Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৫

খান সাহেব পর্ব ৫

খান সাহেব পর্ব ৫
সুমাইয়া জাহান

পুরো বাড়ি অন্ধকার হবার সত্ত্বেও ডিমলাইটের আবছা আলোয় সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ছাদ থেকে এসে সকলের ঘুমানোর প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে। সুমু রুমে এসে দেখল সবাই অলরেডি শুয়ে পড়েছে। ও আর দেরি না করে ব‍্যাগের কাছে গেল ডায়েরিটা বের করতে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ব‍্যাগের ভেতর ডায়েরিটা নেই। পুরো ব‍্যাগ তন্নতন্ন করে খুঁজেও ডায়েরিটা পেল না সে। হঠাৎ তার মনে পড়ল তখন ইফতিয়া রুমে আসায় ডায়েরিটা লুকাতে বালিশের নিচে রেখেছিল। তারপর আর ডায়েরিটা ব‍্যাগে ঢুকাতে ভুলেই গেছিল সুমু।

“ওহ্ শিট! এখন কি হবে? কি করব আমি? ডায়েরিটা’তো ওই রুমে। আর ওখানে’তো এখন খান সাহেব আছেন। যদি ডায়েরিটা উনি দেখে ফেলে। আর খুলে পড়তে শুরু করে। না, না! তাইলে তো আমি লজ্জায় আর ওনার সামনে যেতেই পারব না। আমাকে যে করেই হোক ডায়েরিটা উনি দেখে ফেলার আগেই ওইখান থেকে নিয়ে আসতে হবে। উনি’তো এখনো ছাদে আছে। নিজের পি.এর সাথে কথা বলবে বলছিল। এই সুযোগ আমাকে এক্ষুনি গিয়ে ডায়েরিটা নিয়ে আসতে হবে।”
যেই ভাবা সেই কাজ। আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না সুমু। রুম থেকে বেরোনোর উদ্দেশ্যে পা বাড়াতে গিয়ে পিছন থেকে মাইশার ডাক ভেসে এলো।

“সুমু?”
“জি আপু!”
“এতো রাতে কোথায় যাচ্ছিস তুই?”
“পানি খেতে যাচ্ছি আপু। দেখো না, রুমে একটুও পানি নেই। আমি পানি খেয়ে আসি আর নিয়ে আসি।”
“আচ্ছা! তাড়াতাড়ি এসে শুয়ে পড়িস। অনেক রাত হয়েছে।”
“আচ্ছা, আপু।”
কথাটা বলেই আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না সুমু। ছুটল তার গন্তব্যে।
কাঙ্ক্ষিত রুমটার সামনে দৌড়াতে-দৌড়াতে আসলো সে। রুমের কাছে এসেই পা টিপে টিপে হাঁটল। যাতে মেঝেও শুনতে না পারে তার হাঁটার শব্দ। দরজায় হাত রাখতেই দেখল দরজাটা খোলা। তারমানে মানুষটা এখনো ছাদে।
তারপরেও পুরোপুরি কনফার্ম হওয়ার জন‍্য দরজার ফাঁকা দিয়ে উঁকি মারল। না কেউ নেই। আর একমিনিটও দেরি না করে চটপট রুমে ঢুকল। সে বিড়বিড়িয়ে বলল,

“মানুষটা আসার আগেই ডায়রিটা নিয়ে চলে যেতে হবে।”
জানালা দিয়ে চাঁদের আলোয় আর ডিম লাইটের লাল আলোয় পুরো রুম আলোকিত। বাহির থেকে দক্ষিণা হিমশীতল হাওয়া বইছে পুরো রুমজুড়ে। পুরো রুমটায় একটা রোমাঞ্চকর ভাব ফুটে উঠেছে।
“আজ রুমটা এতো সুন্দর কেন? আচ্ছা এই রুমটা কি রোজ এমন সুন্দর থাকে? নাকি আজ ওই মানুষটার আগমনে রুমটা এতো সুন্দর? আমিওতো ছিলাম এই রুমে। কই আগে’তো এতো সুন্দর লাগেনি রুমটা।”
সুমুর ভাবনার মাঝে হঠাৎ জানালা দিয়ে আসা ঠান্ডা হিমশীতল বাতাস ছুঁয়ে গেল তার দেহখানা। ঠান্ডা বাতাসের ফলে হালকা কেঁপে উঠলো সুমুর ছোট্ট দেহখানা। ধ‍্যান ভাঙ্গল তার। বিছানার কাছে গিয়ে বালিশটা তুলতেই ডায়েরিটা দেখতে পেল সে। আলতো হেসে ডায়েরিটা হাতে নিল সুমু। হঠাৎ রুমের বাহির থেকে কারও পায়ের আওয়াজ ভেসে আসলো সুমুর কানে।

