ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ২৭
ছায়া
রাত তখন প্রায় ৮ টা বাইরে হালকা ঠান্ডা হাওয়া বইছে। নিচ তলার হলরুমে হাসি-ঠাট্টা, আলোর ঝলক, আর গানের মৃদু সুর মিশে একটা উষ্ণ পরিবেশ তৈরি করেছে। হলুদ অনুষ্ঠান শেষ হতেই সবাই এখন রিল্যাক্স মুডে। ইলা রুমে গিয়ে মেহরুন রঙের শাড়িটা খুলে আলমারিতে রেখে দিলো। তারপরে শাওয়ার নিতে চলে গেলো। শাওয়ার শেষ করে বেডে এসে বসে আছে ইলা মনটা হালকা ভারী আরিয়ানের বলা কথাগুলো এখনো কানে বাজছে। “শাড়ি সামলাতে পারবেন না তো শাড়ি পড়েছেন কেনো” এই একটা লাইন যেন বুকের ভেতর দগদগে আগুন হয়ে জ্বলছে।
বিছানার পাশে বসে চুপচাপ পা দোলাতে দোলাতে চিন্তা করছিলো এমন সময় দরজায় টোকা পড়লো ইলা ধীর গলায় বলল।
ইলাঃ- ভিতরে আয়
দরজার ফাঁক দিয়ে হালিমা উঁকি দিলো মুখে দুষ্টু হাসি।
হালিমাঃ- এই যে নিচে সবাই তো গেম খেলছে তুই এখানে একা বসে আছিস কেনো?
ইলা চুপ কোনো উত্তর নেই তার কাছে হালিমা ইলার পাশে বসে বলল
হালিমাঃ- চল না সবাই মজা করছে তোকে ছাড়া গেমটা জমবে না।
ইলা এক মুহূর্ত তাকালো আয়নায় চুলগুলো হালকা ভেজা মুখে ক্লান্তির ছাপ। ইলা বেগুনি রঙের সেমি গাউন পড়েছে একটা গাউনের হাতা কনুই পর্যন্ত অনেক সুন্দর লাগছে ইলাকে এই কালারে কোমরের নিচে পর্যন্ত খোলা চুলগুলো ঢলে পড়েছে পিঠে গলায় হালকা পারফিউমের সুবাস। আয়নায় নিজেকে দেখে হালকা একটা হাসি দিলো,
ইলাঃ- ঠিক আছে এবার নিচে যাই চল।
নিচে নামতেই দেখে সবাই চেয়ার টেনে বৃত্তাকারে বসেছে। হাসাহাসি করছে সবাই কারও হাতে জুস কারও হাতে কফি। কোণের দিকের সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে আরিয়ান গাঢ় লাল পাঞ্জাবির নিচে সাদা পায়জামা গলার বোতাম খোলা চোখে একরকম গভীর তীক্ষ্ণতা। ইলা তাকিয়ে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে গেলো তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে চেয়ার টেনে বসল হালিমার সাথে রায়েদ হাততালি দিয়ে বলল,
রায়েদঃ- চল সবাই আজকের রাতের সবচেয়ে হিট গেম ট্রুথ অর ডেয়ার খেলি।
সবাই চিৎকার করে উঠল “Yesss” প্রথমে আদিবের পালা আদিব ডেয়ার নিলো সবাই একসাথে বলল “তুমি পরির জন্য একটা ফিল্মি লাইন বলবে” আদিব হাসতে হাসতে বলে উঠল,
> “তুমি যত আমার কাছে আসো আমি তোমার ভালোবাসায় ততই গভীর হয়ে যাই”<
সবাই তালি দিয়ে হেসে উঠল পরি হালকা লজ্জায় মাথা নিচু করে হাসছে। দ্বিতীয় পালা পরির পরি ট্রুথ নেয় সবাই বলে আদিব ভাই এর সিরিয়াল তোমার মনে কত নাম্বারে??
পরিঃ- আমার মনে এখনো কোনো নাম্বার নেই কালকে ১ নাম্বার সিরিয়াল উঠবে সেটা আদিব হবে।
সবাই “উউউউউ” করে উঠলো পরি লজ্জা পেয়ে যায় আর সবাই আদিব কে বলে জিতছেন ভাই জিতছেন।
তৃতীয় সিরিয়াল রায়েদের আসলো রায়েদ ট্রুথ নিলো। পরি জিগ্যেস করলো
পরিঃ- হালিমার চোখ দেখে তুই কয়বার প্রেমে পড়ছিস”
রায়েদ ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল
রায়েদঃ- একবার না, প্রতিবার
পরিঃ- প্রতিবার কেনো??
