খান সাহেব পর্ব ১০
সুমাইয়া জাহান
ঘড়ির কাঁটায় রাত নয়টা বাজে। সকলে গার্ডেনে অনুষ্ঠানে মেতে আছে। বড়রা সকলে এক এক করে মাইশাকে হলুদ লাগিয়ে দিচ্ছে আর মিষ্টি মুখ করাচ্ছে। সকলে যার যার মতো মাইশাকে গিফট দিচ্ছে। আনোয়ার সাহেব আর মিনা বেগম মেয়েকে হলুদ দিতে গিয়েও কেঁদে ফেলেছে। মা-বাবার কান্না দেখে মাইশাও নিজেকে সামলাতে পারেনি। সকলে বুঝিয়ে তাদেরকে শান্ত করেছে। সকলের গায়ে হলুদ দেওয়া শেষ। শুধু সুমুই এখনও দেয়নি। সামিয়া গিয়ে সুমুকে ডেকে নিয়ে আসলো। সুমু স্টেজের ওপর উঠতেই মাইশা বলল,
“এতোক্ষণ কোথায় ছিলি, সুমু?”
“আপু, আমি শাড়ি পরে হাঁটতে পারছি না। দেখো না, কেমন খুলে খুলে যাচ্ছে।”
মাইশা আলতো হাসল সুমুর কথায়। সে বলল,
“এখন থেকেই অভ্যাস করে রাখ। তাহলে আর তোর নিজের বিয়ের সময় কোনো সমস্যা হবে না।”
সুমু হালকা লজ্জা পেল মাইশার কথায়। মাইশা সুমুর লজ্জা পাওয়া মুখটা দেখে বলল,
“ওরে আমার লজ্জাবতীরে, থাক তোকে আর লজ্জা পেতে হবে না। শুধু কি লজ্জায় পাবি? নাকি আমাকে হলুদও ছোঁয়াবি?”
সুমু হলুদের বাটি থেকে হলুদ নিয়ে মাইশাকে ছোঁয়াল। কাটাচামচে একটা মিষ্টি গেঁথে মাইশাকে খাওয়ালো। মাইশা পুরোটা খেতে পারবে না বলল। এই নিয়ে সুমু আর মাইশার খুনশুটি চলতে লাগল।
দূর থেকে একজোড়া চোখ সবটা দেখতে লাগল। হঠাৎ তার চোখে পড়ল সুমুর পেটের দিকে। সুমুর পেটের খানিকটা অংশ দেখা যাচ্ছে। শেরাজ মনে-মনে বকতে লাগল সুমুকে।
যেইটা ম্যানেজ করতে পারবে না। সেইটা ইউজ করার কি দরকার এই মেয়েটার। পেটের এতোটা অংশ দেখা যাচ্ছে,সেদিকে মেয়েটার কোনো হুঁশ নেই। দিব্বি তখন থেকে হেসেই চলেছে। ওই শরীরের প্রতিটা অংশ আমার। সৃষ্টিকর্তার আমার নামে বানানো ওই দেহটা, ওকে নিজের কাছে যত্নসহকারে দেখেশুনে রাখার জন্য দিয়েছে। যাতে ভবিষ্যতে আমার আমানত সহি সালামতে আমার হাতে তুলে দিতে পারে। আর ও কিনা সেই দেহের প্রতি এতোটা কেয়ারলেস। শেরাজ খান নিজের জিনিসের প্রতি অবহেলা, অযত্ন একদম সহ্য করে না। ওর কোনো অধিকার নেই আমার জিনিসের প্রতি এতোটা অযত্নশীল হবার।
কথাগুলো মনে-মনে বলে, পকেট থেকে ফোনটা বের করে আইয়ুবকে টেক্সট করল সে। দু’মিনিটের মধ্যে আইয়ুব এসে হাজির হলো শেরাজের সামনে। শেরাজ বলল,
“নাজমিন কই?”
আইয়ুব রাগ দেখানোর ভঙ্গিমাতে বলল;
“ওই ঝগড়াটে মেয়ে কোথায় আমি কীভাবে জানব?”
শেরাজ বিরক্তির সুরে বলল,
“তোকে ওর পিছনে ঘুরতে দেখেছি। এখন বল কোথায় ও?”
আইয়ুব মনে-মনে বলল,
“পিছনে ঘুরতেও দেখে ফেলেছে। এই শেরাজের কয়টা চোখ। সামনের চোখ দুটোতো অলওয়েজ সুমুতে আটকে থাকে। দেখিতো ওর পিছনে কোনো হিডেন চোখ আছে কিনা।”
সেই ভাবা সেই কাজ। আইয়ুব শেরাজের পিছনে গিয়ে ভালো করে চেক করল। কিন্তু চোখ কেনো চোখের “চ” ও পেল না। আইয়ুবের কাজে শেরাজ মহাবিরক্ত। চোখ বন্ধ করে রাগ কন্ট্রোল করার বৃথা চেষ্টা করল সে। রাগ কন্ট্রোল না করতে পেরে বিরক্তিসূরে আইয়ুবকে বলল,
“কি সমস্যা আইয়ুব?”
আইয়ুব আনমনে উত্তর দিল,
“পেলাম না।”
শেরাজ এক ভ্রু উঁচু করে বলল,
“কি পেলিনা?”
এইবারও আইয়ুব আনমনে উত্তর দিল,
“চোখ।”
শেরাজ গর্জে উঠল। একটা রাম ধমক দিল আইয়ুবকে। আইয়ুবের হুঁশ ফিরল। আমতা- আমতা করে বলল,
“কি…কি হয়েছে শা*লা, থুরি ভাই? কি হয়েছে ভাই?”