“তারমানে উনি চলে আসলো। এখন আমি কি করি? কোথায় লুকায়?”
কথাগুলো বলে আর কোনো উপায় না পেয়ে আলমারির সাইডে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল সুমু। তখনই দরজা খোলার শব্দ হল। সেই সাথে বাতাসের সাথে ভেসে আসলো পারফিউমের মন মাতানো সুবাস। দরজা খোলার শব্দে চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলল সুমু। হাত-পা কাঁপছে তার। হার্টবিট অস্বাভাবিক মাত্রায় ছুটকে তার। দম বন্ধ হয়ে আসছে। শরীর অবশ হয়ে গেছে। তার মনে হচ্ছে, সে এক্ষুনি পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারাবে।
শেরাজ রুমের মধ‍্যে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা লক করে দিল। এতেই আরো বেশি ভয় পেয়ে গেল সুমু। এখন’তো তার মনে হচ্ছে ভয়ের চোটে মারাই যাবে সে। শরীরের কাঁপুনি আরও বৃদ্ধি পেল তার।
রুমের মধ্যে ঢুকে কারো উপস্থিতি টের পেয়েও রুমের লাইট জ্বালালো না শেরাজ। আর না খুঁজে দেখার চেষ্টা করল সে। চুপচাপ ঠাঁয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে চাইল, যে ঢুকেছে, সে নিজের ইচ্ছায় বেরিয়ে আসুক। রুমে মধ্যে যে কেউ ঢুকে ছিল— এইটা সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে। ইভেন এখনো সে এই রুমের মধ্যেই আছে— এটাও সে বুঝতে পারছে।
শেরাজের এইভাবে রুমের মাঝে ঠাঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকার কারণ বুঝতে পারল না সুমু।

“আচ্ছা, মানুষটা কি হ‍্যাং হয়ে গেলো? সে যা খুশি হোক। আমি এই সুযোগে পালায়। আচ্ছা উনি আমাকে ধরতে পারলে কি থাপ্পর মারবে? ওনার হাতের একটা থাপ্পর আমার এই ছোট্ট নরম গালে পড়লে’তো আমার একটা দাঁত ও থাকবে না। নাহ! এটা হতে দেওয়া যাবে না। আমাকে পালাতেই হবে। ছোটবেলায় স্কুল কম্পিটিশনে দৌড়ের কতো ফাস্ট হয়েছি। ওই কম্পিটিশন কোনো কম্পিটিশনি ছিল না। আজকের দৌড় হবে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দৌড়। আজ আমাকে জিততেই হবে। কোনোমতেই খান সাহেবের হাতে ধরা পড়লে চলবে না।”

যেই ভাবা সেই কাজ। ডায়েরিটা শক্ত হাতে ধরে দৌড় লাগাল সুমু। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না। শেরাজের পুরুষালি হাতে বাঁধা পড়ল সে।
শেরাজ সুমুর হাত ধরে হেঁচকা টান মেরে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরল তার নরম হাত দুটোকে। ভয়ে সুমুর মরি-মরি অবস্থা। চোখ-মুখ খিঁচে বন্ধ করে রেখেছে সে। শেরাজের হাতের মধ্যে চেপে ধরে রাখা হাত দুটো থরথর করে কাঁপছে সুমুর। পা দুটো মেঝেতে রাখার মতো শক্তি শরীরের অবশিষ্ট নেই মেয়েটার। ভয়ের কারণে হাত থেকে ডায়েরিটা পরে গেছে অনেক আগেই। মুখের ওপর অবাধ‍্য চুলগুলো উড়ছে সুমুর। আলতো করে ফুঁ দিয়ে চুলগুলো মুখের ওপর থেকে সরিয়ে দিলো শেরাজ। মুখের ওপর গরম হাওয়া অনুভব করতেই হালকা কেঁপে উঠল মেয়েটা। মুখের প্রতিটি স্থান নিখুঁতভাবে পরখ করছে শেরাজ। ভয়ের চোটে ওষ্ঠদ্বয় তিরতির করে কাঁপছে মেয়েটার।
শেরাজ মনে মনে ভাবল,