রায়েদঃ- কারণ তোর বান্ধবীর চোখ অনেক মায়াবি। শুধু আমি না যে কেউ তার চোখের প্রেমে পড়ে যাবে।
হালিমা কপালে হাত দিয়ে বলল,
হালিমাঃ- আপনার চিকিৎসা দরকার।
চতুর্থ পালা রিমা আসলো রিমা ট্রুথ নিলো সবাই প্রশ্ন করল “তোর ক্রাশ কে?
রিমা হেসে বলল,
রিমাঃ- ইমরান হাসমি
রিমার কথা শুনে সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ল রায়েদ বলে উঠলো আরে ইমরান হাসমি তো আমার গুরু। হালিমা কাশি দিয়ে বলে
হালিমাঃ- এই ছেলে বলে কি যে এই বেডার বউ হবে ঐ মেয়ের আত্মার মাগফেরাত কামনা করতে হবে।
পরি আর ইলা দুইজন একসাথে “আমিন” বলল হালিমে ঘুরে দেখে দুইজনি শুনে নিয়েছে হালিমার কথা। পঞ্চম পালা হালিমার আসলো হালিমা ডেয়ার নিলো সবাই বলল এই ডেয়ার টা রায়েদ ভাই দিবে সবার কথা মত রায়েদ ডেয়ার দিলো
রায়েদঃ- আমাকে প্রেমের প্রোপোজ করতে হবে।
হালিমা বললো সে এটা করতে পারবে না কিন্তু সবাই বলল রুলস মানতেই হবে চিটিং চলবে না। আর তা না হলে এর থেকে ভয়ানক ডেয়ার দেয়া হবে সেটা রায়েদ দিবে হালিমা ভয় পেয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে হাঁটু গেড়ে বলল,
হালিমাঃ- রায়েদ তালুকদার আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই না কারণ আপনি রান্না পারেন না।
হালিমার এই প্রপোজ শুনে সবাই হেসে হেসে লুটিয়ে পড়ল রায়েদ বলল
রায়েদঃ- এই না না আমি তো ইউটিউব দেখে রান্না শিখেছি সব আমি রান্না পারি।
হালিমাঃ- তবুও আপনার মত প্লে বয়কে বিয়ে করবো না।
রায়েদঃ- মনটা ভেঙে গুড়ো গুড়ো করে দিলো রে আমার।
ষষ্ঠ পালা রাফির আসলো রাফি ডেয়ার নিলো তাকে বলা হলো “একটা নাচ দিবি ১০ সেকেন্ডের” রাফি সঙ্গে সঙ্গে ‘Chama Chama’ গানের তালে উঠে একদম হিরোর মতো নাচ শুরু করে দিলো। সবাই হাত তালি দিয়ে দিয়ে দিলো সপ্তম পালা আরিয়ান এর আসলো সবাই তাকালো তার দিকে। আরিয়ান গম্ভীর মুখে বলল,
আরিয়ানঃ- আমি ডেয়ার নেব।
সায়েমঃ- তাহলে একটা হিন্দি গান গাইতে হবে।
সবাই চিৎকার “হ্যাঁ গান” ডান্স দেখেছি এবার আরিয়ান ভাইয়ের ভয়েজের গান শুনতে চাই। আরিয়ান এক মুহূর্ত চুপ করে চোখ বন্ধ করলো তারপর মৃদু কণ্ঠে গাইল,
> “Do dil mil rahe hain magar chupke chupke…”
গানের সুরে হলরুম এক মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। ইলা তাকিয়ে রইলো তার কণ্ঠের গভীরতা, চোখের আবেগ যেন কোথাও গিয়ে তাকে ছুঁয়ে গেলো। ইলার এই ভয়েজ অনেক পরিচিত লাগলো কোথাও শুনেছে। এই মিষ্টি ভয়েজ কিন্তু মনে করতে পারছে না আরিয়ান গান গাওয়া শেষ করলো গানের শেষে সবাই তালি দিলো।