শেরাজের অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে তাকানো দেখে আইয়ুব বলল,
“সত্যি জানিনা।”
শেরাজ পাঞ্জাবীর হাতা ফোল্ড করছিল। শেহেরাজকে পাঞ্জাবীর হাতা ফোল্ড করতে দেখে আইয়ুব বড় করে ঢোক গিলল। তারপর দাঁত বের করে হেসে বলল,
“এস.কে পুরো কথাটা শেষ করতে দিবি তো? তার আগেই পাঞ্জাবীর হাতা ফোল্ড করছিস কেনো? আমি বলতে চাইছিলাম যে দেখিনি, কিন্তু তোর জন্য সাত সমুদ্র তেরো নদী পার করে হলেও আমি ওই মেয়েকে খুঁজে নিয়ে আসব।”
কথাটা শেষ করেই আইয়ুব ছুটল নাজমিনকে খুঁজতে। পেয়েও গেল। আইয়ুব আগে থেকেই জানতো নাজমিন কোথায়। আইয়ুব বন্ধুদের সাথে দাঁড়িয়ে দূর থেকে এই শ্যামকন্যাকেই দেখছিল এতোক্ষণ। যে আজ শাড়ি পড়েছে, মুখে প্রসাধনী ছোঁয়া, চোখে কাজল, পাতলা চিকন ঠোঁটে গাঢ় রেড লিপস্টিক। পিঠ সমান চুলগুলো ছেড়ে রাখা। গলায়, মাথায়, কানে, হাতে গায়ে হলুদের গয়না পড়া। একদম নতুন রুপ আজ মেয়েটার।
আইয়ুব নাজমিনের পিছনে গিয়ে দাঁড়াল। ঠোঁটে তার লেগে আছে দুষ্টু হাসি। আইয়ুবের কান্ডে নাজমিন কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ল। নাজমিন দেখল ওর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলো হাসছে। নাজমিন তাদের “এক্সকিউজ মি” বলে সরে আসলো।
আইয়ুব এখনও নাজমিনের পিছু-পিছু ঘুরছে। নাজমিন বিরক্তিরসূরে বলল,
“কি হচ্ছেটা কি? আমার পিছু নিয়েছেন কেনো?”
“এস.কে তোমাকে ডাকছে।”
“কিহ! এস,কে মানে শেরাজ খান?”
“হুম।”
“অসম্ভব! উনি আমাকে কেনো ডাকতে যাবে?”
“চলো আমার সাথে। গেলেই দেখতে পাবে।”
নাজমিন গেল আইয়ুবের সাথে। শেরাজ চেয়ারে নির্বাক ভঙ্গিতে বসে আছে। দৃষ্টি তার প্রখর। কাউকে খুব মন দিয়ে দেখছে। শেরাজের আশেপাশে মেয়েরা ঘুরঘুর করছে। একটু চান্স নেওয়ার জন্য। কিন্তু এগোনোর সাহস পাচ্ছে না।
নাজমিন গিয়ে দাঁড়াল শেরাজের সামনে। মুখ ফুটে বলল,
“আমাকে ডেকেছিলেন ভাইয়া?”
শেরাজ নাজমিনের দিকে না তাকিয়ে উত্তর দিল,
হুম, ডেকেছিলাম।
সে আইয়ুবের উদ্দেশ্যে বলল,
“আইয়ুব তুই এখন যা।”
হুকুম পেয়ে আইয়ুব চলে গেল। নাজমিন কিছুটা অস্বস্তিবোধ করছে। সেই সাথে প্রচুর ভয়ও পাচ্ছে।
শেরাজ নাজমিনের সব ভয়কে কাটিয়ে বলল,
“ওই যে স্টেজের ওপর তোমার কাজিন সুমুকে দেখছো। ওকে গিয়ে বলো, হয়তো শাড়িটা চেঞ্জ করে আসতে, নয়তো শাড়িটাকে ঠিকভাবে ম্যানেজ করতে।”
নাজমিন শেরাজের কথায় সুমুর দিকে তাকাল। দেখল, শাড়ির ফাঁকা দিয়ে সুমুর ফর্সা পেট দৃশ্যমান। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সম্মতি জানিয়ে সুমুর কাছে যাবার জন্য পা বাড়িয়েছিল নাজমিন। হঠাৎ শেরাজ পিছন থেকে ডাকল ওকে।
“নাজমিন, লিসেন!”
নাজমিন শেরাজের দিকে তাকাল। দেখল, শেরাজের দৃষ্টি এখনো সুমুতে আটকে আছে। নাজমিন মনে-মনে বলল,
“এখন পর্যন্ত আমার দিকে একটিবার তাকায়নি। প্রতিটা মেয়ের জীবনে’তো এমন লয়াল পুরুষই প্রয়োজন।”
কথাটা সে মনে মনে বলে, মুখে বলল,
“জি ভাইয়া।”
তুমি সুমুকে বলো না, যে ব্যাপার আমি তোমাকে বলেছি। তাহলে ও হেজিটেড ফিল করবে। আর এই কাজটা শেষ করে তুমি আর সামিয়া আমার সাথে এসে দেখা করো।
নাজমিন মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালো। সাথে দ্বিতীয় দফায় মুগ্ধ হলো শেরাজের প্রতি। একটা ছেলে ঠিক কতোটা সৎ চরিত্রের হলে, একটা মেয়ে দিকে না তাকিয়ে কথা বলে। আবার একটা মেয়েকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচাচ্ছে। কিন্তু তার সামনে নিজের নাম জাহির করবে না, কারণ সত্যিটা জানতে পারলে মেয়েটা অস্বস্তিতে পড়তে পারে। সে যাতে অস্বস্তিতে না পড়ে, তার জন্য নিজের নাম বলতে না করছে।
কথাগুলো মনে-মনে বলে পা বাড়িয়ে চলে গেল স্টেজের উদ্দেশ্যে। মুহুর্তের মাঝেই সুমুর কাছে এসে পৌঁছালো সে। সুমুর পাশে বসে বলল,
“সুমু আপু! তোমার পেট দেখা যাচ্ছে। শাড়িটা ঠিক করে নাও।”
নাজমিনের কথায় সুমু অস্বস্তিতে পড়ল। মুখটা কালো করে বলল,
“ঠিক এর জন্যই আমি শাড়ি পড়তে চাইছিলাম না। তুই আমাকে একটু হেল্প কর।”
নাজমিন সম্মতি জানিয়ে সুমুকে সাহায্য করল। সে সুমুকে আড়াল করে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল। সুমু রুমে এসে নাজমিনকে বলল,
ভাগ্যিস ব্যাপারটা তোর নজরে পড়েছিল, নয়তো আমিতো খেয়ালই করতাম না। আর কোনো ছেলে দেখলে, কি একটা লজ্জায় পড়তাম আমি। না এই শাড়ি আমি আর কোনদিনও পড়ব না।”
নাজমিন হেসে বলল,
“এতো না ভেবে, তুমি চেঞ্জ করে নিচে আসো। আমি যাচ্ছি।”
রুম ত্যাগ করল নাজমিন।
নাজমিন যেতেই আলমারি থেকে একটা স্টনের কাজ করা গর্জিয়াস সাদা রঙের চুরিদার বের করল সুমু। ড্রেসটা নিয়ে চলে গেল চেঞ্জ করতে। দশ মিনিটে চেঞ্জ করে বের হলো সে। আয়নার সামনে গিয়ে নিজেকে একটু পরিপাটি করে নিল। ফোনটা হাতে নিয়ে রুম ছাড়ল গার্ডেনের উদ্দেশ্যে।
গার্ডেনে এসে দেখল শেরাজকে মেয়েরা ঘিরে ধরেছে। শেরাজ প্রতিটা মেয়ের সাথে ডিসটেন্স মেইনটেইন করে তাদের ফটোগ্রাফ নিতে দিচ্ছে। কাউকে তার নিজের বডির সাথে টাচ লাগার কোনো সুযোগ দিচ্ছে না। সুমুর ব্যাপারটা সহ্য হলো না। সে শেরাজের দিকে একদৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে হাঁটছে। হঠাৎ সামনে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে পা থামিয়ে ফেলল সুমু। শেরাজের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সামনে তাকাল। দেখল, একজন ভদ্রমহিলা তার দিকে তাকিয়ে আছে। ঠোঁটে তার হাসি লেগে আছে। ভদ্রতাসূচক সুমুও আলতো হাসল। মহিলাটি বললেন,
“তুমি হাসি আপার মেয়ে না?”
