেটা তার অজানা নয়। আজকে সকালেই ইশতিরাজের সাথে ব্যপক আলোচনা হয়েছে এই টপিকে। তাজরিয়ান যখন সবকিছু খুলে বলে তখন ইশতিরাজ সরাসরি বলে,

–” যতদ্রুত সম্ভব মেহুর সাথে বসে সবকিছু ক্লিয়ার করে ফেল। মেয়েটা এমনিতেই পোস্টমর্টেম পিরিয়ড পার করছে। তুই জানিস? এসময় অল্পস্বল্প মানসিক টেনশনও মারাত্মক পর্যায়ের ক্ষতি করে।দেখা গেলো তুই অভিমান করে কথা বলা বন্ধ রাখলি ওদিকে মেহরিমা অভিযোগ না করে নিশ্চুপে সারা জীবনের জন্য চোখ বন্ধ করে ফেললো।
তাজরিয়ান ভড়কে গিয়েছিল কথাটা শুনে। তক্ষুনি সে সিধান্ত নেয়, অনেক হয়েছে মান-অভিমান। আর দূরে সরিয়ে রাখবে না বউকে। তাজরিয়ানের ধ্যান ভাঙে মেহরিমার কথায়। সে বলছে,
–” তাশফিনের ফিডার আমার কাছে রয়ে গেছে। মেজো মা কে দিতে হবে এটা। নাহলে ক্ষুধা পেলে কাঁদবে ও।
তাজরিয়ানের মেজাজ খারাপ হয়। সারাক্ষণ ছেলে ছেলে করে কী বোঝাতে চাই এই মেয়ে? তাজের কোনো দাম নেই তার কাছে? ফ্যাক্টরির তুলনায় প্রোডাক্টেরই দাম বেশি মেহরিমার কাছে? প্রশ্ন গুলো মাথায় ঘুরপাক খেতেই মেজাজ আরও খিঁচড়ে যায় তাজরিয়ানের। দাঁতে দাঁত চেপে মেহরিমাকে উদ্দেশ্য করে সে বলে উঠে,
–” ওটা তুই খা বলদি মহিলা। তোর বেশি প্রয়োজন এটার। স্বামীর কদর করতে না জানা মহিলার উচিত তিন বেলা তিন দু’গুণে ছয়বার ফিডার খাওয়া। ”
মেহরিমা বোকার মতো চেয়ে থাকে তাজরিয়ানের দিকে। সাইকোটা কীসব বলছে? তাজরিয়ান কে রাগে ফোঁস ফোঁস করতে দেখে মেহরিমা শান্ত স্বরে বলে,

–” অযথা ভুলভাল বকছেন। কাজে যান আপনি। আমি একটু তাশ…
এবার আর রাগ সামলাতে পারে না তাজরিয়ান। বউ কে চুপ করানোর এক অভিনব পন্থা এপ্লাই করে। মেহরিমা কে দেয়ালের সাথে ঠেসে ধরে জোরপূর্বক তার মোলায়েম ঠোঁটের দখলদারিত্ব ছিনিয়ে নেয়। মোহরিমা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে অস্ফুটস্বরে আর্তনাদ করে উঠে। হাতের নখ বসিয়ে দেয় তাজের গলায়। তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করে না তাজরিয়ান। সে কী আর থামার মানুষ? উল্টো মেহরিমার সাথে মিশে গিয়ে আরও গভীর চুম্বনে লিপ্ত হয় দু’জন। মেহু ধাক্কাধাক্কি করে সরাতে চাইলেও তাজ পাত্তা দেয় না। বছর খানেকের সুধা মিটিয়ে তবেই ছাড়ে মেহরিমা কে।
বেচারি মেহরিমা ছাড়া পেতেই তাজরিয়ানের বুকে নেতিয়ে পড়ে হাঁপাতে থাকে। তাজরিয়ান সানন্দে তাকে বুকে টেনে হাঁপানো স্বরে উৎফুল্ল কন্ঠে বলে,

–” ইয়্যু টেস্ট লাইক মাই ফেব্রেট প্রোটিন শেইক এন্ড এজ ইউজুয়্যাল ইট ওয়াজ ইয়াম্মি এন্ড এনার্জেটিক বউজান। ”
ক্লান্ত মেহরিমা লজ্জায় মুখ লুকায় তাজের বুকে। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে মিষ্টি হাসি। খানিক সময়ের জন্য ভুলে বসেছিল সে অতীতের কথা। কিছুটা ধাতস্থ হতেই যখন সবকিছু মনে পড়ে তখুনি তাজের বুক থেকে সরে আসে মেহরিমা। দেয়ালের সাথে মিশে গিয়ে বলে,
–” অনেকটা সময় পেরিয়েছে। এবার আমার যাওয়া উচিত। সরুন…
তাজরিয়ান বিরক্ত হয়ে ত্যাড়ামি করে বলল,
–” সরবো না। রিজাস্টার করা বউ আমার। আমি তো আরও কাছে আসবো…
বলেই মেহরিমার দিকে এগোতে থাকে তাজরিয়ান। মেহরিমা এবার সত্যি সত্যি মেজাজ হারায়। এতদিন খবর ছিলো না। আজ এসেছে বান্দা বউ দাবি করতে। ভাবনা সাইডে রেখে মেহরিমা খানিকটা রাগ মিশ্রিত স্বরে বলল,
–” দূরে সরুন। কাছাকাছি আসলে কিন্তু…
তাজরিয়ান সহসাই মেহরিমাকে দেওয়ালের সাথে আঁটকে ফেললো। তার কোমরের দু’পাশে হাত রেখে সামান্য ঝুঁকে গিয়ে হিম শীতল স্বরে বলল,