“এতোটা নেশালো লাগছে কেনো ওই ওষ্ঠদ্বয়? আমাকে এইভাবে আফিমের মতো টানছে কেনো? একটু কি ছুঁয়ে দিব?”
সুমুর এমন অগোছালো অবস্থা দেখে পুরুষত্ব জেগে উঠল শেরাজের। ইচ্ছে করলো ওই কাঁপতে থাকা গোলাপি ওষ্ঠদ্বয় নিজের আয়ত্বে নিতে। রক্তের মতো রক্তিম করে দিতে ইচ্ছে করল ওই পাতলা ওষ্ঠদ্বয়।
আচ্ছা! রক্তের মতো রক্তিম করে দিলে ঠিক কেমন দেখতে হবে ওই ওষ্ঠদ্বয়? আরো বেশি নেশালো লাগবে? খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। আচ্ছা এমনটা করলে কি মেয়েটা রাগ করবে নাকি লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়ে ছুটে পালাবে নিজেকে লুকানোর জন‍্য।
নিজের এইসব বাজে চিন্তাকে মনের মধ্যে চেপে রেখে মুখে রাগ ফুটিয়ে বলল,

“লুক এট মি।”
শেরাজের কথাটায় কোনো ভাবান্তর হলো না সুমুর। সে মনে-মনে বলল,
“আজ থাপ্পর ফরজ আমার জন্য। সরি আমার নিষ্পাপ দাঁতেরা। তোদের মালিক তোদের বাঁচাতে পারল না। তোরা আমাকে ক্ষমা করে দিস। ওপারে ভালো থাকিস তোরা। আমি তোদের খাবার সময় অনেক মিস করব।”
সুমুকে তাকাচ্ছে না দেখে শেরাজ ধমকেরসূরে বলল,

“আই সেইড, লুক এট মি।”
ভয়ের চোটে এবার হয়তো কেঁদেই ফেলবে মেয়েটা। সে ধীরে- ধীরে চোখ মেলে তাকাল। চোখের সামনে সেই সুদর্শন পুরুষ। পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি লম্বা সুঠাম গড়নের এক পুরুষ। মিডিয়াম লেয়ার্ড সাইড-সুইপ্ট চুল, শার্প ওভাল মুখের শেপে শার্প এলমন্ড আকৃতির গভীর ডার্ক চোখ, লম্বা সরু নাক, পাতলা গোলাপি ঠোঁট আর থিন ট্রিমড দাড়ি— সব মিলিয়ে তার চেহারায় এক অনিন্দ্য মায়াবী রাফনেস ফুটে উঠেছে। আল্লাহ কতোটা ধৈর্য্য নিয়ে বানিয়েছে মানুষটাকে। চাঁদের আলোয় কি নিদারুণ সুন্দর লাগছে তাকে। কি দারুন তাইনা, এক চাঁদ আরেক চাঁদকে আলো দিয়ে তার সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছে। কিন্তু ওই চাঁদে খুঁত আছে আর আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চাঁদ একদম নিখুঁত। একটা মানুষ এতো সুন্দর কিভাবে হতে পারে? আচ্ছা! পুরুষ মানুষের কি এতো সুন্দর হতে আছে? উহুম! একদমই নেই।
সুমুর ভাবনার মধ্যে, শেরাজের চোখের ওপর পড়ে উড়তে থাকা চুলগুলোকে দেখে বড্ড হিংসা হলো তার। ইচ্ছে করল ছুঁয়ে দিতে। কিন্তু সেই অধিকার কি সুমুর আছে? না, একদমই নেই। রাগলেও কতটা সুন্দর লাগে মানুষটাকে।
শেরাজের ডাকে ধ‍্যান ভাঙাল সুমুর। সে সাথে-সাথে অবাধ‍্য চোখ দুটো নামিয়ে ফেলল।