সুমু ছোট্ট করে জবাব দিল,
“জি, আন্টি।”
মহিলাটি মুখে হাসির রেখা আরো বেশি প্রশস্ত করে বললেন,
“সেই কোন ছোট বেলায় তোমাকে দেখেছি। কতো বড় হয়ে গেছ তুমি। দেখতেও ভারি মিষ্টি। তা তোমার না একটা ছোট বোন আছে?”
“জি আন্টি, আছে।”
“সেও নিশ্চয় খুব বড় হয়ে গেছে। তা তোমার নাম কি মা?”
“শেখ সুমাইয়া জাহান!”
“বাহ্! খুব মিষ্টি নাম। তা পড়াশোনা করো তো মা?”
“জি আন্টি! আমি অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী।”
“খুব ভালো। এইটুকু বয়সে পড়াশোনাতে খুব এগিয়ে গেছ।”
“জি আন্টি।”
“তা মা, শাড়িতে তো তোমাকে খুব সুন্দর লাগছিল। চেঞ্জ করে ফেললে কেনো? আমিতো এখানে এসে তোমাকে দেখার পর থেকে চোখ সরাতে পারিনি। তা মা বিয়ে হয়ে গেছে তোমার?”
এমন প্রশ্নে খুব বিরক্তিবোধ করল সুমু। সে জোর করে মুখে হাসির রেখা টেনে বলল,
“আসলে আন্টি, আমার একটু কাজ আছে। আমি আসছি। আপনি কিন্তু না খেয়ে যাবেন না।”
কথাটা বলে স্থান ত্যাগ করল সুমু। তখনই ওই মহিলার সামনে এসে দাঁড়াল খুশি বেগম। তিনি হেসে বললেন,
“কেমন আছিস হাসনা?”
হাসনা বেগম হেসে বললেন,
“জি ভালো।”
“তোকে অনেকদিন পর দেখলাম। তা আমার বোনের মেয়েকে খুব পছন্দ হয়েছে তোর তাই না?”
হাসনা বেগম মুচকি হেসে বললেন,
“আরে খুশি আর বলিসনা। আমার ছেলেটাকে বিয়ে দিব, তাই মেয়ে খুঁজছি। কিন্তু হাতের কাছে কোনো ভালো মেয়ে পাচ্ছিনা। আর তুই আমার ছোট বেলার বান্ধবী, তোর কাছে কিছু লুকাব না। আমার ছেলে একটা মেয়েকে পছন্দ করে। মেয়েটাকে আমার একদম ভালো লাগেনি। আমার ওই একটাই মাত্র ছেলে। ছেলেকে বলেছি, আমার পছন্দ করা মেয়ের সাথেই ওর বিয়ে দিব আমি। হাসি আপার এই মেয়েটা খুব মিষ্টি। আর ব্যবহার ও খুব সুন্দর। আমার ওকে খুব পছন্দ হয়েছে।”
খুশি বেগম হেসে বললেন,
“পছন্দ হয়েছে, ছেলের বউ করবি। সমস্যা কি?”
হাসনা বেগম খুশিতে গদগদ হয়ে বললেন,
“সত্যি খুশি? তুই সত্যি বলছিস?”
খুশি বেগম উচ্চস্বরে হেসে বললেন,
“হ্যাঁ সত্যি।”
হাসনা বেগম একটু ভাবুক হয়ে বললেন,
“কিন্তু তোর বড় বোন কি রাজি হবে মেয়ে বিয়ে দিতে?”
খুশি বেগম হাসনা বেগমের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
“আরে, আমি আছি না। তুই কোনো চিন্তা করিস না। কিন্তু তোর ছেলে, সে কি রাজি হবে?”
“তুই ভাবিসনা খুশি। আমার ছেলেকে রাজি করানোর দায়িত্ব আমার।”
খুশি বেগম বললেন,
“ঠিক আছে। চল এখন অনুষ্ঠান দেখি।”
দুই বান্ধবী চলে গেলেন স্টেজের দিকে। দূর থেকে সবটা দেখল একজোড়া চোখ। ঠোঁটে তার বাঁকা হাসি।
মাইশার শশুর বাড়ি থেকে লোক এসেছে, হলুদের তত্ত্ব নিয়ে। মাইশা ভিডিও কলে কথা বলছে তার হবু জামাইয়ের সাথে। ডান্সের জন্য লোক ভাড়া করে আনা হয়েছে। তারা একের পর এক পারফরমেন্স করে যাচ্ছে। আনোয়ার সাহেব, রিসাত সাহেব, ইফতিয়াক সাহেব, শামীম সাহেব হলুদে নিমন্ত্রিত সকলের দেখাশোনা করছেন। কারো কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা, আসতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা, কারো কিছু লাগবে কিনা, এ ব্যাপারে জিঙ্গাসা করছেন। মিনা বেগম আর হাসি বেগম চা, নাস্তা, শরবত, স্নাক্স, পকোড়া তৈরি করছেন। কেটারিংঙের লোকরা সকলকে ঘুরে-ঘুরে নাস্তা দিচ্ছেন। খুশি বেগম নিজের মেয়ে আর বান্ধবীর সাথে খোশগল্প করছেন।
ইফতিয়ার আর খুশি বেগমের মনের ভেতর রাগ জমে আছে। আনোয়ার সাহেবের তখনের বলা কথাগুলো পছন্দ হয়নি খুশি বেগমের। তার মেয়ের হাতের এমন অবস্থা আর তার ভাই ব্যাপারটাকে তুচ্ছ করে দেখেছে। কিন্তু তিনি এর প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়বে। কাল রাতের পর থেকেই খুশি বেগম শেরাজ আর সুমুর দিকে খুব ভালো করে নজর রেখেছে।
রাইশা, তিশা, মাহি আর রাইশার সব ফ্রেন্ডরা ডান্সের প্রিপারেশন নিচ্ছে। ভাড়া করা ডান্সের পার্টির পর তাদের পারফরমেন্স। রাইফ চেয়ারে বসে-বসে হাতে পকোড়ার প্লেট নিয়ে খাচ্ছে আর ডান্স দেখছে। শেরাজে ও তার ফ্রেন্ডরা একসাথে বসে আছে। শেরাজ ফোনে স্ক্রল করছে আর রাহিনরা বসে আড্ডা দিচ্ছে।
সুমু নাজমিন আর সামিয়াকে খুঁজছে। কিন্তু কোথায়ও পাচ্ছেনা। সুমু স্টেজের ওপর উঠে মাইশাকে বলল,
“আপু নাজমিন আর সামিয়াকে দেখেছো? দেখোনা কোথাও পাচ্ছিনা?”