অষ্টম পালা রাফিকার আসলো রাফিকা ডেয়ার নিলো রায়েদ তখন বলল
রায়েদঃ- তোর সাহস আছে বলতে হয়।
রাফিকাঃ- আমি সব সময় সাহসী।
রায়েদঃ- অকে তোর ডেয়ার হলো তুই এখন সবার সামনে তোর মেকআপ গুলো ধুয়ে ফেলবি।
রাফিকা কিছুটা অবাক হয়, আরিয়ান রায়েদ কথা শুনে ফোন স্কোরল করতে করতে হাসে। আর বাকি সবাই রায়েদ এই সব অদ্ভুত ডেয়ার শুনে হাসাহাসি শুরু করে। রাফিকা একটা পানির বোতল এনে মুখে পানি দেয়। তবুও মেকআপ উঠা শেষ হয় না এভাবে ৪ বোতল পানি শেষ করে রাফিকার মেকআপ উঠে।
রায়েদঃ- এইতো হয়েছে দেখলি তো তোর কষ্ট করতে হবে না আর তোর এই এই কাজ টা আগিয়ে দিলাম।
রাফিকা আর কিছু না বলে উঠে চলে গেলো,এরপর ইলার পালা ইলা গম্ভীর মুখে বলল
ইলাঃ- আমি ট্রুথ নেব।
হালিমা চোখ ঘুরিয়ে বলল,
হালিমাঃ- তুই সব সময় ট্রুথ নিস আজ ডেয়ার নে।
আরিয়ান পাশে বসে হালকা হেসে বলল,
আরিয়ানঃ- ডেয়ার নিতে ভয় পাচ্ছে মনে হয়।
ইলা নাক ফুলিয়ে বলল,
ইলাঃ- আমি ভয় পাই না আমি ডেয়ার নেব।
সবাই একসাথে “ওওওওও” করে চিৎকার হালিমা চুপ করে হাসল চোখে দুষ্টু ঝিলিক।
হালিমাঃ- ঠিক আছে আমি আমার ডেয়ার কালকে দিবো।
ইলাঃ- কালকে মানে গেম তো আজ কালকে কেনো ডেয়ার দিবি তুই?
হালিমা ঠোঁট কামড়ে মুচকি হেসে বলল,
হালিমাঃ- কারণ তোর ডেয়ারটা আজ হবে না কালকের জন্য পারফেক্ট।
ইলা কপাল কুঁচকে বলল,
ইলাঃ- আমি তোদের কথা শুনবো না।
আরিয়ান তখন এক কোণ থেকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
আরিয়ানঃ- বলেছিলাম ভয় পাচ্ছে। তবে যেহেতু ডেয়ার নিয়েছে সেটা এক বছর পড় হলেও শেষ করতে হবে।
ঘরের ভেতর হাসির শব্দ আর চোখাচোখির এক অদ্ভুত খেলা চলতে লাগলো।গেমটা শেষ হলো কিন্তু ইলার ডেয়ার সবার মধ্যে একটা কৌতূহল রেখে গেলো বিশেষ করে ইলার হৃদয়ে।
রাত তখন ঠিক ১০ টা ছুঁই ছুঁই হলুদ প্রোগ্রামের আনন্দ যেনো এখনো ভেসে বেড়াচ্ছে চারপাশে কিন্তু সেই উচ্ছ্বাস এবার এক নতুন রূপ নিচ্ছে ব্যাচেলর পার্টি।
আদিব, রায়েদ, রাফি, সায়েম, সামিন, আরিয়ান সবাই গেছে পার্টি করতে। জমে উঠেছে পার্টি শহরের এক ঝলমলে রুফটপ রেস্টুরেন্টে। চারপাশে ডান্স বিট বাজছে বাতাসে পারফিউম আর পানীয়র গন্ধ মিশে এক অদ্ভুত উত্তেজনা তৈরি করেছে।
রায়েদ টেবিলের ওপর বোতল রাখলো।মুখে সেই পুরনো স্টাইলের হাসি
রায়েদঃ- আজকের রাতটা আদিব ভাইয়ের রাত Cheers boys
সবাই হইহুল্লোড় করে গ্লাস তুলে চিৎকার করে উঠল আরিয়ান একটু দূরে বসে আছে মোবাইল স্ক্রল করছে, চোখে স্থিরতা মুখে কোনো হাসি নেই। আদিব কাছে এসে কাঁধে হাত রেখে বলল,