–” এলাম কাছাকাছি। এবার কী হবে ?
তাজের এমন ত্যাড়ামি দেখে মেহরিমার মেজাজ বিগড়ায়। রাগ সামলাতে না পেরে ক্রুদ্ধ স্বরে বলে,
–” জনসংখ্যা বাড়বে..
তাজরিয়ান এমনিতেই দুষ্টুমি করছিলো। মেহরিমা যে এমন বেফাঁস কথা বলে বসবে সেটা তার ধারণাতে ও ছিলো না। ওদিকে মেহরিমা চোখ বড় বড় করে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছে। বাঁচাল হওয়ার এই এক যন্ত্রণা। ভুলবশত সঠিক কথা বেরিয়ে আসে।
তাজরিয়ান হেসে ফেলে বউয়ের বাচ্চামিতে। মেহু মাথা নিচু করে নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে রয়। তাজরিয়ান আর সময় নষ্ট করে না। মেহরিমার চিবুকে হাত রেখে তার মুখটা উঁচু করে ভীষণ আদুরে গলায় বলে,
–” বউজান? ”
কলিজা ঠান্ডা করা ডাকটা শুনে মৃদু কেঁপে উঠে মেহরিমা। কতদিন পর ডাকটা শুনলো ভাবতেই চোখ দু’টো ছলছল করে উঠল। অভিমান সাইডে রেখে ধীর স্বরে বলল,

–” হুঁ?
তাজরিয়ান বউয়ের অশ্রুসজল চোখে দৃষ্টিপাত করে বলল,
–” আম স্যরি সোনা। খুব বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছি ?
মেহরিমা উত্তর দিতে পারে না। ফুঁপিয়ে উঠে স্রেফ। তাজরিয়ানের বুক ভারী হয়ে যায়। মনটা ছেয়ে যায় বিষন্নতায়। একটা মানুষ কতটা কষ্ট পেলে এমন নিরব হয়ে যায়? জিভ দ্বারা ঠোঁট ভিজিয়ে তাজরিয়ান নরম স্বরে বলল,
–” কথা বল সোনা। আক্ষেপ, অভিমান, অভিযোগ যা-ই থাকুক। প্লিজ বল আমায়।
আহ্লাদ পেয়ে বোধহয় খানিকটা সাহস পায় মেহরিমা। শক্ত করে তাজরিয়ানের শার্টের অংশ মুঠো বন্দী করে ধরে। ফোঁপাতে ফোপাঁতে শুধায়,
–” আপনি সবসময় আমার বিরুদ্ধে গিয়ে সিধান্ত নেন। কই আমি তো কখনো আপনার উপর রাগ করিনা। আমি যেইমাত্র আপনার একটা কথার বিরুদ্ধে গেলাম ওমনি আপনি দূরে চলে গেলেন। কেনো করলেন এমন?
তাজরিয়ান শান্ত চোখে দেখে মেহরিমাকে। কাঁদতে কাঁদতে চোখ হিচকি উঠিয়ে ফেলেছে একদম। ঘুম হীন ক্লান্ত চোখ জোড়া লাল টকটকে হয়ে আছে। সে আর অপেক্ষা করলো না। মেহরিমার চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলল,

–” কনসিভ করায় আমি দূরত্ব বাড়িয়েছি কে বলল তোকে?
মেহরিমা প্রশ্নাত্মক চোখে চেয়ে বলে,
–” মানে? আমার কনসিভ করায় আপনি রাগ করেননি?
তাজরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–” না। তুই নিজ ইচ্ছায় আমার বিরুদ্ধে গেলে আমি মেনে নিতাম মেহু। অযাচিত জেদ হলেও সাপোর্ট করতাম কিন্তু তুই আমার থেকে কথা লুকিয়েছিস।আমার আড়ালে আমারই মা তোকে হুমকি দেয়। এই কথাটা আমাকে জানতে হয় ক্যামেরা চেক করে। কেনো মেহু?
মেহরিমা থম মেরে যায়। চোখমুখ শুকিয়ে যায় তার। ভয়ে ধুকপুক করতে থাকে বুক। আমতা আমতা করে বলে,
–” ব্ বিশ্বাস করুন। আমি সংসারে কোনো অশান্তি চাইনি।
তাজরিয়ান তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
–” তোর সংসার আমার সাথে। আমার পরিবার অপশনাল। তুই ফোর সাবজেক্টের জন্য মেইন সাবজেক্ট ভুলে বসলি কোন আক্কেলে?
মেহরিমা জবাব দিতে পারে না। ভালো করতে গিয়ে সবটা বিগড়ে ফেলবে সেটা তো বুঝেনি। তাজরিয়ান লম্বা শ্বাস টেনে বলল,