সে ডান্স পার্টির দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই ডান্সের পার্টির পর তো ওদের পারফরমেন্স। রাইশা আর তিশা খুঁজছে ওদের দুজনকে।”
মাইশা ফোনটা নিচে নামিয়ে বলল,
“ওদের দুজনকে আমি শেরাজ ভাইয়ার সাথে কথা বলতে দেখেছিলাম। তারপর আর দেখেনি।”
মাইশার কথায় সুমুর ভ্রু কুঁচকে আসলো। সে মনে-মনে বলল,
“খান সাহেবের সাথে ওদের কি কথা থাকতে পারে।”
সুমু মুখে বলল,
“ঠিক আছে আপু। তুমি ভাইয়ার সাথে কথা বলো, আমি আসছি।”
কথাটা বলেই স্থান ত্যাগ করল সুমু। এগিয়ে গেল শেরাজদের দিকে। মুহূর্তেই শেরাজের সামনে এসে দাঁড়াল সে। শেরাজ মাথা তুলে তাকাল। আইয়ুবরা সকলে ঠোঁট টিপে হাসছে। সুমুর দৃষ্টি মাটির দিকে। চোখ তুলে তাকানোর সাহস পেল না সে। নিজেকে সামলে বলল,
“আপনি নাজমিন আর সামিয়া কোথায় আছে জানেন?”
শেরাজ মাথা নামিয়ে ফোনে স্ক্রল করতে-করতে বলল,
“ওদের খবর আমি কীভাবে জানবো?”
সুমু আমতা-আমতা করে বলল,
“মা..মাইশা আপু বলল যে, ওদের দুজনকে আপনার সাথে কথা বলতে দেখেছে।”
হ্যাঁ, আমার কিছু লাগবে কিনা জিঙ্গাসা করতে এসেছিল। তারপর চলে গেছে।
সুমু আর দাঁড়াল না। বাড়ির ভেতরে চলে গেল। শেরাজ তার মাশুকার যাওয়ার পানে তাকিয়ে আছে। আইয়ুব একটু জোরেই হেসে ফেলল। আইয়ুবের হাসি দেখে শেরাজের বাকিসব ফ্রেন্ডরাও হেসে ফেলল। শেরাজ তাকাল আইয়ুবের দিকে। আইয়ুব হাসতে-হাসতে বলল,
“সরি এস,কে! হাসি আটকে রাখতে কষ্ট হচ্ছিল। তাই দাঁত ভেদ করে ভেতর থেকে হাসি বেরিয়ে গেছে।”
আইয়ুবের কথাশুনে সকলে আরো উচ্চস্বরে হেসে উঠল।
সুমু বাড়ির ভেতরে এসে ড্রয়িংরুমের কোথাও পেল না ওদের দুজনকে। সে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠল। হঠাৎ তার কানে ভেসে এলো কারো কান্নার আওয়াজ। মুহুর্তেই মাইশার রুমের সামনে এসে পৌঁছাল সুমু। রুমের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। দেখল, সামিয়া অনবরত কাঁদছে আর নাজমিন বসে ওকে শান্তনা দিচ্ছে। সুমুকে দেখে চোখের পানি তাড়াতাড়ি করে মুছল সামিয়া। সুমু সামিয়া দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সুমু মুখ ফুটে বলল,
“তোরা দুজনকি নিজে থেকে আমাকে বলবি কি হয়েছে? নাকি আমি খুঁজে নিবো?”
সামিয়া দৌড়ে এসে নিজের বোনকে জড়িয়ে ধরল। সে কাঁদতে-কাঁদতে বলল,
“আমার মাথার গাজরাটা পড়ে গেয়েছিল বলে আমি আর নাজমিন বাড়ির ভেতরে আসছিলাম গাজরাটা খুঁজতে। তখন মাইশা আপুর শশুর বাড়ি থেকে আসা একটা ছেলে আমাদের দুজনকে অনেক বাজে কথা বলেছে। আমাদের দুজনের ফিগার নিয়ে কথা বলেছে। আমাদের দুজনকে “মাল” বলে সম্মোধন করেছে। ওই ছেলে সাথে যেই ছেলেগুলো ছিল, তারা ওই ছেলেটার কথা শুনে জোরে-জোরে হাসছিল।”
কথাগুলো বলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল সামিয়া। নাজমিনের চোখ থেকেও দু’ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল। রাগে সুমুর শরীর কাঁপছে। সে মুখ ফুটে বলল,
“”ওরা এখন কোথায় আছে?”
নাজমিন বলল,
“গেটের বাহিরে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে।”
সুমু উত্তর পেয়ে বোনরে হাত ধরে নাজমিনের কাছে গিয়ে নাজমিনের হাত ধরে টেনে তুলল। দুই হাতে দুবোনকে ধরে নিয়ে গ্রেটের বাহিরে আসলো। দেখল, পাঁচজন ছেলে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। দুইবোনকে নিয়ে ছেলেগুলোর সামনে গিয়ে দাঁড়াল সুমু। সামিয়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“কোনটা?”