আদিবঃ- ভাই এক গ্লাস খেয়ে ফেলো না আজ কোনো টেনশন নাই।
আরিয়ান ফোন থেকে চোখ না তুলে বলল,
আরিয়ানঃ- না, আমি এইসব খাই না তুই ভালো করেই জানিস তোমরা ইঞ্জয় করো।
রায়েদ মুখ বাঁকিয়ে বলল,
রায়েদঃ- ভাই একদিন তো ভাই একটু চিয়ার্স দেন না।
আরিয়ান এবার মৃদু হাসল,
আরিয়ানঃ- আমি যদি চিয়ার্স করি কাল তোমাদের কেউ ঘুম থেকে উঠতে পারবে না। তাই বাদ দাও তোমড়া ইঞ্জয় করো।
সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ল আরিয়ান আবার ফোনে মন দিলো। স্ক্রিনে আলো জ্বলছে আঙুলের নরম স্পর্শে তার মুখে এক অজানা ভাব।
অন্যদিকে ইলার ঘরে নিস্তব্ধতা সবাই বেরিয়ে যাওয়ায় বাড়িটা ফাঁকা শুধু হালকা ফ্যানের শব্দ। ইলা বিছানায় বসে ফোনটা হাতে নিয়েছে চোখে হালকা অস্থিরতা ঠোঁট কামড়ে বসে আছে।
আজ হঠাৎ করেই শাওনের কথা মনে পড়ছে এক বছর পেরিয়ে গেছে তবু কেন যেন আজ এত মনে পড়ছে সে ছেলেটাকে। শাওনের হাসি, রাগ, ভয়েস সব কিছুই মিস করছে ইলার বুক কেঁপে উঠলো চোখ ভিজে এলো। কিন্তু সে দৃঢ়ভাবে ফোনটা বন্ধ করলো ঠোঁটে বলল,
ইলাঃ- না আমি ওর ভিডিও দেখবো না একদম না।
নিজেকে আটকানোর জন্য হঠাৎ প্লে স্টোর এ ডুকলো আঙুল একবার থেমে আবার এগিয়ে গেলো টাইপ করলো Free Fire একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইন্সটল বাটনে ক্লিক করলো।
আর মনে পড়ে গেলো সেই ১৪ বছর বয়সের সময়টার কথা যখন স্কুল থেকে ফিরে ইলা তার মায়ের ফোন নিয়ে লুকিয়ে গেম খেলতো। হঠাৎ একদিন মায়ের চোখে ধরা পড়ে যা মার খেয়েছে তা এখনো মনে হলে গা শিউরে ওঠে। সেদিন সাবিহা বেগম রেগে গিয়ে নিজের ফোনটাকেই মেঝেতে ছুড়ে মেরেছিলেন স্ক্রিন ভেঙে গিয়েছিল। সেদিন ইলা কেঁদে কেঁদে প্রতিজ্ঞা করেছিল আর কোনোদিন গেম খেলবে না।
কিন্তু আজ শাওনকে ভুলতে সেই পুরনো শপথ ভাঙলো গেম টা ইনস্টল শেষ হলো লগইন করতে গিয়ে হঠাৎ বুকটা ধক করে উঠলো পুরনো আইডি এখনো আছে কি না জানা নেই তবুও লগইন করলো আইডিতে ডুকে গেলো আইডির নাম “Sizuka” অবাক হয়ে ইলা চুপ করে তাকিয়ে রইলো স্ক্রিনের দিকে। পুরনো কোনো কিছুই নেই ৫ বছরে অনেক কিছুই চেঞ্জ হয়ে গেছে। ইলা খেলাও ভুলে গেছে লিস্টে কোনো ফেন্ড নেই এক সময় অনেক ফ্রেন্ড ছিলো কিন্তু আজ এই লিস্ট ফাকা
শুধু একটিই নাম ঝলমল করছে “I’m Waiting” ইলার ভ্রু কুঁচকে গেলো এই আইডি সে চিনে না। নামটা তো আগে কারো ছিল না নাকি কেউ নাম চেঞ্জ করেছে?
একটু দ্বিধা নিয়ে সে প্রোফাইলে ঢুকলো কিছুই লেখা নেই শুধু একটা উক্তি “Old players never die they just wait.”