“হ‍্যালো! হাঁপানি লেডি, হু আর ইউ?”
নিজের নামে এমন অদ্ভুত সম্মোধন শুনে মাথা তুলে তাকাল সুমু। কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে মনে-মনে বলল,
“হাঁপানি লেডি মানে? আমাকে কি ওনার হাঁপানির রোগী মনে হয়? ওনার ভয়েই’তো হাত-পা কাঁপছে আমার। আর উনি আমাকে হাঁপানি রোগী বলল। দোষটাতো ওনার। ওনার জন‍্যই তো এমন হচ্ছে আমার। আর আমিও, দুনিয়ার কাউকে ভয় পাইনা— সেইখানে ওনাকে এতো ভয় পাই কেনো?”
“এই মেয়ে! বার বার কোথায় হারিয়ে যাও তুমি? হাঁপানির সাথে-সাথে হারিয়ে যাওয়ার রোগ আগে নাকি তোমার? কথা বলছ না কেনো? হু আর ইউ?”
সুমু আমতা-আমতা করে বলল,
“আ…আ…আমি সু…সুমু।”
“হোয়াই অ্যান্ড হুইজ পারমিশন ডিড ইউ এন্টার দিস রুম?” (এই রুমে কেনো আর কার পারমিশন নিয়ে ঢুকেছো?)
সুমু চুপ করে রইল। শেরাজ আবারও বলল,

“দ্যা হাউস মে বি ইয়োর্স বাট নাউ দ্যাট আই অ্যাম অ্যালাউড টু স্টে ইন দিস রুম, ইট ইজ নাউ মাই প্রাইভেট স্পেস।” ( বাড়িটা হয়তো তোমাদের, কিন্তু এখন যেহেতু আমাকে এই রুমটাতে থাকতে দেয়া হয়েছে, তাহলে এখন এইটা আমার প্রাইভেট স্পেস।)
“ইউ ডোন্ট নো? ইফ ইউ ওয়ান্ট টু এন্টার সামওয়ানস রুম, ইউ হ্যাভ টু গেট পারমিশন ফ্রম দ্য ওনার অব দ্যাট রুম।” ( তুমি জানো না? কারো রুমে ঢুকতে হলে ওই রুমের মালিকের অনুমতি নিতে হয়।)
সুমু কিছু বলার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। সুমুর উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে শেরাজ আবারও বলল,
“অলদো দ্যা হাউস ইজ ইয়োর্স, আই কারেন্টলি ওউন দিস রুম। দেন হোয়াই ডিড ইউ এন্টার দিস রুম উইদআউট মাই পারমিশন? অ্যন্সার মি।” (বাড়িটা তোমাদের হলেও বর্তমানে এই রুমটা মালিক আমি। তাহলে তুমি আমার অনুমতি ছাড়া কেনো এই রুমে ঢুকেছো? উত্তর দাও আমায়।)
সুমু আমতা-আমতা করে বলল,

“আ… আ…আসলে, আমি আমার ডায়েরিটা এই রুমে ফেলে গিয়েলাম। তাই ডায়েরিটা নেওয়ার জন‍্যই এসেছিলাম। আই এম সরি। আমার ভুল হয়ে গেছে। প্লিজ আমাকে যেতে দিন।”
সুমুর কথায় শেরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“ছেড়ে দিব? ওকে দিলাম ছেড়ে। তবে আমার অনুমতি ছাড়া এই এই রুমে ঢোকার জন‍্য শাস্তিতো তোমাকে পেতেই হবে।”
শাস্তির কথা শুনে ঢোক গিললো সুমু। তারপর আমতা- আমতা করে বলল,
“কি শাস্তি দিবেন?”
সুমুর এমন ভয় পাওয়া মুখটা দেখে খুব হাসি পেল শেরাজের। সে গম্ভীরসুরে বলল,
“সেটা সময় হলে দিব। আর হ‍্যাঁ! তোমার গানের গলা অনেক সুন্দর। তখন অনেক ভালো গেয়েছ।”
শেরাজের মুখ থেকে নিজর সম্পর্কে প্রশংসা শুনে লজ্জা পেয়ে গেল সুমু। সেই সাথে অবাকও হলো ভিষণ, আর ভাবল, তখন কেনো বলল না সবার সামনে। অবশ‍্য উনি যা মুডি মানুষ। সকলের সামনে না বলাটায় স্বাভাবিক। সুমু মুখে বলল,