সামিয়া আঙ্গুল তাক করে দেখাল। নাজমিন পরিস্থিতি উল্টো দিকে যাচ্ছে দেখে দৌড়ে চলে গেল রাহিনদের খবর দিতে।
সুমু অগ্নিচোখে তাকিয়ে আছে ছেলেগুলোর দিকে। হঠাৎ একটা ছেলে বলে উঠল,
“রিফাত, দেখ মামা। তোকে মারার জন্য লেডি গুন্ডা নিয়ে এসেছে।”
ছেলেটার কথাটা শেষ হতেই সকলে উচ্চস্বরে বিচ্ছিরিভাবে হেসে উঠল। রিফাত নামের ছেলেটা সুমুর পা থেকে মাথা প্রচন্ড নোংরা নজরে দেখে বলল,
“আগের দুটোর থেকে এই মালটা বেশি সুন্দর মামা। একদম আগুন। কি তেজ নিয়ে তাকিয়ে আছে দেখ। পুরো ধানি লঙ্কা। আই লাভ তেজি গার্ল।”
কথাগুলো বলেই আবারও উচ্চস্বরে হেসে উঠল ছেলেগুলো।
প্রচন্ড রাগ নিয়ে সুমু বলল,
“সামিয়া তোর পায়ের একটা জুতো খুলে আমার হাতে দে।”
বোনের আদেশ পেয়ে সামিয়া জুতো খুলে সুমুর হাতে দিল। সুমু আর দেরি না করে জুতো দিয়ে ঠাস-ঠাস করে বারি মারল ছেলেটার দুইগালে।
এমন কন্ডে বাকি ছেলেগুলো হতভম্ব। রিফাত নামের ছেলেটা প্রচন্ড রাগ নিয়ে তর্জনী তুলে জোরে চিৎকার দিয়ে বলল,
“এই তুই…”
কথাটা শেষ করতে পারল না ছেলেটা। তার আগেই সুমু তর্জনী তুলে চিৎকার দিয়ে বলল,
“ডোন্ট সাউট।”
তর্জনী আঙুলটা নিজের ঠোঁটের ওপর রেখে বলল,
“একদম চুপ। কোনো কথা বলবি না। মেয়েদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জানিস না? একটা মেয়ের গর্ভ থেকে জন্ম নিয়ে, অন্য একটা মেয়েকেই নোংরা কথা বলিস। বাসায় নিজের মা-বোনকেও মাল ভাবিস নাকি? নোংরা নজরে দেখিস নাকি? তোকে জুতো দিয়ে কেনো মারলাম জানিস? তোর মতো নোংরা ছেলেকে নিজের হাত দিয়ে চড় মারার কথা ভাবলেও আমার গা গুলিয়ে উঠছে, তাই তোকে জুতো দিয়ে মারলাম। কারণ তুই এইটারই যোগ্য। অবশ্য আমার মনে হচ্ছে, তোকে মেরে জুতোটাও নোংরা হয়ে গেছে। আমরা হয়তো বুঝতে পারছিনা, তবে দেখ হয়তো জুতোটারও হয়তো গা গোলাচ্ছে। এই সামিয়া এই জুতোগুলো নোংরা হয়ে গেছে। চল, এগুলো গোবরের মধ্যে ফেলে তুই অন্য জুতা পড়বি।”
কথাটা বলে সুমু সামিয়ার হাত ধরে চলে যাচ্ছিল। তখনি ছেলেটার চিৎকারের আওয়াজ ভেসে আসলো সুমু কানে। সুমু আর সামিয়া ঘুরে তাকিয়ে দেখল, শেরাজ ছেলেটার হাত মুচড়ে ধরে আছে।
নাজমিন সকলকে ডেকে অনেক আগেই নিয়ে এসেছে। কিন্তু শেরাজ গেটের সামনেই সকলকে আটকে দেয়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার সিংহীনির শাসন দেখছিল। সুমু ঘুরে দাঁড়ানোর সময় রিফাত নামের ছেলেটা সুমুর দিকে হাত বাড়ায়। এই দৃশ্য দেখে শেরাজ ঝড়ের গতিতে এসে ছেলেটার হাত মুচড়ে ধরে।
সুমু আহাম্মক বনে গেছে। এমন ভাবে হাত মুচড়ে ধরার কারণ বুঝতে পারল না সে। একবার মুচড়ে ধরা হাতের দিকে তাকাচ্ছে তো একবার ছেলেটার মুখের দিয়ে। ছেলেটা অসহ্য ব্যথায় চোখ-মুখ কুঁচকে গোঙ্গাচ্ছে। সুমু শেরাজের দিকে তাকাতেই ভয়ে চুপসে গেল। এতোক্ষণে গর্জে থাকা সিংহীনি রুপটা শেরাজকে দেখে ভেজা বেড়ালের মতো হয়ে গেল। রাহিন আর আইয়ুব সবটা শোনার পর ভয়ংকর রেগে গিয়েছিল। নিজের প্রেয়সীকে নিয়ে এমন মন্তব্য দুনিয়ার কোনো প্রেমিক সহ্য করতে পারেনা। ওরা দুজনও পারেনি। ছুটে এসেছিল মারার জন্য। তবে সুমুর কান্ড দেখে শেরাজ তাদের আটকে দেয়। আর এখন শেরাজের কান্ড দেখে ওরাও ভয় পেয়ে গেছে। আইয়ুব রাহিনের কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ভাই! এস.কে’কে থামানো দরকার। ও যা ক্ষেপেছে, উল্টাপাল্টা কিছু করার আগে ওকে থামাতে হবে। অন্তত সুমুদের সামনে ওকে কিছু করতে দেওয়া যাবেনা।”
রাহিন আইয়ুবের কথায় সম্মতি জানিয়ে দৌড়ে গেল শেরাজের কাছে। সাথে সব ফ্রেন্ডরাও গেল। শেরাজ এখনো অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে হাত মুচড়ে ধরে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আছে। রিফাতের বন্ধুগুলো শেরাজের অগ্নিদৃষ্টি দেখে ভয়ে সিঁটিয়ে আছে। চোখ তুলে তাকাচ্ছেনা পযর্ন্ত ছেলেগুলো। শেরাজের চোখের প্রতিটি শিরা রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। দাবানলের আগুন জ্বলছে ওই চোখ দুটিতে।
আইয়ুব শেরাজের কানের কাছে গিয়ে বলল,
“মাথা ঠান্ডা কর এস.কে। এইখানে সুমু, সামিয়ারা আছে। এদের সামনে প্লিজ কোনো উল্টাপাল্টা একশন নিস না।”
শেরাজ ছেলেটার নাক বরাবর ঘুষি মারল। মুহুর্তে ছেলেটা মুখ থুবড়ে পড়ল সুমুর পায়ের সামনে। নাক দিয়ে গলগল করে রক্ত ঝড়ছে। গর্জে উঠে শেরাজ বললো,
“সে সরি!”