ইলা ব্যাক হয়ে গেম খেলা শুরু করলো খেলতে ভালোই লাগছে কিন্তু অনেক দিন পড়ে খালার কারণে হাত ফ্রিজ হয়ে গেছে। রাত তখন প্রায় ১১ টা রুফটপে আরিয়ান ফোনে খবর পড়ছে চোখে হালকা ক্লান্তি। একসময় ফোনটা নামিয়ে নিলো অচেতনভাবে গ্যালারি খুললো একটা ভিডিও খুলে গেলো ইলার ডান্সের ভিডিও আরিয়ান ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলল।
আর তালুকদার বাড়িতে সেই সময়েই ইলার কাউকে ভুলার জন্য গেম খেলায় ব্যস্ত। ইলা খেলতে খেলতে এক সময় ফোনে একটা নোটিফিকেশন এল “I’m Waiting sent you a request Let’s play together?” ইলার চোখ বড় হয়ে গেলো বুকের ভেতর ধপধপ শব্দ বাড়ছে।
ইলা খেলা শেষ করে লবিতে গেলো তার পর সে থেমে গেলো কয়েক সেকেন্ড তারপর ধীরে ধীরে স্ক্রিনে ট্যাপ করলো Accept স্ক্রিনে ঝলক দিলো। সেই আইডিটা জয়েন্ট হলো
“আসালামু আলাইকুম সিজুকা”
ইলাঃ- ওয়ালাইকুম সালাম আপনাকে তো চিনলাম না।
” চিনার কথাও না আমি তো নাম চেঞ্জ করেছি তাই হয়তো চিনতে পাচ্ছো না।
ইলাঃ- নাম বলেন তাহলে চিনবো হয় তো।
” তুমি তো কোনো দিন আমার নাম শুনোনি।
সেই সময় সাবিহা ইলার রুমে আসে ইলা তারাতাড়ি করে গেম থেকে বের হয়ে যায়। সাবিহা এসে বলে
সাবিহাঃ- ইলা মা ঘুমাস নি তুই এখনো?
ইলাঃ- না আম্মু ঘুমাবো একটু পড়ে।
সাবিহাঃ- ঘুমায় যা কালকে তো বিয়ে অনেক ঝামেলা যাবে তাই আজ ঘুমিয়ে যা।
সাবিহা ইলার রুমের লাইট অফ করে চলে গেলো ইলাও শুয়ে পড়লো।
রাত প্রায় দুইটা আকাশে মেঘের আড়ালে চাঁদ আধো ঝাপসা হয়ে আছে,বাতাসে ড্রিংকস আর সিগারেটের গন্ধ মিশে একটা ঘোরের আবহ তৈরি করেছে। রুফটপ রেস্টুরেন্টে ব্যাচেলর পার্টির চূড়ান্ত ধামাকা এখনো চলছে। ডান্সফ্লোরে সবাই একদম পাগলের মতো নাচছে রায়েদ গলায় হাত দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো
রায়েদঃ- এই গানটা শুধু আমার জন্য বাজাও DJ ভাই “Abhi Toh Party Shuru Hui Hai”
গান বাজতেই রায়েদ আর আদিব একে অপরের কাঁধে হাত রেখে নাচতে শুরু করলো। চারপাশে সবাই হাসছে কিন্তু তারা নিজের দুনিয়ায় হারিয়ে গেছে। রায়েদের মুখ লাল চোখ আধা বন্ধ এক হাতে বোতল নিয়ে আদিবকে বলছে,
রায়েদঃ- ভাই… তুই আমার ভাই একদম ভাই জানিস? পরি তোকে পেয়ে খুব ভাগ্যবতী রে।
আদিবও টলতে টলতে বলল,
আদিবঃ- তুই চুপ কর আমার বউয়ের নাম মুখে নিবি না।
দুজনের কথায় সবাই হেসে গড়িয়ে পড়লো সায়েম আর সামিন পাশে বসে বলছে “এই দুজনকে নিয়ে কাল সকালে নিউজ হবে” রাতের আড্ডা হাসি, চিৎকারে সময় কখন গড়িয়ে গেছে কেউ বুঝতে পারেনি। ডিজে শেষ গান বাজিয়ে জানালো“লাস্ট ট্র্যাক বন্ধুরা” সবাই গ্লাস তুলে একসাথে চিৎকার করলো
” আবিদ ভাই এর বন্দী জীবন কাল থেকে শুরু” হাসি, চিৎকার, আর অস্পষ্ট হইচইয়ের মাঝে পার্টি শেষ হলো।
রাত ২ টা ১৫ সবাই অবশেষে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হলো।