–” যেদিন আমি সবটা জানতে পারি সেদিন আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল। আম্মার উপর জন্মেছিল বিতৃষ্ণা আর তোর প্রতি অভিমান। আমি অপেক্ষায় ছিলাম, তুই আসবি এরপর বলবি আমায় সবটা। কিন্তু তুই তো মাদার তেরেসা। নিরবে সব সহ্য করার ঠেকা নিয়েছিস।
মেহরিমা নিজের গাধামি বুঝে কাঁদো কাঁদো মুখে তাকাল। তাজরিয়ান ম্লান হেসে হাতের আঁজলায় তার মুখটা নিয়ে বলল,
–” ইট’স গন মেহু। আমি আর ভাবতে চাইছি না ওসব নিয়ে। ভুলে যেতে চাইছি সবকিছু। বাঁচতে চাইছি একসাথে। ওটা নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ, কিংবা অভিমান নেই। তোর আছে?
মেহরিমা দু’পাশে মাথা নাড়ায়। পরপরই তাজের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,
–” ভালোবাসি..

তাজরিয়ান স্মিত হেসে মেহরিমাকে জড়িয়ে ধরে। মুহূর্তটাকে আরেকটু স্পেশাল করতে পুনরায় ডুবে যায় প্রিয়তমার অধরোষ্ঠের নেশায়। আশ্লেষী চুম্বনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে দু’টো মানব-মানবী।
কন্ট্রোল রুম থেকে কল করে জানাল হলো কিছু জায়গার সিসিটিভি ফুটেজ ঠিকঠাক কাজ করছে না। কথাটা শোনা মাত্রই ইশতিরাজ এবং আরশিয়ান এর কপালে ভাঁজ পড়ল। ইশতিরাজ কল কেটে আই প্যাডে সংযুক্ত থাকা সিসিটিভি ফুটেজ গুলো দেখতে থাকলে। সবগুলো রুম চেক করতে গিয়ে আচমকা তার চোখ আটকাল একটা ফুটেজে।
মৃদু আলোকিত একটা করিডরে একজোড়া মানব মানবী একে-অপরের সাথে ধস্তাধস্তি করছে। মেয়েটা যতবার নিজেকে ছাড়াতে চাইছে ছেলেটা ততবারই তাকে ডেস্পারেটলি কাছে টানছে। একটা পর্যায়ে মেয়েটা হার মানে। ছেলেটা তার শাড়ির ফাঁক গলিয়ে হাত রেখে হেঁচকা টানে মেয়েটাকে নিজের সাথে মিশিয়ে তার অধর যুগল দখল করে নেয়। কিছুক্ষণ পর মেয়েটা শ্বাস টানতে না পেরে ছেলেটাকে ঠেলে সরাতে চায় কিন্তু শক্তপোক্ত পেশিবহুল শরীরটা এক চুল ও নড়াতে পারে না।
পুরো দৃশ্যটা দেখে হতভম্ব হয়ে যায় ইশতিরাজ আর আরশিয়ান। ইশতিরাজ ফাঁকা ঢোক গিলে বলে,

–” মানবতা কোথায়? সভ্যতা কোথায়? আমার বউ কোথায়?
ইশতিরাজের কথায় হতভম্ব ভাবটা কেটে যায় আরশিয়ানের। চোখমুখ কুঁচকে রাগী স্বরে বলে,
–” ক্যারেক্টার ঢিলা বেকুব পাবলিক কোথাকার। বউকে না খুঁজে গার্ডদের ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস কর, করিডরের লাইটস অফ কেনো? ”
ইশতিরাজ তেঁতো মুখে বিড়বিড়িয়ে বলে,
–” শ্লা আনরোমান্টিক ভাঁড় কোথাকার। এমন দৃশ্য দেখে বউয়ের কথা মনে পড়বে না তো কী হবে? যত দোষ সব ইশতিরাজ ঘোষের আর তুমি ফেরেশতা। ”
আরশিয়ান তাকে বিড়বিড়ি করতে দেখে ভ্রু কুঁচকে শুধাল,

শিরোনামহীন অনুভূতি পর্ব ৩৬

–” তুই গালি দিচ্ছিস আমাকে?
ইশতিরাজ চোখমুখ কুঁচকে বলল,
–” তুমি সুফি দরবেশ? কোনো গ্রন্থে লেখা আছে যে তোমারে গালি দেওয়া যাইবো না? তুমি মিয়া এক বাসরে তিন বাচ্চার বাপ হয়ে বসে আছো এদিকে আমি তিনবছরে এক বাচ্চার বাবা হইতে পারছি মাত্র। তুমি কী আর আমার মানের দুঃখ বুঝবা? ”

শিরোনামহীন অনুভূতি শেষ পর্ব