উপস্থিত সকলে ভয়ে কেঁপে উঠল। সুমু চোখ তুলে তাকানোর সাহস অবধি পেল না। সামিয়া আর নাজমিন ভয়ের চোটে সারবাজদের পিছনে গিয়ে লুকিয়েছে।
ছেলেটার ভয়ের চোটে সুমুর পা ধরে আমতা-আমতা করে বলল,
“স…সরি, সরি, সরি বোন! আমার ভুল হয়ে গেছে। আমাকে ক্ষমা করে দাও।”
শেরাজ আবারও গর্জে উঠল,
“হয়নি। বল, সরি মা। আমার ভুল হয়ে গেছে। আমাকে ক্ষমা করে দিন। আজকে পর আমি সব মেয়েকে নিজের মায়ের নজরে দেখব।”
ছেলেটা কিছুটা সময় নিয়ে সবটা বলল। শেরাজ সুমুর দিকে আঙুল তাক করে আইয়ুবের উদ্দেশ্যে বলল,
“ওদের নিয়ে বাড়ির ভেতরে দিয়ে আয়।”
সুমু চোখ তুলে তাকাল। আমতা-আমতা করে বলল,
“ও..ওকে আর মা..মারবেন না, প্লিজ। ছে..ছেড়ে দিন। ছেলেটার হাতটা হয়তো…”
কথাটা শেষ করতে পারল না সুমু। শেরাজ গর্জে উঠে আইয়ুবের উদ্দেশ্যে বলল,
আমি তোকে কিছু বলেছি আইয়ুব?”
আইয়ুব সুমুদের নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। সে যেতে-যেতে বলল,
“চিন্তা করোনা। ওদের আর কিছু বলবে না। শেরাজ কেমন ছেলে একটু হলেও তো জানো? রেগে গিয়েছিল তাই হালকা মেরেছে। ক্ষমা চেয়েছে, এখন আর কিছুই বলবে না।”
সুমু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
আইয়ুব সুমুদের অনুষ্ঠানের দিকে যেতে দেখে আবারও শেরাজদের কাছে ফিরে এলো।
শেরাজ পিছন থেকে শার্ট খামচে ধরে ছেলেটাকে টেনে তুলল। সে ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আজ তুই তোর জীবনের সবথেকে বড় ভুলটা করে ফেলেছিস। আর সেই ভুলটা কি জানিস? শেরাজ খানের কলিজার দিকে হাত বাড়িয়েছিস। কি জানো বলেছিলি? পুরো আগুন? ঠিকি বলেছিস, ও আগুন। কিন্তু দেখ, তুই আগুনের দিকে হাত বাড়িয়েছিস আর ছেঁকা খাবিনা তা কি করে হয় বল?”
শেরাজ রিফাতের বাকি ফ্রেন্ডদের দিকে তাঁকিয়ে বলল,
“তোদের কারো কাছে লাইটার আছে?”
একটা ছেলে আমতা-আমতা করে বলল,
“না স্যার।”
শেরাজ অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করল ছেলেটার দিকে। ভয়ের চোটে ছেলেটা পকেট থেকে লাইটার বের করে শেরাজের দিকে বাড়িয়ে দিল। আইয়ুবরা নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তারা বাধা দিচ্ছেনা শেরাজকে। কারণ, তারা জানে বাধা দিয়ে কোনো লাভ নেই। বাধা দিতে গেলে ওদের কপালেও দুঃখ আছে।
শেরাজ লাইটারটা জ্বালিয়ে ছেলেটার হাতের ওপর চেপে ধরল। মুহুর্তেই ছেলেটা গগন ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল। শেরাজ বিরক্তি নিয়ে তাকাল রাহিনের দিকে। রিফাতকে চোখের ইশারায় দেখিয়ে রাহিনের উদ্দেশ্যে বলল,
“ওর পকেট থেকে রুমাল বের করে ওর মুখে গুঁজে দে। নর্দমার কীটটা বড্ড জোড়ে চিৎকার করছে। এখনি কান নষ্ট হলে চলবে না। বিয়ের করে ভবিষ্যৎ বাচ্চাদের কান্নার আওয়াজ আর বাচ্চার মায়ের কোমরে দুইহাত বেঁধে ঝগড়া শোনার জন্য কান দুটোকে ভালো রাখতে হবে।”
আইয়ুবরা শেরাজের কথায় হেসে ফেললো। রাহিন গিয়ে রিফাতের পকেট থেকে রুমাল বের করে রিফাতের মুখে গুঁজে দিল।
শেরাজ পুনরায় অন্য জায়গায় লাইটার জ্বালিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিল। এইবার আর ছেলেটার চিৎকার শোনা গেল না। শুধু চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়তে লাগল আর গ*লাকাটা মুরগির মতো ছটফট করতে লাগল। শেরাজ একে একে দুইহাতের কবজি পযর্ন্ত জায়গায় জায়গায় পুড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আগুনের দিকে হাত বাড়িয়েছিলি। তাই সামান্য ছেকা দিলাম। যদি আগুনকে ছুঁয়ে দিতি– তাহলে তোর এই হাত দুটো আমি পুড়িয়ে ছাই করে দিতাম। আর তোর বডিটাকে কেটে টুকরো-টুকরো করে রাস্তার কুকুর দিয়ে খাওয়াতাম। ইচ্ছেতো করছে তোর এই চোখ দুটোকে তুলে নেই। কিন্তু ওই যে, আমার সুইটহার্ট বলে গেল তোকে ছেড়ে দিতে, তাই অল্পের ওপর তোকে ছেড়ে দিলাম। আজকের পর কোনো মেয়ের দিকে তোর এই নোংরা হাত বাড়ালে এই ছেকাগুলো তোকে আজকে রাতের কথা মনে করিয়ে দিবে।”
শেরাজ লাইটারটা রিফাতের বন্ধুগুলোর দিকে ছুড়ে মেরে রাহিনকে কিছু একটা ইশারা করে হাত ঝাড়তে-ঝাড়তে শিস বাজিয়ে গান গাইতে- গাইতে চলে গেল। হাতটা এমনভাবে ঝাড়লো– যেন হাতে কোনো জীবাণু লেগে আছে। রাহিন রিফাতের কাছে গিয়ে বলল,
“এখনো যে বেঁচে আছো তার জন্য শুকরিয়া আদায় করো। আর আজকে ঘটনা মনে রেখো। অবশ্য মনে পড়াতো পরের কথা, কোনদিনও ভুলতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে।”
কথাটা বলে রাহিন পকেট থেকে ওয়ালেট বের করল। ওয়ালেট থেকে পাঁচ হাজার টাকা আর একটা কার্ড বের করে রিফাতের বন্ধু সাব্বিরের হাতে দিয়ে বলল,
“ওকে হসপিটালে নিয়ে যাও। টাকা আরও প্রয়োজন পড়লে এই কার্ডের নাম্বারে কল করো। আর হ্যাঁ, এই ঘটনা তোমারদের পাঁচ কানের বাহিরে ছয় কান হলে, কি হবে বুঝতে পারছ তো?”