“তাহলে, এখন আমি যায়?”
“ওকে, যাও।”
আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না সুমু। দরজা খুলেই ছুটে পালালো সে। ওর এইভাবে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল শেরাজ। তখনই আইয়ুর রুমে ঢুকল। বুকের উপর দুইহাত বেঁধে দাঁড়াল শেরাজের সামনে। আইয়ুবকে দেখে শেরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল।
“হোয়াট? এইভাবে আহাম্মকের মতো তাকিয়ে আছিস কেন?”
“ছিহ, ছিহ, ছিহ শেরাজ! শেষমেশ তুইও?”
আইয়ুবের দিকে তাকিয়ে বিরক্তিসূরে বলল,
“আমিও মানে? কি করেছি আমি?”
“কি করেছিস তুই জানিস না?”
“জানলে তো পাল্টা তোকে প্রশ্ন করতাম না। তুই বল কি করেছি আমি?”
“ওই ছোট্ট মেয়েটাকে রুমের মধ্যে এনে। ভেতর থেকে দরজা লক করে, কি করছিলি তুই?”
“আরে ও’তো ওর ডায়েরিটা নিতে এসেছিল।”
“ডায়েরি কি রুমের দরজা ভিতর থেকে লক করে নিতে এসেছিল? তখন যে আমি বললাম, সামথিং সামথিং। তুই যেন কি বললি? আমি বাজে কথা বলছি। ওইটা জাস্ট এক্সিডেন্ট। তাহলে এখন কি বলবি?”
বিরক্তি নিয়ে আইয়ুবের দিকে তাকাল শেরাজ।

“তুই এতোরাতে না ঘুমিয়ে কি করিস? যা, ঘুমাতে যা।”
আইয়ুব কাঁদো- কাঁদো মুখ করে বলল,
“ঘুম আসছিল না। তাই বের হয়েছিলাম রুমে থেকে। রুম থেকে না বের হলে তো এইসব কিছুই জানতে পারতাম না। তুই এমন কখন হয়ে গেলি এস.কে। প্রেম করছিস আর আমাকে বললি না।”
আইয়ুবের কথায় রক্তচক্ষু নিয়ে তাকাল শেরাজ। তাকে ওইভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আইয়ুব বলল,
“এইভাবে তাকিয়ে আছিস কেন ভাই? আমি তো ঠিকই বলেছি। তুই প্রেম…. “
কথাটা শেষ করতে পারল না আইয়ুব। তাই আগেই শেরাজ ধমকেরসূরে বলল,
“ইউ নো আইয়ুব! শেরাজ খান নেভার লুকস ব্যাক অ্যাট এনি গার্ল। দিজ চীপ লাভস আর ওয়ার্থ নাথিং টু শেরাজ খান।” (তুইতো জানিস আইয়ুব। শেরাজ খান কোনো মেয়ের দিকে ফিরেও তাকায় না। শেরাজ খানের কাছে এইসব সস্তা ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই।)
শেরাজের ধমকে ভয় পেয়ে গেল আইয়ুব। সে থতমত খেয়ে বলল,