আরিয়ান গাড়ি চালিয়ে সবাইকে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছে। রায়েদ, আদিব পিছনের সিটে আধা ঘুমে টলছে। আরিয়ান সামনের সিটে বসে ড্রাইভ করছে একদম ঠান্ডা মাথায়। চোখে সেই চেনা তীক্ষ্ণতা ঠোঁটে হালকা হাসি।
আরিয়ানঃ- রায়েদ একটু সোজা হয়ে বসো পড়ে যাবে।
রায়েদঃ- না ভাই আমি একদম ঠিক আছি ঠিক মানে ঠিক না।
বলে আবার হেলে পড়লো আদিব এর দিকে আরিয়ান মাথা নেড়ে হাসলো। গাড়ি তালুকদার বাড়ির গেটের সামনে এসে থামালো। রাতের সেই গভীর নিস্তব্ধতা ভেঙে শুধুই ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ। দারোয়ান গেট খুলে দিলো আরিয়ান রাফি আর সায়েম কে বলল আদিব কে নিয়ে যেতে আর আরিয়ান রায়েদ কে বিয়ে তালুকদার বাড়ির মেইন গেটে আসলো। এসে দেখে দরজা লক করা আরিয়ান এক দম নিয়ে রায়েদকে সোজা করে দাঁড় করালো। রায়েদ টলতে টলতে বলল,
রায়েদঃ- ভাই আমরা কি টয়লেটের সামনে আছি হিসু করা যাবে।
রায়েদের কথা শুনে আরিয়ান ঠোঁট কামড়ে হাসলো কলিং বেল টিপলো টিং টং টিং টং একটু পরেই দরজা খুললো রফিকুল তালুকদার। ঘুমে চোখ আধা বন্ধ মুখে কড়া ভাব।
“রাত দুইটার সময় কে” বাক্য শেষ করার আগেই রফিকুল তালুকদার দেখলেন রায়েদ সামনের দিকে এক পা বাড়াতেই ভারসাম্য হারিয়ে সোজা ডিগবাজি খেয়ে বাগানে পড়ে গেলো।
ঘাসে গড়াগড়ি খেয়ে শেষে থামলো গাছের গোড়ায়।
আরিয়ান সেই দৃশ্য দেখে প্রথমে চুপ তারপর এমন হাসতে লাগলো যে চোখ দিয়ে পানি চলে এলো হাসির মাঝেই বলল,
আরিয়ানঃ- সরি আঙ্কেল ও একটু বেশি ড্রিংক করে ফেলেছে তাই এমনটা হয়েছে আমি সামলে নিচ্চি অকে।
রফিকুল তালুকদার হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছেন মুখে শুধু একটা শব্দ “এই ছেলেটা” আরিয়ান এগিয়ে গিয়ে রায়েদকে টেনে তুললো রায়েদের চোখ বন্ধ মুখে কেমন শিশুর মতো শান্ত ভাব।
আরিয়ানঃ- চল হিরো ঘুমের রাজ্যে নিয়ে যাই।
বুকে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রফিকুল বললেন,
রফিকুলঃ- এই বয়সে তোরা যদি এমন করিস বিয়ের পর কী করবি।
আরিয়ান এবার একদম ভদ্রভাবে হেসে মাথা নিচু করল,
আরিয়ানঃ- আপনার কথাই ঠিক আঙ্কেল কিন্তু দুই একদিন এটা ব্যাপার না।
রায়েদকে কাঁধে তুলে সিঁড়ি দিয়ে উপরে নিয়ে যেতে যেতে নিজের মনে ফিসফিস করে বলল,
আরিয়ানঃ- এই রায়েদ তুই পরের বার পার্টিতে গেলে আমি হেলমেট নিয়ে যাবো তোর ডিগবাজি সহ্য করা মুশকিল আজ কপাল জোরে মাথাটা বেচে গেছে।
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ২৬
রায়েদকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আরিয়ান নিঃশব্দে ঘর থেকে বের হয়ে এলো ছাদে রাত তখন প্রায় তিনটা। আরিয়ান নিচে গাড়ির দিকে তাকিয়ে একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঠোঁটে একটা কৌতুকপূর্ণ হাসি ফুটে উঠলো
আরিয়ানঃ- এই বিয়ে বাড়ি মনে হয় আমার ট্রেনিং ক্যাম্পের চেয়েও বেশি অ্যাডভেঞ্চারাস।