সাব্বির নামের ছেলেটা বড় করে ঢোক গিলে বলল,
“কেউ জানবে না ভাইয়া।”
“এইতো, দ্যাটস লাইক আ গুড বয়। তাহলে যাও।”
ছেলেগুলো দৌড়ে গিয়ে রিফাতকে নিয়ে চলে গেল।
রাহিনরাও চলে গেলে বাড়ির ভেতরে। তারা ভেতরে এসে শেরাজকে খুঁজল। শেরাজের রুমের ভিতরে এসে দেখল শেরাজ শাওয়ার নিতে ঢুকেছে।
প্রায় ত্রিশ মিনিটের মাথায় শেরাজ শাওয়ার নিয়ে চুল মুছতে-মুছতে বেরিয়ে এলো। লং শাওয়ার নিয়েছে সে। রুমের মধ্যে সব ফ্রেন্ডদের দেখে একটুও অবাক হলো না সে। উল্টে একজন শাহরুখ খানের রিয়েল ফ্যান হিসেবে, শাহরুখ খানের মুভির গান গাইতে- গাইতে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে পরিপাটি করতে ব্যস্ত হলো। নিজেকে একদম পারফেক্ট ভাবে তৈরি করে ফোনের ক্যামেরা অন করে নিজের কিছু ভিডিও ক্লিপ নিল সে।
এই পর্যায়ে এসে সারবাজ মুখ খুলে বলল,
“এখন কেনো শাওয়ার নিলি?”
শেরাজ ভাবলেসহীনভাবে উত্তর দিল,
“তোরা কি আমার রুলস ভুলে গেছিস?”
রিসান বলল,
“তুইতো ওকে মার্ডার করিসনি। তাহলে?”
শেরাজ বলল,
“নোংরা নোংরাই হয়। সেটা বেশি হোক বা কম।”
রাহিন বলল,
“নিচে যাবিনা?”
“হ্যাঁ যাব। কাল মাইশাকে কথা দিয়েছিলাম, আর শেরাজ কখনো নিজের কথার খেলাপ করে না।”
কথাগুলো বলে সব ফ্রেন্ডরা মিলে নিচে চলে গেল।
সকলে অনুষ্ঠানে মেতে আছে। শেরাজরা এসে চেয়ারের বসল। রাহিন গিয়ে মাইক্রোফোনটা হাতে নিয়ে এনাউন্সমেন্ট করল,
“লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান! আজ একটি সুন্দর দিন। আজ আমার বোন মাইশার হলুদের অনুষ্ঠান। বাট, বাট, বাট! আজ এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা প্রতিটি মানুষের জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। স্পেশালি গার্লসদের জন্য।”
মেয়েরা সকলে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে রাহিনের দিকে। সকলের দৃষ্টি রাহিনের ওপর।
রাহিন আবারও বলল,
“এখন আমাদের মধ্যে পারফরম্যান্স করবে দ্য ওয়ার্ল্ড-ফেমাস, ওমানের নাম্বার ওয়ান বিজনেসম্যান, লাখো মেয়েদের হার্টথ্রব— শেরাজ খান।”
কথাটা শোনার সাথে- সাথে সকলে জোরে চেঁচিয়ে উঠল। শেরাজ, শেরাজ বলে স্লোগান দিতে লাগল। হঠাৎ লাইট অফ হয়ে গেল। পুরো অন্ধকার হয়ে গেল গার্ডেন। হঠাৎ স্টেজের ওপর একবিন্দু আলো জ্বলে উঠল। সকলের দৃষ্টি আলোর মধ্যে দৃশ্যমান একজন বলিষ্ঠ পুরুষের পিঠের ওপর। হোয়াইট শার্ট, ব্ল্যাক প্যান্ট, হোয়াইট স্নিকার্স সুজ, গলায় মোটা রুপার চেন, বাম হাতে ব্ল্যাক রোলেক্স ঘড়ি, ডান হাতে কালো ব্রেসলেট, বা হাতের বুড়ো আর অনামিকা আঙুলে ব্ল্যাক রিং পড়া। হোয়াইট শার্টের ওপর দিয়ে বলিষ্ঠ পিঠ আর হাতের পেশিবহুল মাংস দৃশ্যমান। শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা রাখার ফলে ফর্সা বুকের কিছুটা দৃশ্যমান। হাতে গিটার। চারপাশ আধারে ছেয়ে আছে। শুধু স্পটলাইট শেরাজের ওপর। সুমু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার খান সাহেবের দিকে। শেরাজ গিটারে মৃদু সুর তুলল। মাইক্রোফোনের সামনে এসে সুমুর দিকে তাকিয়ে গিটারে সুর তুলে গান ধরল,
“জানাম, দেখলু, মিটগেয়ি… দুরিয়া
ম্যা ইহা… হু, ইহা… হু, ইহা… হু, ইহা
জানাম, দেখলু, মিটগেয়ি… দুরিয়া
ম্যা ইহা… হু, ইহা… হু, ইহা… হু, ইহা
জানাম, দেখলু, মিটগেয়ি… দুরিয়া
ম্যা ইহা… হু, ইহা… হু, ইহা… হু, ইহা
ক্যাছে সারহাদে, ক্যাছি মাজবুরিয়া
ম্যা ইহা… হু, ইহা… হু, ইহা… হু, ইহা”
সুমু তাকিয়ে আছে তার খান সাহেবের দিকে। তার মনে হচ্ছ, গানটা শুধু তার জন্যই গাইছে সে। সে মাথা নিচু করে আলতো হেসে আবারও তার খান সাহেবের দিকে তাকাল।
“তুম চুপানা ছাকোগি ম্যা ও… রাজ হু
তুম ভুলানা ছাকোগি, ও আন…দাজ হু
গুন্জতাহু জো দিলমে তো হেরাহু… কিউ
ম্যা তুমহারিহি দিল, কিতো আওয়াজ… হু
ছুনছাকো, তো ছুনো ধারকানোকি জুবা
ম্যা ইহা… হু, ইহা… হু, ইহা… হু, ইহা