“আচ্ছা, ভাই তুই ঘুমা। আমার অনেক ঘুম পাচ্ছে। আমি রুমে যায়।”
কথাটা বলেই চলে গেল আইয়ুব। রুমে বাহিরে গিয়ে মনে-মনে বলল,
“ঘুমন্ত সিংহকে জাগানোর কোনো প্রয়োজন নেই।”
আইয়ুব বের হওয়ার সাথে সাথে দরজা লক করে দিল শেরাজ। পকেট থেকে ফোন বের করে ইনস্টাগ্রামে ঢুকল। সোশ্যাল মিডিয়াতে স্ক্রোল করতে-করতে জানালার কাছে আসলো। হঠাৎ বাতাসে কিছু উড়ার শব্দে ভেসে আসলো শেরাজের কানে। ফোনের ফ্লাশলাইট জ্বালিয়ে দেখল একটা ডায়েরি পড়ে আছে। সে বাঁকা হেসে বলল,
“যেটা নিতে এসেছিল— সেটা রেখেই পালিয়ে গেল। স্টুপিড গার্ল।”
ফোনটা পকেটে রেখে ডায়েরিটা হাতে তুলে নিল সে। তখনি ডায়েরিটার ভিতর থেকে কিছু ছবি পড়ল শেরাজের পায়ের ওপর। হাতে তুলে নিতেই দেখলো সব তারই পিক। পিকের ওপর বড় বড় করে ইংরেজিতে লেখা “মাই খান সাহেব”। লেখাটার দুইপাশে দুইটা হার্ট আঁকা।
লেখাটা পড়ে মুচকি হাসল শেরাজ। ডায়েরিটা পরার আকাঙ্ক্ষা জাগল মনে। কিন্তু শেরাজ খান কারও পার্সোনাল জিনিসে হস্তক্ষেপ করে না। তাই সে ডায়েরিটা টেবিলের ওপর রেখে বেডে গিয়ে শুয়ে পড়লো শেরাজ। আজ আর টিকটকে ঢুকে গিফটিং করতে ইচ্ছা করল না তার। মাথার নিচে দুইহাত রেখে চোখ বন্ধ করল সে। চোখের সামনে ভেসে উঠলো— সেই ভীতু মায়াবী ফর্সা মুখ, টানা হরিণী মায়াভরা চোখ, গোলাপের পাপড়ির ন‍্যায় নেশালো পাতলা ঠোঁট।
সে মনে-মনে বলল,

“কিভাবে আফিমের মতো টানছিল আমায়। হাউ ডাজ দিস ফিল? হোয়াই ডু আই ফিল লাইক দিস হোয়েন আই কাম টু দিস গার্ল? সো অ্যাম আই ফলিং ইন লাভ উইথ দিস গার্ল?” ( এইটা কেমন অনুভূতি? এই মেয়েটার কাছে আসলে এমন অনূভুতি কেনো হয় আমার? তাহলে কি আমি ভালোবেসে ফেলেছি এই মেয়েটাকে?)
হঠাৎ চোখ মেলে তাকাল সে। বিড়বিড়িয়ে বলল,
“হোয়াট অ্যাম আই থিংকিং? নো, নো, নো! ইটস ইমপসিবল। শেরাজ খান ক্যান নেভার বি উইক টু অ্যান অর্ডিনারি গার্ল।” ( এইসব কি ভাবছি আমি? না না না। এটা অসম্ভব। শেরাজ খান কখনও একটা সাধারণ মেয়ের কাছে দূর্বল হবেনা।)
সে চোখ বন্ধ করে আবারও বলল,
“বাট দ্যা ফিলিং ওয়াজ ভেরি নাইস।” (তবে অনূভুতি অনেক সুন্দর ছিলো।)
মন থেকে ভাবনাগুলো সরানোর জন‍্য চোখ বন্ধ কর‍ে ঘুমানোর চেষ্টা করল সে।

খান সাহেব পর্ব ৪

দৌড়ে ঘরে এসে হাঁপাতে লাগল সুমু। ভয়ের চোটে গলা শুকিয়ে গেছে মেয়েটার। দুইগ্লাস পানি শেষ করে ফেলল অলরেডি। তার চোখের সামনে বার বার ভেসে উঠছে কিছুক্ষণ আগের সেই মুহূর্ত। লজ্জায় লাল হয়ে গেল মেয়েটা।
না, না! ওই লোকের সামনে আর পড়বে না সে। ডায়েরি চুলোয় যাক। ওনার মতো স্ট্রং পার্সোনালিটির মানুষ হয়তো কখনোই অন‍্যের জিনিস খুলে দেখবে না। কথাটা ভেবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, বেডে গিয়ে চোখ বন্ধ করল সুমু।

খান সাহেব পর্ব ৬