ক্যাছে সারহাটে, ক্যাছি মাজবুরিয়া
ম্যা ইহা….. হু, ইহা….হু, ইহা….হু, ইহা”
শেরাজ আলতো হাসল। তার নজর সুমুতে আটকে। সে আবারও সুর ধরল,
“ম্যা হি ম্যা আব তুমহারে খেয়ালোমে হু,
ম্যা জাবাবো হু, ম্যা সাওয়ালোমে হু
ম্যা তুমহারেহে রিখখাবমেহু বাছা,
ম্যা তুমারি নাজারকি বুজালোমেহু
দেখতি হো মুঝে, দেখতি হো জাহা,
ম্যা ইহা… হু, ইহা… হু, ইহা… হু, ইহা
জানাম, দেখলু, মিটগেয়ি… দুরিয়া
ম্যা ইহা… হু, ইহা… হু, ইহা… হু, ইহা
ক্যাছে সারহাদে, ক্যাছি মাজবুরিয়া
ম্যা ইহা… হু, ইহা… হু, ইহা… হু, ইহা
ম্যা ইহা… হু, ইহা… হু, ইহা… হু, ইহা”
গান শেষে সকলের হাততালির বন্যা বয়ে গেল। স্পটলাইট অফ হয়ে গেল। পুরো গার্ডেন আবারও আগের মতো আলোকিত হয়ে গেল। রাহিন স্টেজের উপর উঠে এল। মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বলল,
“শেরাজ খানের এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দিয়ে আমার আমাদের আজকের অনুষ্ঠান শেষ করলাম।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত সব মেয়েদের মনে একটাই প্রশ্ন— পারফরম্যান্সের সময় শেরাজ খান কার দিকে তাকিয়ে ছিল।
অন্ধকার থাকার ফলে কেউ কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে ধরতে পারেনি— শুরু কিছু মানুষ ছাড়া। ইফতিয়া রাগে ফুঁসছে। খুশি বেগম মেয়েকে চোখের ইশারায় শান্ত থাকতে বললেন।
শেরাজের কাছে মেয়েদের ভিড়। সব মেয়েদের ইগনোর করে শেরাজ বাড়ির ভেতরে চলে গেছে। ঘড়ির কাঁটায় রাত একটা ছুই- ছুই। কেউ এখনো রাতের খাবার খায়নি। আনোয়ার সাহেব বলেছিলেন সকলকে খেয়ে নিতে। সবার একটাই কথা ছিল— অনুষ্ঠান শেষ হলে খাবে। অনুষ্ঠান শেষ হবার সাথে সাথে আনোয়ার সাহেব সকলকে খাবারের জায়গায় নিয়ে গেলেন। মাইশার শশুর বাড়ি থেকে আসা সবাই এখন খেয়ে তাড়াতাড়ি রওনা দিবে। রিফাতদের ব্যাপারটা রাহিন ম্যানেজ করে নিয়েছে।
সুমু খাচ্ছিল না। সামিয়া বলল,
“খাচ্ছোনা কেনো আপু?”
সুমু উত্তর দেওয়ার আগে রাহিন আনোয়ার সাহেবের উদ্দেশ্যে বলল,
“বাবা, শেরাজের খাবারটা আমি রুমে নিয়ে যাচ্ছি?”
আনোয়ার সাহেব বললেল,
“ঠিক আছে! নিয়ে যাও। আর বাকি সবাই ঠিকমতো খেয়েছে তো?”
“হ্যাঁ বাবা।”
খাবারটা নিয়ে চলে গেল রাহিন। সুমুও এইবার নিশ্চিন্তে খেয়ে রুমে চলে গেল। খুব টায়ার্ড সে। তাই শুয়ে পড়ল তাড়াতাড়ি।
শেরাজ রুমে এসে চেঞ্জ করেছে। কালো টি-শার্টের ওপর কালো হুডি পড়েছে। প্যান্ট চেঞ্জ করে অফ- হোয়াইট কালারে ট্রাউজার পড়েছে। রাহিন খাবারের ট্রে’টা টেবিলের ওপর রাখল। শেরাজ বসে খেতে লাগল। সারবাজ শেরাজের পারফরম্যান্সের সময়ের ভিডিও ক্লিপগুলো শেরাজকে দেখাচ্ছে। খেতে-খেতে শেরাজ সেগুলো দেখছে। সেইখানে সুমুর কিছু ছবি আছে। যা শেরাজ লুকিয়ে সারবাজকে তুলতে বলেছিল। সারবাজের কাছে অলওয়েজ ক্যামেরা থাকে। শেরাজের যাবতীয় ভিডিও শুট, ভিডিও এডিট সারবাজ করে। হলুদের ফটোসেশনের জন্য আলাদা ক্যামেরাম্যান আনা হয়েছিল। সবার ফটোশুট তাকে দিয়ে করানো হয়েছে। সারবাজ শুধু নিজেদের ফটো আর ভিডিও শুট করেছে। সেই সাথে শেরাজের কথায় সুমুর কিছু ছবি আর ভিডিও শুট করেছে।
হঠাৎ আইয়ুব বলল,
“আজ আমি শেরাজের সাথে শোবো।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“কেনো? তুই কি আমার বউ, যে আমি তোর সাথে বেড শেয়ার করবো?”
“আগে তো করেছিস। তাহলে এখন তোর সাথে ঘুমাতে হলে তোর বউ হতে হবে কেনো?”
“আগে তো আমার লাইফে কেউ ছিল না, তাই শেয়ার করেছি। এখন আছে তাই করব না।”
খান সাহেব পর্ব ৯
শেরাজের কথায় আইয়ুব কাঁদো-কাঁদো মুখ করে বসে রইল। শেরাজ ওয়াশরুম থেকে হাতে ধুয়ে এসে খাবারের প্লেটটা আইয়ুবের হাতে ধরিয়ে দিয়ে সবাইকে রুম থেকে বের করে দিল। আইয়ুবরাও দেরি না করে শুতে চলে গেল, কাল বিয়ের দিন তাড়াতাড়ি উঠতে হবে বলে। শেরাজ রুমের লাইট অফ করে বিছানায় গা হেলিয়ে দিল। সুমুর কথা ভাবতে ভাবতে চোখ বন্ধ করল।
